All posts by Oporajita

 

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা, ঘাতক দম্পতি গ্রেপ্তার

রাজধানীর পল্লবীতে রামিসা আক্তার (৮) নামের দ্বিতীয় শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালে প্রতিবেশী এক যুবকের ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় জনতা ও পুলিশ। এই ঘটনায় অভিযুক্ত মূল আসামি সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে (২৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত রামিসা মিরপুরের ‘পপুলার মডেল হাই স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণীর রোল নম্বর এক (১)ধারী শিক্ষার্থী ছিল। প্লে-গ্রুপ ও কেজিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পর প্রথম শ্রেণীতে সে প্রথম স্থান অর্জন করে। পড়ালেখায় অত্যন্ত মেধাবী রামিসার অকাল ও নৃশংস মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে রামিসা নিখোঁজ হওয়ার পর তার মা পারভীন আক্তার খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেশী সোহেল রানার ফ্ল্যাটের বাইরে রামিসার জুতো জোড়া দেখতে পান। ভেতর থেকে রামিসার চিৎকার শুনতে পেয়ে পারভীন আক্তার দরজায় অনবরত ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ মেলেনি।
পরে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। রামিসার চাচা এ কে এম নজরুল ইসলাম জানান, ঘরের ভেতরে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উপস্থিত ছিলেন। পরে তল্লাশি চালিয়ে ঘরের খাটের নিচ থেকে রামিসার মাথা বিচ্ছিন্ন দেহ এবং বাথরুমের একটি বালতি থেকে তার মাথা উদ্ধার করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, দরজা না খুলে ভেতর থেকে সোহেলকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না।

হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়া প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে মিরপুর বিভাগীয় পুলিশ। পরবর্তীতে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বশির জানান, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন—উভয়কেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

রামিসার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার বিদ্যালয় পপুলার মডেল হাই স্কুলে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা ও শোক। রামিসার শ্রেণী শিক্ষক মাহবুবুল হাকিম বলেন:

“রামিসা প্রতিদিন ক্লাসের ১০ মিনিট আগেই স্কুলে চলে আসত। মঙ্গলবার ও আসেনি দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। পরে শুনলাম ওকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম রামিসাকে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
নিহত রামিসার বাসায় এখনো থরে থরে সাজানো রয়েছে তার কৃতিত্বের স্মারক ও একাডেমিক ট্রফিগুলো। কিন্তু যে মেধাবী শিশুটি এই ট্রফিগুলো অর্জন করেছিল, সে আজ আর বেঁচে নেই। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।

 

প্রশাসনে মুসলিম নারী: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আয়নায় – সালিমা মেহরা

​ফেসবুক ফতোয়ার ধুন্ধুমার পথ মাড়িয়ে আসুন চোখ রাখি ইতিহাস আর ঐতিহ্যে। আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যে এমনটা আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করলে আমাদের যেতে হয় ফারাণ মরুভূমিতে—আমাদের হৃদয়ে যাঁর নাম মক্কা।

​স্থিরতা, সহনশীলতা আর তাওয়াক্কুলের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত যমযম কূপের পাশে হযরত হাজেরা (আ.) শিশু পুত্রসহ একাকী বসে আছেন। পানির সন্ধান পেয়ে জুরহুম গোত্রের প্রতিনিধি দল এসে বলল, “সম্মানিতা বোন, আপনার অনুমতি হলে আমাদের গোত্র এখানে বসবাস করতে চায়।” হযরত হাজেরা (আ.) অনুমতি দিয়ে বললেন, “বসবাস করতে পারেন; তবে এই কূপের ওপর শুধু কর্তৃত্ব থাকবে আমার।”

​এটা কি শুধুমাত্র কূপের ওপর কর্তৃত্ব, নাকি এই কূপ ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদে পানি বণ্টন ও সীমা নির্ধারণের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃত্ব? তবে কি এ ভূমিকা ছিল একজন প্রশাসকের? একজন নারীর এই ভূমিকা তখনও স্বাভাবিক ছিল বলেই জুরহুম গোত্রের কোনো আপত্তি ছিল না।
কিন্তু এখন!!

​ফারাণ পর্বত ছেড়ে মদিনায়। মুসলিম জাহানের সোনালী সময়; খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকাল। মদিনার বাজার—সমৃদ্ধ আর জমজমাট। সুচারুরূপে বাজার পরিচালনায় বাজার আদালত (قاضية الحسبة) তথা ‘অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি কোর্ট’ এবং (قاضية السوق) ‘মার্কেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর দায়িত্বে ছিলেন হযরত শাফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)।
তিনি ছিলেন একজন নারী সাহাবী এবং মক্কা ও মদিনার প্রসিদ্ধ চিকিৎসক। তিনি তাঁর পেশায় এতটাই সফল ছিলেন যে, ইতিহাস তাঁকে ‘শিফা’ (নিরাময়কারী) নামে স্মরণ রেখেছে।

ইতিহাসে আরেকটি নাম ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রহ.)। আলেপ্পোর প্রশাসনিক ফতোয়ার ওপর দুইজন পুরুষের পাশাপাশি দস্তখত থাকত এক নারীর—তিনিই সেই সম্মানিতা নারী।

​হাফসা বিনতে সিরিন (রহ) সময়ের সেরা ফকিহা। হিশাম বিন হাসসান যাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি হাসান বসরি ও ইবনে সিরিনকে দেখেছি, কিন্তু আমি এমন কাউকেই দেখিনি যাঁকে হাফসার চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে হয়েছে।”

উনারা তো ফকিহা ছিলেন; এখনো এই যোগ্যতা অর্জনে কে বাধা দেয়? সত্যিই কি এটা সমান অর্জন? তবে সেই ফকিহা কেমন? সেই অর্জন কতখানি?

​ক্রমবর্ধমান ইসলামী রাষ্ট্রের নিত্যনতুন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় সময়ের সেরা তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের হাতে গড়ে ওঠে ইসলামী আইনশাস্ত্র।
যেখানে টেক্সচুয়াল জ্ঞানের সাথে ‘Rational Knowledge’ বা ‘আকল-ভিত্তিক জ্ঞান’ ছিল অপরিহার্য। ইজতিহাদের সেই ক্ষমতা ছিল মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা। তাই সেই সময়ের ফকিহারা ছিলেন একেকটি পর্বতশৃঙ্গ, সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের অপরিহার্য অংশীদার।

​আমাদের দৃষ্টি আরও মুগ্ধতা মাখে এক হাশেমী নারীর বিস্ময়কর জ্ঞান, শক্ত মনোবল আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখে।
তিনি হযরত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ (রহ.)! ইতিহাস যাকে স্মরণ রেখেছে ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর জন্মদাত্রী এক সফল মা হিসেবে। পুত্র ইমাম শাফেয়ির জন্মের পরপরই স্বামী হারিয়ে তিনি ইয়েমেনে পিতৃগৃহে আশ্রয় নেন। পিতার অবস্থা ছিল হতদরিদ্র, তবে ফাতিমা থেমে যাননি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে ছেলেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা, কবিতা ও আর্চারি শেখানোর জন্য তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। ছেলেকে হাফেজ, মুহাদ্দিস ও ফকিহ হিসেবে গড়ে তুলতে অল্প বয়সে বিধবা হওয়া ফাতিমা ‘সিঙ্গেল মাদার’ হিসেবেই বাকি জীবন কাটিয়েছেন—যা তৎকালীন আরবের প্রেক্ষাপটে ছিল এক বিরল ঘটনা।

​একজন সফল মা হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সে সময়ের সেরা ফকিহা। একবার মক্কায় বিচারের কাজে সাক্ষী হওয়ার জন্য দুইজন নারীকে ডাকা হলো। দুজনের একজন ছিলেন হযরত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ। কাজি আলাদা আলাদা কক্ষে দুজনের সাক্ষ্য নিতে চাইলেন (শাফেয়ি মাযহাব মতে সাক্ষীদের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে আলাদা সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায়)।

বিচারের মজলিসে উপস্থিত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ শান্ত গলায় বললেন, “আপনার এটা করার কোনো অধিকার নেই কাজি সাহেব। কারণ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন—যদি নারী সাক্ষীদের একজন কোথাও ভুলে যায়, তবে অন্যজন তা স্মরণ করিয়ে দেবে।” (২:২৮২)।

​অতঃপর কাজি এই যুক্তির পর একসাথে তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ইমাম সুবকি এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে বলেন, “সত্যিই এটি ছিল সুন্দর দলিল, শক্তিশালী উপস্থাপন আর অসাধারণ যুক্তিতর্ক।” ছেলের মাযহাবের বিপরীতে উম্মে শাফেয়ির এই অবস্থান ছিল অনবদ্য।

ইতিহাসের গলিপথ মাড়িয়ে মহাগ্রন্থ আল কুরআন-এ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে হযরত মারইয়াম (আ.)যে ছবি ভেসে উঠে তাতে আমরা একজন বুদ্ধিদীপ্ত বালিকার সাক্ষাৎ পাই। বালিকা থেকে কৈশোরে উপনীত হতেই যিনি ইলম চর্চা, আনুগত্য আর চারিত্রিক পবিত্রতায় মহান রবের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কৈশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা রাখা এই মহান রমণী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিজার জন্য মনোনীত হলেন।
ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে তিনি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সদ্য জন্মানো অসাধারণ শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজ গোত্রে ফিরে আসা এবং দোলনা থেকে ছোট্ট শিশুর মাধ্যমে মায়ের চারিত্রিক পবিত্রতার সত্যায়ন—ইতিহাসের এই বর্ণনা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।

​তবে আমরা যা শুনিনি বা খুবই কম শুনেছি, তা হলো:

​একজন নারী কি পবিত্র মসজিদের খাদেমা হতে পারে? সমাজের ও জনপদের লোকদের এই নেতিবাচক মনোভাবকে ভুল প্রমাণিত করে মহান রব দিয়েছেন এর সম্মানজনক অনুমোদন।

​একজন সফল ‘সিঙ্গেল মাদার’-এর সংগ্রামের গল্প। সদ্য জন্মানো শিশুপুত্র ছিল একজন নবী, স্বয়ং রাজা ছিল যাঁর দুশমন। পুরো একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সন্তানের নিরাপত্তায় একাকী মায়ের লড়াই।

​একজন মা, পিতাহীন শিশুপুত্রকে হকের জন্য নিরাপদ রাখতে সুদূর মিশর পানে ছুটে চলেছেন। পথে বিপদ আছে, জীবননাশের শঙ্কা আছে; আর সেই মায়ের একমাত্র হাতিয়ার—বিশ্বাস, তাওয়াক্কুল আর বিচক্ষণতা। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বারোটি বছর সন্তানকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। শিক্ষা দিয়েছেন জালেম রাজার বিরুদ্ধে আর মাজলুমের পক্ষে অটল হয়ে দাঁড়ানোর তেজোদীপ্ততা।

​আমরা থমকে দাঁড়াই ইতিহাসের এই বাঁকে এসে, যখন অভিভূত হয়ে দেখি, একজন নারী লড়ে যেতে পারেন গোটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে—সত্য ও ন্যায়ের জন্য। আর পবিত্র কুরআনে এই মহান নারীকে মনোনীত করেছে সকল নারীর জন্য আদর্শ হিসেবে:

​“হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছেন এবং পবিত্র করেছেন; আর বিশ্বজগতের নারীগণের ওপর আপনাকে মনোনীত করেছেন।” (৩:৪২)

​আমরা যদি বর্তমান ও আগামীর সন্ধানে চোখ রাখি ইতিহাসে তাহলে চার্লস সেইফার্টের ভাষায় বলতে হয়, “নিজের ইতিহাস আর সংস্কৃতির জ্ঞান যে জাতির নেই, তারা শিকড়হীন গাছের মতো। সামনে এগোতে হলে আগে পেছনে তাকাতে হয়।”

 

চট্টগ্রামে বিরল ভাইরাসে সিভাসু শিক্ষিকার মৃত্যু

চট্টগ্রামে বিরল মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা ও বমি নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। শুরুতে বিষয়টিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর বা ফ্লু মনে করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার একাধিক স্ট্রোক হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মারা যান।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ সাধারণত কিউলেক্স প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ড. জুথির ক্ষেত্রেও ভাইরাসজনিত জটিলতায় ব্রেন স্ট্রোক এবং হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭-০৮ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি জাপানের Hiroshima University থেকে পিএইচডি এবং Kyushu University থেকে পোস্টডক সম্পন্ন করেন। সম্প্রতি তিনি সিভাসুতে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

তার স্বামী অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার হাসেম অর্নব বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের পাঁচ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।

 

বিয়ে ও প্রি-ম্যারিটাল এগ্রিমেন্ট : প্রচলিত ভুল ধারণার পুনর্বিবেচনা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

একটি কথা প্রচলিত আছে, “এগ্রিমেন্ট করে সংসার হয়না” কথাটা আসলে কতটুকু যৌক্তিক? শুনতে ঠিক লাগলেও বাস্তবতা হল, মুসলিম ম্যারেজ-এ এই কথাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। In Islam, marriage itself is an agreement, ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বিয়ে কোনো অতীন্দ্রিয় বা স্যাক্রামেন্টাল ইউনিয়ন নয় (যেমনটি হিন্দু ধর্মে মনে করা হয়), বরং এটি একটি দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract)। বিয়ের মূল দলিলই হলো একটি চুক্তিপত্র, আমরা যেটাকে কাবিননামা/নিকাহনামা বলে জানি। এখানে উভয় পক্ষ শর্তারোপ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় থেকেই নারীরা বিয়ের সময় যে কোন বৈধ শর্ত দেওয়ার অধিকার রাখতেন। আব্বাসীয় আমলে (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) অনেক ‘প্রাক-বিবাহ চুক্তি’/Prenup Agreement এর প্রমাণ পাওয়া গেছে যেখানে নারীরা শর্ত দিতেন যে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না বা স্ত্রীকে শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে পারবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি….

প্রশ্ন আসতে পারে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে এবং বিভিন্ন ইসলামী খেলাফতের আন্ডারে নারীরা বিয়ের ক্ষেত্রে কী কী আইনি ও সামাজিক অধিকার ভোগ করতেন? এটা নিয়ে আসলে বিস্তর স্টাডি আর আলোচনার প্রয়োজন আছে, আমি জাস্ট মেজর কিছু ক্রাইটেরিয়া সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

১. বিয়ের সম্মতির অধিকার
​ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামতকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কোনো নারী যদি কোনো বিয়েতে অসম্মতি জানাতেন, তবে সেই বিয়ে বাতিল করার আইনি অধিকার তার ছিল।রাসূল (সা.) স্পষ্ট করেছিলেন যে, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারীর স্পষ্ট অনুমতি এবং কুমারী মেয়ের মৌন বা স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।খাসা বিনতে খিযাম (রা.)-এর বিয়ে তার বাবা তার অমতে দিয়েছিলেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) সেই বিয়ে বাতিল করে দিয়েছিলেন।

​২. বিয়ের চুক্তিতে শর্তারোপের অধিকার
​ইসলামী আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের সময় স্ত্রী নিজের সুরক্ষার জন্য যেকোনো বৈধ শর্তারোপ করতে পারতেন। এবং তা লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হত। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.) যখন তালাকপ্রাপ্তা হন এবং পরবর্তীতে তার বিয়ের আলোচনা চলছিল, তখন সেখানে শর্ত ও অধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা ছিল।
​আতিকা বিনতে যায়েদ (রা.) সাহাবী উমর (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। বিয়ের আগে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে তাঁকে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া যাবে না। উমর (রা.) এই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন এবং সারা জীবন তা পালন করেছেন। (রেফারেন্স: আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা-২২৯; সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৯০০-এর ব্যাখ্যা)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রপৌত্রী সুকাইনা বিনতে হুসাইন তাঁর বিয়ের চুক্তিতে শর্ত দিয়েছিলেন যে, তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে বা দাসী গ্রহণ করতে পারবেন না এবং স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক সফরে গিয়ে তার স্বামী দাসী গ্রহণ করে বিয়ের শর্ত ভঙ্গ করায় সুকাইনা (রা.) কাজীর দরবারে(কোর্ট অব ল’) গিয়ে খোলা তালাক নিয়ে এসেছিলেন। (রেফারেন্স: কিতাব আল-আঘানি, আবু আল-ফারাজ আল-ইসফাহানি)।

​​৩. অর্থনৈতিক অধিকার ও আর্থিক স্বাধীনতা

  • মোহরানা/দেনমোহর : ​বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছিল নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
    ​তৎকালীন আরবে দেনমোহর বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রচলন ছিল। ইসলাম এসে নিয়ম করে দেয় যে বিয়ের সময় নির্ধারিত ‘মোহর’ কনের ব্যক্তিগত সম্পদ। এটি কনের বাবা বা অন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য নয়। নারী চাইলে এই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারতেন বা নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারতেন।
  • ​ভরণপোষণ : বিয়ের পর স্ত্রীর যাবতীয় খরচ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) বহন করা স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বা আয় থাকলেও তিনি স্বামীর খরচে জীবনযাপনের অধিকার রাখতেন।
  • ​উত্তরাধিকার : বিয়ের পরও নারী তার পিতার সম্পত্তির অংশীদার থাকতেন। স্বামীর মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি থেকেও নির্দিষ্ট অংশ লাভের আইনি গ্যারান্টি ইসলাম দিয়েছিল

​৪. তালাক ও ‘তালাক-ই-তাফওয়ীয’ (কর্তৃত্ব হস্তান্তর)
বিয়ের চুক্তি যদি অকার্যকর হয়ে পড়ত, তবে নারী ‘খোলা’ (Khula) তালাক্বের মাধ্যমে সেই বন্ধন থেকে সম্মানের সাথে বেরিয়ে আসতে পারতেন। ​এক্ষেত্রে নারীরা জাস্ট সংসারে আর আগ্রহী নন এই কারণেও তালাক্ব নিতে পারতেন।
​জামিলা বিনতে উবাই (রা.) রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামীর চারিত্রিক বা ধর্মীয় কোনো ত্রুটি নেই, কিন্তু আমি তাঁকে সহ্য করতে পারছি না (আমি কুফরিতে লিপ্ত হওয়ার ভয় করছি)।” রাসূল (সা.) তাঁকে তাঁর মোহরানার বাগানটি ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছেদ করতে বলেন। এটিই ইসলামের প্রথম ‘খোলা’ তালাক। (রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫২৭৩)।
​হাবিবাহ বিনতে সাহল (রা.) যখন তাঁর স্বামী সাবিত বিন কায়েসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি তাঁকে মেরেছেন, তখন রাসূল (সা.) তাঁদের বিচ্ছেদের (খোলা তালাক) ব্যবস্থা করে দেন। (রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২২৭)।
এছাড়াও বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রী নিজেই নিজেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফওয়ীজ) রাখতেন। (তালাক-ই-তাফওয়ীজ এর অধিকার সর্বপ্রথম পেয়েছিলেন উম্মুল মু’মিনীনগণ, কিন্তু তাঁরা আল্লাহর রাসূল সা. কেই বেছে নিয়েছিলেন। সূরা আহযাব ২৮-২৯ দ্রষ্টব্য)

প্রশ্ন হল, এই যে মুসলিমদের বিয়ে এবং পারিবারিক জীবনের ভিত্তিই ছিল এই এগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক চুক্তি, এইটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা “এগ্রিমেন্ট দিয়ে সংসার হয়না”-তে কীভাবে চলে আসলাম?! নট জাস্ট চলে এসেছি, যারা একটা অফিশিয়াল এগ্রিমেন্ট এর মাধ্যমে নিজের প্রাইভেসি এবং সেইফটির অধিকার সংরক্ষণ করতে চাচ্ছি তাদের ওপরেও বিষয়টাকে চাপিয়ে দিচ্ছি! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময় এবং ইসলামের সোনালী যুগে বিয়ে যে একটি ‘সিভিল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক ও আইনি চুক্তি ছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ইসলামে বিয়ের কাবিননামা মূলত একটি আইনি সুরক্ষা কবচ, যেখানে মোহরানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার পূর্ণ অধিকার নারীর ছিল। মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় এই চুক্তিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত হয়ে “কাগজ দিয়ে সংসার হয় না” বা “এগ্রিমেন্ট দিয়ে ভালোবাসা হয় না” জাতীয় আবেগী ও অবাস্তব মনোভাব প্রবেশের পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে –

১. ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মের প্রভাব এবং পারস্য আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে বিয়েকে একটি পারস্পরিক চুক্তির পরিবর্তে একটি ‘পবিত্র বন্ধন’ হিসেবে দেখা শুরু হয়, ফলে চুক্তির আইনি দিকগুলো অনেকের কাছে “ব্যবসায়িক লেনদেন” বা “অবিশ্বাস” হিসেবে গণ্য হতে থাকে। এই অতি-আবেগীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিয়ের বাস্তবসম্মত আইনি সুরক্ষাগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখানে নারীর ত্যাগকেই প্রধান গুণ হিসেবে ধরা হয়। মোগল আমলে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে হিন্দু আইন ও স্থানীয় প্রথাগত আইনের প্রভাবে বিয়ের “চুক্তি” (Contract) চরিত্রটি হারিয়ে “ধর্মীয় ত্যাগ” (Sacrament) এর রূপ নেয়, যেখানে মনে করা হতো স্ত্রী কোনো শর্ত দিলে তা তাঁর সতীত্বের বা পতিভক্তির পরিপন্থী, অথচ স্বামীর মনিব নয় পার্টনার হওয়ার কথা ছিল। এছাড়াও ব্রিটিশ আমলের ভিক্টোরিয়ান ঘরানার রক্ষণশীল চিন্তা আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ে, যেখানে মনে করা হতো বিয়ের চুক্তি মানেই হলো আবেগের মৃত্যু।

​২. পারিবারিক কাঠামো যখন অধিকতর পুরুষতান্ত্রিক (নট পিতৃতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক) হয়ে ওঠে, তখন নারীর দরকষাকষির ক্ষমতা বা চুক্তিতে শর্ত দেওয়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা হয়। “সংসার মানেই ছাড় দেওয়া” এই তত্ত্বের আড়ালে মূলত নারীর আইনি অধিকার ও নিরাপত্তার জায়গাটি সংকুচিত করা হয়েছে। বিয়ের চুক্তিতে শক্ত শর্তারোপকে তখন “অবাধ্যতা” বা “সংসার শুরুর আগেই ভাঙনের সুর” হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়।

৩. ইসলামী শরীয়াহর জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে কমে যাওয়ার ফলে বিয়ের চুক্তিতে (নিকাহনামা) কনের ইচ্ছানুযায়ী শর্ত রাখার বিষয়টি অনেকের কাছে অজানা থেকে গেছে। ধর্মীয় অনেক বিধিবিধানের চেয়ে সামাজিক রীতিনীতি বা ‘প্রথা’ যখন শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন আইনের চেয়ে লোকলজ্জা বা বংশীয় ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে চুক্তির বিষয়টিকে অবজ্ঞা করা হয়।

৪. ভারতবর্ষের মতো অঞ্চলগুলোতে মুসলিম পারিবারিক আইনে উপনিবেশিক প্রভাবের ফলে বিয়ের আইনি দিকগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের জটিলতায় পড়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে রেজিস্ট্রি বা চুক্তি কেবল একটি সরকারি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, যা জীবনের প্রকৃত সুখ-শান্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে মানুষ মনে করতে শুরু করে।

৫. আস্থার অভাবকে পুঁজি করা। ​”এগ্রিমেন্ট দিয়ে কি ভালোবাসা হয়?”—এই যুক্তিটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো পক্ষ (সাধারণত কনে পক্ষ) নিজের অধিকারের সুরক্ষা চায়, তখন অন্য পক্ষ এটিকে “আস্থার অভাব” বা “অবিশ্বাসের সম্পর্ক” বলে চালিয়ে দেয়। ফলে সামাজিকভাবে মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে কুণ্ঠাবোধ করে।

রাসূল সাঃ এর সময়ে নারী সাহাবীরা কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং নিজেদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করেই সংসার করতেন। তবে একটি সফল সংসারের জন্য আইনি শর্ত এবং পারস্পরিক এহসান—দুটিরই প্রয়োজন। তখনকার দিনে লিখিত এগ্রিমেন্ট থাকার পরেও আমাদের সম্মানিত সাহাবীয়্যাতের স্বামীদের অসম্মানিত বোধ হয়নি, স্ত্রীর প্রতি এহসান, আবেগ-অনুভূতির ব্যাত্যয় ঘটেনি, কারণ তারা কেউ ভাবতেন না যে এগ্রিমেন্ট দিয়ে সংসার হয়না, তারা এটাকে তাদের স্ত্রীদের অধিকার বলেই স্বীকার করতেন। কিন্তু এই প্র‍্যাক্টিস এখনকার সমাজে ইমপ্লিমেন্ট করতে গেলে দেখা যাবে উঠতে বসতে নারী সাহাবীদের মত হতে বলা পুরুষরাই বেজার হয়ে বসে আছেন! সমস্যা আসলে এগ্রিমেন্ট-এ না, সমস্যা তাদের মানসিকতায় যারা আইন ও অধিকারকে ‘অসম্মান’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। রাসূলের যুগে মেয়েরা এই করত না সেই করত না এটা ধপ করে বলে ফেলা যায়, কিন্তু বলার আগে একটু আন্দাজ করা কি উচিত না যে আসলে আসলে রাসূলের যূগ সম্পর্কে কতটুকু জানি!

 

কেরালায় মুসলিম লীগের প্রথম নারী বিধায়ক, রাজনীতিতে বদলের ইঙ্গিত

২০২৬ সালের কেরালার বিধানসভা নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন তরুণ মুসলিম আইনজীবী ফাতিমা তাহিলিয়া।
বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পেরামব্রা আসনে জয়ী হয়ে তিনি ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) প্রথম নারী বিধায়ক হিসেবে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই জয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং দলীয় ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনে তাহিলিয়া সিপিআই(এম)-এর জ্যেষ্ঠ নেতা ও এলডিএফ কনভেনর টি.পি. রামকৃষ্ণনকে পরাজিত করেন।
তিনি মোট ৮১ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে প্রায় ৫ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২১ সালের নির্বাচনে একই আসনে রামকৃষ্ণন ২২ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ফলে এবারের ফলাফল বাম জোটের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল মালাবার অঞ্চলে ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি মুসলিম তরুণীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নতুন আশা জাগিয়েছে। আইইউএমএল অতীতে খুব কম নারী প্রার্থী দিয়েছে, এবং ২০২৬ সালের আগে মনোনয়ন পাওয়া দুই নারী প্রার্থীই নির্বাচনে পরাজিত হন। সেই প্রেক্ষাপটে তাহিলিয়ার জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

ছাত্ররাজনীতি থেকেই তাহিলিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। তিনি মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এমএসএফ) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং এর নারী শাখা ‘হারিতা’র প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১২ সাল থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত এই তরুণী পরবর্তীতে কোঝিকোড সিটি করপোরেশনের কুট্টিচিরা ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এবং বর্তমানে মুসলিম ইয়ুথ লীগের রাজ্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষাজীবনে তাহিলিয়া কোঝিকোড সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতক এবং ত্রিশূরের সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কোঝিকোড জেলা আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতেও সক্রিয়।

নির্বাচনী প্রচারণায় তাহিলিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন। প্রবীণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদের জীবিকা ও কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরার মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জন করেন।

তবে এই পথ মোটেই সহজ ছিল না। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই তাহিলিয়া সাইবার হামলা ও অনলাইন হয়রানির শিকার হন।
বিশেষ করে হিজাব পরিহিত মুসলিম নারী হিসেবে তার সক্ষমতা নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। তবুও তিনি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যান।

তাহিলিয়ার এই জয় কেরালার রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
বামদের শক্ত ঘাঁটিতে এই ফলাফল ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং নারী নেতৃত্বের পথকে আরও উন্মুক্ত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

মে দিবসে উপেক্ষিত নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার

আজ পহেলা মে, ​বিশ্বজুড়ে মে মাসের প্রথম দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সংগ্রাম আর সংহতির প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে এবং আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার সুফল আজও পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারেননি নারী শ্রমিকরা।
একদিকে যখন উৎসবের আমেজে মে দিবস পালিত হয়, অন্যদিকে দেশের বিশাল শ্রমশক্তির একটা অংশ -নারী শ্রমশক্তি দিন পার করেন চরম মজুরি বৈষম্য আর অদৃশ্য শ্রমের নিগড়ে বন্দি থেকে।
বিশেষ করে দেশের কৃষি, শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও নারীদের ন্যায্য অধিকার যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

​সৃষ্টির আদি পেশা কৃষির সঙ্গেই নারীর সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের কৃষিখাতে যে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি এই নারীরা।
পরিসংখ্যান বলছে, সার্বিক কৃষির ২১টি কাজের মধ্যে অন্তত ১৭টি কাজই নারীরা করে থাকেন।
বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা তৈরি, ধান মাড়াই, সেদ্ধ করা বা রোদে শুকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তাদের হাতেই সম্পন্ন হয়।
অথচ, এই খাতে ভূমিকা রাখা নারী শ্রমিকদের শ্রম অনেকটাই অদৃশ্য।
নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অভাব, স্বল্প মজুরি আর নানা বঞ্চনায় তারা আজো কোণঠাসা।
কৃষি শ্রমশক্তির সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ কোটির বেশি নারী শ্রমিকের মধ্যে অন্তত ৫৮ শতাংশই মজুরি বৈষম্যের নির্মম শিকার।

​গাইবান্ধার সায়মা আক্তার যেন এই লাখো বঞ্চিত নারীরই প্রতিচ্ছবি। মাঠে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভুট্টা তোলা, পাট বা পুঁই শাক তোলার মতো কাজ করলেও দিনশেষে তার হাতে ওঠে মাত্র ৫০০ টাকা এবং একবেলা খাবার। অথচ একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা পাচ্ছেন তিন বেলা খাবারসহ বেশি মজুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যও এই বৈষম্যের সত্যতা প্রমাণ করে। কৃষিখাতে দৈনিক একবেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে সর্বোচ্চ ৫৭৭ টাকা পান, সেখানে নারীদের জোটে মাত্র ৪১৬ টাকা। খাবার ছাড়া পুরুষের ৬২১ টাকার বিপরীতে নারী পান ৪৬১ টাকা।
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ফসলের ন্যায্য হিস্যা বা সমান মজুরি না পাওয়াটা যেন তাদের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

​কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ হলো কৃষক হিসেবে নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না থাকা। কৃষিবিদ ড. কাশফিয়া আহমেদের মতে, দেশে কত শতাংশ নারী কৃষক আছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য হালনাগাদ নেই। ২ কোটি ২৫ লাখ কৃষকের মধ্যে নারীদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তাদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ বা বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল মনে করেন, নারীবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির অভাব এই বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। প্রযুক্তিগুলোকে নারীবান্ধব করে গড়ে তোলার পাশাপাশি নারী কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

​শুধু কৃষিখাতেই নয়, ইটভাটা, চাতাল, নির্মাণশ্রম, পাথর ভাঙা কিংবা পোশাক শিল্পের মতো ভারী ও প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব জায়গাতেই নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু অভাবের তাড়নায় কাজ করতে আসা এই নারীদের মজুরির বেলায় ঠকানো হচ্ছে অবলীলায়। পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা রোজগার করেন, সেখানে নারীদের দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির যুগে সামান্য এই টাকায় সংসার চালানো তাদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
অধিকার বা মজুরি বৃদ্ধির কথা বললে অনেক সময় কাজ হারানোর হুমকিতেও পড়তে হয় তাদের।

​মজুরি বৈষম্যের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য আরেকটি বড় আতঙ্কের নাম যৌন হয়রানি।
‘সজাগ কোয়ালিশন’-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কারখানার প্রায় ২২ শতাংশ নারী শ্রমিক নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। কারখানায় প্রবেশের সময় অস্বস্তিকর দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, কিংবা মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা অনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চাপের মতো বিষয়গুলো নিত্যদিনের ঘটনা। অথচ এসব অভিযোগ বেশিরভাগ সময়ই আমলে নেওয়া হয় না। এর বাইরে বিদেশে, বিশেষ করে সৌদি আরবে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের খবর প্রতিনিয়তই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। গত তিন দশকে নারী শ্রমিকদের ৪০ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব, যেখানে তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ আজও দৃশ্যমান নয়।

​বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় আয়ে নারীদের অবদান প্রায় ৩০ ভাগ,বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪বছর বয়সী বিশ্বের মোট নারীর ৪৫ ভাগই অর্থনৈতিক ভাবে স্বক্রিয়।
অন্যদিকে দেশে রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পোশাকশিল্পের ৮০ ভাগই নারী শ্রমিকদের দখলে।
তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। 
তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ক্রমশ কমছে,এ থেকে বুঝা যায় শ্রমমর্যাদায় নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান কতটা পিছিয়ে।

৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি নিয়ে মে দিবস এলেও নারীদের অদৃশ্য ও গৃহস্থালি শ্রমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, নেই কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের সুযোগ। সমতার ভিত্তিতে মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মে দিবসের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব। তা না হলে উৎসবের এই দিনটি নারী শ্রমিকদের কাছে কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি পাতা হয়েই রয়ে যাবে।

 

চসিক পদকপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের সুরের জাদুকর বুলবুল আখতার

​কর্ণফুলীর ঢেউ আর পাহাড়ের সবুজে ঘেরা চট্টগ্রামের বাতাসে কান পাতলেই যেন এক সুমধুর কণ্ঠের মায়াজাল শোনা যায়। দীর্ঘ ৫৬টি বছর ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর মাটির ঘ্রাণ যিনি পরম মমতায় নিজের কণ্ঠে তুলে এনেছেন, তিনি আমাদের সকলের প্রিয় শিল্পী বুলবুল আখতার।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ‘সম্রাজ্ঞী’ খ্যাত এই জীবন্ত কিংবদন্তি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি যেন এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির এক চলমান আর্কাইভ।
সুরের প্রতি তাঁর এই আজন্ম নিবেদনের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তিনি ভূষিত হয়েছেন ‘চসিক স্বাধীনতা সম্মাননা পদক-২০২৬’-এ, যা তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে যুক্ত করেছে এক নতুন পালক।

​কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া এই সুরকন্যার রক্তেই যেন মিশে ছিল সাগরের গর্জন আর সুরের মূর্ছনা।
শৈশব থেকেই চট্টগ্রামের নিজস্ব ভাষার গানগুলোকে তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন পরম আদরে।
সেই যে শুরু, এরপর গত সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মাইজভাণ্ডারী, মরমী এবং আঞ্চালিক গানের সুরে সুরে তিনি মাতিয়ে রেখেছেন দেশ-বিদেশের লাখো শ্রোতাকে।
বয়সের গণ্ডি ষাট পেরোলেও, স্টেজে উঠলে তাঁর কণ্ঠের সেই আদি অকৃত্রিম মাধুর্য আর গানের প্রতি উন্মাদনা আজো এতটুকু ম্লান হতে দেখা যায় না।

​১৯৭৮ সালে খ্যাতিমান রশিদ কাওয়ালের সঙ্গে জীবনের গাঁটছড়া বাঁধলেও, বুলবুল আখতারের সংগীত সাধনায় কখনো ছেদ পড়েনি। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া “অ হালা চাঁন গলার মালা”, “যাতন যারে ভালা লাগে”, “ফুলের হরা” কিংবা “বাঁকখালীর মাঝি ও ভাই সোনাদিয়া বাসা”-র মতো কালজয়ী গানগুলো শুনলে আজও শ্রোতারা ফিরে যান সোনালি অতীতে। আশির দশকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ‘আহমদ কবির আজাদ–বুলবুল আখতার’ জুটির জনপ্রিয়তা ছিল আক্ষরিক অর্থেই আকাশচুম্বী, যা তখনকার বিখ্যাত ‘শ্যাম–শেফালী’ জুটির সঙ্গেই কেবল তুলনীয়।
দীর্ঘ এই অবিশ্রান্ত ক্যারিয়ারে তাঁর রেকর্ডকৃত অডিও ক্যাসেটের সংখ্যা প্রায় ৯৮টি, যা যেকোনো লোকশিল্পীর জন্যই এক অসামান্য মাইলফলক।

​এত খ্যাতি আর অর্জনের পরও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা একেবারেই নিখাদ।
সম্প্রতি চসিক আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননা গ্রহণের সময় তাঁর সহজ-সরল স্বীকারোক্তিই বলে দেয় শেকড়ের প্রতি তাঁর তীব্র টান “পুরস্কারের আশায় নয়, চট্টগ্রামের মানুষের ভালোবাসাই আমার গান গাওয়ার মূল অনুপ্রেরণা।”

ডিজিটাল এই যুগেও বুলবুল আখতারের কণ্ঠে যখন আঞ্চলিক গানের সুর বেজে ওঠে, তখন চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেন প্রাণ ফিরে পায়। আধুনিকতার ডামাডোলে চট্টগ্রামের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে সযত্নে আগলে রাখা এই সুরকন্যা আমাদের লোকজ ভাণ্ডারের এক অমূল্য রত্ন।

 

বাংলাদেশের ঐতিহ্যও সংস্কৃতি

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই সোনার বাংলা সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলায় শ্যামলিমা, এর নান্দনিক রূপ বিশ্বের অনেক বড় বড় ঐতিহাসিক এবং মনীষীদের দৃষ্টি কেড়েছিল!
ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে হেন কোন পর্যটক নেই যে – এই বাংলার রূপবৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়নি !

খোলাফায়ে রাশেদার যুগে অনেক মুসলিম ধর্ম প্রচারক ইসলাম প্রচার করতে এসে এই দেশেই বসতি স্থাপন করে এদেশেই বসবাস করে গেছেন আমৃত্যু !
মোঘল আমলে বাদশা আকবর এই বাংলার সন তারিখের প্রবর্তন করেন,[ আরবি মাসের তারিখের সাথে মিল রেখে!
যাই হোক – আমাদের কৃষক সমাজের কাছে এই “বাংলা সন” খুবই সমাদৃত হয় !
তারা বাংলা মাসের পরিপূর্ণ ব্যবহার করতেন তাদের ফসলাদি রোপণ বপন এবং ঘরে তোলার ব্যাপারে!
আমাদের শৈশবে অর্থাৎ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে আমরা গ্রাম বাংলায় বৈশাখের তান্ডবের শুরুতেই বছরের শুরু অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ এবং চৈত্রের শেষ দিনকে বলা হয় “চৈত্র সংক্রান্তি ” ; দিনটি ছিল – কৃষকদের , ব্যবসায়ীদের হালখাতার নবায়ন করার দিন ! চৈত্র সংক্রান্তির রাত থেকেই দেখা যেত তার তোড়জোড় !
সে রাতেই ব্যবসায়ীরা দোকানপাটে তাদের লাল রঙের মলাটের একটা লম্বা হালখাতা( হিসাবের খাতা) তারা নতুন করে আবার সংযোজন করতেন সারা বছরের জন্য! পুরনো হালখাতার হিসাবের পাট চুকিয়ে অর্থাৎ বন্ধ করে নতুন হালখাতায় তারা বছরের শুরুতে হিসাব রাখা শুরু করতেন পহেলা বৈশাখ থেকেই ! সেই সময় দেখেছি অনেক দোকানে একটু বাতাসা খাওয়ায়ে মিষ্টিমুখ করতেন, আর কেউ আবার একটু মিষ্টি পান সুপারি খাওয়ায়ে তাদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতেন, পারস্পরিক হাসি ঠাট্টার ভিতর দিয়ে!
গ্রামে খালা, মামী, দাদি চাচিদের দেখেছি- তারা বিভিন্ন রকমের শাক সংগ্রহ করতেন ক্ষেত থেকে , বাড়ির আঙ্গিনার আশ পাশ থেকে ! চৈত্র সংক্রান্তিতে । তারা এই শাক সংগ্রহ করে নানান উপাদান দিয়ে অনেক মুখরোচক করে রান্না করতেন এবং সেটা ‘বউ-ক্ষুদা’ বা নতুন বোরো ধানের মিষ্টি চালের ভাত দিয়ে খুব মজা করে খেতেন। কেউ আবার কিছু পিঠা তৈরি করে খাওয়াতেন, খেতেন!
বৎসরের শুরুর যে একটা সুন্দর আমেজ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ।
কারণ – সব কৃষক পরিবারগুলো স্বাভাবিকভাবেই নিম্ন মধ্যবিত্ত অস্বচ্ছল পরিবারই ছিল তারা ! কেউ এমন ছিল না যে , চাইলেই ইলিশ মাছ কিনতে পারতেন । পান্তা ইলিশের কোন প্রচলনই সে সময় ছিল না !
খুব বেশি যে স্বচ্ছল পরিবারের ছিল না তারা। ” নুন আনতে পান্তা ফুরায় ” মতো যাদের অবস্থা – তারা সখ করেও পান্তা ইলিশ খেতে পারতেন না ! এটা বিশ শতকের বানানো সংস্কৃতি ।

মোটামুটি সাংস্কৃতিক রূপ মানুষের ছিল, সেটা আমরা দেখতে পেয়েছি ।
সেই সময় গ্রামে বটতলায় বা হাটের জায়গায় মেলা হতো এটা – অনেক পুরনো ঐতিহ্য!
আমরা ও ছোট্ট বেলায় – আব্বা , মামা ভাইদের হাত ধরে মেলায় গিয়েছি ।
শহর থেকে গ্রামে মামার বাড়ি বেড়াতে যেতাম মেলা দেখার জন্য।
” মামার বাড়ির আবদার ” প্রবাদ বাক্যটি
আমাদের জন্য ছিল আক্ষরিক অর্থে এবং বাস্তবতায় সত্য !
মামা তো আমাদের আবদার রক্ষার্থে সকাল থেকেই আয়োজনের লেগে থাকতেন । সেটা দেখে আম্মা আবার একটু আপত্তি করতেন যে – “এরা শহর থেকে আসছে, বুঝবে না কিছু , কখন কোথায় হারিয়ে যাবে , ভাইজান তুমি সামলাতে পারবে না !”
মামা জোড়ালোভাবে আম্মার কথা নাকচ করে দিয়ে বলতেন – ” তুই চিন্তা করিছ না, আমি লোকজন জোগাড় করছি না ! ওদেরকে সবাই দেইখ্যা রাখব ! “
আল্লাহ্ ভরসা!
হ্যাঁ , মামা – বড় একটা বস্তা , দু তিনটা মুড়ির টিন , একজন মজুরের মাথায় দুটা বাঁশের তৈরি (পাতি) ঝাঁকা ইত্যাদি সরঞ্জাম নিয়ে ছাতা নিয়ে ভাগ্নে ,ভাগনীদের হাতে ধরে গ্রামের আইল ধরে হাঁটা শুরু করতেন ।
আমরাও অনভ্যস্ত পায়ে আইল ধরে হাঁটতে গিয়ে কতবার যে পাশের ক্ষেতে পড়ে যেতাম ! আমাদের পড়ে যাওয়া দেখে গ্রামের ভাই বোনেরা তো হেসেই কুটি কুটি হতো !

