All posts by Oporajita

 

এক্স-রে চোখ”– রহস্যময়ী নাতাশা ডেমকিনা

১৯৮৭ সালে রাশিয়ার সারানস্ক শহরে জন্ম নেওয়া নাতাশা ডেমকিনা আজও বিশ্বের কাছে এক রহস্যময়ী নারী। সাধারণ একটি মেয়ের মতো বেড়ে ওঠা হলেও কৈশোরে হঠাৎই সে টের পায়, তার দৃষ্টিশক্তির মাঝে কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করছে। তার দাবি, সে মানুষের শরীরের ভেতর দেখতে পায়—একটি প্রাকৃতিক এক্স-রে ভিশনের মতো। এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার সূত্র ধরেই সে হয়ে ওঠে আলোচিত, আবার বিতর্কিতও।

নাতাশার বয়স তখন ১০ বা ১১। একদিন হঠাৎ সে দেখতে পায়, তার মায়ের পেটের ভেতরে কিছু একটা সমস্যা আছে। পরবর্তীতে চিকিৎসা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে—তার মায়ের পেটে সত্যিই একটি আলসার ছিল। এরপর থেকে নাতাশা একের পর এক রোগ নির্ণয় করতে থাকে, কখনো প্রতিবেশীর টিউমার, কখনোবা বৃদ্ধের হার্নিয়া। তার এই ‘অদ্ভুত’ চোখের কথা স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করে তার বাসায়।

১৭ বছর বয়সে নাতাশা গণমাধ্যমে আসে। রাশিয়ার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশগুলোর নজর পড়ে তার ওপর।
তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় লন্ডন এবং নিউইয়র্কে, যেখানে তার ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের চেষ্টা চালানো হয়।
লন্ডনে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নাতাশা সঠিকভাবে সমস্যা শনাক্ত করতে পারায় ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু নিউইয়র্কে অবস্থা ভিন্ন হয়ে যায়।
CSI (Committee for Skeptical Inquiry)-এর তত্ত্বাবধানে একটি ব্লাইন্ড টেস্টে তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। পরীক্ষায় একজন রোগীর শরীরে বসানো ধাতব পাত খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হন নাতাশা। ফলে, বিজ্ঞানীরা তার এক্স-রে ভিশনের দাবিকে “অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন” বলে ঘোষণা দেন।

তবে নাতাশা নিজে তার ব্যর্থতার জন্য বিভিন্ন যুক্তি দেন। তার ভাষায়—
“আমার চোখ কোনো যান্ত্রিক এক্স-রে মেশিন নয়। এটা একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার জন্য আমি সময়, মনোযোগ, রোগীর সরাসরি উপস্থিতি ও শান্ত পরিবেশ চাই। কিন্তু পরীক্ষার সময় আমার উপর চাপ ছিল, আমার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছিল, রোগীদের শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল-এসব কারণে আমি সঠিকভাবে কাজ করতে পারিনি।”

নাতাশার ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বরাবরই সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি হতে পারে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অনুমান ও কাকতালীয় ঘটনার সমন্বয়। তবে সাধারণ মানুষের একাংশ আজও তাকে অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করে।
বিশেষ করে রাশিয়াতে নাতাশা এক রহস্যময় ও জনপ্রিয় চরিত্র। অনেক রোগী এখনো তার কাছে যান সনাতন চিকিৎসার বাইরের বিকল্প উপায়ে রোগ শনাক্ত করতে।

২০০৪ সালে Discovery Channel ‘The Girl with X-ray Eyes’ শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে নাতাশার জীবনের উপর ভিত্তি করে। ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এ ডকুমেন্টারির কিছু অংশ এখনো দেখা যায়।

বর্তমানে নাতাশা একজন বিকল্প চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছেন। তার নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে “The Special Diagnostic Center” নামের একটি প্রজেক্ট। ইউরোপ ও জাপানেও তিনি বিভিন্ন সময় রোগ নির্ণয়ের কাজ করেছেন।

নাতাশা ডেমকিনা একদিকে যেমন রহস্যে মোড়া এক চরিত্র, অন্যদিকে তেমনি বিজ্ঞানের কড়াকড়ি যাচাইয়ের মুখে পড়া একটি জীবন্ত কেস স্টাডি।
তার ক্ষমতা বাস্তব, না কি মনস্তাত্ত্বিক এক বিভ্রম—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে একথা অনস্বীকার্য, “এক্স-রে চোখের অধিকারী” এই নারী আজো মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে।

তথ্যসূত্র: গুগল সার্চ, Discovery Channel Documentary, CSI রিপোর্ট

 

৩৫০ বছর পর নারী অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল নিযুক্ত

গ্রহ-নক্ষত্রের রহস্যভেদ করতে হলে রাজদরবারে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী থাকা চাই– এই ভাবনা থেকেই ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় চার্লস শুরু করেছিলেন এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। জন্ম হয়েছিল ‘অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল’ নামের এক বিশেষ পদ, যা তিন শতাধিক বছর ধরে ছিলেন শুধু পুরুষদের দখলে। অবশেষে সেই লৌহপ্রাচীর ভেঙে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ রাজপরিবার পেয়েছে এক নারী জ্যোতির্বিদ মিশেল ডাউহার্টিকে।

গত ৩০ জুলাই, ব্রিটিশ রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন মিশেলের নিয়োগপত্রে। এতদিন এই মর্যাদাসম্পন্ন পদে ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার মার্টিন রিস। এখন থেকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন প্রফেসর মিশেল, যিনি শুধু একজন গবেষক নন—একজন পথপ্রদর্শক নারীও।

এই পদ এখন আর শুধুই প্রতীকী নয়, বরং বিজ্ঞান ও মহাকাশসংক্রান্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পরামর্শদানের দায়িত্ব বহন করে। বিশেষত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য সময় ও মহাকাশ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অটুট।

শুধু ‘প্রথম নারী’—এই পরিচয়ে তাঁকে আটকে রাখলে তা হবে বড় অবিচার। মিশেল ডাউহার্টি নিজ গুণেই পৌঁছেছেন উচ্চ শিখরে। ২০১৪ সালে তিনি পান ‘রয়্যাল সোসাইটি রিসার্চ প্রফেসরশিপ’—একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা পদ। এর আগে ২০০৭ সালে পেয়েছেন ‘ক্রি মেডেল’, গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র ও সৌর বাতাসের ওপর কাজের জন্য। ২০১৭ সালে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির স্বর্ণপদক ও ২০১৯ সালে আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের বিশেষ স্বীকৃতি তাঁর নামকে করেছে আরও উজ্জ্বল।

স্যাটার্ন ও বৃহস্পতি গ্রহ ঘিরে পাঠানো মহাকাশযানের ডেটা বিশ্লেষণে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। বর্তমানে তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে স্পেস ফিজিক্সের অধ্যাপক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। পাশাপাশি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির একটি গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য—বৃহস্পতির বরফঘেরা উপগ্রহ গ্যানিমিড, ইউরোপা ও ক্যালিস্টোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

গণমাধ্যমে মিশেল ডাউহার্টি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই পদে আমি নিযুক্ত হয়েছি আমার জেন্ডারের কারণে নয়, বরং আমার গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই।” তবে তাঁর এই অর্জন যে নারীদের বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা জোগাবে, সেই আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “যখন কেউ নিজের মতো কাউকে এমন জায়গায় দেখতে পায়, তখন তাদের মনে স্বপ্ন জাগে—তারাও পারবে।”

১৯৬২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার এক শহরে জন্ম মিশেলের। তাঁর মহাকাশের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় একদম শৈশবে, যখন তিনি দেখতেন তাঁর বাবা বাড়ির উঠানে ১০ ইঞ্চির একটি টেলিস্কোপ বানাচ্ছেন। মজার বিষয়, তাঁর স্কুলে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টি ছিলই না! তবু তাঁর এবিষয়ে আগ্রহ থামেনি।

তিনি পড়াশোনা করেছেন বর্তমান কোয়াজুলু-নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ফলিত গণিতে বিএসসি, পরে পদার্থবিজ্ঞান এবং শেষে পিএইচডি। কর্মজীবনের শুরু জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমিতে। পরে ১৯৯১ সালে তিনি যোগ দেন ইম্পেরিয়াল কলেজে। আর সেখানেই তাঁকে জুপিটার মিশনের জন্য চৌম্বকক্ষেত্রের একটি মডেল তৈরি করতে বলা হয়, যা তাঁর মহাকাশ পদার্থবিদ্যার যাত্রা সূচিত করে।

তিন শতকেরও বেশি সময়ের পুরুষতান্ত্রিক প্রথা ভেঙে মিশেল ডাউহার্টির এই নিযুক্তি শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র বৈজ্ঞানিক জগতের জন্য এক অনন্য মুহূর্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন-গ্রহ, নক্ষত্র, সময়, মহাকাশ—এসব বিশাল বিষয়ের বোঝাপড়ার জন্য লিঙ্গ নয়, দরকার অন্তর্দৃষ্টি, মেধা ও অক্লান্ত সাধনা।

 

শিল্পায়নের ধাক্কায় অস্তমিত কুটিরশিল্প, বিপন্ন অসংখ্য গ্রামীণ নারীর জীবিকা

শিল্পায়নের প্রবল স্রোতে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির যুগে একদিকে যেমন জীবন হয়েছে সহজ, অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা গ্রামীণ পেশা ও হস্তশিল্প। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লাগছে গ্রামীণ নারীদের ওপর, যাঁরা বহু বছর ধরে নিজ বাড়ির উঠোনে বসে তৈরি করতেন বাঁশ, বেত, মাটি, সুতা ও নকশিকাঁথার মতো নানা শিল্পপণ্য।

এই নারীরা সংসার সামলে বিকল্প আয়মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন কুটিরশিল্পে। বিশেষ করে যে সব পরিবারে পুরুষদের আয় সীমিত বা অনিয়মিত, সেখানে নারীদের এই ঘরোয়া কাজ ছিল সংসার টিকিয়ে রাখার মূল সহায়ক শক্তি। কিন্তু বাজার দখল করে নেওয়া প্লাস্টিক, মেলামাইন বা চাইনিজ মেশিনজাত পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কমদামের কারণে এখন এই পণ্যের আর তেমন চাহিদা নেই। ফলে একদিকে যেমন তাদের উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কুটিরশিল্পে নিয়োজিত নারীরা এখন আর আগের মতো কাজ পান না। অনেকে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যাঁরা এখনও টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের লাভের অঙ্ক এতটাই কম যে তা দিয়ে ন্যূনতম সংসার চালানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

শুধু আর্থিক সংকট নয়, এই শিল্প ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের সামাজিক মর্যাদাও কমে যাচ্ছে। আগে যাঁরা কর্মজীবী ছিলেন, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারতেন, এখন তাঁরা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন পুরুষের উপার্জনের ওপর। ফলে আত্মবিশ্বাস কমছে, বাড়ছে পারিবারিক নির্ভরতা ও বৈষম্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বিপণন কৌশল। শুধু সরকার নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামীণ নারীদের ঘরে বসে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি করা, নতুন নকশা ও উদ্ভাবনী ভাবনার সংযোগ ঘটানো, এবং পণ্যের ব্র্যান্ডিং করে বাজার তৈরি করা গেলে এই শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

একটি জাতির ঐতিহ্য শুধু তার ভাষা বা পোশাকে নয়, বরং তার হস্তশিল্পেও প্রতিফলিত হয়। কুটিরশিল্প শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি সংস্কৃতি ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। তাই শিল্পায়নের এই গতির মধ্যে ঐতিহ্যকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব—বিশেষ করে সেই নারীদের জন্য, যাঁরা নিঃশব্দে যুগের পর যুগ ধরে গড়ে তুলেছেন আমাদের নিজস্ব শিল্পচর্চার ভিত।

 

চার বছরের গৃহবন্দিত্ব: জয়পুরহাটের লিজা আক্তার এবং সামাজিক দায়

২৬ জুলাই জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার মণ্ডলপাড়ায় ঘটে যাওয়া একটি নির্মম ঘটনা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, পরিবার কাঠামো এবং নারী অধিকার বিষয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ২০২১ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী ছাত্রী লিজা আক্তার গত চার বছর ধরে তার নিজ ঘরেই তালাবদ্ধ—স্রেফ এই কারণে যে তার বড় বোন প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। বাবা ও সৎমার চোখে এটি ছিলো ‘পরিবারের সম্মানহানি’ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার দায় যেন ছোট বোনকেই বহন করতে হলো।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লিজার বাবা এনামুল হক, যিনি এক সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি মেয়েকে চার বছর ধরে একটি স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কক্ষে বন্দি করে রাখেন। নিয়মিত চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে লিজাকে নিস্তেজ করে রাখা হতো। প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে তার চিৎকার শুনলেও কিছু করতে সাহস পাননি।
এভাবে বছর পার হতে হতে লিজা একসময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্ত এনামুল হক এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী ফুতি বেগমের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

লিজার ঘটনা নতুন নয়। আমাদের সমাজে ‘সম্মান রক্ষা’ বা ‘পারিবারিক মান-ইজ্জত’ রক্ষার নামে বহু নারীকেই শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এখানে নারী যেন পরিবারের সম্পত্তি-একজন নারী ‘ভুল’ করলে, তার দায় বর্তায় পুরো পরিবার বা অন্য নারীর ওপর। বড় বোনের প্রেম বা পলায়ন, ছোট বোনের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিয়ে তাকে বন্দি করে রাখার যথার্থতা কীভাবে একজন মানুষ কল্পনা করতে পারেন?
এটি শুধুই একটি পারিবারিক অন্যায় নয়; এটি সমাজে নারীর অবস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অধিকার, এবং স্বাধীন চিন্তার প্রতি আমাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিচ্ছবি।

এই ঘটনাটি ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’, ‘অবৈধ আটকে রাখা’, এবং ‘মানসিক নির্যাতন’-এর স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কাউকে বিনা অপরাধে বা আদালতের আদেশ ছাড়া এভাবে গৃহবন্দি রাখা ফৌজদারি অপরাধ। আইন অনুযায়ী এ ধরনের কাজের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, চার বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অফিস বা কোনো মানবাধিকার সংস্থা কেন এগিয়ে আসেনি? প্রতিবেশীরা কেন ভয় পেয়ে নীরব থেকেছে? নাকি আমরা সবাই সামাজিক সম্মান রক্ষার মুখোশ পরে আরেকজনের অসহায়ত্বের প্রতি চোখ বুঁজে থাকি?

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এখনও নারীর স্বাধীনতা, বিয়ে, এমনকি শিক্ষা নিয়েও পরিবার ও সমাজের কঠোর দমনমূলক মনোভাব বিদ্যমান। পুরুষের সিদ্ধান্তে নারীর জীবন নিয়ন্ত্রিত হওয়াই যেন ‘স্বাভাবিক’। এই ঘটনাটি সেই সংস্কৃতিরই এক চরম দৃষ্টান্ত, যেখানে একটি মেয়ে শুধুমাত্র মেয়ের বোন হওয়ার কারণে শিক্ষা, আলো-বাতাস, সমাজ সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আমাদের এখন প্রশ্ন তুলতে হবে—কোন সংস্কৃতি আমাদের এমন করে তোলে? যে সংস্কৃতিতে একজন পিতা তার মেয়েকে বন্দি রাখেন, সেই সংস্কৃতি কি আদৌ মানবিক?

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি-
১. নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: লিজার বাবা ও সৎমার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে সমাজে এমন অন্যায়ের বার্তা ছড়িয়ে পড়বে যে, পরিবার মানে একজন পুরুষ যা খুশি তা করতে পারে।

২.লিজার পুনর্বাসন ও মানসিক চিকিৎসা: তাকে শুধু মুক্ত করা নয়, প্রয়োজন তার সুস্থতা নিশ্চিত করা, শিক্ষা-জীবনে ফেরার পথ তৈরি করা, এবং মানসিক পুনর্বাসন দেওয়া।

৩.সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে পরিবারে নারী অধিকার, আইন এবং নৈতিকতা নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো দরকার।

৪.প্রতিবেশী ও সমাজের দায়িত্ব: মানুষ হিসেবে প্রতিবেশীর কষ্টে এগিয়ে যাওয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব। নির্যাতনের শব্দ শুনেও যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে ভবিষ্যতের অন্য ‘লিজা’রা আমাদের সমাজেই নিঃশেষ হবে।

আমরা সমাজে নারীদের জন্য এমন একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখি যেখানে একজনের ভুলের শাস্তি অন্যজনের কাঁধে এসে যেন না পড়ে।
এই নির্মম নিষ্ঠুরতার আইনি, সামাজিক, এবং নৈতিক সব স্তরে বিচার দাবি করছি।

#JusticeForLiza #BreakTheSilence #StopGenderViolence #BangladeshHumanRights

 

ঢাবিতে ছাত্রীসংস্থার জুলাই প্রদর্শনী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীদের বীরোচিত ভূমিকা স্মরণে আয়োজন করা হলো এক ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রদর্শনীটি সোমবার (৪ আগস্ট) বিকেল তিনটায় শুরু হয়, যেখানে ব্যানার, ফেস্টুন, তথ্যচিত্রসহ নানাভাবে তুলে ধরা হয় নারী শিক্ষার্থীদের অবদান।

প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে, যেখানে ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাইয়ে রাজপথ কাঁপানো সাহসিনী ছাত্রীদের নানা মুহূর্তের চিত্র স্থান পায়। বিশেষ করে আন্দোলনের সময়কার নারী নেতৃত্ব, ব্যানার বহনের দৃশ্য, পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে স্লোগানে স্লোগানে এগিয়ে চলা, মাইক হাতে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর—এইসব শক্তিশালী মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলা হয় তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনায়। প্রদর্শনীতে একটি প্রামাণ্যচিত্রও দেখানো হয়, যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও প্রত্যয়ের কাহিনি উঠে আসে সরাসরি বক্তব্য ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে।

ঢাবি শাখা ছাত্রীসংস্থার সভানেত্রী সাবিকুন নাহার তামান্না বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার ছিলো নারীরা। অনেকেই কেবল পুরুষ নেতৃত্বকে সামনে রাখেন, কিন্তু মাঠে-ময়দানে নারীরাও সমানভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই অবদানকে স্মরণ করতেই আমাদের এ আয়োজন।”

তিনি আরও জানান, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও আজকের আয়োজনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। “বৃষ্টির কারণে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলেও যারা এসেছেন তারা গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রদর্শনী উপভোগ করেছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণাদায়ী সাড়া পেয়েছি,”—বলেন তামান্না।

প্রদর্শনী ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। দর্শনার্থী শিক্ষার্থী মরিয়ম তাবাসসুম বলেন, “এটা খুব ইউনিক একটা উদ্যোগ। জুলাই নিয়ে অনেক সংগঠন কাজ করেছে, কিন্তু নারী শিক্ষার্থীদের অবদানকে কেন্দ্র করে এরকম পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী আমি প্রথম দেখলাম। এটা সত্যিই অনন্য।”

আরেক শিক্ষার্থী উর্মি জানান, “ঢাবিতে ছাত্রীসংস্থার তৎপরতা সম্পর্কে আগে তেমন জানতাম না। কিন্তু আজকের এই আয়োজন তাদের দর্শন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। প্রদর্শনী দেখে ভালো লেগেছে, নারীর কণ্ঠকে এভাবে প্রাধান্য দেওয়া খুব দরকার ছিল।”

প্রদর্শনীটি প্রমাণ করেছে, ইতিহাসের পাতায় যাদের নাম অনুল্লিখিত থেকে গেছে, তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে আনতে আজকের ছাত্রীরা নিজেদের দায়িত্ব সজাগভাবে নিচ্ছে। নারী নেতৃত্ব, অংশগ্রহণ ও সাহসিকতার ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করতেই ছাত্রীসংস্থার এ প্রয়াস নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ছাত্রীসংস্থা যে স্মৃতিচারণ করেছে, তা কেবল অতীতকে নয়, ভবিষ্যতের নেতৃত্বকেও নিঃসন্দেহে প্রেরণা জোগাবে।

 

নরম তুলতুলে রুটি বানাতে কার্যকরী কৌশল

রোজকার খাবারের তালিকায় রুটি থাকেই। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, যত যত্ন করেই বানানো হোক না কেন, বাসার রুটি হয়ে যায় শক্ত, শুকনো আর মুখে জমাট বাঁধা! তখন মনটাই খারাপ হয়ে যায়। অথচ, একটু কৌশলী হলেই ঘরেই বানানো যায় একেবারে রেস্টুরেন্টের মতো নরম আর তুলতুলে রুটি। কীভাবে? চলুন জেনে নিই—

১.ঠান্ডা পানির বদলে হালকা গরম পানি কিংবা কুসুম দুধ দিয়ে ময়দা মাখলে তা আরও নরম হয়। এই উষ্ণতার ছোঁয়াই রুটিকে করে তোলে গলে যাওয়ার মতো নরম।

২.ডো মেখে কমপক্ষে ১৫–২০ মিনিট ঢেকে রাখলে তা ‘বসে’ যায় এবং গঠনে আসে নমনীয়তা। এ বিশ্রামই রুটির নরমত্বের গোপন চাবিকাঠি।

৩.ডোতে ১–২ চা চামচ তেল বা ঘি মিশিয়ে নিন। এতে ডো শুকায় না, এবং রুটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত থাকে নরম ও রসাল।

৪.ডো যেন খুব বেশি শক্তও না হয়, আবার অতিরিক্ত নরমও না হয়। মাঝারি ঘনত্বের ডো-ই রুটির কাঙ্ক্ষিত স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করে।

৫.কমপক্ষে ৫–৭ মিনিট ধরে ময়দাকে ভালোভাবে মাখুন। এতে গঠন হয় মসৃণ ও নমনীয়, এবং রুটি পায় প্রাকৃতিক কোমলতা।

৬.অনেকেই রুটি বেলার সময় অতিরিক্ত শুকনো ময়দা ব্যবহার করেন, যা পরে রুটিকে শুকিয়ে ফেলে। তাই যতটা কম সম্ভব, ততটাই ব্যবহার করুন।

৭.তাওয়ায় রুটি দেওয়ার ১০–১২ সেকেন্ড পর প্রথমবার উল্টান, এরপর ২০–২৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার উল্টে দিন। তাপে সময়মতো এ উল্টানোই রুটিকে দেয় ফুলে ওঠার আনন্দ।

৮.কম আঁচে রুটি হয় শক্ত ও চাপা। মাঝারি থেকে উচ্চ আঁচে দ্রুত সেঁকলে রুটি হয় তুলতুলে ও মোলায়েম।

৯.রুটিগুলো একবারে বেলে রাখলে তা শুকিয়ে যায়। বরং একটি বেলে সঙ্গে সঙ্গে তা সেঁকে ফেলুন—এতেই রুটির সতেজতা বজায় থাকে।

 

কন্যাসন্তান জান্নাত লাভের সোপান

আজকের সমাজে কন্যাসন্তান নিয়ে কমন যেই চিত্র দেখা যায়। একদিকে উচ্চশিক্ষিত পরিবারেও মেয়ে সন্তান হওয়ায় নিরাশা—অন্যদিকে ইসলাম যাকে বলে ‘আল্লাহর রহমত’। আমাদের আশেপাশে এখনো অনেক পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে মুখ কালো হয়ে যায়, আত্মীয়স্বজন নীরব হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে ‘পরের সম্পত্তি’ বলে মেয়ে সন্তানকে অবহেলা করে। অথচ ইসলাম এমন আচরণ কঠোরভাবে নিন্দা করে এবং কন্যাসন্তানকে বেহেশতের চাবিকাঠি হিসেবে দেখায়।

জাহেলি মানসিকতা এখনো আমাদের মাঝে বেঁচে আছে
ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে কন্যাসন্তানকে এতটাই ঘৃণার চোখে দেখা হতো যে, অনেকে লোকলজ্জায় নিজের মেয়েকে জীবন্ত কবর দিতো। সেই বর্বরতা আমরা আজ আর করি না ঠিকই, কিন্তু মানসিকতার জায়গায় আমরা কি খুব বেশি বদলেছি?

“আর যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে রাগে-ক্ষোভে ভরে যায়।”
— [সুরা নাহল: ৫৮]
এ আয়াতে বর্ণিত মানসিকতা কি আজও কিছু পরিবারে আমরা দেখি না?

আল্লাহর দেওয়া প্রথম পরিচয়—’কন্যা’
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন:

“তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন…”
— [সুরা আশ-শুরা: ৪৯-৫০]

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ প্রথমেই কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয়—কন্যা সন্তান কোনোভাবেই ছোট নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য দান।

কন্যাসন্তান—জান্নাত লাভের সিঁড়ি
আজ যারা ভাবে “মেয়ে সন্তান মানে দায়”, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে:

“যার কন্যাসন্তান হয় এবং সে তাদের লালন-পালন করে, কষ্ট না দেয়, মেয়েদের কারণে অসন্তুষ্ট হয় না—আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।”
— [মুসনাদে আহমদ]

আর তিনটি কন্যাসন্তানের প্রতিপালনের কথা তো আছেই, এমনকি দুইটি মেয়ে লালন-পালন করলেও জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন তিনি।
(সহিহ মুসলিম ও শুআবুল ইমান)

আজকের বাস্তবতা: কন্যা মানে কষ্ট না, বরং করুণা
আমাদের সমাজে এখনো অনেক বাবা-মা কন্যাকে ‘পরের ঘরের মানুষ’ ভাবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, বিপদের সময় সবচেয়ে বেশি পাশে থাকে মেয়েই। ছেলে হয়তো নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু মেয়ে ফোন করে, খোঁজ নেয়, টাকা পাঠায়, বাবা-মায়ের জন্য ডাক্তারের সিরিয়াল নেয়,এরকম আরো অনেককিছু যা হয়তো ছেলে সন্তানরা করেনা বা করতে পারেনা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

“যে কন্যাসন্তানের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন।”
— [আবু দাউদ]

পিতা-মাতার সৌভাগ্যের চিহ্ন কন্যাসন্তান
সাহাবি ওয়াসিলা বিন আসকা (রা.) বলেন:

“কন্যাসন্তান মা-বাবার সৌভাগ্যের প্রতীক।”
কারণ আল্লাহ নিজেই বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা প্রথমে কন্যা দেন—এটি সৌভাগ্যের ইঙ্গিত।

কন্যাসন্তান মানে রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্য

“যে ধৈর্যের সঙ্গে কন্যাসন্তান লালন-পালন করে, কিয়ামতের দিন সে আমার খুব কাছে থাকবে।”
— [সহিহ মুসলিম]
নবীজির কাছাকাছি জান্নাতে থাকার চেয়ে বড় আশীর্বাদ একজন মুমিনের জন্য আর কী হতে পারে?

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, আখিরাত গড়ুন
একজন মুসলমানের জন্য সন্তানের লিঙ্গ নয়, তার আমল ও প্রতিপালনই গুরুত্বপূর্ণ। কন্যাসন্তান কোনো ‘দায়’ নয়—এটা আখিরাতে আপনার জান্নাত লাভের অন্যতম সুযোগ। আল্লাহ তাআলার দেওয়া প্রতিটি সন্তানই পরীক্ষা ও নেয়ামত। তাই আসুন, কন্যাসন্তানকে সম্মান দিই, ভালোবাসি এবং সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিই।

 

বিমানবাহিনীর প্রথম নারী সদস্য এসথার ম্যাকগোউইন ব্লেক

৮ জুলাই ১৯৪৮, ঠিক মধ্যরাত। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ফোর্ট ম্যাকফারসন সামরিক ঘাঁটিতে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত রচিত হয়। ওই রাতেই এসথার ম্যাকগোউইন ব্লেক যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে প্রথম নারী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়ে তৈরি করেন এক অনন্য নজির। তার এই পদক্ষেপ কেবল একজন নারীর পেশাগত অগ্রযাত্রা নয়, বরং তা ছিল লাখো নারীর জন্য সামরিক পরিসরে প্রবেশের দ্বার উন্মোচনের প্রতীক।

এসথার ব্লেকের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত এক বেদনার গল্প, এবং গভীর দেশপ্রেম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৪ সালে, তিনি “Women’s Army Corps”–এ যোগ দেন। কারণটা ছিল তার নিখোঁজ বড় ছেলে। তিনি একজন বৈমানিক, যিনি যুদ্ধকালীন বেলজিয়ামে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিখোঁজ হন। এসথারের বিশ্বাস ছিল, সেনাবাহিনীর কোনো অফিস সহায়ক কাজের দায়িত্ব নিয়ে তিনি হয়তো তার ছেলের খোঁজ পেতে পারবেন।

এরপর থেকেই যুক্ত হন সামরিক অফিসের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে, বিশেষ করে বিমান শাখায় বেসামরিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী পৃথক কোনো বাহিনী ছিল না; তা সেনাবাহিনীরই একটি শাখা। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২৬ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘United States Air Force’—আলাদা এক সামরিক বাহিনী হিসেবে গঠিত হয়। এর পরপরই শুরু হয় এই বাহিনীতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার আইনি ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া।

এক বছর পর, ১৯৪৮ সালের ৮ জুলাই কার্যকর হয় “Women’s Armed Services Integration Act”, যার মাধ্যমে নারীরা স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার অধিকার পান। আর এই আইন কার্যকর হওয়ার ঠিক এক মিনিট পর, এসথার ম্যাকগোউইন ব্লেক হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর প্রথম নারী সদস্য—একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদচারণা।

যদিও এসথার ব্লেক কখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি, তার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে, যা কোনো বাহিনীর কার্যকারিতা ও কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, যুদ্ধে না গিয়েও একজন নারী সামরিক বাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারেন। তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞাই তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

এসথার ব্লেক পরবর্তীতে সামরিক জীবন থেকে অবসর নেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে নারীদের স্থায়ী ও স্বীকৃত অংশগ্রহণের যাত্রা। আজ যখন আমরা দেখি নারীরা শুধু অফিসে নয়, যুদ্ধবিমান চালানো থেকে শুরু করে সামরিক কমান্ডেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন মনে পড়ে সেই নারীকে, যিনি প্রথম সাহস করে সেই দরজাটি খুলেছিলেন।

তাঁর পদক্ষেপ ছিল ভবিষ্যতের নারীদের জন্য আশার আলো, আর প্রমাণ করে দেয়—আকাশ কোনো সীমা নয়, বরং নতুন এক যাত্রার শুরু।

তথ্যসূত্র:
U.S. Air Force Historical Studies Office

“Women in the Military: An Unfinished Revolution” by Maj. Gen. Jeanne Holm

U.S. Department of Defense Archives

Women’s Armed Services Integration Act, 1948

 

টঙ্গীর ড্রেনে পড়ে এক মায়ের মৃত্যু—দায় কার?

টঙ্গীর একটি খোলা ড্রেনে পড়ে মারা গেলেন এক কর্মজীবী মা। পানিতে দীর্ঘসময় ডুবে থাকায় তাঁর মরদেহ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল—নাক ছিল না, শরীর ফুলে চেনার উপযোগী না, আতর ও স্প্রে দিয়ে দুর্গন্ধ চাপা দিয়ে শেষবারের মতো তাকে দাফন করা হয় মাত্র অল্প সময় আগে।
দুই জমজ শিশুকে লাশের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি, তারা ভয় পাবে বলে। অথচ তারা শুধু একটাই প্রশ্ন —“মা কই?”
তাদের কান্না থামছে না, চোখে ঘুম নেই। মা ছাড়া এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতে তাদের ঠাঁই কোথায়, কে জানে?
ডিভোর্সড মা, একা হাতে সন্তানদের মানুষ করছিলেন। একটি কোম্পানিতে চাকরি করে কঠিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে। আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে একদিকে ঘরের এক কোণে বসে দুই শিশু কাঁদছে, অন্যদিকে পরিবারের কিছু সদস্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাঁর সামান্য স্বর্ণালঙ্কার আর সম্পদের হিসাব নিয়ে।
আর সিটি কর্পোরেশন?
যাদের গাফিলতিতে এক মায়ের মৃত্যু হলো—তারা এখনও কোনো সহানুভূতি দেখায়নি, পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। লাশ বুঝিয়ে দিয়ে যেন তাদের দায়িত্ব শেষ।
এই নিষ্ঠুর নিরবতা এবং দায়িত্বহীনতা শুধু এক পরিবার নয়, পুরো সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আমরা জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি—
এই দুই অনাথ শিশুর পুনর্বাসন ও শিক্ষা-ব্যবস্থার সরকার এবং সিটি কর্পোরেশনকে অবিলম্বে দায়িত্ব নিতে হবে।

মৃত্যুর জন্য দায়ী সিটি কর্পোরেশনের অবহেলার তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

ঢাকাসহ দেশের সব খোলা ড্রেন ও ম্যানহোল দ্রুত সংস্কার করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যা হবে মানবিক দায়বদ্ধতার ন্যূনতম বহিঃপ্রকাশ।

অনাথ শিশু সন্তানদের আইনি সহায়তা ও মানসিক সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে, এবং এ ক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি।

এটা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—এটা আমাদের অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। মৃত্যু হয়েছে একজন মায়ের, অনাথ হয়েছে দুটি শিশু—এই দায় সবার। রাষ্ট্র কিংবা কর্পোরেশন দায় এড়িয়ে গেলে, মানবতা মুখ থুবড়ে পড়ে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই শিশুদের পাশে দাঁড়াই। সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, আর নিরাপদ শহর গড়ার দাবি জানাই।

 

ইসরায়েলি সংসদে পশ্চিম তীর ও মসজিদে আকসা দখলের আইন অনুমোদন

(আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ‘ডি ফ্যাক্টো’ অধিগ্রহণের পথে ইসরায়েল)

আন্তর্জাতিক আইনের চোখে স্পষ্টভাবে অবৈধ হলেও, ইসরায়েলি সংসদ ‘নেসেট’-এ গত বুধবার(২৩ জুলাই) ৭১-১৩ ভোটে একটি বিতর্কিত বিল পাশ হয়েছে, যার মাধ্যমে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইসরায়েল “ইহুদি, সামারিয়া ও জর্ডান উপত্যকায়” সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। এই অঞ্চলগুলো মূলত পশ্চিম তীরের অংশ, যেগুলো ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধভাবে অধিকৃত বলে বিবেচিত।
এই বিল ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীর দখলকে এখন থেকে ‘বৈধ’ বলে গণ্য করবে। যদিও আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে একপেশে জবরদখল এবং দখলদারিত্বের শামিল বলেই আখ্যা দিচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—পশ্চিম তীরের অন্তর্গত পবিত্র শহর বায়তুল মাকদিস (জেরুজালেম) এবং মুসলমানদের প্রথম কেবলা, মসজিদে আকসার উপর এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত আরও দৃঢ় হতে যাচ্ছে।

মূলত ‘ডি ফ্যাক্টো অ্যানেক্সেশন’—অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও, বাস্তবে ভূখণ্ড দখল করে ফেলা—এই নীতিকে কার্যকর করতেই আইনটি পাশ করানো হয়েছে। ইসরায়েল এখন থেকে পশ্চিম তীরে তাদের বসতি নির্মাণ, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘আইনি’ কাঠামোর ভেতরেই চালাতে পারবে।

ইসরায়েলের ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম তীর ও আল-আকসা মসজিদ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে সক্রিয় ছিল। এই আইন পাশের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণের দিকেই আরেকটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তকে ‘মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী অস্থিরতা ডেকে আনার মতো ভয়াবহ উসকানি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে এক বিবৃতিতে জানায়, “এটি একটি উপনিবেশবাদী পদক্ষেপ, যা পশ্চিম তীরে বর্ণবাদী বা ‘আপারথেইড’ শাসনব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করছে।” তারা আরও বলেছে, এই প্রস্তাব জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজল্যুশন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) উপদেষ্টা রায়েরও অপমান।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংগঠন আগেই পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি কার্যকলাপকে অবৈধ দখল হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেসব আন্তর্জাতিক অবস্থানকে উপেক্ষা করে ইসরায়েল এবার সরাসরি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় একে আইনিভাবে অনুমোদন দিয়ে চরম এক পূর্বপরিকল্পিত দখলনীতির বাস্তবায়ন করলো।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের অংশ করে নিলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিতে গৃহীত দুই-রাষ্ট্র সমাধান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি এবং পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করেন। বসতির সংখ্যা ও প্রভাব প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে তুলছে।

তাদের মতে, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি গভীর ধর্মীয় ও ভূরাজনৈতিক বার্তা বহন করে। মসজিদে আকসা মুসলিমদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক। এই স্থানকে কেন্দ্র করেই ইসরায়েল বহু বছর ধরে সহিংসতা ও বৈষম্যের রাজনীতি চালিয়ে আসছে।

বর্তমানে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আরব লিগ, ওআইসি (OIC) এবং অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোরালো কূটনৈতিক প্রতিবাদ জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনিদের জমি ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বহু মানুষ হ্যাশট্যাগ #FreePalestine ও #SaveAlAqsa ব্যবহার করে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে

 

গাজা নিয়ে পার্লামেন্টে প্রতিবাদে শাস্তির মুখে মেহরিন ফারুকি

অস্ট্রেলিয়ার সংসদে সম্প্রতি এক উত্তপ্ত মুহূর্ত তৈরি হয় যখন গ্রিনস পার্টির সাহসী মুসলিম সিনেটর মেহরিন ফারুকি একটি প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন, যাতে লেখা ছিল —
“গাজা ক্ষুধার্ত, শব্দ তাদের খাওয়াবে না। ইসরায়েলের উপর নিষেধাজ্ঞা দিন।”

এই বার্তা তিনি প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজি-এর সামনেই প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেন। বিষয়টি সিনেটরদের অনেকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

এরপর অস্ট্রেলিয়ান সিনেট ৫০-১১ ভোটে সিদ্ধান্ত নেয়, সেনেটর ফারুকির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিনেট প্রেসিডেন্ট সু লাইনস বলেন,“সেনেটর ফারুকি সংসদের নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন, কারণ তিনি রাজনৈতিক বার্তা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করেছেন—যা গভর্নর-জেনারেল ও প্রধান বিচারপতির মতো পদগুলোকেও রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনার ঝুঁকি তৈরি করে।”

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে গাজার মানবিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অধিকার কতটুকু একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখেন -সেটি।

📌 আপনার ভাবনা কী? আপনি কি মনে করেন, একজন সিনেটর হিসেবে ফারুকির এমন প্রতিবাদ ন্যায্য ছিল?

