আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই সোনার বাংলা সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলায় শ্যামলিমা, এর নান্দনিক রূপ বিশ্বের অনেক বড় বড় ঐতিহাসিক এবং মনীষীদের দৃষ্টি কেড়েছিল!
ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে হেন কোন পর্যটক নেই যে – এই বাংলার রূপবৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়নি !
খোলাফায়ে রাশেদার যুগে অনেক মুসলিম ধর্ম প্রচারক ইসলাম প্রচার করতে এসে এই দেশেই বসতি স্থাপন করে এদেশেই বসবাস করে গেছেন আমৃত্যু !
মোঘল আমলে বাদশা আকবর এই বাংলার সন তারিখের প্রবর্তন করেন,[ আরবি মাসের তারিখের সাথে মিল রেখে!
যাই হোক – আমাদের কৃষক সমাজের কাছে এই “বাংলা সন” খুবই সমাদৃত হয় !
তারা বাংলা মাসের পরিপূর্ণ ব্যবহার করতেন তাদের ফসলাদি রোপণ বপন এবং ঘরে তোলার ব্যাপারে!
আমাদের শৈশবে অর্থাৎ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে আমরা গ্রাম বাংলায় বৈশাখের তান্ডবের শুরুতেই বছরের শুরু অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ এবং চৈত্রের শেষ দিনকে বলা হয় “চৈত্র সংক্রান্তি ” ; দিনটি ছিল – কৃষকদের , ব্যবসায়ীদের হালখাতার নবায়ন করার দিন ! চৈত্র সংক্রান্তির রাত থেকেই দেখা যেত তার তোড়জোড় !
সে রাতেই ব্যবসায়ীরা দোকানপাটে তাদের লাল রঙের মলাটের একটা লম্বা হালখাতা( হিসাবের খাতা) তারা নতুন করে আবার সংযোজন করতেন সারা বছরের জন্য! পুরনো হালখাতার হিসাবের পাট চুকিয়ে অর্থাৎ বন্ধ করে নতুন হালখাতায় তারা বছরের শুরুতে হিসাব রাখা শুরু করতেন পহেলা বৈশাখ থেকেই ! সেই সময় দেখেছি অনেক দোকানে একটু বাতাসা খাওয়ায়ে মিষ্টিমুখ করতেন, আর কেউ আবার একটু মিষ্টি পান সুপারি খাওয়ায়ে তাদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতেন, পারস্পরিক হাসি ঠাট্টার ভিতর দিয়ে!
গ্রামে খালা, মামী, দাদি চাচিদের দেখেছি- তারা বিভিন্ন রকমের শাক সংগ্রহ করতেন ক্ষেত থেকে , বাড়ির আঙ্গিনার আশ পাশ থেকে ! চৈত্র সংক্রান্তিতে । তারা এই শাক সংগ্রহ করে নানান উপাদান দিয়ে অনেক মুখরোচক করে রান্না করতেন এবং সেটা ‘বউ-ক্ষুদা’ বা নতুন বোরো ধানের মিষ্টি চালের ভাত দিয়ে খুব মজা করে খেতেন। কেউ আবার কিছু পিঠা তৈরি করে খাওয়াতেন, খেতেন!
বৎসরের শুরুর যে একটা সুন্দর আমেজ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ।
কারণ – সব কৃষক পরিবারগুলো স্বাভাবিকভাবেই নিম্ন মধ্যবিত্ত অস্বচ্ছল পরিবারই ছিল তারা ! কেউ এমন ছিল না যে , চাইলেই ইলিশ মাছ কিনতে পারতেন । পান্তা ইলিশের কোন প্রচলনই সে সময় ছিল না !
খুব বেশি যে স্বচ্ছল পরিবারের ছিল না তারা। ” নুন আনতে পান্তা ফুরায় ” মতো যাদের অবস্থা – তারা সখ করেও পান্তা ইলিশ খেতে পারতেন না ! এটা বিশ শতকের বানানো সংস্কৃতি ।
মোটামুটি সাংস্কৃতিক রূপ মানুষের ছিল, সেটা আমরা দেখতে পেয়েছি ।
সেই সময় গ্রামে বটতলায় বা হাটের জায়গায় মেলা হতো এটা – অনেক পুরনো ঐতিহ্য!