যাহোক- মেলার কিছুটা দূর থেকেই শুনতে পেতাম মেলার হৈ চৈ আর শোরগোলের গমগম আওয়াজ-
[ ] অনেক দূর থেকেই শোনা যেত ক্যাঁচ ক্যাঁচ, ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ আওয়াজ ! অর্থাৎ সেটা ছিল “চরক গাছ ” এর আওয়াজ! “চরক গাছ “গ্রাম দেশের ভাষা এটা! অর্থাৎ চরকি – গ্রাম্য “চরকি-দোলা” !
[ ] তখন তো কোন মোটর বা মেশিন ছিল না! তাই হাত দিয়ে সেটাকে চালিয়ে দেয়া হতো! অর্থাৎ টেনে টেনে একটার পর একটা ঘুরাতে হতো।
[ ] এরপর শোনা যেত ভেপু বা বাঁশের বাঁশির আওয়াজ ! মেলায় আসতো প্রচুর বাঁশের কারুকার্য খচিত জিনিসপত্র!
[ ] সবাই বাঁশি কিনে বাঁশিতে ফু দিয়ে বাজাতে শুরু করতো!
মেলার কোন এক কোণে দেখা যেত যে গানের আসর বসেছে! ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, একতারা দোতারা এই সমস্ত বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তারা জারি ,সারি গান গাইতো!
হ্যাঁ মেলায় বিক্রি হতো নানান ধরনের খাবারের জিনিস – মুড়ি মুড়কী , মুড়ালি , কদমা, চিনির তৈরি হাতি ঘোড়া, বাঘ ভাল্লুক ,নানান ধরনের ছোট্ট ছোট্ট জিনিস তৈরি করত চিনি দিয়ে! সেগুলো খেতে হতো বিন্নি ধানের খই দিয়ে ! বিন্নি ধানের খই ওখানে কিনতে পাওয়া যায় এখান থেকেই কিনে নিতাম আমরা শহরের জন্য।
এজন্যই মামা বস্তা নিতেন সাথে। মুড়ির টিন ভর্তি করে – বিন্নী ধানের খই , মুড়কি, মুড়ালী, বাতাসা ইত্যাদি কিনে টিন ভর্তি করে নিতেন ।
এরপর আমাদের সখ ছিল মাটির পুতুলের । বিভিন্ন রকমের রঙিন নানান ধরনের খেলনা , বাঁশি ! তারপরে কাগজের তৈরি পাখা, তালপাতার নানা রংয়ের পাখা ইত্যাদি নানা ধরনের জিনিস!
‘মামা বাড়ির আবদার’ কাকে বলে! মামা অতি উৎসাহের সাথে সবই কিনে দিতে থাকতেন ! বড় হয়ে বুঝেছিলাম সেটাই হলো ” ” মামার বাড়ির আবদার !”
যাহোক – সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে, কারণ তখন তো আর গ্রামের লাইট ছিল না বা কোন রকমের লাইটের ব্যবস্থাও ছিল না যার জন্য অন্ধকার নামার আগেই আমরা বাড়ি ফিরে আসতাম হেঁটে ! কারণ তেমন কোন বাহন ছিল না গ্রামে।

সারা বাংলাদেশ জুড়েই গ্রামে এই ধরনের মেলা হতো ! কোন জায়গায় দুদিন কোন জায়গায় ৩ দিন কোন জায়গায় সপ্তাহব্যাপী চলতো এই মেলা ! এগুলো আমরা আরো অন্যান্য জায়গায় ও দেখেছি । যেখানে আমরা থাকতাম মফস্বল শহরে, তার আশে পাশে গ্রামে হতো এই বৈশাখী মেলা মেলা! ( (ভৈরববাজারের কমলাপুর গ্রামে এই মেলায় গিয়েছি) !
ঢাকা শহরে ও এই বৈশাখী মেলার কথা শুনেছি- চকবাজার, নবাবগঞ্জ, লালবাগ হোসনী দালান ইত্যাদি জায়গাতে!

রামপুরায় তখনো টি ভি সেন্টার শুরু হয়নি, তার সামনের বড় রাস্তাটি তখন মাটির রাস্তা ছিল । সে সময়টাতে রামপুরা ব্রিজ যেখানে আছে, সেটা ছিল ‘বালু নদী’র উপরে ! নদীটা একটু বড় ছিল , বনশ্রী নগরী তৈরি করতে গিয়ে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নদীটাকে ছোট করে ফেলা হয়! এখন যা আছে তার চাইতে আরো বেশ কিছুটা বড় ছিল নদীটি! সেই সময় নদীর পাড়ে ব্রিজের আশেপাশেই এই বৈশাখী মেলা হতো ! “রমনা বাগান ” বা
পার্কেও এই মেলা বসতো !
এই ছিল “পহেলা বৈশাখে”র “বৈশাখী মেলার” ইতিকথা। এছাড়া অনেকেই হয়তো আরো অনেক রকমের জানেন সেটাও যদি পারেন শেয়ার করবেন!
তবে –
আমাদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিতে
“মঙ্গল শোভাযাত্রা ” বলে আমরা আমাদের জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত কিছুই দেখিনি। এগুলো কোন কুচক্রী মহলের বানানো সংস্কৃতি!
আসল কথা – তখন কোন শোভাযাত্রা তো দূরের কথা, শোভাযাত্রা বলে কোন মিছিল বা কোন পদযাত্রাই ছিল না!

*যেটা ছিল ,সেটা হলো – “হালখাতা “।

এই ব্যবসায়ীরা তাদের “হালখাতা” নিয়েই ব্যস্ত থাকতো ! সেই লাল কাপড়ে মলাটে মোড়ানো – সেই হালখাতা এখনো আছে ! এখনো তারা এটাকে ব্যবহার করছেন , বাঙালিদের
এটা একটা ঐতিহ্যগত দিক !

কিন্তু এছাড়া – এই পান্তা- ইলিশ খাওয়া, লাল রঙের শাড়ি পরা বা লাল টিপ পরার রীতিনীতি বলত তো কিছুই ছিল না বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে!

আগেই বলেছি – বাঙালি মুসলমানদের বিশেষ করে কৃষক সমাজে – আসলেই তারা খুব একটা স্বচ্ছল পরিবার ছিল না! যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি নিয়ে খুব মাতামাতি করবে বা কিছুটা অতিরিক্ত খরচের যে বোঝা সে বোঝা বহন করবে !

আমরা এখন থেকে সতর্কতার সাথে – ঐ সব ধার করা সংস্কৃতি বাদ দিয়ে চলবো। চৌর্য্যবৃত্তির কায়দায় অন্য দেশের , অন্য ধর্মের কোন সংস্কৃতিকে আর ধারণ করব না! আসুন, আমাদের পূর্ব পুরুষদের সংস্কৃতির লালন করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই।
আসুন – আমরাও আমাদের প্রিয় জন্মভূমি , প্রিয় মাতৃভূমির ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করি , লালন করি। বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দেই আমাদের ঐতিহ্যকে এবং ইতিহাসকে , জানানোর জন্য।

 

সন্তানকে গুড টাচ ব্যাড টাচ শেখানোর সঠিক বয়স

শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা এখন একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু অনেক অভিভাবক এখনও দ্বিধায় থাকেন—শিশুকে কি খুব ছোট বয়সেই শরীর সম্পর্কে শেখানো উচিত? লজ্জা, অস্বস্তি কিংবা ‘এখনো সময় হয়নি’—এই ভাবনা থেকে অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। অথচ বাস্তবতা বলছে, এই শিক্ষা যত আগে শুরু করা যায়, শিশুর জন্য ততই নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর বয়স যখন ২ থেকে ৩ বছর, তখন থেকেই খুব সহজ ভাষায় তার শরীর সম্পর্কে ধারণা দেওয়া উচিত। এই বয়সেই শিশুরা নিজের শরীর চিনতে শেখে এবং কোনটি ভালো লাগে, কোনটি অস্বস্তিকর—সে অনুভূতিগুলো বুঝতে শুরু করে। তাই এটি হলো নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলার প্রাথমিক সময়।

তবে শেখানোর পদ্ধতি অবশ্যই বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হতে হবে। ২–৩ বছর বয়সে শিশুকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সঠিক নাম শেখানো জরুরি। একই সঙ্গে গোপনাঙ্গ সম্পর্কে সহজভাবে বোঝাতে হবে—যে অংশগুলো অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

৪–৫ বছর বয়সে শিশুকে ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য বোঝানো উচিত। তাকে জানাতে হবে—যে স্পর্শে সে স্বস্তি বোধ করে, সেটি ভালো; আর যেটি তাকে অস্বস্তি বা ভয় দেয়, সেটি খারাপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুকে ‘না’ বলার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা।

৬ বছর বা তার বেশি বয়সে শিশুদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো যেতে পারে। যেমন—কেউ যদি কোনো বিষয় গোপন রাখতে বলে, সেটি মানতে হবে না। বরং যেকোনো অস্বাভাবিক ঘটনা বিশ্বস্ত বড়দের জানানো জরুরি। এতে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এবং সে নিজেকে রক্ষা করতে শেখে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই শিক্ষা একদিনে শেষ করার মতো নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে গল্প, উদাহরণ এবং খোলামেলা কথোপকথনের মাধ্যমে শিশুকে সচেতন করে তুলতে হয়। ভয় নয়, বরং নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করাই এখানে মূল লক্ষ্য—যাতে শিশু বুঝতে পারে, তার শরীর তার নিজের এবং সে সবসময় সুরক্ষিত থাকার অধিকার রাখে।

 

বাংলাদেশে কৃষিতে নারীর উত্থান ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের কৃষি খাত বহুদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতের ভেতরে একটি নীরব পরিবর্তন ঘটছে—নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। একসময় কৃষিকে পুরুষনির্ভর পেশা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা থেকে শুরু করে উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ—সব ক্ষেত্রেই নারীরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছেন।

বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কৃষিতে নারীর উপস্থিতি এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং কেন্দ্রীয়। কর্মক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত, যা পুরুষের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এর অর্থ হচ্ছে, কৃষি খাতের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এখন অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। বিশেষ করে ফসল সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিবর্তনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর। কাজের সন্ধানে বা উন্নত জীবনের আশায় অনেক পুরুষ শহরে বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে গ্রামের কৃষিকাজ পরিচালনার দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই নারীদের ওপর এসে পড়ছে। তারা শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবেও ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন। গবাদিপশু পালন, সবজি উৎপাদন এবং স্থানীয় বীজ সংরক্ষণে নারীদের নেতৃত্ব এখন সুস্পষ্ট।

তবে এই অগ্রগতির পেছনে বাস্তবতা পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো জমির মালিকানা। অধিকাংশ নারী কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও তাদের নামে জমির মালিকানা খুবই সীমিত। এর ফলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি পান না এবং ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকেন। বাস্তবতা হচ্ছে—যে কাজ তারা করছেন, সেই কাজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে। জমি বা সম্পত্তি না থাকায় তারা জামানত দিতে পারেন না, ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন ব্যবস্থায়। আধুনিক প্রযুক্তি বা উন্নত বীজ ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় তাদের উৎপাদনশীলতা সীমিত থেকে যায়। ফলে তারা কঠোর পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারেন না—এটা একটা বাস্তব এবং অস্বস্তিকর সত্য।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট। কৃষি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলকভাবে কম সুযোগ পান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রযুক্তি নারীদের কাজ সহজ করছে, বিশেষ করে পশুখাদ্য প্রস্তুত, শস্য সংরক্ষণ এবং শুকানোর ক্ষেত্রে। এই ধরনের প্রযুক্তি সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে নারীদের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বাড়তে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। বর্তমানে অনেক নারী কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমেও যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু এখানে একটা বড় সমস্যা হলো—এই শিক্ষিত জনশক্তিকে মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ, সম্ভাবনা আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো—সমাধান কী?
প্রথমত, জমির মালিকানায় নারীর অধিকার নিশ্চিত না করলে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। এটি শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।
দ্বিতীয়ত, নারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালু করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
তৃতীয়ত, কৃষি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নারীদের নাগালের মধ্যে আনতে হবে—শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে।

সবশেষে, একটা বিষয় পরিষ্কার —নারীর এই অংশগ্রহণকে “সহায়তা” হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। তারা এখন কৃষির প্রধান চালিকাশক্তির একটি অংশ। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
যদি নীতি, প্রযুক্তি এবং অর্থায়ন—এই তিনটি জায়গায় সঠিক সমন্বয় করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষি খাত শুধু টিকে থাকবে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
তাই কৃষিতে নারীর উত্থান কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়—এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা দরকার। এটাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে ক্ষতি বাংলাদেশেরই

 

পহেলা বৈশাখ: সংস্কৃতি নাকি নৈতিক অবক্ষয়ের উৎসব?

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, যা প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে উদযাপিত হয়।ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে।

পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয় এবং একে ঘিরে ব্যাপক উৎসব, শোভাযাত্রা, মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। “বাঙালির প্রাণের উৎসব” হিসেবে এর পরিচিতি থাকলেও, এই উদযাপনের প্রকৃতি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ খুব কমই দেখা যায়।

ইতিহাস ও উৎপত্তি
বাংলা সনের সূচনা ঘটে মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর-এর শাসনামলে। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ৯৯২ হিজরিতে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
এই বাংলা সন মূলত হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জি ও সৌর বছরের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ প্রশাসনিক—কৃষকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব আদায় সহজ করা।

পরবর্তীকালে, বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের সময় পহেলা বৈশাখ নতুন সাংস্কৃতিক তাৎপর্য পায়। ১৯৬৭ সালে ছায়ানট প্রথমবারের মতো রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করে, যা আজকের আধুনিক উদযাপনের অন্যতম ভিত্তি।

এছাড়া, ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট “মঙ্গল শোভাযাত্রা” শুরু করে, যা পরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

অর্থাৎ, আজকের যে জাঁকজমকপূর্ণ পহেলা বৈশাখ, তার বড় অংশই গত কয়েক দশকের নির্মাণ,যা প্রাচীন ঐতিহ্যের সরাসরি ধারাবাহিকতা নয়।

আধুনিক উদযাপন: সামাজিক বাস্তবতা

বর্তমানে পহেলা বৈশাখ শহরকেন্দ্রিক বৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে। শোভাযাত্রা, সংগীতানুষ্ঠান, মেলা, ফ্যাশননির্ভর আয়োজন এবং গণসমাগম এই দিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তবে এখানে বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে এই উৎসবের নামে এমন পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে শালীনতা, ব্যক্তিগত সীমা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা এবং প্রদর্শনমূলক আচরণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে, গ্রামীণ ও পারিবারিক পর্যায়ে এখনও অনেকেই সংযতভাবে দিনটি পালন করেন—যেখানে আত্মীয়তা, ঐতিহ্য এবং সরল আনন্দই প্রধান। এই দ্বৈত বাস্তবতা না বুঝলে পুরো বিশ্লেষণই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

সংস্কৃতি বনাম নৈতিকতা এবং ইসলাম

সংস্কৃতি একটি সমাজের জীবনধারা, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন। তবে সংস্কৃতি কখনোই নৈতিকতার ঊর্ধ্বে নয়। সমাজবিজ্ঞান অনুযায়ী, কোনো সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে তার ওপর।

যদি কোনো সামাজিক চর্চা মানুষের শালীনতা, পারিবারিক বন্ধন বা নৈতিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তা সংস্কৃতির নামে বৈধতা পেলেও সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
সুতরাং, পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ক্ষেত্রেও কোন বিষয়গুলো ঐতিহ্যের অংশ এবং কোনগুলো নতুন সংযোজন—এই পার্থক্য নির্ণয় করা জরুরি।

অপরদিকে ইসলামে উৎসব ও আনন্দের ধারণা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়নি; বরং তা নির্দিষ্ট সীমা ও নীতিমালার মধ্যে আবদ্ধ। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্য কোনো সামাজিক দিন পালন সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য; বরং মূল প্রশ্ন হলো—যেকোনো সামাজিক কার্যক্রমকে বিচার করা হয় তার বিষয়বস্তু ও প্রভাবের ভিত্তিতে।
যদি কোনো অনুষ্ঠানে অশালীনতা, শালীনতার লঙ্ঘন, অনৈতিক আচরণ বা ধর্মীয় সীমা অতিক্রমের প্রবণতা থাকে, তাহলে তা ইসলামসম্মত নয়। কুরআনে অশ্লীলতার কাছেও না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা শুধু কাজ নয়, সেই কাজের দিকে নিয়ে যায় এমন পরিবেশ থেকেও বিরত থাকার কথা বলে।

এছাড়া নারী-পুরুষের সম্পর্ক, পোশাক ও আচরণ সম্পর্কেও ইসলামে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাই পহেলা বৈশাখের মতো কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে এসব নীতিমালা লঙ্ঘিত হলে তা ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও বাঙালিত্বের ভারসাম্য

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যেকোনো উৎসব বা গণআয়োজন মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষে যদি বারবার নিয়ন্ত্রণহীনতা, অতিরঞ্জিত বিনোদন বা শালীনতার সীমা লঙ্ঘনের পরিবেশ তৈরি হয়, তবে তা ধীরে ধীরে সমাজে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এর ফলে নতুন প্রজন্ম সেই আচরণকেই গ্রহণযোগ্য মনে করে এবং সামাজিক মানদণ্ড ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হতে থাকে।
তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, কোনো উৎসব একমাত্রিক নয়; এর মধ্যে যেমন সম্প্রীতি, আনন্দ ও ঐতিহ্যচর্চার মতো ইতিবাচক দিক থাকে, তেমনি কিছু নেতিবাচক প্রবণতাও থাকতে পারে।
দায়িত্বশীল সমাজের কাজ হলো সচেতনভাবে এই দুইয়ের পার্থক্য নির্ণয় করে ইতিবাচক দিকগুলো সংরক্ষণ এবং ক্ষতিকর উপাদানগুলো সংশোধন করা।

অন্যদিকে, বাঙালিত্বের প্রশ্নেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। পহেলা বৈশাখকে অনেক সময় বাঙালি পরিচয়ের অপরিহার্য অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে একটি জাতিগত পরিচয় গড়ে ওঠে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনধারার সমন্বয়ে। কোনো নির্দিষ্ট উৎসব পালন করা বা না করার মাধ্যমে কারো বাঙালিত্ব নির্ধারিত হয় না।
বরং একজন সচেতন ব্যক্তি তার ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে এমন উপাদানগুলো গ্রহণ করতে পারে, যা তার নৈতিক ও বিশ্বাসগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রশাসনিক আর আধুনিক রূপ মূলত গত কয়েক দশকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ।
ফলে এটিকে “চিরন্তন ঐতিহ্য” হিসেবে দেখানো পুরোপুরি সঠিক নয়।

এখন বাস্তব প্রশ্ন হলো, আমরা আসলে কী উদযাপন করছি?
ঐতিহ্য, নাকি তার পরিবর্তিত আর বিকৃত সংস্করণ?

অতএব, প্রয়োজন অন্ধ সমর্থন বা অন্ধ বিরোধিতা না করে, বরং সচেতনভাবে ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা।
কোন দিকগুলো ঐতিহ্যের অংশ, কোনগুলো আধুনিক সংযোজন, এবং কোনগুলো নৈতিকতা এবং ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ—এই পার্থক্য বোঝা জরুরি।

একজন সচেতন মানুষ হিসেবে দায়িত্ব হলো নিজের মূল্যবোধ, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
কারণ একটি দিনের উদযাপন সাময়িক হলেও, তার প্রভাব ব্যক্তিজীবন ও সমাজে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

 

গাজার অকুতোভয় শিশু সাংবাদিক সুমাইয়া উইশাহ

​যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা। চারদিকে কেবল ধ্বংসস্তূপ আর বোমার শব্দ। এর মাঝেই ভারী ‘PRESS’ লেখা নীল ভেস্ট আর হেলমেট পরে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট মেয়ে। সে অন্য শিশুদের মতো কোনো খেলায় মেতে নেই; বরং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে যুদ্ধের এক ভয়ংকর বাস্তবতাকে।
​তার নাম সুমাইয়া উইশাহ। বয়স মাত্র ১১ বছর। গাজার ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাটই এখন তার কাজের জায়গা। শুরুতে তার বাবা, মুহাম্মদ উইশাহ এবং তার মা তাকে এই চরম বিপদে পা বাড়াতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ সাংবাদিকদের জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে তারা পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
কিন্তু সুমাইয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সত্য জানানোর জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় তাদের।

​গাজা যুদ্ধে তার ভূমিকা

যুদ্ধের ভয়াবহতায় যখন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরাও হিমশিম খাচ্ছেন, তখন সুমাইয়া হাতে তুলে নিয়েছে মাইক্রোফোন। সে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে, কিংবা খাবার ও ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরছে। আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তার এই সাহসী উপস্থিতির খবর প্রচারিত হয়েছে।

অনুপ্রেরণা

এত ছোট বয়সে সাংবাদিকতায় আসার পেছনে সুমাইয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলেন শিরিন আবু আকলেহ।
শিরিন আবু আকলেহ আল-জাজিরার একজন প্রখ্যাত ও সাহসী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ছিলেন, যিনি ২০২২ সালে জেনিনে সংবাদ সংগ্রহের সময় নিহত হন। শিরিনের সাহস আর সত্য প্রকাশের নির্ভীকতা সুমাইয়াকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
সে চায় শিরিনের মতোই গাজার প্রকৃত অবস্থা ও শিশুদের কষ্ট সারা বিশ্বকে জানাতে।

​প্রভাব ও বৈশ্বিক মনোযোগ

সুমাইয়ার এই অকুতোভয় সাংবাদিকতা খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ববাসীর মনে এক গভীর মানবিক ছাপ ফেলেছে।
তার ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
তার পাশাপাশি আরও দেখা যায় গাজার সবচেয়ে কনিষ্ঠ সাংবাদিক ৯ বছর বয়সী লামা আবু জামুস নামের আরেক শিশুও কাজ করছে।

​ঝুঁকি ও বাস্তবতা

কিন্তু এই অসামান্য উপাখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মর্মান্তিক কঠিন বাস্তবতা।
একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে একজন ১১ বছরের শিশুর সংবাদ সংগ্রহ করা কতটা বিপজ্জনক, তা সহজেই অনুমেয়।
তার এই কঠিন যাত্রায় গতকাল যুক্ত হয়েছে এক চরম আঘাত – জানা গেছে, একটি ড্রোন হামলায় সুমাইয়ার বাবা মুহাম্মদ উইশাহ নিহত হয়েছে।
চোখের সামনে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নিজের বাবাকে হারানোর এই তীব্র শোক সুমাইয়ার জন্য এক অকল্পনীয় মানসিক ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
শিশুরা যেখানে স্কুলে থাকার কথা, নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা, সেখানে তাদের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
একটি শিশুর কাঁধে যুদ্ধের খবর জানানোর এই দায়িত্ব আসলে আমাদের মানবিক ব্যর্থতারই প্রমাণ।

​সুমাইয়া উইশাহ কেবল একজন শিশু সাংবাদিক নয়, সে গাজার হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং সীমাহীন ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতীক। বাবার মৃত্যুর মতো চরম আঘাতের পরও তার এই টিকে থাকার লড়াই আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের নির্মমতা, সত্য তুলে ধরার অদম্য সাহস এবং সংবাদমাধ্যমের অসীম শক্তির কথা।

 

উত্তাল নদী পেরিয়ে জীবনের আলো—চরের মায়েদের ভরসা ফাতিমা রিমা

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল—চরকাজল ও চরবিশ্বাস। চারদিকে নদী, মাঝখানে অনিশ্চিত জীবনযাত্রা। এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই হাজারো প্রসূতি মায়ের কাছে একটিই নাম এখন আশার আলো—ফাতিমা আক্তার রিমা।

ডিপ্লোমা চিকিৎসক রিমা যেন শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মী নন, বরং এক নির্ভরতার প্রতীক। গত দুই বছরে তিনি ২৪৩টি নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করেছেন। যেখানে চিকিৎসা সুবিধা দুর্লভ, সেখানে এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি জীবনের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প।

দরিদ্র পরিবারের অনেক মায়ের জন্য সিজারিয়ান অপারেশন মানেই অতিরিক্ত খরচ আর শারীরিক কষ্ট। সেই বাস্তবতায় রিমা আক্তার নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন এক আশীর্বাদ। স্থানীয়দের অনেকেই বলেন, “তার হাতে যেন আল্লাহর রহমত আছে।” তবে রিমার কাছে এটি কোনো অলৌকিকতা নয়—এটি তার নিষ্ঠা, দক্ষতা আর মানবিকতার ফল।

দিন-রাতের কোনো হিসাব নেই তার। কাঁচা মেঠোপথ, কাদামাটি, অন্ধকার রাত কিংবা ঝড়-বৃষ্টি—সব বাধা উপেক্ষা করে তিনি ছুটে যান প্রসব বেদনায় কাতর নারীদের কাছে। একটি ফোন কলই যথেষ্ট—তিনি রওনা দেন। কখনো গভীর রাতে, কখনো উত্তাল আবহাওয়ায়। পৌঁছে যান ঠিকই, কারণ তিনি জানেন—তার পৌঁছানো মানেই একটি নতুন জীবনের নিরাপদ আগমন।

গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় আট কিলোমিটার নদীপথ। ট্রলার বা লঞ্চে যেতে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা, আর বিকেল ৫টার পর বন্ধ হয়ে যায় নৌযান চলাচল। ঝড়-বৃষ্টির দিনে সেই পথ যেন মৃত্যুঝুঁকির সমান। ফলে জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা। হাতে গোনা কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও নারী চিকিৎসকের অভাব প্রকট। ফলে প্রসবকালীন ঝুঁকি সবসময়ই তাড়া করে মায়েদের। অনেক সময় হাসপাতালের পথে যাওয়ার আগেই ঝরে যায় দুইটি জীবন—মা ও নবজাতক।

এই কঠিন বাস্তবতায় রিমা আক্তারের কাজ যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব। গত এক বছরে তার করানো নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে কোনো মা বা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি—যা এই অঞ্চলের জন্য এক বিরল সাফল্য। নামমাত্র খরচে, ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—মানবিকতা থাকলে সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

রিমা আক্তারের এই পথচলা শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, এটি এক অনুপ্রেরণার গল্প। দুর্গম চরের অসহায় মায়েদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়েছেন—একজন মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টাই বদলে দিতে পারে বহু মানুষের জীবন।

আজ চরকাজল ও চরবিশ্বাসের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন—তিনি ভরসা, তিনি সাহস, তিনি নিরাপদ মাতৃত্বের আরেক নাম।

 

জামিনে মুক্ত হয়ে যা বললেন বিবি সাওদা

ভোলায় গ্রেপ্তার হওয়া আলোচিত জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মী বিবি সাওদা (৩৭) জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে ভোলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সৌরভ রায় মিঠুর আদালত থেকে তিনি জামিন পান।

তার পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন, অ্যাডভোকেট ফরিদুর রহমান, অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমান, অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান ও রহমাতুল্লাহ সেলিমসহ একদল আইনজীবী।

জামিনে মুক্তির পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিবি সাওদা। তিনি বলেন, “সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। যদি তারা জনগণের কথা না শোনে, তাহলে সেই সরকারের প্রয়োজন কী? সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে অসুস্থ সন্তানকে রেখে আমাকে দুই রাত কারাগারে থাকতে হয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর অভিজ্ঞতা।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই অন্তত আমাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হোক। যেন আমরা আমাদের মতামত প্রকাশ করতে পারি। আমি দেশ ও জনগণের স্বার্থেই ফেসবুকে পোস্ট করেছি। কথা বলার কারণে যদি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর মুখ খুলবে না।”

বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি মানুষ চুপ থাকে, তাহলে এর অর্থ কী? আমাদের বাকস্বাধীনতা অন্তত কেড়ে নেওয়া উচিত নয়।”

এর আগে তার গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয় এবং বিষয়টি জাতীয় সংসদেও ওঠে। বিভিন্ন মহল থেকে দ্রুত মুক্তির দাবি জানানো হয়। জামিনে মুক্তির পর আদালত প্রাঙ্গণে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন।

ভোলা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক শেখ মো. নাছির উদ্দিন জানান, বিবি সাওদাকে ৫৪ ধারায় আদালতে হাজির করা হয়েছিল এবং আদালত তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন।

এদিকে দলের কর্মী জামিনে মুক্ত হওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা সেক্রেটারি কাজী মাওলানা হারুনুর রশিদ বলেন, “সাওদাকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরকার দেশজুড়ে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল, যাতে কেউ সরকারের সমালোচনা না করে। তবে আমরা মনে করি, সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আদালত তাকে জামিন দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন।”

 

ভোলায় জামায়াতকর্মী সাওদা গ্রেপ্তার: বাকস্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় ভোলায় বিবি সাওদা (যিনি সাওদা সুমি নামেও পরিচিত) নামের এক নারী জামায়াতকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ৫ এপ্রিল গভীর রাতে ভোলা সদর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের নিজ বাসা থেকে ৩৭ বছর বয়সী এই নারীকে তুলে নেয় গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল।
পরবর্তীতে তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আদালতে হাজির করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বিবি সাওদার তিন বছর বয়সী একজন বাকপ্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, যার মাতৃস্নেহ ও পরিচর্যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই বিষয়টি সামনে আসায় গ্রেপ্তারের ঘটনাটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

​এই আকস্মিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান মঙ্গলবার সকালে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে পুলিশের এই আচরণকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদের বার্তা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যাসিবাদীরা সব যুগেই নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে প্রতিবাদী জনগণের কণ্ঠ নিষ্ঠুরভাবে স্তব্ধ করতে চায়। পাশাপাশি, দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে পূর্ববর্তী স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিচ্ছবি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের পর দেশের মানুষ যে গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রত্যাশা করেছিল, ঊর্ধ্বতনের নির্দেশে মধ্যরাতে একজন সম্মানিত নারীকে তুলে নেওয়ার এই ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
এছাড়া ভোলা জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলন করে অবিলম্বে সাওদার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে এবং দাবি আদায় না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

​ একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সরকারের নীতি বা ভুলত্রুটির গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করার দায়ে কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার করা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি। এর পাশাপাশি, রাষ্ট্রদ্রোহী বা গুরুতর কোনো ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া, কেবল একটি ফেসবুক পোস্টের জেরে একজন তিন বছরের বাকপ্রতিবন্ধী শিশুর মাকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সুস্পষ্টভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই এমন একটি পদক্ষেপ কেবল ওই শিশু ও মায়ের প্রতি অমানবিকই নয়, বরং সমাজে ভিন্নমত দমনের একটি ভীতিকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যা সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য কখনোই কাম্য হতে পারে না।

 

সকালে উল্টো হাঁটা: শরীর-মনের উপকার

(দিনের শুরুতে ছোট অভ্যাস, বড় পরিবর্তন)

দিনের শুরুতে মাত্র ৩০ সেকেন্ড উল্টো দিকে হাঁটা—শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য কার্যকর একটি ব্যায়াম হতে পারে। সাধারণ হাঁটার বিপরীতে এই অভ্যাস শরীরকে নতুনভাবে সক্রিয় করে এবং মস্তিষ্ককে বাড়তি কাজ করতে বাধ্য করে।

উল্টো হাঁটার সময় ভারসাম্য রক্ষা করতে বেশি মনোযোগ দিতে হয়, ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্রম বাড়ে। একই সঙ্গে পায়ের এমন কিছু পেশি সক্রিয় হয়, যা স্বাভাবিক হাঁটায় কম ব্যবহৃত হয়। এতে শরীরের সমন্বয় ক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা উন্নত হতে পারে।

এছাড়া, এটি এক ধরনের ‘ব্রেন ট্রেনিং’ হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত করলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক তীক্ষ্ণতা বাড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি স্ট্রেস কমাতেও সহায়ক, কারণ মন নতুন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

তবে ঝুঁকিও আছে—হোঁচট খাওয়া, পড়ে যাওয়া বা মাথা ঘোরা। তাই সবসময় খোলা ও নিরাপদ জায়গায়, ধীরে শুরু করে সময় বাড়ানো উচিত।

 

সিমরিন লুবাবার বাগদান: ইসলাম, আইন ও সমাজ কী বলে?

সম্প্রতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সিমরিন লুবাবার বাগদানের খবর দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে তার বাগদান সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ এটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আইনি ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। ফলে এটি একটি বৃহত্তর বিতর্ককে সামনে এনেছে—বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম, রাষ্ট্রীয় আইন এবং সমাজ—এই তিনটির অবস্থান কী?

ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যার উদ্দেশ্য কেবল বৈধ সম্পর্ক স্থাপন নয়; বরং মানসিক প্রশান্তি, নৈতিক সংযম এবং একটি সুস্থ পরিবার গঠন। কোরআনে দাম্পত্য সম্পর্ককে “মাওয়াদ্দাহ ও রহমাহ”—অর্থাৎ ভালোবাসা ও দয়ার বন্ধন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলাম বিয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করেনি। বরং গুরুত্ব দিয়েছে “সামর্থ্য” বা সক্ষমতার ওপর। হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে।
এখানে সামর্থ্য বলতে বোঝানো হয়েছে শারীরিক সক্ষমতা, আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষমতা, স্ত্রী বা পরিবারের ভরণপোষণের যোগ্যতা এবং মানসিক পরিপক্কতা।

ইসলামি ফিকহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু বালেগ হওয়াই বিয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। একজন ব্যক্তির ওপর পারিবারিক দায়িত্ব অর্পণ করার মতো মানসিক স্থিতি এবং অর্থনৈতিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি। অনেক আলেম এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, বিয়ের মাধ্যমে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য সৃষ্টি হয়, তা পালনে অক্ষম হলে সেই বিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেয় না, বরং পারিবারিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ইসলাম বিয়েকে সহজ করতে বললেও তা কখনোই অপরিপক্ক অবস্থায় চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের আইন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট এবং কঠোর। “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭” অনুযায়ী, মেয়েদের জন্য বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের জন্য ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বয়সের নিচে বিয়ে সম্পন্ন করা আইনত অপরাধ এবং এতে সংশ্লিষ্ট অভিভাবক, কাজী বা অন্য যে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যদিও আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের অনুমোদনের একটি ধারা রয়েছে, বাস্তবে এটি খুব সীমিত এবং বিতর্কিতভাবে প্রয়োগ হয়। ফলে সাধারণ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের আগে বিয়ে আইনি ঝুঁকিপূর্ণ এবং দণ্ডনীয়।তবে বাগদানের ক্ষেত্রে এধরনের কোনো আইনি ধরাবাধা নেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি কাজ করে—অনেকে মনে করেন, ইসলাম অনুমতি দিলে রাষ্ট্রীয় আইন উপেক্ষা করা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ইসলাম নিজেই সমাজে শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন মানার ওপর গুরুত্ব দেয়, যতক্ষণ না তা সরাসরি শরিয়াহর বিরুদ্ধে যায়। বাংলাদেশের নির্ধারিত বয়সসীমা মূলত সমাজের সুরক্ষা, বিশেষ করে কিশোরী মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এই আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও যৌক্তিক।

সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে কম বয়সে বিয়ে হলে তা “বাল্যবিবাহ” হিসেবে সমালোচিত হয়, অন্যদিকে একটু দেরিতে বিয়ে করলে বিশেষ করে মেয়েদের নানা ধরনের সামাজিক চাপ ও কটূক্তির মুখে পড়তে হয়।
এই দ্বিমুখী মানসিকতা তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে এবং তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
কিন্তু বাস্তব প্রস্তুতি যেমন আর্থিক স্থিতি, মানসিক পরিপক্কতা বা দাম্পত্য জীবনের দক্ষতা—এই বিষয়গুলো নিয়ে সমাজে খুব কমই আলোচনা হয়।

অল্প বয়সে বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাজীবনের ব্যাঘাত, আর্থিক নির্ভরতা, মানসিক অস্থিরতা এবং দাম্পত্য জীবনে সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি। বিশেষ করে বর্তমান যুগে, যেখানে একটি পরিবার পরিচালনা করতে আর্থিক পরিকল্পনা, মানসিক পরিপক্কতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রয়োজন, সেখানে অপরিণত বয়সে এই দায়িত্ব নেওয়া অনেক সময় বাস্তবসম্মত হয় না। আবার অতিরিক্ত দেরিতে বিয়ের ক্ষেত্রেও সামাজিক চাপ, সম্পর্কের জটিলতা এবং নৈতিক চ্যালেঞ্জের মতো বিষয়গুলো সামনে আসে।

সামাজিক বাস্তবতায় অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অল্প বয়সে বিয়ে করেও সফল জীবন গড়া সম্ভব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এর উদাহরণ রয়েছে। যেমন, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অল্প বয়সে বিবাহিত জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

কিন্তু এখানে একটা জিনিস পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে—এই উদাহরণগুলো ব্যতিক্রম (exception), নিয়ম (rule) নয়। বাস্তবতা হলো, অতীতে সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক সাপোর্ট সিস্টেম এবং জীবনযাত্রার ধরন বর্তমান সময়ের তুলনায় ভিন্ন ছিল। তখন পরিবারগুলো বড় ছিল, দায়িত্ব ভাগাভাগি হতো, এবং নারীদের জন্য ক্যারিয়ার গঠনের চাপও তুলনামূলক কম ছিল। ফলে অল্প বয়সে বিয়ের পরও অনেক ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক টিকে যেত এবং ব্যক্তি পরবর্তীতে অন্য ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারতেন।

বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন একটি পরিবার পরিচালনা করতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানসিক পরিপক্কতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষাজীবন, ক্যারিয়ার গঠন এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জনের বিষয়গুলো এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক ক্ষেত্রে চাপ, নির্ভরতা এবং অসম্পূর্ণ প্রস্তুতির কারণে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক সাপোর্ট, আর্থিক স্থিতি এবং ব্যক্তিগত পরিপক্কতা থাকলে অল্প বয়সে বিয়েও সফল হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো—এই শর্তগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে।

সিমরিন লুবাবার বাগদানের ঘটনাটি বর্তমানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে একটি সামাজিক প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লুবাবর পারিবারিক সাপোর্ট আর্থিক সক্ষমতা সবার জন্য উদাহরণ হতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছোট বয়সে বিয়ের পর পড়াশোনা চালানো অনেকক্ষেত্রেই সহজ না। শ্বশুরবাড়ির সাপোর্টের অভাবে অল্প বয়সেই অনেক মেয়েকে বহন করতে হয় শারীরিক ও মানসিক চাপের ভার। তাদের কাছে বিয়ে কোনো ফ্যান্টাসি না বরং হয়ে উঠে কঠিন বাস্তবতা।

অল্প বয়সে বিয়ে হোক বা দেরিতে, দুটাই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। যেটা একজনের কাছে চয়েজ, সেটা আরেকজনের জীবনে হয়ে ওঠে থেমে যাওয়া স্বপ্নের গল্প, বাস্তবতার কাছে হার মানা।

তবে কারো যদি ছোট বয়সে বিয়ে করার মতো ফ্যামিলি সাপোর্ট আর অনুকূল পরিস্থিতি থাকে এবং সে ভালো থাকতে পারে, তাহলে সেটাও তার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু এই ব্যতিক্রমকে সবার জন্য স্ট্যান্ডার্ড বানানো কতটা যৌক্তিক? এদেশের নারীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিয়ের আগে নিজেকে তৈরি করে নেওয়াটা যেমন জরুরি তেমনি একজন পুরুষের আর্থিক ও মানসিকভাবে একটি মেয়ের দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা তৈরী হওয়া আরো বেশী জরুরী।

বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম, আইন এবং সমাজ—এই তিনটি দৃষ্টিকোণকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ইসলাম আমাদের সক্ষমতা ও দায়িত্ববোধ শেখায়, আইন আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, আর সমাজ আমাদের বাস্তব প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই একটি সুস্থ, স্থিতিশীল এবং কল্যাণকর দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।

 

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব: সতর্কতার সময় এখনই

বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম-এ আক্রান্তের সংখ্যা। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসজনিত রোগ ইতোমধ্যেই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি “নীরব সংকট” হিসেবে দেখছেন।

সংক্রমণ পরিস্থিতি: দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনের বাস্তবতা

হাম এমন একটি ভাইরাস, যার সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি আশপাশের প্রায় ৯০ শতাংশ অনটিকাপ্রাপ্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমানে দেশের অন্তত ১০টির বেশি জেলায় এই রোগ প্রকট আকার ধারণ করেছে, এবং প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা প্রাদুর্ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর, স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব এবং পুষ্টিহীনতা একত্রে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

কেন বাড়ছে হাম?
এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট কারণ কাজ করছে:

১. টিকাদানের ঘাটতি
সবচেয়ে বড় কারণ হলো নিয়মিত টিকা না নেওয়া। Expanded Programme on Immunization-এর আওতায় থাকলেও অনেক শিশু সম্পূর্ণ ডোজ পায় না, ফলে তারা ঝুঁকিতে থেকে যায়।
২. অপুষ্টি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
অপুষ্ট শিশুর শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে পারে না। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি হামের জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।
৩. বুকের দুধ কম খাওয়ানো
শিশুর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের দুধের ওপর। এই জায়গায় ঘাটতি থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
৪. কৃমিনাশক ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব
নিয়মিত কৃমিনাশক না খাওয়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

যেভাবে ছড়ায় হাম: বিপজ্জনক সংক্রমণ চক্র

হামের ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণাগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেগুলো প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
সংক্রমণের প্রধান মাধ্যমগুলো হলো-
আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা।
কাশি-হাঁচির মাধ্যমে বায়ুবাহিত ফোঁটা।
দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করে চোখ, নাক বা মুখে হাত দেওয়া।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই একজন ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে।

লক্ষণ ও জটিলতা
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০–১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রথমদিকে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো মনে হলেও দ্রুত তা জটিল রূপ নেয়।

প্রাথমিক লক্ষণ-
উচ্চ জ্বর (১০৪°F পর্যন্ত)
সর্দি, কাশি
চোখ লাল হওয়া
মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)

পরবর্তী পর্যায়-
কানের পেছন থেকে শুরু হওয়া লালচে ফুসকুড়ি
পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়া র‍্যাশ
তীব্র দুর্বলতা ও জ্বরের পুনরাবৃত্তি
জটিল অবস্থায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

মৃত্যুঝুঁকি: সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ছিল:
টিকাবঞ্চিত
অপুষ্টিতে ভোগা
বয়সে ছোট (৫ বছরের নিচে)

এটা সরাসরি প্রমাণ করে—হাম নিজে যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি মারাত্মক হয়ে ওঠে যখন শরীর দুর্বল থাকে।

প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর পথ
এখন পর্যন্ত হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
যা করতেই হবে-
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা
শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া
পুষ্টিকর খাবার ও বুকের দুধ নিশ্চিত করা
আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখা

একটা ব্যাপার পরিষ্কার—এই প্রাদুর্ভাব “হঠাৎ” হয়নি। এটা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁক, অভিভাবকদের অবহেলা এবং সচেতনতার ঘাটতির সরাসরি ফল। যদি এখনই কঠোরভাবে টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানো না হয়, তাহলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এটা নিশ্চিত।
এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—অবহেলা করবেন, নাকি প্রতিরোধ করবেন।

 

ইডেন মহিলা কলেজে আবার ফিরছে এইচএসসি

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ইডেন মহিলা কলেজে পুনরায় উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যায়ের পাঠদান চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কলেজ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমে এই প্রস্তাব জমা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।