 

জ্বর হলে করণীয়: সচেতন হোন, আতঙ্কিত নয়

(বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ও ভাইরাস জ্বরের সময় যা জানবেন ও করবেন)

জ্বর মানেই আতঙ্ক নয়-সচেতনতাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা!
এই ভাইরাস ও ডেঙ্গুর মৌসুমে শিশুদের জ্বর হলে কোন ওষুধ কবে দিবেন, কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, আর কখন শুধু বিশ্রামই যথেষ্ট—জেনে নিন এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলো।
নিজে জানুন, শেয়ার করে অন্যদেরও সচেতন করুন।❞

ভাইরাস জ্বর কেমন হয়?
ভাইরাস জ্বর সাধারণত ৩–৫ দিন স্থায়ী হতে পারে।

তাপমাত্রা ১০২°F–১০৩°F পর্যন্ত উঠতে পারে এবং ধীরে ধীরে নামতে পারে।

একদিনে জ্বর একেবারে সেরে যাবে—এমন ভাবা বাস্তবসম্মত নয়।

অযথা এন্টিবায়োটিক নয়
ভাইরাসজনিত জ্বরে এন্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।

যদি শরীরে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন (যেমন গলা ফুলে যাওয়া, কানে ইনফেকশন বা পেটের সমস্যা) দেখা না দেয়, তাহলে শুরুতেই এন্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

খাদ্য ও পানি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
জ্বর হলে শিশু বা বড়দের খাওয়া কমে যায়। এতে ভয় পাবেন না।

তরল খাবার যেমন স্যুপ, ভাতের মাড়, ওআরএস, শরবত বা ফলের রস অল্প অল্প করে দিন।

শিশুকে এমন কিছু খাওয়াবেন না যা বমি বা পাতলা পায়খানা ঘটাতে পারে।

দিনে কমপক্ষে ৪ বার প্রস্রাব হচ্ছে কি না লক্ষ্য করুন। এটি শরীরের পানিশূন্যতা মাপার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

🌡️ জ্বর মাপা ও ওষুধ প্রয়োগ
থার্মোমিটারে জ্বর ১০০°F বা তার বেশি হলে তবেই জ্বরের ওষুধ দিন।

মুখে খাওয়ার সিরাপ সাধারণত ৪–৬ ঘণ্টা অন্তর দেওয়া যায়।

সাপোসিটরি (Suppository) প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, তবে অন্তত ৮ ঘণ্টার ব্যবধান থাকতে হবে।

সিরাপ খাওয়ানোর ১০–১৫ মিনিটের মধ্যে বমি হলে ওষুধটি আবার দিতে হবে।

🚫 ভুল ধারণা থেকে সাবধান:
গায়ে হাত দিয়ে গরম লাগা মানেই জ্বর নয়।

জ্বরের আগে শরীর ঠান্ডা লাগা বা শীত শীত ভাব থাকলেও তা জ্বরের লক্ষণ হতে পারে, তবে তাপমাত্রা না মাপা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাবে না।

জ্বরের ঔষধ ঘনঘন বা ডাবল ডোজে দেওয়া বিপজ্জনক।

বিশ্রাম ও ঘুম: ওষুধের চেয়েও বড় চিকিৎসা

শিশু বা বড়দের জ্বর হলে বেশি বিশ্রাম নিতে দিন।

ঘুমের সময় জ্বর থাকলেও ঘুম ভাঙিয়ে ঔষধ খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই, যদি না তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যায়।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
জ্বর ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে।

বাচ্চা একেবারেই খাচ্ছে না, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, খিচুনি হচ্ছে বা বারবার বমি করছে।

শরীরে র‍্যাশ উঠলে বা রক্তচাপ কমে যাচ্ছে মনে হলে।

ডেঙ্গু বা করোনা সন্দেহ হলে টেস্ট করান এবং শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান।

🦟 ডেঙ্গু ও করোনা সতর্কতা:
বাসার চারপাশে পানি জমতে দেবেন না, মশারির ব্যবহার নিশ্চিত করুন।

বাচ্চা ও পরিবারের সদস্যদের হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার শেখান।

বাচ্চা জ্বর হলে স্কুলে পাঠাবেন না এবং সবার থেকে আলাদা রাখুন।

সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা:
জ্বর কোনো রোগ নয় বরং একধরনের লক্ষণ। তাই রোগের মূল কারণ বুঝে ধৈর্য ধরে চিকিৎসা নিতে হবে। ভরসা রাখুন, শিশুদের প্রতি সতর্ক থাকুন,যত্ন নিন, অহেতুক অতিরিক্ত ওষুধ সেবন না করে বিশ্রাম, তরল খাবার এবং পরম সেবাযত্নে জ্বর সেরে উঠতে পারে।

সুস্থ থাকুন, শিশুকে নিরাপদে রাখুন।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন পোশাকবিধি: পেশাদার পরিবেশ গড়তে ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক নিষিদ্ধ

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি তাদের সব স্তরের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য নতুন একটি পোশাকবিধি জারি করেছে, যার লক্ষ্য হলো একটি শালীন, পেশাদার ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। গত ২১ জুলাই ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ-২ থেকে এই নির্দেশনা জারি করা হয় এবং ২৪ জুলাই তা দেশের বিভিন্ন শাখা ও দপ্তরে পাঠানো হয়।

নতুন পোশাকবিধিতে নারী ও পুরুষ—উভয় শ্রেণির কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের ধরন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু ধরনের পোশাক পরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনার কথাও বলা হয়েছে।

পুরুষ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) শার্ট—হোক তা হাফ বা ফুলহাতা—ও ফরমাল প্যান্ট পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে থাকতে হবে ফরমাল জুতা বা স্যান্ডেল। জিন্স ও গ্যাবার্ডিন প্যান্ট পরিহারের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলোকে পেশাদার পোশাকের পরিসরে আনা হচ্ছে না।

নারী কর্মীদের জন্য নির্দেশনা আরও বিস্তৃত। তাঁদের শাড়ি, সালোয়ার–কামিজ ও ওড়না বা অন্য কোনো শালীন, পেশাদার পোশাক পরতে বলা হয়েছে। এসব পোশাক হতে হবে সাদামাটা ও সংযত রঙের। হিজাব বা হেডস্কার্ফ পরার সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে তা হতে হবে অনাড়ম্বর ও আনুষ্ঠানিক রূপের।
স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ছোট হাতার ও ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক (শর্ট স্লিভ ও শর্ট লেংথ ড্রেস) এবং লেগিংস।

নতুন পোশাকবিধির পাশাপাশি নারী কর্মীদের প্রতি আচরণ এবং দাপ্তরিক পরিবেশ সংক্রান্ত কয়েকটি নির্দেশনাও সংযুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশন ২০০৩–এর ৩৯ ধারার আলোকে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগ গঠিত কমিটিতে পাঠাতে হবে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আগে থেকেই বিদ্যমান নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ইতিবাচক কর্মপরিবেশ বজায় রাখতে সততা, সময়ানুবর্তিতা, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য প্রতিটি বিভাগ, ইউনিট বা দপ্তরে একজন করে মনোনীত কর্মকর্তা থাকবেন। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্দেশনা অমান্য করলে, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ গঠন করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, এই নির্দেশনার মাধ্যমে কাউকে হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়নি, বরং হিজাব পরার সুযোগকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য যোগদানকারী কিছু কর্মীর পোশাক নিয়ে অনেক সময় সহকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। আবার পুরুষদের মধ্যে অনেকে টি-শার্ট, জিন্স কিংবা গ্যাবার্ডিন পরে অফিসে আসেন। এ কারণেই সবাইকে একক ও পেশাদার পোশাকধারায় আনতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ শুধু একটি পোশাকবিধি জারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি বৃহৎ সামাজিক ও নৈতিক বার্তা বহন করে।
একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শালীনতা, শৃঙ্খলা এবং পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এই সিদ্ধান্তের মূলভিত্তি। পোশাক যেমন ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে, তেমনই কর্মপরিবেশের উপরেও প্রভাব ফেলে। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে পোশাক নিয়ে কর্মক্ষেত্রে অহেতুক দৃষ্টি বা মন্তব্যের সুযোগ রোধ করা একটি প্রশংসনীয় উদ্দেশ্য।
অপরদিকে, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও এখানে সম্মান জানানো হয়েছে—যেমন হিজাব পরাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।
সামগ্রিকভাবে এই সিদ্ধান্ত কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, সৌজন্য ও শালীনতার একটি নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।

 

সৌদিতে নারী যাত্রীদের জন্য নারী চালক সেবা চালু করছে উবার

সৌদি আরবে নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবার নারী চালকদের মাধ্যমে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা রাইড সেবা চালু করতে যাচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত রাইড-শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান উবার।

সোমবার (১৪ জুলাই) রিয়াদে আয়োজিত “For Women, By Women”— অর্থাৎ “নারীদের জন্য, নারীদের দ্বারা”—শীর্ষক এক বিশেষ অনুষ্ঠানে উবার এই নতুন সেবার ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সৌদির বিভিন্ন শহরে পর্যায়ক্রমে এ সেবা চালু হবে।

উবার জানিয়েছে, নতুন সেবার আওতায় নারী যাত্রীরা তাদের রাইডের জন্য নারী চালক বেছে নিতে পারবেন। একই সঙ্গে তারা আগে থেকেই নির্ধারিত সময়ে ট্রিপ বুক করার সুবিধাও পাবেন।

উল্লেখ্য, সৌদি আরব ২০১৮ সালে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেয়। সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের সাত বছর পর এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে নারী চালকদের যুক্ত করে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা এই রাইড সেবা চালু করতে যাচ্ছে উবার।

বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ট্রিপ পরিচালনা করেছে উবার। প্রতিষ্ঠানটি ইরাক ও ইরানে এর আগেই নারী চালকদের মাধ্যমে এমন সেবা চালু করেছে, যা পুরুষ সঙ্গী ছাড়া চলাচলকারী নারীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

উবার কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, সৌদি আরবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের দিকটি গুরুত্ব দিয়েই এই বিশেষ রাইড সেবা চালু করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে দেশটির প্রধান প্রধান শহরজুড়ে সেবাটি বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

উত্তরায় যুদ্ধবিমান ক্রাশে নিহত শতাধিক: শিশুশিক্ষার্থীদের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বাংলাদেশ

২১ জুলাই ২০২৫, সোমবার। সময় তখন দুপুর ১টা ৬ মিনিট। ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান (F-7 BGI) মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন কলেজ ভবনের ঠিক ওপরেই বিধ্বস্ত হয়। তখনই শুরু হয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির। স্কুল ছুটির মুহূর্তে শিশুদের ক্লাসরুমে আছড়ে পড়া বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তেই দুতলা ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র অগ্নিকাণ্ড। এতে ঘটনাস্থলেই বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক দগ্ধ হন। শেষরক্ষা হয়নি বিমানের একমাত্র পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলামেরও।
দুর্ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। শিশুদের স্কুল প্রাঙ্গণ মুহূর্তে পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে।

মাইলস্টোন কলেজের প্রভাষক তাসলিমা আক্তার, যাঁর সন্তান চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, ঘটনার সময় কলেজেই ডিউটিতে ছিলেন। ঘটনার মুহূর্তে তাঁর নিজের চোখেই দেখা আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের দৃশ্য আজও তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন,
“আমি ফোনে ছেলের ফর্ম মাস্টারের সঙ্গে কথা বলার এক মিনিট পরই বিকট বিস্ফোরণ শুনি। দৌড়ে গিয়েই দেখি আমার ছেলের ক্লাস ভবনের সামনে আগুন। পুড়ে যাওয়া তিনটি শিশুর দেহ মাটিতে পড়ে আছে, পোড়া শরীর, কাপড় কিছুই নেই।”
তিনি আরও জানান, তাঁর সন্তান অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও, একই ক্লাসের বাকি শিশুরা কেউ আর বেঁচে নেই। সবাই দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে।

এ দিনের সবচেয়ে সাহসী চরিত্র হয়ে উঠে এসেছেন শিক্ষিকা মেহরীন চৌধুরী। তিনি ভবনের দ্বিতীয় তলায় আটকে পড়া ছাত্রছাত্রীদের উদ্ধারে নিজের জীবন বাজি রাখেন। সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন,
“ম্যাডাম ভিতরে ঢুকে একে একে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে নিচে নামিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিজে আর বের হতে পারেননি।”
এক উদ্ধারকারী সেনা সদস্য চোখের জল সংবরণ করতে না পেরে বলেন,”এইযে মা! এইযে মা হয়ে গেসে, আরেকটু পরই বের হইতে পারত!”

৮০ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। দেশবাসী আজ তাঁর এই আত্মত্যাগে শোকাভিভূত, কিন্তু গর্বিতও।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুতলা ওই ভবনের নিচতলায় ৩য়, ৪র্থ, ৫ম শ্রেণির এবং উপরতলায় ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির ক্লাস চলছিল। দুপুর ১টা থেকে ১টা ১৫ মিনিটের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসেই অবস্থান করছিল। তারা বেঞ্চে বসা অবস্থায়ই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জানালা ভেঙে বের হবার প্রাণান্ত চেষ্টা করেও অনেকেই বের হতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানালার গ্রিল ভেঙে যখন ঢুকছিলেন, তখন দেখা গেছে কিছু শিশুর অর্ধগলিত হাত জানালার ফাঁকে আটকে আছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলামের প্রথম একক উড্ডয়ন (Solo Flight)। উড্ডয়নের কিছু সময় পরই তিনি কন্ট্রোল রুমে জানান বিমানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, বিমান ভাসছে না এবং বারবার নিচে পড়ে যাচ্ছে। কন্ট্রোল টাওয়ার তাকে জরুরি ইজেক্টের নির্দেশ দিলেও, তিনি তা না করে বিমানটিকে জনবসতি এড়িয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বিমানটি মাইলস্টোন কলেজ চত্বরে বিধ্বস্ত হয়।
তাঁকে সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো দুর্ঘটনার সময় ও পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বজন হারানো মা-বাবা, দগ্ধ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার ক্যামেরা তাক করা, ট্রমাটাইজড শিশুদের কাছ থেকে ‘অনুভূতি’ জানতে চাওয়ার ঘটনায় অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। এক অভিভাবক বলেন,
“ভাই, আপনারা এগুলা রাস্তায় গিয়ে করেন, এখন আমার সন্তানকে খুঁজে পাই না।”
এছাড়া উৎসুক জনতা ও কিছু অসচেতন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল এলাকায় ভিড় করে উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসেবে এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ISPR জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৬৪ জনের বেশি আহত এবং একাধিক শিশুসহ প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।

সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতায় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়। বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল, সিএমএইচ সহ একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। বার্ন ইউনিটে জরুরি হটলাইন চালু করা হয়েছে: 📞 ০১৯৪৯০৪৩৬৯৭

২১ জুলাই ২০২৫-বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন। সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি, একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান, আর হারিয়ে যাওয়া শতাধিক শিশুর প্রাণ। যারা এই শিশুগুলোর স্কুল ব্যাগ আর জুতা গুছিয়ে দিয়েছিল সকালে, তারাই বিকেলে পুড়ে যাওয়া পোড়া ব্যাগের চিহ্ন খুঁজে ফিরেছে।
মায়েরা তাদের সন্তানের শেষ খাওয়ানোর কথা স্মরণ করে কাঁদছেন। বাবারা হাসপাতালের করিডোরে দৌড়ে ফিরছেন সন্তানকে একবার দেখার আশায়।
দেশ কাঁদছে আজ, শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়, অপরিচিত ছোট্ট হাতগুলোর জন্যও।

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আল্লাহ শহীদ শিশুদের জান্নাত দান করুন এবং সকল আহত ও স্বজনদের ধৈর্য ও সান্ত্বনা দিন। আমিন।

 

গাজায় দুর্ভিক্ষ: অনাহারে ৩৫দিন বয়সী শিশুর মৃত্যু

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবরোধ, মানবিক সহায়তার বাধা এবং লাগাতার সামরিক হামলার মধ্যে এবার অনাহারে প্রাণ হারাল মাত্র ৩৫ দিনের এক নবজাতক। শনিবার (১৯ জুলাই) গাজার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র আল-শিফা হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যু হয়।

রোববার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর জানায়। একই দিনে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলায় নিহত হয়েছেন আরও অন্তত ১১৬ জন ফিলিস্তিনি। এদের মধ্যে ৩৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত “গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন” (জিএইচএফ)-এর একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে- চরম খাদ্য সংকট চলছে, হাসপাতাল গুলোতে জরুরি বিভাগগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে অন্তত ১৭ হাজার শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।
আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, “শুধু শনিবারই আমাদের হাসপাতালে অনাহারে মারা গেছে দুজন, যার একজন ছিল সদ্যজাত শিশু।”

গাজার খান ইউনিস ও রাফাহ অঞ্চলেও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, বহু ভবন ধ্বংস হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে আছে অসংখ্য মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, “মানুষ একটু খাবারের আশায় লাইনে দাঁড়ায়, কিন্তু ফেরে লাশ হয়ে।”

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের মহাসচিব জগন চাপাগাইন সতর্ক করে বলেছেন, “গাজা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি।” একই বক্তব্য দিয়েছেন নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান ইয়ান এগেল্যান্ড, যিনি বলেন, “গত ১৪২ দিনে আমরা একটি ত্রাণবাহী ট্রাকও গাজায় ঢোকাতে পারিনি।”

জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, মিশর সীমান্তে তাদের যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য মজুত রয়েছে, কিন্তু ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে সেগুলো গাজার ভেতরে প্রবেশ করানো যাচ্ছে না। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, “সীমান্ত খুলুন, অবরোধ তুলে নিন এবং আমাদের মানবিক সহায়তার কাজ করতে দিন।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই মানবিক বিপর্যয় বিশ্ব বিবেকের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গাজায় দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

 

সমাজের এক নির্মম অভিশাপ যৌতুক

যৌতুক এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। আধুনিক যুগে আমরা প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে যতই এগিয়ে যাচ্ছি, ততই যেন পিছিয়ে পড়ছি মানবিকতা ও নারীর মর্যাদার ক্ষেত্রে। এখনও অনেক পরিবারে বিয়ের পর মেয়েটিকে পিতার বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা, ফার্নিচার বা জমিজমা আনার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এই দাবি পূরণ না হলে নারীর ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়্গ।

এই নির্যাতনের রূপ কখনও শারীরিক, কখনও মানসিক, আবার কখনও আর্থিক বা সামাজিক হয়। স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, দেবর—এই চক্র সবাই মিলে একটা নারীর জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে।

যৌতুকের বিরুদ্ধে কী কী আইন আছে?
🔹 যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮
এই আইনে বলা হয়েছে, যৌতুক চাওয়া, দেওয়া বা নেওয়া—সবই অপরাধ।

এই অপরাধের সাজা:
✅ সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছরের জেল
✅ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা

🔹 নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (ধারা ১১)
যদি যৌতুকের জন্য নারীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়, তাহলে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

ধারা ১১(ক):
👉 যৌতুকের কারণে নারীর মৃত্যু ঘটলে
🔸 সাজা: মৃত্যুদণ্ড অথবা আজীবন কারাদণ্ড

ধারা ১১(খ):
👉 যৌতুকের জন্য গুরুতর শারীরিক আঘাত করলে
🔸 সাজা: যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ ১২ বছর জেল + জরিমানা

ধারা ১১(গ):
👉 সাধারণ শারীরিক আঘাত করলে
🔸 সাজা: সর্বোচ্চ ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড + জরিমানা

যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হলে কী করবেন?
ভুক্তভোগী নারীর উচিত দ্রুত ও সচেতনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন—

✅ ১. অভিযোগ করুন থানায়:

নিকটস্থ থানায় গিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে এফআইআর করুন। এতে মামলা রেকর্ড হয়।

✅ ২. কোর্টে মামলা করুন:

বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তায় আদালতে মামলা দায়ের করুন।

✅ ৩. লিগ্যাল এইড নিন:

বিনামূল্যে আইনগত সহায়তার জন্য যোগাযোগ করুন—
🔸 জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা (জাতীয় লিগ্যাল এইড)
🔸 জেলা লিগ্যাল এইড অফিস

✅ ৪. নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে:
আপনি যদি ভয়ের মধ্যে থাকেন বা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর অথবা নির্ভরযোগ্য মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তা নিন।

আপনার পক্ষে প্রমাণ জোগাড় করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
আইন প্রয়োগ তখনই সম্ভব, যখন আপনি নির্যাতনের প্রমাণ দিতে পারবেন। তাই—

🔸 চিকিৎসার কাগজপত্র
🔸 নির্যাতনের ছবি বা ভিডিও
🔸 প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের সাক্ষ্য
🔸 মোবাইল মেসেজ, কল রেকর্ড
🔸 সামাজিক মাধ্যমে পাঠানো বার্তা
এগুলো যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করুন।

মনে রাখবেন, প্রত্যক্ষ ঘটনার পরে দ্রুত অভিযোগ করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

সন্তান থাকলে কী করবেন?
আপনার যদি সন্তান থাকে, তাহলে তাদের অভিভাবকত্ব, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও চিন্তা করতে হবে। প্রয়োজনে শিশুদের জন্য পৃথক আবেদন করে কোর্টে নিরাপত্তা চাওয়া যায়।

  • সহায়তা কোথায় পাবেন?

🔹 [ ] BLAST (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট)
🔹 [ ] নারীপক্ষ
🔹 [ ] বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
🔹 [ ] জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা (www.nlaso.gov.bd)
🔹 [ ] মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর (www.dwa.gov.bd)

✊ মুখ খুলুন, সাহস রাখুন-আইন আপনার পাশে

যৌতুকের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিরোধ হলো সচেতনতা, শিক্ষা, এবং আইন প্রয়োগ। মুখ বন্ধ করে সহ্য করলে অপরাধীরা আরও সাহস পায়। মনে রাখবেন, আপনি একা নন—আইন, সমাজ, এবং নানা মানবাধিকার সংগঠন আপনার পাশে আছে।

নারীর অধিকার রক্ষায় প্রতিটি মানুষকেই সচেতন হতে হবে। যৌতুক শুধু আইনের নয়, মানবিকতা, বিশ্বাস এবং ভালোবাসারও অবমাননা। এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

চিকেনপক্স: ভুল ধারণায় নয়, সচেতন সিদ্ধান্তে সুরক্ষা দিন শিশুকে

বর্তমানে অনেক এলাকায় চিকেনপক্স বা ভ্যারিসেলা ছড়িয়ে পড়েছে মহামারী আকারে। শিশুদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসজনিত রোগ নিয়ে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা, যার ফলে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ভ্রান্ত বিশ্বাস:“একবার চিকেনপক্স হলে আর হবে না, তাই শৈশবে হলে ভালো।”
সত্য:“চিকেনপক্স একবারও না হওয়াই ভালো-কারণ প্রথমবারের সংক্রমণই মারাত্মক হতে পারে।”

চিকেনপক্স বা ভ্যারিসেলা (Varicella) ভাইরাসজনিত একটি সংক্রামক রোগ, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। যদিও অনেকেই একে “সাধারণ” রোগ বলে মনে করেন, তবে এর জটিলতা একবার শুরু হলে তা ভয়াবহ হতে পারে।

কেন ‘একবার হলে ভালো’-এই ধারণা বিপজ্জনক?
🔸 জীবনের প্রথম সংক্রমণই মারাত্মক হতে পারে — অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
🔸 নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে সংক্রমণ), ত্বকের মারাত্মক ইনফেকশন, এমনকি লিভারের জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
🔸 গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত হলে গর্ভপাত, শিশুর জন্মগত ত্রুটি বা নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি থাকে।
🔸 ভ্যারিসেলা ভাইরাস শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়, যা পরবর্তী জীবনে শিংলস (Herpes Zoster) নামে ভয়ানক ব্যথাযুক্ত রোগে পরিণত হতে পারে।

💉 একমাত্র প্রতিরক্ষা: ভ্যারিসেলা ভ্যাকসিন

✅ মাত্র একটি নিরাপদ টিকা আপনার শিশুকে দিতে পারে আজীবনের সুরক্ষা।
✅ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), CDC সহ সব স্বাস্থ্য সংস্থাই শিশুর জন্য ভ্যারিসেলা ভ্যাকসিনের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
✅ সাধারণত ১২–১৫ মাস বয়সে প্রথম ডোজ, এবং ৪–৬ বছর বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।

আপনার করণীয়:

  • শিশুর বয়স অনুযায়ী টিকাদান সম্পন্ন করুন।
  • জ্বর, ফুসকুড়ি বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  • অন্য শিশুদের থেকে সংক্রমণ ছড়াতে না দেয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
  • গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে আরও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।

চিকেনপক্স নিয়ে অসচেতনতা নয়, চাই তথ্যনির্ভর সচেতনতা।
একটি সহজ সিদ্ধান্ত—একটি ভ্যাকসিন—শিশুর সারাজীবনের সুরক্ষার ভিত্তি হতে পারে।
ভুল ধারণা নয়, বেছে নিন বিজ্ঞান ও সঠিক সিদ্ধান্ত।

📌 সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। শিশু সুরক্ষিত থাকলে, সুরক্ষিত থাকবে সমাজ ও জাতি।

চিকেনপক্স #ভ্যারিসেলা #ভ্যাকসিন #শিশুসুরক্ষা #হেলথএডুকেশন

 

মেয়ের মামলায় পিছু হটে মীমাংসার পথে মা

(শিষ্টাচার হারানো সমাজে এক ব্যতিক্রমী পারিবারিক বিতর্ক)

কন্যার দায়ের করা মামলায় অবশেষে পিছু হটলেন মা। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে নিজ পিতা-মাতার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইনে মামলা করে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তরুণী মেহরিন আহমেদ। এবার সেই মায়ের পক্ষ থেকেই এলো মধ্যস্থতার প্রস্তাব।

মামলার এক মাস পর সংবাদ সম্মেলনে মেহরিনের আইনজীবী জানান, মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চান তার মা। ইতোমধ্যে মেহরিনের কাছে কাউন্সেলিংয়ের জন্য একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে। তাতে মা মেয়েকে ‘মেধাবী’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং পারিবারিক দূরত্বের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেছেন।

মায়ের ভাষ্যে উঠে এসেছে-দুজন কর্মজীবী মানুষ হিসেবে সন্তান পালনে পর্যাপ্ত সময় না দিতে পারার আক্ষেপ। একই ছাদের নিচে থাকলেও, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে মেয়ের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “ঘটনাটি ব্যতিক্রমী হলেও সমাজে এমন সম্পর্কচ্যুতি একেবারে নতুন নয়। আমরা অনেক সময় সন্তানদের শুধু ডিগ্রিধারী বানাতে চাই, কিন্তু পারিবারিক মূল্যবোধ আর মানবিক শিষ্টাচারের চর্চা ভুলে যাই।”

তিনি আরও বলেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজের মানবিক বন্ধনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি নিছক পারিবারিক বিষয় নয়—এটি এক সাংস্কৃতিক সংকট, যেখানে পরিবার অর্থহীন হয়ে উঠছে প্রযুক্তি আর ব্যস্ততার ভিড়ে।’’

উপমহাদেশে এমন ঘটনা বিরল হলেও সম্পূর্ণ অজানা নয়। ২০১৯ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে এক তরুণ রাফায়েল স্যামুয়েল “অনুমতি ছাড়া জন্ম দেয়ায়” বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে আলোচনায় আসেন।

তবে ঢাকায় এমন মামলা এই প্রথম, যার পরিণতি যদি মধ্যস্থতা ও বোঝাপড়ায় গড়ায়, তবে তা এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত এমন সময়, যখন পরিবার শুধু একটি সামাজিক একক নয়—বরং মানবিক সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার শিক্ষার প্রাথমিক ক্ষেত্র।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপট আমাদের আরও বড় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: আমরা কি আর সেই পারিবারিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যের সমাজে বাস করছি? যখন সন্তান জন্মদাতার বিরুদ্ধেই আইনি আশ্রয় নেয়, তখন বুঝতে হবে-আমাদের চারপাশের সমাজ কাঠামোতে কিছু একটা ভেঙে পড়ছে। এই বিচ্যুতি শুধু ব্যক্তিগত নয়,এ এক সামাজিক ও নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
আর সে সমাজে আমরা-আপনি, আমি সবাইই বসবাস করছি।

 

ঢাবিতে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ উদযাপন আজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ উদযাপন করছে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’। ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মাসব্যাপী অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে অডিও-ভিডিও প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মনোমুগ্ধকর ড্রোন শো।

রবিবার (১৩ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পুনর্জাগরণ কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা–২০২৫’-এর অংশ হিসেবেই এই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, পুরো জুলাই মাস জুড়ে নানা আয়োজনে মুখর রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

প্রতিটি অনুষদে ‘জুলাই বিপ্লব ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান’ বিষয়ক সেমিনার

হল, বিভাগ ও ইনস্টিটিউটসমূহের উদ্যোগে পৃথক আলোচনা সভা

‘জুলাই অভ্যুত্থান: তারুণ্যের কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক আন্তঃবিভাগ বিতর্ক উৎসব

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রচনা প্রতিযোগিতা

এছাড়াও আগামী ১৭ জুলাই আয়োজিত হবে স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান, যেখানে অংশ নেবেন শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। culminating বা সমাপনী আয়োজন হিসেবে আগামী ৫ আগস্ট বড় পরিসরে উদযাপিত হবে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’।

এই মহতী আয়োজনকে কেন্দ্র করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি। পাশাপাশি তিনটি উপ-কমিটি গঠিত হয়েছে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, এই আয়োজন নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাস-সচেতনতা বাড়াবে এবং নারী নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের গুরুত্বকে সামনে আনবে।

 

ভিটামিন ‘কে’ স্বাস্থ্যের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়

ভিটামিন ‘কে’—নামটি হয়তো আমাদের দৈনন্দিন আলোচনায় খুব একটা আসে না। অথচ এই ভিটামিনটি শরীরের রক্ত জমাট বাঁধা থেকে শুরু করে হাড়ের গঠন এবং হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে এক নীরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত, নবজাতকদের জন্য এই ভিটামিনের গুরুত্ব জীবন রক্ষাকারীও হতে পারে।

ভিটামিন কে কী?
ভিটামিন ‘কে’ হলো একটি ফ্যাট-সলিউবল (চর্বিতে দ্রবণীয়) ভিটামিন, যার মূলত দুটি রূপ রয়েছে:

ভিটামিন কে১ (ফিলোকুইনোন): এটি প্রাকৃতিকভাবে সবুজ শাকসবজিতে পাওয়া যায়।

ভিটামিন কে২ (মেনাকুইনোন): অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা উৎপাদিত হয় এবং কিছু প্রাণিজ ও ফার্মেন্টেড খাদ্যে থাকে।

ভিটামিন কে কেন প্রয়োজন?
✅ রক্ত জমাট বাঁধা: শরীরে কোথাও কাটা-ছেঁড়া হলে যে রক্তক্ষরণ থামে, তা ভিটামিন ‘কে’র কারণে। এটি রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনগুলোকে সক্রিয় করে।
✅ হাড়ের গঠন: ভিটামিন কে ‘অস্টিওক্যালসিন’ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় করে, যা ক্যালসিয়ামকে হাড়ে স্থিত হতে সাহায্য করে। ফলে হাড় হয় মজবুত ও স্থায়ী।
✅ হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ: ভিটামিন কে ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমা প্রতিরোধ করে, যা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়।
✅ অতিরিক্ত উপকারিতা: গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন কে পাকস্থলী, কোলন, প্রোস্টেট ও মুখগহ্বরের কিছু ক্যানসার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ভিটামিন কে-এর ঘাটতি হলে কী হয়?
যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ঘাটতি কম দেখা যায়, তবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় তা হতে পারে, যেমন:

দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন

অন্ত্র বা পিত্তজনিত রোগ

অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ

ঘাটতির লক্ষণ:
সহজে রক্তপাত হওয়া, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

দাঁত ব্রাশের সময় মাড়ি থেকে রক্ত পড়া

নাক বা মুখ দিয়ে রক্তপাত

মেয়েদের অতিরিক্ত ঋতুস্রাব

হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া বা অস্টিওপোরোসিস

ক্লান্তি, হাড় বা পেশীতে ব্যথা

নবজাতকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (Intracranial bleeding) এর ঝুঁকি

শিশুদের জন্য কেন ভিটামিন কে জরুরি?
নবজাতকদের শরীরে জন্মের সময় ভিটামিন কের পরিমাণ খুব কম থাকে। ফলে তাদের ‘নিউবর্ন হেমোরেজ ডিজঅর্ডার’ বা জন্ম-পরবর্তী রক্তপাতজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা মারাত্মক হতে পারে। তাই অনেক দেশে জন্মের পরপরই শিশুদের ভিটামিন কে ইনজেকশন দেওয়া হয়।

ভিটামিন কে-এর প্রাকৃতিক উৎস

  • ভিটামিন কে১:
    সবুজ শাকসবজি—পালং শাক, কচু শাক, বাঁধাকপি, সরিষা শাক, ব্রকলি, লেটুস, ধনেপাতা, শালগম শাক, হেলেঞ্চা ও কলমি শাক ইত্যাদি।
  • ভিটামিন কে২:
    ডিমের কুসুম, যকৃত, ঘরে তৈরি দই, কিছু ফার্মেন্টেড খাবার (যেমন: জাপানি ন্যাটো), নির্দিষ্ট কিছু চিজ।
  • অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া:
    স্বাস্থ্যকর অন্ত্রব্যবস্থার মাধ্যমে ভিটামিন কে২ উৎপন্ন হয়।
  • শিশু খাদ্য:
    অনেক ইনফ্যান্ট ফর্মুলা ভিটামিন কে দিয়ে সমৃদ্ধ করা থাকে। তবে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভিটামিনের ঘাটতির সম্ভাবনা থাকে যতক্ষণ না অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সঠিকভাবে গড়ে ওঠে।

কীভাবে পর্যাপ্ত ভিটামিন কে নিশ্চিত করবেন?
প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় অন্তত এক কাপ রান্না করা সবুজ শাক রাখুন।

পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বাড়ান এবং হজমজনিত সমস্যায় ভুগলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের পর হাসপাতাল প্রদত্ত ভিটামিন কে ইনজেকশন গ্রহণ নিশ্চিত করুন।

যারা প্রাণিজ পণ্য বা শাকসবজি কম খান, তারা প্রয়োজন হলে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।

ভিটামিন ‘কে’ আমাদের শরীরের জন্য এক জরুরি অনুষঙ্গ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতাই পারে আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের সুস্থ রাখার পথে এক নির্ভরযোগ্য সাথী হতে।

 

চিচিঙ্গা ও ঝিঙা: অবহেলিত এই সবজিগুলোতে আছে অসাধারণ স্বাস্থ্যগুণ!

গরমকালে হালকা, সহজপাচ্য আর পানিসমৃদ্ধ সবজির চাহিদা বাড়ে। আমাদের দৈনন্দিন খাবারে সহজলভ্য এমন দুটি সবজি হলো—চিচিঙ্গা ও ঝিঙা। অনেকেই এই সবজিগুলোকে একটু কম গুরুত্ব দেন, কেউ কেউ তো খেতেই চান না! অথচ এই দুটি সবজিতেই রয়েছে এমন কিছু পুষ্টিগুণ, যা শরীর সুস্থ রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

চিচিঙ্গা
চিচিঙ্গা মূলত পানি-সমৃদ্ধ একটি সবজি। প্রতি ১০০ গ্রাম চিচিঙ্গায় আছে মাত্র ১৭ কিলোক্যালরি এবং প্রায় ৯৫% পানি। অর্থাৎ ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয় নেই, বরং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে রয়েছে ‘ভিটামিন এ’, ‘ভিটামিন সি’ ও ফাইবার, যা একে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ করে তোলে।

চিচিঙ্গার ‘ভিটামিন এ’ চোখের জন্য উপকারী, আর ‘ভিটামিন সি’ ত্বককে রাখে উজ্জ্বল ও তরতাজা। এতে থাকা আঁশ হজমশক্তি বাড়ায় এবং শরীরকে রাখে হাইড্রেটেড। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিচিঙ্গা বিশেষ উপকারী, কারণ এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। এছাড়া কিডনি রোগীদের জন্যও উপযোগী—শুধু দানাগুলো বাদ দিয়ে রান্না করলেই চলে।

ঝিঙা
ঝিঙা একটু গাঢ় সবুজ রঙের, গ্রীষ্মকালে প্রচুর পাওয়া যায় এবং এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। প্রতি ১০০ গ্রাম ঝিঙায় পাওয়া যায় প্রায় ২০ কিলোক্যালরি ও ৯৪-৯৫% পানি। এতে রয়েছে আঁশ, ‘ভিটামিন এ’, ‘ভিটামিন সি’ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের ভেতরের পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে।

ঝিঙা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং পাইলসের রোগীদের জন্যও উপকারী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি একটি প্রাকৃতিক “ইমিউনিটি বুস্টার”। ঝিঙা শরীরকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও উপযোগী। উপরন্তু, শরীরে জমে থাকা বিষাক্ত উপাদান (টক্সিন) ঝিঙা দূর করতে পারে, ফলে শরীর থাকে সুস্থ ও ক্লিন।

চিচিঙ্গা ও ঝিঙা—এই দুই সবজিই খুব সাধারণ হলেও এতে লুকিয়ে আছে অসাধারণ উপকারিতা। সঠিকভাবে রান্না করলে এগুলোর স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি শরীরও রাখে সজীব ও সুস্থ। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখুন এই স্বাস্থ্যকর সবজিগুলো।

 

চট্টগ্রামের মেয়ে শারমিন রিমার অসাধারণ আন্তর্জাতিক সাফল্য

চট্টগ্রামভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম সিভয়েস-এর সাংবাদিক শারমিন রিমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক গৌরবময় স্বীকৃতি পেয়েছেন। বিশ্বের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Columbia Journalism School থেকে তিনি গ্রীষ্মকালীন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কোর্সের জন্য পূর্ণ স্কলারশিপ অর্জন করেছেন।

আগামী ৭ জুলাই শুরু হতে যাওয়া তিন সপ্তাহব্যাপী এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাছাই করা হয়েছে মাত্র ২১ জনকে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে একমাত্র স্থান করে নিয়েছেন শারমিন রিমা, যা দেশবাসীর জন্য এক গর্বের বিষয়।

তাঁর এই অর্জন সাংবাদিকতার জগতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। শারমিন রিমা এর আগে সাংবাদিকতা ও সামাজিক সচেতনতামূলক কাজের জন্য পেয়েছেন রাধুনি কীর্তিমান সম্মাননা-২০২৪, ইন্টারন্যাশনাল ওমেন্স মিডিয়া ফাউন্ডেশনের রিপোর্টিং গ্রান্ট, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফেলোশিপ, এবং ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজ-সচেতন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতা ইতোমধ্যেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর এই সাম্প্রতিক সাফল্য নতুন প্রজন্মের সংবাদকর্মীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে ।

ফিলিস্তিনপন্থী জারাহ সুলতানার নতুন রাজনৈতিক ঘোষণা

ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন এক বামপন্থী ধারা তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক লেবার পার্টি এমপি ও ফিলিস্তিনপন্থী নেতা জারাহ সুলতানা। জেরেমি করবিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের সূচনা করতে যাচ্ছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এই পরিকল্পনার কথা জানান সুলতানা।

সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে সুলতানা বলেন, “ওয়েস্টমিনস্টার ভেঙে পড়েছে। তবে সংকটটা এর চেয়েও গভীর। আজকের যুক্তরাজ্যে মাত্র ৫০টি পরিবার দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার চেয়েও বেশি সম্পদের মালিক।”
তাঁর মতে, সরকার সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

সুলতানার ভাষায়, তাঁদের এই নতুন দলটি হবে লেবার, কনজারভেটিভ এবং রিফর্ম ইউকের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ব্যর্থতা ও বিশ্বাসভঙ্গের’ বিরুদ্ধে কার্যকর একটি বিকল্প। তবে দলটির কাঠামো ও নীতিমালা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নীতিমালা ঘোষণা করা না হলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া সুলতানার বক্তব্য থেকে দলটির অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট।

জারাহ সুলতানা জানিয়েছেন, তাঁদের দলের মূল লক্ষ্য হবে বিদ্যমান প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের বাইরে একটি শক্তিশালী বামপন্থী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। তাঁর অভিযোগ, “এই তিন দলই ধনকুবেরদের পক্ষেই কাজ করছে।” তিনি বলেন, নতুন দলটি দারিদ্র্য বিমোচন এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেবে।

বিশেষভাবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে বর্তমান সরকারের অনীহার সমালোচনা করেন সুলতানা। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সরকারের বাজেট যেন ‘অবিরাম যুদ্ধের জন্য নয়, বরং জনসেবায় ব্যয় করা হয়’। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় কমিয়ে সামাজিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পক্ষপাতী।

সুলতানা বরাবরই ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার। নতুন দলটির পররাষ্ট্রনীতিতেও ফিলিস্তিনপন্থা স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্টারমার সরকারের বিরুদ্ধে ‘গাজায় গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ করার অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, ব্রিটিশ জনগণ চায় সরকার যেন যুদ্ধের পরিবর্তে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনকল্যাণে বেশি ব্যয় করে।

জেরেমি করবিনও এ বিষয়ে সুর মিলিয়ে বলেন, “দারিদ্র্য, বৈষম্য ও যুদ্ধ অপরিহার্য নয়। আমাদের এখনই দিক পরিবর্তনের প্রয়োজন।”

সুলতানা নিশ্চিত করেছেন, জেরেমি করবিন এই নতুন দল গঠনের আলোচনায় যুক্ত আছেন। যদিও প্রথমদিকে করবিন এ বিষয়ে মন্তব্য না করায় তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, তবে পরে এক বিবৃতিতে তিনি জানান, “দল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।”

সুলতানা আরও জানান, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য, অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন কর্মসূচিকেন্দ্রিক সংগঠকেরা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এমন অনেক লেবার কর্মী ও সমর্থকও এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দেবেন, যাঁরা মনে করেন স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি অতিমাত্রায় ডানপন্থী হয়ে পড়েছে।

নতুন দলটির প্রতি জনসমর্থনের চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ঘোষণা দেওয়ার পর মাত্র এক রাতেই জারাহ সুলতানার সোশ্যাল মিডিয়া পেজে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ সাইন আপ করেছেন।

এর আগে ‘মোর ইন কমন’ নামের এক জরিপ সংস্থা জানায়, জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে একটি নতুন দল আত্মপ্রকাশ করলে ১০ শতাংশ ভোটার তাকে সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন। ওই জরিপে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির জন্য সমর্থন ২০ শতাংশ এবং রিফর্ম ইউকের জন্য ২৭ শতাংশ পাওয়া যায়।

ফলে বিশ্লেষকদের মতে, নতুন দলটি বড় দুই দলের ভোট ভাগ করে দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করতে হলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সুসংগঠিত নেতৃত্ব অপরিহার্য হবে।

 

চাঁদে যাওয়ার প্রশিক্ষণ নিলেন প্রথম বাংলাদেশি নারী রুথবা ইয়াসমিন

এক সময় যার আকাশচুম্বী স্বপ্ন ছিল, এখন তিনি মহাকাশ ছোঁয়ার দোরগোড়ায়। রুথবা ইয়াসমিন—প্রথম বাংলাদেশি এবং প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ‘চাঁদে যাওয়ার প্রশিক্ষণ’ শেষ করেছেন। তাঁর এই সাফল্য শুধু একজন নারীর নয়, বরং একটি জাতির জন্যও এক ঐতিহাসিক গর্ব। ‘স্পেস নেশন’-এর আয়োজিত ‘মুন পাইওনিয়ার মিশন’-এর প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করে রুথবা এখন চাঁদে পা রাখার প্রতিযোগিতায় সামনের সারির একজন।

গত ১৬ এপ্রিল স্পেস নেশন জানিয়েছে, তাদের মিশনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ সদস্যই নারী। সেই গর্বিত তালিকায় একজন হচ্ছেন বাংলাদেশের রুথবা ইয়াসমিন। তাঁর এই যাত্রা যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা—যেখানে একজন নারী নিজের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন দিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন অজানার দিকে।

ঢাকার স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে শিক্ষা জীবনের সূচনা করেন রুথবা। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের মাউন্ট হোলিওক কলেজ থেকে ২০১৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, সঙ্গে গণিতে মাইনর। কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেশে ফিরে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ডেটা সায়েন্সে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০২৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আলাবামা থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করে নিজের শিক্ষাকে মহাকাশ অভিযানের জন্য দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলেন।

রুথবার আগ্রহের কেন্দ্র ছিল মহাকাশ আবহাওয়া, বিশেষ করে ভূচৌম্বকীয় ঝড় বা ‘জিওম্যাগনেটিক স্টর্ম’। এই বিষয়ে তাঁর গভীর গবেষণাই তাকে মহাকাশ ভ্রমণের প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তাঁর প্রেরণার অন্যতম উৎস ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামস।

‘মুন পাইওনিয়ার মিশন’-এ রুথবা প্রশিক্ষণ নেন EVA (Extra Vehicular Activity) স্পেশালিস্ট হিসেবে। এই দায়িত্বের আওতায় তাঁকে মহাকাশসুট পরে চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটার প্রস্তুতি, রেডিয়েশন প্রতিরোধে কার্যক্রম ও ISRU (In-Situ Resource Utilization)–এর প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হতে হয়।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের Moon Base ও Mission Control—দুটি দলে ভাগ করা হয়। রুথবা প্রথমে চাঁদের মাটি থেকে সম্পদ আহরণ সংক্রান্ত কাজ করেন, পরে Mission Control ইউনিটে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সহকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেন। একটি বিপজ্জনক সিমুলেশনে জরুরি পরিস্থিতিতে তার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণার্থীদের মুগ্ধ করে।

রুথবার মতে, মহাকাশে নারীর অংশগ্রহণ এখনও মাত্র ১১ শতাংশ। এই অস্বাভাবিক বৈষম্য দূর করতে তিনি নিজেই হতে চান এক পরিবর্তনের দূত। তিনি বলেন, “NASA-এর নারী বিজ্ঞানীরা অ্যাপোলো মিশনে যেভাবে অবদান রেখেছেন, ভবিষ্যতের মিশনেও নারীদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া জরুরি।”

১৪ এপ্রিল, প্রশিক্ষণ ঘোষণার ঠিক দু’দিন আগে, পপ গায়িকা কেটি পেরিও ব্লু অরিজিনের অল-ফিমেল ক্রু নিয়ে মহাকাশে যাত্রা করেন। এই দুটি ঘটনা যেন এক যৌথ বার্তা দেয়—মহাকাশ এখন আর শুধুই পুরুষের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়।

মহাকাশ অভিযানে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতিও সমান জরুরি। রুথবা বলেন, মহাকাশে সঠিক ঘুম, হালকা ও পুষ্টিকর খাবার, পানি পান ও পরিপূর্ণ পরিচ্ছন্নতা রক্ষা—এসবের মাধ্যমেই শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হয়। সেখানে গোসলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হয় স্পঞ্জ বাথ ও নন-রিন্স শ্যাম্পু।

এছাড়া মানসিক চাপ মোকাবেলায় ব্যক্তিগত জিনিস সঙ্গে রাখা, দলগত অনুশীলন ও ফিটনেস ট্রেনিং অপরিহার্য। তার মতে, “আমাদের সাফল্য ছিল প্রস্তুতি, সমন্বয় ও নেতৃত্বের ফল।”

