banner

শনিবার, ১৩ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 164 বার পঠিত

 

বাংলাদেশের নারী অধিকার: অগ্রগতি না পশ্চাৎগমন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে বৈশ্বিক একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা এমন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যা অনেক প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। দীর্ঘদিন ধরে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, নতুন প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবে বেশি উদার ও সমতার পক্ষে হবে। কিন্তু যুক্তরাজ্যভিত্তিক Ipsos এবং King’s College London-এর অধীন King’s Business School পরিচালিত এই গবেষণা দেখাচ্ছে—বাস্তবতা এত সরল নয়।

২৯টি দেশের প্রায় ২৩ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে করা এই জরিপে দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি রক্ষণশীল। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে এই প্রবণতা স্পষ্ট। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ মনে করে, একজন নারীকে স্বামীর নির্দেশ মেনে চলা উচিত কিংবা পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পুরুষেরই শেষ কথা থাকা উচিত। এমনকি একটি অংশ মনে করে নারীর অতিরিক্ত স্বাধীনতা সমাজের জন্য ভালো নয়।

আরও উদ্বেগজনক দিক হলো—এই মানসিকতা শুধু পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কিছু নারীও একই ধারণাকে সমর্থন করছেন। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু একপাক্ষিক নয়; এটি সামাজিকভাবে গভীরভাবে প্রোথিত একটি দৃষ্টিভঙ্গি। যৌনতা সম্পর্কিত ধারণাতেও একই ধরনের রক্ষণশীলতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে নারীর সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করে।

এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। Heejung Chung মনে করেন, নতুন প্রজন্মের অনেক পুরুষ একদিকে পুরুষতান্ত্রিক মানদণ্ডের চাপ অনুভব করছে, অন্যদিকে নারীদেরও পুরনো লিঙ্গভূমিকায় ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে। ফলে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে, যা সমাজে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।

দেশভেদে এই মনোভাবের পার্থক্যও লক্ষণীয়। কিছু দেশে এখনও নারীর অধীনস্থ ভূমিকা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য, আবার কিছু দেশে তা প্রায় অগ্রহণযোগ্য। এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে—নারী অধিকার শুধু আইন বা নীতিমালার বিষয় নয়; এটি মূলত একটি সমাজের মানসিকতা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। এখানে আইনগত কিছু অগ্রগতি থাকলেও বাস্তব জীবনে নারীরা এখনও বহু বাধার মুখোমুখি হন। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যের ছাপ স্পষ্ট। সমস্যাটি কেবল আইনের ঘাটতিতে নয়; বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ধীর পরিবর্তনই বড় চ্যালেঞ্জ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—আইনের শাসনের দুর্বলতা। যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ও ক্ষমতা আইনের ওপর প্রাধান্য পায়, তখন ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান থাকে না। কেউ সহজেই সুবিধা পায়, আবার কেউ দীর্ঘদিন বিচারহীনতায় ভোগে। এই পরিস্থিতি শুধু নারী অধিকার নয়, সামগ্রিকভাবে নাগরিক অধিকারের জন্যও হুমকি।

তবে এখানেই চূড়ান্ত হতাশার জায়গা নয়। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি তার নাগরিকদের মধ্যেই নিহিত। সচেতনতা, প্রশ্ন তোলার সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান—এই তিনটি বিষয় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কেবল নীতিমালা নয়, বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের সামনে তাই তিনটি স্পষ্ট অগ্রাধিকার রয়েছে।
প্রথমত, আইনের শাসনকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করা—যেখানে ব্যক্তি বা ক্ষমতা নয়, আইনই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড।
দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে।
তৃতীয়ত, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন—পরিবার, শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে নারীকে অধীন নয়, সমান অংশীদার হিসেবে দেখা হবে।

সবশেষে প্রশ্নটি শুধুই নারীর অধিকার নিয়ে নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন সেখানে ন্যায়বিচার ও মানবিকতা সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় -আমরা কি সমতার পথে এগোব, নাকি পুরনো বৈষম্যের চক্রেই আটকে থাকব।

Facebook Comments Box