গত ২৫ মার্চ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ শাখা থেকে জারি করা এক আদেশে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কাজী নুরুল ইসলামের সই করা ওই নির্দেশনা ২৯ মার্চ মাউশির মাধ্যমে ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের কাছে পৌঁছেছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কলেজটিতে এইচএসসি পর্যায়ের পাঠদান কার্যক্রম ঠিক কোন বছরে এবং কী কারণে বন্ধ হয়েছিল, সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানাতে হবে। পাশাপাশি, পুনরায় এই কার্যক্রম চালু করতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন হবে কি না, তাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় তথ্যসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দ্রুত মাউশির মাধ্যমে পাঠাতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই ইডেন কলেজে আবারও এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হতে পারে।

 

বাংলাদেশের নারী অধিকার: অগ্রগতি না পশ্চাৎগমন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে বৈশ্বিক একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা এমন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যা অনেক প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। দীর্ঘদিন ধরে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, নতুন প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবে বেশি উদার ও সমতার পক্ষে হবে। কিন্তু যুক্তরাজ্যভিত্তিক Ipsos এবং King’s College London-এর অধীন King’s Business School পরিচালিত এই গবেষণা দেখাচ্ছে—বাস্তবতা এত সরল নয়।

২৯টি দেশের প্রায় ২৩ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে করা এই জরিপে দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি রক্ষণশীল। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে এই প্রবণতা স্পষ্ট। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ মনে করে, একজন নারীকে স্বামীর নির্দেশ মেনে চলা উচিত কিংবা পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পুরুষেরই শেষ কথা থাকা উচিত। এমনকি একটি অংশ মনে করে নারীর অতিরিক্ত স্বাধীনতা সমাজের জন্য ভালো নয়।

আরও উদ্বেগজনক দিক হলো—এই মানসিকতা শুধু পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কিছু নারীও একই ধারণাকে সমর্থন করছেন। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু একপাক্ষিক নয়; এটি সামাজিকভাবে গভীরভাবে প্রোথিত একটি দৃষ্টিভঙ্গি। যৌনতা সম্পর্কিত ধারণাতেও একই ধরনের রক্ষণশীলতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে নারীর সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করে।

এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। Heejung Chung মনে করেন, নতুন প্রজন্মের অনেক পুরুষ একদিকে পুরুষতান্ত্রিক মানদণ্ডের চাপ অনুভব করছে, অন্যদিকে নারীদেরও পুরনো লিঙ্গভূমিকায় ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে। ফলে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে, যা সমাজে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।

দেশভেদে এই মনোভাবের পার্থক্যও লক্ষণীয়। কিছু দেশে এখনও নারীর অধীনস্থ ভূমিকা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য, আবার কিছু দেশে তা প্রায় অগ্রহণযোগ্য। এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে—নারী অধিকার শুধু আইন বা নীতিমালার বিষয় নয়; এটি মূলত একটি সমাজের মানসিকতা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। এখানে আইনগত কিছু অগ্রগতি থাকলেও বাস্তব জীবনে নারীরা এখনও বহু বাধার মুখোমুখি হন। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যের ছাপ স্পষ্ট। সমস্যাটি কেবল আইনের ঘাটতিতে নয়; বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ধীর পরিবর্তনই বড় চ্যালেঞ্জ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—আইনের শাসনের দুর্বলতা। যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ও ক্ষমতা আইনের ওপর প্রাধান্য পায়, তখন ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান থাকে না। কেউ সহজেই সুবিধা পায়, আবার কেউ দীর্ঘদিন বিচারহীনতায় ভোগে। এই পরিস্থিতি শুধু নারী অধিকার নয়, সামগ্রিকভাবে নাগরিক অধিকারের জন্যও হুমকি।

তবে এখানেই চূড়ান্ত হতাশার জায়গা নয়। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি তার নাগরিকদের মধ্যেই নিহিত। সচেতনতা, প্রশ্ন তোলার সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান—এই তিনটি বিষয় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কেবল নীতিমালা নয়, বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের সামনে তাই তিনটি স্পষ্ট অগ্রাধিকার রয়েছে।
প্রথমত, আইনের শাসনকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করা—যেখানে ব্যক্তি বা ক্ষমতা নয়, আইনই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড।
দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে।
তৃতীয়ত, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন—পরিবার, শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে নারীকে অধীন নয়, সমান অংশীদার হিসেবে দেখা হবে।

সবশেষে প্রশ্নটি শুধুই নারীর অধিকার নিয়ে নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন সেখানে ন্যায়বিচার ও মানবিকতা সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় -আমরা কি সমতার পথে এগোব, নাকি পুরনো বৈষম্যের চক্রেই আটকে থাকব।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে ভিন্ন বাস্তবতার ঈদ

ঈদুল ফিতর মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি, যা সাধারণত আনন্দ, মিলন এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আসে।
এক মাসের সিয়াম সাধনার পর এই দিনটি মানুষকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একত্রিত করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিশ্বের সব প্রান্তে ঈদের অভিজ্ঞতা এক নয়। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে ঈদ এখন আর উৎসবের প্রতীক নয়, বরং টিকে থাকার সংগ্রামের মাঝেই এক ক্ষণিক বিরতি।

গাজা উপত্যকা-এ চলমান সংঘাত মানুষের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। অবরোধ, খাদ্যসংকট এবং অব্যাহত সামরিক হামলার কারণে সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গাজার বড় একটি জনগোষ্ঠী বর্তমানে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সেবা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট ঈদের আনন্দকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ঈদের প্রস্তুতিও ভিন্ন রূপ নিয়েছে। বাজারে পণ্য থাকলেও অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নেই। খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার ন্যূনতম খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। তবুও মানুষ ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে—কেউ ঘরে তৈরি কুকিজ বানাচ্ছে, কেউ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সামান্য খাবার ভাগ করে নিচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও এই ছোট ছোট প্রচেষ্টাগুলোই তাদের মানসিক শক্তি জোগাচ্ছে।

অন্যদিকে লেবানন-এ সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং সীমান্তবর্তী সংঘর্ষ বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে। তাদের কাছে ঈদ মানে নতুন পোশাক বা উৎসবের আয়োজন নয়, বরং নিরাপদে একটি দিন পার করা। যুদ্ধের ভয়, অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রবাসে থাকা লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর জন্য ঈদের অভিজ্ঞতা আরও জটিল।
পিটারবরো-এর মতো শহরে বসবাসরত অনেকেই নিরাপদ পরিবেশে থাকলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। পরিবার থেকে দূরে থাকা, স্বজনদের দুর্ভোগের খবর শোনা এবং নিজ দেশের অনিশ্চিত পরিস্থিতি তাদের আনন্দকে বিষাদে রূপান্তরিত করেছে।
অনেকেই এবারের ঈদ উদ্‌যাপন না করে নীরবে প্রার্থনা ও সংহতির মাধ্যমে দিনটি পার করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ট্রমা, উদ্বেগ এবং হতাশা—এসব সমস্যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল এবং প্রবাসী উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গুরুতর, কারণ তারা স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সহিংস পরিবেশে বড় হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ঈদের তাৎপর্য নতুনভাবে সামনে আসে। এটি কেবল আনন্দের দিন নয়, বরং সহমর্মিতা, সংহতি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। যারা নিরাপদে আছে, তাদের জন্য এটি একটি স্মরণীয় সময়—বিশ্বের অন্য প্রান্তে কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান।
এবারের ঈদ বিশ্ববাসীর সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা উন্মোচন করেছে—আনন্দের এই উৎসব সবার জন্য সমান নয়। কোথাও এটি পুনর্মিলনের দিন, আবার কোথাও ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও মানবিকতা ধরে রাখার এক নীরব সংগ্রাম।

সূত্র – আল জারিরা, বিবিসি

 

আফ্রিকার লৌহমানবী সিরলিফ

​দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ আর বারুদের গন্ধে তখন লাইবেরিয়ার বাতাস ভারী। অবকাঠামো বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই, অর্থনীতি ধুলিসাৎ এবং সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ঠিক এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উঁকি দেয় একটি নতুন ভোরের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার নাম অ্যালেন জনসন সিরলিফ।
২০০৬ সালের ১৬ জানুয়ারি লাইবেরিয়ার ২৪তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল একটি দেশকেই নতুন করে স্বপ্ন দেখাননি, বরং পুরো আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচনা করেন। বিশ্ব তাঁকে চেনে ‘আফ্রিকার লৌহমানবী’ হিসেবে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে অদম্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে জরাজীর্ণ সমাজকেও নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব।

​অ্যালেন জনসন সিরলিফের ক্ষমতার মসনদে আরহণের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না; এটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী এই নারী চাইলে বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘের মতো সংস্থায় নিরাপদ ও বিলাসী জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু মাতৃভূমির টানে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন লাইবেরিয়ায়।
আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁকে অমানবিক জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে, এমনকি দুবার দেশ ছেড়ে নির্বাসনেও যেতে হয়েছে। তবুও মৃত্যুভয় তাঁকে দমাতে পারেনি। চার্লস টেলরের মতো যুদ্ধাপরাধী শাসকের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন কণ্ঠস্বর এবং সাহসিকতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘লৌহমানবী’ বা ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

​প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিরলিফের সামনে চলে আসে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। দেশটির কোষাগার একদম শূন্য এবং ঘাড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা। তিনি তাঁর জাদুকরী কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাইবেরিয়ার হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং বিপুল পরিমাণ ঋণ মওকুফ করাতে সক্ষম হন।
ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সচল করা এবং ভেঙে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তিনি লাইবেরিয়াকে নতুন জীবন দান করেন। তাঁর শাসনামলেই লাইবেরিয়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে হাঁটতে শুরু করে, যা ছিল দেশটির জন্য এক অভাবনীয় সাফল্য।

সিরলিফের শাসনামল কেবল ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নারী জাগরণে তিনি ছিলেন এক অগ্রদূত। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী।
তিনি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন।
নারী অধিকার রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
তাঁর এই অর্জন বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

​ক্ষমতার প্রতি মোহহীনতা সিরলিফকে আফ্রিকার অন্যান্য নেতাদের থেকে আলাদা করেছে। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর, তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন। ১৯৪৪ সালের পর লাইবেরিয়ায় এটিই ছিল এক নির্বাচিত সরকার থেকে অন্য নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথম ঘটনা।

বর্তমানে তিনি ‘অ্যালেন জনসন সিরলিফ প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার ফর ওমেন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আফ্রিকার ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিহাসের পাতায় অ্যালেন জনসন সিরলিফ কেবল একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট নন, তিনি সাহসিকতা ও পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।

 

সামাজিক সহযোগিতায় বাড়বে নারীর পেশাগত অগ্রগতি

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা (আইএসডি) একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে, যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের নেতৃত্বস্থানীয় নারীরা অংশগ্রহণ করেন। ‘গিভ টু গেইন: এমপাওয়ারিং উইমেন, এমপাওয়ারিং দ্য নেশন’ শীর্ষক এই আলোচনায় নারীর ক্ষমতায়ন, মেন্টরশিপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বাস্তব গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

আলোচনায় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের বড় বাধা কেবল সম্পদের অভাব নয়, বরং সমন্বয়ের ঘাটতি।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাত পৃথকভাবে কাজ করলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় খুব কম দেখা যায়। অথচ এই খাতগুলো একসঙ্গে কাজ করলে নারীদের জন্য মেন্টরশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন আলোচকরা। আইএসডির রোবোটিকস শিক্ষক আনা ইয়াং বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। তাদের ভুল করার সুযোগ দিতে হবে এবং ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, নইলে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রযুক্তিগত বৈষম্যের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মেয়েই এখনো মৌলিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সায়মা শওকত উল্লেখ করেন, একটি কম্পিউটার বা ইন্টারনেট সংযোগের অভাব তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সীমাবদ্ধতা দূর না করলে নারীদের অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদে থমকে যেতে পারে।

বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়েও সরাসরি আলোচনা হয়। বক্তারা মনে করেন, কেবল মুনাফা নয়—দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করতে হবে। বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

নারীদের নেতৃত্বে পিছিয়ে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীদের সংখ্যা এখনো কম। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক বাধা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং পর্যাপ্ত মেন্টরশিপের সংকট। অভিজ্ঞ নারী নেতাদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে গাইড করার উদ্যোগ বাড়ালে এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মত দেন আলোচকরা।

গোলটেবিল বৈঠকের সারসংক্ষেপ ছিল একটাই-সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করলে নারীদের জন্য একটি শক্তিশালী মেন্টরশিপ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে নারী নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে আরও গতিশীল করে তুলবে।

 

মস্তিষ্কের আয়নায় নারী-পুরুষ: বিজ্ঞান কী বলছে, বিতর্ক কোথায়?

একুশ শতকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও নারী ও পুরুষের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কে বেশি বুদ্ধিমান, কার চিন্তার গভীরতা বেশি, কার সিদ্ধান্ত দ্রুত—এমন প্রশ্ন আজও ঘুরে ফিরে আসে ব্যক্তিগত আড্ডা থেকে সামাজিক আলোচনায়। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নারীরা আজ গবেষণাগার পেরিয়ে মহাকাশে, আবার পুরুষেরা প্রযুক্তির জটিল হিসাব সামলে ঘরের রান্নাঘরে নতুন স্বাদের রেসিপি আবিষ্কার করছে। তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—এই পার্থক্যের উৎস কোথায়? নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক কি সত্যিই আলাদা?
এই প্রশ্নটি যেমন কৌতূহলোদ্দীপক, তেমনি স্পর্শকাতর। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এই পুরোনো বিতর্ককে নতুন আলোয় নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞানীরা এখন আর অনুমান নয়, বরং বিশাল ডেটা ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।

হারানো পাঁচ আউন্স
নারী-পুরুষের মস্তিষ্ক নিয়ে বিতর্কের শিকড় অনেক গভীরে। উনিশ শতকের কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, গড় হিসেবে পুরুষের মস্তিষ্কের ওজন নারীর তুলনায় কিছুটা বেশি। এখান থেকেই জন্ম নেয় তথাকথিত ‘মিসিং ফাইভ আউন্স’ তত্ত্ব—যার দাবি ছিল, এই বাড়তি ওজনই নাকি পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
আধুনিক বিজ্ঞান অবশ্য এই ধারণাকে অনেক আগেই নাকচ করেছে। নিউরোসায়েন্সের ভাষায় বিষয়টি বেশ সহজ। সাধারণত যাদের শরীর বড়, তাদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্কের আয়তনও তুলনামূলক বড় হয়। প্রাণিজগতেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নেই। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের আকার বা ওজনের সঙ্গে মেধা, বুদ্ধিমত্তা কিংবা সৃজনশীলতার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের গঠনগত ও কার্যগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করছেন। তবে এই গবেষণার উদ্দেশ্য কে ‘ভালো’ বা কে ‘খারাপ’ তা নির্ধারণ করা নয়।
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের মনোরোগ ও আচরণগত বিজ্ঞানের অধ্যাপক বিনোদ মেননের ভাষায়, এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয়, বয়সের সঙ্গে কীভাবে বদলায় এবং বিভিন্ন স্নায়বিক বা মানসিক রোগে লিঙ্গভেদে কেন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়—তা বোঝা।
গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কে যদি লিঙ্গভিত্তিক কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য চিহ্নিত করা যায়, তবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, অটিজম ও পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগ পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস কিংবা বিষণ্নতার মতো মানসিক রোগে নারীরা বেশি আক্রান্ত হন।
এই পার্থক্যগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করলে রোগের প্রকৃত কারণ ও কার্যপ্রণালি বোঝা কঠিন হয়ে পড়তে পারে—এমনটাই মত গবেষকদের একাংশের।

আপত্তির জায়গা: বিজ্ঞান না সামাজিক ‘অ্যাজেন্ডা’?
তবে সবাই এই গবেষণাকে একই চোখে দেখছেন না। ব্রিটিশ নিউরোসায়েন্টিস্ট জিনা রিপন মনে করেন, বর্তমানে জৈবিকভাবে নির্ধারিত লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য খোঁজার পেছনে একধরনের সামাজিক আগ্রহ বা ‘অ্যাজেন্ডা’ কাজ করছে। তাঁর আশঙ্কা, মানুষ যদি আচরণ, আবেগ বা অর্জনের পার্থক্যকে সরাসরি মস্তিষ্কের কাঠামোর সঙ্গে জুড়ে দেয়, তবে সামাজিক বৈষম্যকে বৈজ্ঞানিক মোড়কে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এস্টন ইউনিভার্সিটির এই ইমেরিটাস অধ্যাপকের মতে, নারী-পুরুষের পার্থক্যকে যদি জন্মগত ও অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক কাঠামোয় সমতার লড়াই দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমতা মানে অভিন্নতা নয়। পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্যকে স্থায়ী তকমা বানানো বিপজ্জনক।

আগামীর বিজ্ঞান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণা নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে নিঃসন্দেহে আরও গভীর করছে। তবে বিজ্ঞানীরাই স্বীকার করছেন—এই ফলাফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা প্রয়োজন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজন হলে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আবার একই সঙ্গে এই পার্থক্যকে ব্যবহার করে সামাজিক বৈষম্যকে স্বাভাবিক বা বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে বলা যায়, নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক নিয়ে প্রশ্নটি আজ আর কেবল ‘কে বেশি বুদ্ধিমান’—এই সরল বিতর্কে আটকে নেই। বরং এটি মানবদেহ, সমাজ ও ন্যায়বিচারের এক জটিল সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান। বিজ্ঞান এখানে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু সেই পথে হাঁটার দায়িত্ব আমাদের সবার।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ন্যাচার, নিউ সায়েন্টিস্ট, স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন

 

ঈদের পর পেটের যত্ন: সুস্থ হজমে করণীয় ও বর্জনীয়

ঈদ মানেই নানা রকম সুস্বাদু খাবারের সমাহার—গরু, খাসির মাংস, কাবাব, মিষ্টি, সেমাই—সব মিলিয়ে জমে ওঠে খাওয়া-দাওয়া। কিন্তু এই অতিরিক্ত খাওয়াদাওয়া অনেক সময় পেটের সমস্যা, গ্যাস, বদহজম বা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঈদের পরপরই পেট ও হজম শক্তি ঠিক রাখতে কিছু নিয়ম মেনে চলা খুবই জরুরি।

✅ যা করবেন

১. হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খান
ঈদের পরের কয়েকদিন ভাত, সবজি, ডাল, মাছের মতো সহজপাচ্য খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে হজমতন্ত্র বিশ্রাম পায়।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
পানি শরীরের টক্সিন বের করতে সাহায্য করে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে। প্রতিদিন অন্তত ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন।

৩. আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান
শাকসবজি, ফলমূল, ওটস—এসব আঁশযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজম ভালো রাখে।

৪. নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন
খাওয়ার পর হালকা হাঁটা হজমে সহায়তা করে। প্রতিদিন অন্তত ২০–৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করুন।

৫. সময়মতো খাবার খান
অনিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস হজমে সমস্যা তৈরি করে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

❌ যা করবেন না

১. অতিরিক্ত মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন
ঈদের পরপরই ভারী ও তেলযুক্ত খাবার খেলে গ্যাস ও বদহজমের ঝুঁকি বাড়ে।

২. একসাথে বেশি খাবেন না
একবারে বেশি খাওয়ার বদলে অল্প অল্প করে কয়েকবার খান।

৩. খাবারের পরপরই ঘুমাবেন না
খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে হজমে সমস্যা হয় এবং এসিডিটি বাড়তে পারে।

৪. কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টি কমান
সফট ড্রিংক ও অতিরিক্ত মিষ্টি হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

৫. দেরি করে রাতের খাবার খাবেন না
রাত বেশি করে খেলে খাবার ঠিকমতো হজম হয় না এবং ঘুমের সমস্যা হয়।

ঈদের আনন্দ যেন অসুস্থতায় নষ্ট না হয়—সেজন্য একটু সচেতন হলেই পেট ও হজম ভালো রাখা সম্ভব। পরিমিত খাবার, নিয়মিত জীবনযাপন আর কিছু ছোট অভ্যাসই আপনাকে রাখবে সুস্থ ও স্বস্তিতে।

 

আধুনিক সৌন্দর্য চর্চায় মুসলিম নারীদের হালাল নেলপলিশ

নখ সাজানো অনেক নারীর কাছেই সৌন্দর্য চর্চার স্বাভাবিক একটি অংশ। মুসলিম নারীরাও এর বাইরে নন। কিন্তু ইবাদতের বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে সাধারণ নেলপলিশ প্রায়ই একটি দ্বিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রচলিত নেলপলিশ নখের ওপর এমন একটি আবরণ তৈরি করে, যা অজুর সময় পানি নখ পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা দেয় ফলে নামাজ সহিহ হওয়ার প্রশ্ন উঠে আসে।

এই সমস্যার সমাধানে অনেকেই নামাজের আগে নেলপলিশ তুলে ফেলেন কিংবা বিশেষ সময়েই তা ব্যবহার করেন। তবে সৌন্দর্যশিল্পের অগ্রগতির ফলে এখন এসেছে আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব সমাধান -হালাল নেলপলিশ। এসব নেলপলিশে বিশেষ ‘ব্রিদেবল’ বা শ্বাসযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে পানি ও অক্সিজেন নখের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। ফলে অজু ও নামাজে বাধা না দিয়েই প্রতিদিন নেলপলিশ ব্যবহার করা সম্ভব।
নিচে বিশ্বজুড়ে পরিচিত কয়েকটি হালাল নেলপলিশ ব্র্যান্ড সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

অরেলি (Orly)
‘মুসলিম গার্লস’-এর সঙ্গে যৌথভাবে অরেলি তৈরি করেছে বিশেষ হালাল নেলপলিশ সিরিজ। এটি একটি অল-ইন-ওয়ান ফর্মুলা, যা নখকে শক্ত, মসৃণ ও দীর্ঘস্থায়ী করে। আরগান অয়েল, প্রো-ভিটামিন বি৫ ও ভিটামিন সি থাকায় নখ থাকে উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যবান।

ওলিসি (Olive & June / Olisi টাইপ)
ওয়াটারবেসড এই নেলপলিশ সহজেই খোসার মতো তুলে ফেলা যায়, রিমুভারের প্রয়োজন নেই। মাত্র এক মিনিটে শুকিয়ে যায় এবং এতে ইউভি বা কৃত্রিম আলো দরকার হয় না। বেস ও টপ কোটসহ সেট আকারে এটি পাওয়া যায়।

টিউজডে ইন লাভ (Tuesday in Love)
কানাডার এই ব্র্যান্ডটি হালাল কসমেটিকসের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। আইএসএনএ কানাডা কর্তৃক স্বীকৃত এই নেলপলিশে মাইক্রো-পোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পানি দ্রুত শোষণে সহায়ক। এতে প্রাণিজ উপাদান বা নিষিদ্ধ অ্যালকোহল নেই।

ভিভরে (Vivre)
ফ্রান্সের এসজিএস ল্যাব দ্বারা সার্টিফায়েড ভিভরের নেলপলিশ ভেগান ও প্যারাবেনমুক্ত। এটি নখে বাতাস ও অক্সিজেন চলাচলে বাধা দেয় না, ফলে ইবাদতের ক্ষেত্রে নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

কার্মা অরগানিক (Karma Organic)
পরিবেশবান্ধব এই ব্র্যান্ডটি কাচের বোতল ও সয়াবিন-ভিত্তিক কালি ব্যবহার করে। এর ফর্মুলা এমনভাবে তৈরি, যাতে পানি ও অক্সিজেন নখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্যও এটি নিরাপদ।

৭৮৬ কসমেটিকস (786 Cosmetics)
এই ব্র্যান্ডটি স্বীকৃত হালাল সার্টিফিকেশনপ্রাপ্ত এবং ১১ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত। প্রাণিজ উপাদানবিহীন এই নেলপলিশ নখকে আর্দ্র ও সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। এর রঙগুলোর নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন মুসলিম শহরের নামে।

ল্যাভেন্ডার (Lavender Violets)
২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্র্যান্ডটি ঘরে বসেই সেলুন-মানের জেল ফিনিশ দেওয়ার জন্য পরিচিত। বিষাক্ত রেজিন, ফর্মালডিহাইড বা টলুইন ছাড়া তৈরি এই নেলপলিশ দীর্ঘদিন উজ্জ্বল থাকে এবং নখের ক্ষতি করে না।

সৌন্দর্য ও ইবাদত দুটোর মধ্যেই ভারসাম্য রক্ষা করা মুসলিম নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক হালাল নেলপলিশ সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে এক কার্যকর ও আস্থার সমাধান হয়ে উঠেছে।

 

ঈদে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বেছে নিন সুষম খাবার

ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দের বড় অংশজুড়ে থাকে খাবার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ হজমের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া, এমনকি হঠাৎ অসুস্থতায় ভোগে। কারণ একটাই—অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া।

ঈদের দিনগুলোতে টেবিলে থাকে মাংসের নানা পদ, মিষ্টি, ভাজাপোড়া—সবই উচ্চ ক্যালরি ও চর্বিযুক্ত। পুষ্টিবিদদের মতে, হঠাৎ করে এ ধরনের খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীর তা সামলাতে পারে না। বিশেষ করে যারা নিয়মিত সুষম খাবার খান না, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ফলে বদহজম, এসিডিটি, বমিভাব এসব সমস্যা খুব দ্রুত দেখা দেয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলেন, ঈদে খাবার উপভোগ করতে হবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারানো যাবে না। তাদের পরামর্শ হলো—একবারে পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া। এতে হজম প্রক্রিয়া সহজ থাকে এবং শরীরের ওপর চাপ কম পড়ে। একইসাথে খাবারের তালিকায় সবজি, সালাদ ও আঁশযুক্ত উপাদান রাখার ওপর জোর দেন তারা। শুধু মাংস আর মিষ্টি খেলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়। প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারও প্রয়োজন। তাই প্লেটে বৈচিত্র্য রাখা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান না করলে হজমের সমস্যা আরও বাড়ে।

আরেকটি বড় ভুল হলো সামাজিক চাপে পড়ে অতিরিক্ত খাওয়া। অনেকেই না চাইলেও “আরেকটু খান” কথার চাপে পড়ে শরীরের সীমা অতিক্রম করেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, এটা সরাসরি নিজের স্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে কাজ করা। শরীরের সংকেত বুঝে থামতে না পারা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাস্তব কথা হলো—ঈদ উৎসব কয়েক দিনের, কিন্তু অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অল্প কিছু সময়ের আনন্দের জন্য যদি পরে ওষুধ খেয়ে সময় কাটাতে হয়, তাহলে সেটা কোনো বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত না।
সুতরাং সুষম খাবার খান, পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ রাখুন,সুস্থ থাকুন। কারণ সুস্থ থাকলেই উৎসবের আনন্দ সত্যিকার অর্থে উপভোগ করা যায়

 

রেহানে জাবারি: অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক তরুণীর শেষ লড়াই

ইরানের তরুণী রেহানে জাবারির (জন্ম: ১৯৮৭) জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালের ৭ জুলাই, যখন মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি ধর্ষণের মুখে পড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এক প্রভাবশালী সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার আক্রমণাত্মক আচরণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে তিনি ছুরি ব্যবহার করেন। মুহূর্তেই এই আত্মরক্ষার চেষ্টা ‘পরিকল্পিত হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রতিরোধের সত্যটিকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে হত্যাকারী হিসেবে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

বিচারপ্রক্রিয়ায় রেহানের কথা শোনার কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। তদন্তে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ গুরুত্ব পায়নি; বরং তার নরম হাত, রঙ করা নখ, নারীত্বের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য—এসবই ব্যঙ্গ এবং সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে।
রেহানে যে কখনো একটি মশাও হত্যা করেননি—এই কথাও বিচারকের চোখে উপেক্ষিত থাকে। শেষ পর্যন্ত আদালত তাকে “ঠাণ্ডা মাথার খুনি” আখ্যা দিয়ে ২০০৯ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে।

রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মানবাধিকার সংগঠন, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতা—সবার দাবি ছিল রেহানের বিচার পুনর্বিবেচনা করা হোক। নানা দেশে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্তির দাবি ওঠে। এমনকি রেহানের মা শোলেহ আদালতের কাছে মেয়ের বদলে নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ার আবেদনের মতো হৃদয়বিদারক পদক্ষেপও নেন। কিন্তু রাষ্ট্রের কঠোর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই নরম হয়নি।

গ্রেফতারের পর রেহানেকে প্রথমে কুখ্যাত এভিন কারাগারের একাকী কক্ষে রাখা হয়। দীর্ঘ জেরা, নজরদারি ও নিপীড়নের মধ্যে কাটে তার দিন। পরে তাকে স্থানান্তর করা হয় শাহর-এ রায় কারাগারে, যেখানে পরিবেশ আরও কঠোর ছিল।
মাথা মুড়িয়ে তাকে একাকী কক্ষে রাখা হয়—যেন তার নারীত্ব ও আত্মমর্যাদাকে ভেঙে ফেলা যায়। আত্মরক্ষার সাহস দেখানোর অপরাধে তাকে সহ্য করতে হয় অপমান, অবমাননা এবং অমানবিক নির্যাতন।

ফাঁসির আগের রাতটি ছিল ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর। শাহর-এ রায় জেলের অন্ধকার সেলে সেই রাতটিই ছিল তার জীবনের শেষ রাত। সেদিনই তাকে জানানো হয় যে ২৫ অক্টোবর ভোরে ‘কিসাস’ রায় কার্যকর হবে। তিনি আক্ষেপ করেন—এই শেষ সত্যটি মা কেন নিজে জানাননি তাকে। সেই রাতেই তিনি লিখে যান তার বিখ্যাত শেষ চিঠি—যা পরে মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে প্রতিরোধের এক মূল্যবান দলিল হয়ে ওঠে।
চিঠিতে তিনি মায়ের শেখানো সত্য, সাহস ও মর্যাদার শিক্ষা স্মরণ করেন এবং জানান—তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না, কিন্তু বিচারহীনতার ক্ষত তাকে তীব্রভাবে ব্যথিত করে।

চিঠিতে রেহানে নিজের শেষ ইচ্ছাগুলোও প্রকাশ করেন। তিনি চান, মৃত্যুর পর তার চোখ, হৃদপিণ্ড, কিডনি, হাড়—যা কিছু দানযোগ্য, তা যেন অন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত হয়। তবে তিনি অনুরোধ করেন—যে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাবে, সে যেন কখনো রেহানের নাম না জানে। তিনি কোনো কবর, কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ফুলের আয়োজনও চান না। এমনকি মা-ও যেন তার কবরের পাশে শোক নিয়ে না যান-এই অনুরোধও করেন। তিনি মাকে বলেন, সমস্ত দুঃখ বাতাসে ছেড়ে দিয়ে নতুন করে জীবনকে গ্রহণ করতে।
চিঠির শেষ অংশে রেহানে দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে সৃষ্টিকর্তার আদালতে সত্যের বিচার হবেই। তিনি লিখেন—সেই চূড়ান্ত বিচারের দিনে তিনি ও তার মা দাঁড়াবেন অভিযোগকারীর আসনে, আর যারা তাকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে তারা দাঁড়াবে আসামির কাঠগড়ায়। মৃত্যুর আগে তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল—শেষ মুহূর্তে মায়ের বুকের কাছে থাকা। আর তার শেষ বাক্য—
“মা, তোমাকে আমি খুব, খুব ভালোবাসি।”
এই বাক্যেই মিশে আছে একসঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা ও নিখাদ স্নেহ।

২৫ অক্টোবর ২০১৪, ভোরের কিছু পর রেহানে জাবারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
আজও তার মৃত্যু মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক শোকাবহ অধ্যায়।আর তার লেখা সেই চিঠি আজও বেঁচে আছে সত্যের পক্ষের সওয়াল হিসেবে-অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে, নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হয়ে।

 

শিশুকে বেশি কোলে রাখা উচিত নাকি উচিত নয়?

নবজাতক বা কয়েক মাসের শিশুকে অনেক সময়ই দেখা যায় শুধু মায়ের কোলেই থাকতে চাইছে, একটু দূরে রাখলেই কান্না শুরু করে। তখন অনেকেই বলেন – এভাবে কোলে নিলে তো শিশু অভ্যাস করে ফেলবে, আর কারও কাছে যেতে চাইবে না।

কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, জীবনের প্রথম কয়েক মাসে শিশুর এই আচরণ একেবারেই স্বাভাবিক। বরং এই সময় বাবা-মায়ের স্পর্শ, কণ্ঠ ও উপস্থিতিই শিশুর নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর প্রথম মাসগুলো: নিরাপত্তার অনুভূতি কেন গুরুত্বপূর্ণ

জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুত বিকশিত হয়। এই সময়েই সে ধীরে ধীরে চারপাশের পৃথিবীকে চিনতে শেখে এবং নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি গড়ে উঠতে শুরু করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬–৭ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুরা নিজের অস্তিত্ব ও মায়ের অস্তিত্বকে পুরোপুরি আলাদা করে বুঝতে পারে না। তাই মা বা যত্নশীল মানুষের কাছাকাছি থাকলেই তারা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Center on the Developing Child–এর মতে, অভিভাবকের দ্রুত সাড়া দেওয়া, যত্ন নেওয়া এবং স্নেহপূর্ণ আচরণ শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুর কান্নার জবাব দেওয়া কেন জরুরি

শিশুর জন্য কান্নাই মূলত যোগাযোগের ভাষা। ক্ষুধা, অস্বস্তি, ভয় বা একাকিত্ব—সবকিছুর প্রকাশ সে কান্নার মাধ্যমেই করে। তাই শিশুর কান্না শুনে তাকে কোলে নেওয়া, খাওয়ানো বা সান্ত্বনা দেওয়া তাকে শেখায় যে তার প্রয়োজনগুলোর গুরুত্ব আছে।

American Academy of Pediatrics বলছে, দ্রুত ও স্নেহপূর্ণ প্রতিক্রিয়া শিশুর মধ্যে “নিরাপদ সংযুক্তি” বা secure attachment গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই সম্পর্ক শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বেশি আদর করলে কি শিশু নষ্ট হয়ে যায়?

অনেকের ধারণা, বেশি কোলে নেওয়া বা কান্না শুনেই সাড়া দিলে শিশু নষ্ট হয়ে যায়। তবে গবেষণা ভিন্ন কথা বলছে। জীবনের প্রথম বছরগুলোতে শিশুকে অতিরিক্ত আদর করে “নষ্ট” করে ফেলার আশঙ্কা খুবই কম।

বরং নিয়মিত স্নেহ, স্পর্শ এবং যত্ন শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–ও বলছে, শিশুর সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য স্নেহপূর্ণ ও সাড়া-দেওয়ার পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি

শিশুকে কোলে নেওয়া বা তার কান্নার জবাব দেওয়া শুধু মুহূর্তের সান্ত্বনা নয়—এটি ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। ছোটবেলায় যে শিশু নিরাপদ ও ভালোবাসায় ঘেরা পরিবেশে বড় হয়, সে বড় হয়ে নতুন মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।

তাই শিশু বারবার কোলে আসতে চাইলে সেটিকে অভ্যাস বা খেয়াল নয়, বরং তার নিরাপত্তা খোঁজার স্বাভাবিক চেষ্টা হিসেবেই দেখা উচিত।

 

প্রবীণের সঙ্গে তরুণের বন্ধুত্ব কেন জরুরি?

সমাজে সাধারণত দেখা যায়—তরুণরা নিজেদের জগতে ব্যস্ত, আর প্রবীণরা ধীরে ধীরে একাকিত্বে ডুবে যান। অথচ গবেষণা ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বলছে, প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বন্ধুত্ব সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার এক সুন্দর সেতুবন্ধন।

১. অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনের মিলন

প্রবীণরা জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন। তাদের কাছে রয়েছে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার—ভুল-শুদ্ধ সিদ্ধান্ত, সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প। অন্যদিকে তরুণরা নতুন চিন্তা, উদ্যম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে আসে। এই দুই শক্তি একত্র হলে নতুন ধারণা ও বাস্তব জ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে।

২. একাকিত্ব কমায়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্বে ভোগেন। তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তাদের জীবনে নতুন প্রাণ এনে দেয়। গল্প, স্মৃতি ও সময় ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা আবার সামাজিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

৩. তরুণদের জন্য জীবনজ্ঞান

তরুণদের জীবনে সিদ্ধান্তের মুহূর্ত অনেক। শিক্ষা, পেশা, সম্পর্ক—সবকিছু নিয়ে দ্বিধা থাকে। প্রবীণ বন্ধুদের পরামর্শ অনেক সময় পথ দেখায়। তারা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তরুণদের ভুল থেকে বাঁচতে সাহায্য করতে পারেন।

৪. পারস্পরিক সহমর্মিতা তৈরি করে

প্রজন্মের পার্থক্যের কারণে অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। বন্ধুত্ব সেই দূরত্ব কমায়। তরুণরা প্রবীণদের অনুভূতি বুঝতে শেখে, আর প্রবীণরা নতুন প্রজন্মের ভাবনা ও জীবনধারা সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।

৫. সমাজে মূল্যবোধ গড়ে তোলে

প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ থাকলে সমাজে সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান বাড়ে। প্রবীণরা ইতিহাস ও মূল্যবোধের ধারক, আর তরুণরা ভবিষ্যতের নির্মাতা। তাদের বন্ধুত্ব সমাজকে আরও সুস্থ ও মানবিক করে তোলে।

প্রবীণ ও তরুণের বন্ধুত্ব আসলে সময়ের দুই প্রান্তকে একত্র করে। এতে যেমন প্রবীণরা নতুন উদ্যম পান, তেমনি তরুণরা পান জীবনের গভীর শিক্ষা। তাই প্রজন্মের এই বন্ধন শুধু ব্যক্তিগত নয়—একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্যও অপরিহার্য।

(রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে)

 

ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন থেকে মুসলিম নারী সামিরা মুনশির পদত্যাগ

ক্যাথলিক কমিশনারকে সরানোর প্রতিবাদ, মুসলিমবিদ্বেষের অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর প্রশাসনের অধীন গঠিত ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশনের পরামর্শক বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছেন মুসলিম নারী সামিরা মুনশি। ক্যাথলিক কমিশনার ক্যারি প্রেজিয়ান-বোলারকে অপসারণের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সামিরার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস না করার অবস্থান থেকেই তিনি এ পদ ছেড়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁর পদত্যাগপত্রটি দেখতে পেয়েছে Middle East Eye।

ক্যাথলিক কমিশনার অপসারণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক

ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ দেন সরাসরি প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি কমিশনের সদস্য ক্যারি প্রেজিয়ান-বোলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে সমালোচনা করা এবং জায়নবাদবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে কমিশনের এক বৈঠকে তীব্র বাকবিতণ্ডার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত আসে। সেই বৈঠকে প্রেজিয়ান-বোলার জোর দিয়ে বলেছিলেন, ক্যাথলিক বিশ্বাস এবং জায়নবাদ একসঙ্গে চলতে পারে না।

কমিশনের বক্তব্য

মার্কিন বিচার বিভাগের অধীনে গঠিত এই কমিশনের চেয়ারম্যান হলেন Dan Patrick। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, কোনো কমিশনার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুযায়ী শুনানি পরিচালনা করতে পারেন না। একই পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন যে প্রেজিয়ান-বোলারকে প্যানেল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রেজিয়ান-বোলার এ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাঁকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টেরই রয়েছে।

পদত্যাগপত্রে সামিরার অভিযোগ

সামিরা মুনশি তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছেন,
“যদি যুক্তরাষ্ট্রে আমরা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী স্বাধীনভাবে চলতে না পারি এবং অন্যদের অসন্তোষের মধ্যেও তা বজায় রাখতে না পারি, তবে আর কোথায় তা সম্ভব?”