রুথবার স্বপ্ন শুধু চাঁদের বুকে পা রাখা নয়, বরং নতুন ইতিহাস রচনা করা। তিনি চান ভবিষ্যতে আর্টেমিস মিশন, লুনার সারফেস অপারেশন এবং চন্দ্র গবেষণায় কাজ করতে। তাঁর লক্ষ্য হলো—চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহ, নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সম্প্রসারণ।

তিনি বলেন, “আমি চাই বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে চাঁদে পা রাখতে। এটি শুধু আমার স্বপ্ন নয়, বরং পুরো জাতির জন্য এক গৌরবময় অধ্যায় হবে। আমি মহাকাশ অনুসন্ধানে ঐতিহাসিক অবদান রাখতে চাই।”

রুথবা ইয়াসমিন এখন আর কেবল একজন গবেষক বা শিক্ষার্থী নন—তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম। নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, সীমা বলতে কিছু নেই, যদি থাকে স্বপ্ন, সাধনা আর সাহস।

বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়তো সেই দিনটি খুব দূরে নয়, যেদিন রুথবার মতো কেউ সত্যিই চাঁদের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরবেন।

 

জুলাই নারী শহীদ পরিবারের পাশে সরকার

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত নারী ও শিশুদের স্মৃতি ধরে রাখতে এবং তাদের পরিবারকে সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ।
আজ নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটিতে গুলিতে নিহত শিশু রিয়া গোপের বাড়ি এবং সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজিতে নিহত গৃহবধূ সুমাইয়ার পরিবার পরিদর্শনকালে তিনি এই বার্তা দেন।

শারমীন এস মুরশিদ বলেন, “জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা—তাদের হারিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। তাঁদের তথ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এই শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী, তা নিশ্চিত করতে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে।”

তিনি আরও বলেন, “শহীদ পরিবারের বর্তমান অবস্থা, তাদের চাহিদা ও সংকট জানার চেষ্টা করছি। আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে যতটুকু সামর্থ্য ও সম্পদ আছে, সবটুকু দিয়েই আমরা এই পরিবারগুলোর পাশে থাকব। আমরা শুধু নীতি-নির্ধারণে নয়, মানবিক সহানুভূতিতেও বিশ্বাস করি। শহীদ পরিবারের চোখের জল মুছে দিতে চাই আমরা।”

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা ছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, চলমান জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত সাধারণ মানুষের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার শহীদ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

পবিত্র মহররম ও আশুরা: কলুষিত হৃদয়ের জন্য এক আত্মশুদ্ধির আহ্বান

হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম আমাদের সামনে হাজির হয় এক আত্মমূল্যায়নের বার্তা নিয়ে। এটি শুধু বছরের সূচনা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে পবিত্র কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, “আল্লাহর বিধানে মাস বারোটি, তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (আরবা’আতুন হুরুম)” (সূরা আত-তাওবা, ৯:৩৬)। সেই সম্মানিত মাসগুলোর অন্যতম হলো মহররম, আর এরই দশম দিন – আশুরা, ইসলামী ইতিহাসে এক বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং অতল গুরুত্ববাহী দিন।

পবিত্র কুরআনের ঘোষণা মতে ‘আরবাআতুন হুরুম’—চার সম্মানিত মাসের একটি। সেই মাহাত্ম্যপূর্ণ মাসে প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর নৈকট্যের সন্ধানে একটি সুযোগ।

মহররম মাসের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হাদিস শরীফে স্পষ্টভাবে এসেছে, “রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই মাসে নফল রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান এবং আশুরার দিন যত গুরুত্ব দিয়ে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য কোনো দিন এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৬)।

নবীজি (সা.) আশুরার রোজা সম্পর্কে বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, এই রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (ছগীরা) গুনাহ মাফ করে দিবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)। তাই নবীজি শুধু নিজেই রোজা রাখেননি, বরং সাহাবাদেরও উৎসাহিত করেছেন এদিন রোজা রাখতে। তিরমিজি শরীফে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রমজানের পর যদি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররমে রাখো। কেননা, এ মাস আল্লাহর মাস।” (তিরমিজি, হাদিস: ৭৪০)।

হজরত হাফসা (রা.) বলেন, “নবীজী চারটি আমল কখনো বাদ দিতেন না—আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, প্রতি মাসের তিনটি রোজা এবং ফজরের আগের দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।” (সুনানে নাসায়ি: ২৪১৫)
কিন্তু আশুরার রোজা কেবল একটি দিনে সীমাবদ্ধ নয়। নবীজির নির্দেশনায় পাওয়া যায়, ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিত্যাগ করার জন্য তিনি আশুরার আগের বা পরের দিন একটি অতিরিক্ত রোজা রাখতে বলেছেন। “তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং একদিন আগে বা পরে আরেকটি রোজা রেখো।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১৫৪)। এমনকি তিনি বলেন, “আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে ৯ তারিখেও রোজা রাখব।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)।

আশুরা কেবল রোজা পালনের দিন নয়, বরং ইসলামী ইতিহাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত রয়েছে, এই দিনেই আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদেরকে সমুদ্র পার করিয়ে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪০১)। এই উপলক্ষে মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, এরই ধারাবাহিকতায় ইহুদি সম্প্রদায় এই দিন রোজা রাখতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আমি মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।” অতঃপর তিনি রোজা পালন করেন এবং সাহাবাদেরও তা করতে বলেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)।

অনেক বর্ণনায় এসেছে, এই দিনেই হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়, হজরত নূহ (আ.)-এর কিসতী জুদী পাহাড়ে অবতরণ করে, হজরত ইব্রাহিম (আ.) আগুন থেকে মুক্ত হন, হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে নিঃসরণ হন, হজরত ঈসা (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। যদিও এসব ঘটনার স্পষ্ট সহিহ সনদ নেই, তথাপি বহু সালাফ থেকে এব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাই নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস না করেও এই দিনটিকে বরকতময় হিসেবে বিবেচনায় রাখা যায়।
তবে আশুরা নিয়ে যেসব ভিত্তিহীন কাহিনি চালু রয়েছে—যেমন, এই দিনে কিয়ামত হবে, হজরত ইউসুফ জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, কিংবা হজরত ইয়াকুব দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন—এগুলোর কোনো সহিহ প্রমাণ নেই।

কারবালা
মহররম মাসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো কারবালার প্রান্তরে হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। সত্য ও অন্যায়ের মুখোমুখি অবস্থানে তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন। এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য বেদনার হলেও ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—শোক পালন হবে আত্মিক ও আত্মোন্নতিবিধান সাপেক্ষে, জাহেলি যুগের আদলে হবেনা।
নবীজি (সা.) বলেন, “আমাদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই, যে বুক চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে বা জাহেলি যুগের কথা বলে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪)। তাই শোক র‌্যালি, মাতম, তাজিয়া বের করা, শরীর রক্তাক্ত করা এসব ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড। এগুলো এ মাসের মাহাত্ম্য ও উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেকে মহররমকে ‘অশুভ মাস’ মনে করে। কেউ কেউ এ মাসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়। অথচ ইসলাম এই মাসকে ফজিলতের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছে। নবীজির যুগে এ ধরণের ভয়-ভীতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তাই এসব কুসংস্কার বর্জন করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবনচর্চা জরুরি।

এই মাসে করণীয়
এই মহররম মাস যেন শুধু একটি দিন বা ঘটনার স্মরণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা হয়ে উঠুক আত্মশুদ্ধির অনুপ্রেরণা। রোজা, তাওবা-ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদের নামাজ ও দান-সাদকার মাধ্যমে এই মাসকে আমরা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারি। পাশাপাশি কুসংস্কার, বিদআত, অপসংস্কৃতি ও লোকদেখানো কর্মসূচি থেকে নিজেকে দূরে রাখা অপরিহার্য।

আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এই সম্মানিত মাসের হক আদায় করার তাওফিক দেন।
আল্লাহুম্মা আমিন।

 

স্ত্রীর কিডনিতে বেঁচে ফেরা স্বামী পরকীয়ায়, প্রতারণা-নির্যাতনে ভাঙলো সংসার

সংসার মানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর ত্যাগের বন্ধনে গড়া এক জীবনের নাম। স্ত্রী যখন কেবল সঙ্গী নন, হয়ে ওঠেন জীবনের পরমছায়া-তখন তাঁর প্রতি স্বামীর কৃতজ্ঞতা থাকা তো স্বাভাবিক।
কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে এক ভয়াবহ, অমানবিক চিত্র তুলে ধরেছে। যেখানে স্ত্রী নিজের কিডনি দিয়ে স্বামীকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন, আর সেই স্বামী সুস্থ হয়ে প্রথমেই যেটা করলেন তা হলো স্ত্রীকে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, এরপর শুরু করলেন পরকীয়া ও অনলাইন জুয়ার জীবন।

ঘটনাটি ঘটেছে সাভারের কলমা এলাকায়, যেখানে উম্মে সাহেদীনা টুনি নামের এক সংগ্রামী নারী আজও লড়ছেন স্বামী মোহাম্মদ তারেকের প্রতারণা, নির্যাতন ও সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধে।

২০০৬ সালে টুনির বিয়ে হয় মালয়েশিয়া ফেরত তারেকের সঙ্গে। বিয়ের এক বছর পর তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। সব ঠিকঠাক চলছিল, হঠাৎ করেই ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে জানা যায় তারেকের দুটি কিডনিই প্রায় অচল। চিকিৎসকেরা ডায়ালাইসিস শুরু করার পরামর্শ দেন। সদ্য সন্তানের মা হওয়া টুনি ভয় পেয়ে গেলেও দমে যাননি। সিদ্ধান্ত নেন স্বামীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাবেন। শুরু হয় এক লম্বা সংগ্রাম।

টুনি নিজের বাড়িতে হোম বিউটি পার্লার ও বুটিক ব্যবসা শুরু করেন। মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় করে পুরোটাই স্বামীর চিকিৎসায় ব্যয় করেন। নিজের গহনা বিক্রি করেন, মায়ের পেনশনের টাকা খরচ করেন, এমনকি একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেও চিকিৎসা চালিয়ে যান। প্রতি বছর তিনবার করে স্বামীকে ভারতে নিয়ে যেতে হতো, প্রতিবার ব্যয় হতো প্রায় তিন লাখ টাকা।

শেষ পর্যন্ত, ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে স্ত্রী টুনি নিজের একটি কিডনি স্বামীকে দান করেন। অপারেশনের পরই শুরু হয় জীবনের নতুন ট্র্যাজেডি। সুস্থ হয়ে হাসপাতালের কেবিনেই প্রথমবার চিৎকার, অপমান ও দুর্ব্যবহার শুরু করেন তারেক। ঢাকায় ফিরে এই নির্যাতন বেড়ে যায়। টুনিকে উপার্জনের সব টাকা তার হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হয়, শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এরপরই সামনে আসে আরও ভয়াবহ এক সত্য—তারেক জড়িয়ে পড়েন ডিভোর্সি এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায়। জড়িয়ে পড়েন অনলাইন জুয়ার আসক্তিতেও।

টুনির জীবন ধ্বংস হতে শুরু করে। শারীরিকভাবে দুর্বল টুনি সহ্য করতে না পেরে পুলিশের দ্বারস্থ হন। অভিযোগের পর মুচলেকা দিয়ে অভিযোগ তুলিয়ে নেন তারেক। পরে নির্যাতন বাড়লে অবশেষে আদালতে যৌতুক ও নারী নির্যাতনের মামলা করেন টুনি। এক মাস কারাবন্দি থাকার পর জামিনে মুক্ত হয়ে তারেক সোজা চলে যান প্রেমিকার বাড়িতে এবং সেখান থেকে টুনিকে চাপ দিতে থাকেন বাড়ি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য ও ডিভোর্স দেওয়ার জন্য।

এখানে থেমে থাকেনি নির্মমতা। টুনি জানান, কিডনি দেওয়ার পর তার শরীর ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকেরাও সতর্ক করেছেন ভবিষ্যতে বড় বিপদ ঘটতে পারে। অথচ টুনি সব ভয় পেছনে ফেলে যেই মানুষটির জীবন বাঁচিয়েছেন সেই তাঁকে নিঃস্ব করে ফেলেছেন। এমনকি অপারেশনের স্থানে লাথি মেরে শারীরিকভাবেও আঘাত করেছেন।

টুনির মা ও প্রতিবেশীরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন, কীভাবে এক তরুণী নিজের জীবন উজাড় করে স্বামীর জীবন রক্ষা করেছেন, অথচ সেই মানুষটি সুস্থ হয়ে পরিণত হয়েছেন নির্যাতক ও প্রতারকে।

এ ঘটনাটি শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে নারীর ত্যাগ, ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে পদদলিত করে এক পুরুষ অনায়াসে জুয়া, পরকীয়া ও লোভের পথে হাঁটেন। একজন নারী কেবল স্ত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন মানবদাত্রী হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত, বিশেষত যখন সে স্বামীর প্রাণ রক্ষায় নিজের অঙ্গ উৎসর্গ করে। অথচ তার প্রতিদান হয় মারধর, ত্যাগ আর ঘৃণা।

সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের কারণ
এই ঘটনার পেছনে আমাদের সমাজে বিদ্যমান কয়েকটি গভীর সংকট দায়ী:

১. পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব: এখনও সমাজের অনেক পরিবারে নারীর অবস্থান ‘সহায়ক’ বা ‘ত্যাগী’ হিসেবে কল্পনা করা হয়, অধিকারভিত্তিক নয়। ফলে স্বামীর প্রতারণা, নির্যাতন কিংবা ঔদ্ধত্যকেও অনেক সময় সহনীয় বলে মেনে নেওয়া হয়।

২. নৈতিক অবক্ষয়: পারিবারিক মূল্যবোধ, সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার জায়গাগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে। ভোগবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা পারস্পরিক ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধকে প্রতিস্থাপন করছে।

৩. আইন প্রয়োগে শৈথিল্য: অনেক সময় নারী নির্যাতন ও প্রতারণার মামলাগুলো সঠিকভাবে নিষ্পত্তি হয় না। জামিনের সুযোগে অভিযুক্তরা ভিকটিমের ওপর পুনরায় অত্যাচার করে।

৪. নারীর আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা: অধিকাংশ নারী আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হলেও সামাজিকভাবে এখনও তাঁরা এক ধরনের ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে একক মায়ের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ।

উত্তরণের উপায়
সাভারের কলমা এলাকায় উম্মে সাহেদীনা টুনির ওপর যা ঘটেছে, তা কেবল একটি নারীর গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের হাজারো নারীর মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিচ্ছবি। এমন সামাজিক বিপর্যয়ের মোকাবিলায় আমাদের করণীয় হতে হবে বহুমাত্রিক, বাস্তবভিত্তিক এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিচে কিছু স্পষ্ট ও কার্যকর উত্তরণ কৌশল তুলে ধরা হলো:

১. আইনি ব্যবস্থা আরও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে

টুনির ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের কিছু ধারা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩): এই আইনের ১১(গ) ধারায় শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তারেকের নির্যাতন এ ধারায় বিচারযোগ্য।

দণ্ডবিধি ৪৯৮এ ধারা: স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করলে এ ধারায় সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রযোজ্য।

মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন, ১৯৯৯ (সংশোধিত ২০১৮): প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে অঙ্গ সংগ্রহ করা হলে এ আইনে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৭-১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ঘরোয়া সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০: টুনির মতো নির্যাতিত নারীরা এই আইনে বিচার চাইতে পারেন এবং আদালত থেকে ‘Protection Order’ বা ‘Rescue Order’ চাইতে পারেন, যা তার শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এছাড়া;আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়িত্ব নিতে হবে জামিনপ্রাপ্ত আসামির ওপর নজরদারি, নির্যাতিতার নিরাপত্তা এবং দ্রুত চার্জশিট প্রদান নিশ্চিত করতে।

২. ইসলামের আলোকে নারীর সম্মান ও অধিকারের প্রতিফলন

ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নারীর মর্যাদা, ত্যাগ ও অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছে।

সুরা আন-নিসা ৪:১৯ এ বলা হয়েছে:
“তোমরা নারীদের প্রতি জুলুম করো না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করো।”

স্ত্রী নির্যাতন ও প্রতারণা ইসলামে কবীরা গুনাহ।
রাসূল (সা.) বলেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে।”
— (তিরমিযী, হাদীস: ১১৬২)

টুনির স্বামী যেমন জীবন রক্ষাকারী স্ত্রীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা দেখিয়ে অমানবিক আচরণ করেছেন, ইসলাম সে কাজকে ধর্মীয়ভাবে হারাম এবং নৈতিক বিচারে ঘৃণিত অপরাধ আখ্যা দিয়েছে।

৩. নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষার সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে

শিশুকাল থেকে পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা শুরু করতে হবে। ভালোবাসা মানে কেবল ভোগ নয়, বরং দায়িত্ব, ত্যাগ ও সহানুভূতি — এই শিক্ষা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিতে হবে।

বিয়ের আগে নৈতিকতা ও পারিবারিক সচেতনতা বিষয়ক কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। যেখানে যৌনতা নয়, সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূলনীতি শেখানো হবে।

বিনোদনের নামে অসামাজিক কনটেন্ট ও জুয়ার প্রচার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ জরুরি। তরুণদের পর্ন, অনলাইন জুয়া ও বিকৃত রুচির হাত থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর আইন প্রয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।

৪. নারীর জন্য আর্থিক ও আইনি সহায়তার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা

নারী কল্যাণ তহবিল ও আইনি সহায়তা কেন্দ্র-এর মাধ্যমে নির্যাতিতাদের দ্রুত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্যাতিত নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র ও হেল্পলাইন সার্ভিস আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে হবে।

নারীর নামে সম্পত্তি সংরক্ষণ এবং নারীর সম্মতিবিহীন কোন সম্পত্তি হস্তান্তরের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশিষ্ট
উম্মে সাহেদীনা টুনির গল্পটি আমাদের সমাজের এক নির্মম প্রতিবিম্ব—যেখানে নারীর ভালোবাসা, ত্যাগ, বিশ্বাস সবকিছু নস্যাৎ করে তাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় প্রতারণা আর নির্যাতনের মুখোমুখি। কেবল আইন নয়, দরকার একটি বোধসম্পন্ন, নৈতিক, ধর্মভীরু এবং দায়বদ্ধ সমাজ, যেখানে পুরুষ শিখবে কৃতজ্ঞতা, নারী পাবে মর্যাদা, পরিবার হবে সহমর্মিতা আর বিশ্বাসের আধার।

একজন টুনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে বলার-আর নয়!এ সমাজে নারীর চোখের জল,ভালোবাসার অপমান আর সইব না।

 

শিশুর বিকাশ:শুরুর প্রথম দশকে যা সবচেয়ে জরুরি

একটি শিশু যখন এই পৃথিবীতে আসে,যেন এক পবিত্র খাতা—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে অভিজ্ঞতা, ভাষা, অনুভব ও আচরণ দিয়ে লেখা হয় তার ভবিষ্যতের মানচিত্র। জন্ম থেকে নয়/দশ বছর বয়স পর্যন্ত এই সময়টি শিশুর মানসিক, সামাজিক, ভাষাগত ও আবেগগত বিকাশের ভিত্তি গড়ে তোলে। একজন অভিভাবক হিসেবে এই সময়ে আপনি যা করবেন বা যা এড়িয়ে চলবেন, তার প্রভাব থাকবে বহু বছর ধরে।

এই লেখায় আমরা আলোচনা করব সেই ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা একজন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

১. ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয়।
প্রথমত, একটি শিশু চায় নিরাপত্তা—শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নিরাপত্তাও। মা-বাবা বা যত্নশীল অভিভাবকের ভালোবাসাপূর্ণ উপস্থিতি শিশুর ব্রেইনের নিউরাল কানেকশন তৈরি করে। বার বার চোখে চোখ রাখা, হেসে সাড়া দেওয়া, কাঁধে জড়িয়ে ধরা—এসব ছোট ছোট আচরণ শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।

২. দৈনন্দিন রুটিন এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা।
শিশুরা অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না। খাবার, ঘুম, খেলা -প্রতিদিনের নিয়মিত রুটিন তাদের মানসিক স্থিতি নিশ্চিত করে। এতে তারা নিয়মানুবর্তিতা, সময়জ্ঞান এবং নিজের শরীর ও চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা শেখে।

৩. খেলার মাধ্যমেই শেখা।
খেলাই শিশুদের প্রকৃত শিক্ষা। ৩-৭ বছর বয়সে ফর্মাল পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলা ও কল্পনাপ্রবণ খেলা (imaginative play) অনেক বেশি কার্যকর। খেলনার দোকানের দামি জিনিস নয়, বরং ঘরের গৃহস্থালি জিনিসপত্র দিয়েও তারা গঠন, সংখ্যা, শব্দ আর সম্পর্কের ধারণা শিখতে পারে।

৪. শব্দ ও গল্পের জগতে পরিচয়।
ভাষা শেখা হয় শোনার মধ্য দিয়ে। শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, ছড়া শোনানো, বই পড়া—এই সবকিছু তার ভাষার ভিত্তি গড়ে তোলে। এমনকি কথা বলতে না পারলেও বইয়ের ছবি দেখিয়ে গল্প বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।

৫. পর্দার পেছনে থাকুক পর্দাজগৎ।
শিশুর বিকাশে স্ক্রিন টাইম একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুই বছর বয়স পর্যন্ত যেকোনো ধরনের মোবাইল, ট্যাব বা টিভি একেবারে পরিহার করা উচিত। তার পরে সীমিত এবং মানসম্মত কনটেন্টের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচয় করানো যেতে পারে। শিশু যত কম স্ক্রিনে থাকবে, তত বেশি তারা বাস্তব জগৎকে অনুভব করতে পারবে।

৬. অনুভূতির ভাষা শেখানো।
শিশুরা তাদের অনুভূতিকে প্রকাশ করতে শেখে পরিবারের কাছ থেকেই। “তুমি রেগে গেছ?”, “তুমি দুঃখ পেয়েছো?” এই ধরনের প্রশ্ন বা মন্তব্য তাদের শেখায় অনুভূতির নাম। পরিণত বয়সে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহানুভূতির ভিত্তি এখানেই তৈরি হয়।

৭. শিশুকে দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলা।
ছোট কাজেও শিশুকে যুক্ত করা জরুরি। নিজের প্লেট তুলে রাখা, খেলনা গুছিয়ে রাখা, মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ডাল নাড়া—এসব ছোট ছোট দায়িত্ব শিশুকে নিজের ওপর আস্থা রাখতে শেখায় এবং আত্মমর্যাদা বাড়ায়।

৮. প্রশংসার ভাষা হোক আচরণভিত্তিক।
“তুমি অনেক ভালো ছেলে” বলার চেয়ে “তুমি ওর সঙ্গে খেলনাটা ভাগ করে নিয়েছ, এটা খুব ভালো কাজ”—এই ধরনের নির্দিষ্ট প্রশংসা শিশুদের শেখায় কোন কাজের জন্য তারা বাহবা পেয়েছে। এতে তাদের আচরণগত বুদ্ধি বাড়ে।

৯. প্রাকৃতিক পরিবেশে বেশি সময় দিন।
গাছপালা, বৃষ্টির শব্দ, পাখির ডাক—প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিকভাবে স্থিতিশীল হয়। নিয়মিত পার্কে যাওয়া, বাগানে খেলা, বা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো তাদের কল্পনা ও সংবেদনশীলতা বাড়ায়।

১০. শিশুর কথা শোনার মানসিকতা।
সবচেয়ে বড় ভুল আমরা তখনই করি, যখন শিশুর কথা গুরুত্ব দিই না। শিশু যদি কোনো ভয়, কষ্ট বা আগ্রহ প্রকাশ করে, সেটিকে ছোট না ভেবে গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত। এতে সে শেখে তার আবেগ -অনুভূতি মূল্যবান, তার কথা শোনার মতো মানুষ আছে।

শেষ কথা
মানবশিশু পরিণত বয়সে কেমন হবে তার ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে উঠে জীবনের এই প্রাথমিক সময়টুকুতে। এই সময়ে আমরা যদি তাদের সাথে ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, কল্পনা, শেখা এবং আত্মমর্যাদার চর্চা করতে পারি—তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে মানবিক, সচেতন ও স্বাধীনভাবে চিন্তাশীল।

শিশুর বেড়ে উঠার জন্য প্রযুক্তি/বাহারি খেলনার চেয়ে বেশি জরুরি আমাদের সময়, মনোযোগ ও হৃদয়।
এটাই শিশুর শৈশবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 

ঢাবিতে শিক্ষার্থীদের পাশে ছাত্রীসংস্থা: ৩টি স্পটে হেল্পডেস্ক চালু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হতে আসা নবীন শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিশেষ হেল্পডেস্ক স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা।

মঙ্গলবার, ২৪ জুন থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে।
স্থান গুলো হলো- কার্জন হল গেটের পাশে, কলা অনুষদের ডিন অফিসের বিপরীতে এবং সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পাশে ।

হেল্পডেস্কে বিনামূল্যে স্যালাইন, চকলেট, কলম, টিস্যু, পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া ভর্তিপ্রত্যাশী ছাত্রীদের তথ্য সহায়তা এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে আন্তরিকভাবে।

ঢাবি শাখার সভানেত্রী সাবিকুন্নাহার তামান্না বলেন,
“নবাগত শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে তাদের সহায়তার জন্য আমরা এই হেল্পডেস্ক চালু করেছি। তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা দিতে প্রতিদিন আমরা এখানে উপস্থিত থাকছি ইনশাআল্লাহ। ছাত্রীসংস্থা একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সহযোগিতামূলক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে সদা সচেষ্ট।”

শাখা সেক্রেটারি আফসানা আক্তার জানান,
“অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আমাদের হেল্পডেস্কে এসে উপকৃত হয়েছেন। তাদের মুখে প্রশংসা ও সন্তুষ্টির কথা শুনে আমরা অনুপ্রাণিত।”

প্রসঙ্গত, ঢাবির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের অনার্স ১ম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রম ২৪ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত।এই কার্যক্রম চলাকালীন প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত হেল্পডেস্ক পরিচালিত হয়েছে।

এই মহতী উদ্যোগ ছাত্রীবন্ধুদের জন্য যেমন সহায়ক, তেমনি একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল ছাত্ররাজনীতির দৃষ্টান্তও বটে।

 

চেমন আরা বেগম: আলোকিত সন্তানের গর্বিত জননী

চট্টগ্রামের পটিয়ার নিভৃত গ্রাম নাইখাইনের এক প্রান্তে ছায়াঘেরা একটি বাড়িতে বাস করেন এক অনন্য মা—চেমন আরা বেগম। বয়স ৭৮ বছর। তিনি শুধু ১১ সন্তানের জননী নন, বরং গড়েছেন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিচারক ও সরকারি কর্মকর্তা।

চেমন আরার এই জীবনসংগ্রাম কোনো রূপকথা নয়। বাস্তবেই তিনি নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম, এমনকি প্রয়োজনীয়তাকেও বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করতে। তাই তো তাঁর এই লড়াইকে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্র তাঁকে সম্মান জানিয়েছে ‘অদম্য নারী’ পুরস্কারে।

চেমন আরার সন্তানদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ই যেন একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস—
বড় ছেলে মোহাম্মদ শহীদ উদ্দিন: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক।
দ্বিতীয় সন্তান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: সাতকানিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
তৃতীয় মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন: লক্ষ্মীপুরে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ।
চতুর্থ পারভীন আকতার: নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত।
পঞ্চম মোহাম্মদ আলমগীর: পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থায় প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার।
ষষ্ঠ সেলিনা আকতার: বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক।
সপ্তম মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন: শিশুরোগবিশেষজ্ঞ।
অষ্টম অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ: পটিয়া সরকারি কলেজে পদার্থবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক।
নবম আবু সাদাৎ মুহাম্মদ সায়েম: চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।
দশম রেজিনা আকতার: হোসাইন আহমদ সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক।
একাদশ মোহাম্মদ ওমর কাইয়ুম: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আইইডিসিআরের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ও রেসিডেন্ট অ্যাডভাইজার।

স্বামী প্রয়াত আবদুল্লাহ ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালটির কর সংগ্রাহক। সীমিত আয়ের সংসারে থেকেও এই মা সন্তানদের জন্য সঞ্চয় করেছেন স্বপ্ন, আর নিজেকে বিলিয়ে গড়েছেন ভবিষ্যৎ।

চেমন আরা বেগম সমাজের চোখে চোখ রেখে দেখিয়ে দিলেন—একজন মায়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সীমাহীন ত্যাগ আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা কেমন করে একটি পরিবারকে নয়, গোটা সমাজকেই আলোকিত করতে পারে। তাঁর জীবন শুধুই একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং এটি এক অনন্য মা-মানবীর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও সাফল্যের ইতিহাস। এই মায়ের হাত ধরেই বেড়ে ওঠা সন্তানরা আজ দেশের নানা প্রান্তে আলোর মশাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

এমন মায়েরা সমাজের নীরব স্থপতি। তাঁদের প্রতি রইলো আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

 

নারীর অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি মহিলা পরিষদের

জাতীয় বাজেট ২০২৫–২৬ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে নারী অধিকার সংগঠন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। তারা নারীর অবৈতনিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়।
‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬: জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটের প্রতিফলন’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা ১৭ জুন রাজধানীর মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম মুনিরা খান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী এবং স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। সঞ্চালনায় ছিলেন আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সানেমের ডেপুটি ডিরেক্টর ইশরাত শারমিন, ইউএনডিপি’র জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের লেকচারার উম্মে মারজানা, নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম এবং দলিত নারী ফোরামের প্রকল্প কর্মকর্তা তামান্না সিং বড়াইক।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “নারীর অবদানকে সম্মান দিতে হলে তাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আনতে হবে। বাজেট প্রণয়নে নারী অর্থনীতিবিদদের দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ানো জরুরি।”
প্রধান অতিথি ড. মনজুর হোসেন বলেন, “জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ কিছুটা কমেছে, তবে বরাদ্দের গুণগত দিকটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোর দক্ষতা যাচাইও জরুরি।”
বিশেষ অতিথি ইশরাত শারমিন বলেন, “জেন্ডার বাজেট বিষয়ে এখনো সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। বরাদ্দ কমে যাওয়ায় নারীদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে।”

ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম বলেন, “বাজেট বরাদ্দের পর বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নারীর জীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিরীক্ষা জরুরি।”
দলিত নারী প্রতিনিধি তামান্না সিং বড়াইক বলেন, “প্রায় ৬৫ লাখ দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও পরিকল্পনা থাকা দরকার। বিশেষ করে দলিত নারী ও কিশোরীদের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের উল্লেখ থাকা উচিত।”

মালেকা বানু বলেন, “এবারের বাজেটে নারীর অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে সকল মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়ন এবং কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে।”

সভা শেষে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন নারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা বাজেটে নারীর উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

 

দেয়ালের আঁকা ছবি থেকে আমেরিকার স্কলারশিপ জয়

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক পুরনো বাড়িতে জন্ম নেওয়া মুমতাহিনা করিম মীম ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অন্যরকম। বাইরের খেলাধুলার চেয়ে বেশি ভালো লাগত দেয়ালে ছবি আঁকতে। রাজকন্যা, প্রকৃতি কিংবা নিজের কল্পনার চরিত্র-প্রতিদিনই কিছু না কিছু আঁকতেন ঘরের দেয়ালে।
“আমার ঘরের দেয়াল ছিল আমার প্রথম ক্যানভাস,” বললেন মীম।

শৈশবে তাঁর হাতে রঙতুলির হাতেখড়ি হয় মায়ের মাধ্যমে। মীমের মা ছিলেন একজন হোম-বেইজড ফ্রিল্যান্সার। কাজ করতেন ল্যাপটপে। ছোট্ট মীম সেখানেই প্রথম প্রযুক্তির জগৎকে আবিষ্কার করেন।
একদিন মা যখন Microsoft Paint-এ কিছু দেখাচ্ছিলেন, মীম বলেই ফেললেন, “এইটাও তো আঁকার জায়গা!” সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রযুক্তিভিত্তিক ক্যানভাসের যাত্রা।

মাত্র ক্লাস থ্রিতে থাকা অবস্থায় ইউটিউব দেখে নিজেই শিখে ফেলেন HTML আর CSS।
প্রথমবার কোডে যখন “Hello World” লিখে স্ক্রিনে দেখেন-তাঁর ভাষায় “তখনই বুঝে গিয়েছিলাম,এই ট্যাপাট্যাপি করাটাও এক ধরনের শিল্প।”

নবম শ্রেণিতে গিয়ে মীম প্রতিষ্ঠা করেন নিজের স্কুলে একটি প্রোগ্রামিং ক্লাব। শুরুতেই ক্লাবের সদস্য হয় ৬৫ জন শিক্ষার্থী।
প্রথমদিকে অনেকে বলেছিল,
“‘মেয়ে হয়ে এসব করছো কেন?’—এই কথাটা বহুবার শুনেছি। কিন্তু আমি জানতাম, দক্ষতা আর আগ্রহের কাছে লিঙ্গ কখনোই বাধা হতে পারে না।”

করোনা মহামারির সময়, যখন সবাই ঘরবন্দি, তখন মীম ইউটিউব দেখে দেখে তৈরি করেন রোবটিক্স প্রজেক্ট। নিজের জমানো টাকায় কেনেন Arduino কিট ও নানা সেন্সর।
নিজের ঘরটিই হয়ে ওঠে ক্ষুদ্র ল্যাবরেটরি।
সেখানেই তৈরি করেন ফুড-সার্ভিং রোবট ‘কিবো’। বন্ধুরা বলত,
“‘এসব করে সময় আর টাকার অপচয় করছো।’ কিন্তু আমি এগুলো করতাম ভালোবেসে।”

এইচএসসি পাশের পর চারপাশে সবাই যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন মীম নিরবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য।
কারো কোনো গাইডলাইন ছিল না, ছিলো না কোনো বড় ভাইবোন বা সিনিয়র। ইউটিউব, ব্লগ, ওয়েবসাইট ঘেঁটে ঘেঁটে নিজেই শিখে ফেলেন -কীভাবে ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করতে হয়,কীভাবে স্টেটমেন্ট অফ পারপাস (SOP) লিখতে হয়,কীভাবে স্কলারশিপ পাওয়া যায়।

SAT এবং TOEFL-এর প্রস্তুতির জন্য রাত জেগে পড়াশোনা করতেন। নিজের খরচ চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক কোম্পানিতে পার্টটাইম অনলাইন চাকরি করতেন।
তবে রাত জাগা নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক কথা শুনতে হয়েছে।
“অনেকেই বলত, বিদেশে পড়া আমাদের পরিবারের জন্য না। কেউ কেউ হাসতও। কিন্তু আমি জানতাম-ভালো স্কলারশিপ ছাড়া আমেরিকা যাওয়া সম্ভব না।”

এই পুরো পথচলায় একমাত্র শক্তি হয়ে পাশে ছিলেন মিজানুর রহমান স্যার—যিনি শুধু স্কুলের শিক্ষকই ছিলেন না, বরং নিঃস্বার্থভাবে মীমকে SAT পরীক্ষার জন্য গাইড করেছিলেন।
“স্যার ছিলেন ছায়ার মতো। তাঁর মতো মানুষ না থাকলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না।”

অবশেষে দিনের পর দিন রাত জেগে কষ্ট করার ফল আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসে অ্যাডমিশন ও স্কলারশিপ অফার। কিন্তু তার মধ্য থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অফার আসে Hendrix College থেকে—Hays Memorial Scholarship, যা পুরোপুরি টিউশন, থাকা-খাওয়াসহ সব খরচ কভার করে।

আজ মীম প্রস্তুত তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের জন্য। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক ছোট্ট বাড়ি থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার আসনে।

 

ইতিহাস গড়লেন কুমিল্লার প্রথম নারী ওসি নাজনীন সুলতানা

কুমিল্লা জেলার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী কর্মকর্তা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্ব পেলেন। লাকসাম থানার বর্তমান ওসি নাজনীন সুলতানা গড়েছেন এই অনন্য ইতিহাস।

১৭টি উপজেলা ও ১৮টি থানার কুমিল্লা জেলায় আগে কখনো কোনো নারী ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর নাজনীন সুলতানা লাকসাম থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে বদলে যায় এই দীর্ঘদিনের চিত্র।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা নাজনীন সুলতানা চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে বাংলা ভাষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। এছাড়া তিনি এলএলবিও সম্পন্ন করেছেন। ২০০৭ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন এবং কর্মজীবন শুরু হয় ফেনী জেলা থেকে। ২০১৬ সালে তিনি পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক পরিসরেও তার দক্ষতার প্রমাণ দেন।

লাকসাম থানার ৪০তম ওসি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নাজনীন সুলতানা শুধু প্রথম নারী ওসি নন, বরং একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবেও ইতোমধ্যে প্রশংসিত হচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণের কাছ থেকে পেয়েছেন ইতিবাচক সাড়া।

তিনি বলেন, “আমি কোনো দলের প্রতি নয়, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করছি। মানুষ থানায় আসলে আমি মন দিয়ে তাদের কথা শুনি, তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিই। এখানকার মানুষ আমাকে খুব সহযোগিতা করছেন।”

লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, “মাঠপর্যায়ে আমি বহু ওসির সঙ্গে কাজ করেছি, কিন্তু নাজনীন সুলতানা সবচেয়ে পেশাদার ও মানবিক ওসি বলেই মনে হয়েছে।”

নারীর ক্ষমতায়নে এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে কুমিল্লার নারীনেত্রী দিলনাশি মোহসেন বলেন, “আরও থানায় নারী ওসি নিয়োগ দিতে হবে। সেইসঙ্গে নারী কর্মকর্তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার।”

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান জানান, নাজনীন সুলতানা তার দক্ষতার প্রমাণ ইতিমধ্যেই দিয়েছেন। সামনে আরও কয়েকটি থানায় নারী কর্মকর্তাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

মহাকাশে নারীর পদচিহ্ন: হর্স হেড নেবুলার আবিষ্কারক উইলিয়ামিনা ফ্লেমিং

উইলিয়ামিনা প্যাটন ফ্লেমিং-একজন নারী যিনি পরিচারিকা থেকে হয়ে উঠেছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানী। ১৮৫৭ সালের ১৫ মে, স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী কেবল নিজের জীবন বদলাননি, বদলে দিয়েছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে নারীর অংশগ্রহণের ধারণাকেও।

জীবনের এক পর্যায়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং এক অধ্যাপকের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ নেন। কিন্তু তাঁর সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখে সেই অধ্যাপক উইলিয়ামিনা ফ্লেমিংকে হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটরিতে কাজের সুযোগ করে দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার অনন্য যাত্রা।

তিনি তারার বর্ণালির শ্রেণিবিন্যাসের একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা সে সময়কার অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় ছিল অনেক উন্নত। পরবর্তী কালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাঁর এই পদ্ধতির ভিত্তিতেই আরও উন্নত গবেষণা চালিয়ে যান।

উইলিয়ামিনা ছিলেন একাধারে আবিষ্কারক ও পথপ্রদর্শক। তাঁর অর্জনের তালিকায় আছে-
১০টি নতুন নোভা (উজ্জ্বল বিস্ফোরণ তারকা),৫২টি নতুন নেবুলা (মহাকাশের ধূলিকণা ও গ্যাসের মেঘ),
৩১০টি নতুন পরিবর্তনশীল তারা।

তবে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় আবিষ্কার হলো—হর্স হেড নেবুলা। এই বিস্ময়কর নেবুলাটি দেখতে ঠিক ঘোড়ার মাথার মতো, যা তাঁকে বিশ্ববিজ্ঞানে অমর করে রেখেছে।

উইলিয়ামিনার প্রবন্ধ ‘A Field for Women’s Work in Astronomy’-তে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন—নারীদের বিজ্ঞান গবেষণায় আরও সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর এই বক্তব্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

১৯০৬ সালে তিনি সম্মানসূচক সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে যুক্ত হন—প্রথম আমেরিকান নারী হিসেবে।

৫৪ বছর বয়সে ১৯১১ সালের ২১ মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর কাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি আজও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি বিজ্ঞানপ্রেমীর মনে আলো জ্বালায়।

 

প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে অগ্রণী নারীরা

প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘ ১৯৭২ সালে এই দিবসের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৭৪ সাল থেকে এটি বিশ্বব্যাপী পালন শুরু হয়। পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়াই এর মূল উদ্দেশ্য। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজন করা হয় এ দিবসটি। ২০২5 সালের প্রতিপাদ্য- #BeatPlasticPollution, অর্থাৎ ‘প্লাস্টিক দূষণ রোধ করুন’।

প্লাস্টিক দূষণ আজ বৈশ্বিক সংকট। প্রতি বছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপন্ন হয়, যার একটি বিশাল অংশ গিয়ে পড়ে আমাদের নদী, সমুদ্র এবং জমিতে। কিন্তু এই দূষণের বিরুদ্ধে যাঁরা নীরবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ হলেন নারী। আজ তুলে ধরছি এমন কিছু সাহসী নারীর কথা, যাঁরা তাঁদের নিজ নিজ অঞ্চলে প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইসাতু সিসে, গাম্বিয়া: রিসাইক্লিংয়ের রানী
আফ্রিকার গাম্বিয়ায় ১৯৯৭ সালে ইসাতু সিসে চারজন নারীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন Recycle Centre of N’jau। তাঁরা প্লাস্টিক ব্যাগ সংগ্রহ করে তা ধুয়ে, কেটে সুতো বানান ও সেখান থেকে তৈরি করেন ব্যাগ, পার্স, ম্যাট ইত্যাদি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীরা যেমন আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি প্লাস্টিক বর্জ্যও রূপ নিচ্ছে পরিবেশবান্ধব পণ্যে। ইসাতুর এই উদ্ভাবনী নেতৃত্ব তাঁকে এনে দিয়েছে “Queen of Recycling” উপাধি।

ক্রিস্টাল অ্যামব্রোস, বাহামাস: সাগর রক্ষার সংগ্রামী
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ক্রিস্টাল অ্যামব্রোস ২০১৩ সালে ‘Plastics Camp’ কর্মসূচি চালু করে সমুদ্র তীর থেকে ৫ হাজার পাউন্ডের বেশি বর্জ্য সংগ্রহ করেন। ২০১৮ সালে তিনি একক-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেন, যার ভিত্তিতে ২০২০ সালে বাহামাস সরকার সেইসব প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

শিলশিলা আচার্য, নেপাল: পাহাড় বাঁচানোর দূত
Avni Center for Sustainability প্রতিষ্ঠা করে নেপালের শিলশিলা আচার্য স্কুল, হোটেল ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন। তিনি পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপকরণ ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করছেন।

লরনা রুট্টো, কেনিয়া: প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নির্মাণসামগ্রী
কেনিয়ার উদ্ভাবক লরনা রুট্টো তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা EcoPost এর মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করে তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী। এতে যেমন বর্জ্য কমছে, তেমনি কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে।

এমিলি পেন, যুক্তরাজ্য: সমুদ্র প্লাস্টিক গবেষণার নায়িকা
Emily Penn ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Exxpedition, যা নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত সমুদ্র গবেষণা কার্যক্রম। এ অভিযানে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক শতাধিক নারী অংশ নেন। তিনি একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, যেখানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্লাস্টিক দূষণ বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথে যেতে পারে।

সেল ক্লিভ, যুক্তরাষ্ট্র: সচেতনতার সৈনিক
Sea Hugger নামক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে Sel Cleave সাধারণ মানুষকে সমুদ্র পরিচ্ছন্নতায় সম্পৃক্ত করছেন। তাঁর উদ্যোগে আমেরিকার উপকূলবর্তী বহু এলাকায় প্লাস্টিক ব্যবহার কমেছে এবং পরিবেশবান্ধব আচরণে উৎসাহ বেড়েছে।

এই নারীরা প্রমাণ করেছেন-উদ্যোগ, নেতৃত্ব ও সচেতনতা থাকলে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব। তাঁরা শুধু নিজেরাই কাজ করছেন না, অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী করছেন, নেতৃত্বে আনছেন। তাঁদের সাফল্য আমাদের শেখায়, ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

 

নারী শিল্পীদের জন্য বিশ্বের প্রথম জাদুঘর

আপনি কি জানেন, শিল্প জগতের ইতিহাসে এক সময় নারীদের অবদান প্রায় অদৃশ্য ছিল? আর সেই অনুচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে জায়গা করে দিতে এক নারী গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের প্রথম নারী শিল্পীদের নিবেদিত জাদুঘর—যুক্তরাষ্ট্রের National Museum of Women in the Arts।

২০০০ সালের পর সংস্কারের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া এই জাদুঘর আবার নতুনভাবে ফিরে আসে ২০২৩ সালে, এক চমৎকার প্রদর্শনীর মাধ্যমে—”The Sky’s the Limit”। এই শিরোনামের প্রদর্শনীটি চলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১৩ জন নারী শিল্পীর ইনস্টলেশন আর্ট ও ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়।

এই জাদুঘরের পেছনে যার স্বপ্ন, সংগ্রাম ও শ্রম—তিনি Wilhelmina Cole Holladay। সত্তরের দশকে স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন জাদুঘর ভ্রমণের সময় তিনি বুঝতে পারেন, নারী শিল্পীদের শিল্পকর্ম সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। ভিয়েনায় এক নারী শিল্পী Clara Peeters-এর একটি ছবি দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে-নারী শিল্পীরা কোথায়?

