banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 69 বার পঠিত

 

বাংলাদেশে কৃষিতে নারীর উত্থান ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের কৃষি খাত বহুদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতের ভেতরে একটি নীরব পরিবর্তন ঘটছে—নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। একসময় কৃষিকে পুরুষনির্ভর পেশা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা থেকে শুরু করে উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ—সব ক্ষেত্রেই নারীরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছেন।

বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কৃষিতে নারীর উপস্থিতি এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং কেন্দ্রীয়। কর্মক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত, যা পুরুষের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এর অর্থ হচ্ছে, কৃষি খাতের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এখন অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। বিশেষ করে ফসল সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিবর্তনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর। কাজের সন্ধানে বা উন্নত জীবনের আশায় অনেক পুরুষ শহরে বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে গ্রামের কৃষিকাজ পরিচালনার দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই নারীদের ওপর এসে পড়ছে। তারা শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবেও ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন। গবাদিপশু পালন, সবজি উৎপাদন এবং স্থানীয় বীজ সংরক্ষণে নারীদের নেতৃত্ব এখন সুস্পষ্ট।

তবে এই অগ্রগতির পেছনে বাস্তবতা পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো জমির মালিকানা। অধিকাংশ নারী কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও তাদের নামে জমির মালিকানা খুবই সীমিত। এর ফলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি পান না এবং ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকেন। বাস্তবতা হচ্ছে—যে কাজ তারা করছেন, সেই কাজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে। জমি বা সম্পত্তি না থাকায় তারা জামানত দিতে পারেন না, ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন ব্যবস্থায়। আধুনিক প্রযুক্তি বা উন্নত বীজ ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় তাদের উৎপাদনশীলতা সীমিত থেকে যায়। ফলে তারা কঠোর পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারেন না—এটা একটা বাস্তব এবং অস্বস্তিকর সত্য।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট। কৃষি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলকভাবে কম সুযোগ পান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রযুক্তি নারীদের কাজ সহজ করছে, বিশেষ করে পশুখাদ্য প্রস্তুত, শস্য সংরক্ষণ এবং শুকানোর ক্ষেত্রে। এই ধরনের প্রযুক্তি সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে নারীদের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বাড়তে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। বর্তমানে অনেক নারী কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমেও যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু এখানে একটা বড় সমস্যা হলো—এই শিক্ষিত জনশক্তিকে মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ, সম্ভাবনা আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো—সমাধান কী?
প্রথমত, জমির মালিকানায় নারীর অধিকার নিশ্চিত না করলে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। এটি শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।
দ্বিতীয়ত, নারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালু করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
তৃতীয়ত, কৃষি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নারীদের নাগালের মধ্যে আনতে হবে—শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে।

সবশেষে, একটা বিষয় পরিষ্কার —নারীর এই অংশগ্রহণকে “সহায়তা” হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। তারা এখন কৃষির প্রধান চালিকাশক্তির একটি অংশ। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
যদি নীতি, প্রযুক্তি এবং অর্থায়ন—এই তিনটি জায়গায় সঠিক সমন্বয় করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষি খাত শুধু টিকে থাকবে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
তাই কৃষিতে নারীর উত্থান কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়—এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা দরকার। এটাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে ক্ষতি বাংলাদেশেরই

Facebook Comments Box