তিনি কমিশনের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মুসলিমদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন আচরণ এবং ধর্মকে উপহাস করার প্রবণতার অভিযোগও তুলেছেন।

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে সাক্ষ্যের পর থেকেই ‘কোণঠাসা’

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কমিশনের সামনে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে সাক্ষ্য দেওয়ার পর থেকেই তাঁকে উপেক্ষা করা শুরু হয় বলে দাবি করেন সামিরা। তিনি বলেন, এরপর থেকে কমিশনের শুনানির আগে তাঁকে আর সাক্ষীর তালিকা দেওয়া হয়নি।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি ওই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

সামিরা বলেন, “আমি জানি না এটি কাকতালীয় ঘটনা, নাকি যোগাযোগের ভুল। তবে মনে হয়েছে, আমার দেওয়া সাক্ষ্যই আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

দুই নারীর বন্ধুত্ব

এই বিতর্কের মধ্যেই ক্যারি প্রেজিয়ান-বোলারই প্রথম সামিরার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

সামিরা বলেন, “ক্যারি সত্যিই অসাধারণ একজন মানুষ। রক্ষণশীল শিবিরে যেটা খুব কম দেখি—তিনি মুসলিমদের প্রতি আন্তরিক সম্মান দেখান।”

সম্প্রতি প্রেজিয়ান-বোলার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলারও সমালোচনা করেছিলেন। সামিরা মুনশি জানান, এই ঘটনাও তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

 

নিরাপদ সমাজ গড়তে নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার

৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটা হলো-দিবস পালনের বাইরে আমরা নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে কতটা এগিয়েছি?
স্লোগান, আলোচনা বা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে নারীর ক্ষমতায়নের কথা যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন এখনো ততটা দৃশ্যমান নয়। ফলে ‘নারী দিবস’ কেবল আনুষ্ঠানিকতার নাম মাত্র।

এ বছরের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য- “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।”
প্রতিপাদ্যটি মূলত একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: ভবিষ্যতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে চাইলে আজই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুধু আলোচনা, প্রতিশ্রুতি বা নীতিগত বক্তব্য দিয়ে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।

নারী বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় পরিবার, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু এই ভূমিকার সঙ্গে সমানভাবে জুড়ে আছে বৈষম্য, সহিংসতা ও অবহেলার দীর্ঘ বাস্তবতা। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই আমরা দেখি ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি কিংবা অনলাইন সহিংসতার খবর। আইন রয়েছে, নীতি রয়েছে, নানা কর্মসূচিও রয়েছে-তবু সমস্যাগুলো পুরোপুরি কমছে না।
এর কারণ খুব স্পষ্ট: আইন প্রণয়ন সহজ, কিন্তু আইনের বাস্তব প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন কঠিন।

 

রমজানে মেয়েদের ইবাদত—আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্যের পথ

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে প্রতিটি মুমিন তার ইবাদত-বন্দেগি বৃদ্ধি করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। পুরুষদের মতো নারীরাও রমজানের ইবাদতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরিবারের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তারা নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে এই মাসকে বরকতময় করে তোলেন।

ইসলামে নারীদের ইবাদতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। একজন নারী যদি আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করেন, তাহলে তিনিও পুরুষদের মতোই সমানভাবে সওয়াব লাভ করেন। রমজান মাসে নারীদের জন্য ইবাদতের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে, যা তাদের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথকে সহজ করে দেয়।

রমজানে নারীদের প্রধান ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাজ। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায়ের পাশাপাশি তারা নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ এবং তারাবির নামাজ আদায় করতে পারেন। অনেক নারী ঘরে বসেই তারাবির নামাজ পড়েন এবং কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে এই মাসকে আলোকিত করেন। ইসলামে নারীদের জন্য ঘরে নামাজ পড়াকে অধিক ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে, তাই তারা ঘরে থেকেই একাগ্রতার সঙ্গে ইবাদত করতে পারেন।

কোরআন তিলাওয়াত রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ এই মাসেই আল্লাহ পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। নারীরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতে পারেন এবং এর অর্থ ও ব্যাখ্যা বুঝে পড়ার চেষ্টা করতে পারেন। এতে তাদের ঈমান মজবুত হয় এবং জীবনের প্রতি একটি সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

রমজানে দোয়ার গুরুত্বও অনেক বেশি। ইফতারের সময়, সেহরির সময় এবং তাহাজ্জুদের মুহূর্তে করা দোয়া আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। তাই নারীরা নিজেদের জন্য, পরিবার ও সমগ্র উম্মাহর জন্য বেশি বেশি দোয়া করতে পারেন। দোয়া মানুষের হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ায়।

এছাড়া রমজান মাসে দান-সদকা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। অনেক নারী গোপনে দান করেন, গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করেন অথবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইফতার ভাগ করে নেন। এই ধরনের কাজ সমাজে সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। পরিবারের ভেতরেও একজন নারী তার সন্তানদের দান ও সহানুভূতির শিক্ষা দিতে পারেন, যা তাদের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নারীদের জন্য রমজানে আরেকটি বড় ইবাদত হলো ধৈর্য ধারণ করা। সংসারের নানা কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা এবং পরিবারের জন্য ইফতার ও সেহরির আয়োজন করতে গিয়ে অনেক সময় ক্লান্তি আসে। কিন্তু যদি এসব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করা হয়, তাহলে সেগুলোও ইবাদতের অংশ হয়ে যায়। ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব অনেক বেশি, তাই সৎ নিয়ত থাকলে দৈনন্দিন কাজও সওয়াবের উৎস হতে পারে।

রমজানে অনেক নারী ইসলামি বই পড়েন, ওয়াজ-মাহফিল শোনেন এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেন। এতে তাদের আধ্যাত্মিকতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা নিজেদের জীবনকে ইসলামের আলোকে সাজাতে পারেন। বর্তমান সময়ে অনলাইন মাধ্যমেও অনেক ইসলামি আলোচনা পাওয়া যায়, যা নারীদের জন্য জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তবে নারীদের জন্য একটি বিশেষ বিষয় হলো মাসিক বা হায়েজের সময়। এই সময়ে তারা নামাজ ও রোজা রাখতে পারেন না, কিন্তু তবুও তারা আল্লাহকে স্মরণ, দোয়া, জিকির, দরুদ পাঠ এবং ইসলামি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হন না। ইসলাম নারীদের স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থাকে সম্মান করে এবং তাদের জন্য সহজ বিধান নির্ধারণ করেছে।

সবশেষে বলা যায়, রমজান মাস নারীদের জন্য আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। একজন নারী যদি আন্তরিকতার সঙ্গে এই মাসকে কাজে লাগান, তাহলে তার ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং সমাজ—সবই উপকৃত হয়। তাই রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত ও ভালো কাজের মাধ্যমে অর্থবহ করে তোলা প্রত্যেক মুসলিম নারীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিকাবে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

সম্প্রতি বিএনপি নেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘নিকাব মুসলমানদের ড্রেসই নয়…। ইহুদি নারীরা যখন বেশ্যাবৃত্তি করত অথবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম করত, তখন নিকাব পরত।’ এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষ বিস্মিত ও আহত হয়েছেন। কারণ বিষয়টি কেবল একটি পোশাকের আলোচনা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় পরিচয়, নারীর মর্যাদা এবং সমাজের সাধারণ সৌজন্যবোধ। একজন নারী কী পরবেন, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তকে ‘অনৈতিকতা’ বা ‘অপরাধ’-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটি সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

প্রথমেই একটি ন্যায্য কথা বলা দরকার—অপরাধের দায় অপরাধীর, পোশাকের নয়। কোনো নারী নিকাব পরলেই তিনি সন্দেহজনক, এমন ধারণা তৈরি করা মানে লক্ষ কোটি পর্দানশীন নারীকে অবমূল্যায়ন করা। পোশাককে কেন্দ্র করে নারীকে চরিত্রগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা নারীর সম্মানবোধকে দুর্বল করে, সমাজকে অশালীন করে।

নিকাব কি মুসলিম সমাজে অচেনা কিছু?

নিকাবকে ‘মুসলমানদের ড্রেস নয়’ বলে এভাবে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার আগে ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো দেখা জরুরি। সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত আছে— ‘ইহরামরত অবস্থায় নারীরা মুখে নিকাব এবং হাতে হাতমোজা পরিধান করবে না।’ (বুখারি : ১৮৩৮)। এই হাদিস খুব স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত দেয়। ইহরাম হলো বিশেষ ইবাদতের অবস্থা; সেখানে কিছু পোশাক বা আচরণে আলাদা বিধান থাকে। কিন্তু যেটি লক্ষণীয়—নিকাব ও হাতমোজা ইহরামের সময়ে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। আর একটি জিনিস সমাজে পরিচিত না হলে, সাধারণভাবে ব্যবহৃত না হলে, তার ব্যাপারে আলাদা নিষেধাজ্ঞা আসার কথাও নয়। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাসুল (সা.)-এর যুগে বহু নারী নিকাব পরতেন, হাতমোজাও ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, নিকাব মুসলিম সমাজে সম্পূর্ণ অচেনা বা বহিরাগত কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামের প্রথম যুগের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এটি পরিচিতভাবে যুক্ত ছিল।

এছাড়া উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর পর্দা ও সংযমের বিষয়েও হাদিসে নানা বর্ণনা আছে। ইসলামি জীবনবোধে পর্দা ছিল শালীনতার স্বাভাবিক সংস্কৃতি। তাই নিকাবকে অসম্মান করার মধ্যে ইতিহাস-বিচ্ছিন্নতা যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মীয় অনুভূতিতে অপ্রয়োজনীয় আঘাত।

নিকাব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মর্যাদা নষ্ট করা কাম্য নয়

নিকাব ফরজ কি না, ফিকহি আলোচনায় মতভেদ রয়েছে। কেউ একে বাধ্যতামূলক বলেন, কেউ উত্তম বলেন, কেউ সমাজভেদে ব্যাখ্যা করেন। তবে যা-ই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—পর্দানশীন নারীকে অপমান করার সুযোগ এতে তৈরি হয় না। ইসলামি জ্ঞানধারায় বহু প্রসিদ্ধ আলেম নিকাবকে অন্তত অধিক সংযমপূর্ণ ও নিরাপদ পথ হিসেবে দেখেছেন। কেউ নিকাব বেছে নিলে তা হতে পারে তার তাকওয়া, সততা, নিরাপত্তাচেতনা কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত। তাকে বিদ্রুপ করা নয়, বরং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা সুশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আবশ্যক।

‘ইহুদি নারী’ প্রসঙ্গ এনে নিকাবকে কলুষিত করা অশোভন সাধারণীকরণ

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো তিনি নিকাবকে ‘বেশ্যাবৃত্তি’ বা ‘নিষিদ্ধ কার্যক্রম’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি নিছক ভুল তথ্য নয়; এটি সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ এতে নিকাবধারী নারীর প্রতি একটি অপমানজনক মানসিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যেন নিকাব মানেই সন্দেহজনক, গুপ্ত অপরাধ; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঠাকুরের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ স্বকপোলকল্পিত। ইতিহাসের কোথাও ইহুদি নারীদের অন্যায় করে নিকাব করার কথা বর্ণিত হয়নি। বর্তমান সময়ে কোনো কোনো অসতী নারীর চিত্রকে তিনি অতীত ইতিহাসে প্রক্ষিপ্ত করেছেন।

সমাজে অপরাধ ঘটতে পারে, এটা সত্য। অপরাধ দমন হবে আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হবে, এটিই ন্যায়। কিন্তু একটি পোশাককে অপরাধের প্রতীক বানিয়ে দেওয়া মানে ধর্মীয় নারীদের গণহারে সন্দেহের আসামি বানিয়ে দেওয়া। এটি ন্যায্যতা নয়, এটি অপবাদ ও অন্যায়Ñঅসভ্য মানসিকতা।

যদি কেউ নিকাব পরে অপরাধ করে, সেটি ব্যক্তির অপরাধ। যেমন কেউ শাড়ি পরে অপরাধ করলে শাড়ি অপরাধের পোশাক হয়ে যায় না; কেউ স্যুট পরে দুর্নীতি করলে স্যুটকে দোষী করা যায় না। ঠিক তেমনি নিকাবকে কুৎসিত ইঙ্গিতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

নারীর পোশাক : অধিকার ও স্বাধীনতার অংশ

বাংলাদেশে বহু নারী নিকাব করেন, বহু নারী হিজাব করেন। কেউ শাড়ি-ওড়নায়ও পর্দা রক্ষা করেন। নারী কী পরবেন—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একান্তভাবে নারীরই। রাষ্ট্র নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে; সেই স্বাধীনতার স্বাভাবিক অংশ হলো পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা। কাজেই কারো নিকাব পরাকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অপরাধমূলক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। বিশেষত নতুন বাংলাদেশের নতুন পরিবেশে তা অকল্পনীয়।

এছাড়া একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, অনেক নারী নিকাব পরেন নিজেদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও আত্মমর্যাদার কারণে। তারা চান মানুষ তাদের শরীর নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব দেখুক। হিজাব-নিকাব তাদের কাছে কোনো লজ্জা নয়; বরং পর্দানশিন নারীর কাছে তা সম্মান ও সংযমের প্রতীক।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন মুসলিম নারী যদি পরিপূর্ণ পর্দা পালনে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি চেহারা ঢেকে রাখতে বাধ্য। এটি তার ধর্মীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। রাজনীতি থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু রাজনৈতিক কথাবার্তায় ধর্মীয় পোশাককে টেনে এনে নারীর সম্মানকে আঘাত করা চরম অসুস্থতার লক্ষণ। মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে যে কটূক্তি ও অসম্মানজনক ইঙ্গিত আছে, তা সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার দাবি। অন্তত এটুকু বোঝা জরুরি—নিকাব কোনো অপরাধের প্রতীক নয়, এটি বহু নারীর বিশ্বাস ও শালীনতার একটি পরিচিত প্রকাশ।

আমরা চাই, সমাজে বহুমত বহু চিন্তা থাকবে, কিন্তু সৌজন্য ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে; রাজনীতি থাকবে, কিন্তু অন্যায় আক্রমণ থাকবে না। নারীর পোশাক নিয়ে উপহাস নয়, বরং নারীর মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো সভ্যতার মানদণ্ড।

 

ফিরে দেখাঃ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৩০-৩১ সালের লবণ সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ লবণ আইনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো গণ-আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং সারা ভারতে বিদেশি পণ্য বর্জন, লবণ সংগ্রহ ও পুলিশি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই আন্দোলনের ইতিহাসে নারীদের অবদান আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া একটি পুরোনো ছবি অ্যালবাম সেই বিস্মৃত অধ্যায়ের নতুন আলোকপাত করেছে।

দুই দশক আগে লন্ডনের নিলামে ওঠা ধূসর রঙের ছোট অ্যালবামটি দীর্ঘসময় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল দিল্লির আলকাজি ফাউন্ডেশনে। অ্যালবামের মলাটে ছিল ‘ওল্ড কংগ্রেস পার্টি—কে এল নার্সি’ লেখা, কিন্তু নামটি কার সে পরিচয় জানা ছিল না। ছবিগুলোর নিচে টাইপরাইটারে লেখা ক্যাপশনগুলোতেও ছিল প্রচুর ভুল। গবেষকেরা অনেক দিন এ অ্যালবামকে তেমন গুরুত্ব দেননি। অবশেষে ২০১৯ সালে ফাউন্ডেশনের কিউরেটর ও যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক অ্যালবামের ছবিগুলো বিশ্লেষণ শুরু করলে তাঁরা বিস্মিত হন—এই বহু পুরোনো অ্যালবামেই লুকিয়ে ছিল লবণ সত্যাগ্রহে নারীদের নেতৃত্বের অমূল্য প্রমাণ।

অ্যালবামের ছবিগুলোতে ধরা আছে ১৯৩০ সালের বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) উত্তাল রাস্তাঘাট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মুহূর্ত, আহত স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধার এবং সর্বোপরি নারী নেতৃত্বের দৃশ্য। গবেষক সুমাথি রামাস্বামীর ভাষায়—“ছবিগুলো দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীরা কতটা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের ময়দানে ছিলেন।”

 লীলাবতী মুনশি নামে গুজরাটের সাহসী কংগ্রেস নেত্রীকে দেখা যায় পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ দিচ্ছেন সরকারি লবণ কেন্দ্র দখলে। আরেক ছবিতে তিনি ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে দৃঢ় ভঙ্গিতে বয়কট কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। চারপাশে পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও তাঁর আত্মবিশ্বাসে ছিল নারীর নতুন শক্তি ও রাজনীতিতে নতুন পরিচয়।

অ্যালবামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘দেশ সেবিকা’ বাহিনীর ছবি—যা ছিল সম্পূর্ণ নারীদের নিয়ে গঠিত। তাঁরা পুলিশের লাঠিচার্জ ঠেকিয়ে পতাকা রক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, যা তখনকার সামাজিক মানসিকতার জন্য ছিল অভাবনীয়। একই সঙ্গে চৌপাট্টি সৈকতে হাজারো নারী সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন-লবণ সত্যাগ্রহকে জন-আন্দোলনে রূপ দিতে এই নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

 আরও উল্লেখযোগ্য হলো—অনেক নারী তাঁদের কন্যাদের হাত ধরে আন্দোলনে নিয়ে এসেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

ছবিগুলোর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক মিছিলে নারীরা সামনের সারিতে, আর রাস্তার দুই পাশে পুরুষেরা দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন। এই উল্টোচিত্র সমসাময়িক সমাজে নারীর অবস্থান বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। গবেষকেরা বলেন, শুধু নেতাদের ডাকে নয়—বোম্বের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সাধারণ নারী, আন্দোলনকে বড় রূপ দিয়েছিলেন। তাঁদের মিছিল, পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো, গ্রেপ্তার হওয়া ও বয়কটের প্রচারণা—সবই ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এ অ্যালবামে শুধু আন্দোলনের ছবি নয়, তখনকার বোম্বের নগরজীবনেরও চিত্র ফুটে উঠেছে। শহরের রাস্তাঘাট, বাজার, সমুদ্রতট—সব মিলিয়ে এটি প্রায় এক শতাব্দী আগের ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যবান দলিল হয়ে উঠেছে।

 বর্তমানে ছবিগুলো প্রকাশিত হয়েছে “ফটোগ্রাফিং সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স” নামে একটি বইয়ে, যা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে লবণ সত্যাগ্রহের বিস্মৃত নারীনেত্রীদের।

সর্বোপরি, এই অ্যালবাম প্রমাণ করে—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু পুরুষদের নেতৃত্বে চলে এমন ধারণা ভুল। লবণ সত্যাগ্রহে নারীরা ছিলেন সমানভাবে নেতৃত্বের আসনে, কখনো কখনো পুরুষদেরও পেছনে ফেলে। তাঁদের দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও ত্যাগ আজও ইতিহাসের পাতায় অনিবার্য হয়ে আছে, আর এই ছবিগুলো সেই সংগ্রামী নারীদের প্রতি প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিচ্ছে।






































 

অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষক নুসরাতের সাত বছরের লড়াই

বর্তমানে নুসরাত বেতন অ্যাকাউন্ট সচল করা ও জব্দ করা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। 

দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করার কারণে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কারাবরণ, চাকরিচ্যুতি ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শিকার হন, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়া। প্রায় সাত বছর পর অবশেষে তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান এবং পুনরায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ ফিরে পান।

২০১৮ সালের জুলাই–আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় নুসরাত ফেসবুকে অন্যের একটি লেখা শেয়ার করেন। ওই শেয়ারের জেরে ২০১৮ সালের ৪ আগস্ট গভীর রাতে তাঁকে আটক করে কলাপাড়া থানায় নেওয়া হয়। পরদিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

গ্রেপ্তারের সময় নুসরাত সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁকে প্রায় ১২ ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয় এবং পরে ১৪ দিন কারাগারে থাকতে হয়। একই সময় তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যা তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে গভীর সংকট তৈরি করে।

কারাগারে থাকাকালীন নুসরাতকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়েছে বলে তিনি জানান। বড় পেট নিয়ে মেঝেতে পাতলা কম্বলের ওপর ঘুমানো, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং মানসিক চাপে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। জামিন শুনানির সময়ও রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক অপবাদ ও ভয় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী করে রাখে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন, যা মানসিকভাবে তাঁকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক অপবাদ ও ভয় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী করে রাখে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন, যা মানসিকভাবে তাঁকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৪ সালের ২২ মে হাইকোর্ট মামলাটি বাতিল করেন। আদালত বলেন, মামলার চার্জশিট দাখিলের সময় সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর ছিল না, ফলে এটি আইনের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয়।

এরপর গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আদেশে নুসরাতের সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়। বরখাস্তকালীন সময় চাকরিকাল হিসেবে গণ্য হবে এবং বকেয়া বেতন–ভাতাও তিনি পাবেন বলে জানানো হয়। ২৯ ডিসেম্বর তিনি পুনরায় কর্মস্থলে যোগ দেন।

নুসরাতের গর্ভে থাকা সন্তানটির বয়স এখন সাত বছরের বেশি। সেই সন্তান আজ মায়ের কাছে জানতে চায়, তাকে পেটে নিয়ে কেন মাকে জেলে যেতে হয়েছিল। এই প্রশ্ন নুসরাতকে এখনো মানসিকভাবে নাড়া দেয়।

মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, নুসরাতের সঙ্গে যা ঘটেছে তা গুরুতর অন্যায়। এ ঘটনার পূর্ণ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের জবাবদিহির পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বর্তমানে নুসরাত বেতন অ্যাকাউন্ট সচল করা ও জব্দ করা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। 

দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে:আইন ও ইসলাম

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা চায়ের আড্ডায় অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো-প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে।

 বিষয়টি নিছক একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় আইন এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের অধিকার খর্ব করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, আবার আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে অনেক নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু ইসলামি শরীয়ত, বাংলাদেশের আইন (১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ) এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে কিছু বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে যায়,তারমধ্যে-

*​দ্বিতীয় বিয়ের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও শর্তাবলি*

​ইসলামে পুরুষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি রয়েছে, তবে তা শর্তহীন বা অবাধ নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বহুবিবাহের অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু এর সাথে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘আদল’-এর কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:…আর যদি তোমরা ভয় কর যে স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার রক্ষা করতে পারবে না, তবে মাত্র একটি বিয়েই কর।”

​এখানে স্পষ্ট যে, একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও, যদি স্বামী মনে করেন যে তিনি স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ, ভরণপোষণ এবং সময় বন্টনে সমতা বজায় রাখতে পারবেন না, তবে তার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা নিষিদ্ধ বা হারাম।

আবার ফিকহ বা শরীয়ত অনুযায়ী- দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, অনুমতি না নিলে বিয়ে ‘বাতিল’ বা ‘অশুদ্ধ’ হবে না। তবে, ইসলামে পারিবারিক শান্তি এবং পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ভীষণভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

স্বামী যদি গোপনে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে তা জানাজানি হয়, তবে সংসারে যে অশান্তি ও বিশ্বাসের ফাটল তৈরি হয়, তা ইসলাম সমর্থন করে না।ইসলামে এতিমদের রক্ষণাবেক্ষণ, স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা বন্ধ্যত্বের মতো যৌক্তিক কারণে বহুবিবাহের পথ খোলা রাখা হয়েছে। 

কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে নিছক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য এই সুযোগের অপব্যবহার করা হচ্ছে, যা শরীয়তের মূল লক্ষ্যের পরিপন্থী।

*​বাংলাদেশের আইন: অনুমতি ছাড়া বিয়ে ও শাস্তি*

​বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে এটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে।

​১. সালিশি পরিষদের অনুমতি (ধারা ৬):

আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ বলবৎ থাকাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই ‘সালিশি পরিষদ’-এর কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। এই পরিষদে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়র এবং প্রথম স্ত্রীর প্রতিনিধি থাকবেন।২. অনুমতির যৌক্তিক কারণ:

শুধুমাত্র আবেদন করলেই অনুমতি মিলবে না। সালিশি পরিষদ কিছু নির্দিষ্ট কারণ বিবেচনা করে অনুমতি দিতে পারে, যেমন: বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব। শারীরিক অক্ষমতা বা দুরারোগ্য ব্যাধি দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের অযোগ্যতা বা মানসিকভাবে অসুস্থতা।

​৩. শাস্তি ও জরিমানা:যদি কোনো ব্যক্তি সালিশি পরিষদের (এবং পরোক্ষভাবে প্রথম স্ত্রীর) অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। এক্ষেত্রে শাস্তি হলো:

​এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা ​উভয় দণ্ড।

​৪. বিয়ের বৈধতা ও দেনমোহর:এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্যাঁচ বা সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে স্বামী শাস্তি পাবেন ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েটি ‘অবৈধ’ বা ‘বাতিল’ হবে না। অর্থাৎ, দ্বিতীয় স্ত্রী তার স্ত্রীর মর্যাদা এবং অধিকার পাবেন। তবে, অনুমতি না নেওয়ার কারণে স্বামী প্রথম স্ত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ দেনমোহর (মোজ্জল বা মুয়াজ্জল যা-ই হোক) পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।

*​সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট: বাস্তবতা কী?*

​আইন ও ধর্মের বাইরে গিয়ে যদি আমরা বাংলাদেশের বর্তমান সমাজের দিকে তাকাই, তবে চিত্রটি বেশ জটিল। ​১. আইনের ফাঁকফোকর ও প্রয়োগহীনতা: গ্রামাঞ্চলে এবং অনেক ক্ষেত্রে শহরেও, সালিশি পরিষদের তোয়াক্কা না করেই অনেকে দ্বিতীয় বিয়ে করছেন। ভুয়া তালাকনামা তৈরি করা বা প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া হয়েছে মর্মে মিথ্যা হলফনামা দেওয়ার প্রবণতাও প্রচুর। নারীরা অধিকাংশ সময় অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা এবং ‘লজ্জা’র ভয়ে মামলা করতে চান না।

​২. অর্থনৈতিক সংকট: মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে স্বামী যখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রথম সংসারের সন্তানরা অবহেলায় বেড়ে ওঠে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং অনেক সময় বিপথগামী হয়।৩. ‘সুন্নাহ’র অপব্যাখ্যা:

সমাজে একটি শ্রেণি রয়েছে যারা দ্বিতীয় বিয়েকে শুধুমাত্র ‘সুন্নাহ’ বা ধর্মীয় অধিকার হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু সেই সুন্নাহ পালনের জন্য যে আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক পরিপক্কতা প্রয়োজন, তা তাদের থাকে না। এটি ধর্মের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।

*​মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কেমন* ​অনুমতিহীন দ্বিতীয় বিয়ে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।

 দীর্ঘদিনের সংসার জীবনের পর স্বামীর গোপন বিয়ে একজন নারীর আত্মবিশ্বাস চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এটি তার মধ্যে গভীর বিষণ্নতা (Depression) তৈরি করে।

সতিন বা দ্বিতীয় স্ত্রী আসার পর সংসারে ঝগড়া-বিবাদ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় প্রথম স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।বেশিরভাগ সময়ই​ বাবার দ্বিতীয় বিয়ে সন্তানদের মনে বাবার প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ তৈরি করে। পারিবারিক ভাঙন তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

*​আইন বনাম ধর্ম* অনেকে প্রশ্ন করেন, “ইসলামে যদি অনুমতি না লাগে, তবে রাষ্ট্র কেন বাধা দিচ্ছে?”

​এখানে মূল বিষয়টি হলো ‘মাসলাহা’ বা জনকল্যাণ। ইসলামি রাষ্ট্রে বা মুসলিম সমাজে যখন কোনো ধর্মীয় অনুমতির ব্যাপক অপব্যবহার হয় এবং তা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্র সেই অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ (Restrict) করতে পারে।

​১৯৬১ সালের আইনটি তৈরি করা হয়েছিল নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, যাতে কোনো পুরুষ খেয়ালখুশি মতো বিয়ে করে নারীদের রাস্তায় বসিয়ে দিতে না পারে। তাই, রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করাও একজন নাগরিক হিসেবে মুসলমানের দায়িত্ব, যতক্ষণ না তা সরাসরি কুফরির দিকে নিয়ে যায়। যেহেতু এই আইনটি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি, তাই এটি পরোক্ষভাবে ইসলামি চেতনারই পরিপূরক।চলমান ইস্যু ‘​প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে’ -বিষয়টি কেবল আইনি বা ধর্মীয় তর্কের নয়, এটি মানবিকতারও প্রশ্ন। ইসলামে যেমন বহুবিবাহের অনুমতি আছে, তেমনি ন্যায়বিচারের কঠোর হুঁশিয়ারিও আছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আইন পুরুষকে জেল-জরিমানার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের বোঝা উচিত, বিয়ে মানে কেবল যৌন সম্পর্ক বা বংশবৃদ্ধি নয়; এটি একটি গুরুদায়িত্ব। গোপন বিয়ে বা জোরপূর্বক অনুমতি নিয়ে বিয়ে কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আইনের কঠোর প্রয়োগেরপাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক ব্যাখ্যাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।

পরিবারের শান্তি বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।

ব্যাংকে নারীবান্ধব ওয়াশরুম বাধ্যতামূলক করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ও গ্রাহকসেবাকে আরও নারীবান্ধব করতে সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে স্বাস্থ্যসম্মত নারীবান্ধব ওয়াশরুম নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দেশনা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়সহ দেশের সব শাখা ও উপশাখায় কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত সপ্তাহে জারি করা এ নির্দেশনায় জানিয়েছে, ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ব্যাংকিং সেবা নিতে আসা নারীদের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম থাকা আবশ্যক। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারীবান্ধব ওয়াশরুমের অভাবে অনেক নারী কর্মকর্তা ও নারী গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, যা কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, তফসিলভুক্ত সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয় এবং সব শাখা–উপশাখায় নারীবান্ধব ওয়াশরুম নির্মাণ নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি বিদ্যমান ওয়াশরুমের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পর্যাপ্ত স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১–এর ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে নারীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সম্মানজনক কর্ম ও সেবা পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

গ্রেফতার হলেন মাদুরোর স্ত্রী,মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন*

গ্রেফতার হলেন মাদুরোর স্ত্রী,মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর স্ত্রী, ৬৯ বছর বয়সী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করে, আহত অবস্থায় আদালতে হাজির করার ঘটনা- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর আইনগত ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 ঘটনাটি শুধু একটি গ্রেপ্তার অভিযান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের সীমারেখা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে । অভিযানের সময় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন।

পরে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে হাজিরির সময় তাঁর মুখ ও চোখে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। 

তাঁর আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, বয়স ও শারীরিক অবস্থার তুলনায় তাঁর ওপর অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বিচারক তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের আইনি যুক্তি হলো, সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সংগঠিত অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে আগে থেকেই ফেডারেল ইন্ডিক্টমেন্ট রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব অপরাধ সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তারা এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল জুরিসডিকশনের আওতায় মামলা পরিচালনার অধিকার রাখে। অভিযানের সময় আহত হওয়ার ঘটনাকে তারা “পরিস্থিতিগত দুর্ঘটনা” হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

অন্যদিকে, ফ্লোরেসের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞরা এই গ্রেপ্তারের বৈধতা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের মতে, ভেনেজুয়েলার সরকারের সম্মতি কিংবা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া সে দেশের ভেতরে অভিযান পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে স্পষ্ট সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের শামিল।

এটি কোনো নিয়মিত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অপহরণের বৈশিষ্ট্য বহন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতরভাবে বিতর্কিত।

আহত হওয়ার বিষয়টি মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তির শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।

একজন প্রবীণ নারীর মুখ ও চোখে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন থাকা গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রশ্ন তোলে। এ অবস্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যকার সংঘাতকে আবারও স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো একভাবে বিষয়টিকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপন করলেও আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে তা একইভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

পাশাপাশি, নারী ও মানবাধিকার ইস্যুতে বৈশ্বিক নীরবতা তথাকথিত “নির্বাচিত মানবাধিকার” বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

সব মিলিয়ে, সিলিয়া ফ্লোরেসের গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার ঘটনা এখন একটি প্রতীকী মামলায় রূপ নিয়েছে। এটি কেবল আদালতের রায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতা, আইন ও মানবাধিকারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচিত হতে থাকবে।

জকসুতে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দেওয়া সেই শান্তা জয়ী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব ও শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী শান্তা আক্তার। ভোটের দিন ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে হেনস্তা করা হলেও শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সমর্থনে তিনি বিজয়ী হন।

ভোটগ্রহণের দিন শান্তা আক্তার মাইক হাতে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিলে ছাত্রদল সমর্থিত নেত্রী খাদিজাতুল কুবরা তার হাত থেকে মাইক কেড়ে নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেদিনই ক্যাম্পাসে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই ঘটনাটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন।

সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শান্তা আক্তার রেকর্ড সংখ্যক ৩ হাজার ৫৫৪ ভোট পেয়ে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে জয়লাভ করেন।
বুধবার (৮ জানুয়ারি) মধ্যরাতে জকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন।
এ সময় তিনি আবারও ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিলে পুরো হলরুম মুখরিত হয়ে ওঠে।

জয়ী ঘোষণার পর শান্তা আক্তার আবেগাপ্লুত হয়ে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন,
“এই জয় শুধু আমার ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি শহীদ ওসমান হাদি ভাইয়ের বিশ্বাস, স্বপ্ন ও শেষ ইচ্ছার প্রতিফলন। নির্বাচনের আগে হাদি ভাই আমাকে ফোন করে বলেছিলেন—‘শান্তা, জিতে আইতে হবে।’ সেই কথাই আমার লড়াইয়ের প্রধান প্রেরণা ছিল। এখন আমি কেবল তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে চাই—ভাই, আমি জিতে এসেছি।”

তিনি আরও জানান, নির্বাচনের ঠিক আগে ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি ভোট চাইতে পারেননি। তবুও শিক্ষার্থীরা তার আদর্শ ও বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে ভোট দিয়েছেন।

জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শান্তা আক্তার শহীদ হাদির স্মরণে মুড়ি ও বাতাসা বিতরণ করেন।

শান্তা আক্তার জয়ের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন,
“এই জয় আমাকে আরও দায়িত্বশীল করেছে। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করতে চাই। বিভাজন নয়, ঐক্যই হবে আমাদের পথ।”

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, কারিগরি জটিলতা ও দীর্ঘ বিরতি সত্ত্বেও সব পক্ষের উপস্থিতিতে ওএমআর মেশিন ও হাতে গণনার সমন্বয়ে স্বচ্ছভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে।

‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিয়ে যে শান্তা আক্তার একদিন হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই স্লোগানই হয়ে উঠল তার বিজয়ের প্রতীক আর জকসু রাজনীতিতে এক আলোচিত অধ্যায়।

খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন রাজনীতিক

ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী টিপু সুলতান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) এ তৃণমূল কর্মীর হাতের সেই প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমি বেগম খালেদা জিয়াকে নিজের কিডনি দান করতে চাই।’

১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে টিপু সুলতানের সেই ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৩ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে উদ্বেগ বিরাজ করছিল। এরপর থেকে টিপু হাসপাতালের ফটকের উল্টো দিকের ফুটপাতেই দিন কাটাচ্ছিলেন; প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নেত্রীর সুস্থতার খবর না পাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে নড়বেন না।

আল-জাজিরাকে বিএনপির এই কর্মী বলেছিলেন, ‘তিনি আমার মায়ের মতো। গণতন্ত্রের জন্য তিনি সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। আমার একটাই প্রার্থনা, সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁকে আগামী নির্বাচন দেখার সুযোগ দেন।’ তিনি মূলত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের কথা বলছিলেন।

কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ৭৯ বছর বয়সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া। ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি জানায়, ‘আমাদের প্রিয় জাতীয় নেতা আর আমাদের মাঝে নেই। আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সকাল ৬টায় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’

খালেদা জিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। এই দীর্ঘ সময় ‘ব্যাটলিং বেগম’ হিসেবে পরিচিত এ দুই নেত্রীই দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

তবে হাসিনার মতো খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনও অম্লমধুর। দুই নেত্রীই কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। যদিও হাসিনার মতো খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিরোধীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ নেই, তবুও তিনি ছিলেন একজন মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব। বিরোধী দলে থাকাকালে আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন, নির্বাচন বর্জন ও দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্বদান এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে সমর্থকদের কাছে তিনি যেমন অকুতোভয় নেত্রী, তেমনি সমালোচকদের কাছে ছিলেন বিতর্কিত।

উত্থান:

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল)। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ফেনী জেলার বাসিন্দা। পরিবার নিয়ে দিনাজপুরে স্থায়ী হওয়ার আগে তিনি ভারতের জলপাইগুড়িতে ছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে।

খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। সেখানে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন।

রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অভিষেক কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে হয়নি; বরং হয়েছিল পরিস্থিতির প্রয়োজনে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। জিয়ার মৃত্যু দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। বছরের পর বছর ক্যু আর পাল্টা ক্যুর পর দেশে যে স্থিতিশীলতা জিয়াউর রহমান ফিরিয়ে এনেছিলেন, তাঁর অবর্তমানে তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠাতা হারানো বিএনপি তখন চরম অস্তিত্ব সংকটে।

স্বামীর জীবদ্দশায় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তবে বিএনপির তৎকালীন শীর্ষ নেতারা মনে করেছিলেন, দলের অভ্যন্তরীণ বিভেদ মেটাতে এবং জিয়ার আদর্শ ধরে রাখতে খালেদা জিয়াই একমাত্র ঐক্যবদ্ধ করার মতো ব্যক্তিত্ব।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন এবং পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করেন; কিন্তু কয়েক মাসের মাথায় ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন। একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের সেই উত্তাল সময়েই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানের শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেসামরিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রীতে পরিণত হন।

১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী কয়েক দশকে তিনি তিনবার জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি এবং তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কয়েক দশক আধিপত্য বজায় রাখেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন ছিল বর্ণিল, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে তাঁকে অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বড় ছেলে তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন এবং পরে নির্বাসনে যান। ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো প্রবাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়। পরের বছরগুলোতে রাজনৈতিক একাকিত্ব ও ক্রমাবনতিশীল স্বাস্থ্যের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয় তাঁকে।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর দায়িত্ব নিয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার তাঁর (তারেক রহমান) বিরুদ্ধে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিলে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান।

খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানকে কাছ থেকে দেখা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘তাঁর (খালেদা জিয়া) পুরো জীবনই কষ্টে ভরা। তবুও তিনি ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে দেশকেই বড় করে দেখেছেন। এ কারণে সব রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর সময়ের অন্যতম দৃষ্টান্তস্থাপনকারী একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।’

ফার্স্ট লেডি থেকে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতারা খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার অনুরোধ জানান। যদিও ওই সময় তিনি দলের সাধারণ সদস্যও ছিলেন না।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান এমন এক সময়ে ঘটেছিল, যখন এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে। ক্ষমতা দখলের পর সেনাপ্রধান সংবিধান স্থগিত করে দেশে সামরিক আইন জারি করেছিলেন।

আশির দশকজুড়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যায়।

দিলারা চৌধুরীর মতে, ১৯৮৬ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় মোড়। ওই বছর এরশাদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে বিরোধীরা একে অসাংবিধানিক বলে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, তখনো সামরিক আইন জারি ও রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত ছিল। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তা বর্জন করে।

দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিল। আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করে বর্জনের সিদ্ধান্ত তাঁকে নীতির প্রশ্নে আপসহীন একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।’

এরশাদ সরকারের আমলে বারবার গৃহবন্দী হওয়ার ঘটনা এ ধারণাকে আরও মজবুত করে। দিলারা চৌধুরীর ভাষায়, ‘এরশাদকে হটানো এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে খালেদা জিয়া অবিচল ছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও জেল-জুলুম সহ্য করার মানসিকতা তাঁকে মানুষের কাছে সম্মানিত করেছিল।’

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে কোনো দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপি ১৪০টি আসন পায়; যেখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি আসন। আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়ী হয়।

আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত সংসদে বিএনপিকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন নিশ্চিত হয় খালেদা জিয়ার। দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘এ সমঝোতা তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিল। এটি খুব সহজে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিও ছিল।’

বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। এর মধ্য দিয়ে তিনি ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ও বেনজির ভুট্টোর মতো দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী নারী নেতৃত্বের সারিতে নাম লেখান।

শাসনকাল, সংস্কার ও অভিযোগ

খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রথমবার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল; পরে ১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত দ্বিতীয় মেয়াদে কয়েক মাস এবং সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৯১ সালের শুরুতে এক বৈঠকের স্মৃতিচারণা করে দিলারা চৌধুরী বলেন, বৈঠক শেষে যাওয়ার সময় খালেদা জিয়া বাড়ির নারীদের সঙ্গে কথা বলতে থামেন এবং জানতে চান, তাঁরা তাঁর কাছে কী প্রত্যাশা করেন।

দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘আমার বড় বোন অধ্যাপক হোসনে আরা খান জবাব দিয়েছিলেন, ‘‘আমরা চাই, আপনি দেশকে অপেক্ষাকৃত সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রশাসন উপহার দেবেন।’’’

খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত তা দিতে পেরেছিলেন কি না, সেটি একটি জটিল প্রশ্ন বলে মনে করেন দিলারা চৌধুরী। বলেন, ‘স্বামীর জাতীয়তাবাদী দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর এ সদিচ্ছা সত্যিই ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন।’

সমর্থকেরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের কঠোর শাসন থেকে বেরিয়ে আসা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে খালেদা জিয়ার সরকার বেশ কিছু কার্যকর নীতি নিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি, শিল্পের পুনরুজ্জীবন, পোশাক খাতের প্রসার ও বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর সময় দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও তুলনামূলক বিকশিত হয়েছিল।

২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ নির্বাচিত মেয়াদের শেষে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। এটি ছিল স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি; যা ৯০-এর দশকের গড় প্রবৃদ্ধি (৪.৮ শতাংশ) ও ৮০-এর দশকের প্রবৃদ্ধির (৩.৮ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি। ওই সময় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে অর্থনীতিতে ‘এশিয়ার পরবর্তী উদীয়মান বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

তবে খালেদা জিয়ার শাসনামল সমালোচনা থেকেও মুক্ত ছিল না। ১৯৯৫ সালে বোরো মৌসুমের মোক্ষম সময়ে সার মজুত ও বণ্টন অব্যবস্থাপনার কারণে তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। প্রতিবাদে হাজারো কৃষক আন্দোলনে নামেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ গুলি চালায়। সংঘর্ষে অন্তত এক ডজন কৃষক ও এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ ঘটনা গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি এবং সরকারের ভাবমূর্তির ক্ষতি করে।

রাজনৈতিক ভুল

দিলারা চৌধুরী এমন দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন; যেখানে খালেদা জিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছিল। ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে জয়ের জন্য বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে, যা দেশজুড়ে সমালোচিত হয়। পরে ২০০১-০৬ মেয়াদের শেষের দিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরবর্তী নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি দলীয় অনুগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বসানোর চেষ্টার অভিযোগ ওঠে।

রাজনৈতিক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ আরও কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন; যা তাঁর মতে খালেদা জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করেছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হন এবং আহত হন কয়েক শ মানুষ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীন পরিচালিত তদন্ত ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীরা এ হামলার জন্য উগ্রবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছিলেন।

২০১৮ সালে ঢাকার একটি আদালত এ হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে দণ্ড দেন। তবে সম্প্রতি আপিল ও হাইকোর্টের রায়ে কয়েকজনের সাজা বাতিল এবং কয়েকজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এ হামলার বিচার ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন অনেক বাংলাদেশির কাছে আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ২০০৪ সালের এপ্রিলে। পুলিশ ও কোস্টগার্ড অবৈধ অস্ত্রের একটি বিশাল চালান আটক করে; যা ভারতের আসামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার জন্য আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

মহিউদ্দিন আহমদ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ঘটনাগুলো দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক শত্রুতা গভীর ও প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছিল।’

২০০১-০৬ মেয়াদে খালেদা জিয়া সরকারের নেওয়া কিছু ভুল পদক্ষেপ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত ক্ষমতা দখল (ওয়ান-ইলেভেন)। সে সময় সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ এবং ওই মাসের শেষ দিকে নির্ধারিত নির্বাচন বাতিলে চাপ দেয়। সেনাবাহিনীর সমর্থনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে নতুন অন্তর্বর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়। দেশে স্থিতিশীলতা ফেরানো ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল এ সরকারের কাজ।

এ পরিবর্তনের ফলে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—উভয়কেই প্রায় দুই বছর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হয়।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তাঁর (খালেদা জিয়া) দলই এমন পরিস্থিতি (ওয়ান-ইলেভেন) তৈরি করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত দল ও তাঁর পরিবারই এর শিকারে পরিণত হয়।’

‘গণতন্ত্রের প্রতি আপসহীন’

খালেদা জিয়ার সরকারের একজন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সমঝোতা করার জন্য প্রচণ্ড চাপের মুখেও তাঁর নেত্রী কখনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি।

আমীর খসরু বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর (খালেদা জিয়া) অঙ্গীকার ও দেশপ্রেম নেতা-কর্মীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। ওয়ান-ইলেভেন এবং পরে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপিকে ভেঙে দেওয়ার বারবার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তাঁর আদর্শই দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গত কয়েক দশকে রাজনীতি থেকে অনেকেই লাভবান হয়েছেন। কিন্তু খালেদা জিয়াকে বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে, বিশেষ করে ২০০৬ সালের পর থেকে।’ এর মাধ্যমে তিনি খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর আসা কারাবরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নিরবচ্ছিন্ন চাপের প্রতি ইঙ্গিত করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভুল হোক বা ঠিক, তিনি একবার যা বলতেন, সেখান থেকে সচরাচর পিছু হটতেন না। সমসাময়িক অন্য রাজনীতিকদের মধ্যে এ দৃঢ়তা দেখা যায় না।’

একটি রক্ষণশীল সমাজে যেখানে নারীর নেতৃত্ব নিয়ে একসময় সংশয় ছিল; সেখানে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়াটাও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় অংশ হয়ে থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ান-ইলেভেনের পর বড় ছেলেকে (তারেক) নির্বাসনে যেতে হলেও কিংবা হাসিনা সরকারের আমলে চরম প্রতিহিংসার শিকার হয়েও দেশ ছেড়ে না যাওয়ার (খালেদা জিয়ার) সিদ্ধান্ত বিএনপিকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তিনি চাইলে বিদেশে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি থেকে যাওয়ার ও পরিণাম ভোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ সংকল্পই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।’

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও মনে করেন, খালেদা জিয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রেও সংযত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা ও গালাগাল করা হলেও তিনি কখনো একই ভাষায় পাল্টা জবাব দেননি।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যটি ছিল এর বড় উদাহরণ।