সেই প্রশ্নই তাকে নিয়ে আসে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে। ১৯৮০ সালের মধ্যে তিনি সংগ্রহ করেন প্রায় ৫০০টি শিল্পকর্ম, তৈরি করেন নারী শিল্পীদের জীবনী, ফটোগ্রাফ ও ক্যাটালগের বিশাল আর্কাইভ। এই সংগ্রহশালাকে জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য তিনি সংগ্রহ করেন ২০ মিলিয়ন ডলার, এবং অবশেষে ১৯৮৭ সালের ৭ এপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী Barbara Bush উদ্বোধন করেন এই অসাধারণ জাদুঘর।

আজ এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ১ হাজার নারী শিল্পীর ৫,৫০০-এর বেশি শিল্পকর্ম। ৫০ জন কর্মী ও ২১ দেশের দাতা সংস্থার সহায়তায় জাদুঘরটি নারী শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে কাজ করে চলেছে।

এই জাদুঘর শুধু শিল্প সংরক্ষণের জায়গা নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ, এক সমতা প্রতিষ্ঠার চিত্রশালা।

 

চুলের স্বাস্থ্যের জন্য বায়োটিন:যেসব খাবারে পাবেন এই উপাদান

চুল পড়া, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা চুলের উজ্জ্বলতা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে পুষ্টির ঘাটতি অন্যতম কারণ। এর মধ্যে বায়োটিন (Biotin) হলো এমন একটি ভিটামিন যা চুল, ত্বক এবং নখের সুস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ভিটামিন বি-৭ নামেও পরিচিত, যা শরীরের চর্বি, কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন ভাঙতে সহায়তা করে এবং কেরাটিন উৎপাদন বাড়িয়ে চুলকে করে তোলে মজবুত ও স্বাস্থ্যবান।

নিচে বায়োটিন সমৃদ্ধ কিছু খাবার এবং চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ টিপস দেওয়া হলো:

যেসব খাবারে বায়োটিন পাওয়া যায়:
১. ডিমের কুসুম – সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎসগুলোর একটি। তবে কাঁচা না খেয়ে সিদ্ধ খাওয়া উত্তম।
২. বাদাম ও বীজ – যেমন: বাদাম, আখরোট, সূর্যমুখীর বীজ ইত্যাদি।
৩. সোয়াবিন ও ডালজাতীয় খাবার – উদ্ভিজ্জ উৎস হিসেবে ভালো।
৪. মিষ্টি আলু – অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও বায়োটিন সমৃদ্ধ।
৫. কলা ও অ্যাভোকাডো – সহজলভ্য ফল যা হেয়ার কেয়ার-এ কার্যকর।
৬. মাছ (বিশেষ করে স্যামন ও টুনা) – ওমেগা-৩ এর পাশাপাশি বায়োটিন সরবরাহ করে।
৭. দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য – যেমন: দই, ছানা ইত্যাদি।

চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় টিপস:

১. সুষম খাদ্যগ্রহণ নিশ্চিত করুন – শুধু বায়োটিন নয়, আয়রন, জিংক, প্রোটিন ও ওমেগা-৩-ও চুলের জন্য জরুরি।
২. অতিরিক্ত হিট এড়ান – হেয়ার ড্রায়ার বা স্ট্রেইটনারের অতিরিক্ত ব্যবহারে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. জলীয় পদার্থের গ্রহণ বাড়ান – শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখলে টক্সিন বের হয় ও চুল সতেজ থাকে।
৪. চুলের পরিচর্যায় কেমিক্যালমুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করুন – সালফেট ও প্যারাবেনমুক্ত পণ্য বেছে নিন।
৫. হেয়ার মাস্ক ও তেল ম্যাসাজ করুন নিয়মিত – নারিকেল বা আমন্ড অয়েল বায়োটিন সংরক্ষণে সাহায্য করে।
৬. প্রয়োজনে ডাক্তারি পরামর্শে বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন – তবে তা অবশ্যই ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শে।

বায়োটিন চুলের জন্য একটি গোপন জাদুর মতো কাজ করলেও এটি একা যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যবান চুলের জন্য প্রয়োজন ভেতর থেকে পুষ্টি, বাইরে থেকে পরিচর্যা এবং নিয়মিত অভ্যাসের পরিবর্তন।

 

রোমেনা আফাজ: বাংলা সাহিত্যের এক সাহসিনী কিংবদন্তি

বাংলা সাহিত্যে যখন নারী লেখকদের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা, তখনই একজন নারী কলম ধরেছিলেন অপরাধ ও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি লেখার সাহস দেখিয়ে। তিনি হলেন রোমেনা আফাজ—‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের স্রষ্টা। ষাট ও সত্তরের দশকে যাঁদের ‘আউট বই’ পড়ার অভ্যাস ছিল, তাঁদের শৈশবে রোমাঞ্চ জুগিয়েছেন এই লেখিকা। অথচ সেই লেখিকা আজ প্রায় বিস্মৃত।

রোমেনা আফাজ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর, বগুড়ার শেরপুর উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম কাজেম উদ্দিন ও মায়ের নাম আছিয়া খাতুন। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহরের একজন পুলিশ পরিদর্শক। সেই পেশাগত জীবনের গল্প শুনে ছোটবেলা থেকেই রোমেনার মধ্যে অপরাধ ও থ্রিলারের প্রতি আগ্রহ জন্মায়।

মাত্র ৯ বছর বয়সে ‘বাংলার চাষী’ নামে একটি ছড়া প্রকাশিত হয় কলকাতার জনপ্রিয় পত্রিকা ‘মোহাম্মদী’তে। এটিই ছিল তাঁর ছাপা হওয়া প্রথম লেখা।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে রোমেনা বিয়ে করেন বগুড়ার ফুলকোর্ট গ্রামের চিকিৎসক আফাজ উল্লাহকে। বিয়ের পর তাঁর নাম হয় রোমেনা আফাজ—যে নামে তিনি পরিচিত হন সারাজীবন।

পরবর্তীতে ১৯৬০ সালের দিকে তাঁরা বসবাস শুরু করেন বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায়, যেখানে রোমেনা আফাজের সাহিত্যিক জীবনের মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে।

লেখালেখিতে তাঁর পেশাদার যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। সেই বছর ‘সাহিত্য কুঠির’ নামের এক স্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই—‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’। এটি ছিল একটি নারী চরিত্রকেন্দ্রিক অ্যাডভেঞ্চার লসিরিজ ‘দস্যুরানী’-এর সূচনা।

এরপর ১৯৬৫ সালে তিনি শুরু করেন তাঁর বিখ্যাত ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ। এই সিরিজের বই সংখ্যা ১৩৮টি, যা একক নারীনামধারী লেখকের পক্ষে এক বিরল কীর্তি।

যেখানে কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ ছিল সাহসী গোয়েন্দা, সেখানে রোমেনা আফাজের ‘দস্যু বনহুর’ ছিল সাহসী, চৌকস এক ডাকাত, যার দস্যুবৃত্তির আড়ালে ছিল ন্যায়বোধ ও রোমাঞ্চ। তাঁর লেখা সহজ ভাষায়, টানটান উত্তেজনাময় প্লটে ভরপুর—যা সাধারণ পাঠকদের কাছে ছিল সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয়।

রোমেনা আফাজের উপন্যাসের কাহিনি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর লেখা অবলম্বনে ছয়টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

রোমেনা আফাজ ছিলেন কাজেম-আছিয়া দম্পতির বড় সন্তান।
তিনি সাত পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জননী। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন সন্তানের মৃত্যু ঘটে আগেই। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের কেউ বগুড়ায়, কেউ প্রবাসে বসবাস করছেন। ছোট ছেলে মন্তেজার রহমান আঞ্জু বর্তমানে বগুড়া শহরে থাকেন।

নাতনি উম্মে ফাতেমা লিসার উদ্যোগে জলেশ্বরীতলার বাড়িকে ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতিঘর’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তা স্থানান্তরিত হয় শহরের আলতাফুনেছা খেলার মাঠসংলগ্ন একটি ক্লাবে।

সাহিত্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রোমেনা আফাজ জীবদ্দশায় পেয়েছেন ২৭টি পুরস্কার ও সম্মাননা এবং মৃত্যুর পরে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত করে—যা দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।

বগুড়া পৌরসভা তাঁর সম্মানে তাঁর বাড়ির সামনের সড়কটির নামকরণ করে ‘রোমেনা আফাজ সড়ক’ হিসেবে।

২০০৩ সালের ১২ জুন, ৭৭ বছর বয়সে বগুড়ার জলেশ্বরীতলার নিজ বাসভবনে রোমেনা আফাজ মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বাড়িটি ফাঁকা পড়ে আছে—যেন এক সময় সাহিত্যে ঝড় তোলা এক নারীচরিত্র আজ নিঃশব্দে বিশ্রামে।

রোমেনা আফাজ ছিলেন সাহিত্যে নারীর সাহসী পথচলার প্রতীক। একাই লিখে গেছেন দুই শতাধিক বই—উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, সিরিজ—সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যভাণ্ডার বিস্ময়কর।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, থ্রিলার বা অ্যাডভেঞ্চার শুধু পুরুষ লেখকদের ক্ষেত্র নয়-নারীর কলমও পারে পাঠককে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় বেঁধে রাখতে।

আজ যখন সাহিত্যজগতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়, তখন রোমেনা আফাজকে স্মরণ করা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অলিখিত রাণী—যাঁর সৃষ্ট দস্যু বনহুর, আজও পাঠকের মনে চিরজাগরুক।

 

১১৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধান এমআই৬-এ, দায়িত্ব নিচ্ছেন ব্লেইস মেট্রেওয়েইলি

যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স-৬ (এমআই৬)-এর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধান পদে একজন নারী নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এমআই৬-এর বর্তমান প্রধান রিচার্ড মুর-এর স্থলাভিষিক্ত হবেন ব্লেইস মেট্রেওয়েইলি।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ব্লেইস মেট্রেওয়েইলি ১৯৯৯ সাল থেকে ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস-এ কর্মরত। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। পেশাগত জীবনের বড় একটি অংশ তিনি কাটিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে। এর আগে তিনি এমআই৫-এর পরিচালক পদেও দায়িত্ব পালন করেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তাঁর নিয়োগকে ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “যখন জাতীয় নিরাপত্তার কাজ স্মরণকালের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন এমন নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী।”

ব্লেইস মেট্রেওয়েইলি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ২০২৪ সালের ‘কিংস ওভারসিস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অনারস লিস্ট’-এ তাঁকে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক নীতিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সিএমজি (কম্প্যানিয়ন অব দ্য অর্ডার অব সেইন্ট মাইকেল অ্যান্ড সেইন্ট জর্জ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

২০২১ সালে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (তখন তিনি ছিলেন এমআই৫-এর পরিচালক) তিনি বলেছিলেন,“যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিগুলো এখন বহুস্তরবিশিষ্ট।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, এমনকি নাগরিকদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে।”

তিনি আরও বলেন “রাশিয়া নয়, বরং রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তৎপরতাই বড় হুমকি। আর চীন এমনভাবে বৈশ্বিক কাঠামো পাল্টে দিচ্ছে, যা যুক্তরাজ্যের জন্য একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনা আনছে, তেমনি তৈরি করছে বড় ঝুঁকিও।”

প্রসঙ্গত, এমআই৬ মূলত যুক্তরাজ্যের বাইরের দেশগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা চালায়। সংস্থাটির প্রধানকে অভ্যন্তরীণভাবে ‘সি (C)’ নামে ডাকা হয়। ব্লেইস মেট্রেওয়েইলি হবেন সংস্থার ১৮তম প্রধান এবং প্রথম নারী ‘সি’।

 

এক আসবাবেই বহু কাজ, জায়গা ও খরচ বাঁচানোর জাদু!

শহুরে জীবনে জায়গার সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বুদ্ধিমানের মতো বাসা গোছানো এখন একরকম আর্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছোট ফ্ল্যাট, সীমিত বাজেট আর নিত্যদিনের ব্যবহারে সহজ-সরল সমাধান খুঁজতে গিয়ে অনেকেই এখন বেছে নিচ্ছেন মাল্টিপারপাস ফার্নিচার, অর্থাৎ বহুমুখী আসবাব। এক আসবাবেই যখন দুই -তিনটি কাজ হয়ে যায়, তখন আলাদা আলাদা ফার্নিচার কেনার দরকার পড়ে না-এটাই এক চরম লাইফ হ্যাক!

একটা সোফা যদি খাট হিসেবেও ব্যবহার করা যায়, বা একটি টেবিল যদি পড়ার টেবিল আর খাবার টেবিল দুটোই হয়, তাহলে আপনি অর্ধেক জায়গায় পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন।
বিশেষ করে ৮০০–১০০০ বর্গফুট ফ্ল্যাটে থাকা ব্যাচেলর, নতুন দম্পতি কিংবা ছোট পরিবারগুলোর জন্য এটি এক দারুণ সল্যুশন।

বাংলাদেশে এখন হাতিল, আকতার, পারটেক্স, ইশো, অটবি, নাভানা সহ বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড এই ধরনের আসবাব তৈরি করছে। যেমন, হাতিলের স্টোরেজ সোফা—বসে গল্পও হবে, আবার ভেতরে রাখা যাবে কম্বল বা বই। এমনকি বাচ্চাদের পড়ার টেবিল থেকেও রাতের বেড হয়ে যাচ্ছে এক ক্লিকে! আর নন–ব্র্যান্ডেড দোকানগুলো থেকেও অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নেওয়া যায় পছন্দমতো আসবাব।

মূলত ইউরোপীয় ডিজাইনের ছোঁয়ায় তৈরি এসব আসবাব দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি হালকা ও সহজে সরানো যায়। ডিজাইনগুলো মিনিমাল, কিন্তু ব্যবহারভিত্তিক—একটা তাক, আবার সেটাই বিছানা। অথবা ড্রেসিং টেবিল, যার নিচে স্টোরেজ বক্স!

মূল্য? ১০ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ পর্যন্ত, তবে ইএমআই সুবিধায় ৩–১২ মাসের কিস্তিতে সহজেই কেনা যায়, বাড়তি চার্জ ছাড়াই। একটু বেশি দামের হলেও, কাজের দিক থেকে এটি পুরোটাই স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট।

যারা নতুন বাসা নিচ্ছেন বা পুরোনো বাসা নতুনভাবে গোছাতে চাইছেন-বহুমুখী আসবাব হতে পারে আপনার পরবর্তী স্মার্ট সিদ্ধান্ত। জায়গা কম, কিন্তু ফাংশনালিটি চাই? এই লাইফস্টাইল হ্যাক আপনার জন্যই!

 

একজন নারীর সত্যিকারের সৌন্দর্য: আত্মার ১০টি অনন্য গুণ

সৌন্দর্য মানে শুধু বাহ্যিক রূপ নয় বরং একজন নারীর আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, ও হৃদয়ের উষ্ণতায়ই তাঁর প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয়। চলুন জেনে নিই এমন দশটি গুণাবলি যা একজন নারীর আত্মিক সৌন্দর্যকে অনন্য করে তোলে।

১. মমত্ববোধ ও সহানুভূতির প্রকাশ
তিনি শুধু দুঃখ দেখা পর্যন্ত থেমে থাকেন না, যতটুকু পারেন ততটুকু সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। তাঁর মমত্ববোধ নিঃস্বার্থ ও আন্তরিক।

২. আশাবাদী মনোভাব
জীবনের কঠিন সময়েও তিনি আশার আলো খুঁজে নেন এবং অন্যদের সেই আলো দেখাতেও চেষ্টা করেন।

৩. অকৃত্রিমতা ও আত্ম-গ্রহণযোগ্যতা
তিনি যেমন, তেমনভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। নিজের শক্তি ও দুর্বলতা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।

৪. জীবের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা
মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি—সবকিছুর প্রতিই থাকে তাঁর শ্রদ্ধা। তিনি বিশ্বাস করেন, সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া মানে মানবিক হওয়া।

৫. গভীর সহানুভূতি ও হৃদয়ের সংযোগ
তিনি কেবল অনুভব করেন না, অন্যের ব্যথা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন। এই সহানুভূতিই তাঁকে করে তোলে এক শক্তিশালী মানবিক ব্যক্তিত্ব।

৬. নিঃস্বার্থ ভালোবাসা
তাঁর ভালোবাসা হয় শর্তহীন। পরিবার, বন্ধু, সমাজ—সব জায়গায় তিনি ভালোবাসার রূপ ছড়িয়ে দেন। নিজের প্রতিও থাকে এক গভীর সম্মান ও স্নেহ।

৭. সাহস ও দৃঢ়চেতা মনোভাব
ভয়ের উপস্থিতিতেই তিনি সাহস খুঁজে নেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তিনি এগিয়ে যেতে জানেন।

৮. কৃতজ্ঞতাপূর্ণ মন
তিনি জীবনের প্রতিটি আশীর্বাদের জন্য কৃতজ্ঞ থাকেন—ছোট বিষয়েও খুঁজে নেন প্রশান্তির উপলক্ষ।

৯. অন্তর্দৃষ্টি ও আত্মিক শান্তি
বাহ্যিক সাফল্য নয়, তিনি অভ্যন্তরীণ প্রশান্তিতেই তৃপ্ত। বর্তমানে বাঁচেন, জীবনের রূপ-রস উপভোগ করেন সম্পূর্ণভাবে।

১০. অন্যদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা
তিনি নিজে শুধু ভালো থাকেন না, বরং অন্যদেরও জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। তাঁর কর্ম, কথা এবং উপস্থিতিই হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার উৎস।

এই গুণাবলিগুলো কাউকে নিখুঁত করে না, বরং একজন নারীর মানবিক ও আত্মিক সৌন্দর্যকে আলোকিত করে তোলে। এমন নারীরা সমাজে নীরবে আলো ছড়িয়ে দেন—নিজের মতো করে, নিজের বিশ্বাসে।

রালফ ওয়াল্ডো এমারসনের ভাষায়, “সৌন্দর্য মুখে নয়, হৃদয়ের আলোয়।”
আমাদের চারপাশে এমন হৃদয়ের আলোকিত মানুষ হোক প্রতিদিনের প্রেরণা।

 

গাজার পথে গ্রেটা থুনবার্গের সাহসী অভিযান

বিশ্বজুড়ে যখন যুদ্ধের দামামা বেজে চলেছে, তখন কেউ কেউ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও দাঁড়াচ্ছেন মানবতার পক্ষে। তাদেরই একজন হলেন সুইডিশ মানবাধিকার ও পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। জলবায়ু আন্দোলনের কিশোরী কণ্ঠ থেকে যুদ্ধবিরোধী সাহসী প্রতিবাদী হিসেবে তার বিবর্তন বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।

২০২৫ সালের ৯ জুন, ‘ম্যাডলিন’ নামের একটি ত্রাণবাহী জাহাজ গাজার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য, ওষুধ, স্যানিটারি সামগ্রীসহ মানবিক সহায়তা বহন করছিল জাহাজটি। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রমের সময় ইসরায়েলি বাহিনী এটি জবরদখল করে। জাহাজে থাকা ১৩ জন মানবাধিকার কর্মীর মধ্যে ছিলেন গ্রেটা থুনবার্গও। অপহরণের ঠিক আগে গ্রেটা একটি ভিডিও বার্তায় বিশ্ববাসীকে জানান, “আমাদের আটক করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের অপহরণ করেছে।”

জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছিল গাজার প্রথম নারী মৎস্যজীবী ম্যাডলিন কুল্লাবের নামে। আশা ছিল, এ জাহাজ একদিন মানবিক বার্তা নিয়ে গাজার উপকূলে পৌঁছাবে। কিন্তু যুদ্ধ সেই আশা স্তব্ধ করে দেয়।

গ্রেটা থুনবার্গ মাত্র ১৫ বছর বয়সে ২০১৮ সালে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেন এবং সুইডিশ সংসদ ভবনের সামনে ‘জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট’ শুরু করেন। তার আন্দোলনে পরে দশ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রতিবাদ জানিয়ে আসেন তিনি।

২০১৯ সালে কার্বনমুক্ত নৌযান করে ইংল্যান্ড থেকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে যান। সেখানে বিশ্বনেতাদের প্রশ্ন করেন: “মানুষ মারা যাচ্ছে, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে, আমরা গণবিলুপ্তির মুখে—তোমাদের সাহস কীভাবে হয়?”

তার স্পষ্টভাষী প্রতিবাদ বিশ্বনেতাদের অনেকেরই বিরাগভাজন করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে “রাগী কিশোরী” বলেও কটাক্ষ করেন। জলবায়ু, মানবাধিকার এবং যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে গ্রেটাকে বারবার হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, এমনকি জেলও খাটতে হয়েছে।

বর্তমানে গ্রেটা রাশিয়া, ইসরায়েল, আজারবাইজান ও মরক্কোর যুদ্ধনীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সক্রিয়। ইউক্রেন, ফিলিস্তিন ও আর্মেনিয়ার মতো যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলে তার ভূমিকা শুধু প্রতিবাদ নয়, বরং সরাসরি মানবিক সহায়তায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমেও স্পষ্ট।

গ্রেটার পরিবেশসচেতন জীবনধারাও প্রশংসনীয়। তিনি উড়োজাহাজে যাত্রা এড়িয়ে চলেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু সম্প্রতি ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স-এ তার বিমানযাত্রার ছবি প্রকাশ করে বিতর্ক তোলে।

২০০৩ সালে জন্ম নেওয়া গ্রেটার মা অপেরা শিল্পী মালেনা এরম্যান এবং বাবা অভিনেতা সভান্তে থুনবার্গ। TEDx-এ গ্রেটা বলেন, “আমি আট বছর বয়সে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা জানতে পারি, কিন্তু বুঝতে পারিনি কেন কেউ কিছু করছে না।”

তার লেখা দুটি বই—Scenes from the Heart (২০১৮) এবং No One is Too Small to Make a Difference (২০১৯)—বিশ্বজুড়ে আলোচিত। দ্বিতীয় বইয়ের বিক্রিত অর্থ তিনি মানবতার কাজে ব্যয় করবেন বলেও জানান।

গ্রেটার কণ্ঠ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-বিশ্বে ন্যায়, মানবতা ও পরিবেশের পক্ষে দাঁড়ানোর এখনই সময়। যুদ্ধ, নিপীড়ন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তার মতো মানুষ যতদিন থাকবেন, ততদিন পৃথিবীর সৌন্দর্য বেঁচে থাকবে।

Photo Credit: BBC Bangla

Loading

 

শোনো, বন্ধু হও! প্যারেন্টিং মানে আদেশ নয়, সহযাত্রা

বাসায় ফিরে এসে যখন দরজায় আপনার ছোট্ট সন্তান ছুটে আসে, কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবা এক কাপ চায়ের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকেন—তখন আপনি কি ভাবেন? আপনি কি শুধু নির্দেশ দেন, নাকি একটু নরম সুরে, সহমর্মিতায় কথা বলেন? পরিবার মানে শুধু কর্তৃত্ব নয়, পরিবার মানে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বোঝাপড়ার সম্পর্ক, যেখানে সবাই একে অপরের বন্ধু।

অনেকেই মনে করি, সন্তান জন্ম দিলেই আমরা “ভালো” বাবা-মা হয়ে যাই। কিন্তু সন্তানের জন্য সত্যিকারের ভালো পিতামাতা হয়ে ওঠা আলাদা ব্যাপার। এটা দায়িত্ব, ধৈর্য ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়।

❝আমার সন্তান আমার স্বপ্ন নয়, সে নিজের স্বপ্ন নিয়ে জন্ম নিয়েছে❞
প্যারেন্ট হিসেবে, আমি আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারি না। আমি তাকে শুধু দেখাতে পারি ভালোটা কী, মন্দটা কী। আমি পার্থক্য চিনতে শেখাতে পারি যাতে সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

কিন্তু আমাদের সমাজে কী ঘটে? ছেলেমেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বাবা-মার ইচ্ছার গদি। তারা যদি আকাশে উড়তে চায়, আমরা তাদের পাখা কেটে দেই। যদি তারা সমুদ্রে ভাসতে চায়, আমরা বলি—না, তোমাকে শুধু ডাক্তার হতে হবে। জাহাজের নাবিক হওয়া মানেই জীবন নষ্ট।

এই যে চাপ, এই ডমিনেশন—আমি এর ঘোর বিরোধী। আমরা কখনো তাদের জিজ্ঞেস করি না, “তুমি কী হতে চাও?” “তোমার স্বপ্ন কী?” বরং আমরা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো তাদের উপর চাপিয়ে দিই। এটা কি পিতামাতার দায়িত্ব? নাকি এক ধরণের মানসিক আগ্রাসন?

শুধু নম্বর নয়, জীবনটাও গুরুত্বপূর্ণ
আমরা সন্তানদের এমনভাবে লালন পালন করি, যেনো তারা আমাদের কর্মচারী। পরীক্ষায় ভালো নাম্বার আনতে বলি, মানে আনতেই হবে। পাশের বাসার মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার, সুতরাং আমার মেয়েকেও হতে হবে। কিন্তু পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে কি আমরা কখনো জানতে চেয়েছি—সে আসলে কী হতে চায়?
সে কি উড়তে চায়, না ডুবতে চায়? তার চোখের স্বপ্নগুলো কি আমরা সত্যিই দেখি?

আমরা এই জটিল প্রতিযোগিতামূলক সমাজে আমাদের সন্তানদের এমন একটা দৌড়ে নামিয়ে দিচ্ছি, যেখানে তারা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। এক সময় দেখা যায়—চাপ নিতে না পেরে একটা শিশু আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। তখন আমরা কেবল বলি—“ও খুব দুর্বল ছিলো।” আসলে, আমরা কি তার পাশে ছিলাম?

🌱 বন্ধু হোন, বোঝার চেষ্টা করুন
একজন আদর্শ অভিভাবক মানে “বন্ধু” হওয়া। তার সাথে হাঁটা, তার স্বপ্ন শুনা, ভুল করলে ভালোবেসে শেখানো। একসাথে সিদ্ধান্ত নেওয়া—কীভাবে সে ভালো মানুষ হতে পারে। তাকে এমন পরিবেশ দেওয়া, যেখানে সে ভয় নয়, ভালোবাসা নিয়ে বড় হতে পারে।

আমার সন্তান, আপনার সন্তান, আমাদের বাবা, আমাদের মা—প্রতিটা জীবনই মূল্যবান। ইনডিভিজুয়াল জীবন মানেই আলাদা এক জগৎ। চলুন না, প্রতিটা জীবনের প্রতি সম্মান রাখি।

📌 সন্তান কোন ‘প্রজেক্ট’ নয়-সে একজন মানুষ
সন্তান আমাদের “প্রজেক্ট” না যে ঠিক করে দেওয়া যাবে কোথায় পৌঁছাবে। সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, চিন্তা আছে, স্বপ্ন আছে। তাকে বোঝা, তাকে ভালোবাসা, তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেওয়াটাই পিতামাতার দায়িত্ব।

শুধু বলবেন না, “আমি তোমার জন্য সব করেছি।” বরং এমন কিছু করুন যাতে সে নিজে বলতে পারে, “আমার মা-বাবা আমার জন্য একটা বেঁচে থাকার জায়গা ছিলেন।”

Photo Credit: Sahlah

 

শিশুর স্মৃতিশক্তি বাড়াতে করণীয় ও বর্জনীয়

শিশুদের শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক বিকাশে সচেতনতা থাকা জরুরি। বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর হলো শিশুর মস্তিষ্ক গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়টাতেই স্মৃতিশক্তি প্রভাবিত হওয়ার ভিত্তি তৈরি হয়। তাই অভিভাবক হিসেবে কিছু কাজ নিয়মিত করলে শিশুর মনে রাখার ক্ষমতা আরও উন্নত হতে পারে।

করণীয়
১. খেলাধুলার মাধ্যমে শেখানো:
শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হলে খেলাধুলা ও গেম-ভিত্তিক শেখানো কার্যকর। মেমোরি গেম, ধাঁধা, শব্দজট, চিত্রপরিচিতি—এসব খেলার মাধ্যমে শিশুর শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং শেখা বেশি সময় ধরে মনে থাকে।

২. কল্পনা করার অভ্যাস গড়ানো:
শিশুকে গল্প শোনানোর পর বলা যেতে পারে, “এবার চোখ বন্ধ করে ভাবো, তুমি কী দেখলে?”—এভাবে কল্পনাকে সক্রিয় করলে স্মৃতিও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

৩. শেখা বিষয় অন্যকে শেখাতে উৎসাহ:
যে জিনিসটা সে শিখেছে, তা যদি কাউকে (যেমন ছোট ভাই/বোন, দাদি-নানি) শেখাতে পারে, তাহলে বিষয়টি তার মনে আরও ভালোভাবে গেঁথে যায়। এতে তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।

৪. ভেঙে ভেঙে শেখানো:
বড় কোনো তথ্য বা অধ্যায়কে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে শেখালে শিশুর পক্ষে তা সহজে মনে রাখা সম্ভব হয়। প্রতিটি ধাপকে বোঝার সুযোগ দিলে তার ধারণা আরও পরিপক্ব হয়।

৫. হাইলাইট এবং রঙের ব্যবহার:
শিশুদের জন্য পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বা বাক্য রঙিন কলম দিয়ে হাইলাইট করে দেওয়া যেতে পারে। শিশুরা রঙের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, যা তার মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

৬. দৈনন্দিন রুটিনে শেখার সময়:
শিশুর জন্য একটি নির্দিষ্ট পড়ার ও শেখার সময় নির্ধারণ করলে সে অভ্যাস গড়ে তুলতে শেখে। শেখার সময়টা যেন চাপমুক্ত ও আনন্দদায়ক হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. গল্প বলার অভ্যাস গড়ে তোলা:
ঘুমানোর আগে গল্প বলা শিশুর কল্পনাশক্তি ও শব্দভাণ্ডার বাড়ায়। পাশাপাশি, গল্পের ধারাবাহিকতা মনে রাখার চেষ্টা করাও স্মৃতিশক্তি উন্নত করে।

৮. শরীরচর্চা ও খেলাধুলা:
দৌড়, লাফঝাঁপ, বল খেলা, সাইকেল চালানো—এসব শারীরিক কসরত শিশুর রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে, মানসিক চাপ কমায় এবং শেখার আগ্রহ বাড়ায়।

৯. পুষ্টিকর খাদ্য:
শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখুন ডিম, মাছ, দুধ, বাদাম, তাজা ফল, সবজি এবং যথাসম্ভব প্রাকৃতিক খাবার। চকলেট, সফট ড্রিংকস বা ফাস্টফুড কমিয়ে দিলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।

১০. পর্যাপ্ত ঘুম:
বয়স অনুযায়ী শিশুকে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমাতে দিতে হবে। গভীর ঘুমই তার মস্তিষ্ককে পুনরায় সজীব করে এবং শেখা মজবুত করে।

১১. আবেগিক নিরাপত্তা:
শিশু যেন তার ভুল বলার ভয়ে ভীত না থাকে বা প্রশ্ন করতে সংকোচ না করে, সেজন্য তাকে সহানুভূতির সঙ্গে বড় করতে হবে। এতে শেখার আগ্রহ বাড়ে।

১২. নিয়মিত বইপড়া:
কমিক বই, ছবি সহ গল্পের বই বা ইসলামিক শিশুতোষ বই পড়ার অভ্যাস গড়লে সে শব্দ চিনতে শেখে, ভাষা রপ্ত করে এবং কল্পনা শক্তি বাড়ায়—যা সবকিছু মিলিয়ে স্মৃতিকে জোরদার করে।

বর্জনীয়
শিশুকে অতিরিক্ত পড়ার চাপ দেওয়া যাবে না। এতে শেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়।

তার প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হওয়া বা উত্তর না দেওয়া একেবারেই উচিত নয়। এতে সে ভবিষ্যতে জিজ্ঞেস করতে ভয় পায়।

“অমুকের মতো হতে হবে” বলে তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন। এতে শিশুর আত্মসম্মানবোধ নষ্ট হয়।

প্রতিযোগিতা বা পরীক্ষার চাপে না রেখে শেখার আনন্দটা উপভোগ করতে দিন।

টিভি, মোবাইল, ট্যাব—এসব ডিভাইসে অতিরিক্ত সময় কাটানো শিশুর মনোযোগ ও স্মৃতির বড় ক্ষতি করে।

বড়দের ঝগড়া বা চিৎকার শিশুর মানসিক স্থিতি নষ্ট করে; তাই ঘরের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ
যদি উপরের সব কৌশল অনুসরণ করেও শিশুর মধ্যে স্মরণশক্তি, মনোযোগ বা আচরণগত সমস্যা লক্ষ করা যায়, তাহলে শিশুবিশেষজ্ঞ বা মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কখনো কখনো সমস্যার পেছনে শারীরিক বা নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল কারণও থাকতে পারে।

এই পরামর্শগুলো শুধু শিশুদের মেধা বাড়ানোর জন্য নয়, বরং তাদের সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পথও তৈরি করে।

 

এক ডিমে শুরু,এক মহীয়সীর মসজিদ নির্মাণ ইতিহাস

বাংলাদেশের হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো স্থাপত্যশিল্প। এই ভূখণ্ডের নয়নাভিরাম মসজিদগুলো যুগে যুগে বিমোহিত করেছে অগণিত দর্শনার্থী আর ইতিহাসপ্রেমী মানুষকে। তবে এমন একটি মসজিদের কথা কি শুনেছেন, যার গোড়াপত্তন হয়েছিল মাত্র একটি ডিম দিয়ে?
হ্যাঁ, হবিগঞ্জ জেলার এক নিভৃত পল্লী প্রজাতপুরে দাঁড়িয়ে আছে এমনই এক মসজিদ—যার পেছনে লুকিয়ে আছে এক মহীয়সী নারীর অতুলনীয় ত্যাগ, ধৈর্য ও একাগ্রতা।

সরাসরি গল্পে আসা যাক। হবিগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরের এই প্রজাতপুর গ্রামের এক নারী, যিনি ‘বেঙ্গির মা’ নামে পরিচিত, নিয়ত করেছিলেন নিজের উপার্জিত অর্থেই গড়ে তুলবেন একটি মসজিদ। স্বামীর অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তিনি সে অর্থ স্পর্শ করেননি।

ঘটনা ১৯০২ সালের। প্রজাতপুর ও লালাপুর গ্রামের মাঝামাঝি একটি স্থানে এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। শুরুটা ছিল একটি মাত্র ডিম দিয়ে! সেই ডিম মানত করে একটি মুরগির নিচে রাখেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই ডিম থেকে ছানা, ছানা থেকে ডিম—এভাবে একসময় একটি মুরগির খামার গড়ে তোলেন বেঙ্গির মা।
খামারের মুরগি বিক্রি করে জমাতে থাকেন টাকা। এক সময়, নিজ চেষ্টায় এক লাখ টাকা জোগাড় করেন এবং তা দিয়েই নির্মাণ করেন মসজিদ। তিনি প্রথমে এর নাম রাখেন ‘এক আন্ডার মসজিদ’। সময়ের সাথে মসজিদটির আসল নাম হয়ে ওঠে—‘বেঙ্গির মায়ের মসজিদ’।

আজও শতবর্ষ পেরিয়ে সেই মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মসজিদের মূল ভবন এখনো অক্ষত রয়েছে, যদিও ২০০৯ সালে এলাকাবাসী এর বর্ধিত অংশ সংস্কার করেন এবং সম্প্রতি আবার রং করা হয়।
মসজিদের খতিব মাওলানা আলমাছ উদ্দিন বলেন, “আমি মসজিদের ইতিহাস শুনে বিস্মিত। নিয়ত থাকলে মানুষ কী না করতে পারে!”

বেঙ্গির মার উত্তরপুরুষ রাকিল হোসেন বলেন, “আমার দাদির দাদি বেঙ্গির মা শুধুমাত্র একটি ডিম থেকেই যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা এখনো আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”

বর্তমানে মসজিদ পরিচালনা কমিটিতে আছেন বেঙ্গির মার বংশধর রূপ উদ্দিন, লন্ডনপ্রবাসী আবদুল হারিছ, ব্যবসায়ী হেলিম উদ্দিন, রাকিল হোসেন ও শামীনুর মিয়া।
এলাকাবাসীর দাবি, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়া হোক সরকারের পক্ষ থেকে।

এক ডিম থেকে শুরু হয়ে গড়ে ওঠা এই মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনাই নয়, আত্মনিবেদনের এক চিরন্তন স্মারক।

 

৩৫ থেকে ৩৯ বয়সী নারীদের মধ্যে এইচপিভি সংক্রমণ সর্বাধিক

সম্প্রতি ‘ইলেকট্রনিক ডাটা ট্রাকিংসহ জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রধান কারণ উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচআর-এইচপিভি) সংক্রমণের হার অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট,৩৫-৩৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।

সিলেট অঞ্চলে এই হার সবচেয়ে বেশি (৬.৪%), যেখানে গ্রামীণ এলাকায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.১ শতাংশে। সবচেয়ে কম সংক্রমণ পাওয়া গেছে রাজশাহীতে (১.৭%)। গবেষণার আওতায় থাকা ৩,৮৫৬ জন নারীর মধ্যে মোট ১৩৮ জন এইচপিভি পজিটিভ ছিলেন, অর্থাৎ গড় হার ৩.৬%।

উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠি, কক্সবাজার ও বাগেরহাটে পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, বিবাহিত নারীদের মধ্যে সংক্রমণের গড় হার ২.৫৬% হলেও ঝালকাঠিতে তা ছিল ৩%। এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ভাইরাস ধরন ছিল এইচপিভি-১৬, যা ক্যানসার সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ।

স্ক্রিনিং পদ্ধতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, ভায়া + এইচপিভি পরীক্ষার সমন্বিত পদ্ধতি একক পরীক্ষার তুলনায় রোগ শনাক্তকরণে বেশি কার্যকর। এ গবেষণায় ৪,৭৯২ জন নারী অংশ নেন এবং ফলাফল অনুযায়ী, যৌথ পদ্ধতিতে পজিটিভ পাওয়া যায় ৫.৯% নারীর, যেখানে শুধুমাত্র এইচপিভি স্ক্রিনিংয়ে তা ছিল ৩.৭%।

জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় ৩০-৬০ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত আরেক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এইচআর-এইচপিভি সংক্রমণের হার ছিল ৩.২%। এর মধ্যে ১% ছিলেন এইচপিভি-১৬ পজিটিভ এবং ০.২% ছিলেন এইচপিভি-১৮ পজিটিভ।

এছাড়াও, ডিএইচআইএস২ ভিত্তিক ই-হেলথ ইনফরমেশন সিস্টেম (ই-এইচআইএস) ব্যবহারের মাধ্যমে স্ক্রিনিং ও ট্র্যাকিং কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। বর্তমানে ১৪,২১৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক এই সিস্টেম ব্যবহার করছে। যদিও ইন্টারনেট সংযোগ ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা আগামীতে আরও কার্যকর স্ক্রিনিং কার্যক্রম গড়ে তুলতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন, যেমন:
উপকূলীয় ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে স্ক্রিনিং জোরদার

৩৫-৪৪ বছর বয়সী নারীদের অগ্রাধিকার

জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে ই-স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম সংযুক্তকরণ

ল্যাব ও হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের ডিজিটাল সংযুক্তি

ভায়া ও এইচপিভি’র যৌথ ট্রাইএজ পদ্ধতি নিশ্চিতকরণ

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এই স্ক্রিনিং কর্মসূচির নেতৃত্বে ছিল এবং ভবিষ্যতে নারী স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট গঠনের পরিকল্পনাও জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের এই ধরণের উদ্যোগ নারীস্বাস্থ্য সচেতনতা, ক্যানসার প্রতিরোধ ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

📌পাঠকদের জন্য পরামর্শ:
৩৫ বছর বয়স পার হওয়ার পর সকল নারীর উচিত নিয়মিত এইচপিভি ও জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিং করানো। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে জীবন বাঁচানো সম্ভব।

 

মন্থর জীবনের আহ্বান: ক্লান্ত পুঁজিবাদের যুগে ‘কিছু না করা’র বিপ্লব

ধীরে চলা, বিশ্রামের জন্য সময় বের করা: এ কি শুধু বিলাসিতা, নাকি এক জরুরি প্রয়োজন?

