কর্ণফুলীর ঢেউ আর পাহাড়ের সবুজে ঘেরা চট্টগ্রামের বাতাসে কান পাতলেই যেন এক সুমধুর কণ্ঠের মায়াজাল শোনা যায়। দীর্ঘ ৫৬টি বছর ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর মাটির ঘ্রাণ যিনি পরম মমতায় নিজের কণ্ঠে তুলে এনেছেন, তিনি আমাদের সকলের প্রিয় শিল্পী বুলবুল আখতার।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ‘সম্রাজ্ঞী’ খ্যাত এই জীবন্ত কিংবদন্তি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি যেন এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির এক চলমান আর্কাইভ।
সুরের প্রতি তাঁর এই আজন্ম নিবেদনের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তিনি ভূষিত হয়েছেন ‘চসিক স্বাধীনতা সম্মাননা পদক-২০২৬’-এ, যা তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে যুক্ত করেছে এক নতুন পালক।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া এই সুরকন্যার রক্তেই যেন মিশে ছিল সাগরের গর্জন আর সুরের মূর্ছনা।
শৈশব থেকেই চট্টগ্রামের নিজস্ব ভাষার গানগুলোকে তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন পরম আদরে।
সেই যে শুরু, এরপর গত সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মাইজভাণ্ডারী, মরমী এবং আঞ্চালিক গানের সুরে সুরে তিনি মাতিয়ে রেখেছেন দেশ-বিদেশের লাখো শ্রোতাকে।
বয়সের গণ্ডি ষাট পেরোলেও, স্টেজে উঠলে তাঁর কণ্ঠের সেই আদি অকৃত্রিম মাধুর্য আর গানের প্রতি উন্মাদনা আজো এতটুকু ম্লান হতে দেখা যায় না।
১৯৭৮ সালে খ্যাতিমান রশিদ কাওয়ালের সঙ্গে জীবনের গাঁটছড়া বাঁধলেও, বুলবুল আখতারের সংগীত সাধনায় কখনো ছেদ পড়েনি। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া “অ হালা চাঁন গলার মালা”, “যাতন যারে ভালা লাগে”, “ফুলের হরা” কিংবা “বাঁকখালীর মাঝি ও ভাই সোনাদিয়া বাসা”-র মতো কালজয়ী গানগুলো শুনলে আজও শ্রোতারা ফিরে যান সোনালি অতীতে। আশির দশকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ‘আহমদ কবির আজাদ–বুলবুল আখতার’ জুটির জনপ্রিয়তা ছিল আক্ষরিক অর্থেই আকাশচুম্বী, যা তখনকার বিখ্যাত ‘শ্যাম–শেফালী’ জুটির সঙ্গেই কেবল তুলনীয়।
দীর্ঘ এই অবিশ্রান্ত ক্যারিয়ারে তাঁর রেকর্ডকৃত অডিও ক্যাসেটের সংখ্যা প্রায় ৯৮টি, যা যেকোনো লোকশিল্পীর জন্যই এক অসামান্য মাইলফলক।
এত খ্যাতি আর অর্জনের পরও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা একেবারেই নিখাদ।
সম্প্রতি চসিক আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননা গ্রহণের সময় তাঁর সহজ-সরল স্বীকারোক্তিই বলে দেয় শেকড়ের প্রতি তাঁর তীব্র টান “পুরস্কারের আশায় নয়, চট্টগ্রামের মানুষের ভালোবাসাই আমার গান গাওয়ার মূল অনুপ্রেরণা।”
ডিজিটাল এই যুগেও বুলবুল আখতারের কণ্ঠে যখন আঞ্চলিক গানের সুর বেজে ওঠে, তখন চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেন প্রাণ ফিরে পায়। আধুনিকতার ডামাডোলে চট্টগ্রামের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে সযত্নে আগলে রাখা এই সুরকন্যা আমাদের লোকজ ভাণ্ডারের এক অমূল্য রত্ন।














