banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 93 বার পঠিত

 

আফ্রিকার লৌহমানবী সিরলিফ

​দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ আর বারুদের গন্ধে তখন লাইবেরিয়ার বাতাস ভারী। অবকাঠামো বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই, অর্থনীতি ধুলিসাৎ এবং সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ঠিক এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উঁকি দেয় একটি নতুন ভোরের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার নাম অ্যালেন জনসন সিরলিফ।
২০০৬ সালের ১৬ জানুয়ারি লাইবেরিয়ার ২৪তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল একটি দেশকেই নতুন করে স্বপ্ন দেখাননি, বরং পুরো আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচনা করেন। বিশ্ব তাঁকে চেনে ‘আফ্রিকার লৌহমানবী’ হিসেবে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে অদম্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে জরাজীর্ণ সমাজকেও নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব।

​অ্যালেন জনসন সিরলিফের ক্ষমতার মসনদে আরহণের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না; এটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী এই নারী চাইলে বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘের মতো সংস্থায় নিরাপদ ও বিলাসী জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু মাতৃভূমির টানে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন লাইবেরিয়ায়।
আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁকে অমানবিক জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে, এমনকি দুবার দেশ ছেড়ে নির্বাসনেও যেতে হয়েছে। তবুও মৃত্যুভয় তাঁকে দমাতে পারেনি। চার্লস টেলরের মতো যুদ্ধাপরাধী শাসকের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন কণ্ঠস্বর এবং সাহসিকতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘লৌহমানবী’ বা ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

​প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিরলিফের সামনে চলে আসে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। দেশটির কোষাগার একদম শূন্য এবং ঘাড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা। তিনি তাঁর জাদুকরী কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাইবেরিয়ার হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং বিপুল পরিমাণ ঋণ মওকুফ করাতে সক্ষম হন।
ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সচল করা এবং ভেঙে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তিনি লাইবেরিয়াকে নতুন জীবন দান করেন। তাঁর শাসনামলেই লাইবেরিয়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে হাঁটতে শুরু করে, যা ছিল দেশটির জন্য এক অভাবনীয় সাফল্য।

সিরলিফের শাসনামল কেবল ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নারী জাগরণে তিনি ছিলেন এক অগ্রদূত। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী।
তিনি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন।
নারী অধিকার রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
তাঁর এই অর্জন বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

​ক্ষমতার প্রতি মোহহীনতা সিরলিফকে আফ্রিকার অন্যান্য নেতাদের থেকে আলাদা করেছে। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর, তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন। ১৯৪৪ সালের পর লাইবেরিয়ায় এটিই ছিল এক নির্বাচিত সরকার থেকে অন্য নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথম ঘটনা।

বর্তমানে তিনি ‘অ্যালেন জনসন সিরলিফ প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার ফর ওমেন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আফ্রিকার ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিহাসের পাতায় অ্যালেন জনসন সিরলিফ কেবল একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট নন, তিনি সাহসিকতা ও পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।

Facebook Comments Box