আমরা ও ছোট্ট বেলায় – আব্বা , মামা ভাইদের হাত ধরে মেলায় গিয়েছি ।
শহর থেকে গ্রামে মামার বাড়ি বেড়াতে যেতাম মেলা দেখার জন্য।
” মামার বাড়ির আবদার ” প্রবাদ বাক্যটি
আমাদের জন্য ছিল আক্ষরিক অর্থে এবং বাস্তবতায় সত্য !
মামা তো আমাদের আবদার রক্ষার্থে সকাল থেকেই আয়োজনের লেগে থাকতেন । সেটা দেখে আম্মা আবার একটু আপত্তি করতেন যে – “এরা শহর থেকে আসছে, বুঝবে না কিছু , কখন কোথায় হারিয়ে যাবে , ভাইজান তুমি সামলাতে পারবে না !”
মামা জোড়ালোভাবে আম্মার কথা নাকচ করে দিয়ে বলতেন – ” তুই চিন্তা করিছ না, আমি লোকজন জোগাড় করছি না ! ওদেরকে সবাই দেইখ্যা রাখব ! “
আল্লাহ্ ভরসা!
হ্যাঁ , মামা – বড় একটা বস্তা , দু তিনটা মুড়ির টিন , একজন মজুরের মাথায় দুটা বাঁশের তৈরি (পাতি) ঝাঁকা ইত্যাদি সরঞ্জাম নিয়ে ছাতা নিয়ে ভাগ্নে ,ভাগনীদের হাতে ধরে গ্রামের আইল ধরে হাঁটা শুরু করতেন ।
আমরাও অনভ্যস্ত পায়ে আইল ধরে হাঁটতে গিয়ে কতবার যে পাশের ক্ষেতে পড়ে যেতাম ! আমাদের পড়ে যাওয়া দেখে গ্রামের ভাই বোনেরা তো হেসেই কুটি কুটি হতো !
যাহোক- মেলার কিছুটা দূর থেকেই শুনতে পেতাম মেলার হৈ চৈ আর শোরগোলের গমগম আওয়াজ-
[ ] অনেক দূর থেকেই শোনা যেত ক্যাঁচ ক্যাঁচ, ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ আওয়াজ ! অর্থাৎ সেটা ছিল “চরক গাছ ” এর আওয়াজ! “চরক গাছ “গ্রাম দেশের ভাষা এটা! অর্থাৎ চরকি – গ্রাম্য “চরকি-দোলা” !
[ ] তখন তো কোন মোটর বা মেশিন ছিল না! তাই হাত দিয়ে সেটাকে চালিয়ে দেয়া হতো! অর্থাৎ টেনে টেনে একটার পর একটা ঘুরাতে হতো।
[ ] এরপর শোনা যেত ভেপু বা বাঁশের বাঁশির আওয়াজ ! মেলায় আসতো প্রচুর বাঁশের কারুকার্য খচিত জিনিসপত্র!
[ ] সবাই বাঁশি কিনে বাঁশিতে ফু দিয়ে বাজাতে শুরু করতো!
মেলার কোন এক কোণে দেখা যেত যে গানের আসর বসেছে! ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, একতারা দোতারা এই সমস্ত বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তারা জারি ,সারি গান গাইতো!
হ্যাঁ মেলায় বিক্রি হতো নানান ধরনের খাবারের জিনিস – মুড়ি মুড়কী , মুড়ালি , কদমা, চিনির তৈরি হাতি ঘোড়া, বাঘ ভাল্লুক ,নানান ধরনের ছোট্ট ছোট্ট জিনিস তৈরি করত চিনি দিয়ে! সেগুলো খেতে হতো বিন্নি ধানের খই দিয়ে ! বিন্নি ধানের খই ওখানে কিনতে পাওয়া যায় এখান থেকেই কিনে নিতাম আমরা শহরের জন্য।
এজন্যই মামা বস্তা নিতেন সাথে। মুড়ির টিন ভর্তি করে – বিন্নী ধানের খই , মুড়কি, মুড়ালী, বাতাসা ইত্যাদি কিনে টিন ভর্তি করে নিতেন ।
এরপর আমাদের সখ ছিল মাটির পুতুলের । বিভিন্ন রকমের রঙিন নানান ধরনের খেলনা , বাঁশি ! তারপরে কাগজের তৈরি পাখা, তালপাতার নানা রংয়ের পাখা ইত্যাদি নানা ধরনের জিনিস!
‘মামা বাড়ির আবদার’ কাকে বলে! মামা অতি উৎসাহের সাথে সবই কিনে দিতে থাকতেন ! বড় হয়ে বুঝেছিলাম সেটাই হলো ” ” মামার বাড়ির আবদার !”