আজকের ব্যস্ত, প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনে, যেখানে মানুষ প্রতিদিন ‘আরো করো’ সংস্কৃতির শিকার, সেখানে ‘কিছু না করা’ হয়ে উঠছে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ! এক নতুন জীবনদর্শন!

একটি বছর শুধু বিশ্রামে কাটানো, কেমন শোনায়?
নেই অফিস, নেই ইমেইল, নেই ক্যারিয়ারের দৌড়ঝাঁপ-শুধু নিজেকে সময় দেওয়া।
এক সময় এটা ছিল “ব্যর্থতা”র প্রতিচ্ছবি, কিন্তু আজ তা হয়ে উঠেছে আত্মউপলব্ধির পথ। এই ধরণের ধীর জীবনচর্চা এখন পুঁজিবাদী ব্যস্ততার বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লবের রূপ নিচ্ছে।

ব্রিটিশ লেখিকা এমা গ্যানন একসময় ক্যারিয়ার-ভিত্তিক ‘গার্লবস’ কালচারের প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ এক চরম বার্নআউট তাঁর জীবন পাল্টে দেয়। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, স্ক্রিনের দিকে তাকাতেও কষ্ট হতো, হাঁটতে গেলেও ক্লান্তি ছাপিয়ে যেত। এই অবস্থায় তিনি এক বছর কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরতি নেন।

এই অভিজ্ঞতাই জন্ম দেয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক দুই খণ্ডের বই “A Year of Nothing”। বইটিতে তিনি বলেছেন কীভাবে দিনগুলো কাটিয়েছেন পাখি দেখা, শিশুদের কার্টুন দেখা, জার্নাল লেখা আর ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটার মতো সহজ কিন্তু শান্তিপূর্ণ অভ্যাসে। তাঁর মতে, “ঘুম, আকাশ দেখা, হাঁটাহাঁটি -এগুলো বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের মানসিক সুস্থতার অপরিহার্য অংশ।”

‘কাজই যদি জীবনের মানদণ্ড হয়’ – এই বিশ্বাসে ধাক্কা
আজকের সমাজে ‘ব্যস্ততা’কে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হয়। কিন্তু এই ধারণার বিরুদ্ধেই দাঁড়াচ্ছে নতুন প্রজন্ম। অনেক লেখক-চিন্তক এখন বলছেন, বিশ্রামও এক ধরনের হতে পারে অগ্রগতির চালিকাশক্তি।

জেনি ওডেলের “How To Do Nothing” বইটি দেখিয়েছে, কীভাবে প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগ চুরি করছে, এবং ‘কিছু না করাও’ এক রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারে।

অলিভার বার্কম্যানের “Four Thousand Weeks” মনে করিয়ে দেয়, আমাদের জীবনের সময় সীমিত, তাই তা যেন আমরা ব্যস্ততার আড়ালে হারিয়ে না ফেলি।

“নিকসেন” নামে এক ডাচ ধারণা বলছে – ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু না করাটাই নিজেকে সময় দেওয়ার একটি পদ্ধতি।

অক্টাভিয়া রাহিম তাঁর বই “Pause, Rest, Be”–তে যোগব্যায়ামের মাধ্যমে নিজের সঙ্গে সংযোগ তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

ক্লডিয়া হ্যামন্ডের “The Art of Rest” বইয়ে দেখা যায় গবেষণালব্ধ প্রমাণ – বিশ্রাম আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কতটা জরুরি।

এই ‘মন্থরতার’ ঢেউ কোথা থেকে এলো?
এক কথায়- আমরা ক্লান্ত,খুব বেশি ক্লান্ত।
নিত্যদিনের কাজের চাপে, সোশ্যাল মিডিয়ার অপূর্ণতার প্রতিযোগিতায়, স্ক্রিনে আটকে থাকা জীবনে আমরা হাঁপিয়ে উঠেছি। কোভিড-প্যান্ডেমিক অনেককে প্রথমবারের মতো বাধ্য করেছে থামতে, নিজেকে সময় দিতে। সেখান থেকেই অনেকেই বুঝেছেন-ধীরে চলা মানে পিছিয়ে পড়া নয়।

তবে, ‘কিছু না করা’ কি সবার জন্য সম্ভব?
সমালোচকেরা বলেন, এই “বিশ্রামের জীবন” মূলত সেইসব মানুষের জন্য, যাদের আর্থিক সুরক্ষা আছে। সবকিছু ছেড়ে শুধু নিজের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ কি সবার আছে?

এই প্রশ্ন থেকেই স্পষ্ট হয় – ধীরে চলার পথও এক ধরনের প্রিভিলেজ। কিন্তু তাই বলে এই বার্তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। বরং এটি মনে করিয়ে দেয় – যতটা সম্ভব, আমাদেরও দরকার কিছুটা থেমে যাওয়া, কিছুটা বিশ্রাম, কিছুটা নিজের খেয়াল রাখা।

‘কিছু না করা’ এখন আর অলসতার প্রতীক নয়। বরং এটি হয়ে উঠছে এক সচেতন সিদ্ধান্ত -প্রযুক্তি, ব্যস্ততা, আর অকারণ চাপের বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল।
বই পড়া, গাছপালায় পানি দেওয়া, কিছু সময় নীরবে বসে থাকা-এসব আজকের দুনিয়ায় এক ধরনের বিপ্লব।

ক্লান্ত এই সময়ে, আপনি কি প্রস্তুত একটু থামতে!

 

ঈদের ভোজের পর পেট ভার? দূর করুন সহজ উপায়ে!

কুরবানির ঈদ মানেই মাংসের বাহার -রোস্ট, কাবাব, কোরমা কিংবা বিরিয়ানি! কিন্তু এতসব মজাদার খাবারের পর অনেক সময় পেট ভার, গ্যাস্ট্রিক কিংবা অস্বস্তি দেখা দেয়। মূলত ফাইবারজাতীয় খাবার কম খাওয়া ও অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত মাংস হজমে সমস্যা তৈরি করে। তাই খাওয়ার আনন্দ ঠিক রেখে, পেট সুস্থ রাখার জন্য মেনে চলুন এই সহজ ৫টি উপায়:

১.পর্যাপ্ত পানি পান করুন (তবে সময়মতো)
খাওয়ার সময় একসাথে বেশি পানি পান না করে, খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে বা পরে পানি পান করুন। এতে হজমপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং খাবার ভালোভাবে ভাঙতে সহায়তা করে। ঈদের ব্যস্ততায় পানি পানের কথা একদম ভুলে যাবেন না।

২.এক বাটি টক দই খান
মাংসজাতীয় খাবার খাওয়ার পর এক বাটি টক দই পেটের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে থাকা প্রো-বায়োটিক উপাদান অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজমে সহায়তা করে। ফলে পেট ভার ভাব অনেকটাই কমে আসে।

৩. আদা-লেবুর মিশ্রণ
আদা কুচি, কয়েক ফোঁটা লেবুর রস ও হালকা গরম পানি মিশিয়ে খেলে হজমে সহায়তা হয় এবং পেটের অস্বস্তি দূর হয়। চাইলে আদা দিয়ে হালকা চা তৈরি করে খেতেও পারেন। এটি পেটের গ্যাস দূর করতে বেশ কার্যকর।

৪. হাঁটা বা হালকা চলাফেরা করুন
খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া উচিত নয়। অন্তত ১৫–২০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করুন। এতে হজম ভালো হয়, খাবার পাকস্থলীতে জমে থাকে না এবং পেট ফাঁপা কিংবা ভার ভাব কমে।

৫. পুদিনাপাতা বা জিরা পানি পান করুন
ঈদের মসলাদার খাবার খাওয়ার পরে এক গ্লাস পুদিনা পাতা বা জিরা ভেজানো হালকা গরম পানি পান করলে হজমে আরাম মেলে। এগুলো প্রাকৃতিক হজম সহায়ক এবং পেট ঠান্ডা রাখতেও সাহায্য করে।

ঈদের আনন্দের সঙ্গে যেন হজমের অস্বস্তি না আসে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এই সহজ ৫টি স্বাস্থ্য টিপস মেনে চললে কুরবানির ঈদের মজাদার খাবারের আনন্দ নষ্ট না করেই পেটকে রাখা যাবে সুস্থ ও হালকা।

ঈদ মোবারক! 🌙🍖

 

মাতৃত্ব হোক নিরাপদ, অধিকার হোক সুরক্ষিত

 

‘মা’ এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে বিশাল এক পৃথিবী। মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়, ভালোবাসা, মমতা, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের অপর নাম। একজন নারীর জীবনে মাতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা। আর এই মাতৃত্বকাল যেন নিরাপদ হয়, সে দায়িত্ব সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র-সবার।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ২১ কোটি নারী গর্ভধারণ করেন। তাদের মধ্যে দুই কোটির বেশি নানা ধরনের জটিলতায় ভোগেন, এবং প্রায় ৮০ লাখ নারীর জীবন প্রসবজনিত কারণে হুমকির মুখে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৮০০ নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। এর বাইরেও ৭০ লাখ নারী প্রসব পরবর্তী গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় আক্রান্ত হন এবং আরও প্রায় ৫ কোটির বেশি নারী ভোগেন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায়।

বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার নারী গর্ভধারণ ও সংশ্লিষ্ট কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি লাখ জীবিত সন্তানের জন্মে ১২৩ জন মায়ের মৃত্যু হয়। আর প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন মা প্রাণ হারান প্রসবজনিত জটিলতায়।

দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোর চিত্র আরও করুণ—প্রায় ৫৩ শতাংশ নারী এখনও বাড়িতেই সন্তান প্রসব করেন, যেখানে নিরাপদ ও মান-সম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি দুর্লভ। এছাড়া নবজাতকের মৃত্যুহারও উদ্বেগজনক—প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে ২১ জন মারা যাচ্ছে।

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতের লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালে নাইরোবিতে প্রথম বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশে ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছর ২৮ মে ‘জাতীয় নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো—
মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস,

নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা,

গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ,

নারীর মাতৃত্বকালীন অধিকার প্রতিষ্ঠা।

২০২৫ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: “মাতৃস্বাস্থ্যে সমতা; বাদ যাবেনা কোনো মা”। এটি একটি সময়োপযোগী বার্তা, যা সকল শ্রেণি-পেশার নারীদের জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।

মাতৃত্বকালীন সংকটের কারণসমূহ
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতে দেশে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে:

দক্ষ মিডওয়াইফ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মীর অভাব

জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতি

প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের অভাব ও অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের বেড়ে চলা

গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকাদানের প্রতি উদাসীনতা

দরিদ্রতা ও পুষ্টিহীনতা

কর্মজীবী নারীদের উপর গর্ভকালেও কঠিন শ্রমের চাপ

পরিবার ও সমাজের অসচেতনতা

বর্তমানে দেশে প্রায় ২২ হাজার প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ প্রয়োজন, অথচ রয়েছেন মাত্র এক হাজারের মতো। ফলে নারীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে করণীয়
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

✅ গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
✅ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ
✅ প্রয়োজনীয় টিকা ও ওষুধ গ্রহণ
✅ ভারী কাজ ও মানসিক চাপ থেকে বিরত থাকা
✅ গর্ভকালীন জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ
✅ দক্ষ মিডওয়াইফ ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব
✅ প্রসব-পরবর্তী পর্যাপ্ত সেবা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা

সঙ্গে থাকতে হবে পরিবার ও সমাজের সহানুভূতি, সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

মাতৃত্বকালীন সময়ে নিরাপত্তা নারীর অধিকার—এটি যেন বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। নিরাপদ মাতৃত্ব কেবল একজন মায়ের জীবন নয়, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করে। তাই ‘মাতৃত্ব হোক নিরাপদ, অধিকার হোক সুরক্ষিত’—এই শ্লোগান হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার একত্রিত হয়ে যদি সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এ নামিয়ে আনা সম্ভব।

আমরা চাই, প্রতিটি মা যেন তার মাতৃত্বকালীন সময়টি কাটাতে পারেন সম্মান, সেবা ও নিরাপত্তার সঙ্গে।

 

ঢাকা মেডিকেলে নিকাবধারীদের জন্য আলাদা নারী শিক্ষক

 

দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজেও পরীক্ষার সময় নিকাব পরিহিত ছাত্রীদের চেহারা শনাক্তের জন্য আলাদা নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

এর আগে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সাস্ট)-এও একই রকম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা এই সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, “নিকাব পরিহিত ছাত্রীদের পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে আলাদা নারী শিক্ষক নিয়োগ একটি যৌক্তিক, শালীন ও ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল ব্যবস্থা। এটি নারীদের ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

প্রসঙ্গত, নিকাব পরিহিত অনেক ছাত্রী পরীক্ষাকেন্দ্রে চেহারা শনাক্তের সময় নানা ধরনের বিড়ম্বনা বা হেনস্তার মুখে পড়েন। অথচ আলাদা নারী শিক্ষক থাকলে সেই প্রক্রিয়া সম্মানজনক ও স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পন্ন হয়, যা পরীক্ষার্থীর জন্য মানসিক প্রশান্তি এবং শিক্ষা জীবনের স্বাভাবিকতাকে বজায় রাখতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা আশা প্রকাশ করে যে, দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এই উদ্যোগকে অনুসরণ করে পর্দানশীন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

 

আরাফাহ দিবসের গুরুত্ব-ফজিলত, জানুন কেন দিনটি এত মর্যাদাপূর্ণ!

 

ইসলামের মহিমান্বিত দিনগুলোর মধ্যে যিলহজ্জের ৯ তারিখ, অর্থাৎ আরাফাহ দিবস অন্যতম। এটি শুধুমাত্র হজ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকনই নয়, বরং এই দিনকে ঘিরে রয়েছে অগণিত বরকত, ফজিলত ও রহমত। এই দিনে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের গুনাহ মাফ করেন, দো‘আ কবুল করেন এবং অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আসুন জেনে নিই, কেন আরাফাহ দিবস এত গুরুত্ববহ এবং আমাদের কী করণীয়।

🕋 আরাফাহ দিবস : মর্যাদা ও ফজিলত
🔹 ১. ইসলামের পূর্ণতা লাভের দিন

এই দিনে কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত নাজিল হয়:

> “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসাবে মনোনীত করলাম।”
📖 [সূরা মায়েদা: ৩]

এ আয়াতটি আরাফাহ দিবসে, শুক্রবার, হজ্জের সময় নাজিল হয়েছিল। এক ইহুদি বলেছিল, “এমন আয়াত আমাদের উপর নাজিল হলে আমরা তা ঈদের দিন হিসেবে পালন করতাম।” খলীফা উমর (রাঃ) জবাবে বলেন, “আমরা জানি এটি কবে, কোথায় এবং কী অবস্থায় নাজিল হয়েছে।”
📚 বুখারী: ৪৫, ৪৬০৬

🔹 ২. এটি ঈদের দিনের অন্তর্ভুক্ত

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

> “আরাফাহ দিবস, কুরবানির দিন এবং তাশরীক-এর দিনগুলো মুসলিমদের ঈদের দিন। এগুলো খাওয়া ও পান করার দিন।”
📚 আবু দাঊদ: ২৪১৯

আরাফাহ দিবসের ফজিলত
🟢 ১. দু’বছরের গুনাহ মাফ হয়

আরাফাহ দিবসে রোযা রাখা অ-হাজীদের জন্য সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

> “আমি আশা করি এই দিনের রোযা আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।”
📚 মুসলিম: ১১৬৩

তবে হাজীরা এদিন রোযা রাখেন না, বরং আরাফাতে অবস্থান করে দো‘আ, যিকর ও ইবাদতে সময় অতিবাহিত করেন।

🟢 ২. জাহান্নাম থেকে মুক্তির সবচেয়ে বড় দিন

> “আল্লাহ তাআলা আরাফার দিনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, ‘দেখো, আমার বান্দারা ধুলায় ধূসরিত হয়ে এসেছে, তারা কী চায়?’”
📚 মুসলিম: ১৩৪৮, ইবনু মাজাহ: ৮১

🟢 ৩. দো‘আ কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

> “সবচেয়ে উত্তম দো‘আ হল আরাফাহ দিবসের দো‘আ। আর আমি ও আগের নবীরা যেটা বলেছি তা হলো—
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ”
📚 তিরমিযী: ২৮৩৭

এই যিকর বারবার বলা, আল্লাহর প্রশংসা করা ও নিজের জন্য এবং উম্মাহর জন্য দো‘আ করা এই দিনে অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ।

আমাদের করণীয়
🔸 যারা হজ্জ করছেন না, তারা এদিন রোযা পালন করবেন।
🔸 যিকর-আযকার বেশি বেশি করবেন।
🔸 তওবা ও ইস্তিগফার করবেন।
🔸 দো‘আ ও কান্নাকাটি করে আল্লাহর রহমত চাইবেন।

আরাফাহ দিবস শুধু হজ্জ পালনকারীদের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের সব মুসলমানের জন্য এটি এক অপার ফযীলতের দিন। আসুন আমরা এই দিনের গুরুত্ব অনুধাবন করে, যথাযথ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি।

 

কুরবানির ইতিহাস ও গুরুত্ব

ইসলামে কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত, যার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয় বরং আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ। কুরবানি ঈদুল আজহার মূল ভিত্তি, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার বার্তা নিয়ে আসে।

কুরবানির ইতিহাস
কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদায় হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানির কাহিনি বর্ণিত হয়েছে:
“তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের কাহিনী যথাযথভাবে শুনাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানি করেছিল। তাদের একজনের কুরবানি কবুল হল এবং অন্যজনেরটা কবুল হল না। সে বলল- অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব।
অপরজন বলল -আল্লাহ শুধু মুত্তাকীদের কাছ থেকেই কবুল করেন।” (সূরা মায়েদা: ২৭)

পরবর্তী সময়ে কুরবানির চূড়ান্ত রূপ ও তাৎপর্য প্রকাশ পায় হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনে। আল্লাহ তাকে আদেশ করেন স্বপ্নে পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করতে।
“অতঃপর যখন সে (ইসমাইল) পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন সে বলল, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন তুমি চিন্তা করো, তোমার মত কী? সে বলল, হে পিতা! আপনি যা আদেশ পাচ্ছেন তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন।” (সূরা ছাফফাত: ১০২)
“আর আমি তার পরিবর্তে একটি মহান কোরবানি দান করলাম।” (সূরা ছাফফাত: ১০৭)

কুরবানির শরয়ী গুরুত্ব
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানি একটি ওয়াজিব ইবাদত। ঈদুল আজহার দিনগুলোতে সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য এটি আদায় করা অপরিহার্য। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” (মুসনাদে আহমাদ)

কোরআনে আল্লাহ বলেন,
“তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো এবং কুরবানি করো।” (সূরা কাউসার: ২)
এই নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, কুরবানি নিছক একটি সামাজিক উৎসব নয় বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত হিসেবে এটি আজও বহাল আছে। হাদিসে এসেছে, “এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” (ইবনে মাজাহ)

কুরবানির ফজিলত
রাসুল (সা.) বলেন:
“আল্লাহর কাছে কুরবানির দিন মানবজাতির কোনো আমলই কুরবানির চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। তাই তোমরা খুশিমনে কুরবানি করো।” (তিরমিজি)

যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণনা করেন, সাহাবারা জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসুল! কুরবানি কী?” তিনি বলেন, “এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” সাহাবারা আবার জিজ্ঞেস করেন, “এতে আমাদের কী পুরস্কার আছে?” তিনি বলেন, “প্রতিটি পশমের জন্য একটি করে নেকি।” (মিশকাত)

তাকওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক:
আল্লাহ বলেন,
“তাদের গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ: ৩৭)
আরও বলেন,
“বল, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবকিছুই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর জন্য।” (সূরা আন’আম: ১৬২)

এই ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুমিন তার আত্মাকে খাঁটি করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভালোবাসার বস্তু ত্যাগ করে এবং জীবনের প্রতি মোহ কমিয়ে তাকওয়ার পথে অগ্রসর হয়। এটি কেবল পশু জবাই নয়, বরং আত্মিক পশুত্ব জবাইয়ের এক প্রকৃত ইবাদত।

কুরবানির সামাজিক প্রভাব
কোরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক প্রভাব। কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে সহানুভূতি, সাম্য ও ঐক্যের চর্চা হয়। ধনী ও গরিবের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত হয় এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে কিছু মানুষ কুরবানিকে কেবল সামাজিক রেওয়াজ, স্ট্যাটাস দেখানো বা পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখে। কিন্তু ইসলাম কুরবানিকে ত্যাগ, সহানুভূতি ও তাকওয়ার উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে গরিবের মুখে হাসি ফোটে, ধনী-গরিবের মাঝে বন্ধন সৃষ্টি হয় এবং মুসলিম সমাজে সাম্যবোধ জাগ্রত হয়।

কুরবানির শর্ত ও মাসআলা
১. কুরবানি শুধুমাত্র ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত করতে হবে।
২. যে ব্যক্তির কাছে কুরবানির তিনদিনে (১০-১২ জিলহজ) যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব।
৩. পশু হতে হবে নির্ধারিত বয়সের: গরু ও মহিষ দুই বছর, ছাগল ও ভেড়া এক বছর।
৪. কুরবানির পশু যেন দৃষ্টিগোচর ত্রুটিমুক্ত ও সুস্থ হয়।
৫. কুরবানি নিজ হাতে করা উত্তম, না পারলে উপস্থিত থেকে অন্যের মাধ্যমে করানো।
৬. কুরবানির গোশত গরিব, আত্মীয় ও নিজের মধ্যে বণ্টন করা সুন্নত।
৭. যে ব্যক্তি কুরবানির নিয়ত করবে সে যেন কুরবানির আগ মুহুর্ত পর্যন্ত নখ,চুল বা শরীরের পশম না কাটে

কুরবানি একটি বহুমাত্রিক ইবাদত, যার ভেতর আছে ইতিহাস, শিক্ষা, আত্মিক শুদ্ধি ও সামাজিক কল্যাণ। এটি পালন করতে হবে বিশুদ্ধ নিয়তে, শরিয়তের নির্দেশনা মেনে। বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, বরং অন্তরের খাঁটি ইমান ও তাকওয়ার সঙ্গে কুরবানি করলে তবেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে।

আসুন, আমরা সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যথাযথভাবে কুরবানি আদায় করি, তাকওয়ায় পরিপূর্ণ জীবন গঠন করি, এবং আমাদের পরিবার, সমাজ ও উম্মাহকে কুরবানির মাধ্যমে ঐক্য ও সহানুভূতির পথে পরিচালিত করি।

আরওয়াহ আনাম

 

কোরবানির ঈদে ঝামেলা কমাতে আগেই সংরক্ষণ করুন সবধরনের মসলা

কোরবানির ঈদ মানেই ঘরে ঘরে মাংসের নানা পদ রান্না। আর এইসব সুস্বাদু রান্নার আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে সঠিক মসলা ব্যবহারে। তবে সময় বাঁচাতে ও রান্নার ঝামেলা কমাতে মসলা আগে থেকেই সংরক্ষণ করে রাখা অত্যন্ত কার্যকর। মসলা যদি ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে তার গন্ধ, স্বাদ ও কার্যকারিতা দীর্ঘদিন পর্যন্ত অটুট থাকে। তাই রান্নাঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো কীভাবে দীর্ঘদিন ভালো রাখা যায়, তা জানা জরুরি।

শুকনা মসলা সংরক্ষণ
১. বাতাসরোধী কাঁচের বোতলে রাখুন।
শুকনা মরিচ গুঁড়া, ধনে, জিরা, গরম মসলা ইত্যাদি কাঁচের বা ফুড-গ্রেড প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষণ করুন।

➡️ টিপস: মসলা ব্যবহারের সময় চামচ অবশ্যই শুকনো রাখবেন।

২. শুকনা ও ঠাণ্ডা জায়গায় রাখুন।
রান্নাঘরের চুলার পাশে রাখবেন না। আলো ও গরমে মসলার ঘ্রাণ ও গুণ নষ্ট হয়।

৩. ফ্রিজে রাখা যায় কিছু মসলা।
গরমের সময় মরিচ গুঁড়া বা হলুদ গুঁড়া ফ্রিজের ড্রায়ার বক্সে রাখা যায়। এতে পোকামাকড় বা ঘাম জমে না।

🧄 বাটা মসলা সংরক্ষণের পদ্ধতি।
১. আদা-রসুন বাটা সংরক্ষণ
সম পরিমাণ আদা ও রসুন বেটে হালকা তেলে ভেজে নিন।

ঠাণ্ডা হলে কাচের বোতলে ভরে ফ্রিজে রাখুন।

৭-১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে।

২. মরিচ বাটা
কাঁচা মরিচ বেটে সামান্য লবণ দিয়ে ছোট কন্টেইনারে রাখুন।

আলাদা আলাদা ভাগে ফ্রিজে রাখলে প্রতিবার পুরোটা বের করতে হয় না।

৩. ফ্রিজিং (আইস কিউব ট্রিক)
আদা, রসুন, পেঁয়াজ বা কাঁচা মরিচ বেটে আইস কিউব ট্রেতে রেখে ফ্রিজে দিন।

জমে গেলে বের করে জিপলক ব্যাগে রেখে দিন।

ব্যবহারের সময় একটি কিউব বের করলেই হবে।

✅ সংরক্ষণের সময় কিছু অতিরিক্ত টিপস:

যেকোনো পাত্রে রাখার আগে অবশ্যই তা শুকনো ও পরিষ্কার রাখবেন।

বেশি সময়ের জন্য সংরক্ষণ করতে চাইলে একটু তেল বা ভিনেগার মিশিয়ে নিলে ভালো থাকে।

ব্যাচ ধরে মসলা বানান, যেন পুরোনোটা শেষ না করে নতুনটা খোলা না হয়।

মসলা শুধু খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। তাই মসলাগুলো যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা দরকার, যাতে সময়, পরিশ্রম ও খরচ—তিনটিই সাশ্রয় হয়। উপযুক্ত উপায়ে সংরক্ষিত মসলা আপনার রান্নাকে করে তুলবে আরও সুস্বাদু ও প্রাণবন্ত। আশাকরি এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে আপনি কুরবানির পরও দীর্ঘদিন মসলার আসল স্বাদ উপভোগ করতে পারবেন।

 

ডা.তাসনিম জারা:নেতৃত্বের মঞ্চে নতুন মাত্রা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে একটি ব্যতিক্রমধর্মী নাম বারবার আলোচনায় আসছে—ডা. তাসনিম জারা। চিকিৎসক, শিক্ষক, স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ও এখন একজন রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে তার উত্থান শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং অনুপ্রেরণাদায়কও।

ডা. তাসনিম জারার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে, যেখান থেকে তিনি MBBS ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “এভিডেন্স-বেইজড হেলথ কেয়ার” বিষয়ে MSc ডিগ্রি অর্জন করেন ডিস্টিংকশনের মাধ্যমে। এরপর যুক্তরাজ্যের RCOG থেকে DRCOG ও Royal College of Physicians থেকে MRCP ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি Higher Education Academy UK-এর অ্যাসোসিয়েট ফেলো হিসেবেও স্বীকৃত।

বর্তমানে ডা. জারা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ইন্টারনাল মেডিসিনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছেন এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ম ও ৬ষ্ঠ বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়ান। এই বৈশ্বিক পর্যায়ের ক্যারিয়ারের মাঝেও তিনি বাংলা ভাষাভাষী জনগণের জন্য কনটেন্ট নির্মাণে ব্যস্ত ছিলেন। তার তৈরি স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিওগুলো কোটি কোটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি “সহায় হেলথ” নামে একটি প্ল্যাটফর্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা বাংলাভাষায় প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা তথ্য সহজভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়। কোভিড-১৯ এর সময় তার সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি ২০২১ সালে ব্রিটিশ সরকারের ‘ভ্যাক্সিন লুমিনারি’ স্বীকৃতি লাভ করেন।

এই ব্যতিক্রমী মেধাবী মানুষটি এখন সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলটির আনুষ্ঠানিক যাত্রার সময় থেকেই তিনি নেতৃত্বের প্রথম সারিতে রয়েছেন।

রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি যখন নিজ দলেরই উত্তরাঞ্চলের এক নেতার বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, অনেকেই বিষয়টি হালকা ভাবে নিয়েছিলেন। কিন্তু এতে প্রকাশ পেয়েছে—ডা.জারা দলগত রাজনীতির ভেতর থেকেও জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার পক্ষে অবস্থান নিতে সাহস রাখেন। এমন অবস্থান সচরাচর দেখা যায় না।

অনেকেই বলে থাকেন, রাজনীতি সবার জন্য নয়। কিন্তু ডা. তাসনিম জারা যেভাবে তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, একাডেমিক কৃতিত্ব এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন, তা নিঃসন্দেহে এক নতুন ধারার সূচনা করছে।

একজন তরুণী, যিনি ইউকের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনের বাইরে এসে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কাজ করছেন, তার প্রতি আমাদের সমর্থন থাকা উচিত। তাকে নিয়ে কুৎসা রটানো বা ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে তার কাজ ও উদ্দেশ্যকে মূল্যায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।

আমরা আশা করি, ডা. তাসনিম জারার এই যাত্রা নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার পথেই চলবে। তিনি যেন হয়ে ওঠেন এক অনন্য উদাহরণ—যেখানে একজন নারী, একজন চিকিৎসক ও একজন শিক্ষকের সম্মিলিত রূপে দেশ ও জাতির জন্য কিছু করে যেতে পারেন।

#DrTasnimJara #বাংলাদেশের_নারী #রাজনীতিতে-নারী #WomenInLeadership #HealthcareToPolitics #womensupportingwomen #InspiringBangladeshi #OxbridgeToPolitics

 

ঢাবিতে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার আত্মপ্রকাশ: নারীদের অধিকার আদায়ে নতুন পদক্ষেপ

 

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রীসংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সূচনা করেছে। ২০২৫ সালের ২৮ মে, সংগঠনটির সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করেন, যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়।

স্মারকলিপিতে যেসব দাবিগুলো তুলে ধরা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সহজলভ্যতা

পর্যাপ্ত কমনরুম, নামাজরুম ও ওজুখানার ব্যবস্থা

মাতৃত্বকালীন সময়ে সহযোগিতা প্রদান

আবাসন সংকট নিরসন ও জরুরি প্রয়োজনে হলে প্রবেশাধিকার

যৌন হয়রানিমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিতকরণ

মেডিকেল সহায়তা এবং হলভিত্তিক ওষুধের প্রাপ্যতা

ঢাবি শাখার সভানেত্রী সাবিকুন্নাহার তামান্না জানান, “দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নতুন করে কাজ শুরু করি। বর্তমানে আমরা শাখা পর্যায়ে কাঠামো গঠন করতে সক্ষম হয়েছি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”

সেক্রেটারি আফসানা আক্তার বলেন, “নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সম্মানজনক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছি। ইসলামী ছাত্রীসংস্থা অতীতেও নারীদের অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, ভবিষ্যতেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।”

ইসলামী মূল্যবোধ, নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা ও নারী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সংগঠনের এই নতুন যাত্রা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না—
আপনি কি মনে করেন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামভিত্তিক সংগঠনগুলোর কার্যকর উপস্থিতি শিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে?

বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে নারী শিক্ষার্থীরা কোন কোন সমস্যায় বেশি ভুগছেন বলে আপনি মনে করেন? সমাধানে কী কী উদ্যোগ নেওয়া উচিত?

একটি ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বে নারী শিক্ষার্থীদের দাবি তুলে ধরা কি সময়ের দাবি নয়? আপনি কি এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন?

আপনি কি মনে করেন, নামাজরুম, কমনরুম, মাতৃত্বকালীন সহায়তা ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রশাসনের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা উচিত?

একজন সচেতন মুসলিম নাগরিক হিসেবে আপনি নারী নেতৃত্বে ইসলামী সংগঠনের এমন উদ্যোগকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

 

দাসত্বের শিকল ছিঁড়ে যারা স্বপ্ন দেখে:ছোট্ট ইকবাল মাসীর গল্প

 

পৃথিবীতে কিছু গল্প থাকে, যেগুলো উপন্যাস নয়, সিনেমাও নয়—তবু সেগুলো বাস্তবতার এমন নির্মম অধ্যায় হয়ে ওঠে, যা পাঠক বা শ্রোতার মনজগত কাঁপিয়ে দেয়। তেমনই এক ছোট্ট বালকের নাম ইকবাল মাসী— বয়স ছিল মাত্র বারো, অথচ লক্ষ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখার মত সাহস বুকে নিয়ে যার বেড়ে উঠা।

ইকবালের জন্ম ১৯৮৩ সালে পাকিস্তানের লাহোরে। মা মারা যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক টানাপড়েন চরমে ওঠে। তার বাবা মাত্র ৮০০ রুপি বা ৮ ডলারের বিনিময়ে মাত্র চার বা পাঁচ বছর বয়সেই ইকবালকে এক কার্পেট কারখানায় বিক্রি করে দেন। শুরু হয় দাসত্বের জীবন—দিনে ১৪-১৬ ঘণ্টা কাজ, হাতের ছোট আঙুল দিয়ে গাঁথতে হতো সূক্ষ্ম সুতো, পায়ে পড়তো শিকল যাতে পালাতে না পারে। খাবার অপ্রতুল, নিদ্রা সীমিত, স্বাস্থ্যহীনতা নিত্যসঙ্গী।

কিন্তু মানুষ শুধু মাংস আর হাড়ের কাঠামো নয়, মনের ভিতর একটি আশ্চর্য আলো থাকে। ১০ বছর বয়সে ইকবাল সেই আলোকে সঙ্গী করে পালিয়ে যায় বন্দিদশা থেকে। দুর্ভাগ্যবশত ধরা পড়ে আবারও বিক্রি হয়। এবার মূল্য ১০ ডলার, আর কাজ বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি সপ্তাহে ১৪০ ঘণ্টা।

তবুও ইকবালের মনের আগুন নিভে যায় না। একদিন আবারও পালিয়ে যায়, সিনেমার মতই এক মানব-ময়লার নালার ভিতর দিয়ে। আশ্রয় নেয় একটি এতিমখানায়, সেখান থেকে একজন সদয় মানুষ, হাফেজ ইব্রাহিম, তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। অসাধারণ মেধাবী ইকবাল মাত্র দুই বছরে প্রাইমারি শিক্ষার পাঁচ বছরের পাঠ শেষ করে।

স্কুল জীবনেই সে যুক্ত হয় Bonded Labour Liberation Front (BLLF) নামের এক সংগঠনের সঙ্গে। এই সংগঠনের হয়ে ইকবাল নিজের কণ্ঠকে করে তোলে হাজার হাজার শিশুর কণ্ঠস্বর। বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শিশুদের মুক্ত করার জন্য কাজ করে। তার নেতৃত্বে প্রায় ৩,০০০ শিশু শ্রমিক মুক্তি পায় দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে।

ইকবালের কণ্ঠ বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Reebok Human Rights Award তাকে সম্মানিত করে। সেখানে ইকবাল বলে “আমার স্বপ্ন হলো, বিশ্বের কোনো শিশু যেন আর দাসত্বে বন্দি না থাকে। কোনো শিশু যেন স্কুলের জায়গায় কারখানায় কাজ করতে বাধ্য না হয়।”

ইকবালের এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতো যেখানে শিশুরা বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাবে, কাঁটা-সুতোয় নয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে যখন তার আন্দোলন তুঙ্গে, যখন সে বোস্টন থেকে লাহোরে ফিরে আসে—১৯৯৫ সালের ১৬ এপ্রিল, দুর্বৃত্তদের গুলিতে চিরতরে থেমে যায় ইকবাল। মাত্র ১২ বছর বয়স,হ্যাঁ মাত্র ১২।

এই ছোট্ট কিশোরটি যদি বেঁচে থাকত, আজ তার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে যেতো। হয়তো আরও ৪০ হাজার শিশু মুক্তি পেতো তার হাত ধরে। তার অকালমৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানিই নয়, একটি সম্ভাবনার মৃত্যু।

তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তর প্রবর্তন করে “The Iqbal Masih Award for the Elimination of Child Labor”—যা প্রতিবছর শিশু শ্রম প্রতিরোধে অবদান রাখা সাহসী কর্মীদের দেওয়া হয়।

আজ যেখানে আমরা এক মিনিটের কাল্পনিক বিনোদন চিত্রে মেতে উঠি অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিনেমা,অথচ সবচেয়ে সাহসী স্ক্রিপ্ট জন্ম নেয় বাস্তবের বুক চিরে।
এই ছোট্ট নীরব হিরোর আত্মবলিদান যেন ভুলে না যাই।ইকবালের এই ত্যাগ বয়ে যাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

 

গর্বিনী মা সম্মাননায় ভূষিত ১২ জন মা

 

বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ‘গরবিনী মা ২০২৫’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ১২ জন গর্বিনী মা। সন্তানদের গঠন ও সফলতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁদের এই সম্মাননা প্রদান করে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

রোববার (১১ মে) ঢাকার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে এ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি ছিল ‘গরবিনী মা’ সম্মাননার দশম বার্ষিক আয়োজন।
সম্মাননায় ভূষিত মায়েরা হলেন—
মনোয়ারা বেগম (নাসরীন আফরোজের মা), রেজীয়া বেগম (বিচারক রেজাউল করিমের মা), রেজিয়া খাতুন (তানজীমউদ্দিন খানের মা), আয়েশা আক্তার (হুসনে আরা শিখার মা), ফরিদা আফরোজা (কাজী নুসরাত এদীবের মা), রাজিয়া কাদের (সরদার এ নাঈমের মা), হাজেরা বেগম (প্রকৌশলী সাইফুল বারির মা), রাজিয়া খাতুন (মাহফুজুর রহমানের মা), লুৎফুন্নাহার লুৎফা (সংগীতশিল্পী কনার মা), লায়লা রহমান (অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুর মা), কানিজ ফাতেমা (অভিনেতা আবদুন নূর সজলের মা) এবং শ্রীমতী শৈল বালা (বর্ষা রানীর মা)।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “জীবনে যা কিছু অর্জন করেছি, সব মায়ের দোয়ায়। মা বেঁচে থাকলে আজকের এই অবস্থানে আমাকে দেখে গর্ব করতেন।”

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, “প্রতিটি দিনই মা দিবস। নারীরা এখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছেন।”
সম্মাননাপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে এনএসডিএ’র নির্বাহী চেয়ারম্যান নাসরীন আফরোজ বলেন, “আমার জীবনের সব অর্জনের পেছনে মায়ের ত্যাগ রয়েছে। খুব কম বয়সে মা আমাদের বড় করার দায়িত্ব নেন।”
বিচারক রেজাউল করিম অনুষ্ঠানে বলেন, “মায়ের পাশাপাশি বাবাদেরও সম্মানিত করা উচিত।”
তানজীমউদ্দিন খান মাকে “সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক” আখ্যায়িত করেন।
ছাত্রবৃত্তিপ্রাপ্ত বর্ষা রানী জানান, তাঁর মা সংসার চালাতে মানুষের বাসায় কাজ করতেন, অনেক সময় নিজে না খেয়ে তাঁকে খাওয়াতেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “সব মাকে সম্মান জানানো সম্ভব না হলেও তাঁদের ত্যাগকে স্মরণ করিয়ে দিতেই আমাদের এই আয়োজন।”
সঞ্চালনায় ছিলেন শান্তা জাহান। বক্তব্য দেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সম্মাননার প্রধান উদ্যোক্তা আশীষ কুমার চক্রবর্তী। তিনি জানান, ২০১৪ সাল থেকে প্রতিবছর এই সম্মাননা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

নাঙ্গেলির আত্মত্যাগ বনাম আধুনিক প্রদর্শনবাদ: কোনটা প্রকৃত সাহস?

 

ইতিহাসের পাতাজুড়ে নারীর মর্যাদা ও অধিকার বারবার পদদলিত হয়েছে সামাজিক শোষণ, ধর্মীয় কুসংস্কার ও শ্রেণিবৈষম্যের কারণে।
তেমনি এক নির্মম ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় দক্ষিণ ভারতের বর্তমান কেরালা রাজ্যের চের্থালা অঞ্চলের এক লজ্জাজনক কর প্রথার, যার নাম ছিল ”মুলাক্কারম” বাংলায় যাকে বলা যায় “স্তন কর”।

ঔপনিবেশিক আমলের পূর্বে তৎকালীন সমাজে নিম্নবর্ণের নারীদের যদি নিজেদের স্তন ঢেকে রাখতে হতো, তবে তাদের দিতে হতো কর। স্তনের আকার অনুযায়ী করের পরিমাণ নির্ধারিত হতো—যত বড় স্তন, তত বেশি কর! যারা কর দিতে পারত না, তাদের জনসমক্ষে স্তন অনাবৃত রাখা ছিল বাধ্যতামূলক।
এই অমানবিক ও অবমাননাকর প্রথা নারীর শরীরকে পণ্য ও করযোগ্য সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল।

এই অপমানজনক করব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এক সাহসিনী নাঙ্গেলি। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ নিম্নবর্ণের নারী, কিন্তু সাহস ছিল হাজারো মানুষের চেয়েও বেশি।
যেদিন জমিদারের লোক কর আদায়ে তার বাড়িতে আসে, নাঙ্গেলি ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসেন হাতে নিজের কাটা দুই স্তন নিয়ে।
রক্তাক্ত সেই দৃশ্য দেখে জমিদারের লোকজন আতঙ্কে পালিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেদিনই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নাঙ্গেলির এই আত্মত্যাগ শুধু একটি অন্যায় প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং নারীর মর্যাদা, সম্মান ও স্বাধীনতার সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে সমাজকে।
তার মৃত্যুর পরপরই মুলাক্কারম প্রথা বাতিল হয়।
কিন্তু ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায় একটি প্রশ্ন—
নারীর শরীর কি সমাজের সম্পদ? নাকি তার ব্যক্তিগত সম্মান?

এখন দেখি ইসলাম কী বলে?
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর শরীর করযোগ্য বা অন্যের সম্পত্তি কিংবা প্রদর্শনযোগ্য কোনো বস্তু নয়, বরং তার সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষা করা সব মানুষের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ইসলাম নারীর মর্যাদাকে ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কুরআনে বলা হয়েছে—

> “হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের উপর চাদরের (জিলবাব) একটি অংশ নামিয়ে দেয়। এটি তাদের চেনার জন্য সহজ এবং উত্ত্যক্ত না হওয়ার জন্য উত্তম।”
(সূরা আহযাব, আয়াত ৫৯)

ইসলামে পর্দার বিধানের কারণে নারীদের অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই, বরং এটি নারীর সুরক্ষায় এবং তাকে সম্মানিত করার এক চমৎকার মাধ্যম।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীর শরীর কর আরোপের বা প্রদর্শনের বস্তু নয়, বরং তা গোপন রাখার ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সমাজের এবং নারীর নিজস্ব অধিকার।

কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য—
নাঙ্গেলির আত্মত্যাগের শতাব্দী পেরিয়ে এসেও বর্তমান সমাজে নারীদের একটি শ্রেণি শরীরকে আবারও উপস্থাপন করছে প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে।
‘আমার শরীর আমার অধিকার’, ‘পোশাকের স্বাধীনতা’র নামে চলছে শরীর প্রদর্শনের এক প্রকার মহড়া।

কিছু নারী মনে করেন, শরীর দেখানোই স্বাধীনতা কিংবা সাহস।
অথচ প্রকৃত সাহস দেখিয়েছিলেন সেই নারী নাঙ্গেলি, যিনি নিজের স্তন কেটেছিলেন তা দেখানোর জন্য নয়, বরং ঢাকার অধিকার রক্ষায়।

আজ প্রশ্ন উঠতেই পারে—
নারীর স্বাধীনতা কি নিজেকে উন্মুক্ত করা?
নাকি নিজেকে সম্মানের সঙ্গে গুটিয়ে রাখা?

