banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 61 বার পঠিত

 

উত্তাল নদী পেরিয়ে জীবনের আলো—চরের মায়েদের ভরসা ফাতিমা রিমা

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল—চরকাজল ও চরবিশ্বাস। চারদিকে নদী, মাঝখানে অনিশ্চিত জীবনযাত্রা। এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই হাজারো প্রসূতি মায়ের কাছে একটিই নাম এখন আশার আলো—ফাতিমা আক্তার রিমা।

ডিপ্লোমা চিকিৎসক রিমা যেন শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মী নন, বরং এক নির্ভরতার প্রতীক। গত দুই বছরে তিনি ২৪৩টি নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করেছেন। যেখানে চিকিৎসা সুবিধা দুর্লভ, সেখানে এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি জীবনের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প।

দরিদ্র পরিবারের অনেক মায়ের জন্য সিজারিয়ান অপারেশন মানেই অতিরিক্ত খরচ আর শারীরিক কষ্ট। সেই বাস্তবতায় রিমা আক্তার নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন এক আশীর্বাদ। স্থানীয়দের অনেকেই বলেন, “তার হাতে যেন আল্লাহর রহমত আছে।” তবে রিমার কাছে এটি কোনো অলৌকিকতা নয়—এটি তার নিষ্ঠা, দক্ষতা আর মানবিকতার ফল।

দিন-রাতের কোনো হিসাব নেই তার। কাঁচা মেঠোপথ, কাদামাটি, অন্ধকার রাত কিংবা ঝড়-বৃষ্টি—সব বাধা উপেক্ষা করে তিনি ছুটে যান প্রসব বেদনায় কাতর নারীদের কাছে। একটি ফোন কলই যথেষ্ট—তিনি রওনা দেন। কখনো গভীর রাতে, কখনো উত্তাল আবহাওয়ায়। পৌঁছে যান ঠিকই, কারণ তিনি জানেন—তার পৌঁছানো মানেই একটি নতুন জীবনের নিরাপদ আগমন।

গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় আট কিলোমিটার নদীপথ। ট্রলার বা লঞ্চে যেতে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা, আর বিকেল ৫টার পর বন্ধ হয়ে যায় নৌযান চলাচল। ঝড়-বৃষ্টির দিনে সেই পথ যেন মৃত্যুঝুঁকির সমান। ফলে জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা। হাতে গোনা কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও নারী চিকিৎসকের অভাব প্রকট। ফলে প্রসবকালীন ঝুঁকি সবসময়ই তাড়া করে মায়েদের। অনেক সময় হাসপাতালের পথে যাওয়ার আগেই ঝরে যায় দুইটি জীবন—মা ও নবজাতক।

এই কঠিন বাস্তবতায় রিমা আক্তারের কাজ যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব। গত এক বছরে তার করানো নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে কোনো মা বা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি—যা এই অঞ্চলের জন্য এক বিরল সাফল্য। নামমাত্র খরচে, ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—মানবিকতা থাকলে সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

রিমা আক্তারের এই পথচলা শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, এটি এক অনুপ্রেরণার গল্প। দুর্গম চরের অসহায় মায়েদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়েছেন—একজন মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টাই বদলে দিতে পারে বহু মানুষের জীবন।

আজ চরকাজল ও চরবিশ্বাসের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন—তিনি ভরসা, তিনি সাহস, তিনি নিরাপদ মাতৃত্বের আরেক নাম।

Facebook Comments Box