৬ আগস্ট গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খালেদা জিয়া সমর্থকদের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়ার আহ্বান জানান। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অনেকের কাছেই এটি ছিল অকল্পনীয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে থাকার পরও তিনি কোনো উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করেননি।’

তবে এখন একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, খালেদা-পরবর্তী যুগে বিএনপির ভবিষ্যৎ কী? এ প্রশ্নের জবাবের কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর ছেলে তারেক রহমান।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্ব এখনো চূড়ান্ত পরীক্ষার সম্মুখীন হয়নি। তাই বিএনপি বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে পড়তে পারে।’

আগামী জাতীয় নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটিতে দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। বিমানবন্দরে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঢল নামে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে তাদের সাবেক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

দেশে ফেরার পর নিজের প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ৬০ বছর বয়সী এ নেতা ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা সম্পর্কেরও উন্নতি করতে পারেন। হাসিনার অপসারণ ও দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। অতীতে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক খুব একটা উষ্ণ না থাকলেও, সম্প্রতি দুই পক্ষ থেকেই ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।

এখন বিএনপি ও তারেক রহমানের সামনে বড় পরীক্ষা। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু এটিই ঠিক করবে না যে কে বাংলাদেশের পরবর্তী নেতা হচ্ছেন; বরং এটিও স্পষ্ট করতে পারে যে দেশের মানুষ খালেদা জিয়ার উত্তরসূরির ওপর কতটা আস্থা রাখছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

 

হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগসহ সারাদেশে নারীদের অবস্থান কর্মসূচি

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড় কে কেন্দ্র করে নারীদের নেতৃত্বে ও সক্রিয় অংশগ্রহণে টানা অবস্থান কর্মসূচি চলছে। কনকনে শীত, গভীর রাত কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ—কোনো কিছুই নারীদের এই প্রতিবাদ থামাতে পারেনি। নারী-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ রাজপথে অবস্থান নিয়ে একটাই দাবি তুলছেন—হাদি হত্যার দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় পানির ট্যাংকির সামনে গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুকে আন্দোলনকারীরা পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছেন।

হাদির মৃত্যুর পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে বিচার দাবিতে কর্মসূচি শুরু হয়। ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় শাহবাগ মোড়। এখানে নারীদের উপস্থিতি আন্দোলনকে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে, আবার কেউ একাই এসে অবস্থান কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। খোলা আকাশের নিচে কম্বল জড়িয়ে বসে নারীরা স্লোগান দিচ্ছেন—‘হাদি হত্যার বিচার চাই’, ‘ইনসাফ চাই’, ‘নারী-শিশুর নিরাপত্তা চাই’।

শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচির সময় একাধিক আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়। এক মা দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আন্দোলনস্থলে এসে বলেন, “আজ হাদির বিচার না হলে কাল আমাদের সন্তানরাও নিরাপদ থাকবে না।” শিশুকণ্ঠে উচ্চারিত ‘হাদি হত্যার বিচার চাই’ স্লোগান উপস্থিত অনেককে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

 নারীদের এই সরব উপস্থিতি আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক ন্যায়বিচারের দাবিতে রূপ দিয়েছে।

অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের জানান, কোনো আশ্বাসে নয় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কার্যক্রম শুরু হলেই কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

এছাড়াও খুনিদের গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবিতে সম্মিলিত নারী প্রয়াসের উদ্যোগে ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম, সহকারী সেক্রেটারি মাহসিনা মমতাজ মারিয়া, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সদস্য সাংবাদিক লাবিন রহমান, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিশাত শারমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন, জুলাই যোদ্ধা জান্নাতুন নাঈম প্রমি, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সদস্য রায়হানা নাসিম প্রমুখ। 

এবং ২২ ডিসেম্বর চিল্ড্রেন ভয়েস অব হিউম্যানিটির  উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

 পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের উদ্যোগে সমান্তরাল কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় নারীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে হাদি হত্যার বিচার দাবি জানিয়েছেন। রাজশাহীতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে নারীদের অংশগ্রহণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা শহরে নারী শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও কর্মজীবী নারীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ, মৌন মিছিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে নারীর নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। হাদি হত্যার বিচার এই রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার একটি পরীক্ষা বলেও তারা মন্তব্য করেন।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার সম্পন্ন এবং বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি জনসম্মুখে নিয়মিতভাবে জানানো।

নারীদের পক্ষ থেকে আরও দাবি জানানো হয়, ভবিষ্যতে যেন কোনো রাজনৈতিক সহিংসতায় কোনো প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আন্দোলনে নারীরা কোনো দলীয় ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকছেন না। বরং একজন নাগরিক, একজন মা, একজন শিক্ষার্থী ও একজন নারী হিসেবে ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নারীদের এই কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিভিন্ন স্থানের কর্মসূচির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করছে।

 শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগসহ সারাদেশে নারীদের অবস্থান কর্মসূচি এখন একটি শক্তিশালী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে—এমন ঘোষণা দিয়ে নারীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তারা আর নীরব থাকবেন না।

 

লুইস গিবসন: বিশ্বের সেরা ফরেনসিক আর্টিস্ট

ডিজিটাল নজরদারি যেখানে আজ তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, সেই যুগের অনেক আগেই অপরাধ অনুসন্ধানের নির্ভরতা ছিল মানুষের স্মৃতি আর একটি পেন্সিলের ওপর। ঠিক সেই বাস্তবতায় যিনি নিজের শিল্পশক্তিকে ন্যায়বিচারের অস্ত্রে রূপ দিয়েছিলেন, তিনি হলেন লুইস গিবসন। ফরেনসিক স্কেচকে একসময় “সফট সায়েন্স” বলে অবজ্ঞা করা হলেও তাঁর অভূতপূর্ব কাজ প্রমাণ করে দেয়—একটি নিখুঁত স্কেচও অপরাধী শনাক্তে প্রযুক্তির সমতুল্য, কখনো তার থেকেও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

লুইস গিবসন জন্মগ্রহণ করেন টেক্সাসের ডালাসে, ১৯৫০ সালে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল শিল্পের প্রতি গভীর টান এবং মানুষের মুখ পর্যবেক্ষণের এক আশ্চর্য ক্ষমতা। পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করতেন, অন্য শিশুদের মতো শুধু আঁকিবুঁকি করার বদলে লুইস মানুষের অভিব্যক্তি, মুখের রেখা ও সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলি অনায়াসে ধরতে পারতেন। তাঁর শিক্ষাজীবনেও আর্ট, সাইকোলজি ও মানব-পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ ছিল অত্যন্ত দৃঢ়।

জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে ফরেনসিক
আর্টের পথে নিয়ে আসে। তরুণ বয়সে তিনি নির্মম এক হামলার শিকার হন এবং দুর্ভাগ্যবশত সেই অপরাধী কখনো শাস্তি পায়নি। এই অমানবিক অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের প্রতিভাকে ব্যবহার করবেন অন্য ভিকটিমদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে। ভিকটিম বা সাক্ষীর স্মৃতি থেকে অপরাধীর মুখ পুনর্গঠন করার যে শিল্প, লুইস সেটিকে রূপ দেন পেশাদার দক্ষতায়।

পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন হিউস্টন পুলিশ ডিপার্টমেন্টে। সেখানে শুরু হয় তাঁর কিংবদন্তি ক্যারিয়ার। পুলিশের অনুরোধে তাঁকে বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হতো জটিল মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের স্মৃতি থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করে তিনি তৈরি করতেন অপরাধীর স্কেচ—যার নিখুঁততা দেখে অনেক প্রসিকিউটরই সেগুলোকে প্রায় আসল ছবির মতো বলে বর্ণনা করতেন। চোয়ালের সামান্য বাঁক, কপালের তীব্রতা, চোখের কোণের সংকোচন—এমন ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্যও তিনি অবিশ্বাস্যভাবে বাস্তবসম্মত করে তুলতেন।
তাঁর স্কেচের কারণে বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকা বহু মামলা নতুন করে গতিপথ পায়। নিখোঁজ শিশু, যৌন নিপীড়ন, খুন, ডাকাতি—সব ধরনের মামলাতেই তাঁর স্কেচ ছিল তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সহায়ক। ফরেনসিক স্কেচ, যাকে একসময় নগণ্য একটি অংশ হিসেবে দেখা হতো, লুইস গিবসনের সাফল্যের কারণে আজ বিশ্বজুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে মূল্যবান দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর কাজের বিশ্ব স্বীকৃতি আসে যখন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লুইস গিবসনকে ঘোষণা করে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফরেনসিক আর্টিস্ট। তাঁর স্কেচের সূত্র ধরে শনাক্ত অপরাধীর সংখ্যা ১,৩১৩ জনেরও বেশি—যা কোনো একক শিল্পীর সর্বোচ্চ অর্জন। যদিও পূর্ববর্তী কিছু সংবাদে ১,২৬৬ জন উল্লেখ ছিল, কিন্তু গিনেসের হালনাগাদ সংখ্যা তাঁর অবদানের পরিধিকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি লুইস গিবসনের ব্যক্তিগত জীবনও স্থির ও অনুপ্রেরণামূলক। তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জননী। পরিবারের সমর্থনই তাঁকে দীর্ঘ কর্মজীবনে অবিচল রেখেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেনসিক আর্ট পড়িয়েছেন এবং বিশ্বব্যাপী ওয়ার্কশপ ও বক্তৃতার মাধ্যমে নতুন শিল্পীদের প্রস্তুত করেছেন। তাঁর লেখা বই ও প্রশিক্ষণ উপকরণ আজও ফরেনসিক আর্টের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স।

সবশেষে বলা যায়, লুইস গিবসন শুধু একজন শিল্পী নন—ন্যায়বিচারের সংগ্রামে তিনি এক আলোকবর্তিকা।ব্যক্তিগত বেদনা থেকে শুরু হওয়া যাত্রায় তিনি প্রমাণ করেছেন—শিল্প শুধু সৌন্দর্যের মাধ্যম নয়, এটি সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে।

 

নারীর ৫ ঘণ্টা কর্মদিবস: সুবিধা, চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীকে যদি শ্রমবাজারে পুরোপুরি কাজে যুক্ত করা যায়, তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বড় অর্জন হতে পারে।
তবে বাস্তবতা এমন নয় যে প্রতিটি নারী পূর্ণদিনের (৮–৯ ঘণ্টা) কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম। গর্ভাবস্থা, নবজাতক পরিচর্যা, পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব ইত্যাদি কারণে বহু উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন নারী চাকরি থেকে দূরে সরে যান।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ১৫ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের নারীর লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট ছিল প্রায় ৪৪.১৫ %, যেখানে মোট শ্রমবাজারে নারীর অংশ প্রায় ৩৬.৯৪ %।
তদুপরি, অধিকাংশ নারী এখনও অ-ফর্মাল সেক্টরে কাজ করছেন; একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্মরত নারীর ৯৬.৬ % অ-ফর্মাল কাজে নিয়োজিত।
এই তথ্যগুলো নির্দেশ করে যে, শুধু নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য নিরাপদ, স্থায়ী এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে, “৫ ঘণ্টার কর্মদিবস” অথবা সংক্ষিপ্তকালীন (part‑time) কাজ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই মডেল নারীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে: পরিবার ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য রক্ষা করা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ধরে রাখা, এবং যুব ও স্থানীয় কর্মশক্তিকে কাজে লাগানো। উদাহরণস্বরূপ, গর্ভবতী বা সদ্য-মাতা নারী ৫ ঘণ্টার কাজ করলে সন্তান পরিচর্যা ও ক্যারিয়ার দুটোই সহজভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।
পাশাপাশি, নতুন কর্মীদের জন্য part‑time অনবোর্ডিং মডেল তাদের দক্ষতা যাচাই ও পরবর্তীতে পূর্ণ‑সময় কাজে উত্তরণের সুযোগ তৈরি করে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই কর্মঘণ্টা সংক্ষিপ্তকরণ নারীর শ্রমবাজারে অবদান নিশ্চিত করতে সহায়ক। এটি শুধু কর্মজীবনই ধরে রাখে না, বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। পারিবারিক দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানের ভারসাম্য মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়।
তবে এটি কার্যকর করতে হলে পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য প্রোপোরশনাল বেতন, সামাজিক বীমা, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন ও ট্রান্সপারেন্ট প্রমোশন সিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এই মডেলের বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জও আছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গার্মেন্টস ও জরুরি সেবার মতো সেক্টরে শিফট সিস্টেম অপরিবর্তনীয় চাহিদা থাকতে পারে, যা শুধু ৫‑ঘণ্টার মডেল দ্বারা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এছাড়া পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা (যেমন বীমা, পেনশন), পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও প্রমোশনের নিয়মগুলোর পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। আইনগতভাবে ও নীতিগতভাবেও পরিবর্তন আনা দরকার — পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য স্বীকৃতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, চুক্তি ধরন এবং সুবিধার কাঠামোতে সংস্কার জরুরি।

এই সমস্যা মোকাবিলায় কিছু প্রাসঙ্গিক সুপারিশ:
১. পাইলট প্রোগ্রাম চালু করা: বিভিন্ন সেক্টরে ৫ ঘণ্টার/পার্ট‑টাইম কর্মদিবসের প্রভাব পরিমাপ।
২. শিফট ও রোটেশন ব্যবস্থা: জরুরি সেবা, স্বাস্থ্য ও গার্মেন্টসে গ্রেডেড শিফট, ওভারল্যাপিং শিডিউল ও জব-শেয়ারিং।
৩. অনবোর্ডিং ও রি-স্কিলিং: নতুন কর্মীদের জন্য part‑time অনবোর্ডিং এবং পারিবারিক বিরতির পর ফিরে আসা নারীদের জন্য অনলাইন/অফলাইন রি-স্কিলিং প্রোগ্রাম।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: প্রোপোরশনাল বেতন, পেনশন ও বীমা কাঠামো।
৫. পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও সচেতনতা: পারফরম্যান্স ভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রমোশন এবং HR-এ লিঙ্গ সচেতনতা বৃদ্ধি।

সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ৫ ঘণ্টার কর্মদিবস কেবল নারীর সুবিধার বিষয় নয়, এটি নারীর কর্মজীবন, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা সংরক্ষণ ও অর্থনীতিতে অবদান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি পরিবার ও কর্মের ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ দেয় এবং সমাজে লিঙ্গ-সমতার বাস্তবায়নে সহায়ক। নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই মডেলকে শুধুমাত্র বিকল্প না রেখে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের পথ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

ফল্ট লাইনের প্লেট খুলে যাচ্ছে: উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ভূমিকম্পঝুঁকির দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এলাকায় অবস্থান করছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণা জানিয়েছিল, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচে একটি সুপ্ত ‘মেগাথ্রাস্ট ফল্ট’ রয়েছে, যা এক সময় ৯ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই শঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ দেশের তিনটি দৈত্যাকৃতির টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে দীর্ঘদিন ধরে যে চাপ জমছিল, সেটি এখন আটকানো অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্লেট খুলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে বাংলাদেশ আরও উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

গত ২১-২২নভেম্বর দেশের বিভিন্ন জেলায় চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা জানান, এটি আসন্ন চাপমুক্তির অংশ হতে পারে এবং আগামী এক সপ্তাহে আরও ২০ বার ছোট–বড় কম্পন অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় নয়, তবে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ভূগর্ভে চাপ জমে আছে। যদি কয়েক দিনের মধ্যে ৫.৭ মাত্রার চেয়েও বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটে, তাহলে স্বল্পসময়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাঁর মতে, বিভিন্ন এলাকায় উৎপত্তিস্থলের কথা বলা হলেও সমস্ত কম্পনের উৎস একই-নরসিংদী অঞ্চল।

জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভূমিকম্প গবেষক রুবাইয়াত কবির মনে করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভারতীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এর ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মারাত্মক ভূমিকম্পের মুখে পড়ছে।
এদিকে নরসিংদীর ঘোড়াশালে মাটিতে দেখা দেওয়া ফাটল পরিদর্শনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একটি দল নমুনা সংগ্রহ করেছে, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে কম্পনের ধরন ও গভীরতা নির্ণয় করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, গত কয়েক দিনের কম্পন হচ্ছে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্লেট এখন খুলে যাচ্ছে। বিশেষভাবে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি গত ৮০০ থেকে ১,০০০ বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করে আসছে; যা যেকোনো সময় তীব্র ভূমিকম্পের রূপ নিতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাবডাকশন জোনে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প সাধারণত ৭.৫ মাত্রার ওপরে হয়ে থাকে এবং সেগুলো ধ্বংসাত্মক হয়।
পৃথিবীর ‘রিং অব ফায়ার’-এ এমন ভূমিকম্প নিয়মিত দেখা যায়। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলও একই ধরনের সাবডাকশন জোনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় উদ্বেগ এখানে অত্যন্ত বেশি।

ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালে মিয়ানমার-টেকনাফ প্লেট সীমানায় ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে এসেছিল। ওই কম্পনে বঙ্গোপসাগরে সুনামি সৃষ্টি হয়ে পাঁচশর বেশি মানুষ মারা যায়। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই অঞ্চলে আবারো শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধ্বংস নিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, হিমালয়ের নিচে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে ভেঙে অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল স্তরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। এর ফলে ভূত্বকে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে উপমহাদেশজুড়ে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ২১ নভেম্বর সকালে নরসিংদী মাধবদী থেকে উৎপত্তি হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় যে ক্ষতি করেছে, তা রাজধানীর নাজুক অবস্থাই তুলে ধরে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে ভবনের দেয়াল ফাটল, স্ল্যাব ধস, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক, গ্যাস–বিদ্যুৎসংযোগে ত্রুটি দেখা দেয়। শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় কয়েক শত মানুষ। রাজউকের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বড় একটি অংশেই বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই যেখানে দৃশ্যমান ক্ষতি হচ্ছে, সেখানে ৭ বা ৮ মাত্রার কম্পন হলে কী ধরনের বিপর্যয় নামবে, তা কল্পনাতেও ভয়ংকর।

ঢাকার আরও একটি সমস্যা হলো এর নরম পলিমাটির গঠন। Basin Effect-এর কারণে কম মাত্রার ভূমিকম্পও ঢাকায় বড় কম্পনের মতো অনুভূত হয়। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্প সিলেট বা নরসিংদীর তুলনায় ঢাকায় বেশি ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। এ কারণেই ৩.৩ বা ৩.৭ মাত্রার আফটারশকও রাজধানীতে ৫ মাত্রার মতো অনুভূত হয়েছে।

যদিও ভূমিকম্পের পর হওয়া ছোট ছোট কম্পনগুলো স্বাভাবিক আফটারশক—যা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ধীরে ধীরে কমে আসার কথা—তবুও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট: স্বল্পমেয়াদে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব বেশি নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না; তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে পুনঃমূল্যায়ন, সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, এবং নাগরিকদের ঘরোয়া নিরাপত্তা–প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো শুধু বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাসই দিচ্ছেনা, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান কতটা বিপজ্জনক।
প্লেট টেকটনিকের এই ধীর পরিবর্তন কখন কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তাই এখনই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায়।

 

কর্মব্যস্ত নারীদের স্বাস্থ্যরক্ষা:জীবনধারা বদলের জরুরি পরামর্শ

আজকের সমাজে নারীরা শুধু ঘর সামলিয়েই থেমে থাকেন না; তারা কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা—সবক্ষেত্রেই সমানভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ কারণে প্রতিদিনের ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে খুব কম সময় দিতে পারেন। কিন্তু সময়মতো যত্ন না নিলে ছোট ছোট অসুবিধাই পরবর্তীতে বড় রোগে রূপ নিতে পারে। তাই সচেতন জীবনধারা ও নিয়মিত যত্ন কর্মজীবী নারীর সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা নারীদের মধ্যে মেরুদণ্ড, কোমর ও কাঁধের ব্যথা খুবই সাধারণ। একই ভঙ্গিতে লম্বা সময় বসে থাকা, ভারী ব্যাগ ব্যবহার বা ব্যায়ামের অভাব এ ব্যথার প্রধান কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে আট ঘণ্টার বেশি বসে কাজ করা নারীদের একটি বড় অংশ মেরুদণ্ডের ব্যথায় আক্রান্ত হন।
নিয়মিত অল্প বিরতি নেওয়া, সঠিক বসার ভঙ্গি বজায় রাখা এবং স্ট্রেচিং ব্যায়াম করা এই সমস্যার কার্যকর সমাধান।

স্ক্রিন-নির্ভর কাজের আধিক্যের কারণে চোখের ক্লান্তি আরেকটি বড় সমস্যা। কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাজ করলে চোখ লাল হওয়া, মাথাব্যথা বা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
এ থেকে রক্ষা পেতে ‘২০–২০–২০ নিয়ম’ অনুসরণ করা কার্যকর; অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকানো।
পাশাপাশি কাজের জায়গায় পর্যাপ্ত আলো ব্যবহার এবং চোখের নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি।

ব্যস্ততার কারণে অনেক নারী সময়মতো খাবার খেতে পারেন না, যা হজমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাসসহ নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস পাকস্থলির ওপর বাড়তি চাপ ফেলে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
তাই দিনে কয়েকবার অল্প অল্প পরিমাণে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, প্রচুর পানি পান এবং ফল-সবজি, প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কাজের চাপ, ডেডলাইন, পারিবারিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে কর্মজীবী নারীরা নিয়মিত মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং মানসিক অবসাদ তৈরি করতে পারে।
এজন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজেকে দেওয়া,ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বা কোনো শখের কাজ করাও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।

অনেক নারীর ক্ষেত্রে ব্যস্ততার কারণে মাসিক চক্রে অনিয়ম দেখা দেয়, যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। স্ট্রেস, ওজন পরিবর্তন বা অনিয়মিত ঘুম এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং মানসিক প্রশান্তি হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত চিকিৎসক পরামর্শ গ্রহণ করাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

ব্যায়ামের অভাব কর্মব্যস্ত নারীদের আরেকটি বড় সমস্যা। দীর্ঘ সময় বসে থাকা হার্টের রোগ, ওজন বৃদ্ধি ও হাড়ের ক্ষয় তৈরি করতে পারে।
প্রতিদিন ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা শরীরচর্চা এসব সমস্যা কমিয়ে আনে এবং শরীরকে দ্রুত সক্রিয় রাখে।
একইভাবে পর্যাপ্ত পানি পান না করলে ডিহাইড্রেশন, ত্বকের সমস্যা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তাই প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করা উচিত।

স্বাস্থ্য সচেতনতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সুস্থতার জন্যও প্রয়োজন। কর্মজীবী নারীরা দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন; তাই সুস্থ থাকা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি কর্মজীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সঠিক জীবনধারা ছোট সমস্যাকে বড় হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

 

রাজনীতির পরিবর্তনে নারীর অংশগ্রহণ: সংকট ও সম্ভাবনা

২০২৪ সালের অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়, তা কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনাই নয়—বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থবিরতা ও সামাজিক জটিলতার ভেতর থেকে উদ্ভূত এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
টানা গণ-আন্দোলন, অসন্তোষ ও রাষ্ট্রীয় চাপের এক সংমিশ্রণে ১৫ বছরের পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে, আর এর পরপরই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত নারী সমাজে যে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তা আশার আলো যেমন দেখায়, তেমনি অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশাও ঘনীভূত করে।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। আগের সরকারের সময় যে ভীতি, হয়রানি ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন নারী কর্মীদের সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল, তা কিছুটা হলেও সরে গেছে—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। মাঠের রাজনীতি, নাগরিক প্রতিরোধ, মত প্রকাশ—সব জায়গায় নারীর উপস্থিতি নতুন করে দেখা যাচ্ছে। দলীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগও বেড়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান উন্মুক্ততার ভেতরেও লুকিয়ে আছে গুরুতর বাস্তবতা।

নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নটি এই পরিবর্তনের সময় আরও জটিল রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ কমলেও তার অবসান হয়নি, আর যতদিন রাজনৈতিক উত্তেজনা বিদ্যমান থাকবে, ততদিন নারী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকবে—এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সুস্পষ্ট। রাজনৈতিক সমাবেশে মহিলা কর্মীদের উপর হামলার ঘটনা এখনও ঘটে; লাঞ্ছনা ও অপমানের চক্র থামেনি।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো সাইবার সহিংসতা। নারী সাংবাদিক, নারী রাজনীতিবিদ এবং অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার, ব্ল্যাকমেইলিং, ছবি বিকৃতি, হুমকি—এসব এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কণ্ঠরোধ করতে এই ভার্চুয়াল সহিংসতা কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতিকে নীরব করে দেওয়ার এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি করছে।

নারীর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ভোটার সংখ্যা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে নারীর ভোট সংখ্যা ৬ কোটি ২১ লাখেরও বেশি—একটি বিরাট গণশক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে এই শক্তির প্রতিফলন খুবই দুর্বল। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ১০ শতাংশেরও কম। এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক শক্তি এখনো প্রান্তিকীকরণ ও দলীয় পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে ওঠে দাঁড়াতে পারেনি।

নারীর ওপর সহিংসতার চিত্রও রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হাজার হাজার মামলা হয়েছে—এর বড় অংশই যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনসংক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা এই পরিসংখ্যানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। সামাজিক লজ্জা, বিচার না পাওয়ার ভয়, প্রভাবশালীদের চাপ—নারী এখনও এই তিন বৃত্তের মাঝখানে আটকে আছেন। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার পাওয়া এখনো অসাধ্য পর্বতের মতো।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবদান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নারীর কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক অগ্রগতি বাধার মুখে পড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, নতুন চাকরি সৃষ্টি না হওয়া, বাজারের অস্থিতিশীলতা—এসব কারণে নারী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যারা ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করতেন, তারা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছেন; অনেক কারখানা ও কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের নিয়োগ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব নারীর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

পরিস্থিতির এই বহুমাত্রিক পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয় যে, নারীকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে দূরে রেখে কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যকর হতে পারে না। রাষ্ট্র এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে সম্ভাবনার দরজা খোলা, অন্যদিকে সঙ্কটের ঘনঘটা। এই বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা, অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত।
সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করতে চায়, তবে নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীয় জায়গায় আনা ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো পথ নেই।

 

Conduct Disorder: শিশু-কিশোরের আচরণগত বিপর্যয়

বর্তমান সমাজে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। কিন্তু অনেক সময় এমন কিছু আচরণ আমরা উপেক্ষা করি যা আসলে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো Conduct Disorder (CD) এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে শিশু বা কিশোর নিয়মিতভাবে সমাজের গ্রহণযোগ্য নিয়ম ও নৈতিক আচরণ লঙ্ঘন করে, এবং অন্যের অধিকার বা অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিহীন হয়ে পড়ে। এটিকে কেবল “দুষ্টুমি” হিসেবে গণ্য না করে, বরং একটি গভীর মানসিক বিকার হিসেবে এড্রেস করা প্রয়োজন যা সময়মতো চিকিৎসা না হলে ব্যক্তিত্ব বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।

Conduct Disorder কী
Conduct Disorder হলো এমন একটি আচরণজনিত মানসিক ব্যাধি, যেখানে শিশু বা কিশোর ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ করে যা সমাজ, পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মবিরুদ্ধ।
সাধারণত এ রোগ ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
এটি ধীরে ধীরে শুরু হয়ে সময়ের সঙ্গে আচরণের উপর প্রভাব তৈরী করে আরও জটিল করে তুলে।

বিশেষজ্ঞরা একে “Persistent pattern of violating rules and rights of others” বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
অর্থাৎ, বারবার নিয়ম ভাঙা, মিথ্যা বলা, মারধর করা, চুরি করা বা সহিংস আচরণ প্রদর্শন করা—এই সবই Conduct Disorder-এর অন্তর্ভুক্ত।

লক্ষণ ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য
Conduct Disorder আক্রান্ত শিশু বা কিশোরের আচরণে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:

১আক্রমণাত্মক আচরণ: অন্যকে মারধর করা, ভয় দেখানো, বা প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা।

২.সম্পত্তিনাশী প্রবণতা: জিনিসপত্র ভাঙা, আগুন লাগানো বা ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করা।

৩.প্রতারণা ও মিথ্যাচার: নিয়মিত মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা বা চুরি করা।

৪.নিয়মভঙ্গ ও দায়িত্বহীনতা: স্কুল পালানো, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, সামাজিক নিয়ম উপেক্ষা করা।

এ ধরনের আচরণ যদি দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয় এবং দৈনন্দিন জীবন বা শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে, তখন এটি নিশ্চিতভাবে Conduct Disorder হিসেবে বিবেচিত হয়।

সম্ভাব্য কারণ ও প্রভাবক উপাদান
Conduct Disorder-এর উৎস একক নয়; এটি সাধারণত জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক কারণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।

১.জৈবিক কারণ:
মস্তিষ্কের frontal lobe-এর কার্যকারিতায় সমস্যা থাকলে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কমে যায়, যা impulsive আচরণের জন্ম দেয়।

২.মানসিক কারণ:
শৈশবের অবহেলা, ট্রমা, ভালোবাসার অভাব বা আত্মসম্মানহীনতা শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

৩.সামাজিক কারণ:
পারিবারিক ভাঙন, সহিংস পরিবেশ, অনিয়মিত প্যারেন্টিং, বা অপরাধপ্রবণ এলাকার প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
Conduct Disorder চিকিৎসাবিহীন থাকলে শিশুর সামাজিক, শিক্ষাগত ও আবেগীয় বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই কৈশোরে গিয়ে antisocial personality disorder-এ আক্রান্ত হয়, যা অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বাড়ায়। স্কুলে নিষ্ক্রিয়তা, বন্ধুত্বে সমস্যা, ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা—সবই এর পরিণতি হিসেবে দেখা যায়।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
Conduct Disorder-এর চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধৈর্যনির্ভর প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবার, শিক্ষক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।

১.Cognitive Behavioral Therapy (CBT): শিশুর নেতিবাচক চিন্তা ও প্রতিক্রিয়া পরিবর্তনের মাধ্যমে ইতিবাচক আচরণ তৈরি করে।

২.Parent Management Training (PMT): পিতামাতাকে শেখানো হয় কীভাবে শিশুর আচরণকে ধৈর্য ও ইতিবাচকভাবে পরিচালনা করতে হবে।

৩.Family Therapy: পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও যোগাযোগের অভাব দূর করতে সাহায্য করে।

৪.Medication:
কিছু ক্ষেত্রে antidepressant বা mood stabilizer প্রয়োগ করা হয়, বিশেষত যখন ADHD বা depression সহ-অবস্থান করে।

প্রতিরোধ ও সচেতনতা
Conduct Disorder প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রারম্ভিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও সহানুভূতিশীল আচরণ।

১.শিশুদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া

২.পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম বৃদ্ধি করা

৩.সহিংসতা-মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা

৪.স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা চালু করা

এসব পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যাধি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Conduct Disorder এমন এক মানসিক অবস্থা যা উপেক্ষা করলে পরবর্তীতে শিশুর ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
প্রতিটি “অস্বাভাবিক আচরণ”-এর পেছনে কোনো না কোনো ব্যথা বা অভাব লুকিয়ে থাকে—তা বোঝাই হলো প্রথম চিকিৎসা। শিশুদের প্রতি সহানুভূতি, মানসিক যত্ন এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে সমাজকে আরও মানবিক ও নিরাপদ করা সম্ভব।

 

সিজোফ্রেনিয়া :কীভাবে চিনবেন ও সামলাবেন

কখনও কি মনে হয়, সবাই আপনাকে নজরে রাখছে? পরিচিতদের ভালোবাসায়ও সন্দেহ জন্মায়? অথবা কানে ভেসে আসে এমন কিছু শব্দ, যা অন্য কেউ শুনতে পায় না? এগুলো শুধু কল্পনা নয়- হতে পারে এক জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) নামে পরিচিত।

সিজোফ্রেনিয়া এমন এক দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অসুখ, যেখানে মানুষের ভাবনা, আচরণ ও বাস্তবতা উপলব্ধি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। রোগী বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, নিজের মনে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেন—যেখানে ভয়, বিভ্রান্তি ও একাকিত্ব ঘিরে ধরে। অনেক সময় তারা বিশ্বাস করেন কেউ তাদের ক্ষতি করতে চায়, কিংবা মনে করেন নিজের ভেতরের কণ্ঠ তাদের নির্দেশ দিচ্ছে। ফলে, দৈনন্দিন জীবন, কাজ, সম্পর্ক—সব কিছুই বিঘ্নিত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও এই রোগ ক্রমবর্ধমান। অনেক সময় দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা, কিংবা মানসিক অসচেতনতার কারণে রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকেন। সাধারণত কৈশোরের শেষ ভাগ বা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শুরুতেই এর উপসর্গ প্রকাশ পায়—যেমন অদ্ভুত চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, একাকিত্ব, অতিরিক্ত ভয় বা সন্দেহপ্রবণতা, এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।

সিজোফ্রেনিয়ার সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে গবেষণায় দেখা গেছে এটি একাধিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল অবস্থা।
প্রধান কারণগুলো হলো:

জিনগত প্রভাব: পরিবারে কারো এই রোগ থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের গোলযোগ: ডোপামিন ও গ্লুটামেট নামক নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর অস্বাভাবিকতা চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে।

গর্ভকালীন বা জন্মকালীন জটিলতা: গর্ভাবস্থায় ভাইরাস সংক্রমণ বা অক্সিজেনের ঘাটতি পরবর্তী জীবনে ঝুঁকি বাড়ায়।

পরিবেশগত ও মানসিক চাপ: মানসিক ট্রমা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা অতিরিক্ত স্ট্রেস।

চিকিৎসার দিক থেকে, সিজোফ্রেনিয়া এখন আর আগের মতো অচিকিৎসাযোগ্য নয়। নিয়মিত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং,মানসিক সহানুভূতি এবং সুস্থ পরিবেশে রোগীরা অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
চিকিৎসা সাধারণত তিনটি স্তরে হয় —
ওষুধ (Antipsychotics): মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে সহায়তা করে।

মনোচিকিৎসা ও কাউন্সেলিং:
রোগীকে নিজের অনুভূতি চিনতে ও বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।

সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা:
নিরাপদ, সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ রোগীর উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রোগী হঠাৎ করে চিকিৎসা বন্ধ করলে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। তাই ওষুধ বন্ধ করা বা পরিবর্তনের আগে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক দেশে এখন community-based rehabilitation program চালু আছে, যেখানে রোগীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়।

পরিবার এখানে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষদের অনেক সময় ভুল বোঝা হয়—তাদের ‘পাগল’ বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে। অথচ ভালোবাসা, ধৈর্য ও বোঝাপড়া—এই তিনটিই রোগীর সুস্থতার প্রধান হাতিয়ার। পরিবার ও বন্ধুদের উচিত রোগীর পাশে থাকা, তার অনুভূতি শোনা, এবং তাকে সমাজে গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতি দেওয়া।

সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত কাউকে দেখলে ভয় পাবেন না বা হুট করে তার প্রতি জাজমেন্টাল হয়ে যাবেননা । জেনে রাখুন এটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অসুখ মাত্র।

 

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা

দেশের শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই নারীরা আজ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও জীবনের প্রয়োজনে নিয়মিতভাবে গণপরিবহন ব্যবহার করছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই চলাচল অনেক সময় তাদের জন্য হয়ে ওঠে ভয়, অপমান ও অস্বস্তির কারণ।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন, আর তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একটি সামাজিক সংকটের প্রতিফলন—যেখানে নিরাপদ চলাচলের মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।

নারীদের গণপরিবহনে হয়রানির ঘটনা ঘটলে প্রথম করণীয় হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এমন পরিস্থিতিতে ভয় বা লজ্জায় চুপ না থেকে বরং সরব প্রতিবাদ জানানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আশপাশের মানুষকে অবহিত করা, জোরে চিৎকার করে জানানো কী ঘটছে, এবং প্রয়োজনে চালক, কন্ডাক্টর বা নিকটস্থ যাত্রীদের সহায়তা নেয়া। সম্ভব হলে মোবাইল ফোনে ঘটনার ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করে রাখা। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকলে তার নাম ও ফোন নম্বর নোট করা, কারণ এই তথ্যগুলো পরবর্তীতে আইনি প্রমাণ হিসেবে অমূল্য ভূমিকা রাখে।

আইনের দৃষ্টিতে গণপরিবহনে শারীরিক বা মৌখিক হয়রানি কোনো সাধারণ অসভ্যতা নয়, এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৩৫৪ অনুযায়ী, কোনো নারীকে আক্রমণ করা, জোর করে স্পর্শ করা, বা তার শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে, ধারা ৫০৯ অনুসারে কোনো নারীকে অপমান বা শ্লীলতাহানি করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা আচরণ করাও আইনের আওতায় দণ্ডনীয়। তদুপরি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০—এর অধীনেও এসব অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করা উচিত। যদি ঘটনাটি গুরুতর হয়—যেমন শারীরিক আক্রমণ বা যৌন সহিংসতা—তবে এফআইআর দায়ের করতে হবে। এখন অনলাইনেও জিডি করার সুযোগ রয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে সহায়তা করে। পুলিশের পাশাপাশি কোনো আইনজীবী বা নারী সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর হয়। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিডিও, ছবি, অডিও বা মেডিকেল রিপোর্ট সবসময় সংরক্ষণ করে রাখা উচিত, কারণ এসব প্রমাণ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মৌখিক কটূক্তি বা হেনস্তার মতো ঘটনাও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেউ যদি গণপরিবহনে অশালীন কথা বলে বা কটূক্তি করে, সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানান। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা লজ্জা বা ভয়ের কারণে চুপ থাকেন, কিন্তু নীরবতা অপরাধীকে সাহসী করে তোলে। সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, যাতে প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনাস্থলে প্রতিক্রিয়া জানান ও অপরাধীকে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করেন।

হয়রানির শিকার ব্যক্তির জন্য একটি মানসিক আঘাত। তাই এমন ঘটনার পর পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীর সহযোগিতা নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে স্থানীয় নারী সহায়তা কেন্দ্র, ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯, কিংবা কোনো এনজিওর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু আইনগত পরামর্শই নয়, মানসিক সহায়তাও প্রদান করে।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন।
দেখা যায় এহেন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীকে বারংবার দোষারোপ বা হেয় করা হচ্ছে।
এসমস্ত ভিক্টিম ব্লেইমিং সংস্কৃতি থেকে সরে এসে ভুক্তভোগীর প্রতি
সহায়তাও সহানুভূতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ানোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক।
গণপরিবহনে হয়রানি কেবল নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। তাই পরিবর্তনের দায়িত্ব—নাগরিক হিসেবে, যাত্রী হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই।

জীবিকার তাগিদে, শিক্ষার প্রয়োজনে কিংবা পারিবারিক দায়িত্বে প্রতিদিন লাখো নারী ঘর থেকে বের হন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা হলেও, সচেতন প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়।তাই আর নীরবতা নয়, প্রতিবাদই পারে অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে দিতে।

 

গোলটেবিল বৈঠক: নতুন বাংলাদেশে শাসক নয়, সেবক চাই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে গত ১৮ অক্টোবর শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী গোলটেবিল বৈঠক—প্রতিপাদ্য ছিল “নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বে শাসক নয়, সেবক চাই।” নারী নেতৃত্বভিত্তিক সংগঠন ‘সম্মিলিত নারী প্রয়াস’ আয়োজিত এই আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।

বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দলীয় আনুগত্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সেবামুখী নেতৃত্বই পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরিন আমিন মোনামি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে সমাজকে শ্রেণী ও মানসিকতায় বিভক্ত করা হয়েছে—গ্রাম-শহর, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানভেদেও। এই বিভাজনই শোষণের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, নারীর প্রতিনিধিত্ব কেবল মুখের বুলি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে পরিচয়ের রাজনীতি নয়, কাজের নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।

বুয়েটের এমএমই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকিয়া আনা ফখরুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ বা ইসলামফোবিয়া গভীর আকার ধারণ করেছিল। নতুন সরকারের পক্ষে তা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তবে উদ্যোগ নিতে হবে সচেতনতার সঙ্গে। তিনি বলেন, নেতৃত্বে থাকতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনায় দক্ষতা—যে নেতা কেবল ক্ষমতায় নয়, পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবেন।

ঢাবির জিনপ্রকৌশল ও জিনপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রকৃত শাসক সে-ই, যিনি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়, বরং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দুর্নীতিমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বই পারে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, অতীতে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন ছিল তুলনামূলক সহজ, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি, ভোট কেনাবেচা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, জনগণের সচেতনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থাই নেতৃত্ব নির্বাচনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।

তার মতে, ভবিষ্যতের শাসককে হতে হবে দ্বৈতধর্মী—একদিকে জনগণের সেবক, অন্যদিকে অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।

বৈঠকের সারসংক্ষেপে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন ‘শাসক মানসিকতা’ নয়, ‘সেবক মানসিকতা’ প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতি দায়বোধ—এই তিন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে হবে নতুন নেতৃত্ব।

 

নারীর অদৃশ্য পরিশ্রমের দৃশ্যমান বাস্তবতা

বিশ্বজুড়ে নারী ও পুরুষের কাজের সময় নিয়ে আলোচনাটা আজ আর নতুন নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বছর পেরিয়ে গেলেও নারীর কাজের ঘন্টা—বিশেষ করে অবৈতনিক কাজের সময়—এখনো অর্থনীতির মূলধারায় যথাযথভাবে গণনা করা হয় না। এই পার্থক্য আইন বা নীতির কারণে তৈরি হয়নি, বরং এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সামাজিক ধারণা, পারিবারিক ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান দেখায়, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে কম সময় বেতনভুক্ত কাজে ব্যয় করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা ঘরোয়া ও যত্নমূলক কাজে পুরুষের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সময় দেন। অর্থাৎ, কাজের ঘন্টার হিসাবে নারীরা কখনোই কম পরিশ্রম করছেন না; বরং তাঁদের পরিশ্রমের বড় অংশটাই থেকে যাচ্ছে “অদৃশ্য”।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোতেও কর্মঘণ্টায় লিঙ্গভেদ স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ২৮ শতাংশ নারী খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত, যেখানে পুরুষের হার মাত্র ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নারীরা প্রায় চারগুণ বেশি হারে কম সময়ের চাকরি বেছে নিচ্ছেন।
তবে এই পার্থক্য কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার ফল নয়। বরং সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিই নারীদের এমন পেশা বেছে নিতে বাধ্য করে যেখানে সময়ের নমনীয়তা থাকে, যাতে তারা গৃহস্থালি, সন্তান লালন-পালন কিংবা বয়স্কদের যত্নের কাজ সামলাতে পারেন। ফলে নারীর কাজের ঘন্টা সংখ্যা হিসেবে কম মনে হলেও, বাস্তবে তা একেবারেই সঠিক চিত্র নয়।

উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়ের মতো দেশে পুরুষ ও নারী উভয়ের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৯ ঘণ্টা। কিন্তু নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডে অনেক নারী সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার কম কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা গড়ে প্রতিদিন ৭.৯ ঘণ্টা কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের জন্য এই সময় ৮.৪ ঘণ্টা। পার্থক্যটা অল্প মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা— পরিবার, সন্তানের দায়িত্ব ও গৃহস্থালি কাজের চাপ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, নারীরা বৈতনিক কাজের বাইরে যে বিপুল সময় দেন ঘরোয়া কাজে, তা কোনো অর্থমূল্যে ধরা হয় না। ২০২৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (ILO) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৪৮ মিলিয়ন মানুষ পরিচর্যা ও যত্নের কাজের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন— তাদের মধ্যে ৭০৮ মিলিয়নই নারী।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, নারীরা প্রতিদিন পুরুষদের তুলনায় গড়ে আড়াই গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন রান্না, ঘর পরিষ্কার, শিশু ও বয়স্কদের যত্নের মতো কাজগুলোতে। অথচ এই কাজগুলোই পরিবার ও সমাজকে সচল রাখে। যদি এই সময়কে বৈতনিক কাজের সঙ্গে যোগ করা হয়, তবে দেখা যায়— নারীর মোট কর্মঘণ্টা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পরিশ্রমের কোনো বেতন নেই, কোনো ছুটি নেই, এমনকি অনেক সময় কোনো স্বীকৃতিও নেই।

বহু সমাজে এখনো গৃহস্থালি কাজকে নারীর “প্রাকৃতিক দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়। এমন ধারণার কারণে অনেক নারী চাকরির ক্ষেত্রে নমনীয় সময়সূচি বেছে নিতে বাধ্য হন, অথবা পুরোপুরি কর্মক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা পিছিয়ে পড়েন, কিন্তু গৃহস্থালি দায়িত্বের ভার হালকা হয় না।
যেসব দেশে পরিবার ও রাষ্ট্র মিলে শিশুসেবা বা বয়স্কদের যত্ন ভাগাভাগি করে নেয়, যেমন— স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, সেখানে নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্মঘণ্টা তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক দেশে সামাজিক কাঠামো ও নীতিগত সহায়তার অভাবে নারীরা এখনো দ্বিগুণ পরিশ্রম করেন— একদিকে ঘর, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্র।

নারীরা প্রতিদিন যে সময় ব্যয় করেন রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান বা বৃদ্ধদের যত্নে— সেগুলো সমাজের চোখে “কাজ” নয়, কারণ তার কোনো বাজারমূল্য নেই। অথচ এই কাজগুলো ছাড়া কোনো সমাজই টিকতে পারে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তবে তা অনেক দেশের জিডিপির বড় অংশ হয়ে দাঁড়াবে।

নারী আজ অফিসে কাজ করছেন, সংসারও সামলাচ্ছেন— কিন্তু তাঁর এই অবদান দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের দাম আছে, আরেক ভাগের নেই। অথচ দুটি অংশই সমাজের চালিকাশক্তি। তাই এখন সময় এসেছে এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান স্বীকৃতি দেওয়ার।
নারীর বৈতনিক ও অবৈতনিক—দুই ধরনের কাজই সমান মর্যাদা ও গুরুত্বের দাবিদার।
সুতরাং, বৈষম্যের মূল উৎস দূর করতে হলে শুধু চাকরির সুযোগ নয়, ঘরের ভেতরের দায়িত্ব ভাগাভাগিও জরুরি। নারী ও পুরুষ উভয়েই যদি সমঝোতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে ঘর ও বাইরের দায়িত্ব বহন করেন, তবেই সমাজে প্রকৃত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

ডিপফেইকে ছবি বিকৃতি,মামলা করলেন ঢাবি শিক্ষিকা মোনামি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি তার ছবি বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন। সোমবার (৩ নভেম্বর) সকালে তিনি নিজেই শাহবাগ থানায় উপস্থিত হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলায় চারজনকে নামীয় আসামি করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে, যারা বিকৃত ছবি শেয়ার বা অশালীন মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

১ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট মুজতবা খন্দকারকে। ২ নম্বর আসামি মহিউদ্দিন মোহাম্মদ, ৩ নম্বর আসামি ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী নিরব হোসাইন, এবং ৪ নম্বর আসামি আশফাক হোসাইন ইভান। মামলাটি দায়েরের পর তা অধিকতর তদন্তের জন্য গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)র সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।

মামলার সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম ঝুমা, ডাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক মো. জাকারিয়া ।
ডাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক মো. জাকারিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, “শেহরীন আমিন ভূঁইয়া ম্যাম তার ছবি এডিট করে ফেসবুকে পোস্ট করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন। আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক হিসেবে আমি সার্বিক সহায়তা করেছি।”

জাকারিয়া আরও জানান, ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হলে ডিবির সাইবার ইউনিট দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, “যারা বিকৃত ছবি পোস্ট করেছেন, অশালীন মন্তব্য করেছেন বা শেয়ার দিয়েছেন, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে ইনশাআল্লাহ।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনের কঠোর ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালিদ মনসুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন। আমরা মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পাঠিয়েছি।”

এদিকে, ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা বুম বাংলাদেশ যাচাই করে জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবিগুলো বাস্তব নয়; বরং এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছবিগুলো গুগলের জেনারেটিভ টুল “Gemini” দিয়ে তৈরি এবং এতে SynthID নামে ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে—যা শুধুমাত্র এআই-তৈরি কনটেন্টে যুক্ত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত হয়রানির বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশে ডিপফেইক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের হেনস্তা, চরিত্র হনন ও সামাজিকভাবে অপমান করার এক ভয়াবহ প্রবণতাকে স্পষ্ট করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এআই-নির্ভর টুল ব্যবহার করে নারীদের ছবি বিকৃত বা কল্পিত “অশালীন” দৃশ্য তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে—যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।

সার্বিকভাবে, শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামির মামলা শুধু এক শিক্ষকের ন্যায়বিচারের আবেদন নয়; এটি ডিপফেইক ও এআই-নির্ভর নারীবিরোধী অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে এক সতর্ক বার্তা, যা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জন্য নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।

 

ফ্রিতে ২ লাখ টাকার আইটি কোর্স, কোর্স শেষে চাকরির নিশ্চয়তা

দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি এডুকেশন ওয়াক্ফ (আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ) আবারও তাদের ৭০তম আইটি স্কলারশিপ প্রোগ্রামের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে।

এই প্রোগ্রামের আওতায় নন-আইটি ব্যাকগ্রাউন্ডের স্নাতক বা সমমানের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সাড়ে আট মাসের আইটি প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। পুরো কোর্সটির মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা, তবে এটি সম্পূর্ণ ফ্রি স্কলারশিপে করানো হবে।

কোর্স শেষে সফল শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে দেশ-বিদেশে চাকরির সুযোগ। ইতিমধ্যে এ প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ৯২% শিক্ষার্থী সফলভাবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ এখন পর্যন্ত ১৭,০০০+ আইটি প্রফেশনাল তৈরি করেছে, যারা কাজ করছেন বিশ্বের ৩,২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে।

প্রোগ্রামটির অধীনে বর্তমানে ১৩টি আইটি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এগুলো সাজানো হয়েছে আধুনিক চাকরির বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী, যাতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি পেশাজীবনে প্রবেশ করতে পারেন।

প্রার্থীকে স্নাতক, ফাজিল, মাস্টার্স, কামিল পাস বা অধ্যয়নরত হতে হবে।
এছাড়া চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (কম্পিউটার, টেলিকমিউনিকেশন, ইলেকট্রনিকস, সিভিল, আর্কিটেকচার, সার্ভে বা কনস্ট্রাকশন) পাসরাও আবেদন করতে পারবেন।
বয়স হতে হবে সর্বোচ্চ ৩০ বছর।
তবে, আগের কোনো রাউন্ডে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা নতুন করে আবেদন করতে পারবেন না।

ভর্তি পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া
লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে।
লিখিত পরীক্ষায় গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে এমসিকিউ পদ্ধতিতে প্রশ্ন থাকবে।
প্রতি রাউন্ডে মোট ১৬৫টি আসন নির্ধারিত রয়েছে।
ডিপ্লোমাধারী প্রার্থীদের জন্য কোর্সগুলো শুধু ঢাকায় পরিচালিত হবে।

আবেদনের শেষ সময়: ১৫ নভেম্বর ২০২৫
বিস্তারিত জানতে ও আবেদন করতে ভিজিট করুন:
https://apply.isdb-bisew.info/

 

ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট: শীর্ষ ৫০ নারী নেত্রীর তালিকায় শিফা

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এক গর্বের সংবাদ—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিতা বিনতে আজাদ শিফা স্থান করে নিয়েছেন রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর অধীন প্রতিষ্ঠান ‘অবনিন্সক টেক একাডেমি’ কর্তৃক নির্বাচিত বিশ্বের শীর্ষ ৫০ নারী নেত্রীর তালিকায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত আবেদনকারীর মধ্য থেকে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তার পূর্ববর্তী কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণাকর্ম এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শিফার জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সমাজসেবার প্রতি গভীর ভালোবাসা, যা তিনি শিখেছেন বাবা-মায়ের কাছ থেকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, মানুষের উপকারে আসাটাই জীবনের প্রকৃত অর্থ। সমাজকর্ম বিভাগে ভর্তি হয়ে তিনি বুঝতে পারেন—সমাজকর্মের শিক্ষার্থীরা যদি ডায়নামিক হতে পারে, তাদের সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিজেকে যুক্ত করেন নানা স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। তার এই অদম্য প্রচেষ্টা তাকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স প্রকল্পে লিড প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে শিফা উপলব্ধি করেন—বাংলাদেশের অনেক তরুণ মেধাবী হলেও সঠিকভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে না পারার কারণে পিছিয়ে পড়ে। ঢাকা শহরে পড়াশোনার সময় তিনি দেখেছেন, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী তাদের যোগ্যতার যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। এই সমস্যার সমাধান নিয়েই জন্ম নেয় তার উদ্যোগ ‘ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট’। তরুণদের যোগাযোগ দক্ষতা ও সফট স্কিল উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
শিফার স্বপ্ন, ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে অন্তত এক লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা। তার বিশ্বাস, একজন মানুষ যদি নিজের সফট স্কিল গুণাবলিগুলো উন্নত করতে পারে, তবে সে নিজের জীবনের পথ নিজেই তৈরি করে নিতে সক্ষম হবে।

শিফার সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের অবদান অপরিসীম। বাবা ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ এবং মা সোহরাত বেগম ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। সততা, নিষ্ঠা, নীতিনিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের যে শিক্ষা তিনি তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন, সেটিই তাকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে শক্তি জুগিয়েছে। বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসাই তার এগিয়ে চলার সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি।

রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা শিফার জীবনে এনেছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি দেখেছেন—পৃথিবীতে অনেক ভালো মানুষ রয়েছেন, যারা একে অপরের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে সম্মান করেন। শিফা বলেন, “দেশের বাইরে আমি মানেই বাংলাদেশ। আমাকে দেখে অনেকেই বাংলাদেশকে চিনেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।” তার এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ।
যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের জন্য শিফার বার্তা অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক।
তার মতে, নারীদের জন্য আজকের যুগে সুযোগের দ্বার অনেক উন্মুক্ত। ঘরে বসেই ইংরেজি শেখা, নতুন ভাষা বা কোডিং শেখার মতো দক্ষতা অর্জন এখন অনেক সহজ। তিনি বলেন, “আপনাকে আপনার লক্ষ্য জানতে হবে। যদি আপনার লক্ষ্য বড় হয়, তবে ছোট ছোট বাধা খুব সহজেই পেরিয়ে যাওয়া যায়।”

শিফার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং পারিবারিক মূল্যবোধের সমন্বয় থাকলে যেকোনো স্বপ্নই পূরণ করা সম্ভব। ‘ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট’-এর মাধ্যমে তিনি যে পরিবর্তনের বীজ বপন করেছেন, তা একদিন আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ তরুণ প্রজন্মে রূপ নেবে—যারা নিজের জীবন বদলে দিতে পারবে, আর সেইসঙ্গে বদলে দেবে পুরো সমাজকেও।

 

জকসু নির্বাচনে লড়বেন ১৫ মাসের কারাবন্দী সেই খাদিজা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বহুল আলোচিত শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা আসন্ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (জকসু) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
আওয়ামী দুঃশাসনের সময় প্রায় ১৫ মাস কারাভোগ করা এই শিক্ষার্থী বলেন, “আমি জকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে কোন প্যানেল বা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। খুব শিগগিরই জানাব।”

সম্প্রতি এক গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের ইচ্ছা ও লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানান খাদিজা। তিনি বলেন, “প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে কাজ করব। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, ক্যান্টিন ও ছাত্রী হলে খাবারের মান উন্নয়ন, এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা—এসব বিষয় থাকবে আমার অগ্রাধিকারে।”

শিক্ষার্থীদের আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়েও পরিকল্পনা জানিয়ে খাদিজা বলেন, “অনেক শিক্ষার্থী টিউশন করাতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন। আমি চাই, তারা যেন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বনির্ভর হতে পারেন। পাশাপাশি প্রাইভেট হাসপাতালে জবি শিক্ষার্থীরা যাতে স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন, সেজন্যও ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি।”

নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতার কথা টেনে খাদিজা বলেন, “আমার মতো যেন আর কোনো শিক্ষার্থী বিনা বিচারে জেল না খাটে—এটাই আমার অন্যতম অঙ্গীকার। সর্বোপরি আমি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে চাই।”

খাদিজাতুল কুবরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রচার এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কলাবাগান ও নিউমার্কেট থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সে সময় তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে এ মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় ১৫ মাস কারাভোগ করেন।

বর্তমানে মুক্ত জীবনেই নতুন পথচলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন খাদিজা—এবার ছাত্র রাজনীতির ময়দান হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের।

 

ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে স্বপ্নপথে কানিজ ফাতেমা

চাঁদপুরের এক তরুণী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে, যখন সকলের আশা ছিল স্থিতিশীল চাকরির দিকে এগোনো, তখন তিনি বেছে নিলেন এক ভিন্ন পথ—উদ্যোক্তা হওয়া। আশপাশের মানুষ হয়তো বিস্মিত, কেউ কেউ হয়তো কটাক্ষও করেছিল, কিন্তু কানিজ ফাতেমা নিজস্ব স্বপ্নের পথে অটল থেকেছেন। আজ তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্যও পরিচিত।

কানিজ ফাতেমা প্রিয়া বহু ধরনের ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন—কাপড়, রেস্টুরেন্টসহ একাধিক উদ্যোগে হয়েছেন সফল। তাঁর জীবন সঙ্গী মঞ্জুরুল ইসলাম সুমন একজন চিত্রশিল্পী, এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে।

১৯৯৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি দেন কানিজ। এরপর ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার গল্প শুরু হয়। ২০০৭ সালে তাঁর ব্যবসা ‘ডিভাস স্টাইল’ যাত্রা শুরু করে। ডিভাস স্টাইল মূলত তৈরি পোশাকের বাজারে—শাড়ি, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, বেডশিট এবং কাপল ড্রেসসহ নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে এখানে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন।

তাঁর উদ্যোক্তা জীবন সবসময় সহজ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে ব্যবসার পথে যাওয়া অনেকেরই পছন্দ হয়নি। কটাক্ষ ও সমালোচনার মধ্যেও কানিজ হার মানেননি। তিনি নিজস্ব দৃঢ় মনোবল নিয়ে বলেন, “সফল হলে সবাই পাশে থাকবে। তাই আমি সবসময় আমার কাজে মনোযোগ দিতাম। জীবন আমার, তাই সেটিকে সুন্দরভাবে গড়তে হবে।” শুরুর দিকে পরিবারের অনীহা থাকলেও এখন মা-বাবা তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে গর্বিত।

কানিজের উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়; তিনি সমাজের জন্যও কাজ করেন। ‘আর্ট অব ডিভা ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে তিনি গ্রামে নিম্ন আয়ের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে পণ্য সরবরাহ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার ও এতিমদের খাদ্য সহযোগিতা—সবই এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে।

নারী উদ্যোক্তাদের ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি দেখেছেন পরিবারিক সহযোগিতা ও আর্থিক সমস্যা। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তার জন্য প্রথম প্রতিবন্ধকতা আসে পরিবার থেকে। তাই পারিবারিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

কানিজ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু টিপস দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য:

যেটি নিয়ে উদ্যোগ নিতে চান, তা ভালোভাবে জানুন।

বাজার গবেষণা অপরিহার্য।

যে পণ্যের উপর কাজ করবেন, তার চাহিদা বোঝা জরুরি।

সঠিক কাঁচামাল নির্বাচন করুন।

উদ্যোগে তার শ্রম ও নিষ্ঠা স্বীকৃতিও পেয়েছে। জয়িতা ২০১৯, পাওয়ার উইমেন পদ্মা ব্যাংক ২০২১, এবং দক্ষিণ এশিয়ার ১০০ সেরা নারী উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড ২০২২ এর মত পুরস্কার তার কাজের পরিচায়ক।

কানিজ ফাতেমা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ ব্যবসা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং গ্রামের নিম্ন আয়ের নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনির্ভর হবেন। তাঁর এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা প্রমাণ করে, সাহসী পদক্ষেপ এবং দৃঢ় মনোবল দিয়ে যে কেউ নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারে।

 

বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু রুহাব

দেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ছোট্ট আয়ান খান রুহাব। মাত্র আট মাস বয়সেই সে হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব জীবনের এক অনন্য প্রতীক।
পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD) আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করে।

রুহাবের বাবা ইমরান রাব্বি, পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীনম্যান–এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং মা আয়শা আক্তার কিরণ সংগঠনটির সমন্বয়ক। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ নিতে গিয়ে তারা রোপণ করেছেন ৫৮০টি গাছের চারা—নিজ বাড়ি ও আত্মীয়দের জমিতে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই বৃক্ষগুলোই রুহাবের পুরো জীবনের সম্ভাব্য কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য বজায় রাখবে।

আয়শা কিরণ বলেন, “রুহাবের জন্য আমরা যা করেছি, তা শুধু তার জন্য নয়—এই পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্যও। চাই, প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানের জন্য কিছু গাছ লাগান।”

আইসিসিসিএডি এর ইয়ুথ অ্যান্ড জেন্ডার বিষয়ক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সুমাইয়া বিনতে সেলিম জানান-
“বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড থেকে দেখা হয়েছে কোনো দেশের মানুষ বছরে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ করে। সেই হিসাব এবং একটি গাছ বছরে কতটুকু কার্বন শোষণ করতে পারে- এই দুটি বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ধরে রুহাবকে কার্বন-নিরপেক্ষ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।”

প্রতিষ্ঠানটির এক সমন্বয়ক বলেন, “এটি কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, এটি পৃথিবী বাঁচানোর এক আন্দোলনের প্রতীক। আমরা চাই, ভবিষ্যতে আরও মানুষ এ ধরনের উদ্যোগে অংশ নিক।”

এদিকে, কার্বন-নিরপেক্ষতা বলতে বোঝায় এমন এক ভারসাম্য, যেখানে একজন মানুষ যতটুকু কার্বন বাতাসে ছড়ায়, প্রকৃতির উদ্যোগে বা প্রযুক্তির মাধ্যমে ততটাই কমিয়ে আনা হয়। এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ভারতের তামিলনাড়ুর দুই বছর বয়সী আদাভি বিশ্বের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তার মা-বাবা মেয়ের জীবদ্দশার কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য রাখতে রোপণ করেছিলেন প্রায় ছয় হাজার গাছ।

 

বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে।

বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা এখনো নানামুখী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে— এমন তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

শনিবার (৪ অক্টোবর) বিকেল ৩টার পর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির তথ্য প্রকাশ করা হয়। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশে ৩৪ জন শিশু অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের অবস্থান অজানা। একই সময়ে ৮৩ জন কন্যাশিশু খুনের শিকার হয়েছে এবং ৫০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে, যাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।

এ ছাড়া, এই সময়ের মধ্যে ৫৪ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে এবং ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নানা মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণে ১০৪টি শিশু আত্মহত্যা করেছে, যা সমাজে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে যেখানে একজন নারী বা কন্যাশিশু কোনো ধরনের সহিংসতার ভয় ছাড়াই ঘর থেকে বের হতে পারবেন এবং নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুর অবস্থার কিছু পরিবর্তন হলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাল্যকাল থেকেই নারীদের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। তাদের শিক্ষা, পুষ্টি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, “নারীর অবস্থার পরিবর্তন মানে পুরো জাতির অবস্থার পরিবর্তন।”

সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব নিয়ে পাঁচবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। তিনি মন্তব্য করেন, “এই ঘটনায় নারী রাজনৈতিক অধিকার পরাজিত হয়েছে— জয়ী হয়েছে পুরুষতন্ত্র।”

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই। ফোরামের মতে, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— তিন পক্ষকেই আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

 

সন্তানের আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে কী করবেন?

বেশির ভাগ অভিভাবকই হয়তো এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়েন-আগে যে সন্তান মা বাবাকে চোখে হারাতো, হঠাৎ একসময় তার মাঝেই দেখা দেয় অস্বাভাবিক রাগ, জেদ কিংবা অবাধ্যতা। অনেক মা বলেন, “আমার ছেলে/মেয়ে হঠাৎ বদলে গেছে।” এমন পরিবর্তন নিছক মুডের ওঠানামা নয়, বরং এটি হতে পারে গভীর মানসিক সংকেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে কিশোর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ১৪% মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অথচ এই অঞ্চল, বিশেষ করে বাংলাদেশে, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা অনেক কম। ফলে খুব স্বাভাবিক পরিবর্তনও অনেক সময় বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। তিনা (ছদ্মনাম), বয়স বারো। আগে মা ছাড়া চলত না, মায়ের পেছনেই ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত। কিন্তু এখন তার চেহারাতেই বিরক্তি, কথা বললেই মুখ গোমড়া, রাগারাগি। মা জানালেন, কিছুদিন আগে তিনার ছোট ভাই জন্মেছে। এরপর থেকেই এমন আচরণ দেখা দিয়েছে। আদর, ভালোবাসা, খেলনা—সব দিয়েও যেন মন গলানো যাচ্ছে না। বরং দিন দিন সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন দেখে অনেক অভিভাবক চিন্তিত হয়ে পড়েন—“আমার সন্তান কেন এমন করছে?”

এখানে বিষয়টা বোঝা জরুরি। প্রথমেই যে ব্যাপারটি মাথায় রাখতে হবে, তা হলো—শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন কোনো একক ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে থাকে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক কারণ। ছোট ভাই জন্মের পর তিনার ভেতরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা মনোবিদ্যার ভাষায় ‘সিবলিং রাইভালরি’। অর্থাৎ, আগে সে যে গুরুত্ব পেত, এখন সেটি হঠাৎ হারিয়ে গেছে বলে তার মনে হচ্ছে। এতে করে তার মধ্যে অনিরাপত্তা, মনোযোগের ক্ষুধা এবং অভিমান তৈরি হয়েছে, যা বাইরে রাগ বা অবাধ্যতার রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।

একজন শিশুর জন্য মা–ই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। জন্মের পর থেকেই শিশুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ হয় মায়ের হাত ধরে। তাই মায়ের সঙ্গে তার যে আবেগগত বন্ধন তৈরি হয়, সেটি অন্য কারো সঙ্গে হয় না। আর সেই কারণেই, যখন শিশুটি কোনো মানসিক চাপে পড়ে, তখন প্রথমেই সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় মায়ের প্রতি। মা-ই হয়ে ওঠেন তার আবদার, অভিমান এমনকি রাগ প্রকাশের ‘নিরাপদ জায়গা’। অনেক সময় সন্তান মায়ের সঙ্গে যতটা অবাধ্য, অন্যদের সঙ্গে ততটা নয়—এটিও সেই মানসিক সংযুক্তির কারণেই হয়।

শিশু থেকে কিশোর বয়সে পা রাখার মধ্যবর্তী সময়টিও বেশ সংকটপূর্ণ। শারীরিক ও মানসিকভাবে তখন তারা নতুন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই বয়সে নিজেদের মতামত প্রকাশের চেষ্টা, স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠা এবং নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করার ইচ্ছা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রয়াসটি অনেক সময় রাগ, বিরক্তি বা মা–বাবার কথার বিরুদ্ধাচরণ হিসেবেই প্রকাশ পায়। অনেক সময় এটিকে ভুলভাবে বিশ্লেষণ করে বাবা–মা শাসনের পথ বেছে নেন, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।

এর বাইরেও কিছু মানসিক জটিলতা, যেমন ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder), ODD (Oppositional Defiant Disorder), বা বুদ্ধিবিকাশজনিত অন্যান্য সমস্যা শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি যদি পারিবারিক পরিবেশ অশান্ত হয়, বাবা–মায়ের মধ্যে কলহ থাকে, অথবা সন্তানের প্রতি অতি শাসন বা অবহেলা করা হয়, তাহলেও তার মনের ওপর চাপ তৈরি হয়। এসব কারণেই আচরণে দেখা দেয় হঠাৎ রাগ, জেদ বা বিরক্তি।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক প্রথমেই যা করেন, তা হলো বকা দেওয়া, মারধর বা আরও কঠোর হওয়া। অথচ, এভাবে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং শিশু আরও দূরে সরে যায়।
বকাঝকা না করে বরং সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন, সময় দিন। বোঝার চেষ্টা করুন, তার ভেতরে কী চলছে। হয়তো সে কোনো কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে, যা প্রকাশ করার ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। তখন তার রাগটাই হয়ে উঠছে সেই ভাষা। এই ভাষাকে ভুল না বুঝে বরং সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করুন। ধৈর্য ধরে পাশে থাকুন।

সবচেয়ে বড় কথা, সন্তান বড় হওয়ার মানে শুধু তাকে ভালো খাবার, ভালো স্কুল আর ভালো জামাকাপড় দেওয়া নয়। তার মন, তার অনুভূতি, তার বিকাশ—সবই যত্নের দাবি রাখে। আর এই যত্নের বড় অংশ জুড়ে আছে আপনার সহানুভূতি, বোঝার চেষ্টা আর সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত।

সন্তান হঠাৎ অবাধ্য হলে বলবেন না—”বাচ্চারা তো এমনই হয়!” বরং ভাবুন—”সে এমন করছে কেন?” তাহলেই আপনি পারবেন তার মন বুঝতে, এবং তাকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে।

 

নিউজিল্যান্ডে সম্পূর্ণ ফ্রি পিএইচডি স্কলারশিপ!

University of Otago ঘোষণা দিয়েছে ২০২৫ সালের জন্য পূর্ণ অর্থায়নে PhD Research Scholarship—এই সুযোগটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত!

ডেডলাইন: আবেদন সারা বছরজুড়েই খোলা থাকবে

বৃত্তির সুবিধাসমূহ:

  • সম্পূর্ণ টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে
  • গবেষণার জন্য বার্ষিক স্টাইপেন্ড প্রদান করা হবে
  • অতিরিক্ত গবেষণা সহায়তাও দেওয়া হবে
  • বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারবেন

এখনই আবেদন করুন: https://tinyurl.com/4rvya275

University of Otago PhD Scholarships 2025

 

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিধ্বস্ত সুদান, মৃত্যুর মিছিলে আফ্রিকা

সুদানে টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে সংঘাতে আজ দেশটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের কেন্দ্রে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, প্রায় এক কোটি বিশ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, এবং পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্ভিক্ষ ও ধ্বংসযজ্ঞ। পশ্চিম দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহর সম্প্রতি আরএসএফ বাহিনীর দখলে চলে গেছে, যেখানে তারা গণহত্যা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বের বিবেক আজ সুদানের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু যুদ্ধের আগুন যেন নিভছেই না।

এই গৃহযুদ্ধের সূচনা ২০১৯ সালে, প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতনের মধ্য দিয়ে। তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বশিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বৈরাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যখন জনরোষ তীব্র হয়, তখন সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু এতে দেশে স্থিতিশীলতা ফেরেনি। গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ চলতে থাকে, যার ফলে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু দুই বছর না যেতেই, ২০২১ সালের অক্টোবরে আবারও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এবার অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন দুই সেনানায়ক—জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো, যিনি “হেমেডটি” নামে পরিচিত।

এক সময় ঘনিষ্ঠ এই দুই সামরিক নেতা ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। মূল বিরোধ ছিল আরএসএফ বাহিনীর সৈন্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—এ নিয়েই। সেনাবাহিনী আশঙ্কা করেছিল, আরএসএফকে একীভূত করা হলে দাগালোর ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়। রাজধানী খার্তুমসহ বড় বড় শহরে বন্দুকের গুলি আর বোমার শব্দে কেঁপে ওঠে সুদান।

আরএসএফ বাহিনীর জন্ম ২০১৩ সালে, যার মূল শিকড় দারফুর অঞ্চলের কুখ্যাত জানজাওয়িদ মিলিশিয়ায়। ওমর আল-বশির শাসনামলে এই মিলিশিয়া বিদ্রোহীদের দমন করতে ভয়াবহভাবে নিপীড়ন চালায়—হত্যা, ধর্ষণ ও গণঅগ্নিসংযোগ তাদের নিত্যকার কৌশল ছিল। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে বশির এই মিলিশিয়াকে বৈধতা দেন এবং তাদের র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। দাগালো বা হেমেডটির নেতৃত্বে আরএসএফ খুব দ্রুত একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে আরএসএফ ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং সুদানের বিভিন্ন সোনার খনি দখলে নেয়। এই অর্থনৈতিক শক্তি দাগালোর হাতে ব্যাপক প্রভাব এনে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরএসএফ সেনাবাহিনীর সমান শক্তি অর্জন করে, এমনকি রাজধানী খার্তুমের একাংশও তারা দখল করে নেয়। বর্তমানে আরএসএফ সুদানের পশ্চিমাঞ্চল দারফুর, কোর্দোফানসহ বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি—এই অঞ্চলগুলো নিয়ে তারা একটি নতুন সরকার গঠন করবে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানের মতো আবারও দেশটি বিভক্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে উত্তর ও পূর্বাঞ্চল। সেনাপ্রধান জেনারেল আল-বুরহান এখন লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট সুদানকে নিজের প্রধান ঘাঁটি ঘোষণা করেছেন। এখান থেকেই জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ধারণা করা হয়, সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিচ্ছে মিসর, কারণ নীলনদ ও সীমান্তসংলগ্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দেশের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করেছে। তবে যুদ্ধের আগুন এখানেও ছড়িয়ে পড়েছে—২০২৫ সালের মার্চে আরএসএফ ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায় পোর্ট সুদানে, যেখানে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়।

দারফুর অঞ্চল আজ পরিণত হয়েছে মৃত্যুর উপত্যকায়। আরএসএফ ও তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘ, ইউনিসেফ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য—শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছে না। এমনকি এক বছর বয়সী শিশুদেরও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দারফুরের অনারব মাসালিট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আরএসএফ সেনারা বলেছে, “তোমাদের গর্ভে আরব সন্তান দেব।” এসব অপরাধে শুধু আরএসএফ নয়, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন এল-ফাশের অঞ্চলে থাকা আড়াই লাখের বেশি অনারব নাগরিক বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।

সুদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ। প্রায় উনিশ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশের সীমানা সাতটি আফ্রিকান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত, এবং লোহিত সাগরের তীরঘেঁষা অবস্থান এটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নীলনদও এই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। জনসংখ্যার অধিকাংশই মুসলিম, ভাষা আরবি ও ইংরেজি। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে নাগরিকদের গড় বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ৭৫০ ডলার। যুদ্ধের পর তা আরও কমে গেছে, রাষ্ট্রীয় আয় প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, লাখ লাখ মানুষ অনাহার ও রোগে ভুগছে।

সুদানের এই সংঘাত এখন শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি ধর্ম, জাতি, সম্পদ ও ক্ষমতার সংঘর্ষ।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল একে “মানবসভ্যতার অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি” হিসেবে দেখছে।
তবে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ—উভয় পক্ষই এখনো সমঝোতায় আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

এক সময় যে দেশ ইসলামি ঐতিহ্য, সোনার খনি আর নীলনদের জন্য গর্ব করত—
আজ সেই সুদান রক্ত, ধ্বংস আর ক্ষুধার রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

 

শিশুদের টাইপ ১ ডায়াবেটিস: একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে শিশুদের মধ্যে টাইপ ১ ডায়াবেটিসের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটি একটি বংশগত ও অটোইমিউন রোগ, যার ফলে শিশুর শরীর প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। অথচ এই রোগ সম্পর্কে আমাদের সমাজে সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত নয়।

এই লেখায় সহজভাবে জানবো—টাইপ ১ ডায়াবেটিস কী, শিশুদের মধ্যে এর লক্ষণ, চিকিৎসা, করণীয় এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তব চিত্র।

টাইপ ১ ডায়াবেটিস কী?
টাইপ ১ ডায়াবেটিস এমন একটি স্বাস্থ্যসমস্যা, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরির কোষগুলিকে আক্রমণ ও ধ্বংস করে ফেলে। ফলে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। ইনসুলিনের অভাবে রক্তের গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে না পেরে রক্তেই জমা হয়, যা নানা জটিলতা সৃষ্টি করে।

শিশুদের মধ্যে টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ

বারবার ও অতিরিক্ত প্রস্রাব হওয়া

সব সময় তৃষ্ণার্ত বোধ করা

ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া

ওজন কমে যাওয়া

ক্লান্তি ও দুর্বলতা

ঘন ঘন সংক্রমণ (যেমন: চামড়ায় ফুসকুড়ি, ফাংগাল ইনফেকশন)

ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে হঠাৎ প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা

অনেক সময় এসব উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে অজান্তে অবহেলা করা হয়, যার ফলে শিশু মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে বা ডায়াবেটিক কোমায় চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে টাইপ ১ ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে। অনেক অভিভাবক মনে করেন ডায়াবেটিস শুধুই প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা। ফলে শিশুদের লক্ষণগুলোকে চিহ্নিত করতেই সময় লেগে যায়।

বাস্তবিক কিছু চ্যালেঞ্জ:

ইনসুলিন ব্যবহারে সামাজিক ভয় বা সংকোচ

ইনসুলিন সংরক্ষণ এবং ইনজেকশন প্রয়োগের প্রযুক্তিগত অসুবিধা

স্কুলে ডায়াবেটিক শিশুদের জন্য আলাদা কোনো সহায়তা নেই

দরিদ্র পরিবারের শিশুরা প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সঠিক খাবার পায় না

চিকিৎসা ও করণীয়

টাইপ ১ ডায়াবেটিসের এখনো কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। তবে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাপনের মাধ্যমে শিশুরা স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ

নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা

স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস

বয়স অনুযায়ী শারীরিক কার্যকলাপ

সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন

বাবা-মা ও শিক্ষকের দায়িত্ব

লক্ষণ বুঝে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া

ইনসুলিন ব্যবহারে শিশুকে মানসিক শক্তি দেওয়া

স্কুলে শিক্ষকদের রোগ সম্পর্কে সচেতন করা

পরিবারে সহানুভূতিশীল ও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা

 

নারী: অগ্রযাত্রা, অর্জন আর অবমাননার দ্বৈত বাস্তবতা

একবিংশ শতকের বাংলাদেশে নারী আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন শুধু সংসারের দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও কাঁধে নিচ্ছেন। আকাশে বিমান চালাচ্ছেন, সমুদ্রপথে জাহাজ চালাচ্ছেন, পাহাড় জয়ের দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, আবার প্রশাসনের কড়িকাঠে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান গবেষণা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চ—সবখানেই নারীর দৃপ্ত পদচারণা আজ এক বাস্তবতা।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করা থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে, রাজনীতি থেকে কূটনীতি, কৃষি থেকে শিল্প, চিকিৎসা থেকে বিচারব্যবস্থা—সবখানেই সমানতালে এগিয়ে চলেছেন বাংলার নারী। বিমান চালনা, ট্রেন চালনা কিংবা শহরের রাইড শেয়ারিং—যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানেই নারী নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস পোশাকশিল্পে সবচেয়ে বড় অবদানও তাদেরই। এভারেস্টসহ বিশ্বের সাতটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছেন বাংলার নারী। এমনকি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনেও তাদের অংশগ্রহণ গৌরবময় অধ্যায় রচনা করছে।

বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নারীর অবস্থান দৃঢ় হচ্ছে। রাজনীতি, গবেষণা ও প্রশাসনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা নারী উদ্যোক্তা যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্জন করেন, তখন প্রমাণ মেলে—আজকের বাংলার নারী চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।

তবু বাস্তবতার আরেকটি মুখ রয়েছে। ঝকঝকে সাফল্যের নিচে লুকিয়ে আছে ঘন অন্ধকার। প্রতিদিন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে চোখে পড়ে নারী নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণ, পাচার, যৌতুকের দাবিতে হত্যা কিংবা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে আত্মহত্যা—এ যেন নিত্যদিনের ঘটনাপঞ্জি। ইয়াসমিন, সীমা রানী, তনু, নুসরাত, মিতু, চাঁপা রানীসহ অগণিত নাম সেই তালিকায় রয়ে গেছে। প্রতিটি ঘটনার সাময়িক প্রতিবাদ হলেও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা নারীর বেদনা বাড়িয়ে দেয়।

অথচ নারী নির্যাতন কোনো এক দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন গড়ে ৫০০জন নারী নির্যাতনের শিকার হন। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা বলছে, প্রতি ছয় নারীর মধ্যে একজন জীবনে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হন, যা ভয়াবহতায় সৌদি আরবকেও ছাড়িয়ে গেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উচ্চস্তর—কোথাও নারী নিরাপদ নন। গির্জার ভেতর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধানের নাম পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—একদিকে নারীর সাফল্য আর অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার এই দ্বৈত বাস্তবতা কতদিন চলবে? সমাজ কি সত্যিই নারীর অর্জনকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শিখেছে? নাকি এখনো গভীরে রয়ে গেছে নারীকে কেবল দুর্বল ও অধীনস্থ ভাবার প্রবণতা?

এই পরিস্থিতি বদলাতে শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন। দরকার শিক্ষা, সচেতনতা, মানবিকতা এবং নারী-পুরুষের সত্যিকারের সাম্যচর্চা। কারণ, নারী মর্যাদার লড়াই কোনো একক সংগ্রাম নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।

সেদিনই নারী সত্যিকার অর্থে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবেন, যেদিন আমরা তাকে নারী বলে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখবো।

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

ঢাকা: দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ব্র্যাক, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন এবং সুইডিশ উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা সিডার সহায়তায় ২ সেপ্টেম্বর ’ ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে নতুন প্রকল্প ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ (জিআরডিআরআরআইবি) এর উদ্বোধনী কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের সদস্য, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ বলেন, “দুর্যোগে প্রাণহানি কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনও অনেক বেশি। কার্যকর প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুর্যোগ ঝুঁকি বিমা চালু ও যথাযথ অর্থায়ন অপরিহার্য।”

ইউএন উইমেনের ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নবনিতা সিনহা বলেন, “বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্রণী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নারীরা ইতিমধ্যেই সম্মুখসারিতে আছেন। এখন তাদের নেতৃত্বের স্তরে উন্নীত করতে হবে।”

সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মাতিলদা স্ভেনসন বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলায় জেন্ডার সমতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি অপরিহার্য। সব পরিকল্পনায় নারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী গোলাম তৌসিফ বলেন, “নারীদের নেতৃত্ব দক্ষতা উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।” একই সঙ্গে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী—বিশেষত নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, “স্থানীয় প্রেক্ষাপট এবং জনগণের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি শক্তিশালী করা হবে।”

প্রকল্পের মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

  1. জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস নীতিমালা ও কার্যক্রমে লিঙ্গভিত্তিক সমতা সংযোজন।
  2. সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
  3. ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
  4. জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন (জিআইএচএ) ওয়ার্কিং গ্রুপসহ সমন্বয় কাঠামো শক্তিশালী করা।

এই প্রকল্প ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ভোলা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, খুলনা ও সাতক্ষীরায় বাস্তবায়িত হবে।

 

পিরিয়ডের ব্যথা : হার্ট অ্যাটাকের মতোই যন্ত্রণাদায়ক

পিরিয়ড বা মাসিক নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তীব্র ব্যথা ও অস্বস্তি, যা অনেক সময় স্বাভাবিক জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, কিছু নারীর জন্য এই ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের মতোই যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপক জন গুইলেবাউড এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, পিরিয়ডের সময় ব্যথা “হার্ট অ্যাটাকের থেকেও খারাপ হতে পারে।” তাঁর মতে, এই ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়; বরং এটিকে নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরেক গবেষক অলিভিয়া গোল্ডহিল জানান, মাসিকজনিত যন্ত্রণার সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ বিষয়ে গবেষণার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

পিরিয়ডের সময় যে তলপেটের তীব্র ব্যথা হয়, সেটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিসমেনোরিয়া বলা হয়।
প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে অন্তত একজন এই সমস্যায় ভোগেন।
তীব্র ব্যথার কারণে অনেক সময় হাঁটা-চলা বা স্বাভাবিক কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেকেই হটব্যাগ, প্যারাসিটামল বা অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করেন, তবে এটি স্থায়ী সমাধান না।

কেন হয় এই ব্যথা?
পিরিয়ডের সময় শরীর প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামের একটি রাসায়নিক তৈরি করে। এটি জরায়ুকে সংকুচিত করে এবং রক্ত প্রবাহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে জরায়ুর পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ হ্রাস পায়, আর তখনই ব্যথার উদ্ভব হয়।

এছাড়াও, এন্ডোমেট্রিওসিস নামক জটিলতায় অনেকে ভোগেন। এতে জরায়ুর কোষগুলো জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে, যা মাসিককে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে। দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীন থাকলে এটি বন্ধ্যাত্বের কারণও হতে পারে। তবে গবেষণা বলছে, এন্ডোমেট্রিওসিস একমাত্র কারণ নয়— অন্য শারীরবৃত্তীয় ও হরমোনজনিত কারণেও পিরিয়ডের ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে।

মানসিক প্রভাব
অধ্যাপক জন গুইলেবাউড মনে করেন, এই সময়ে নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেজাজ ও মানসিক অবস্থায় ব্যাপক ওঠানামা হয়। ফলে শারীরিক কষ্টের সঙ্গে মানসিক চাপও যুক্ত হয়।

করণীয়
ব্যথা যদি সহনীয় না হয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ ব্যথা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতি সহমর্মিতা ও বাড়তি যত্ন নেওয়া উচিত। কারণ অনেক সময় মানসিক সহায়তাই শারীরিক কষ্ট কমাতে কার্যকর হয়।

 

“আমার বিড়াল, টিয়া আর কচ্ছপ—ওরাই আমার আত্মা”

দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে অবশেষে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। গাজার মানুষ ধীরে ধীরে ভাঙাচোরা জীবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছে। কেউ ফিরছেন ভগ্ন ঘরে, কেউ নতুন আশ্রয়ে—কিন্তু প্রত্যেকেরই বুকে জমে আছে হারানোর যন্ত্রণা আর স্মৃতির ভার।

এই ভগ্ন জীবনের মাঝেই এক গাজাবাসী নারী তার ভালোবাসা, বেঁচে থাকার প্রতীক হিসেবে আগলে রেখেছেন তার পোষা প্রাণীদের—একটি কচ্ছপ, একটি টিয়া পাখি ‘বিকো’ এবং একটি বিড়াল ‘লুকা’।

“আমার পোষা প্রাণীরা আমার আত্মা,” তিনি বলেন। “যেখানেই যাই, ওরা আমার সঙ্গে থাকে। আমি ওদের আমার সন্তানের মতোই দেখি।”

ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিজের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এখন তিনি মায়ের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে ছেলে সন্তানসহ বসবাস করছেন। যুদ্ধের সময় বহুবার স্থানচ্যুত হতে হয়েছে, কখনও কয়েকদিন রাস্তায়ও কাটাতে হয়েছে।

তার পোষা প্রাণীদের নিয়েও কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। যুদ্ধের সময় পাখির খাঁচা ভেঙে যায়, খাবারেরও তীব্র অভাব ছিল। কিন্তু তিনি বলেন, “আমি ওদের কিছু হতে দেব না। বিকো, লুকা, আর আমার কচ্ছপ—ওরা আমার সন্তান, আমার আত্মা। আমি কাঁদলে লুকাও কাঁদে।”

গাজার এই নারীর গল্পটি কেবল একটি পরিবারের নয়—এ যেন সমগ্র প্যালেস্টাইনের সেই মানবিক প্রতিচ্ছবি, যেখানে যুদ্ধ ধ্বংস করে ঘরবাড়ি, কিন্তু ভালোবাসা এখনো বাঁচিয়ে রাখে মানুষের প্রাণ।

 

যৌন হয়রানি ও নারী নির্যাতনের বিচার দাবিতে দেশজুড়ে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার মানববন্ধন

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে মাদরাসাছাত্রী ধর্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে নারী যৌন হয়রানির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে বক্তারা সাম্প্রতিক নারী নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান।

রোববার (২০ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নারী হেনস্তার প্রতিবাদে মানববন্ধন করে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
আয়োজনে বক্তারা বলেন, দেশে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহস পাচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন, অনেক সময় ধর্ষণের শিকার নারীদেরই দায়ী করা হয়, যা ভুক্তভোগীর প্রতি চরম অন্যায় ও অপমানজনক।
বক্তারা আরও বলেন, “যে সরকারের প্রতি জনগণ আশা রেখেছিল নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেই সরকারই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রশাসন অনেক সময় ধর্ষণের মামলা রুজুতে গড়িমসি করে, এমনকি ভিক্টিমের বয়স বাড়িয়ে ঘটনা আড়াল করারও চেষ্টা চলে।”

একই দিন বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে মানববন্ধন করে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা, রাবি শাখা।
ছাত্রী সংস্থার নবনির্বাচিত সহ-বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ফাতেমাতুস সানিহা বলেন, “দেশে চলতি বছর ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি। কালিয়াকৈরের ১৩ বছরের মাদরাসাছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনায়ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।”
রাবি শাখার সহ-নেত্রী সাইফুন নাশীদা বলেন, “ধর্ষকের কোনো ধর্ম নেই। অপরাধী যখন ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করতে চায়, তখন সেটি সমাজের নৈতিক পতনের প্রতিফলন।”

পরদিন মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে মানববন্ধন করে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা, চবি শাখা।
শাখার সেক্রেটারি ও চাকসুর ছাত্রীকল্যাণ সম্পাদক নাহিমা আক্তার দীপা বলেন, “রাষ্ট্রের নীরবতা ও সামাজিক উদাসীনতাই নারী নির্যাতনের পুনরাবৃত্তির মূল কারণ। আমরা কেবল প্রতিবাদ জানাতে নয়, প্রতিকার ও জবাবদিহিতার দাবি নিয়েই আজকে দাঁড়িয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
চবি শাখার প্রচার সম্পাদক উমাইমা শিবলী রিমা বলেন, “২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে ২৭ হাজারেরও বেশি নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৮১ জন নারী। কিন্তু এসব ঘটনার অধিকাংশই বিচারহীন রয়ে গেছে।”

অন্যদিকে সংগঠনের প্রতিনিধি তাওফিকা রহমান বলেন, “কালিয়াকৈরের ঘটনায় পুলিশের বিবৃতি বিভ্রান্তিকর। ১৩ বছরের একটি শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক কোনোভাবেই ‘প্রেমের সম্পর্ক’ হতে পারে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী এটি স্পষ্ট ধর্ষণ।”

তিনটি শাখার মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করা, তদন্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ রাখা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তারা সমাজে নৈতিক ও মানসিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন।

নারী_নিরাপত্তা

#যৌনহয়রানি #ধর্ষণবিরোধীপ্রতিবাদ #ইসলামীছাত্রীসংস্থা

ঢাবি #রাবি #চবি

#কালিয়াকৈরধর্ষণ #বিচারচাই
#রাষ্ট্রের_জবাবদিহিতা

 

বিনা মূল্যে ফ্যাশন ডিজাইন ও মার্চেন্ডাইজিংয়ে প্রশিক্ষণ

শান্ত-মারিয়ম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি নিয়ে এসেছে দারুণ সুযোগ!
বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগ, বিজিএমইএ ও এসআইসিআইপি’র সহযোগিতায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে তিন মাস মেয়াদি দুটি কোর্সে ভর্তি চলছে।

আবেদনের শেষ তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫
কোর্সসমূহ:
১️⃣ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজিং
২️⃣ থ্রিডি ফ্যাশন ডিজাইনিং

যা পাবেন:
প্রশিক্ষণ শেষে সার্টিফিকেট

ভাতা সুবিধা

চাকরির জন্য সহযোগিতা

দরিদ্র, নারী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পাবেন।

আবেদনের জন্য প্রয়োজন:
পাসপোর্ট সাইজের ১ কপি ছবি

এনআইডি কার্ডের ফটোকপি

অনার্স/ডিগ্রি পাসের সার্টিফিকেট

🌐 বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন:
🔗 https://smuct.ac.bd/
📢 সুযোগ সীমিত—আজই আবেদন করুন!