পছন্দমতো পোশাক পরা নারীর অধিকার বটে, তবে সেটি যেন আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সংবেদনশীলতার সীমা অতিক্রম না করে।
সত্যিকারের শক্তি হলো নিজেকে সংযত রাখা, আত্মমর্যাদায় দৃঢ় থাকা-
যেমন ছিলেন নাঙ্গেলি, যেমন শিক্ষা দেয় ইসলাম।

লেখকঃ আরওয়া আনাম

 

পেশা ও নেশায় ফটোগ্রাফি: মৌসুমি সিরাজ স্মৃতির গল্প

বর্তমান সময়ে নারীরা শুধু সাংবাদিকতাই নয়, ফটোগ্রাফির মতো চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্রেও নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছেন। তেমনি একজন উল্লেখযোগ্য নাম মৌসুমি সিরাজ স্মৃতি। তাঁর ক্যামেরায় বন্দি হওয়া পাখি ও বন্যপ্রাণীর ছবি দেশের জাতীয় পত্রিকা ছাড়াও ভারতের বহু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অর্জন করেছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা।

ছোট ভাইয়ের হাতে পুরোনো একটি ক্যামেরা দেখেই ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় স্মৃতির। শৈশবে আঁকাআঁকির প্রতি ভালোবাসাই ধীরে ধীরে গড়িয়েছে ছবির ভাষায় কথা বলার দিকে। পারিবারিক একটি সাধারণ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার যাত্রা শুরু করলেও, সময়ের সাথে নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে। এখন তিনি স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে গড়া ছোট্ট পরিবারে থাকেন, পেশায় পূর্ণকালীন ফটোগ্রাফার।

স্মৃতি মূলত ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফিতে পারদর্শী। শুরুতে নিজেই ছবি তুলতে তুলতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তারপর অনলাইন ও সরাসরি বিভিন্ন কোর্স করে নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলেন। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে সফল হতে হলে প্রয়োজন ধৈর্য, মনোযোগ আর সত্যিকারের ভালোবাসা।

দেশের প্রধান দৈনিক পত্রিকাগুলোতে তাঁর ছবি নিয়মিত প্রকাশিত হয়। একক প্রদর্শনী না করলেও তিনি অংশ নিয়েছেন অনেক যৌথ প্রদর্শনীতে—দেশে যেমন, তেমনি বিদেশেও; ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, এমনকি ইতালিতেও।

নিজেকে কখনো “সফল” দাবি না করলেও, সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করেন। স্মৃতির মতে, তাঁর এ পর্যায়ে আসার পেছনে তিনটি মূল গুণ: ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম, এবং সমালোচনায় মন না দেওয়া।

স্মৃতি মনে করেন, ভালো ছবি তুলতে হলে শুধু ভালো ক্যামেরা থাকলেই হবে না; জানতে হবে কারিগরি দিকগুলোও। যাঁরা শুরু করছেন, তাঁদের একজন অভিজ্ঞ মেন্টরের কাছে পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রথমে একা একা বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতেন। পরে তাঁর সঙ্গে পুষ্পিতা, রেহনুমা, লাবণ্য ও সোফিয়া জামান নামে আরও কিছু তরুণী যুক্ত হন। এভাবে একটি নারীকেন্দ্রিক দল গড়ে ওঠে, যারা দলবেঁধে বিভিন্ন এলাকায় পাখি দেখতে ও ছবি তুলতে যান—এ ধরনের উদ্যোগ এখনো দেশে বিরল।

স্মৃতির স্বপ্ন একদিন তাঁর তোলা ছবিগুলো নিয়ে একটি একক প্রদর্শনী করার। পাশাপাশি তিনি একটি ফটোগ্রাফি স্কুল গড়ে তুলতে চান, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ফটোগ্রাফিই নয়, বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনও হবে।

 

গরমে সর্দি-কাশি-জ্বর? প্রতিরোধে ঘরোয়া টোটকা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

 

প্রচণ্ড তাপদাহে জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। সূর্যের প্রখর তাপে শুধু গরমই নয়, শরীরও পড়ছে চাপে। ফলে বাড়ছে সর্দি, কাশি, জ্বরসহ নানান শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষেরা আছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তন ও অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেকেই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, টনসিল, ফ্যারিঞ্জাইটিস, সাইনোসাইটিস এমনকি অ্যাজমা বা নিউমোনিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

কেন এই সময়ে ঝুঁকি বেশি?
গরমে ঘাম ও ডিহাইড্রেশনের ফলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভাইরাল ইনফেকশন সহজেই আক্রমণ করে। শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, গরমে সচেতন না হলে সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর থেকেও বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে। এজন্য দরকার জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন।

সুস্থ থাকতে যেগুলো মেনে চলবেন:
প্রচুর পানি ও তরল পান করুন: শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে স্যুপ, ডাবের পানি, লেবু শরবত ও ওআরএস পান করুন।

সহজপাচ্য ও হালকা খাবার খান: তৈলাক্ত ও ঝাল খাবার এড়িয়ে হালকা খাবার গ্রহণ করুন, প্রয়োজনে দিনে বারবার খান।

প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নিন: জ্বর বা দুর্বলতা অনুভব করলে বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিদিন গোসল করুন: অতিরিক্ত ঘাম হলে শীতল রাখতে গোসল উপকারী।

হালকা রঙের সুতির পোশাক পরুন: এতে ত্বক ও শরীর উভয়ই সজীব থাকবে।

দুপুর ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত রোদে বের হওয়া এড়ান।

উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: তিন দিনের বেশি জ্বর, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, মাথা ঘোরা, চোখ বসে যাওয়া ইত্যাদি ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ—এসব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

ঘরোয়া উপায়ে প্রতিরোধ:
১. নারকেল তেল:
নারকেল তেলে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান থাকায় এটি ঠান্ডা-কাশি থেকে মুক্তি দিতে পারে। এটি শরীরের ফ্যাট কমাতেও সহায়ক। তবে অবশ্যই খাঁটি নারকেল তেল ব্যবহার করুন।

২. আদা ও আমলকি:
আদা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণে গলা ও বুকে জমা ঠান্ডা দূর করতে কার্যকর। আমলকি ভিটামিন ‘সি’-এর উৎস। প্রতিদিন সকালে ৩০ মি.লি. আমলকির রসের সঙ্গে এক চা চামচ আদার রস মিশিয়ে পান করলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

৩.দুই কাপ পানিতে কিছু আদা কুচি সেদ্ধ করে এর সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে খেলে গলার খুসখুসে ভাব কমে এবং গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া উপশম হয়।

গরমের এই সময়টাতে সাবধানতা এবং প্রাকৃতিক উপায়ে যত্নই পারে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে সুস্থ রাখতে। প্রতিদিনের ছোটখাটো যত্ন আর সঠিক খাদ্যাভ্যাসে আপনি হয়ে উঠতে পারেন রোগমুক্ত,সতেজ ও প্রাণবন্ত।

 

জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমল ও ফজিলত

পবিত্র জিলহজ মাস ইসলামের অন্যতম বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ মাস। এই মাসে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ইবাদত হজ্ব পালিত হয় এবং মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কুরবানি করে থাকে। এ মাস তাকওয়া, আত্মত্যাগ,আত্মসমর্পণ এবং ইবাদতের এক বিশেষ মৌসুম, যার মধ্যে প্রথম দশ দিনকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

وَالفَجرِ .وَلَيَالٍ عَشرٍ
শপথ ফজরের এবং দশ রাতের।
(সূরা ফজর: ১-২)

মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে “দশ রাত” দ্বারা জিলহজের প্রথম দশ দিন বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে ইবনু কাসীর)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“আল্লাহর কাছে নেক আমল করার জন্য বছরের কোনো দিন এই দশ দিনের চেয়ে প্রিয় নয়।”
সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করাও না?”
তিনি বললেন: “না, তবে সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হয়ে আর কিছুই ফিরে আনেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়েছে)।”
(সহিহ বুখারি: ৯৬৯)

জিলহজের প্রথম দশ দিনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল
১. অধিক পরিমাণে তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ পাঠ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“তোমরা এই দশ দিনে বেশি বেশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদু লিল্লাহ’ পড়ো।”
(মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬)

তাশরিকের তাকবির:

الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله، والله أكبر، الله أكبر، ولله الحمد
এই তাকবির ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে একবার বলা ওয়াজিব।

২. রোজা রাখা (বিশেষ করে ৯ জিলহজ – আরাফার দিন)।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“আরাফার দিনের রোযা বিগত এক বছরের এবং আগামি এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।”
(সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

৩. কুরবানি করা (১০-১২ জিলহজ)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“তুমি তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানি করো।”
(সূরা কাউসার: ২)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“মানুষের কোনো আমল আল্লাহর কাছে কুরবানির দিনে রক্ত ঝরানোর চেয়ে অধিক প্রিয় নয়।”
(তিরমিজি: ১৪৯৩)

৪. কুরবানির নিয়তে চুল ও নখ না কাটা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“যে ব্যক্তি কুরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করে, সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানির দিন পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটে।”
(সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)

৫. অন্যান্য নফল ইবাদত ও নেক আমল।

এই দশ দিনে সকল নেক আমলের ফজিলত বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তাই যতটা সম্ভব নিচের আমলগুলো করা উচিত:
-নফল নামাজ

-কুরআন তিলাওয়াত

-অধিক পরিমাণে জিকির-আজকার

-ইস্তিগফার (তওবা)

-সালাতুত তাসবিহ

-দান-সদকা

জিলহজের প্রথম দশ দিন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। এ সময়টিতে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অপূর্ব সুযোগ লাভ করি। তাই এই দশ দিন যেন আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও জান্নাতের পথে এক নতুন যাত্রার সূচনা হোক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত দিনগুলো যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।।

 

হবিগঞ্জে নারীদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ

 

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলায় নারীদের জন্য নির্মিত হয়েছে জেলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহিলা মসজিদ। ‘হযরত ফাতিমা (রা.) মহিলা মসজিদ ও হিফজ ভবন’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি দারুল হিকমাহ জামেয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার বালিকা শাখায় স্থাপন করা হয়েছে।

নবীগঞ্জ পৌরসভার পূর্বতিমিরপুর এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ জন ছাত্রী একসাথে জামাতে নামাজ আদায় করেন। নামাজের পাশাপাশি এখানে হিফজ বিভাগে কোরআন মুখস্থ করা ও ইসলামি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

দাখিল শ্রেণির ছাত্রীদের মতে, একত্রে সুন্দর পরিবেশে নামাজ আদায় তাদের মধ্যে আত্মিক প্রশান্তি ও একতার অনুভূতি তৈরি করছে। হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানান, এই মসজিদ কেবল নামাজের জায়গা নয়, বরং ইসলামী আদর্শে বড় হওয়ার জন্য একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রও।

২০২২ সালের ১৫ মার্চ হবিগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির উদ্বোধন করেন। মসজিদটি নির্মাণ করেন প্রবাসী সমাজসেবক ও মাদ্রাসার শুভানুধ্যায়ী মামুন চৌধুরী। তার এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. লুৎফুর রহমান জানিয়েছেন, মসজিদটি নারীদের পর্দা ও অজুর সুবিধা নিশ্চিত করে একটি মনোরম ও নিরাপদ ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করেছে। তিনি আরও জানান, প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে কুরআন-হাদীস চর্চার আয়োজন হয়, যাতে স্থানীয় ছাত্রীদের পাশাপাশি বয়স্ক নারীরাও অংশ নেন।
এছাড়াও হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় দূরপাল্লার যাত্রী নারীরা পথিমধ্যে এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারেন। দেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য এমন সুযোগ খুবই সীমিত হওয়ায়, এই মসজিদটি অনেক ধর্মপ্রাণ নারীর জন্য একটি বিশেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

 

মতের অমিল, মনের মিল: সম্পর্ক টিকে রাখার অদ্ভুত সমীকরণ

পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক কি কেবল ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা?
একত্রে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া সেই সমস্ত দাম্পত্য জীবনের ভিত কি প্রতিদিনের পরম মুগ্ধতায় গড়া?
না, প্রেমের সেই একরঙা কল্পনায় সত্যি মেলে না।

জীবন আসলে এক সমান্তরাল দুই ধারার যাত্রা, যেখানে একদিকে রোদ, অন্যদিকে ছায়া। একজন চায় ফ্যানের শীতল ঝাপটা, অন্যজনের দরকার এসির স্থির প্রশান্তি। কেউ রাত্রে আলো জ্বালিয়ে ঘুমায়, কেউ চায় নিঃশব্দ অন্ধকার। কেউ রেস্টুরেন্টে খেতে ভালোবাসে, আরেকজনের চোখে বাড়ির ভাতেই থাকে শান্তি। কেউ দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে, কেউ আবার সূর্য ওঠার আগেই দিন শুরু করে।

মতের এই অমিল, চাওয়া-পাওয়ার এই টানাপড়েনের মধ্যেই জন্ম নেয় এক গভীর সখ্যতা, যা প্রেমের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী।

অনেকেই ভাবেন—একসাথে থাকার মানে, একে অপরের ছাঁচে নিজেকে ঢেলে ফেলা। কিন্তু না, আসল সম্পর্ক তৈরি হয় যখন একজন আরেকজনের ভিন্নতাকে জড়িয়ে ধরে। প্রতিদিনের ছোট ছোট খুনসুটি, কারণহীন ঝগড়া, কিছুটা অভিমান—এসবই আসলে এক অন্য ভাষায় বলা ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা চোখে পড়ে না, তবুও অনুভবে ছুঁয়ে যায়।

ভাবতে পারেন, একদিকে এত অমিল—তারপরও দেখা যায় সেই দুই মানুষ একদিন পাহাড়ে ঘুরতে যাচ্ছে, কাঁধে মাথা রেখে ছবি তুলছে, একসাথে সিনেমা দেখছে, নতুন গাড়ির স্বপ্ন দেখছে, মনের মতো করে সাজিয়ে নিচ্ছে তাদের ছোট্ট ঘরটা।
এটাই তো সম্পর্কের সৌন্দর্য। এই অমিলের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অদ্ভুত এক সমীকরণ, যাকে ছকে ফেলেও মেলানো যায় না।

আমরা সম্পর্কের শুরুতে যা করি, সেটাই সবচেয়ে বড় ভুল—আমরা মিল খুঁজি। কে কী পছন্দ করে, কার সঙ্গে কতটা মিলে যায়—সেই হিসেব কষি। অথচ, যেটা মিলছে না, সেটাই তো আসল দেখার জায়গা।

ভালোবাসা গড়ে ওঠে মতের মিল দিয়ে নয়—মতের অমিল আর মনের মিল দিয়ে।

জীবনটা আসলে একটা দীর্ঘ উপন্যাস। প্রতিটি অধ্যায়ে মতের দ্বন্দ্ব, কিছু ঝগড়া, কিছু অভিমান থাকবেই। কিন্তু সেই বইয়ের পাতাগুলো ভরে ওঠে যদি প্রতিটি বাক্যে থাকে সহানুভূতি, সম্মান আর একটুখানি হাসি।

তাই, সারাটা জীবন ভালোবাসবে এমন কাউকে খোঁজার দরকার নেই। বরং এমন কাউকে খুঁজুন, যার সঙ্গে আপনি প্রতিদিন একটু একটু ঝগড়া করেও ভালো থাকতে পারেন।
কারণ দিনের শেষে, ভালোবাসা মানে সারাক্ষণ একসাথে হাসা নয়—বরং ঝগড়ার মাঝেও আলতো করে হাতটা ধরে রাখা।
মতের অমিল থাকুক, থাকুক হাজারটি।
শুধু যেন মনের মিলটা থেকে যায়…
ঠিক বাতাসের মতো—দেখা যায় না, কিন্তু গায়ে লাগলেই বোঝা যায়, শান্তি দেয়।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মাননায় ভূষিত ছয় সাহসী নারী উদ্যোক্তা

 

এই বছর মে মাসের প্রথম দশকের শেষের দিকে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী ‘এসএমই নারী উদ্যোক্তা মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গৌরবময় পরিণতির মাধ্যমে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মাননা দিয়েছে ছয় জন অনন্য নারী উদ্যোক্তাকে, যাঁরা তাঁদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও কঠোর পরিশ্রমে নিজ নিজ এলাকায় গড়েছেন কর্মসংস্থানের পথ।
সম্মাননা পাওয়া ছয় উদ্যোক্তার মধ্যে রয়েছেন রাঙামাটির ছেনছেন রাখাইন, যিনি ২৫ বছর আগে মাত্র ৫ হাজার টাকা মূলধনে গড়ে তোলেন ‘মে রাখাইন বার্মিজ স্টোর’। আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ি তাঁতের পোশাক যেমন পিনন, খাদি, ব্লাউজ ও খামি উৎপাদন ও বিপণনে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সুনাম কুড়াচ্ছে।
বাগেরহাটের রোজি আহমেদের ‘মেসার্স অর্গানিক প্রোডাক্ট’ কোকো ফাইবার দিয়ে তৈরি করছে পরিবেশবান্ধব খেলনা ও পোষাপ্রাণির জন্য সামগ্রী, যা এখন ইউরোপের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। ফরিদপুরের সাবেকুন নাহারের ‘লাম ক্রিয়েশন’ পাট ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি করছে দৃষ্টিনন্দন ঝুড়ি, মাদুর ও ব্যাগ।
সিলেটের রোজিনা আলিম ‘মিনার কেমিক্যাল অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস’ নামের প্রতিষ্ঠান দিয়ে গড়ে তুলেছেন স্থানীয় রাসায়নিক পণ্যের এক নির্ভরযোগ্য উৎস। ঢাকার সাভারের আয়েশা বেগমের ‘মুসলিম জুয়েলারি ওয়ার্কশপ’ রুপা, পিতল ও তামার অলংকার রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
পাবনার হোসনে আরা স্বামীর মৃত্যুর পর ‘আকলিমা সেবা ক্লিনিক ও নার্সিং হোম’ চালিয়ে নারীর স্বাস্থ্যসেবায় রেখেছেন অসামান্য অবদান। তাঁর প্রতিষ্ঠান পেয়েছে কবি সুফিয়া কামাল স্বর্ণপদকও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার বলেন, “দেশের উন্নয়নে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা অপরিহার্য। এ ধরনের উদ্যোগ নারীদের সাহস ও স্বপ্ন দেখার পথ প্রশস্ত করবে।”

এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী ৭৩ জন নারী উদ্যোক্তাকে সনদ প্রদান করা হয় এবং আয়োজকরা জানান, চার দিনে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে।

 

নারীর নামে সংস্কৃতির অপব্যাখ্যার প্রতিবাদ

উত্তরবঙ্গে নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ সমাজের বিদ্যমান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূলধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উত্তরবঙ্গ নারী জাগরণ মঞ্চের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় নারী অধিকারকর্মীরা।

বৃহস্পতিবার (২২ মে) বিকেলে জয়পুরহাট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘উত্তরবঙ্গ নারী জাগরণ মঞ্চ, জয়পুরহাট জেলা’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব উদ্বেগের কথা উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নেন সংগঠনের সভাপতি নাজনীন নাহার, সিনিয়র সহসভাপতি শাহনাজ পারভীন, সহসভাপতি তাহরীমা কামরুন, সেক্রেটারি সাবেকুন নাহার, সদস্য আকরিমা, রিম্মি খাতুনসহ অন্যান্যরা।

বক্তারা বলেন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন সমাজের মূল ভিত্তি—ধর্মীয় অনুশাসন, পারিবারিক কাঠামো ও ঐতিহ্যকে উপেক্ষা না করে। তাদের মতে, কমিশনের অন্তত ২০টি সুপারিশ দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক বাস্তবতার পরিপন্থি, যা বাস্তবায়ন হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং দীর্ঘমেয়াদে নারীর প্রকৃত উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করবে।

তারা আরও দাবি করেন, এই সুপারিশমালায় বিদেশি প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে এবং অনেক সুপারিশ পরিবারব্যবস্থা, নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সভায় বক্তারা সরকারের প্রতি নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আবহকে বিবেচনায় রেখে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।

আলোচনা শেষে আয়োজক সংগঠন এক লিখিত বিবৃতিতে জানায়, তারা শিগগিরই এসব সুপারিশ বাতিলের দাবিতে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করবে। সেই সঙ্গে দেশব্যাপী সচেতন নাগরিক ও অন্যান্য নারী সংগঠনকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।

 

নারীবিষয়ক কমিশন বাতিলের দাবিতে শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাতিলের দাবিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন একদল নারী শিক্ষার্থী। ২২মে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে স্বরূপ ইসলামিক কালচারাল অর্গানাইজেশনের ব্যানারে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতিবাদকারীদের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ছিল:
“নারী-পুরুষ বাইনারি, এই শর্তেই দেশ গড়ি”,
“যৌনকর্মী স্বীকৃতিদান, মায়ের জাতির অপমান”,
“সমতার নামে নারীর বিকৃতি চলবে না”,
“সে নো টু এলজিবিটি অ্যাজেন্ডা” প্রভৃতি।

শিক্ষার্থী জান্নাতুল সুমাইয়া সাফি বলেন, কমিশনের প্রস্তাবনার অধিকাংশ ইসলাম ধর্ম ও জাতিসত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব দাম্পত্য অস্থিরতা বাড়াবে। পতিতাবৃত্তিকে বৈধতা দিয়ে যৌনকর্মীদের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথ প্রশস্ত করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আদিবা সালেহা ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’কে সমালোচনা করে বলেন, এতে দেশের নারীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নেই। উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও অশালীন পোশাকের মাধ্যমে নারীত্বকে অপমান করা হয়েছে এবং ধর্মীয় শিষ্টাচারকে ‘উগ্রবাদ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ট্রান্সজেন্ডার ধারণা মানব কল্যাণ নয়, বরং চিকিৎসার প্রয়োজন এমন বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে চার দফা দাবি তুলে ধরেন:
১. নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও প্রতিবেদন অবিলম্বে প্রত্যাহার,
২. ধর্ম, সংস্কৃতি ও জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন কমিশন গঠন,
৩. পতিতাবৃত্তি নির্মূল ও নারীদের হালাল উপায়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা,
৪. সংবিধানসম্মতভাবে ধর্মীয় বিধানসমূহ রক্ষা করে নারী উন্নয়নের ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা প্রণয়ন।

 

বুকার পুরস্কারে সম্মানিত বানু মুশতাকের ‘হার্ট ল্যাম্প’

 

বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন স্বীকৃতি ‘বুকার পুরস্কার’ এবার পেয়েছেন ভারতীয় লেখিকা বানু মুশতাক। ৭৭ বছর বয়সী এই গুণী সাহিত্যিককে ১৯ মে (মঙ্গলবার) এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কান্নাড়া ভাষায় রচিত তাঁর গল্পসংকলন Heart Lamp/ ‘হার্ট ল্যাম্প’-এর জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন দিপা ভাস্তি।

১২টি ছোটগল্পের এই সংকলনে দক্ষিণ ভারতে বসবাসরত মুসলিম নারীদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা দিক, পারিবারিক টানাপোড়েন, সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতা সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি গল্প যেন জীবনের অন্তর্নিহিত গল্পগুলোকে নতুন ভাষা ও আবেগে প্রকাশ করেছে।

পুরস্কার গ্রহণের সময় বানু মুশতাক বলেন,
“একটি বিভাজনময় সময়ে, সাহিত্য আমাদের সেই শেষ আশ্রয় যেখানে আমরা একে অপরের মনোজগতে কিছু সময়ের জন্য হলেও বাস করতে পারি। এই বইয়ের জন্ম সেই বিশ্বাস থেকে যে— কোনও গল্পই ছোট নয়। মানুষের জীবনের বিশাল অভিজ্ঞতার জালে প্রতিটি সুতোই পুরো চিত্র বহন করে।”

পেশাগত জীবনে তিনি একাধারে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী। বিশেষভাবে নারীর অধিকার নিয়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে সাহিত্যের বাইরেও একজন গুরুত্বপূর্ণ সমাজচিন্তাকে তুলে ধরেছে।

উল্লেখ্য, বুকার পুরস্কার চালু হয় ১৯৬৯ সালে। প্রথমদিকে এটি শুধু ব্রিটিশ ও কমনওয়েলথ দেশগুলোর লেখকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৯৯ সালে তা সকল ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২০০২ সালে এর নাম সংক্ষিপ্ত করে ‘ম্যান বুকার’ রাখা হলেও বর্তমানে এটি পরিচিত ‘বুকার পুরস্কার’ নামে।
বানু মুশতাকের এই অর্জন শুধু ভারতীয় সাহিত্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত।

 

শখ থেকে শখের বাজার

 

নারী উদ্যোক্তাদের পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। সমাজের বাঁধা, পরিবার ও পরিচিতজনদের নেতিবাচক মন্তব্য—সবকিছু পেরিয়ে যারা এগিয়ে যান, তারাই সফল হন। আজ আমরা কথা বলছি এক এমনই অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোক্তার গল্প নিয়ে, যিনি শুধুমাত্র শখের বসে শুরু করেছিলেন ব্যবসা, আর এখন সেটাই তার পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে!

লালমনিরহাট জেলার বারেকটারী গ্রামের ফাতেমা পারভিন মাত্র ২৮ বছর বয়সে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। করোনার সময়ে সবাই যখন গৃহবন্দী, তখন ফাতেমার মাথায় আসে এক নতুন আইডিয়া। কুষ্টিয়ার ছোট বোনের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি শুরু করেন ‘শখের বাজার’ নামের অনলাইন ব্যবসা।

শুরুটা ছিল মাত্র ৫,০০০ টাকা বিনিয়োগে। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যের ফলে এখন তার মাসিক আয় ৪০-৫০ হাজার টাকা! অনলাইন ব্যবসার সাফল্য দেখে তিনি লালমনিরহাট শহরে ‘শখের বাজার’ নামে একটি শোরুমও চালু করেছেন।

তার ব্যবসার মূল পণ্যগুলো হলো—বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন সিঁদল, কুমড়ার বড়ি, সরিষার তৈল, গাওয়া ঘি, নারিকেলের নাড়ু ইত্যাদি। এছাড়াও, মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রও তিনি বিক্রি করেন।

ফাতেমার উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল নিজের পরিবারের কিছু মানুষ। তারা মনে করতেন, নারীদের ব্যবসা করার প্রয়োজন নেই, বরং সংসার সামলানোই তাদের দায়িত্ব। কিন্তু ফাতেমার মা তাকে সবসময় মানসিক শক্তি যুগিয়েছেন, যা তাকে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
ফাতেমা বলেন, “পরিবারের বাঁধাই হয়তো আমার জেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি প্রমাণ করতে চেয়েছি, মেয়েরাও পারে।”

ফাতেমার স্বপ্ন তার ‘শখের বাজার’ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। বিশেষ করে, তিনি চান তার প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র নারী কর্মীদের কাজের সুযোগ করে দিতে। যারা উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের জন্য তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চান।

এই অনন্য সাফল্যের জন্য বিশ্ব নারী দিবস ২০২৫-এ লালমনিরহাট সরকারি কলেজ ফাতেমা পারভিনকে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মাননা প্রদান করেছে।
ফাতেমার এই যাত্রা প্রমাণ করে—সঠিক ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও লেগে থাকার মানসিকতা থাকলে শুধু শখ নয়, তা হয়ে উঠতে পারে পেশা এবং সাফল্যের পথ।

নারীদের এগিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো ছড়িয়ে দিতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন!

 

নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ প্রত্যাখ্যানের দাবিতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

“নারী কমিশনের সুপারিশমালা ও নারী সমাজের প্রত্যাশা” শীর্ষক একটি আলোচনা সভা ১৫মে বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পেশাজীবি মহিলা ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সদস্য নাসিমা বেগম ঝুনু।

সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সমাজকর্মী ও ফোরামের সহকারী সেক্রেটারি উম্মে খালেদা জাহান। তিনি বলেন, নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মিলনে একটি নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের দিকেই ইসলাম আহ্বান জানায়। অথচ নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা ইসলামী মূল্যবোধ ও পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যেখানে ইসলাম নারীর জন্য দেনমোহর নির্ধারণ করে সম্মানিত করেছে, সেখানে সমান অধিকারের নামে কি নারীর সেই সম্মান হরণ করা হচ্ছে না?”

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কবি ও সাহিত্যিক শামীমা রহমান শান্তা, যিনি বলেন, নারী সংস্কার কমিশন সব সেক্টরের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত না করে পক্ষপাতমূলকভাবে গঠিত হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য সৃষ্টি হতে পারে।

এশিয়ান টিভির সহ-বার্তা সম্পাদক জাবালুন নূর বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও কমিশনের সুপারিশে তা উপেক্ষিত হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে নারীদের ইতিবাচক ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে।

ফোরামের সদস্য তাসলিমা মুনীরা বলেন, “নারী সংস্কার কমিশন নারীর পারিবারিক দায়িত্বকে বাধা হিসেবে উপস্থাপন করে নারীদের পরিবার বিমুখ করছে, যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।”

লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. সাজেদা হুমায়রা বলেন, “এই সুপারিশমালা আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে আঘাত করেছে।” তিনি বলেন, ইসলামিক পারিবারিক আইন কুরআন-ভিত্তিক, তা এড়িয়ে নতুন বিধান প্রবর্তনের প্রয়াস কুরআনকে অস্বীকার করার শামিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিকুন্নাহার তামান্না বলেন, “শরীর আমার, সিদ্ধান্ত আমার” জাতীয় স্লোগান নারীর সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন ভাঙার অপচেষ্টা। ইসলাম নারীর শরীরকে আমানত হিসেবে দেখেছে এবং তাকে মর্যাদাসম্পন্ন দায়িত্ব প্রদান করেছে।

সভাপতির বক্তব্যে নাসিমা বেগম ঝুনু বলেন, “নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা দেশীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থী। এই সুপারিশ জাতিকে নৈতিকতা ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত করবে।” তিনি নারী সমাজের পক্ষ থেকে কমিশনের সুপারিশ বাতিল এবং নতুনভাবে সব সেক্টরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিশন গঠনের দাবি জানান।

সভাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন বাংলাদেশ পেশাজীবি মহিলা ফোরামের সদস্য সাইয়্যেদা রাহাত তাসনিয়া ও ডা. জোবায়দা।

 

গরমে নারীর শরীরের বিশেষ সময়ে বিশেষ যত্ন কেন জরুরি

 

বাংলাদেশের মতো দেশে গরমকালের তাপদাহ শুধু অস্বস্তিই নয়, বরং কখনো কখনো তা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। নারীর জীবনচক্রে এমন কিছু পর্যায় আছে—যেমন মাসিক, মেনোপজ, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান—যেগুলোতে শরীরের ভেতর হরমোনের নানা রকম পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের সময় শরীর এমনিতেই কিছুটা দুর্বল ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে গরমের বাড়তি চাপ যুক্ত হলে শারীরিক অস্বস্তি, পানিশূন্যতা এবং রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

পিরিয়ড চলাকালে করণীয়
পিরিয়ডের সময় শরীর থেকে রক্তের সঙ্গে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। আবার গরমে অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে আরও পানি বেরিয়ে যায়। এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার না খাওয়া হলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এতে মাথাঘোরা, দুর্বলতা এমনকি মূর্ছা যাওয়ার মতো সমস্যাও হতে পারে। এই সময় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া দরকার। স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়মিত বদলানো, শরীর শুকনো রাখা এবং ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত পাল্টে ফেলা জরুরি।

মেনোপজের পর
মেনোপজের পরে অনেক নারীর হঠাৎ করে গরম অনুভব হওয়া বা ঘাম দিয়ে জেগে ওঠার অভ্যাস তৈরি হয়। একে বলে “হট ফ্ল্যাশ”। এই সমস্যাগুলো গ্রীষ্মকালে আরও বেশি বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। তাই ঘরের তাপমাত্রা সহনীয় রাখার চেষ্টা করতে হবে। হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা, মাথার পাশে অতিরিক্ত ফ্যান রাখা কিংবা ভেজা কাপড় দিয়ে মুখ ও শরীর মুছে নেওয়া কিছুটা আরাম দিতে পারে। রাতের বেলায় ঘাম হলে বালিশ উল্টে দেওয়া, কারণ বালিশের অপর পাশ তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে।

গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান: বাড়তি সতর্কতা দরকার
গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদানের সময় শরীরের পানির প্রয়োজন আরও বেশি হয়। গরমের মধ্যে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে অনেক তরল ও লবণ বের হয়ে যায়, যা গর্ভবতী মায়ের শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দিনে কয়েকবার লবণ মেশানো শরবত খাওয়া যেতে পারে, যদি চিকিৎসক এ বাপারে নিষেধ না করেন। নিরাপদ পানি ও টাটকা খাবার গ্রহণ করতে হবে, কারণ এই সময়ে হেপাটাইটিস ই-এর মতো সংক্রমণ মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। আরামদায়ক ও বাতাস চলাচলের উপযোগী পোশাক পরতে হবে। প্রয়োজনে দিনের সবচেয়ে গরম সময়টা ঘরের ভেতরে কাটানো উত্তম।

নারীর জীবনের এই প্রাকৃতিক সময়গুলোতে গরম আবহাওয়া সরাসরি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় বাঁধা না দিলেও, বাড়তি অস্বস্তি ও জটিলতা তৈরি করে। তাই গরমে নারীর নিজের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।বিশেষ করে পানি গ্রহণ, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা এবং পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও উচিত নারীদের এই সময়গুলোতে সহমর্মী ও সচেতন থাকা।

পাঠকের জন্য প্রশ্ন:
আপনার পরিবারের নারী সদস্যরা গরমে কোন ধরণের অস্বস্তিতে পড়েন? তাঁদের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে আপনি কীভাবে সাহায্য করেন?

 

‘ফ্যামিলি এইড’-এর আত্মপ্রকাশ: পারিবারিক বন্ধন সুসংহত করতে ইসলামী উদ্যোগ

 

বাংলাদেশ ইসলামিক ল রিসার্চ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার (BILRC) চালু করেছে একটি নতুন সামাজিক প্রকল্প—‘ফ্যামিলি এইড’, যা পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় ও অধিকার রক্ষায় কাজ করবে ইসলামী শরিয়াহর আলোকে।

শনিবার ঢাকার পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী আয়োজনে বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ও ‘ফ্যামিলি এইড’ প্রকল্প পরিচালক শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “পশ্চিমা প্রভাব ও সামাজিক অস্থিরতায় আমাদের পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। ইসলামভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় আমরা কাজ শুরু করেছি ২০২৩ সাল থেকে।”
এই প্রকল্পের আওতায় পারিবারিক, মানসিক ও আইনগত সমস্যায় ভুক্তভোগীরা পাবেন বিশেষজ্ঞ সহায়তা। বর্তমানে ৩৪ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত একটি টিম এই সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। সেবাগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় বিশেষ ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সেবাও প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘একাডেমি টোয়েন্টি ওয়ান’-এর চেয়ারম্যান জিয়াউল হক বলেন, “দাম্পত্য কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা ভয়াবহ হারে বাড়ছে। এর প্রতিকারে আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা মানজুর বলেন, “পারিবারিক সমস্যা সমাধানে শুধু নারী বা শিশুকে কেন্দ্র করে কাজ করলে চলবে না। পুরুষরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শরিয়াহ সকল পক্ষকে সমান সম্মান দিয়ে দেখে, এটিই ‘ফ্যামিলি এইড’-এর ভিত্তি।”

বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রকল্পটির মাধ্যমে এক ছাদের নিচে আইনজীবী, মনোবিদ ও পারিবারিক পরামর্শদাতারা একযোগে কাজ করবেন। এতে করে সেবা গ্রহণকারীরা পাবেন এককেন্দ্রিক ও সুসমন্বিত সহায়তা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রুহুল আমীন রাব্বানী, মনোবিদ সুমাইয়া তাসনিম, সহকারী প্রকল্প পরিচালক মারদিয়া মমতাজ ও লিগ্যাল কনসালট্যান্ট ফাইজা তাবাসসুম।

 

বাংলাদেশি নার্সদের বিশ্বমঞ্চে উত্থান: বিএমইউ ভিসির আশাবাদ

 

বাংলাদেশি নার্সরা বিশ্বজুড়ে নিজেদের গুণগত শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পাবে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।

বিশ্ব নার্স দিবস ২০২৫ উপলক্ষে সোমবার (১২ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “গুণগত নার্সিং শিক্ষার মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি নার্সদের চাহিদা তৈরি করা সম্ভব।”

তিনি জানান, বিএমইউ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নার্সিং শিক্ষা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম চালু করেছে। পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে।

ডা. শাহিনুল আলম বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে চাই। ফিলিপাইন বা ভারতের কেরালার মতো বাংলাদেশও নার্স রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে, যা থেকে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব।”

তিনি নার্সদের উদ্দেশে বলেন, “নার্সিং কেবল চাকরি নয়, এটি মানবতার সেবার মহৎ এক পেশা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। রোগীর কষ্ট লাঘবে নার্সরাই ভরসাস্থল।”

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ’র প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার এবং হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু নোমান মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দীন।

গ্র্যাজুয়েট নার্সিং বিভাগের শিক্ষক মো. হারুন অর রশীদ গাজী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার নার্স কর্মরত আছেন। তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে বিদেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটবে।

দিনব্যাপী আয়োজনে নার্সিং পেশার গৌরব, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা তুলে ধরে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যাতে অংশ নেন নার্সিং শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ১৫টি দেশে নার্স প্রেরণ করছে। ২০২৪ সালে নার্স রপ্তানি থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক আয় হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নার্সিং শিক্ষার মান উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে এই আয়ের পরিমাণ তিন গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

মেয়েদের আত্মরক্ষা ও প্যারামিলিটারি প্রশিক্ষণ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার

নারীদের আত্মরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্যারামিলিটারি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এমনটি জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ।

সোমবার (১৩ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ‘কথা বলো নারী’র উদ্যোগে আয়োজিত ‘নারীর চোখে আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

শারমীন মুরশিদ বলেন, “আমরা যেসব মেয়েদের ট্রেইন-আপ করব, সেখানে তাদের জেন্ডার রিলেটেড অ্যাওয়ারনেস থেকে শুরু করে, ফিজিক্যাল ট্রেনিং, সেলফ ডিফেন্স ট্রেনিং, প্যারামিলিটারি ট্রেনিং—সবটুকুই ভাবা হয়েছে। যেটা আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। এটা নারীদের জন্য একটা ক্ষেত্র হবে, যেটাতে তারা মাথা উঁচু করে তাদের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি নিরাপত্তাটা দিতে না পারি, তাহলে নারীর বিকাশ ঘটবে না। মেয়েরা যদি স্কুলে, রাস্তায় বা বাসে নিরাপদ না থাকে, তাহলে কীভাবে একটি সুন্দর পরিবেশে নিজেকে গড়ে তুলবে? এই বিষয়গুলোতে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।”

উপদেষ্টা আরো বলেন,‘চব্বিশে যারা যুদ্ধ করেছে, তাদের আমরা কাজে লাগাতে চাই। সোশ্যাল ফোর্স হিসেবে দেখতে চাই। সাইবার সেফটি তৈরি করার ক্ষেত্রে তাদেরকে দেখতে চাই।’

তরুণদের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, “তোমরা কী ভাবছো, কী চাইছো—তোমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা আমাদের কৌশল সাজাতে চাই।”

সাইবার বুলিংয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি এখন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেজন্য আমাদের আলাদা একটি ইউনিট গঠন করতে হবে।”
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, লেখক ও গবেষক মাহা মির্জা, ড. রেজওয়ানা কবীর স্নিগ্ধা, উমামা ফাতেমা প্রমুখ।

 

ইসলামে নারীর সম্পত্তিতে অধিকার

ইসলাম ধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান যা মানবজাতির প্রতিটি দিককে নির্দেশনা দিয়েছে। নারীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে এমন এক সময়ে ইসলাম যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে , যখন নারীদেরকে সমাজে অবজ্ঞা করা হতো, সম্পত্তির অধিকার তো দূরের কথা, তাদের মানুষ হিসেবে বিবেচনাও করা হতো না। অথচ আজ, মুসলিম সমাজে নারীদের সেই ইসলাম-স্বীকৃত অধিকার, বিশেষত সম্পত্তিতে অধিকার, ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার: স্পষ্ট কোরআনিক ঘোষণা
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
“পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ তাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে। আর নারীদের জন্যও রয়েছে অংশ তাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে—অল্প হোক বা বেশি—এটি একটি নির্ধারিত অংশ।”
(সূরা নিসা: আয়াত ৭)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, নারীরাও সম্পত্তিতে সমানভাবে অধিকার রাখে। ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজে নারীরা সম্পত্তির কোনো দাবিদার ছিল না। ইসলাম এসে এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নারীর মর্যাদাকে নিশ্চিত করেছে।

উত্তরাধিকার সূত্রে নারীর অধিকার: কন্যা, স্ত্রী, মা, ও বোনের মর্যাদা
ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে (ফরায়েজ) নারীর অংশকে নির্ধারণ করা হয়েছে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ও অবস্থানের ভিত্তিতে। কন্যা সন্তান বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশের মালিক হয়। যদি সন্তান থাকে, স্ত্রী পায় অষ্টমাংশ; সন্তান না থাকলে পায় চতুর্থাংশ। মা তাঁর সন্তানের সম্পত্তিতে ষষ্ঠাংশ পান, আর বোন নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ভাইয়ের সম্পত্তিতে অংশীদার হন।
কোরআনে বলা হয়েছে:
“তোমাদের স্ত্রীদের যদি সন্তান না থাকে, তবে যা কিছু তারা রেখে যায়, তার অর্ধেক তোমরা পাবে। আর যদি সন্তান থাকে, তবে যা কিছু তারা রেখে যায়, তার চতুর্থাংশ তোমরা পাবে।”
(সূরা নিসা: আয়াত ১২)

