banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 76 বার পঠিত

 

মস্তিষ্কের আয়নায় নারী-পুরুষ: বিজ্ঞান কী বলছে, বিতর্ক কোথায়?

একুশ শতকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও নারী ও পুরুষের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কে বেশি বুদ্ধিমান, কার চিন্তার গভীরতা বেশি, কার সিদ্ধান্ত দ্রুত—এমন প্রশ্ন আজও ঘুরে ফিরে আসে ব্যক্তিগত আড্ডা থেকে সামাজিক আলোচনায়। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নারীরা আজ গবেষণাগার পেরিয়ে মহাকাশে, আবার পুরুষেরা প্রযুক্তির জটিল হিসাব সামলে ঘরের রান্নাঘরে নতুন স্বাদের রেসিপি আবিষ্কার করছে। তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—এই পার্থক্যের উৎস কোথায়? নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক কি সত্যিই আলাদা?
এই প্রশ্নটি যেমন কৌতূহলোদ্দীপক, তেমনি স্পর্শকাতর। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এই পুরোনো বিতর্ককে নতুন আলোয় নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞানীরা এখন আর অনুমান নয়, বরং বিশাল ডেটা ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।

হারানো পাঁচ আউন্স
নারী-পুরুষের মস্তিষ্ক নিয়ে বিতর্কের শিকড় অনেক গভীরে। উনিশ শতকের কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, গড় হিসেবে পুরুষের মস্তিষ্কের ওজন নারীর তুলনায় কিছুটা বেশি। এখান থেকেই জন্ম নেয় তথাকথিত ‘মিসিং ফাইভ আউন্স’ তত্ত্ব—যার দাবি ছিল, এই বাড়তি ওজনই নাকি পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
আধুনিক বিজ্ঞান অবশ্য এই ধারণাকে অনেক আগেই নাকচ করেছে। নিউরোসায়েন্সের ভাষায় বিষয়টি বেশ সহজ। সাধারণত যাদের শরীর বড়, তাদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্কের আয়তনও তুলনামূলক বড় হয়। প্রাণিজগতেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নেই। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের আকার বা ওজনের সঙ্গে মেধা, বুদ্ধিমত্তা কিংবা সৃজনশীলতার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের গঠনগত ও কার্যগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করছেন। তবে এই গবেষণার উদ্দেশ্য কে ‘ভালো’ বা কে ‘খারাপ’ তা নির্ধারণ করা নয়।
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের মনোরোগ ও আচরণগত বিজ্ঞানের অধ্যাপক বিনোদ মেননের ভাষায়, এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয়, বয়সের সঙ্গে কীভাবে বদলায় এবং বিভিন্ন স্নায়বিক বা মানসিক রোগে লিঙ্গভেদে কেন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়—তা বোঝা।
গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কে যদি লিঙ্গভিত্তিক কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য চিহ্নিত করা যায়, তবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, অটিজম ও পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগ পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস কিংবা বিষণ্নতার মতো মানসিক রোগে নারীরা বেশি আক্রান্ত হন।
এই পার্থক্যগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করলে রোগের প্রকৃত কারণ ও কার্যপ্রণালি বোঝা কঠিন হয়ে পড়তে পারে—এমনটাই মত গবেষকদের একাংশের।

আপত্তির জায়গা: বিজ্ঞান না সামাজিক ‘অ্যাজেন্ডা’?
তবে সবাই এই গবেষণাকে একই চোখে দেখছেন না। ব্রিটিশ নিউরোসায়েন্টিস্ট জিনা রিপন মনে করেন, বর্তমানে জৈবিকভাবে নির্ধারিত লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য খোঁজার পেছনে একধরনের সামাজিক আগ্রহ বা ‘অ্যাজেন্ডা’ কাজ করছে। তাঁর আশঙ্কা, মানুষ যদি আচরণ, আবেগ বা অর্জনের পার্থক্যকে সরাসরি মস্তিষ্কের কাঠামোর সঙ্গে জুড়ে দেয়, তবে সামাজিক বৈষম্যকে বৈজ্ঞানিক মোড়কে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এস্টন ইউনিভার্সিটির এই ইমেরিটাস অধ্যাপকের মতে, নারী-পুরুষের পার্থক্যকে যদি জন্মগত ও অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক কাঠামোয় সমতার লড়াই দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমতা মানে অভিন্নতা নয়। পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্যকে স্থায়ী তকমা বানানো বিপজ্জনক।

আগামীর বিজ্ঞান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণা নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে নিঃসন্দেহে আরও গভীর করছে। তবে বিজ্ঞানীরাই স্বীকার করছেন—এই ফলাফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা প্রয়োজন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজন হলে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আবার একই সঙ্গে এই পার্থক্যকে ব্যবহার করে সামাজিক বৈষম্যকে স্বাভাবিক বা বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে বলা যায়, নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক নিয়ে প্রশ্নটি আজ আর কেবল ‘কে বেশি বুদ্ধিমান’—এই সরল বিতর্কে আটকে নেই। বরং এটি মানবদেহ, সমাজ ও ন্যায়বিচারের এক জটিল সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান। বিজ্ঞান এখানে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু সেই পথে হাঁটার দায়িত্ব আমাদের সবার।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ন্যাচার, নিউ সায়েন্টিস্ট, স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন

Facebook Comments Box