 

হিফজুল কুরআন অনলাইন ইনস্টিটিউটের প্রীতিমিলনী ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন

ঢাকা, ২৫ অক্টোবর ২০২৫:
হিফজুল কুরআন অনলাইন ইনস্টিটিউট আয়োজিত প্রীতিমিলনী ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। দিনব্যাপী আয়োজনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অতিথিদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে করেছে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দারস পেশ করেন- হাফিজা ফতেমা।
এরপর পবিত্র কুরআনের উপর নির্মিত একটা ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়। যার তথ‍্যের উপর ভিত্তি করে অনলাইনে কুইজ প্রতিযোগিতা নেওয়া হয় যা দশর্কদের কাছে খুব ভালো লেগেছে।

অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলো উস্তাজা ও হাফিজা সংবর্ধনা পর্ব।
উস্তাজা সংবর্ধনা পর্বে সংবর্ধনা প্রদান করেন মুহতারামা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা ও হাফিজা ফাতেমা সুলতানা।
এই সময় স্টেজে হিফজুল কুরআন অনলাইন ইনিস্টিটিউটের উস্তাজারা উপস্থিত ছিলেন—
হাফিজা শাহীনা আক্তার, হাফিজা মাকসুরা মারদিয়া, হাফিজা আফসানা মাসুম, হাফিজা গাজী শামসুন্নাহার, হাফিজা খাদিজাতুল কোবরা, মোয়াল্লিমা রহীমা আক্তার ও মারিয়াম রুম্মানা।
এরপর আল কুরআনের দাবী আমাদের অবস্থান ও করনীয় এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন
প্রফেসর শামীমা ইয়াসমিন, বিভাগীয় প্রধান, সমাজ কর্ম বিভাগ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ।
“আল কুরআনের মিরাকল” বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রফেসর তাহমিনা ইয়াসমিন, ভাইস প্রিন্সিপাল, মানারাত ঢাকা।

আরেকটি আকর্ষণীয় পর্ব ছিলো হাফিজা সংবর্ধনা।এ পর্বে সংবর্ধনা প্রদান করেন প্রফেসর ড. নাঈমা মোয়াজ্জেম ও ড. জয়নব এম. ডি. সিদ্দিকুর রহমান, এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পর্বে স্টেজে আসেন হাফিজাগণ—
হাফিজা আফরা আল গালিবা, হাফিজা মীর মুমতাজা ফেরদৌস, হাফিজা মারিয়া আজিমি, হাফিজা আসিফা বিনতে আরশাদ, হাফিজা যয়নব বিনতে হোসাইন, হাফিজা সিরাজাম মুনিরা ফারিহা, হাফিজা তাকিয়া মেহজাবিন আব্দুল্লাহ, হাফিজা ফাতেমা আলম তাকওয়া, হাফিজা মুতহহারা হাফসা, হাফিজা হাফসা বিনতে আনোয়ার, হাফিজা আয়েশা আরীবা, হাফিজা আকিফা ইসলাম, হাফিজা কামরুন্নাহার মীম এবং হাফিজা খুলাইবা রহমান খুশবু।

হাফিজাদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করেন নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, সেক্রেটারি, মহিলা বিভাগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও অধ্যক্ষ দেশিক।

পরবর্তী পর্বে হিফজ ও কুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়।
পুরস্কার প্রদান করেন প্রফেসর ড. নাঈমা মোয়াজ্জেম, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে প্রফেসর ড. নাঈমা মোয়াজ্জেম হাফিজা দের মযার্দার কথা তুলে ধরে তাদেরকে অভিনন্দন জানান।


অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন হিফাজুল কুরআন অনলাইন ইনিস্টিটিউটের ফাউন্ডার আখি ফেরদৌসী।তিনি হিফজুল কুরআন অনলাইন ইনস্টিটিউটের এই আয়োজন ইসলাম, জ্ঞান ও নৈতিকতার আলোকে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিলো তেলাওয়াত, নাশিদ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রিদওয়ান
জাইমা নূর, নুসাইবা নিসা, রাহী, নাবিহা নূর সাওদা,এবং নুসরাতের কণ্ঠে পরিবেশিত নাশিদ সমূহ দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। জাইমা নূরের দলের পনের মিনিট ব্যাপী মেশাপের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা ছিলো অতুলনীয় ও ব্যতিক্রমী।আগত দর্শনার্থীদের অনুভূতি ছিলো তারা এ ধরনের আয়োজন আরো দেখতে চায়। ইসলামী সাংস্কৃতির প্রসারে এ ধরনের উদ্যোগকে তারা সাধুবাদ জানান।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক মেরি ই. ব্রাঙ্কো

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয় করলেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক মেরি ই. ব্রাঙ্কো। তাঁর সঙ্গে এ বছরের পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেড র‌্যামসডেল ও জাপানের শিমোন সাকাগুচি। তারা তিনজন যৌথভাবে এই সম্মান অর্জন করেছেন মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে।

 সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় সুইডেনের স্টকহোম থেকে ২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট। 

নোবেল কমিটির ঘোষণায় জানানো হয়, তারা “পরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স” সম্পর্কিত মৌলিক আবিষ্কারের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং ক্যানসার ও অটোইমিউন রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।

মেরি ব্রাঙ্কো ও তাঁর সহগবেষকরা দেখিয়েছেন, দেহে বিশেষ ধরনের প্রতিরোধক কোষ থাকে—রেগুলেটরি টি সেলস, যা আমাদের প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে নিজের শরীর আক্রমণ করা থেকে রক্ষা করে।

মেরি ই. ব্রাঙ্কো ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বর্তমানে সিয়াটলের ইনস্টিটিউট ফর সিস্টেমস বায়োলজি-তে সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত।

নারী গবেষক হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর এই অর্জন বিজ্ঞান জগতে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁর অবদান ক্যানসার ও অটোইমিউন রোগের চিকিৎসা গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলে আশা করছে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।

উল্লেখ্য, মেরি ব্রাঙ্কো, ফ্রেড র‌্যামসডেল ও শিমোন সাকাগুচি তিনজন মিলে ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি টাকা) পুরস্কার অর্থ ভাগ করে নেবেন।

 

বুয়েটের স্বঘোষিত ধর্ষক: কোথায় বাস করছি আমরা?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)—দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীর স্বীকারোক্তি এখন পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে।
বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী ‘শ্রীশান্ত রায়’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে লিখেছে, কীভাবে সে তার এক সহপাঠী মুসলিম মেয়েকে মাদক খাইয়ে ধর্ষণ করেছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো—সে নিজ অপরাধ নিয়েই নির্লজ্জভাবে গর্ব করেছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই বুয়েট ক্যাম্পাসে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার রাতভর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে, অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করে তোলে। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, লজ্জা ও গভীর হতাশা। তারা যেন নিজেদেরই প্রশ্ন করছিল—“আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠতে পারছি?”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাটির পর জরুরি বৈঠক ডেকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে এবং বিস্তারিত তদন্তের আশ্বাস দেয়। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি এই ধরনের অপরাধের কোনো স্থান কোনো ক্যাম্পাসে বা সমাজে হতে পারে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা কেবল একজন অপরাধীর নয়; বরং এটি একটি প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। আমরা শিক্ষা দিচ্ছি, ডিগ্রি দিচ্ছি—কিন্তু মানুষ গড়ার শিক্ষা দিতে পারছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, “প্রযুক্তি আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু মূল্যবোধের শিক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবার ও সমাজ মিলে তরুণদের নৈতিক শূন্যতায় ঠেলে দিচ্ছে।”

তরুণদের একটি বড় অংশ এখন ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও রেডিটের মতো ভার্চুয়াল জগতে নিমগ্ন। সেখানে অশ্লীলতা, সহিংসতা ও বিকৃত আনন্দকে ‘স্বাভাবিক’ মনে করা হয়। ফলস্বরূপ, বাস্তব জীবনের নৈতিক মূল্যবোধ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

পরিণতিতে বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে হাজারেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের বড় অংশই কিশোরী বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রী।
শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার পেতে বছরের পর বছর কেটে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার মেয়েটিই সমাজের কটূ মন্তব্য ও দোষারোপের শিকার হয়। এই অন্যায় সংস্কৃতিই অপরাধীদের সাহস জোগায়, তারা ভাবে—“কেউই কিছু করতে পারবে না।”

চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ২১ দিনেই দেশে অন্তত চারটি ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে। বুয়েটের ঘটনাটি যেন তারই ধারাবাহিকতা। সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন নীরব, মিডিয়াও অনেক সময় নিরব।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্নভাবে অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তি কার্যকর না হওয়াই আজ ধর্ষকদের সাহস বাড়িয়ে তুলছে। প্রশ্ন উঠছে—কেন বিচার হয় না? কারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষা এখন কেবল পেশা ও ডিগ্রির সীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা নেই, স্কুলে নেই চরিত্রগঠনের পাঠ, সমাজে নেই দায়িত্ববোধ। ফলে তরুণ প্রজন্ম এক ধরনের অন্ধকারে হাঁটছে, যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে ‘পুরনো’ মনে করা হয়।
আইন বিশ্লেষক ব্যারিস্টার আনিসুর রহমান বলেন, “ধর্ষণ এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি এক সামাজিক রোগ। এর চিকিৎসা শুধুমাত্র আইনের মাধ্যমে নয়, মূল্যবোধ ও আত্মিক শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব।”

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা এখন রাস্তায়। তাদের প্রতিবাদ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেকের লড়াই।
সমাজ যদি এখনই না জেগে ওঠে, তবে একদিন এই অন্ধকার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করবে। এই দেশের মেয়েরা, শিশুরা, মায়েরা—তাদের নিরাপত্তা দান করা আমাদেরই দায়িত্ব। আর যদি আমরা এখনো নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

 

ইবিতে মেহেদি উৎসবের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার আত্মপ্রকাশ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বটতলায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী মেহেদী উৎসব।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা এই উৎসবের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
অনুষ্ঠানে ইংরেজি বিভাগের (২০১৮-১৯ সেশন) শিক্ষার্থী ইয়াসমিন আক্তার শাখার সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উৎসব প্রাঙ্গণে বিভিন্ন বিভাগের নারী শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। তারা আনন্দঘন পরিবেশে মেহেদি অঙ্কন ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক নানা কার্যক্রমে অংশ নেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসমিন আক্তার বলেন,
“ছাত্রী সংস্থার এমন আয়োজন দেখে সত্যিই ভালো লেগেছে। বান্ধবীদের নিয়ে মেহেদি দিতে চলে এসেছি। এখানের আপুরা খুব আন্তরিক, চাই তারা এমন আয়োজন আরও বেশি করুক।”

নবনিযুক্ত সভানেত্রী ইয়াসমিন আক্তার বলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে এ আয়োজন করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এটি ছাত্রীদের জন্য একটি সুস্থ ও ইতিবাচক সংস্কৃতিচর্চার অংশ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে এমন আয়োজন সম্ভব হয়নি, কিন্তু এখন আমরা নতুনভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এমন আয়োজন করা হবে।”

উৎসব চলাকালীন সময়ে সংগঠনের সদস্যরা নতুন সদস্য আহ্বান করেন এবং নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রচারপত্র বিতরণ করেন। উৎসব প্রাঙ্গণে বন্ধুত্বপূর্ণ, সৌহার্দ্য ও সৃজনশীলতার এক অনন্য মিলনমেলা তৈরি হয়।

 

প্রতিবন্ধী নারীদের মধ্যে সহিংসতার শিকার প্রতি তিনজনের একজন

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারী ও কন্যাদের জীবন প্রতিদিনই লড়াইয়ের। শুধু শারীরিক নয়—এই লড়াই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত। একদিকে নারী হওয়ায় লিঙ্গজনিত বৈষম্য, অন্যদিকে প্রতিবন্ধকতা—এই দ্বৈত প্রান্তিকতা তাদের জীবনে সৃষ্টি করছে বহুমাত্রিক বঞ্চনা ও সহিংসতার ঝুঁকি।

বেসরকারি সংস্থা উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (WDDF) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণা জানায়, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি তিনজনের একজন কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার। পাশাপাশি ৭৫ শতাংশ নারী শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুতর বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
রাজধানীর একটি হোটেলে শনিবার প্রকাশিত ‘প্রতিবন্ধকতার শিকার নারীদের ওপর যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে এই তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ভাস্কর ভট্টাচার্য ও সিনারজি সলিউশনসের প্রধান নির্বাহী মোজাহিদুল ইসলাম। ২০২৪ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলায় পরিচালিত এই জরিপে অংশ নেন ২ হাজার ১৩২ জন উত্তরদাতা।
গবেষণায় দেখা যায়—
৭৫% নারী শিক্ষা অর্জনে গুরুতর বাধার মুখে

প্রায় ৪৯% নারী কখনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি

৫২% এর বেশি নারী বেকার, আর মাত্র ৪.৮৩% কোনোভাবে চাকরিতে যুক্ত

৭৮% নারী জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র তাদের জন্য প্রবেশগম্য নয়

এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী নারীরা নাগরিক অধিকার প্রয়োগ, বিশেষ করে রাজনৈতিক অংশগ্রহণে, ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৫% নারী বলেন, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যই তাদের প্রধান বাধা।
অন্যদিকে, ৪০% নারী জানেনই না যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা কী। তবু ৩০.৪৯% নারী স্বীকার করেছেন, তারা কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ছিল শারীরিক নির্যাতন (৭০%), এরপর মানসিক নির্যাতন (৫৬%)।

গবেষণা প্রতিবেদনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডব্লিউডিডিএফের চেয়ারপারসন শিরিন আক্তার। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক। উপস্থিত ছিলেন বি-স্ক্যানের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব এবং মানবাধিকার নেত্রী শিফা হাফিজাসহ আরও অনেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমাজে প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে কোনো নীতি বা প্রকল্পই টেকসই হবে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

 

ইইউ কার্যালয়ে জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের সৌজন্য সাক্ষাৎ

২০ অক্টোবর ২০২৫ সকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) ডেপুটি চীফ বাইবা জারিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র মহিলা বিভাগীয় সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নূরুন্নিসা সিদ্দীকার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ইইউ কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে অংশ নেয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. হাবীবা আক্তার চৌধুরী, এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী, আয়েশা সিদ্দিকা পারভীন, সুফিয়া জামাল—সবাই কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য; এবং লায়লা মরিয়ম, সদস্য, এডভাইসারি কাউন্সিল, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ।

বৈঠকটি অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় উভয় পক্ষ পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং ভবিষ্যতেও সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

 

গুম কমিশনের মস্তিষ্ক ড. নাবিলা ইদ্রিস

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বলপূর্বক গুম ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানে গঠিত “গুম অনুসন্ধান কমিশন” এখন এক ঐতিহাসিক প্রয়াসের প্রতীক। এই কমিশন শুধু অতীতের অন্ধকার উন্মোচন করছে না, বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের নতুন এক আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ড. নাবিলা ইদ্রিস—যিনি বর্তমানে “গুম কমিশনের মস্তিষ্ক” হিসেবে সর্বত্র পরিচিত।

ড. নাবিলা ইদ্রিস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গবেষক ও নীতিবিশ্লেষক। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের Open University-তে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তিনি বৈশ্বিক সামাজিক সুরক্ষা (Global Social Protection Fund) বিষয়ক গবেষণায় যুক্ত। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD)-এর খণ্ডকালীন গবেষক হিসেবেও কাজ করছেন।
তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের US State Department IVLP প্রোগ্রামের ফেলো হিসেবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। চীন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে নীতি বিশ্লেষণ, শাসনব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে তার বিস্তৃত কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামো, নীতি নির্ধারণের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। এই তাত্ত্বিক গভীরতা ও বিশ্লেষণী নেতৃত্বের ফলেই গুম অনুসন্ধান কমিশন আজ একটি প্রমাণনির্ভর, নিরপেক্ষ ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে কাজ চললেও, কমিশনের দিকনির্দেশনা, গবেষণা পরিকল্পনা, তথ্য বিশ্লেষণ ও সুপারিশ প্রণয়নের মূল দায়িত্বে রয়েছেন ড. নাবিলা ইদ্রিস। তার তত্ত্বাবধানে কমিশন ইতোমধ্যে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন ও একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংঘটিত শতাধিক বলপূর্বক গুমের সত্যতা ও পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য—গাড়ির ভেতরে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা, বিষ প্রয়োগ, কিংবা লাশ রেললাইনে ফেলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের হাতে হ্যান্ডকাফসহ মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এমন অগণিত প্রমাণ কমিশনের প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে।

ড. নাবিলার নির্দেশনায় কমিশন শুধু ঘটনাগুলোর তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভবিষ্যতের জন্য নীতিগত সংস্কারেরও প্রস্তাব দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো হলো—
গুমের শিকার পরিবারদের জন্য “ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স সার্টিফিকেট” প্রবর্তন, যাতে তারা আইনি স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য মানসিক ও আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন।

নাগরিক সমাজের বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. নাবিলা ইদ্রিস এই কমিশনকে কেবল তথ্য-সংগ্রহের কাঠামোতে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি এটিকে এক নৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেছেন—যেখানে প্রতিটি সাক্ষ্য, প্রতিটি দলিল, প্রতিটি পরিবারিক কান্না হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার দলিল।

একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মীর ভাষায়, “নাবিলা ইদ্রিস হচ্ছেন সেই কণ্ঠ, যিনি ভয় নয়, তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তার মতো মানুষের হাতেই জনগণের আস্থা ফিরছে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায়।”

আজ “গুম অনুসন্ধান কমিশন” শুধু নিখোঁজদের তথ্যভান্ডার নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে ন্যায়, সাহস ও মানবতার নতুন সংলাপ।
আর এই সংলাপের সূক্ষ্ম নকশাকার—ড. নাবিলা ইদ্রিস, যিনি প্রমাণ করছেন, গবেষণা ও নৈতিকতার সমন্বয়েই সম্ভব সত্যের পুনরুদ্ধার।

রাষ্ট্রের নীরব অন্ধকারের ভিতর থেকে তিনি যেন আলোর রেখা টেনে আনছেন-একজন নারী, এক গবেষক, এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর—বাংলাদেশের গুম ইতিহাসে ন্যায়ের নতুন নির্মাতা, ড. নাবিলা ইদ্রিস।

 

মুক্তি পাওয়া দুই নারী বন্দি: সেহাম আবু সালেম ও মিরফাত খলিল

গাজা | ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন দুই বীর ফিলিস্তিনি নারী বন্দি — সেহাম আবু সালেম ও মিরফাত খলিল। তারা দুজনেই গাজা সিটির বাসিন্দা এবং বহু বছর ধরে ইসরায়েলি কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ছিলেন।

সেহাম আবু সালেম (উম খলিল) — বয়স সত্তরেরও বেশি। গাজা সিটির এই প্রবীণ নারী প্রথমবার গ্রেফতার হন ২০১৫ সালে। এরপর একাধিকবার আটক হন ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে। তাঁর দুই কন্যা, সুযান ও রাবাব, পূর্বে বন্দি বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু সেহাম আবু সালেম দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন।
সর্বশেষ তাঁকে গ্রেফতার করা হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, এবং আজ, বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি মুক্তি পান।

অন্যদিকে, মিরফাত খলিল গাজারই আরেক সাহসী নারী। তাঁকে ২০২০ সালে গ্রেফতার করা হয়, অভিযোগ ছিল তিনি হামাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসরায়েলি কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী অবস্থান এবং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হন।

এই দুই নারী বন্দি বছরের পর বছর অন্যায় আটক ও নির্যাতনের মধ্যেও অদম্য সাহসিকতা দেখিয়েছেন। তাঁদের মুক্তি গাজার মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

 

রাসায়নিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের গর্ব অধ্যাপক ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা

অধ্যাপক ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল বিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষিকা, যিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রাসায়নিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন।
ড. রাজিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় বুয়েটে, যেখানে তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল শিল্প প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে, যা পরবর্তীতে তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাজীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

পিএইচডি শেষ করার পর তিনি বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি দেশের একজন পরিচিত কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে কেমিক্যাল সেফটি ও সিকিউরিটি, প্রক্রিয়া নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ডিস্টিলেশন ও সেপারেশন প্রক্রিয়া, এবং শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণা কাজগুলো শুধু একাডেমিক জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং দেশের শিল্পখাতেও নিরাপত্তা সংস্কৃতি গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি নিয়মিত আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ড. রাজিয়ার আন্তর্জাতিক অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি OPCW (Organization for the Prohibition of Chemical Weapons)-এর Scientific Advisory Board-এর সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। এই পদে থাকাকালীন তিনি বিশ্বব্যাপী রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ এবং কেমিক্যাল সিকিউরিটির নীতি ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী হিসেবে এই বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব দেশের জন্য গর্বের।

২০২৩ সালে ড. সৈয়দা রাজিয়া “The Hague Award” লাভ করেন, যা OPCW প্রদত্ত একটি সম্মানজনক পুরস্কার, রাসায়নিক নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য প্রদান করা হয়। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী বিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মান লাভ করেছেন। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাগত জগতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে ড. রাজিয়া শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই জ্ঞান নয়, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও নিরাপত্তাবোধ শেখান।
তিনি নিয়মিত কিছু কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন, যেখানে শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী এবং শিল্পকর্মীরা রাসায়নিক ঝুঁকি এবং নিরাপদ প্রক্রিয়া পরিচালনার আধুনিক ধারণা শিখতে পারেন। তাঁর এই উদ্যোগগুলো দেশের শিল্পখাত ও একাডেমিয়ায় নিরাপত্তা সংস্কৃতি গঠনে অমূল্য ভূমিকা রেখেছে।

ড. রাজিয়ার গবেষণা এবং প্রকাশনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কেমিক্যাল সেফটি, প্রক্রিয়া নিরাপত্তা, এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানদণ্ডে দেশকে পরিচিতি দিয়েছে। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সিম্পোজিয়ামে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ভাগাভাগি করেন এবং বহু বৈজ্ঞানিক বোর্ডে সম্পাদনা দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে, তিনি একজন প্রেরণাদায়ী শিক্ষক। তাঁর শিক্ষার্থীরা বলছেন, “ম্যাডাম শুধু ক্লাসে পড়ান না, জীবনেও শেখান কীভাবে দায়িত্বশীল ও নৈতিক গবেষক হওয়া যায়।” তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে বিজ্ঞান তখনই সত্যিকার অর্থে কল্যাণকর, যখন তা মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও সুন্দর করে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর গবেষণা, নেতৃত্ব এবং নৈতিক দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য এক দৃষ্টান্ত। তার মতে বিজ্ঞান কেবল জ্ঞান নয়, বরং একধরনের মানবিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বকে তিনি নীরবে, নিষ্ঠাভরে দেশের ও বিশ্বের কল্যাণে পালন করছেন।

 

নারীদের চারটি আইটি কোর্সে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের সুযোগ

ডিজিটাল দক্ষতায় নারীদের আরও একধাপ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই) এবং দ্য এভারেস্ট আইটি একত্রে নিয়ে এসেছে অনন্য উদ্যোগ। বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় আয়োজন করা হয়েছে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চারটি আইটি প্রশিক্ষণ কোর্সের।

তিন মাস মেয়াদি এই কোর্সগুলোয় নারীরা পাবেন আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা করে ক্লাসে অংশ নিয়ে গড়ে তোলা হবে নতুন প্রজন্মের দক্ষ নারী আইটি প্রফেশনাল।

চারটি প্রশিক্ষণ কোর্স:
১️. কম্পিউটার অপারেশন (লেভেল–৩)
২️.ফ্রিল্যান্সের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং (লেভেল–৩)
৩️. গ্রাফিকস ডিজাইন (লেভেল–৩)
৪.ফ্রিল্যান্সের জন্য গ্রাফিকস ডিজাইন (লেভেল–৩)

যোগ্যতা:
ন্যূনতম এসএসসি পাস বা সমমান।

সুবিধাসমূহ:
কোর্স শেষে সরকারি অনুমোদিত (NSDA) সনদপত্র প্রদান

ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজের অগ্রাধিকার

চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ

ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টে সহায়তা

ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
১️পূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত (সিভি)
২️ দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি
৩️ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ
৪️ জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কপি

ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য:
আসনসংখ্যা সীমিত

প্রতি ব্যাচে ২৪ জন প্রশিক্ষণার্থী

আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে ভর্তি

অনলাইনে আবেদন করুন এখানে:
https://tinyurl.com/ymyt7775

নিজেকে বদলে নিন, নিজের হাতে গড়ে তুলুন নতুন ক্যারিয়ার!

 

ঢাবিতে ছাত্রীসংস্থার উদ্যোগে চারদিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প শুরু

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ইসলামী ছাত্রীসংস্থা চারদিনব্যাপী একটি মানসিক স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা রক্ষা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক চিন্তা চর্চার প্রতি উৎসাহ জাগানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

ক্যাম্পের প্রথম দিন, সোমবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সুফিয়া কামাল হলে সেবা প্রদান করা হয়। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা সম্পর্কের সংকট, পরীক্ষার ভয়, মানসিক চাপ এবং ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নেন।

পরবর্তী তিনদিন এই কার্যক্রম চলবে ঢাবির বিভিন্ন হলে। ১৪ অক্টোবর রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হলে, ১৫ অক্টোবর বঙ্গমাতা ও কুয়েত মৈত্রী হলে, এবং ১৬ অক্টোবর শহীদ অ্যাথলেট সুলতানা কামাল হোস্টেল (লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট)-এ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

এই ক্যাম্পে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, আত্মহত্যার চিন্তা প্রতিরোধ, ডিভাইস আসক্তি থেকে মুক্তি, অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট, ওসিডি, প্যানিক ডিজঅর্ডার, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (PTSD), অনিদ্রা, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—এসব বিষয়ে পরামর্শ ও কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখানে বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে তাদের মানসিক সংকটের সমাধান পাচ্ছেন।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লোপা রহমানা বলেন, “অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আত্মহত্যা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যার দিকে ধাবিত হয়। এই ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে দৃঢ় হতে সহায়তা করবে।” অপর এক শিক্ষার্থী মাহমুদা জানান, “দীর্ঘদিনের অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা অনেক সময় মনকে ক্লান্ত করে তোলে। এই ক্যাম্প শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বস্তি ও নতুন করে পথচলার অনুপ্রেরণা দেবে।”

আয়োজক ছাত্রীসংস্থার নেত্রীরা জানান, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের সহনশীল ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। তারা আরও বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা এই ক্যাম্পে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কাউন্সেলিং সেবা নিতে পারবেন।”

এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রীসংস্থা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি এবং পারস্পরিক সহানুভূতির পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে এটি শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

গ্রামীণ নারীদের উদ্যোগে মানিকগঞ্জে পরিবেশবান্ধব ‘চুলা মেলা’

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার পুটাইল ইউনিয়নের মান্তা মধ্যপাড়া গ্রামে সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হলো এক ভিন্নধর্মী আয়োজন—পরিবেশবান্ধব চুলা ও হাজল মেলা। দিনব্যাপী এ মেলায় অংশ নেন প্রায় দুই শতাধিক কৃষক-কৃষাণী। আয়োজন করে স্থানীয় মান্তা নারী সংগঠন, সহযোগিতায় ছিল গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’।

মেলায় প্রদর্শিত হয় স্থানীয় মাটি দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব চুলা। অংশ নেন মোট ৩৫ জন কৃষাণী। তাঁরা তুলে ধরেন ছাবনা চুলা, পদ্ম চুলা, তিন তালা চুলা, তিন ঝিক চুলা, বন্ধু চুলা, ঝিকছাড়া চুলা ও খেলনা চুলা। প্রদর্শনকারীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এসব চুলা ধোঁয়া কমায়, জ্বালানি সাশ্রয় করে এবং রান্নার সময় চোখে ক্ষতির আশঙ্কা হ্রাস করে।

দিনব্যাপী এ আয়োজনে ছিল আলোচনা সভাও। এতে বক্তব্য রাখেন মান্তা নারী সংগঠনের সভাপতি রেনু বেগম, সহসভাপতি বিউটি আক্তার, বারসিকের সহযোগী কর্মসূচি কর্মকর্তা সুবীর কুমার সরকার, সহযোগী গবেষণা কর্মকর্তা শ্যাময়েল হাসদা ও আলপনা রানী সরকার। বক্তারা বলেন, গ্রামীণ জীবনে পরিবেশবান্ধব চুলা শুধু জ্বালানি সাশ্রয়েই নয়, পরিবেশ রক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল হাতে-কলমে হাজল তৈরির প্রশিক্ষণ। হাজল হলো এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ পাত্র, যা ব্যবহার করে দেশি মুরগির ডিম ফোটানো হয়। প্রশিক্ষণ দেন আদর্শ কৃষাণী রেনু বেগম। তিনি জানান, হাজল ব্যবহারে শতভাগ ডিম ফুটানো সম্ভব, পাশাপাশি মুরগিকে খাবারের জন্য বাইরে যেতে হয় না। ফলে মুরগির সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি খামারিদের জন্য ডিম উৎপাদনও বাড়ে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গ্রামাঞ্চলের আরও অনেক কৃষাণী হাজল তৈরিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পরিবেশবান্ধব চুলা ও হাজলের প্রসার ঘটলে তা গ্রামীণ অর্থনীতি ও টেকসই জীবনের জন্য একটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তথ্যসূত্র -আজকের পত্রিকা

 

ওরিয়ানা ফালাচি: এক সাহসী কণ্ঠের উত্তরাধিকারী

বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসে ওরিয়ানা ফালাচি একটি ব্যতিক্রমী নাম। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, দার্শনিক ও নির্ভীক সাংবাদিক। যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয়—যেখানেই দাঁড়িয়েছেন, সত্যের পক্ষে আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর কলম শুধু খবর পরিবেশনের যন্ত্র ছিল না; বরং একে তিনি ব্যবহার করেছেন অন্যায়, সহিংসতা ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে।

১৯২৯ সালের ২৯ জুন ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন ওরিয়ানা ফালাচি। কৈশোরেই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মী, আর কিশোরী ওরিয়ানাও যুক্ত হন নাৎসিবিরোধী আন্দোলনে।
যুদ্ধকালীন এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক গঠনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকতা বেছে নেওয়ার অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে।

প্রথম জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করলেও ধীরে ধীরে সাংবাদিকতাকেই জীবনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন—“একজন সাংবাদিক কেবল তথ্য জানায় না; বরং সত্যকে উদঘাটন করে নির্ভয়ে প্রকাশ করে।”

ফালাচি যুদ্ধক্ষেত্রকে নিজের কাজের পরিসর হিসেবে গ্রহণ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মেক্সিকোর ছাত্রবিদ্রোহ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি ছিলেন সরাসরি উপস্থিত।
নারী সাংবাদিকদের জন্য যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব ছিল, সেখানে তিনি সাহসের সঙ্গে প্রবেশ করেছিলেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধকালীন তাঁর রিপোর্টগুলো পশ্চিমা পাঠকদের কাঁপিয়ে তোলে। যুদ্ধের নির্মমতা, সৈন্যদের মানসিক অবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশা তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা পাঠকদের চোখে যুদ্ধকে জীবন্ত করে তুলেছিল। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি লেখেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Nothing and So Be It’।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন।
শরণার্থীশিবির, হাসপাতাল ও সীমান্তবর্তী এলাকা পরিদর্শন করে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা ও নির্যাতনের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন। তাঁর একাধিক প্রতিবেদন পশ্চিমা বিশ্বে আলোড়ন তোলে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। তিনি নির্দ্বিধায় এই যুদ্ধকে “Massacre” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি সাক্ষাৎকার গ্রহণে তাঁর নির্ভীকতা ছিল অনন্য। ইন্দিরা গান্ধী, ইয়াসির আরাফাত, হেনরি কিসিঞ্জার, আয়াতুল্লাহ খোমেনি কিংবা গোল্ডা মেয়ার—প্রত্যেকের সঙ্গেই তিনি এমন প্রশ্ন করেছেন, যা অনেক সময় তাঁদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল।

ফালাচির সাহিত্যকর্মও তাঁর সাংবাদিকতার মতোই গভীর ও প্রভাববিস্তারী। Letter to a Child Never Born মাতৃত্ব ও নারীত্ব নিয়ে লেখা এক আত্মজিজ্ঞাসামূলক উপন্যাস। Inshallah লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ধর্মীয় মৌলবাদের প্রেক্ষাপটে রচিত। আর ৯/১১-পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত The Rage and The Pride পশ্চিমা সভ্যতা ও ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ওরিয়ানা ফালাচি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কলম থামাননি। মৃত্যুশয্যায় থেকেও ঘোষণা করেছিলেন—“আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করব, যেমন আমি অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়েছি।”

ওরিয়ানা ফালাচির জীবন কেবল একজন সাংবাদিকের নয়; এটি সাহস, নির্ভীকতা ও সত্য অনুসন্ধানের এক উজ্জ্বল দলিল। সাংবাদিকতার পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের পথ সুগম করার পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন—প্রশ্ন করা, সত্য বলা এবং ভয়কে অতিক্রম করাই সাংবাদিকতার মূল আত্মা।

 

দলিত নারীর ক্ষমতায়নে চার দফা দাবি

দলিত নারী ফোরাম ও নাগরিক উদ্যোগের আয়োজনে রাজধানীর ধানমন্ডির উইমেন ভলেন্টিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সম্মিলনীতে দলিত নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করা হয়। একইসঙ্গে উপমহাদেশের দলিত অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত বি. আর. আম্বেদকর, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং বাংলাদেশের দলিত আন্দোলনের নেতা বিজি মূর্তির অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

বক্তারা বলেন, শ্রেণী, বর্ণ ও লিঙ্গের কারণে দলিত নারীরা ত্রিমুখী বৈষম্যের শিকার। সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সম্ভব নয়।

সম্মিলনীতে জানানো হয়, দক্ষিণ এশিয়ার ২১ কোটি দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। দলিত মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৭৬ শতাংশ, বিদ্যালয়ে গিয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়া, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া—এসব কারণে তারা আরও পিছিয়ে পড়ছে।

বক্তারা দলিত নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য চারটি মূল দাবি উত্থাপন করেন—
১. ভূমি ও সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা প্রতিষ্ঠা।
২. কর্মক্ষেত্রে সম্মানজনক পরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।
৩. ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
৪. সব স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

দলিত নারী ও কিশোরীদের উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপের সুপারিশও আসে সম্মিলনীতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
সংবিধানে নারী-পুরুষ সমতা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।

হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা ও বৈষম্যমূলক উত্তরাধিকার আইন বাতিল।

“জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা–২০১১” পুনর্মূল্যায়ন করে দলিত ও প্রান্তিক নারীদের চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করা।

জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য নিরসনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা।

কর্মজীবী দলিত নারীদের মাতৃত্বকালীন সকল সুবিধা নিশ্চিত করা।

সম্মিলনীতে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে দলিত নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে দলিত নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া নারী নির্যাতন ও বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব নয়।

 

ডাচ সংসদে ফিলিস্তিন প্রশ্নে প্রতীকী প্রতিবাদ

নেদারল্যান্ডসের সংসদ সম্প্রতি এক ভিন্নধর্মী ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। বাজেট আলোচনার দিনে সংসদ সদস্য এস্তের উওয়্যান্ড (Esther Ouwehand), যিনি দেশটির Party for the Animals (Partij voor de Dieren – PvdD) দলের নেতা, সংসদীয় বিতর্কে বক্তব্য রাখতে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর পোশাককে কেন্দ্র করে সংসদে দেখা দেয় বিতর্ক, যা শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে।

ঘটনার শুরু হয় যখন এস্তের উওয়্যান্ড সংসদ অধিবেশনে হাজির হন এমন একটি শার্ট পরে, যেটি দেখতে অনেকটা ফিলিস্তিনের পতাকার মতো। শার্টের লাল, সবুজ, কালো ও সাদা রং ফিলিস্তিনি পতাকার প্রতীকী ছাপ বহন করছিল। অধিবেশনের সভাপতি ও কিছু সংসদ সদস্য আপত্তি জানান যে সংসদে নিরপেক্ষ পোশাক পরিধান করা আবশ্যক, এবং তাঁর এই শার্টকে “রাজনৈতিক প্রতীকী পোশাক” বলে অভিহিত করেন।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তাঁকে সরাসরি পোশাক পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সংসদে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নিয়মের কথা উল্লেখ করে স্পিকার তাঁকে ওই শার্ট খুলে ফেলার আহ্বান জানান। ফলে এস্তের কিছু সময়ের জন্য সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।

কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসেন নতুন এক শার্ট পরে। এই শার্টে আঁকা ছিল তরমুজের ছবি ও বীজের ছাপ। এই পছন্দ নিছক কাকতালীয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তরমুজ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ ও সংহতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কারণ, ফিলিস্তিনের পতাকার মতোই তরমুজের লাল, সবুজ, কালো ও সাদা রঙ মিলে এক অর্থবহ প্রতীক তৈরি করে। ইসরায়েলি সেন্সরশিপ ও নিষেধাজ্ঞার সময়েও ফিলিস্তিনিরা পতাকা ব্যবহার করতে না পারলেও তরমুজকে শিল্প, কার্টুন ও পোশাকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

এস্তের উওয়্যান্ডের এই কৌশল সংসদকক্ষের ভেতর ও বাইরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তিনি শুধু পোশাকের মাধ্যমে এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন—“প্রতীকী প্রতিবাদকে দমন করা যায় না, তা অন্যভাবে ফিরে আসে।”

ডাচ সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সমর্থকরা বলছেন, তিনি নৈতিক সাহস দেখিয়েছেন এবং ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, সংসদে রাজনৈতিক প্রতীকী পোশাক পরিধান করা শোভনীয় নয়। তবে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো—একটি সাধারণ শার্ট এবং তরমুজের ছবিই ফিলিস্তিনের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