“পুরুষ দ্বিগুণ পায়” – এই বিধান কেন?
সাধারণভাবে বলা হয়, পুত্র সন্তান দ্বিগুণ পায়, কন্যা পায় অর্ধেক। কোরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দেন—পুরুষ সন্তানকে দুই নারীর সমান অংশ দিতে হবে।”
(সূরা নিসা: আয়াত ১১)
অনেকেই এই আয়াতকে বৈষম্য মনে করেন, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে যৌক্তিকতা। ইসলাম পুরুষের উপর পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রীর খরচ, সন্তানদের শিক্ষা, বোনের বিয়ে, এমনকি বৃদ্ধ মা-বাবার দেখাশোনার দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ, অধিক সম্পত্তির বিপরীতে পুরুষের উপর আর্থিক দায়িত্বও অধিক। পক্ষান্তরে, নারীকে সম্পত্তি প্রদান করা হলেও তাঁর উপর কোনো বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব নেই। সে চাইলে ব্যয় করতে পারে, না চাইলে তা সঞ্চয় করতেও পারে।

দেনমোহর ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি:
ইসলামে নারীর জন্য বিবাহের সময় দেনমোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। এটি স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি একটি সম্মানসূচক উপহার ও তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটি পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তালাক দিলে বা স্বামী মৃত্যুবরণ করলে, স্ত্রী আইনি ও শরয়ি অধিকার অনুযায়ী দেনমোহর দাবি করতে পারে।
কোরআনে বলা হয়েছে:
“তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর আনন্দ সহকারে প্রদান করো। যদি তারা স্বেচ্ছায় মোহরের কোনো অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা খেয়ে ফেলতে পারো আনন্দের সঙ্গে।”
(সূরা নিসা: আয়াত ৪)

নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা:
ইসলাম নারীর উপার্জন ও সম্পত্তির উপর তার একচ্ছত্র মালিকানা স্বীকার করেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
“পুরুষ যা অর্জন করে, তা তার জন্য; আর নারী যা অর্জন করে, তা তার জন্য।”
(সূরা নিসা: আয়াত ৩২)
এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নারীর উপার্জন তারই সম্পদ, কেউ জোরপূর্বক তা নিতে পারে না। এমনকি স্বামীও নয়। এটি আধুনিক নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি যুগান্তকারী ভিত্তি।

সামাজিক বাস্তবতা: কেন নারীরা বঞ্চিত?
বিস্ময়ের বিষয় হলো, ইসলাম নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার নিশ্চিত করলেও আমাদের সমাজেই নারীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, এমনকি শহরের শিক্ষিত পরিবারেও অনেক নারী তাদের পিতৃসম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। “বিয়েতে অনেক পেয়েছে”, “ছেলেরা তো সংসার চালায়”—এই অজুহাতে ইসলামি অধিকার লঙ্ঘন করা হয়।
এটি একপ্রকার জুলুম। আল্লাহ বলেন:
“তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।”
(সূরা বাকারা: আয়াত ১৮৮)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো হক আত্মসাৎ করবে, সে কিয়ামতের দিন সাতবার জাহান্নামে যাবে।”
(সহীহ বুখারী)

এছাড়াও; বর্তমান বিশ্বে ‘নারীর স্বাধীনতা’ ও ‘সমান অধিকার’ স্লোগানে পশ্চিমা নারীবাদীদের একটি অংশ ইসলামকে আক্রমণের অস্ত্র বানিয়েছে। তারা সমতার নামে এমন এক সমাজ গড়ে তুলছে যেখানে একজন নারীকে তার স্বাভাবিক শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক চরিত্র থেকে সরিয়ে অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।

তাদের দাবি, নারী-পুরুষকে সব দিক থেকে এক রকম করতে হবে—এমনকি দায়িত্ব ও শারীরিক কাঠামোর পার্থক্য উপেক্ষা করে হলেও। এর বিপরীতে ইসলাম নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্ব বন্টন করেছে। ইসলাম সমতা নয়, ন্যায় (Justice) প্রতিষ্ঠা করে—যা প্রকৃত মানবিকতার ভিত্তি।

রাসূল (সা.) বলেন:
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

পরিশিষ্ট
ইসলামেই নারীর প্রকৃত অধিকার
ইসলাম নারীকে কেবল সম্পত্তির অধিকার দেয়নি; দিয়েছে সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা। যে সমাজ ইসলামি শরীয়ত মেনে চলে, সেখানে নারী কখনো বঞ্চিত হয় না। বরং যারা ইসলামি জ্ঞান ও ন্যায়বিচার থেকে সরে গেছে, তারাই নারীদের প্রকৃত শত্রু। তাই আমাদের উচিত ইসলাম প্রদত্ত নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরআন-হাদীস অনুযায়ী নারীর অধিকার বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমীন।

 

আছিয়া হত্যা মামলা: হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড, বাকিদের খালাসে মায়ের ক্ষোভ

 

মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আদালত প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তবে মামলার বাকি তিন আসামি সজীব শেখ, রাতুল শেখ ও রোকেয়া বেগমকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এই রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আছিয়ার মা আয়েশা বেগম।

শনিবার (১৭ মে) সকালে মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান এই রায় ঘোষণা করেন। মামলার বাদী আয়েশা বেগম বলেন, “আমরা এই রায় মেনে নিতে পারছি না। একজনের ফাঁসি হলেও বাকি তিনজনের খালাসে আমাদের মন ভাঙা।”

২০২৫ সালের ৬ মার্চ, আছিয়া তার বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৩ মার্চ ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে মারা যায় সে। এ ঘটনায় আছিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার তদন্ত শেষে ১৩ এপ্রিল অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয় এবং ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। মাত্র ১২ কার্যদিবসে মামলার বিচারকাজ শেষ হয়।

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মনিরুল ইসলাম মুকুল জানিয়েছেন, বাদী রায়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে

তথ্যসুত্র ঃবিডি নিউজ,,যুগান্তর,,ইত্তেফাক

 

নারী উদ্যোক্তা গড়ার অগ্রদূত জান্নাতুল হক

 

নারীর ক্ষমতায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরিতে যাঁরা নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন জান্নাতুল হক। ২০১৩ সালে মাত্র একটি ফেসবুক পেজ ‘আমান্দ ফ্যাশন’ দিয়ে তাঁর ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়। তখন দেশে এফ-কমার্সের সূচনালগ্ন, আর সেই সময়েই তিনি নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পথ খুঁজে নেন।
ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, যার নাম ‘শৈলীর ছোঁয়া’। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন জনপ্রিয় ফুড ব্র্যান্ড এজিউর কুইজিন–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে।

জান্নাতুল হকের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে রয়েছে পারিবারিক প্রেরণা, বিশেষ করে তাঁর স্বামী আশরাফ উদ্দিন–এর ভূমিকা, যিনি একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। স্বামীর উৎসাহেই তাঁর ব্যবসার প্রতি আগ্রহ জন্মে এবং তাঁর সহযোগিতায় তিনি ব্যবসার জগতে প্রবেশ করেন। পরে এটিকেই তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

জান্নাতুল হকের শৈশব কেটেছে সিরাজগঞ্জে। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, আর মা গৃহিণী। এই পারিবারিক বন্ধন ও আদর্শ তাঁকে আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

শিক্ষাজীবনে তিনি উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০০৮ সালে চাইল্ড অ্যান্ড সাইকোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর (Masters) সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি থাকেন ঢাকার ধানমন্ডিতে।

ছোটবেলা থেকেই জান্নাতুল হকের স্বপ্ন ছিল দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) নিয়ে কাজ করার। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করাটা তাঁর কাছে আবেগের জায়গা।
তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, অনেক নারী সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করলেও সামাজিক বাধা ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে মাঝপথে থেমে যেতে হয়। এই সমস্যাগুলো তাঁকে নাড়া দিয়েছে।
এই তাড়না থেকেই ২০২২ সাল থেকে তিনি ১০০ এর বেশি নারী উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সহায়তা করেছেন। শুধু অর্থ নয়, তিনি দিয়েছেন মানসিক সহায়তা,ব্যক্তিগত পরামর্শ,বিপণন সহযোগিতা,নেটওয়ার্কিং সুবিধা।
এই সব সহায়তার ফলে অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিচ্ছেন এবং রপ্তানি বাজারে পণ্য সরবরাহ করছেন।

তিনি বলেন,“আমি ১০০ নারী উদ্যোক্তাকে ছোট পরিসরে বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যাতে তাঁরা নিজেরাই ই–কমার্স ও এফ–কমার্সে দক্ষ হয়ে ওঠে।”

নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জান্নাতুল হক তৈরি করতে চান একটি সমন্বিত কো–ওয়ার্কিং স্পেস। সেখানে থাকবে-একাধিক উদ্যোক্তার কাজের জায়গা,ছোট ছোট ওয়্যারহাউস,পণ্য সরবরাহ ও ডেলিভারির ব্যবস্থা,সাপ্লাই চেইন পরিচালনার পূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

তিনি বিশ্বাস করেন, এই প্ল্যাটফর্ম থেকে উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসা বড় করতে পারবেন, তৈরি করতে পারবেন নিজস্ব অফিস ও বড় আকারের স্টোরেজ সুবিধা।

জান্নাতুল হক ই–কমার্স খাতের উন্নয়নে নিরাপদ ব্যবসা পরিবেশ, গ্রাহকের আস্থা, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা, আধুনিক লজিস্টিক ও পেমেন্ট সিস্টেম, স্টার্টআপ ফান্ড এবং সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বে নীতিমালা গঠনের ওপর জোর দেন।
তিনি মনে করেন “ই-কমার্স খাত কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের নয়, এটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি বড় হাতিয়ারও হতে পারে।”

জান্নাতুল হকের যাত্রা প্রমাণ করে, একজন নারীর আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম আর প্রেরণায় গড়ে উঠতে পারে এক সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাঁর কাজ শুধু নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেই নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও রাখছে গভীর প্রভাব।

তথ্যসুত্রঃ সারাবাংলা, যুগান্তর, সিমেক নিউজ.কম

 

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের, পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ২০% নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি, সিএমএসএমই খাতে ২৫% ঋণ বিতরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এর মধ্যে ১৫% নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।

এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করবে এবং ব্যবসায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়াবে।

তবে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক নারী উদ্যোক্তাই প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সুবিধা পান না বা ঋণ পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। তাছাড়া, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই নীতিকে কতটা আন্তরিকভাবে অনুসরণ করবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর মনিটরিং বাড়ানো, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নেটওয়ার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা হলে এই নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

আপনার বিছানা কি গোপনে অসুস্থতার কারণ হয়ে উঠছে?

 

ঘুম!!শরীরে বিশ্রামের প্রয়োজন। অথচ আপনি জানেন কি, বছরে গড়ে একজন মানুষ তার বিছানায় ২৬ গ্যালনের মতো ঘাম ঝরায়? এই ঘাম, ধুলা, ত্বকের মৃত কোষ, ছত্রাক—সব মিলিয়ে আপনার আরামদায়ক বিছানাটিই হয়ে উঠতে পারে জীবাণুর অভয়ারণ্য!

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজিস্ট ফিলিপ টিয়েরনো এ নিয়ে দিয়েছেন চমকে দেওয়ার মতো এক সতর্কতা। তিনি বলেন, অপরিষ্কার চাদরে ঘুমানো ঠিক যেন কুকুরের বিষ্ঠা স্পর্শ করার পর হাত না ধোয়ার মতোই ক্ষতিকর! কারণ, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই চাদরে জমে যেতে পারে ঘাম, পরাগকণা, ধুলোমাইটের বর্জ্য, এমনকি ছত্রাকের স্পোর—যা অ্যালার্জি ও নানা রকম সংক্রমণের কারণ হতে পারে।

এ সমস্যা থেকে বাঁচতে টিয়েরনোর পরামর্শ খুবই স্পষ্ট:
আপনার বিছানার চাদর প্রতি সপ্তাহে ধুয়ে ফেলুন। ব্যবহার করুন গরম পানি এবং উচ্চ তাপে শুকানোর পদ্ধতি, যাতে সব রকম ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক নিশ্চিহ্ন হয়। শুধু চাদর নয়—বালিশের কভার ও তোষকের কভার পরিষ্কার রাখাও জরুরি। কারণ, বালিশে থাকতে পারে অন্তত ১৬ প্রকারের ছত্রাক!

শুধু সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললেই আপনার ঘুমানোর জায়গাটা হয়ে উঠতে পারে এক শান্ত, পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর আশ্রয়—যেখানে জীবাণুর কোনো ঠাঁই নেই।

 

আল-আকসা: ইতিহাসের হৃদয়ে পোড়া প্রার্থনার মিনার

জেরুসালেম—একটি শহরের নাম নয় কেবল, এটি ইতিহাসের ধুলিকণায় লেখা বিশ্বাস, বেদনা ও বিজয়ের এক অনন্ত কাব্য। এই পবিত্র শহরের বুকে হৃদয়ের মতোই স্পন্দিত মসজিদুল আকসা, যে স্থান একাধারে ঈমানের প্রথম অভিমুখ, নবী করিম (সা.)-এর মেরাজের সফরের গন্তব্য এবং মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সেই আল আকসা আজ শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়; এটি মুসলিম জাতির আত্মমর্যাদা, বিশ্বাস ও ঐক্যের প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এই মসজিদ সাক্ষী থেকেছে যুদ্ধ, বিজয়, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুনর্জাগরণের।

এই লেখায় আমরা খুঁজে দেখবো আল আকসার অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত এক দীর্ঘ, রক্তাক্ত কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়—যা একইসঙ্গে বেদনার, তেমনি অহংকারের।

পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনের হৃদয়ে অবস্থিত জেরুসালেম। আর এখানেই ইসলামের এক অনন্য ধন—মসজিদুল আকসা। মুসলমানদের প্রথম কিবলা, মক্কা ও মদিনার পর তৃতীয় সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থান হিসেবে মসজিদটি ইসলামের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

আল আকসা: এক দৃষ্টিতে অতীত ও বর্তমান
আল কোরআনের পবিত্র আয়াতে ‘বরকতময় ও পবিত্র ভূমি’ হিসেবে বর্ণিত এই ভূমি অসংখ্য নবী ও রাসূলের পদধূলিতে ধন্য। প্রাচীন যুগে এটি ছিল ইসলামি শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। ইতিহাসের পাতায় আল আকসা ঘিরে ফুটে ওঠে সুলতান সালাহউদ্দীনের বীরত্বগাথা, খলীফা ওমরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মুসলিম শাসকদের নির্মিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বর্ণালী অধ্যায়।
জেরুসালেমের এই ভূমিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরসহ বহু মনীষী।

আল আকসা কমপ্লেক্স: শুধু একটি মসজিদ নয়, জ্ঞান-ঐতিহ্যের শহর
প্রায় ১৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্স কোনো একটি স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্থাপত্য-ঐতিহ্যের মহাসমারোহ। চার দেয়ালের ভিতর বিস্তৃত প্রায় দুই শতাধিক স্থাপনা—মসজিদ, মিনার, মেহরাব, মিম্বারসহ একেকটি ইট যেন বহন করে শতাব্দীর ইতিহাস।

নির্মাণ ইতিহাস: হাজার বছরের শেকড়

১.ইসলাম পূর্ব যুগ: আদি নিদর্শনের শুরু
মসজিদুল আকসা পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। মক্কার মসজিদুল হারামের ৪০ বছর পর এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, কেউ বলেন আদম (আ.) এই মসজিদের প্রথম নির্মাতা, কেউ বলেন নূহ (আ.)-এর পুত্র সাম, আবার অনেকের মতে ইব্রাহিম (আ.) এই পবিত্র স্থানের ভিত্তি স্থাপন করেন।

২.নবীদের যুগ: পবিত্রতার উত্তরাধিকার
নূহ (আ.)-এর প্লাবনে ধ্বংস হওয়ার পর ইব্রাহিম (আ.) মসজিদের পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর দাউদ (আ.) এবং তাঁর পুত্র সুলাইমান (আ.) সময়কালে মসজিদ পরিণত হয় এক বিস্তৃত কমপ্লেক্সে। সুলাইমান (আ.) নির্মাণ করেন হায়কাল-ই-সুলাইমানি, যা পরবর্তীতে ইহুদিদের বিশ্বাসে রূপ নেয় সলেমন ট্যাম্পলে।

ইহুদি ও খ্রিস্টান আধিপত্য: ইতিহাসের উল্টো পৃষ্ঠা
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে বুখতে নাসর হায়কাল ধ্বংস করে স্মৃতিচিহ্ন লুটে নেয়। ৭০ বছর পর ইরানি সম্রাটের সহায়তায় ইহুদিরা নির্মাণ করে ‘সেকেন্ড ট্যাম্পল’। এরপর গ্রিক সম্রাট অ্যারোটেনিস একে গ্রীক মন্দিরে রূপান্তর করেন। খ্রিস্টান শাসকরা আবারও এর রূপান্তর ঘটায় গির্জায়। এ সময় ইহুদিরা ভূমিহীন, আশ্রয়হীন জাতিতে পরিণত হয়—যেমনটা কোরআনে উল্লেখিত ‘লাঞ্চনার জাতি’।

ইসলামোত্তর যুগ: পুনর্জাগরণের আলোকবর্তিকা
মেরাজের রাতে রাসূল (সা.)-এর আল আকসা সফর শুধু অলৌকিক ঘটনা নয়, এক নতুন যুগের সূচনা। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ হিজরিতে খলীফা ওমর (রা.) মসজিদে ওমর নির্মাণের মাধ্যমে এখানে মুসলিম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক নির্মাণ করেন কুব্বাতুস সাখরা।
স্বর্ণচূড়া বিশিষ্ট অষ্টকোণাকৃতির এই স্থাপনা ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। কেন্দ্রের পাথরটি ইহুদিদের মতে পৃথিবীর ‘ফাউন্ডেশন স্টোন’।

উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে আল আকসা হয়ে ওঠে ইসলামি জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। প্রতিষ্ঠিত হয় অসংখ্য মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠান। যদিও শিয়া ইসমাঈলিয়া সম্প্রদায়ের হাতে কিছু সময় এটি বিভ্রান্ত মতবাদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়, কিন্তু সেলজুক সুলতানরা পুনরুদ্ধার করে ইসলামের মূলধারায় ফিরিয়ে আনেন। ইমাম গাজালির আল আকসায় অবস্থান, জ্ঞানের দীপ্তি ছড়ায় এই কমপ্লেক্সে।

ক্রুসেড থেকে আধুনিক যুগ:রাজনৈতিক বৈরি বাতাস

মসজিদ আল আকসা—ইতিহাস, ধর্ম এবং রাজনীতির এক অম্ল-মধুর মিশেল। জেরুসালেমের হৃদয়ে অবস্থিত এই পবিত্র স্থানকে ঘিরে ইতিহাসের অনেক রক্তাক্ত অধ্যায় রচিত হয়েছে। ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান হিসেবে এর মর্যাদা বহু পুরনো হলেও, এর ইতিহাসে এক গভীর মোড় আসে ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে, যখন প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা জেরুসালেম দখল করে। তারা আল-আকসা মসজিদকে “সলোমনের মন্দির” বলে ঘোষণা করে এবং কুব্বাত আস সাখরাকে “টেমপ্লাম ডোমিনি((Templum Domini)” বা ঈশ্বরের গম্বুজ হিসেবে রূপান্তর করে ফেলে। মসজিদটি তখন খ্রিষ্টানদের গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে, আর আল-আকসা মসজিদকে ব্যবহার করা হয় কখনও ঘোড়ার আস্তাবল, কখনও রাজপ্রাসাদ হিসেবে।

১১১৯ খ্রিষ্টাব্দে নাইটস টেম্পলাররা মসজিদটিকে তাদের সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই সময়ে স্থাপত্যগত অনেক পরিবর্তন আসে—উত্তরের বারান্দা সম্প্রসারিত হয়, নতুন এপস তৈরি হয়, এবং অভ্যন্তরে একটি বিভক্তকারী দেয়াল নির্মিত হয়। পশ্চিমে ও পূর্বে খিলানযুক্ত নতুন অংশ সংযোজিত হয়, যা পরে একটিতে মহিলাদের নামাজের স্থান এবং অন্যটিতে ইসলামী জাদুঘর হিসেবে রূপান্তরিত হয়।

এই ধর্মীয়-রাজনৈতিক দখলের অবসান ঘটে ১১৮৭ সালে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জেরুসালেম পুনরুদ্ধার করে। বিজয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই মসজিদের অভ্যন্তরে থাকা খ্রিষ্টানদের স্থাপনাগুলো(টয়লেট, শস্যগুদাম) সব সরিয়ে ফেলা হয়। মেঝে আচ্ছাদিত হয় দামি কার্পেটে, গোলাপজল ও সুগন্ধি ছিটিয়ে তা আবার নামাজের উপযোগী করে তোলা হয়। সালাহউদ্দিন তখন মসজিদে স্থাপন করেন এক ঐতিহাসিক মিম্বর, যা আগে 1168 সালে সুলতান নুরউদ্দিন জেনগির আদেশে নির্মাণ শুরু হয়েছিল এবং তার মৃত্যুর পরে সমাপ্ত হয়।
পরবর্তী শতকগুলোতে মামলুক ও উসমানীয় শাসকদের অধীনে আল-আকসা ধীরে ধীরে নতুন মাত্রা পায়।
১৩৪৫ সালে মামলুক সুলতান আল-কামিল শামান মসজিদের পূর্ব দিকে আরও দুটি সারি ও ফটক সংযুক্ত করেন। উসমানীয়রা ১৫১৭ সালে জেরুসালেমের শাসন নিলে মসজিদে বড় কোনো স্থাপত্য পরিবর্তন না আনলেও আশেপাশে নানান উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেন। কাসিম পাশার ফোয়ারা, নতুন সেতু এবং মুক্ত গম্বুজ নির্মাণ হয় এই সময়েই। ১৮১৬ সালে গভর্নর সুলাইমান পাশা আল-আদিল মসজিদের জীর্ণ অবস্থা দেখে পুনরায় সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
বিশ শতকে এসে আল-আকসা নতুন করে সংস্কারের সুযোগ পায়, যখন জেরুসালেমের গ্র্যান্ড মুফতি আমিন আল-হুসাইনি তুর্কি স্থপতি মিমার কামালউদ্দিন বেককে দায়িত্ব দেন মসজিদ ও আশেপাশের স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। পুরনো উমাইয়া ভিত্তি শক্তিশালী করা হয়, কাঠের বিমের পরিবর্তে কংক্রিট ও পিতল ব্যবহৃত হয়, ভেতরের আর্চ ও গম্বুজের সৌন্দর্য পুনর্নির্মাণ করা হয়। খোদিত আরবি লিপি ও ফাতেমীয় আমলের মোজাইকও প্লাস্টারের আড়াল থেকে উদ্ধার করে দৃশ্যমান করা হয়।

তবে সব ইতিহাস আনন্দদায়ক নয়। ১৯২৭ ও ১৯৩৭ সালের ভূমিকম্প মসজিদে ব্যাপক ক্ষতি করে, যাকে ১৯৩৮ ও ১৯৪২ সালে আবার মেরামত করা হয়।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ছিল এক মোড়বদলের ঘটনা, যেখানে মুসলিমরা হারায় মসজিদুল আকসার কার্যত নিয়ন্ত্রণ। যদিও নামমাত্রভাবে এটি পরিচালিত হয় জর্ডান-ফিলিস্তিনের ওয়াকফের তত্ত্বাবধানে, বাস্তবে প্রতিটি প্রবেশপথে রয়েছে দখলদার সেনাদের কঠোর নজরদারি। মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের আগে পোহাতে হয় অসহনীয় চেকিং, কখনো কখনো বন্ধ থাকে প্রবেশদ্বার।

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা ঘটে ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট, যখন এক অস্ট্রেলীয় পর্যটক ডেনিস মাইকেল রোহান মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেন। আগুনে নুরউদ্দিনের তৈরি সেই ঐতিহাসিক মিম্বর পুড়ে যায়। রোহান বিশ্বাস করতেন এই আগুনের মাধ্যমে তিনি যীশুর দ্বিতীয় আগমন ত্বরান্বিত করতে পারবেন। এই ঘটনার ফলে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভ জন্মায় এবং তার ফলস্বরূপ গঠিত হয় ওআইসি—ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা।

১৯৮০-এর দশকে ফের উগ্রবাদী ইহুদি সংগঠন গুশ এমুনিম আন্ডারগ্রাউন্ড আল-আকসা ও কুব্বাত আস সাখরা উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাদের লক্ষ্য ছিল, এই দুই পবিত্র স্থাপনা ধ্বংস করে সেই স্থানে ”তৃতীয় ইহুদি মন্দির(থার্ড টেম্পল)” নির্মাণ করা।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, যখন ইসরায়েলের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এরিয়েল শ্যারন এক হাজার সশস্ত্র রক্ষী নিয়ে আল-আকসা চত্বরে প্রবেশ করেন। ফিলিস্তিনিরা প্রতিবাদ করে, এবং সংঘর্ষের সূচনা হয়—যা পরবর্তীতে “আল-আকসা ইন্তিফাদা” নামে ইতিহাসে স্থান পায়। এই ইন্তিফাদা চলে পাঁচ বছর, ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ফিলিস্তিনে।
২০১৪ সালে ইসরায়েলি পুলিশ ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো আল-আকসার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। যদিও তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তারা শুধু প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছে কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন।

২০১৪ সালের পর থেকে আল-আকসা মসজিদকে ঘিরে উত্তেজনা ও দখলদারিত্বের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তা মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মসজিদে প্রবেশে মুসলমানদের জন্য কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে—বিশেষ করে রমজানের মতো পবিত্র মাসে, যেখানে পুরুষদের জন্য ৫৫ বছর এবং নারীদের জন্য ৫০ বছর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বিধিনিষেধ বহু ফিলিস্তিনির জন্য মসজিদে নামাজ আদায়ের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী নিয়ম ভেঙে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো প্রায় ১৮০ জন ইহুদি উপাসককে আল-আকসা চত্বরে প্রার্থনার অনুমতি দেয়। এ পদক্ষেপ মুসলিমদের মাঝে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, কারণ এটি মসজিদের দীর্ঘকালীন ধর্মীয় মর্যাদা ও স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
মুসলমানদের দাবি, এই পরিবর্তন ইসরায়েলের পরিকল্পিত নীতির অংশ, যার মাধ্যমে মসজিদের নিয়ন্ত্রণে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
এই সংকট শুধু ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেক মুসলিম দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন আল-আকসার ধর্মীয় অবস্থান ও মুসলমানদের অধিকারে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। আজও আল-আকসা মসজিদ তার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে বিশ্ব বিবেকের সামনে প্রশ্ন তুলে দাঁড়িয়ে আছে—একটি মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ উপাসনাস্থলের আশায়।

সমাপ্তি
আল-আকসা মসজিদ শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি একটি প্রতীক—বিশ্বাস, সংগ্রাম ও অটল অবস্থানের প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যে মিনার একবারও মাথা নোয়ায়নি, বরং প্রতিটি দখল, প্রতিটি আগুন, প্রতিটি গুলির শব্দে আরও বেশি দৃঢ় হয়ে উঠেছে তার আত্মিক অবয়ব। ক্রুসেডারদের বিজয়, সালাহউদ্দিনের পুনরুদ্ধার, উসমানীয়দের রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা আধুনিক যুগের দখলদারিত্ব—সব কিছুর মধ্য দিয়েই আল-আকসা থেকেছে অমলিন, অভ্রান্ত।

আজও, যখন জেরুসালেমের আকাশে বারুদের গন্ধ ভেসে আসে, তখনও মসজিদুল আকসার আঙিনায় ভোরের আলো পড়ে নিঃশব্দে। সেই আলোয় ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণ যেন চিত্রিত হতে থাকে—মিম্বর, মিনার ও মোজাইকে। সময়ের শত আঘাত, রাজনীতির শত হিসাব-নিকাশ আর বেদনার অতল থেকে উঠে আসা এই মসজিদ তাই কেবল ইবাদতের স্থান নয়, হয়ে উঠেছে এক জাতির আত্মপরিচয়ের অন্তর্নিহিত প্রতিচ্ছবি।

এখনও আল-আকসা থেকে ধ্বনিত হয় আজানের ধ্বনি—ভেঙে দেয় দেয়ালের সীমা, জাগিয়ে তোলে আত্মা। যতদিন ঈমান টিকে থাকবে, ততদিন আল-আকসাও টিকে থাকবে—বিশ্বাসের প্রতিরূপ হয়ে, দুনিয়ার সমস্ত নির্যাতনের বিপরীতে মাথা উঁচু করে।
আল আকসা আজও আমাদের ডাকে, ইতিহাসের প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যেন সে ফিসফিস করে বলে—
“আমাকে ভুলো না, কারণ আমার মাঝে লুকিয়ে আছে তোমার আত্মপরিচয়, তোমার সংগ্রাম, তোমার ঈমান।”

লেখকঃ আরওয়া আনাম

 

‘মাতৃত্বই শ্রেষ্ঠ পরিচয়’—মা দিবসে লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের বিশেষ উদ্যোগ

বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসি আয়োজন করেছে এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রচারণা ‘মাতৃত্বই পৃথিবীর সবচেয়ে মহৎ পেশা’।
এই প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ১১ জন মায়ের জীবনগাথা ভিডিওচিত্রে ধারণ করেছে, যেখানে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব ও মাতৃত্বের ভারসাম্য রচনার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই ভিডিওগুলোতে উঠে এসেছে—কীভাবে এক একজন মা সংসার, সন্তান এবং কর্মক্ষেত্রে সমান নিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ, মমতা এবং ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্তগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো—সমাজে মায়েদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের জীবনের অজানা অধ্যায়গুলো সবার সামনে তুলে ধরা। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সন্তান লালন-পালন কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়; বরং এটি এক মহান ত্যাগের কর্মযজ্ঞ, যা অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় অনেক বেশি ভালোবাসা ও ধৈর্য দাবি করে।

মাতৃত্বকে একজন নারীর জীবনের শ্রেষ্ঠ পরিচয় হিসেবে তুলে ধরাই এই প্রচারণার প্রধান বার্তা।

 

নারীর স্বাস্থ্যরক্ষায় প্রযুক্তির বিপ্লব: বুয়েটের ‘নিওস্ক্রিনিক্স’ টিমের বিশ্বজয়

 

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্তন ক্যান্সার। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না হওয়ায় এই রোগে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী মৃত্যুবরণ করেন;বিশেষত আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে যেখানে সচেতনতা ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের অভাব প্রবল। ঠিক এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের গর্ব ‘বুয়েট’-এর একটি তরুণ দল এনে দিল এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি, যা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

জন হপকিন্স হেলথকেয়ার ডিজাইন কম্পিটিশন ২০২৫-এর ডিজিটাল হেলথ ট্র্যাক বিভাগে বিজয়ী হয়েছে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগের উদ্ভাবনী দল ‘নিওস্ক্রিনিক্স’।
তাদের তৈরি প্রযুক্তি—একটি AI-ভিত্তিক ডিভাইস ও অ্যাপ্লিকেশন, যা নারীদের নিজে থেকেই ঘরে বসে স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ করে দেয়। শুধুমাত্র লক্ষণ বিশ্লেষণ করেই প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্যতা শনাক্ত করা সম্ভব হয়, যা পরবর্তী চিকিৎসা গ্রহণে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে।

এই প্রকল্পের মূল নেতৃত্বে ছিলেন ফাহমিদা সুলতানা,’নিওস্ক্রিনিক্স’ টিমের লিড ইনোভেটর।
একজন নারী হিসেবে, নারীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তার নেতৃত্ব এই প্রকল্পকে দিয়েছে এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি। বাস্তব অভিজ্ঞতা, নারীর সমস্যা সম্পর্কে অনুভব, এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা—এই তিনের সমন্বয়ে তিনি টিমকে এগিয়ে নিয়ে যান সঠিক সমাধানের পথে।

দলটির অন্যান্য সদস্যরা-এইচ এম শাদমান,
সাদাতুল ইসলাম,মো. হাসনাইন আদিল,পৃথু আনান।
তত্ত্বাবধান করেছেন-অধ্যাপক মো. সোহেল রহমান, বুয়েট।
তথ্য ও মেডিকেল সহায়তায় ছিলেন-জারিন তাসনিম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ,রিবাতুল ইসলাম, রংপুর মেডিকেল কলেজ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে স্বাস্থ্যপরিসেবা এখনো শহরকেন্দ্রিক এবং নারীরা বহু সময় দ্বিধা বা লজ্জায় স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, সেখানে এই প্রযুক্তি হতে পারে এক প্রযুক্তিনির্ভর আর্শীবাদ। এটা কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং নারীর স্বাস্থ্য অধিকার ও সচেতনতার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

অভিনন্দন নিওস্ক্রিনিক্স টিম এবং বুয়েট!
তোমাদের উদ্ভাবন একদিন লাখো নারীর জীবন বাঁচাবে।

#NeoScreennix
#WomenInTech
#HealthcareInnovation
#DigitalHealth
#BangladeshPride
#BreastCancerAwareness

 

মুন্সিগঞ্জে দুই তরুণীকে মারধর: দোষীদের শাস্তির দাবি মহিলা পরিষদের

 

মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাটে দুই তরুণীকে প্রকাশ্যে মারধর এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সোমবার (১৩ মে) এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ মে ঢাকা থেকে চাঁদপুরগামী একটি লঞ্চ মুন্সিগঞ্জে সাময়িক যাত্রাবিরতি করলে দুই তরুণী ঘাটে নেমে কিছু কেনাকাটার জন্য বের হন। তখন স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হলে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে লঞ্চে হামলা চালানো হয় এবং দুই তরুণীকে মারধর ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়। প্রকাশ্যে একজন যুবক বেল্ট দিয়ে তাঁদের আঘাত করে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

মহিলা পরিষদ বলছে, এটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং নারীর প্রতি সহিংসতা, অবমাননা ও বৈষম্যের একটি গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, “নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও মৌলিক অধিকারের ওপর এ ধরনের হামলা একটি ভয়ংকর বার্তা দেয়।”
সংগঠনটি নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ ও সামাজিক মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

 

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলের দাবি

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের প্রেক্ষিতে ঢাকায় আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা কমিশনের প্রতিবেদন বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি বাস্তবায়িত হলে দেশে বিভাজন ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে।

‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন: বিতর্ক ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় বুধবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে। গবেষণা ও সামাজিক উন্নয়নমুখী সংগঠন ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বর্তমান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এ কারণে অবিলম্বে কমিশন ও তাদের প্রতিবেদন বাতিল করতে হবে। তারা সব ধর্ম ও মত-পথের নারীদের সমন্বয়ে নতুন করে একটি কমিশন গঠনের আহ্বান জানান। বিশেষভাবে ইসলামিক চিন্তাবিদদের কমিশনে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন,
“সরকার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে জানি না। পদে পদে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, আবার সরকারও সেসব ষড়যন্ত্রে পা দিচ্ছে। নারী সংস্কার কমিশনও আরেকটি ষড়যন্ত্র। এ জন্য এই কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি।”
তিনি প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশ্যে বলেন,
“কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদন যাচাই না করেই আপনি দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এতে করে সরকার কার্যত জনগণের মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে। আপনারা কি জনগণের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে চান?”

ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুর রব বলেন,“কমিশনের প্রস্তাবগুলো জাতিকে চূড়ান্ত বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি উদ্যোগ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মতকে উপেক্ষা করে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাই প্রায় সব মহল থেকেই এগুলোকে পরিত্যাজ্য বলে মনে করা হচ্ছে।”

লেফটেন্যান্ট কর্নেল (চাকরিচ্যুত) মো. হাসিনুর রহমান বলেন,“এই কমিশন পরিবারের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করবে। এটি বৃদ্ধাশ্রমকে প্রমোট করার কমিশন। এর মাধ্যমে মানুষকে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা চলছে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম আবদুল মান্নান বলেন,“কমিশনের বেশির ভাগ প্রস্তাব ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিন্ন পারিবারিক আইনসহ অনেক প্রস্তাব অন্যান্য ধর্মেরও পরিপন্থী। তাই এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে হবে।”

সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী অধ্যাপক শামীমা তাসনীম বলেন,“কমিশনের প্রস্তাবগুলো দাম্পত্য কলহের নতুন ইস্যু তৈরি করবে। বাস্তবায়িত হলে পরিবারের মহিলা সদস্যদের কাছে পুরুষ সদস্যদের শত্রু করে তুলবে।”

বক্তারা আরও বলেন, যৌনকর্মীদের শ্রমিক নয়, বরং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

গোলটেবিল বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জুলফিকার হাসান। সঞ্চালনা করেন ওয়ান ইনিশিয়েটিভের পরিচালক মুহাম্মাদ আবদুল মান্নান।

আরও বক্তব্য রাখেন:বুয়েটের অধ্যাপক মো.ফখরুল ইসলাম,
অ্যাডভোকেট ইকতেদার আহমেদ,মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুস সামাদ,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহীন আরা আনোয়ারী,সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি ফেরদৌস আরা খানম,আইপাস বাংলাদেশের সাবেক সিনিয়র অ্যাডভাইজর ডা. শামিলা নাহার,আইনজীবী সাবিকুন নাহার মুন্নি,ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর খলিলুর রহমান মাদানী,মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্সের খতিব আবদুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ,ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও সংগঠনটির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম।

 

মুসলিম হবার ‘অপরাধে’ চিকিৎসা বঞ্চিত অন্তঃসত্ত্বা নারী!

 

কলকাতার কস্তুরী দাস মেমোরিয়াল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এক অন্তঃসত্ত্বা মুসলিম নারী। অভিযোগ, হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সি কে সরকার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ওই রোগীকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানান।

ভুক্তভোগী নারী গত সাত মাস ধরে নিয়মিত ওই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তবে সম্প্রতি কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন হিন্দু পর্যটক নিহত হওয়ার ঘটনার পরপরই চিকিৎসক ডা. সি কে সরকার বলেন, “পহেলগাঁও ঘটনার পর আমি মুসলমান রোগী দেখা বন্ধ করেছি। হিন্দুদের উচিত তোমার স্বামীকে হত্যা করা, তাহলে বুঝবে যন্ত্রণা কাকে বলে।”

চিকিৎসকের এমন বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যে হতবাক হয়ে পড়েন রোগী ও তাঁর পরিবার। বাধ্য হয়ে তাঁরা অন্যত্র চিকিৎসা নিতে যান। বর্তমানে মা ও শিশু দুজনেই নিরাপদে রয়েছেন।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নেটিজেনদের প্রশ্ন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা কীভাবে একজন চিকিৎসকের নৈতিকতা এবং শপথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এদিকে আরও জানা যায়, কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতাল জে এন রে হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় পতাকার প্রতি ‘অসম্মান’ দেখানোর অভিযোগ তুলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

এ ধরনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও চিকিৎসাসেবার মৌলিক নীতিমালা আদৌ কি এসব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিদ্বেষের মধ্যেও অক্ষুণ্ণ থাকছে?