যাহোক – সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে, কারণ তখন তো আর গ্রামের লাইট ছিল না বা কোন রকমের লাইটের ব্যবস্থাও ছিল না যার জন্য অন্ধকার নামার আগেই আমরা বাড়ি ফিরে আসতাম হেঁটে ! কারণ তেমন কোন বাহন ছিল না গ্রামে।
সারা বাংলাদেশ জুড়েই গ্রামে এই ধরনের মেলা হতো ! কোন জায়গায় দুদিন কোন জায়গায় ৩ দিন কোন জায়গায় সপ্তাহব্যাপী চলতো এই মেলা ! এগুলো আমরা আরো অন্যান্য জায়গায় ও দেখেছি । যেখানে আমরা থাকতাম মফস্বল শহরে, তার আশে পাশে গ্রামে হতো এই বৈশাখী মেলা মেলা! ( (ভৈরববাজারের কমলাপুর গ্রামে এই মেলায় গিয়েছি) !
ঢাকা শহরে ও এই বৈশাখী মেলার কথা শুনেছি- চকবাজার, নবাবগঞ্জ, লালবাগ হোসনী দালান ইত্যাদি জায়গাতে!
রামপুরায় তখনো টি ভি সেন্টার শুরু হয়নি, তার সামনের বড় রাস্তাটি তখন মাটির রাস্তা ছিল । সে সময়টাতে রামপুরা ব্রিজ যেখানে আছে, সেটা ছিল ‘বালু নদী’র উপরে ! নদীটা একটু বড় ছিল , বনশ্রী নগরী তৈরি করতে গিয়ে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নদীটাকে ছোট করে ফেলা হয়! এখন যা আছে তার চাইতে আরো বেশ কিছুটা বড় ছিল নদীটি! সেই সময় নদীর পাড়ে ব্রিজের আশেপাশেই এই বৈশাখী মেলা হতো ! “রমনা বাগান ” বা
পার্কেও এই মেলা বসতো !
এই ছিল “পহেলা বৈশাখে”র “বৈশাখী মেলার” ইতিকথা। এছাড়া অনেকেই হয়তো আরো অনেক রকমের জানেন সেটাও যদি পারেন শেয়ার করবেন!
তবে –
আমাদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিতে
“মঙ্গল শোভাযাত্রা ” বলে আমরা আমাদের জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত কিছুই দেখিনি। এগুলো কোন কুচক্রী মহলের বানানো সংস্কৃতি!
আসল কথা – তখন কোন শোভাযাত্রা তো দূরের কথা, শোভাযাত্রা বলে কোন মিছিল বা কোন পদযাত্রাই ছিল না!
*যেটা ছিল ,সেটা হলো – “হালখাতা “।
এই ব্যবসায়ীরা তাদের “হালখাতা” নিয়েই ব্যস্ত থাকতো ! সেই লাল কাপড়ে মলাটে মোড়ানো – সেই হালখাতা এখনো আছে ! এখনো তারা এটাকে ব্যবহার করছেন , বাঙালিদের
এটা একটা ঐতিহ্যগত দিক !
কিন্তু এছাড়া – এই পান্তা- ইলিশ খাওয়া, লাল রঙের শাড়ি পরা বা লাল টিপ পরার রীতিনীতি বলত তো কিছুই ছিল না বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে!
আগেই বলেছি – বাঙালি মুসলমানদের বিশেষ করে কৃষক সমাজে – আসলেই তারা খুব একটা স্বচ্ছল পরিবার ছিল না! যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি নিয়ে খুব মাতামাতি করবে বা কিছুটা অতিরিক্ত খরচের যে বোঝা সে বোঝা বহন করবে !
আমরা এখন থেকে সতর্কতার সাথে – ঐ সব ধার করা সংস্কৃতি বাদ দিয়ে চলবো। চৌর্য্যবৃত্তির কায়দায় অন্য দেশের , অন্য ধর্মের কোন সংস্কৃতিকে আর ধারণ করব না! আসুন, আমাদের পূর্ব পুরুষদের সংস্কৃতির লালন করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই।
আসুন – আমরাও আমাদের প্রিয় জন্মভূমি , প্রিয় মাতৃভূমির ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করি , লালন করি। বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দেই আমাদের ঐতিহ্যকে এবং ইতিহাসকে , জানানোর জন্য।