 

রোবি তে নিকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে অনুষ্ঠিত এক মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষায় নারী শিক্ষার্থীকে নিকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, ভাইভা রুমে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এক্সটার্নাল পরীক্ষক তাকে মুখ খুলতে বলেছিলেন। শিক্ষার্থী জানিয়েছিলেন, তিনি নিকাব খুলতে পারবেন না এবং এটি তার ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অংশ। এরপর পরীক্ষক বলেন, “এটা কোনো নিয়ম না, এটা অভদ্রতা।” উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষকও একই রকম মন্তব্য করেন। এক শিক্ষক বলেন, “তুমি তো চাকরি করতে চাইবে? এভাবে গেলে চাকরি দেবে?” আরেকজন বলেন, “এখানে আসার আগে প্রিপারেশন নিতে হবে, নিয়ম মানতে হবে।”

শিক্ষার্থী জানান, তিনি নিকাব খুলতে অস্বীকার করলে পরীক্ষক বিদেশি শিক্ষার্থীদের উদাহরণ দেন এবং বলেন, “তুর্কি, ইরানি, আফগান মেয়েরা কি ইসলাম মানে না? ওরা কি এভাবে থাকে?” এছাড়া, রুম থেকে বের হওয়ার সময় সতর্ক করা হয় যে, পরের বার এভাবে আসবেন না। একই সঙ্গে, একজন শিক্ষক হুমকি দেন যে, তার এই ড্রেসকোডের কারণে ‘শূন্য নম্বর’ দেওয়া হতে পারে।

পরে জানা যায়, ভাইভা শুরুর আগে সেমিনার রুমে মেয়েদের বলা হয়েছিল, কেউ যেন নিকাব পরে ভাইভা রুমে প্রবেশ না করে। তারপরও কয়েকজন শিক্ষার্থী নিকাব পরে প্রবেশ করলে তাদের নিকাব খুলতে বাধ্য করা হয়। যিনি নিকাব খুলতে বাধ্য করেছেন, তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, বরং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক্সটার্নাল পরীক্ষক নুরুল কাউয়ুম।এ সময় রুমে উপস্থিত ছিলেন বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকরা, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেননি। হুমকি দেওয়ার দায়িত্ব মূলত বিভাগের শিক্ষক ইউসুফের।

উল্লেখ্য, ভাইভা বোর্ডে কোনো নারী শিক্ষক ছিলেন না, সব শিক্ষকই পুরুষ ছিলেন।
শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, ভবিষ্যতে নারী শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই ও ভাইভা পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নারী শিক্ষক রাখা উচিত, যাতে তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা যায়।

এই ঘটনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।

 

ব্যাংক খাতে নারী কর্মী হ্রাস: ছয় মাসে কমেছে প্রায় ২ হাজার

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় দুই হাজার, যা মোটের ওপর প্রায় পাঁচ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৬৪৯ জন, যা এ বছরের জুন শেষে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৭৮২ জনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোতে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং অফিস-পরবর্তী যাতায়াত সুবিধায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অফিস-পরবর্তী যাতায়াত সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—গত বছরের শেষার্ধে যেখানে ৫২ শতাংশ নারী এই সুবিধা পেতেন, তা কমে বর্তমানে ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। এর মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ১৭ শতাংশ। বাকি ৮৩ শতাংশ পুরুষ কর্মী। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে একই চিত্র দেখা যায়—সেখানে প্রতি পাঁচজন পুরুষ কর্মীর বিপরীতে নারী কর্মী প্রায় একজন।

নারী কর্মীদের পদোন্নতি ও কর্মমূল্যায়নে বৈষম্যের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাতৃত্বকালীন ছয় মাসের ছুটিকে কর্মমূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ ছাড়া কাজের পরিবেশ, ডে কেয়ার ও নিরাপদ যাতায়াত সুবিধার অভাবে অনেক নারী মাঝপথেই চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। এক নারী কর্মকর্তা জানান, সন্তান প্রতিপালনের অসুবিধার কারণে গত পাঁচ বছরে তার পরিচিত কয়েকজন নারী সহকর্মী চাকরি ছেড়েছেন।
উচ্চপর্যায়ে নারী কর্মীর উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর উচ্চপদে নারী অংশগ্রহণের হার ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকে এই হার প্রায় ১৪ শতাংশ। আর বেসরকারি ব্যাংকে তা মাত্র ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে পরিচালনা পর্ষদে নারী সদস্যের হার সবচেয়ে বেশি বিদেশি ব্যাংকে (১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ), আর সবচেয়ে কম রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে (৪ শতাংশ)।
নারী কর্মীর সংখ্যার দিক থেকে বেসরকারি ব্যাংক শীর্ষে রয়েছে। সেখানে কর্মরত নারী কর্মীর সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে কর্মরত আছেন প্রায় ৮ হাজার ৭৫০ জন নারী। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কর্মরত নারী মাত্র এক হাজার ৩২ জন এবং বিশেষায়িত তিন ব্যাংকে কর্মরত আছেন প্রায় ২ হাজার নারী।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব মনে করেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের কারণে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলো মনোযোগ দিতে পারছে না। অন্যদিকে, ইস্টার্ন ব্যাংকের নারী ব্যাংকিং প্রধান তানজেরি হক জানান, মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনেক নারী পরিবার ও সন্তানের কারণে চাকরি ছেড়ে দেন, ফলে নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছানোর মতো নারী কর্মীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

সার্বিকভাবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ব্যাংক খাতে নারীর উপস্থিতি থাকলেও নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তারা এখনো পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিকতা পরিবর্তন এবং নারীবান্ধব নীতি কার্যকর না হলে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

 

দিবস উদযাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা

সে রাজকন্যা নয়, না কোনো রূপকথার চরিত্র। তবু দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে সে। তার কণ্ঠস্বর স্কুলে পাঠিয়েছে মেয়েদের, শিখিয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের উপায়, আর সাহস জুগিয়েছে বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। তার নাম মিনা—যে কেবল কার্টুনের কাগুজে চরিত্র নয়, বরং কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলার প্রতীক।

মীনার বয়স আমরা জানি না, জানি না তার গ্রাম বা স্কুলের নামও। তবু দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশু তাকে নিজেদের মতো করে চিনে নিয়েছে। কারণ মীনা কেবল একটি কার্টুন চরিত্র নয়, সে শিশুদের অধিকার নিয়ে সমাজকে ভাবিয়েছে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষা ও স্বপ্নের কথাই সে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে বলেছে।

১৯৯০ থেকে ২০০০ সালকে দক্ষিণ এশিয়ার কন্যাশিশুর দশক ঘোষণা করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ তৈরি করে মীনা কার্টুন, যা বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে শিশুদের সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে মীনা দিবস।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পালন করা হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। লক্ষ্য একটাই—কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করা, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কন্যাশিশু দিবস বা মীনা দিবস—দুটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বের কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছবি দেখায়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আইন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২২-২৪ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

শুধু বাল্যবিবাহ নয়, নানা নির্যাতন ও সহিংসতার খবরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৯০১ কন্যাশিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০০ জন, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১৭ জনের ওপর। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র মার্চ মাসে—এ মাসেই ২৪৮ কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়, যাদের মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারায়।

তবে প্রকাশিত সংখ্যাগুলো পুরো ছবিটা তুলে ধরে না। অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা পরিবার ও সমাজের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ভুক্তভোগী কন্যাশিশুরা নীরবে যন্ত্রণা সয়ে যায়, আর সমাজে তৈরি হয় এক অদৃশ্য ভয় ও অবিশ্বাসের দেয়াল।

মীনা দিবস বা কন্যাশিশু দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং পরিবারে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

কন্যাশিশুরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানের নাগরিকও। তাদের অধিকার সুরক্ষিত হলে তবেই সমাজ সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে উঠবে।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নারী নেতৃত্বের অঙ্গীকার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন্ন ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ২০২৫-এ নারী নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থীতা ঘোষণা করেছে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাইয়িদা হাফছা এবং সহকারী মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে রয়েছেন সামিয়া জাহান।

দুই প্রার্থীর ইশতেহারে নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার উঠে এসেছে।
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী সাইয়িদা হাফছা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নারী শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। তিনি ক্যাম্পাসে হিজাব ও নিকাব ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ, একাডেমিক ভবনে নামাজরুম, ওয়াশরুম, কমনরুম, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের অঙ্গীকার করেছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে গাইনী চিকিৎসক নিয়োগ, নারী হলের পাশে ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম, মা শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও চাইল্ড ডে কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা, অমুসলিম শিক্ষার্থীদের উপাসনালয়, নিরাপদ যানবাহন এবং ত্রৈমাসিক ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রামের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে সহকারী মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী সামিয়া জাহান নারী শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে জোর দিয়ে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে খাবারের মান ও বৈচিত্র্য নিশ্চিত এবং ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ছাত্রী জিমনেসিয়াম সংস্কার ও আত্মরক্ষা কৌশল প্রশিক্ষণ, হিজাব-নিকাব ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ, একাডেমিক ভবনে প্রেয়ার রুম ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন, আবাসিক হলে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের উপাসনালয় এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
দুই প্রার্থীর ইশতেহারে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, একাডেমিক সুবিধা ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা একটি সমতাভিত্তিক, নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।

 

ইসলামী ছাত্রীসংস্থা প্রীতিলতা হলে পূর্ণ প্যানেল ঘোষণা

(চাকসু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে সংগঠনটি)চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন্ন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে ইসলামী ছাত্রীসংস্থা। দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আবাসিক হলের নানা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রীতিলতা হল সংসদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল প্রকাশ করে ইসলামী ছাত্রীসংস্থা। এতে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মিসবাহুল জান্নাত তারিন। জিএস পদে রয়েছেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাদিয়া সুলতানা, আর এজিএস পদে মনোনয়ন নিয়েছেন আফরিদা রিমা।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শেষে সংগঠনের নেত্রীবৃন্দ বলেন, “এই নির্বাচন কেবল নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।” তারা আরও জানান, ইতোমধ্যে ১৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র নিয়েছেন এবং শিগগিরই কেন্দ্রীয়সহ সব হলের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করা হবে।

নেত্রীদের আশা-পরিবর্তনের প্রত্যাশায় শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গেই থাকবেন।

উল্লেখ্য, আজ মনোনয়নপত্র সংগ্রহের শেষ দিন। আগামীকাল (১৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। বহুল প্রত্যাশিত চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ অক্টোবর।

 

জাকসু নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব:পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত

জাকসু নির্বাচন ২০২৫-এ নারী প্রার্থীদের সরব অংশগ্রহণ ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট তাদের প্যানেলে একাধিক নারী নেত্রীকে মনোনয়ন দিয়ে নারী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

তাদের ইশতেহারে উঠে এসেছে নিরাপদ ক্যাম্পাস, আবাসন সংকট নিরসন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে হিজাব-নিকাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন নারী প্রার্থীরা।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, কমনরুম, নামাজের স্থান নির্ধারণ এবং আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ চালুর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তাদের ঘোষণায়। ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের জন্য আলাদা মাঠ ও ইনডোর গেমসের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা এই ইশতেহারকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।

এছাড়া সাইবার বুলিং প্রতিরোধে সাইবার সেল গঠন, টেলিমেডিসিন সেবা চালু ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, নারী প্রতিনিধিদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ শুধু জাকসুর নির্বাচনী রাজনীতিতেই নয়, বরং পুরো ক্যাম্পাসে নারী নেতৃত্বের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

 

জাকসু নির্বাচনে সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের নারী প্রার্থীদের ইশতেহার

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন ২০২৫-এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে নারী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ। এ নির্বাচনে সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট তাদের প্যানেলে একাধিক নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যারা শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা, নিরাপত্তা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সবসময় পুরুষ প্রার্থীর আধিক্য থাকলেও এবারের জাকসু নির্বাচনে নারী শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসন, ধর্মীয় অনুশীলনের সুযোগ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে সামনে এনে প্রার্থীরা নিজেদের ভিশন তুলে ধরছেন।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারের জন্য বিশেষ আলোচনায় উঠে এসেছেন-

আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ প্রার্থী – নারী, ব্যালট নং: ১):
হর্নমুক্ত ক্যাম্পাস, নিকাবি শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা, ডে-কেয়ার সেন্টার, বটতলায় নারীদের জন্য ওয়াশরুম এবং মসজিদে নামাজের জায়গা বরাদ্দ তার প্রধান প্রতিশ্রুতি।

নিগার সুলতানা (সহ-সমাজসেবা সম্পাদক পদ প্রার্থী – নারী, ব্যালট নং: ১):
নারী শিক্ষার্থীদের স্বকীয়তা রক্ষা, বুলিং প্রতিরোধ, জিরো টলারেন্স নীতি, এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় স্থাপনের অঙ্গীকার করেছেন।

নাবিলা বিনতে হারুন (কার্যকরী সদস্য পদ প্রার্থী – নারী, ব্যালট নং: ২):
একাডেমিক ভবনে নারীদের জন্য কমনরুম ও নামাজের স্থান, ছাত্রী হলের নিরাপত্তায় ড্রোন ক্যামেরা, পানীয় জল ও স্যানিটেশন উন্নয়ন, এবং মহাসড়কে পুলিশ টহল জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ফাবলিহা জাহান (কার্যকরী সদস্য পদ প্রার্থী- নারী, ব্যালট নং: ৩):
হিজাব-নিকাব পরা শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ, সাইবার সেল গঠন, টেলিমেডিসিন সেবা, এবং উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড তৈরির পরিকল্পনা দিয়েছেন।

ফারহানা আক্তার লুবনা (সহ-ক্রীড়া সম্পাদক পদ প্রার্থী – নারী, ব্যালট নং: ৫):
নারীদের জন্য পৃথক খেলার মাঠ, কারাতে প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রী হলে ইনডোর গেমস ও ক্রীড়া সামগ্রী নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রেখেছেন।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, নারী প্রার্থীদের সরব অংশগ্রহণ জাকসু নির্বাচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নিরাপদ, নারী-সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি হবে।

জাকসুনির্বাচন২০২৫ #নারীনেতৃত্ব #সম্মিলিতশিক্ষার্থীজোট #জাহাঙ্গীরনগর_বিশ্ববিদ্যালয়

নারী_প্রতিনিধি

 

ঢাবি ছাত্রী সংস্থার সভানেত্রী তামান্না সর্বোচ্চ ভোটে বিজয়ী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে শাখা ছাত্রী সংস্থার সভানেত্রী সাবিকুন নাহার তামান্না বিপুল ভোটে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সর্বোচ্চ ১০,০৮৪ ভোট পেয়ে জয় লাভ করেছেন।

ফল বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের প্রচারণার শুরুতেই ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ প্রচারণা বোর্ডে তামান্নার ছবি বিকৃত করা হয়, যা তিনি নিজের ফেসবুকে শেয়ার করে লেখেন, “স্বপ্নের ক্যাম্পাস গড়ার পথযাত্রী, আমরা থামব না।” এর মাধ্যমে নারীর পোশাক স্বাধীনতা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের ৮টি কেন্দ্রে, ৮১০টি বুথে অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।

এবারের ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদে ৪৭১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৬২ জন। সহসভাপতি (ভিপি) পদে ৪৫ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৯ জন এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নারী প্রার্থীদের মধ্যে ভিপি পদে ৫ জন, জিএস পদে ১ জন ও এজিএস পদে ৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

মোট ভোটার ৩৯,৭৭৫ জন, যার মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০,৮৭৩ এবং ছাত্রী ভোটার ১৮,৯০২। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

 

নারীর নিরাপত্তা দাবিতে সোচ্চার সাবিকুন্নাহার তামান্না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এর মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব নির্বাচন করে, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত দেয়। এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর নারী প্রতিনিধি সাবিকুন্নাহার তামান্না।

বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীসংস্থার সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যাম্পাসে নারীর নেতৃত্ব এখনো সীমিত হলেও তামান্নার প্রার্থিতা সেই সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ।

প্রচারণার শুরুতেই তিনি এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নেকাব করা ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সাইবার বুলিংয়ের ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা হলেও প্রত্যাশিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সহপাঠী ও সহপ্রার্থীরা একযোগে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এমন ঘটনার বিচার না হলে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ বোধ করবেন না। তামান্না নিজেও দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে না।”

প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও হাল ছাড়েননি তামান্না। তিনি এবং কয়েকজন নারী প্রার্থী মিলে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। তাঁদের দাবি ছিল—ভোটার তালিকায় নারী শিক্ষার্থীদের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য সীমিতভাবে প্রদর্শন করা হোক। প্রয়োজনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে কারও তথ্য বা ছবি অপব্যবহার না হয়। এই উদ্যোগ শুধু বর্তমান নির্বাচন নয়, ভবিষ্যতের নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার পথও প্রশস্ত করছে।

নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়েও তামান্না গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর মতে, পরিবারিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং পরীক্ষার সময়সূচির কারণে অনেক নারী শিক্ষার্থী ভোট দিতে আসতে পারেন না। এজন্য তিনি ভোটকেন্দ্র পুনর্বিন্যাস এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—“নারীরা যদি নির্ভয়ে ভোট দিতে না পারেন, তবে গণতান্ত্রিক চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”

তামান্নার নির্বাচনী ইশতেহারে উঠে এসেছে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে ক্যাম্পাসে সাইবার-সুরক্ষা সেল গঠন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ অভিযোগ কমিটি চালু এবং নারীদের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন। তাঁর ভাষায়, “নারীরা শুধু দর্শক নয়, তারা নেতৃত্বেও সমানভাবে জায়গা করে নেবে।”

ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে সবসময়ই অরাজকতা ও সহিংসতার শঙ্কা থাকে। তবুও সাবিকুন্নাহার তামান্নার দৃঢ়তা স্পষ্ট করে প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই নতুন পথ তৈরি করা যায়।

তাঁর লড়াই কেবল একটি নির্বাচনী আসনের জন্য নয়; বরং নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তিনি এক নতুন আশা দেখাচ্ছেন—যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে নারীরা সমান অংশীদার হয়ে উঠবে।

শিশুদের রক্তে বিপজ্জনক সিসা: প্রসাধনী, ব্যাটারি ও ধূলাবালিতে ঝুঁকি

বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের শরীরে সিসার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩.৫ কোটি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা রয়েছে। বিশেষত রাজধানী ঢাকায় দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯৮ শতাংশের রক্তে সিসার পরিমাণ নিরাপদ সীমার দ্বিগুণ শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন, শিশুদের জন্য রক্তে সামান্য সিসাও ক্ষতিকর। এটি মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করে, যার ফলে বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত জটিলতা এবং শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তীব্র মাত্রায় সিসার সংস্পর্শে খিঁচুনি, কোমা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু যা প্রাকৃতিকভাবে মাটি ও খনিজে থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এটি এখন খাবার, পানি, বাতাস, প্রসাধনী, খেলনা, রান্নার হাঁড়ি-পাত্র এবং ঘরের ধূলাবালিতেও পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিসার প্রধান উৎস হলো ব্যাটারি ও সিসা-ভিত্তিক শিল্প, রঙ, প্রসাধনী, রান্নার সরঞ্জাম এবং ঘরের অভ্যন্তরে ধূমপান। নিঃশ্বাস, খাদ্যগ্রহণ কিংবা ত্বকের মাধ্যমে এই বিষ শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণের শরীরেও পৌঁছে যায়। শিশুদের স্বভাবগত কৌতূহল এবং জিনিস মুখে নেওয়ার প্রবণতা তাদের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) রক্তে সিসার পরিমাণ প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে তা বিপজ্জনক মনে করে। কিন্তু আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৬৭ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। শিল্প এলাকায় বসবাসরত শিশুদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় গড়ে ৪৩ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে ইউনিসেফ জানিয়েছে, শিশুদের সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারি রিসাইক্লিং এবং শিল্পকারখানার সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিসা শরীরের প্রায় সব অঙ্গকেই প্রভাবিত করে। এটি মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি এবং হাড়ে জমা হয় এবং গর্ভবতী নারীর মাধ্যমে ভ্রূণেও ছড়িয়ে পড়ে। অল্প পরিমাণ সিসাও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যার ফলে তাদের আইকিউ কমে যেতে পারে, মনোযোগ নষ্ট হয় এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি এটি রক্তাল্পতা, কিডনি দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রজনন অঙ্গের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগও অপরিহার্য। পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ শরীরে সিসার ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে পারে। অন্যদিকে দূষিত এলাকায় বাস এড়ানো, শিল্প ও ব্যাটারি কার্যক্রমকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সহায়ক হতে পারে।

আইসিডিডিআর,বি’র পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, হলুদ মশলার সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও নিয়মতান্ত্রিক উদ্যোগ সফল হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে সিসা সম্পর্কিত সকল শিল্প কার্যক্রমকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে আনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানোই সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

 

কাঁচা পেঁয়াজ: ছোট হলেও কাজে বড়!

রান্নায় তো আমরা সবাই পেঁয়াজ দিই, কিন্তু কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার অভ্যাস আছে কি? শুধু স্বাদ নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক গুণ!

🥗 পেঁয়াজে কী থাকে?
ফাইবার, ভিটামিন সি, ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, সালফার, পটাশিয়ামসহ নানা খনিজ উপাদানে ভরপুর এই ছোট সবজিটা।

✨ উপকারিতা
১. ঠান্ডা-কাশি থেকে শরীর রক্ষা করে
২.হজমে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়
৩. রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক
৪.ত্বক ও চুলের জন্য উপকারী
৫. হার্ট ভালো রাখে
৬. ফ্রি র‍্যাডিকেল দূর করে ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়
৭. শরীর ডিটক্সিফাই করে
৮.হাড়ের স্বাস্থ্যেও সাহায্য করে

🍽️ খাওয়ার নিয়ম:
সালাদে, ভাতের সঙ্গে কাঁচা খাওয়া, কিংবা স্যান্ডউইচ/চাটনিতে ব্যবহার—অনেক উপায়ে খাওয়া যায়।

⚠️ সতর্কতা:
অতিরিক্ত খেলে কারও কারও গ্যাস হতে পারে। সংবেদনশীল পাকস্থলীর ক্ষেত্রে একটু সতর্ক থাকুন।

📌 দিনে কতটুকু?
মাত্র ২৫-৩০ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজই যথেষ্ট।

💬 আপনি কাঁচা পেঁয়াজ খেতে পছন্দ করেন?
নাকি গন্ধের ভয়ে দূরে থাকেন?
কমেন্টে জানান তো!

 

৩৯ বছর পর্যন্ত পড়তেই জানতেন না, এখন তিনি বেস্টসেলিং লেখক!

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে জন্ম নেওয়া এক নারী, যাঁর শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য আর পারিবারিক অশান্তির মধ্যে। ১৫ বছর বয়সে গর্ভবতী, ১৩-তেই মা-বাবার বিচ্ছেদ, ১৬-র আগেই হারিয়েছেন সন্তান। জীবনে একের পর এক ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়া নয়, বরং ঘুরে দাঁড়ানোই বেছে নিয়েছেন তিনি।

তাঁর নাম ক্যারেন উডস।
একটা সময় পর্যন্ত তিনি জানতেন না কীভাবে একটি ই-মেইল লিখতে হয়। কারণ, তিনি ছিলেন নিরক্ষর। হ্যাঁ, ৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তেও জানতেন না তিনি। তখন ক্লিনারের চাকরি করতেন, হঠাৎ অফিস থেকে পদোন্নতি দেওয়া হলো-কাজ মেইল আদান-প্রদান করার। ভয় পেয়ে গেলেন ক্যারেন। পড়তেই না জানলে কী করে চলবে?

কিন্তু এখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেল।
প্রতিষ্ঠানই তাঁকে ভর্তি করে দেয় অ্যাডাল্ট লিটারেসি কোর্সে। ৩৯ বছর বয়সে হাতে খড়ি হলো তাঁর! লিখতে-পড়তে শিখলেন। আর সেই ক্লাসেই প্রথম ভাবনা এলো-“আমি একটা বই লিখতে চাই।”
সেই চিন্তা থেকে মাত্র তিন মাসে হাতে লিখে ফেলেন প্রথম উপন্যাস “ব্রোকেন ইউথ”।

কপাল খুলে যায় যখন তাঁর পাণ্ডুলিপি চলে যায় এক স্থানীয় পত্রিকার হাতে, সেখান থেকে বড় এক প্রকাশনী এম্পায়ার পাবলিকেশনস-এ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ক্যারেন উডসকে। একের পর এক ২৭টি বই প্রকাশ হয়েছে তাঁর, যার বেশিরভাগই ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার। সুপারমার্কেট থেকে শুরু করে অ্যামাজনের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে বেস্টসেলার তালিকায় উঠে এসেছে তাঁর বই।

তবে এত কিছুর পরও তিনি নিজের পরিচয় ভুলে যাননি। এখনো ক্লিনারের কাজ করেন, পাশাপাশি কাজ করেন স্কুলের বিহেভিয়ার টিমে এবং কারাগারে বন্দীদের জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ বিষয়ে অনুপ্রেরণা দেন।

“আমি চাই, ৪০ পেরোনো নারীরা জানুক—এখনো শুরু করা যায়। সন্তান থাকলেও, সংসার থাকলেও, স্বপ্ন দেখা থেমে যায় না। আমি আজও বাড়ি পরিষ্কার করি, স্কুলে কাজ করি, নাটক লিখি, বই লিখি—সব একসঙ্গে,” বলেন ক্যারেন।

তিনি বই বিক্রি করে খুব ধনী হয়ে যাননি-তবুও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক জীবন এখন তাঁর। কারণ, তিনি জানেন, সম্মান কখনো বয়স দেখে আসে না বরং আসে সাহস আর ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে।

🔗 এমন আরও বাস্তব জীবনের গল্প পেতে চোখ রাখুন আমাদের পাতায়।
আপনি নিজেও হতে পারেন ক্যারেন উডসের মতো কারো অনুপ্রেরণা।

 

ঢাবি ছাত্রীদের ছবি নিয়ে জবি নেতার কটূক্তি

(পর্দা ও নারীর ধর্মীয় অধিকারে আঘাতের অভিযোগে মানববন্ধন)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্যের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার ঢাবি শাখার সদস্যদের সাক্ষাতের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণভাবে শেয়ার করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (১০ আগস্ট) বিকেলে জবি ভাষা শহীদ রফিক ভবনের সামনে নারী শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান।

প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা বলেন, ইসলামের ফরজ বিধান “পর্দা” শুধু একটি পোশাক নয়—এটি মুসলিম নারীর ধর্মীয় অধিকার, মর্যাদা ও আবেগের প্রতীক। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এ নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা কটূক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী হুমাইরা বলেন, “আমরা ৯৪% মুসলিমের দেশে বাস করি। এখানে পর্দা নিয়ে কটূক্তি কোনো সৎ ও সভ্য মানসিকতার মানুষের কাজ নয়। ৫ আগস্টের পরও কেন আমাদের এ ধরনের মন্তব্য শুনতে হবে?”

নাট্যকলা বিভাগের তিশা বলেন, “পর্দা আমাদের অধিকার। এর প্রতি অবজ্ঞা বা কটূক্তি করা মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ।”

ইংরেজি বিভাগের সুমাইয়া বলেন, “এটি শুধু মুসলিম নারী নয়, মূলত সব নারীর মর্যাদাকে অপমান করেছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই—ভবিষ্যতে যেন কেউ পর্দা পালনকারী নারীদের নিয়ে কটূক্তি করার সাহস না পায়, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।”

এর আগে গত শনিবার (৯ আগস্ট) জবি শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢাবি উপাচার্যের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার সদস্যদের সাক্ষাতের ছবি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন এবং একাধিক মন্তব্যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের ঝড় ওঠে।

 

ভাল থাকাটাও এক ধরনের বিজ্ঞান -জানুন উপেক্ষিত খনিজের কথা

ঘুম থেকে উঠেই শরীরে ক্লান্তির ছাপ। মন ভার, অথচ কোনো দৃশ্যমান কারণ নেই। মাথা যেন কুয়াশায় ঢাকা, মেজাজ খিটখিটে, আর দিনটা শুরুই হলো এক রকম খারাপ লাগা নিয়ে। আপনি ভাবছেন, ঘুম তো ঠিকঠাকই হলো! তবে এই অস্বস্তি, মনমরা ভাব, শরীরের অলসতা— সবকিছুর পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে একটিমাত্র খনিজের ঘাটতি। এই খনিজ শরীরের গভীরে নীরব এক সৈনিক— প্রতিদিন লড়াই করে চলেছে আমাদের মেজাজ, পেশি, এমনকি হৃদয়ের সুস্থতার জন্য। নাম তার: ম্যাগনেশিয়াম।

সোডিয়াম বা ক্যালশিয়ামের মতো খনিজ আমাদের চেনা নাম। কিন্তু ম্যাগনেশিয়ামের কথা খুব কমই শোনা যায়, অথচ শরীরচর্চা হোক বা হরমোনের ভারসাম্য, এমনকি মন ভাল রাখার ক্ষেত্রেও এই খনিজের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে নারীদের শরীরে হাড় ও পেশির গঠনে ম্যাগনেশিয়াম এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শুধু তাই নয়, মাসিকচক্র স্বাভাবিক রাখতে এবং হরমোনজনিত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণেও এর অবদান উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো, এমনকি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ম্যাগনেশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও এটি কার্যকর। শরীরচর্চার সময় পেশিতে টান ধরা বা রাতের ঘুমের সময়ে হঠাৎ পায়ের পেশিতে ব্যথা— এর পেছনেও রয়েছে এই খনিজের ঘাটতি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, শরীরে ভিটামিন ডি যতই থাকুক, যদি ম্যাগনেশিয়াম না থাকে, তবে তা কার্যকর হয় না বললেই চলে।

অতিরিক্ত মেদ ঝরানো যেমন কঠিন কাজ, তেমনি ম্যাগনেশিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে তা সহজ হতে পারে। এই খনিজ হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে, শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে এবং শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতাও বাড়ায়। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়, আবার প্রয়োজনীয় পুষ্টিও মেলে।

ভয়ের কিছু নেই। এই প্রয়োজনীয় খনিজ পাওয়া যায় অনেক পরিচিত খাবারে, যেগুলো আপনার দৈনন্দিন রসনার অংশ হতে পারে অনায়াসেই।

সবুজ শাকসবজি: বিশেষত পালংশাক— একটি শক্তিশালী ম্যাগনেশিয়াম উৎস। এক কাপ রান্না করা পালংয়ে মিলবে প্রায় ৭৮ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম।

বীজ ও বাদাম: কুমড়োর বীজ, চিয়া বীজ, কাজুবাদাম— এদের প্রত্যেকটিই ম্যাগনেশিয়ামে পরিপূর্ণ। আধা কাপ কুমড়োর বীজে প্রায় ১৫০ মিলিগ্রাম, চিয়া বীজে ১১১ মিলিগ্রাম, আর কাজুবাদামে মিলবে ৭৮ মিলিগ্রামের মতো।

দানাশস্য: ডালিয়া, কিনোয়া, ওটস— এগুলোর মধ্যেও রয়েছে এই খনিজ। ভাতের বদলে মাঝে মাঝে এই দানাশস্যগুলি খেলে পেট ভরবে, পুষ্টিও মিলবে, আর ওজনও নিয়ন্ত্রণে আসবে।

ফলমূল: কলা ও পেঁপে— এই সাধারণ ফলগুলিও ম্যাগনেশিয়ামে সমৃদ্ধ। একটি মাঝারি কলায় আছে প্রায় ৩২ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম। সকালে এক গ্লাস কলার স্মুদি কিংবা পেঁপের স্যালাড— হতে পারে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর একটি শুরু।

দুগ্ধজাত খাবার: দুধ ও দইয়ের মধ্যেও রয়েছে পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম। দইয়ের প্রোবায়োটিক উপাদান হজম শক্তি বাড়ায় এবং প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকলে শরীর-মন দুটোই ভাল থাকে।

শেষ কথা
ভাল থাকাটা শুধু মানসিক মনোভাব নয়, এটা শারীরিক সুসমঞ্জস্যের ফলও বটে। অল্পতে মেজাজ হারানো, ক্লান্ত লাগা, বা একটানা মন খারাপ থাকা— এসবের পেছনে কারণ খুঁজতে গেলে আপনি হয়তো মনস্তত্ত্ব ঘাঁটবেন। কিন্তু একবার খাবারের তালিকায় চোখ রাখলে বোঝা যাবে, হয়তো শরীরই তার প্রয়োজনীয় উপাদান ঠিকমতো পাচ্ছে না।

তাই প্রতিদিনের পাতে কিছু সামান্য পরিবর্তন এনে, এই নীরব পরিশ্রমী খনিজটিকে জায়গা দিন।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান :প্রত্যাশা,প্রাপ্তি এবং পুনর্গঠনের রূপরেখা

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ‘কোটা সংস্কার’ নিয়ে শুরু হওয়া একদল ছাত্র-জনতার আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় এক গণঅভ্যুত্থানে—যা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের অঙ্গীকারই নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক স্বপ্ন পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে। শোষণ, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে এই তরুণ প্রজন্মের উত্তাল আহ্বান গোটা জাতিকে এক অভূতপূর্ব আলোড়নে ফেলে দেয়।

শুরুতে এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে ছিল কোটা সংস্কারের দাবি, কিন্তু তা অচিরেই পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় অবিচার, রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র, পুলিশি জুলুম ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে গণজাগরণে।
কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন—বিপ্লব আমাদের কী দিয়েছে? আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? আর ভবিষ্যতের পথে আমাদের কী প্রত্যাশা?

অভ্যুত্থানের পটভূমি
২০২৪ সালের ৪ জুন হাইকোর্ট এক রায়ে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং চাকরিতে ৩০% কোটা পুনর্বহাল করে। রায় প্রকাশের পর শিক্ষিত তরুণ সমাজে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামে, তাদের একমাত্র দাবি ছিল—“চাকরি হোক মেধাভিত্তিক, বৈষম্য নয়।”

কিন্তু ১১ জুলাই কুমিল্লায় ছাত্রদের ওপর পুলিশি গুলি চলার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরদিন থেকে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের (গুলিবিদ্ধ হয়ে) মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং সেই মুহূর্ত থেকেই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হয় এক গণঅভ্যুত্থান ।

অভ্যুত্থানের উত্থান ও পতনের চিত্র
১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট—এই সময়কাল ইতিহাসে ‘জুলাই গণহত্যা’ নামে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঢাকার শাহবাগ, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, রংপুরের মেডিকেল মোড়, রাজশাহীর বিনোদপুর, খুলনার সোনাডাঙ্গা—সবখানে রক্তপাত ঘটে। পুলিশ, র‍্যাব ও ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনগুলো নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর চালায় গুলি, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গুম খুনের নির্যাতন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, এই সময়ে মোট ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, প্রায় ৩০,০০০ আহত এবং ১০,০০০-এর বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি গণহত্যার নতুন এক অধ্যায়।

দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলন দমন করা যায়নি,৩আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ১দফা দাবি ঘোষণা করে বিক্ষোভকারীরা ঢাকার শহীদ মিনারের কাছে জড়ো হন।
এরপরে জন অসন্তোষের মুখে পড়ে ৫ আগস্ট দুপুরবেলা তৎকালীন স্বৈরশাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।
তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় পরবর্তী সময়ের জন্য ৮আগস্ট একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে আসেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এভাবেই সমাপ্ত হয় একযুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এক কর্তৃত্ববাদী অধ্যায়।

প্রাপ্তি: কী পেলাম এই অভ্যুত্থানে?

১. সরকার পতন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর
দীর্ঘ ১৫ বছরের একক দমনমূলক শাসনের অবসান ঘটে। নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংবাদপত্রের মুক্তি, এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের।

২. “জুলাই ঘোষণাপত্র” ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-কে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে মূল চারটি স্তম্ভ ছিল: ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, বিকেন্দ্রীকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা।

৩. গণচেতনার পুনর্জাগরণ
এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রের মালিকানায় জনগণের নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারে অংশগ্রহণ বাড়ছে।

৪. আন্তর্জাতিক সমর্থন ও চাপ
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দিচ্ছে।

সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা
সব অর্জনের পরেও, আজ এক বছর পর দাঁড়িয়ে আমাদের কিছু অস্পষ্টতা এবং ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে:

গণহত্যার বিচার হয়নি: আজও পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত হয়নি। দায়ীদের চিহ্নিত কিংবা শাস্তির আওতায় আনা যায়নি।

আহত ও শহীদ পরিবারদের পুনর্বাসন অনিশ্চিত: পঙ্গু, গুম ও নির্যাতিতদের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন কাঠামো দাঁড়ায়নি।

সংবিধান সংশোধন এখনো অসম্পূর্ণ: “জুলাই ঘোষণাপত্র” প্রণীত হলেও তার অনেক ধারা এখনো কার্যকর নয়।

রাজনৈতিক বিভাজন: বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধ এখনো রয়ে গেছে।

আমাদের প্রত্যাশা ও ন্যায্য দাবি

এই বিপ্লবের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যায় না। তাই, আমরা এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে উত্থাপন করছি—

১. জুলাই শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

শহীদদের “জাতীয় শহীদ” হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে ৫ আগস্টকে “গণতন্ত্র পুনর্জাগরণ দিবস” ঘোষণা করতে হবে।

শহীদদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও স্থাপনা নামকরণ করে চিরস্থায়ী স্মৃতি নির্মাণ করতে হবে।

২. আহত ও নির্যাতিতদের পুনর্বাসন

পঙ্গু ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আন্দোলনকারীদের জন্য চিকিৎসা, চাকরি ও বাসস্থানসহ পূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

গ্রেফতারকৃত বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়া

গণহত্যার তদন্তে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কমিশন গঠন করতে হবে।

নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

৪. “জুলাই ঘোষণাপত্র”-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন

বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষায় মেধা ও মানবতা, সুশাসন, নারী অধিকারসহ ঘোষণাপত্রের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।

৫. রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

আন্দোলনকেন্দ্রিক সকল মামলার নিঃশর্ত প্রত্যাহার করতে হবে।

নাগরিকের মতপ্রকাশ, সংগঠিত হওয়ার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অধিকার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

পরিশিষ্ট
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে একটি যুগান্তকারী জাগরণ হিসেবে। এটি আমাদের স্বপ্নের, প্রতিবাদের, ত্যাগের এবং পুনর্নির্মাণের মুহূর্ত। আমাদের দায়িত্ব আজ, সেই নির্মাণযজ্ঞে অংশগ্রহণ করা।
এখন সময় এসেছে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার।
শহীদের রক্ত যেন আমাদের অবহেলায় রঙ হারিয়ে না ফেলে।

 

ঘরের ভিতরে নারীর মাথায় ওড়না রাখা কি ইসলামি দৃষ্টিতে জরুরি?

(ইসলামি বিধান ও প্রচলিত ধারণার প্রেক্ষিতে একটি বিশ্লেষণ)

ইসলামে নারীদের পর্দা পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে পর্দার শরয়ী বিধান সবসময় একই মাত্রায় প্রযোজ্য নয়; এটি প্রসঙ্গ ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন হয়ে থাকে। অনেকেই মনে করেন, একজন নারী নিজের ঘরে থাকলেও তার মাথায় সবসময় ওড়না থাকা জরুরি। এমন ধারণা কতটা সঠিক, তা পর্যালোচনা করা দরকার কুরআন-সুন্নাহর আলোকে।

ঘরের পরিবেশ ও মাহরাম পুরুষ
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা নারীদের পর্দা প্রসঙ্গে বলেন:
“হে নবী! মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আচ্ছাদন করে…”
(সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

এই আয়াতে গায়রে মাহরাম বা অনাত্মীয় পুরুষদের সামনে নারীদের শরীর ও সৌন্দর্য গোপনের কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ ইত্যাদি মাহরামদের সামনে এই পর্দা করার বাধ্যবাধকতা নেই।

অতএব, যখন একজন নারী নিজের ঘরে অবস্থান করছেন এবং তার আশেপাশে শুধুমাত্র মাহরাম পুরুষ, নারী অথবা শিশু রয়েছে—তখন তার জন্য মাথা ঢেকে রাখা শরয়ীভাবে জরুরি নয়। এটি ইসলামী বিধানের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য, যে অতিরিক্ত কষ্টসাধ্যতা বা অযৌক্তিক কঠোরতা আরোপ করে না।

প্রচলিত ভুল ধারণা: “ফেরেশতা প্রবেশ করেন না”
বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের অনেক স্থানে একটি ধারণা প্রচলিত আছে—“নারীদের মাথায় ওড়না না থাকলে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” এ বক্তব্যটির কোনো সহিহ হাদিস ভিত্তি নেই। ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে একমত যে, এ ধরনের বর্ণনা বানানো হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।

হাদিসের বিশিষ্ট গ্রন্থ আল-মাকসূদ ফি মাজু’আতিল হাদিস ও আল-আস্রারুল মারফু’আ তে এমন অনেক ভুয়া হাদিসের তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যার নমুনা পাওয়া যায়। সুতরাং, এমন ভিত্তিহীন বক্তব্যকে ইসলামি বিধান হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয় এবং এতে ধর্মীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

অজুর সময় ওড়না পরা কি জরুরি?
অজুর সময় মাথায় ওড়না রাখা ফরজ, ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব—কোনোটিই নয়। বরং ইসলামে অজুর নির্দিষ্ট অঙ্গসমূহ ধৌত করাই শর্ত (সূরা মায়েদা: ৬)। নারীরা অজু করতে গিয়ে মাথায় ওড়না রাখলেন বা রাখলেন না—তা তাদের ইচ্ছা ও প্রয়োজনসাপেক্ষ। যদি তারা একান্ত ঘরে থাকেন এবং পরপুরুষের দৃষ্টিগোচর হওয়ার শঙ্কা না থাকে, তাহলে ওড়না ছাড়া অজু করতেও কোনো দোষ নেই।

ইমামগণের বক্তব্য
ইবনে কাসীর (রহ.) আয়াত ৩১-এর তাফসিরে বলেন,
“এই আয়াতে মাহরামদের তালিকা রয়েছে, যাদের সামনে নারীরা মুখ ও মাথা খোলা রাখতে পারে। এটি কোনো গোনাহ নয়।”

ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “মাহরামদের সামনে নারীর শরীরের এমন অংশ প্রকাশে কোনো গোনাহ নেই, যা সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে প্রকাশ পায়।”
(আল-মাজমু’, খণ্ড ৩)

পরিশিষ্ট
ইসলামে নারীর পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো—গায়রে মাহরাম এবং অনাত্মীয় পুরুষদের সামনে তার সৌন্দর্য গোপন রাখা। ঘরের ভেতরে যেখানে এমন পুরুষ নেই এবং শুধুমাত্র মাহরাম ও নারী রয়েছে, সেখানে মাথায় ওড়না রাখা জরুরি নয়। অজুর সময়ও এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে যারা নিজেদের ধর্মীয় সচেতনতা থেকে সবসময় মাথায় ওড়না রাখতে চান, তা তাদের ব্যক্তিগত ফজিলত ও তাকওয়ার পরিচায়ক হতে পারে। তবে এটিকে ফরজ বা ওয়াজিব হিসেবে দাবি করা ইসলামি শরিয়তের সীমালঙ্ঘন মূলক কাজ।

ছবিঃ istock