 

আলো ছড়ান যিনি:শিল্পী খাতুনের পাঠাগার

শিক্ষকতা, ব্যবসা আর সমাজসেবার মাঝেও যে কেউ নিজের গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করে যেতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার আছিম কুটিরা গ্রামের শিল্পী খাতুন।

স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে একসময় ঢাকায় বসবাস করতেন শিল্পী। তবে কোভিড-১৯ মহামারির পর তারা ফিরে আসেন নিজ গ্রাম আছিম কুটিরায়। এখানে কুটিরা ডিএস ক্যাডেট একাডেমিতে পড়ানোর পাশাপাশি নিজের পাঠাভ্যাস চালিয়ে যান। আশপাশের অনেকে তাঁর কাছ থেকে বই নিয়ে পড়তেন, আবার ফেরতও দিতেন। এই আগ্রহ দেখে তিনি নিজেই বই জমিয়ে তৈরি করে ফেলেন একট ছোট্ট পাঠাগার—’কুটিরা জ্ঞানের আলো পাঠাগার।’

গ্রামে একজন নারী হিসেবে পাঠাগার চালানো সহজ ছিল না। শুরুতে অনেকে বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। স্কুলে পড়ানোর সময়ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন শিল্পী খাতুন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। ধৈর্য আর নিষ্ঠায় গ্রামের নারীদের আস্থা অর্জন করেছেন এবং এখন পাঠাগার পরিচালনা কমিটির সব সদস্যই নারী।

বর্তমানে পাঠাগারটিতে একসঙ্গে ১৪ জন পাঠক বসে বই পড়তে পারেন। সদস্যসংখ্যা ১৩৭ জন। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, গৃহিণীসহ নানা শ্রেণির মানুষ এখানে বই পড়তে আসেন। শিল্পী খাতুন নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে বই কিনেছেন এবং অনেকেই বই উপহারও দিয়েছেন।

শুধু পাঠাগার প্রতিষ্ঠা নয়, সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও তাঁর নিয়মিত কাজ। রোজার সময় এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ইফতার ও ঈদসামগ্রী বিতরণ করেন। গ্রামের মানুষদের জন্য চালের কার্ডের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন তিনি।

শিক্ষকতার পাশাপাশি স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে শিল্পী খাতুন একটি মুদি ও মনিহারি দোকান চালু করেছেন। এই ব্যবসা তাঁদের পরিবারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।

শিল্পী খাতুন চান, তাঁর স্কুল ও পাঠাগারের মডেল আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ুক। যাতে গ্রামের আরও মানুষ পড়ালেখা ও সচেতনতার আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারে। এজন্য তিনি নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

পারিবারিক কলহের বলি হয়ে ঝরে গেলো একটি প্রাণ

 

চট্টগ্রামের র‍্যাব-৭ এর চান্দগাঁও ক্যাম্পের এক নির্জন অফিস কক্ষে সকালটা ছিল অন্যরকম নীরব। অফিসে ঢোকার সময় সহকর্মীরা হয়তো ভেবেছিলেন, প্রতিদিনের মতোই দায়িত্বে নিযুক্ত হবেন তাদের প্রাণচঞ্চল ও দায়িত্বশীল সহকর্মী এএসপি পলাশ সাহা। কিন্তু দরজা খুলতেই এক বিভীষিকাময় দৃশ্য তাদের চোখে পড়ে,রক্তে ভেজা ইউনিফর্মে পড়ে আছেন পলাশ সাহা, হাতে নিজের সার্ভিস রিভলভার।

একজন তরুণ, প্রতিশ্রুতিশীল পুলিশ অফিসার—যিনি রাষ্ট্রের সেবায় জীবন উৎসর্গ করতে শপথ নিয়েছিলেন, তিনিই কেন নিজেই নিজের জীবন কেড়ে নিলেন? মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া ছোট্ট একটি চিরকুট যেন সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় “আমার মৃত্যুর জন্য মা ও বউ কেউ দায়ী না। আমিই দায়ী। কাউকে ভালো রাখতে পারলাম না।” কিন্তু এই একটি বাক্যে ঢাকা পড়েনি সেই গভীর পারিবারিক সংকট, যেটি ধীরে ধীরে পলাশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

পলাশ সাহা ৩৭তম বিসিএসের মেধাবী র‍্যাব কর্মকর্তা। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার সন্তান হিসেবে এলাকার গর্ব। সহকর্মীদের ভাষায়, তিনি ছিলেন দায়িত্ববান, দৃঢ়চেতা এবং বিনয়ী। তার এমন করুণ পরিণতি কারো কল্পনায়ও আসেনি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, দুই বছর আগে সুস্মিতা সাহার সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়। সেই সম্পর্কের শুরু থেকেই পলাশের মা আরতি সাহার সঙ্গে সুস্মিতার সম্পর্ক খারাপ ছিল। সময়ের সাথে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠে। পলাশ চেষ্টা করেও মা এবং স্ত্রীর মধ্যে শান্তি আনতে পারেননি।

ফরিদপুরের চৌধুরীপাড়ায় পলাশের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে জানা যায় এক বেদনাময় চিত্র। শ্বশুর ভরত সাহা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার মেয়ে সুস্মিতাকে অনেক ভালোবাসত পলাশ। কিন্তু সেই ভালোবাসা তার মা সহ্য করতে পারেনি। মেয়েটা আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল কয়েকবার।” পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই সুস্মিতা তার শাশুড়ি আরতি সাহার নির্যাতনের শিকার হন। রান্না নিয়ে অপমান, কথা বলা নিয়ে টিপ্পনি, এমনকি ফেসবুকে আত্মহত্যার ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দিয়েও পরে বাধ্য হয়ে তুলে নিতে হয় তাকে।

পলাশের স্ত্রী সুস্মিতা সাহা সংবাদমাধ্যমে জানান, শাশুড়ির চাপে তিনি স্বামীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়েই তুলতে পারেননি। পলাশ খুবই ভালো মানুষ কিন্তু ছিলেন মাত্রাতিরিক্ত মাতৃভক্ত। এমনকি ৩৫ বছর বয়সেও মা তাকে নিজ হাতে খাওয়াতেন, কোন পোশাক পরবে সেটাও মা ঠিক করতেন। বাড়ির সব সিদ্ধান্তে শাশুড়ির আধিপত্য ছিল। ফলে স্বামীকে ভালোবাসলেও, সুস্মিতা নিজেকে যেন ‘তৃতীয় ব্যক্তি’ বলে মনে করতেন সংসারে।
বিয়ের শুরুর দিকে সুস্মিতা চেষ্টা করেছিলেন সংসারটাকে গুছিয়ে রাখতে। শাশুড়ির চুলে তেল দেয়া থেকে শুরু করে গোসল করানো পর্যন্ত সব করেছেন। কিন্তু এত যত্ন-আদর সত্ত্বেও সম্পর্কের বরফ গলেনি। বরং দিনের পর দিন বাড়তে থাকে উপেক্ষা ও মানসিক অবহেলা।

সুস্মিতার চাচাতো ভাই পার্থ সাহাও অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকে যৌতুকের জন্য চাপ ও নির্যাতন চলেছে। তবে পলাশকে সবসময় ভালো মনে হয়েছে।

এদিকে পলাশের আত্মহত্যার পর তার আত্মীয়রা সামাজিক মাধ্যমে স্ত্রীকে দায়ী করে নানা স্ট্যাটাস দিলেও সুস্মিতার দেওয়া তথ্যগুলো স্পষ্ট করে, এটি ছিল এক জটিল মানসিক দ্বন্দ্ব ও পারিবারিক একচ্ছত্র আধিপত্যের করুণ পরিণতি।

যদিও ঘটনাটিকে আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে: এটি কি নিছক আত্মহত্যা, নাকি মানসিক ও পারিবারিক নির্যাতনের প্ররোচনায় সংঘটিত আত্মহনন? বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় “আত্মহত্যায় প্ররোচনা” একটি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। তবে সামাজিক রীতি অনুযায়ী পারিবারিক কলহকে প্রায়শই গোপন করা হয় কিংবা ‘গৃহস্থালির ব্যাপার’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই ঘটনার ভেতরে লুকিয়ে আছে বৃহত্তর একটি প্রশ্ন—আমাদের সমাজে পারিবারিক সম্পর্ক কীভাবে একজন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে? বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা আমাদের আদালতগুলোতে জমে থাকলেও সমস্যা প্রতিরোধে নেই কোনো কার্যকর সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নীতি।

সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিবার তিনটি স্তরেই প্রয়োজন সচেতনতা, সহনশীলতা এবং সহানুভূতি। নইলে এমন পলাশদের আর শেষ নেই, শুধু সময়ের সাথে নামগুলোই পাল্টাবে।

তথ্যসূত্রঃপ্রথম আলো
যুগান্তর
চ্যানেল ২৪

 

রাবিতে নারী শিক্ষার্থীদের পোশাক নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে এক শিক্ষক ক্লাস চলাকালীন সময় বোরকা পরা ছাত্রীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সহযোগী অধ্যাপক এটিএম রফিকুল ইসলাম ছাত্রীদের ‘কালো কাক’ বলে কটাক্ষ করেন এবং অতীতে বহুবার শিক্ষার্থীদের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন নিয়ে অশোভন মন্তব্য করেছেন।

ঘটনার পরপরই মাস্টার্স শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী বিভাগীয় সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষক রফিকুল ইসলাম শুধু পোশাক নয়, শিক্ষার্থীদের পারিবারিক পটভূমি, অর্থনৈতিক অবস্থা, এমনকি শারীরিক গঠন নিয়েও বিদ্রূপ করতেন। নাম ধরে অপমান, বাবার পেশা নিয়ে কটূক্তি, অঞ্চলভেদে শিক্ষার্থীদের হেয় করা—এসব ছিল তার বক্তব্যের নিয়মিত অংশ।
এক শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষক রফিকুল ইসলাম প্রায়ই তাদের ‘টোকাই’, ‘বি-ক্লাস’ ইত্যাদি শব্দে অপমান করতেন এবং পছন্দের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করতেন।

তবে অভিযুক্ত শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নয়, বিভাগের এক সিনিয়র শিক্ষকের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। সেটিকেই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে বিভাগের সভাপতি ড. মুনসি মঞ্জুরুল হক জানান, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় অ্যাকাডেমিক সভা ডাকা হয়। সভায় রফিকুল ইসলাম তার আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চান। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

বিভাগীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যদি তিনি পুনরায় এ ধরনের আচরণ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় প্রধান।

 

সম্মিলিত নারী প্রয়াসের মানববন্ধন: মূল্যবোধের ভিত্তিতে নারী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি

সম্মিলিত নারী প্রয়াসের মানববন্ধন: ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নারী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি

নারী সংস্কার কমিশনের বিতর্কিত সুপারিশ বাতিল এবং নতুনভাবে কমিশন গঠনের দাবিতে গত ৮মে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে ‘সম্মিলিত নারী প্রয়াস’। বৃহস্পতিবার সকালে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধকে ভিত্তি করে ইসলামিক স্কলারদের নেতৃত্বে সব ধর্মের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নতুন নারী সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে।

সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, নারী সংগঠন, সুশীল সমাজ, শিক্ষক-ছাত্রী ও মানবাধিকার কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
সংগঠনের সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম অভিযোগ করেন, “নারী সংস্কার কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান কোনো মুসলিম নারী স্কলারকে অন্তর্ভুক্ত না করে পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন। এ সুপারিশ নারী সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে।” তিনি বলেন, “কমিশনের সদস্যদের উচিত নিজেদের মা, বোন ও কন্যাদের যৌন শ্রমিক হিসেবে কল্পনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, তাহলে তারা বুঝতে পারবেন আসল মর্যাদা কোথায়।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহীন আরা আনোয়ারী বলেন, যৌনকর্মীদের শ্রমিকের স্বীকৃতি দিলে গোটা সমাজ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। গনোরিয়া, সিফিলিস, এইডসসহ নানা রোগ বাড়বে এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হবে।
“যৌনকর্ম নয় তো পেশা, সে তো সমাজ নষ্টের নেশা”— এই স্লোগান ধারণ করে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি সাহেল মোস্তারী, তাহমিনা আক্তার সুরমা, নুসরাত জাহান লিজা, হেলেনা আক্তার লাকি ও নাদিয়া বিনতে মাহতাব।

সভাপতির বক্তব্যে ড. শামীমা তাসনিম বলেন, “এই কমিশনের সুপারিশ নারীর বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরুষকে নারীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা। অথচ ইসলাম নারী-পুরুষকে পরিপূরক হিসেবে চিহ্নিত করে সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নারী নীতিমালা না হলে তা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধ প্রবণতা বাড়াবে।”

 

অস্বাভাবিক স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম

 

বর্তমানে স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত, দেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো, যেমন ‘সেনোরা’, যেখানে এক প্যাকেটের দাম ১২০ টাকা।
এত চড়াদামে ন্যাপকিন কিনে ব্যবহার করা শুধুমাত্র একজন মেয়ের জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব স্বীকৃত, তবে কেন আমাদের জন্য এটি বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াতে হবে? কেন একটি সাধারণ, স্বাস্থ্যকর পণ্য কেনার জন্য আমাদের এত টাকা খরচ করতে হবে?

যে সমস্যাটি আমরা মুখোমুখি হচ্ছি: এই দাম সাধারণ মানুষের জন্য নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাদের পরিবারের আয় সীমিত, তারা কীভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনবে? কিছু পরিবারের সদস্যরা হয়তো কাপড় বা তুলা ব্যবহার করছে, যেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। কিন্তু, এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তবে এটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে।

প্রতিকার:
১. দামের নিয়ন্ত্রণ এবং সাশ্রয়ী পণ্য: সরকারকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট কমিয়ে, দাম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। সাশ্রয়ী এবং মানসম্পন্ন পণ্য সহজলভ্য করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই এটি কিনতে পারে।

স্বাস্থ্যকর বিকল্পের প্রচলন: কোম্পানিগুলির উচিত স্বাস্থ্যকর এবং সাশ্রয়ী বিকল্প বাজারে নিয়ে আসা। কাপড় বা তুলা ব্যবহার করার পরিবর্তে, সাশ্রয়ী দামে স্যানিটারি প্যাড পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।

উৎপাদন খরচ কমানো: কোম্পানিগুলি তাদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে, বিক্রির দামে সমন্বয় আনতে পারে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খরচ কমানো সম্ভব।

সরকারি নীতি এবং সহায়তা: সরকারের উচিত, নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি কার্যকর নীতি গ্রহণ করা, যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের সহজলভ্যতা এবং দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যায়।

স্যানিটারি ন্যাপকিন শুধুমাত্র একটি পণ্য বা খরচের বিষয় নয়, আমাদের সবার স্বাস্থ্য এবং জীবন সুরক্ষার প্রশ্নও বটে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম কমানো, তার মান নিশ্চিত করা, এবং সহজলভ্যতা নারীর মৌলিক অধিকার।
আমরা সকলেই দাবি জানাই, যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন আমাদের সবার জন্য সাশ্রয়ী, সহজলভ্য, এবং নিরাপদ হয়। স্বাস্থ্য বা জীবনের নিরাপত্তা কখনোই একটি শ্রেণীর জন্য সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

#স্যানিটারি_ন্যাপকিন #স্বাস্থ্য_অধিকার #সাশ্রয়ী_মূল্য #জনসচেতনতা #স্বাস্থ্য_নিরাপত্তা #আর্থিক_সাম্য
[8:25 pm, 26/04/2025] +880 1994-004543: ভিক্টোরিয়ান যুগের ফ্যাশন

ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩৭-১৯০১) ছিল একটি বিশেষ সময়, যেখানে ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলিতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। তবে এর পাশাপাশি এক অনন্য এবং কঠিন ফ্যাশন যুগও তৈরি হয়েছিল, যেখানে নারীদের জন্য সৌন্দর্য অর্জন করতে গেলে শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এই যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফ্যাশন ছিল কর্সেট, যা নারীদের শারীরিক গঠনকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আনার জন্য ব্যবহৃত হত।

ভিক্টোরিয়ান সমাজে নারীদের সৌন্দর্যের মাপকাঠি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট শরীরের গঠন, যা আওয়ারগ্লাস ফিগার নামে পরিচিত ছিল। এই শারীরিক আকৃতি অর্জন করতে কর্সেট ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে কর্সেটের ব্যবহারের ফলে নারীদের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

অতিরিক্ত টাইট কর্সেট পরার কারণে নারীদের পাঁজরের হাড় বিকৃত হয়ে যেত, যার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দিত। কর্সেটের চাপে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থানচ্যুতি ঘটত, যা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা এবং অসুস্থতা তৈরি করত। চিকিৎসা প্রতিবেদনগুলিতে দেখা গেছে, কর্সেট পরা নারীদের মধ্যে বেহুঁশ হয়ে পড়া এবং শ্বাসকষ্ট ছিল অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। এমনকি এক্স-রে এবং সংরক্ষিত কঙ্কালগুলি থেকেও প্রমাণ মিলেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে কর্সেট পরলে পাঁজরের হাড় স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে যেত।

এছাড়া, ভিক্টোরিয়ান যুগের ফ্যাশনে হুপ স্কার্ট ও ক্রিনোলিনের ব্যবহারও ছিল খুব জনপ্রিয়। এই পোশাকগুলি সাধারণত বৃহৎ স্কার্ট তৈরি করত, যা নারীদের দেহকে বিশাল আকারে প্রদর্শন করত। কিন্তু এসব পোশাকও ছিল মারাত্মক বিপজ্জনক। এগুলি যেমন চলাফেরায় অসুবিধা সৃষ্টি করত, তেমনি এগুলির আগুন ধরারও সম্ভাবনা ছিল, যা অনেক নারীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

সামাজিক চাপের কারণে নারীরা তাদের স্বাস্থ্যের কথা না ভেবে এই ধরনের ফ্যাশন এ বাধ্য হতেন। তবে, ১৯শ শতকের শেষ দিকে কিছু ডাক্তার, নারীবান্ধব লেখক ও ফ্যাশন ডিজাইনাররা নারীদের জন্য আরামদায়ক পোশাকের প্রচলন শুরু করেন। এভাবেই ২০শ শতকের শুরুতে কর্সেটের জনপ্রিয়তা কমে আসে এবং আধুনিক ফ্যাশনের বিকাশ ঘটে।

ভিক্টোরিয়ান যুগের ফ্যাশন নারীদের জন্য এক চরম শারীরিক কষ্টের যুগ ছিল। কর্সেট ও ক্রিনোলিনের মতো পোশাক নারীদের শরীরের স্বাভাবিক গঠন ও স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক ছিল, কিন্তু সমাজের চাপে তারা এসব পোশাক পরতে বাধ্য হতেন। আজকের দিনে, সৌন্দর্য এবং ফ্যাশনের মধ্যে আরাম এবং স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা আধুনিক সমাজের অগ্রগতির লক্ষণ।

 

অবশেষে পৃথিবীতে ফিরছেন সুনিতা উইলিয়ামস ও তার টীম

দীর্ঘ ১০ মাস মহাকাশে আটকে থাকার পর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরছেন মার্কিন নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর। বোয়িংয়ের স্টারলাইনার মহাকাশযানের ত্রুটির কারণে পরিকল্পিত সময়ের আগেই তাঁদের মহাকাশ স্টেশনেই থাকতে হয়েছে। অবশেষে নাসা ও স্পেসএক্সের যৌথ উদ্যোগে তাঁদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

২০২৩ সালের জুনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যান সুনিতা ও বুচ। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কিছু গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়ে দ্রুত ফিরে আসা। কিন্তু স্টারলাইনার মহাকাশযানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটিকে খালি অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়, আর দুই নভোচারী সেখানেই আটকে পড়েন। তাঁদের ফিরিয়ে আনার জন্য নাসা শুরু থেকেই চেষ্টা করলেও বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নেয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের পর।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত তাঁদের ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দিতে থাকে। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও এই বিষয়ে সরব হন এবং দাবি করেন, আগের বাইডেন প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এরপর নাসা স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন মহাকাশযানের মাধ্যমে তাঁদের ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। গত শুক্রবার নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ক্রু ড্রাগন সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং ২৯ ঘণ্টা পর এটি মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে। নতুন করে চার নভোচারী সেখানে যোগ দেন, যাঁরা আগামী ছয় মাস মহাকাশ স্টেশনে থাকবেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নাসার অ্যান ম্যাকক্লেইন, নিকোল আয়ার্স, জাপানের তাকুয়া অনিশি ও রাশিয়ার কিরিল পেসকভ।

এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু সুনিতা ও বুচই নয়, তাঁদের সঙ্গে আরও দুজন নভোচারী পৃথিবীতে ফিরছেন—নাসার নিক হেগ এবং রাশিয়ার আলেকসান্দর গরবুনোভ। গত বছর সেপ্টেম্বরে এই দুজন মহাকাশ স্টেশনে এসেছিলেন এবং তাঁদের ফেরার জন্য আগে থেকেই স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্রু ক্যাপসুলে দুটি ফাঁকা আসন রাখা হয়েছিল।

সোমবার থেকে সুনিতাদের ফেরার প্রস্তুতি শুরু হয়। মহাকাশযানের দরজা বন্ধ করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নির্ধারিত সময়েই তাঁরা পৃথিবীতে ফিরবেন। তবে আবহাওয়া, মহাকাশযানের অবস্থা এবং সমুদ্রের পরিস্থিতি তাঁদের ফেরার পথে প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
পৃথিবীতে ফেরার পর নভোচারীদের বেশ কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘদিন মহাকাশে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকার কারণে শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন আসে, যা পুনরায় পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে সুনিতা উইলিয়ামস ও তাঁর সহকর্মীরা ঘরে ফিরছেন। সারা বিশ্ব তাঁদের এই সফল প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে।

 

এপ্রিল মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৬২টি ঘটনা

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৬২টি ঘটনা ঘটেছে, যা মার্চ মাসের তুলনায় ৬৬টি কম। তবে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি—ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, হত্যা ও আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো এখনও সমাজে উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়ে গেছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের মাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানায়, এপ্রিল মাসে ৯৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২ জন শিশু, ৪৩ জন কিশোরী এবং ৮ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ২৫, যার শিকার হয়েছেন ৪ শিশু, ৮ কিশোরী ও ৯ নারী। এছাড়াও ৪ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ৩৩টি, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৬ জন, আর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি। এসিড হামলায় আহত হয়েছেন একজন নারী।

আত্মহত্যার দিক থেকেও মাসটি ছিল হতাশাজনক—১২ কিশোরী ও ২৩ নারীসহ ৩৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। অপহরণের ঘটনা ১১টি (৪ শিশু ও ৭ কিশোরী), আর নিখোঁজ রয়েছেন ৫ জন (২ শিশু, ২ কিশোরী ও ১ নারী)। অস্বাভাবিক মৃত্যু ও হত্যা মিলিয়ে নিহত হয়েছেন ৬৯ জন নারী, কিশোরী ও শিশু; যাদের মধ্যে ১৮ জন শিশু ও কিশোরী।

এমএসএফের প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, অনেক ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা স্থানীয় সালিশে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি। এই ধরনের সালিশি বিচার বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।

আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

 

শিশুদের শৈশব হোক নিরাপদ, গৃহশ্রমিকের শ্রম হোক মর্যাদাপূর্ণ

(শ্রম সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ)বাংলাদেশের শ্রমজগতে এক নতুন আলো ফেলেছে শ্রম সংস্কার কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন। শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা এবং গৃহ ও সৌন্দর্য সেবাখাতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।

কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে গৃহকর্মে নিয়োজিত ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার জন্য একটি কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫ অনুযায়ী এমন নিয়োগ ইতোমধ্যেই অবৈধ হলেও, আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় তা নিরবিচারে চলমান।
কমিশন মনে করে, ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫’-এর যথাযথ প্রয়োগ না হলে শিশুদের অধিকার সুরক্ষিত হবে না।

গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। বলা হয়েছে, নিয়োগের ধরন যাই হোক—আবাসিক, অনাবাসিক, খণ্ডকালীন কিংবা স্থায়ী—সবার জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ন্যায্য বেতন, ছুটি, নিরাপদ বাসস্থান ও খাবারের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এ জন্য বাধ্যতামূলক কর্মচুক্তি চালুর পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।

এছাড়া অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করাও এই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কমিশন বলেছে, গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।

শ্রম সংস্কার কমিশনের দৃষ্টিতে সৌন্দর্যসেবাখাতও শ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিউটি পারলারে কর্মরত নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, ডে কেয়ার সুবিধা এবং ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতে পৃথক বোর্ড গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষার বিষয়েও জোর দিয়েছে কমিশন।

পারলার কর্মীদের নিরাপত্তা বিশেষ করে রাতের সময় বাড়ি ফেরা, কর্মস্থলে হয়রানি রোধ, ও কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও উঠে এসেছে সুপারিশে। বলা হয়েছে, এই শ্রমিকরা শুধুই সেবিকা নন তাঁরা অর্থনীতির নীরব যোদ্ধা, যাঁদের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ জরুরি।

শ্রম সংস্কার কমিশনের এই প্রতিবেদন শুধু আইনি সংশোধনের আহ্বান নয়—এ এক নৈতিক প্রত্যয়: যে শিশুদের খেলাধুলার সময়, তারা যেন নিপীড়নের শিকার না হয়; যে নারীরা অন্যের ঘর সাজায়, তাঁরাও যেন নিজের জীবনে সম্মান ও নিরাপত্তা পান।

তথ্যসুত্র -প্রথম আলো

 

ডা. সায়েবা আক্তার: মাতৃস্বাস্থ্যের নীরব পথিকৃৎ

 

ডা. সায়েবা আক্তার একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, যিনি মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। তার উদ্ভাবন ‘সায়েবা’স মেথড’ বিশ্বের মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, তিনি ব্যক্তি হিসেবে নিজে থেকে গেলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।

১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করা ডা. সায়েবা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বেশ মেধাবী। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি গবেষণা ও চিকিৎসা সেবায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন।

উদ্ভাবন: ‘সায়েবা’স মেথড’
২০০০ সালে, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ (Postpartum Hemorrhage – PPH) প্রতিরোধে তিনি ‘ইউটেরিন বেলুন ট্যাম্পোনেড’ (UBT) নামক একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা ‘সায়েবা’স মেথড’ নামে পরিচিত। উন্নত দেশে এই সমস্যার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও, ডা. সায়েবা স্বল্পমূল্যের এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা প্লাস্টিকের ক্যাথেটারের মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে বেলুন তৈরি করে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। তার উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রচুর গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং হাজারো মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।

ডা.সায়েবা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গাইনিকোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের চিকিৎসা দিতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করেছেন।
এছাড়াও, তিনি সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের শিক্ষায় সহায়তা করতে ঢাকা ও গাইবান্ধায় দুটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার উদ্যোগে অনেক দরিদ্র মেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে এবং নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক প্রদান করে। এছাড়া, তিনি ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমি সাম্মানিক ফেলোশিপ অর্জন করেন।
তবে, তার কাজ আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল স্বীকৃতি পেলেও, ব্যক্তি হিসেবে তিনি সেই মর্যাদার আসনে আসতে পারেননি,থেকে গেলেন জনমনের আড়ালে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা তার উদ্ভাবিত পদ্ধতির প্রশংসা করলেও,ব্যক্তি হিসেবে কাজের জন্য পাননি বিশেষ কোন বিশ্বস্বীকৃতি।
প্রায়শই দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের কাজ বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেলেও, তারা ব্যক্তিগতভাবে উপেক্ষিত থাকেন। তার উদ্ভাবন নোবেল পুরস্কার কিংবা র‍্যামোন ম্যাগসেসে পুরস্কারের যোগ্য হলেও, তিনি এখনো সে পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মাননা পাননি।

ডা. সায়েবা আক্তার কেবল একজন চিকিৎসক নন, তিনি একজন পথিকৃৎ, মানবতার সেবক। তার উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসুক বা না আসুক, তার কাজের মাধ্যমে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ভবিষ্যতে বিশ্ব তাকে আরও বড় পরিসরে সম্মানিত করবে, এমনটাই প্রত্যাশা।

 

রাবিতে ছাত্রীসংস্থার সহায়তা বুথ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ‘সি’ ইউনিটের প্রথম ধাপের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। দুপুর আড়াইটায় শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা। এ ব্যস্ত সময়ে ভর্তি-ইচ্ছুক ছাত্রীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

শনিবার (২৬ এপ্রিল) সকালে ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনে ছাত্রী সংস্থার সদস্যরা একটি সহায়তা বুথ স্থাপন করেন। এখানে স্যালাইন, পানীয় জল সরবরাহের পাশাপাশি যেসব ছাত্রী আবাসন সমস্যায় পড়েছেন, তাদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সংস্থার এক সদস্য জানান, তাদের কার্যক্রম তিনটি পর্যায়ে পরিচালিত হয়—দাওয়াত, সংগঠন ও প্রশিক্ষণ এবং কল্যাণ ও সমস্যা সমাধান। ভর্তি পরীক্ষার সময় অসচ্ছল ছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা, প্রাথমিক চিকিৎসা, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি বছরের অন্যান্য সময়েও শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা মানবিক উদ্যোগে অংশ নেয় সংস্থাটি।

আরেক সদস্য জানান, ইসলামী জীবনবোধে আলোকিত আদর্শ নারী গড়ে তোলাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার মূল লক্ষ্য। ১৯৭৮ সালের ১৫ জুলাই ঢাকায় ১৮ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮০ সালে এবং আজও তা সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থী আফরোজ মনি বলেন, “এ ধরনের সহায়তা সত্যিই প্রশংসনীয়। অনেক সময় ছাত্রীদের পক্ষে সরাসরি সহায়তা চাইতে দ্বিধা হয়। কিন্তু এখানে আপুরা পাশে থাকায় আমরা সাহস পাচ্ছি। রাতে থাকার ব্যবস্থাও করেছেন তাঁরা, আমাদের প্রতি তাঁদের যত্নশীল আচরণ অনেক স্বস্তি দিয়েছে।”

 

নারী ও পুরুষের মাঝে মর্যাদায় সমতা, কিন্তু দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা — এটাই ইসলামের নীতি

আঁখি ফেরদৌসী: একটি দেশের জনগণের জন্য যে কোন ধরনের নীতিমালা প্রণয়নে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে ? যে বিষয়টি প্রাধান্য পাবে তাহলো জনগণের মৌলিক অধিকার ও কল্যাণ।সে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট,ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সম্মান,সংবিধান ও আইনি কাঠামো যাতে করে সেই মূলনীতির মাধ্যমে যাদের জন‍্য মূলনীতি প্রনয়ন করা হয়েছে তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়।

এবার আসা যাক আলোচিত নারী বিষয়ক সংস্কার কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত নারী নীতিমালার বিষয়ে-
একদম শুরুতেই এই নীতিমালার লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে-
‘‍সর্বক্ষেত্রে সর্বস্তরে নারীর প্রতি বৈষম বিলুপ্তি এবং নারী পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ চিহ্নিতকরণ’
অর্থাৎ তাদের মূল ফোকাস নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমতা ।
সংক্ষেপে বললে:
‘সমতা’ মানে সবাইকে সব দিক থেকে একরকম করে দেওয়া।
‘ন্যায্যতা’ মানে যার যা প্রাপ্য, উপযোগী এবং যথার্থ — সেই অনুযায়ী অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়া।
মানুষ হিসেবে মানবিক অধিকার আর সামাজিক বা নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে ইসলামও সমতার কথা বলে। যেমন-
শুরা আহযাবের ৩৫ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে-
নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়ামপালনকারী পুরুষ ও নারী, নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী, তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’‍

সূরা নাহলের ৯৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

যে ব্যক্তিই মুমিন থাকা অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন যাপন করাব এবং তাদেরকে তাদের উৎকৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব।’

সূরা তওবা ৭১ নং এ বলা হয়েছে-

আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু [১], তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে; তারাই, যাদেরকে আল্লাহ্‌ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

সূরা নিসার ১২৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

আর যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, যদি সে মুমিন হয়ে থাকে, তবে এরূপ লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।

আরো বলা হয়েছে-

“পুরুষদের জন্য যা তারা উপার্জন করে তার প্রতিফল, আর নারীদের জন্যও যা তারা উপার্জন করে তার প্রতিফল।”
(সূরা আন-নিসা, ৪:৩২)

এই আয়াত গুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে,মানুষ হিসেবে পুরুষ ও নারীর আল্লাহর কাছে সমান। তারা আল্লাহর কাছে সম্মানিত হবেন তাদের কাজের ভিত্তিতে, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়।
তাই ইসলামে যেমন সমতা (equality) গুরুত্ব রয়েছে আবার ন্যায্যতা (equity/justice)-কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মানে, ইসলামে নারী-পুরুষকে একই রকম সব দায়িত্ব বা অধিকার দেয়নি, বরং তাদের স্বভাব, যোগ্যতা এবং ভূমিকার উপর ভিত্তি করে ন্যায্য অধিকার ও দায়িত্ব বণ্টন করেছে।
যেমন-পুরুষদের উপর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ও নারীদের রক্ষা ও সম্মান দেওয়া দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা সমতার বদলে ন্যায্যতার উদাহরণ। কারণ নারী ও পুরুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য এক নয়, তাই তাদের দায়িত্বও স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন।

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
“নারী শ্রমিকের শ্রম কখনো বিনষ্ট করি না; তোমরা একে অপরের অংশ।”
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯৫)

আরো বলেছেন-
“পুরুষরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের একের ওপর অপরের বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের অর্থ দিয়ে তাদের রক্ষা করে।”
(সূরা আন-নিসা, ৪:৩৪)
এখানে বোঝানো হয়েছে, পুরুষের উপর পরিবারের নেতৃত্ব ও দায়িত্ব আর্থিক ও শারীরিকভাবে বেশি। নারীর দায়িত্ব প্রধানত পরিবারকে ভালোভাবে রক্ষা করা ও সহযোগিতা করা। এখানে সমতা নয়, বরং ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

ইসলামে ন্যায্যতার নীতি বাস্তব জীবনে কিভাবে প্রয়োগ হয়েছে তা দেখা যাক-

১. খাদিজা (রা.) মহানবী (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী, নিজে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
তিনি ব্যবসার মাধ্যমে আর্থিকভাবে নিজেকে এবং নবীজি (সা.)-কেও সহযোগিতা করেছেন।
কিন্তু তাঁর উপর পরিবার চালানোর পুরুষের দায়িত্ব চাপানো হয়নি। বরং স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছেন।
তার মানে নারী চাইলে ব্যবসা করতে পারে, কিন্তু পরিবারের ভরণপোষণের মূল দায়িত্ব পুরুষের — এটি ইসলামের ন্যায্যতার নীতি।

২.ফাতিমা (রা.) ঘরের কাজ করতেন, সন্তানদের দেখাশোনা করতেন, এবং ধর্মীয় অনুশাসনে জীবন পরিচালনা করতেন।
স্বামী হযরত আলী (রা.) ঘরের বাইরের কাজ করতেন এবং আর্থিক দায়িত্ব বহন করতেন।
যখন ফাতিমা (রা.) গৃহকর্মে কষ্ট পেতেন, তখন নবীজি (সা.) তাঁকে ধৈর্য ধারণের এবং তাসবীহ তাহলীলের শিক্ষা দিয়েছেন।
অর্থাৎ নারীর আসল দায়িত্ব পরিবার পরিচালনা করা — কিন্তু এটি দাসত্ব নয়, বরং মর্যাদার কাজ তা তুলে ধরা হয়েছে।

৩. উম্মে সালামা (রা.) হুদাইবিয়ার সন্ধি চলাকালে নবীজি (সা.) মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন, তখন উম্মে সালামা (রা.) গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেটা নবীজি (সা.) মেনে নেন।
তাঁর বুদ্ধিমত্তা পুরো মুসলিম উম্মাহকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে এটাই বুঝা যায় ইসলাম নারীর বুদ্ধিমত্তাকে সম্মান করে এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পরামর্শে নারীর অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়।
৪. হযরত নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) — উহুদের যুদ্ধে তিনি নবীজি (সা.)-কে রক্ষা করতে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন।
যদিও নারীদের উপর যুদ্ধ ফরজ ছিল না, তবুও প্রয়োজনে ইসলাম নারীদের সম্মানজনক ভূমিকা রাখতে অনুমতি দিয়েছে।

ইসলাম ন্যায্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগ করেছে, তবে চরম প্রয়োজনে নারীও সম্মানজনক অবস্থানে থাকতে পারে বলেও স্বীকৃতি দিয়েছে।ন‍্যায‍্যতার ভিত্তিতে দায়িত্বের বন্টন মানে এই নয় যে ইসলামে নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে বরং তার যোগ্যতা, প্রয়োজন ও স্বভাবের ভিত্তিতে ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে বাস্তবে নারী ও পুরুষ পরস্পরের পরিপূরক (complementary), প্রতিদ্বন্দ্বী (competitive) নয়।

 

বান্দরবানে শিক্ষা কর্মকর্তা দ্বারা নারী শিক্ষিকা লাঞ্ছনার স্বীকার

 

বান্দরবানে পর্দা ও নিকাব পরিধানের কারণে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী শিক্ষিকাকে মৌখিক পরীক্ষার সময় লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন খানের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, চিংকুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মাশরুফা সাঈদী তুন্না প্রাইমারি টিচার্স ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) প্রাথমিক শিক্ষকদের চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে গেলে কক্ষে প্রবেশের পর পর্দা নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী পর্দা পরিধান করাকে কেন্দ্র করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ধর্মীয় কটাক্ষ ও অবমাননাকর মন্তব্য করেন এবং হুমকিও দেন যে, পর্দার কারণে অন্য একজন শিক্ষিকাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, কক্ষে উপস্থিত অন্য কর্মকর্তারাও এই আচরণের কোনো প্রতিবাদ করেননি। উল্লেখ্য, শিক্ষিকা তুন্না একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী, যিনি প্রতিনিয়ত দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। তাঁর স্বামী তাঁর বদলির বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করছিলেন বলেও জানা গেছে।

ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদ এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা জানায়। তারা বলেন, এই ঘটনা শুধুমাত্র একজন নারীর ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি অবজ্ঞাই নয়, বরং তা নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

এদিকে, ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) বান্দরবান সদরের মুক্তমঞ্চ চত্বরে মানববন্ধনের আয়োজন করে সচেতন নাগরিক সমাজ। বক্তারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবিলম্বে বরখাস্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বান্দরবান প্রতিনিধি আসিফ ইকবাল, হাবিব আল মাহমুদ, মো. হাবিবুল্লাহ আফফান, রুমানা আক্তারসহ স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীরা।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “স্বাধীন দেশে একজন নারী তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী চলবেন এটাই স্বাভাবিক। সেখানে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা যদি এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন, তবে তা পুরো জাতির জন্য লজ্জাজনক।”

ঘটনার তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

 

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিল ও পুনর্গঠনের দাবিতে ইবিতে মানববন্ধন

 

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ প্রত্যাহার এবং বর্তমান কমিটি বাতিল করে নতুন কমিশন গঠনের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) নারী শিক্ষার্থীরা।

বুধবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অর্ধশতাধিক নারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। তারা বলেন, বর্তমান কমিশনের সুপারিশে যৌনকর্মীদের পেশাগত স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

বক্তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান কমিশন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সুপারিশ করেছে। তারা দাবি করেন, ইসলাম নারীকে যে সম্মান দিয়েছে, তা যথেষ্ট এবং সেই অধিকার বাস্তবায়নের দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. খোন্দকার আরিফা আক্তার বলেন, “এই কমিশনে যারা আছেন, তাদের অধিকাংশই পশ্চিমা ভাবধারায় প্রভাবিত এনজিও-সংশ্লিষ্ট। তারা বৃহত্তর নারী সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি নন। নতুন করে কমিশন গঠন করে সংস্কারের প্রস্তাব আনা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “কমিশনের কিছু সুপারিশ কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং অন্যান্য ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে। যা দেশের ধর্মপ্রাণ জনগণের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে।”

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা আরও দাবি জানান, ইসলাম অনুযায়ী নারীদের উত্তরাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, তবে ধর্মীয় বিধান পরিবর্তনের নামে কোনো চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার তারা মেনে নেবেন না।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন কতিপয় সুপারিশ পেশ করলে তা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ইবিতে এ প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

 

চোখ ঘষা: স্বস্তির ফাঁদে লুকানো বিপদ!

চোখ চুলকালে আমরা অনেকেই অবচেতনভাবে হাত দিয়ে ঘষে ফেলি। প্রথমদিকে এটি স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, নিয়মিত বা জোরে চোখ ঘষার অভ্যাস আমাদের অজান্তেই নানা ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। চোখ শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল অঙ্গ, তাই এর যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

চোখ ঘষার ফলে কর্নিয়া বা কনজাংটিভার ওপর চাপ পড়ে, যা চোখে খসখসে ভাব, লালচে রঙ ও ঝাঁঝালো অনুভূতির জন্ম দিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—নোংরা বা জীবাণুযুক্ত হাতে চোখ ঘষলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে কনজাংটিভাইটিস বা চোখ ওঠার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এছাড়া, যারা গ্লুকোমার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে চোখ ঘষা চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়িয়ে অপটিক নার্ভের ক্ষতি করতে পারে, যা দৃষ্টিশক্তি ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। আবার, নিয়মিত ঘষার ফলে চোখের চারপাশের নরম ত্বকে বলিরেখা বা ডার্ক সার্কেল দেখা দিতে পারে, যা বয়সের আগেই চেহারায় ক্লান্তির ছাপ ফেলে।

সবচেয়ে মারাত্মক একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হলো কর্নিয়ার গঠন বিকৃতি—যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কেরাটোকোনাস বলা হয়। এ অবস্থায় কর্নিয়া পাতলা ও শঙ্কু আকৃতির হয়ে পড়ে, ফলে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যায় এবং তা সারাজীবনের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে অ্যালার্জি বা ধুলোবালির কারণে চোখে অস্বস্তি হলে, তাৎক্ষণিকভাবে চোখ ঘষার পরিবর্তে ঠান্ডা পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে নেওয়া, কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করা অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আইড্রপ ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। হালকা চাপ দিয়ে চোখ চেপে ধরা বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়াও আরাম পেতে সহায়ক হতে পারে।

চোখে যদি লালভাব, ব্যথা, ঝাপসা দেখা বা চুলকানি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দেরি না করে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়াই উত্তম। স্মরণে রাখা উচিত—চোখের প্রতি অবহেলা মানেই নিজের প্রতি অবহেলা।

সতর্ক থাকুন, চোখের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।

 

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন: একটি পর্যালোচনা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ২০২৫’ প্রকাশিত হয়েছে। আমি মনে করছি, এই প্রতিবেদনের একটি পর্যালোচনা জরুরি, যাতে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং বাস্তবায়নের দিকগুলো যাচাই করা যায়। প্রায় দুইশো পৃষ্ঠার এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে মোট ১৭টি অধ্যায় রয়েছে। এটি প্রণয়ন করা হয়েছে বর্তমান নারী নীতির ভিত্তিতে, এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সুপারিশও করা হয়েছে।
যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের নিয়ে কাজ করেন, তারা এই প্রতিবেদনের বড় একটি অংশকে ইতিবাচক হিসেবে দেখবেন বলেই মনে হয়। নারীর উন্নয়ন, মেধার বিকাশ এবং গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপনা—এই বিষয়গুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রতিটি খাতের জন্য কেবল বর্তমান নয়, পরবর্তী সরকারগুলোর করণীয়ও তুলে ধরেছে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয় এবং ভালো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে।
তবে কিছু বিষয় আছে যেগুলো পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে এই প্রতিবেদনকে আরও বিস্তৃত ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব।
প্রথমত, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পালাবদলের সময় নারীদের সক্রিয় ভূমিকা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। দেশের প্রতিটি স্তরের নারী তখন ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটানোর আন্দোলনে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। এই অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে, তা যেন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একটি আর্কাইভে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এমন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার।
দ্বিতীয়ত, বর্তমানে শহরাঞ্চলে নারী ও কন্যাশিশুর জন্য সূর্যের আলো, খোলা জায়গায় নিরাপদে হাঁটার সুযোগ এবং প্রাইভেসি সহ শরীরচর্চার ব্যবস্থা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম গঠনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ অবহেলিত। এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রতিবেদনটিতে থাকা উচিত।
এবার আসা যাক কিছু নির্দিষ্ট সুপারিশে, যেগুলো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে:
১। ধারা ৩.২.১.১, ১২.৩.১.১ (জ) ও ১২.৩.২.৩-এ যৌনকর্মীদের সুরক্ষা ও শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হলেও, এই পেশায় বাধ্য হয়ে আসা নারীদের সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। এতে করে এই পেশায় থাকা নারীরা যেমন ভবিষ্যতে পুনরায় নিপীড়নের শিকার হতে পারেন, তেমনি আরও নারীদের এই পেশায় ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত যেন তারা সম্মানের সঙ্গে বিকল্প জীবনে ফিরে যেতে পারেন, তাদের সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত হয় এবং দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২। ধারা ৩.২.২.১.২-এ বিবাহ বিচ্ছেদের সময় মোহরানা আদায় নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ইসলামী পারিবারিক আইনে মোহরানা বিবাহের সময়ই পরিশোধযোগ্য। এটি বিবাহ বিচ্ছেদের সাথে সম্পর্কিত নয়। তাই এখানে আইন অনুযায়ী মোহরানা বিবাহের সময়েই আদায়যোগ্য—এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা উচিত এবং তা বাস্তবায়নে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ থাকা দরকার।
৩। ধারা ৩.২.২.১.১১ ও ৩.২.৩.১.১-এ সকল ধর্মের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রস্তাব এসেছে, যা আমাদের সমাজের বহুধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। এই সুপারিশ CEDAW-এর একটি প্রভাব হতে পারে, তবে আমাদের দেশে প্রতিটি নাগরিক যেন নিজের ধর্ম অনুযায়ী পারিবারিক ও সম্পত্তির অধিকার পায় এবং প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে পারে—এমন সুপারিশ থাকা উচিত।
৪। CEDAW (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women) আন্তর্জাতিকভাবে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার একটি সনদ, যা বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে সংরক্ষণসহ স্বাক্ষর করেছে। সংরক্ষিত ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে ধারা ২ এবং ধারা ১৬(১)(c), যেগুলো ইসলামী শরীয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবেদন সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে, যা অপ্রয়োজনীয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অসম্মানসূচক। বরং সনদে স্বাক্ষরকালে যেভাবে এই সংরক্ষণ রাখা হয়েছিল, সেটি বজায় রেখেই এর বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর সুপারিশ করা উচিত ছিল।
সবশেষে আমি মনে করি, দেশের শিক্ষিত ও সচেতন নারীদের প্রতিনিধিত্বে একটি নতুন কমিশন গঠন করে এই প্রতিবেদনটি সংশোধন করা জরুরি, যাতে এটি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।

-মারদিয়া মমতাজ