banner

শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬ ইং, ,

Monthly Archives: March 2026

 

জুলাই ট্র্যাজেডির জীবন্ত সাক্ষী ছোট্ট মুসা

ঢাকার রামপুরার আট বছর বয়সী বাসিত খান মুসার জীবন ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতার পর থেকে আর আগের মতো নেই।
যে শিশুটি একসময় দৌড়ে খেলত, হাসত, কথা বলত, আজ সে খেলনা পিয়ানোয় সুর তোলে শুধু বাম হাতে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কিংবা খাবার খাওয়াও আর সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মুসা বাবার সঙ্গে আইসক্রিম কিনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। ঠিক সেই সময় রামপুরা এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা শুরু হয়। হঠাৎ ছুটে আসা একটি গুলি শিশুটির মাথায় আঘাত করে।
একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তার দাদি মায়া ইসলাম। হাসপাতালে নেওয়ার পরদিন তিনি মারা যান।

মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ছেলের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি তখন জানতেই পারেননি তার মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে মায়ের মৃত্যুর খবর পেলেও ছেলের সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুসার চিকিৎসা শুরু হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। পরে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশেও নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এ পর্যন্ত তার মাথায় ২১টি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খুলির অংশে কৃত্রিম খুলি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মস্তিষ্কে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল শরীরের অন্য অংশে সরিয়ে নিতে স্থায়ী শান্টও বসানো হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় সাত মাস নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকার পর ধীরে ধীরে সুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। বর্তমানে মুসা আশপাশের অনেক কিছুই বুঝতে পারে এবং অল্প কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। তবে এখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটা, কথা বলা কিংবা নিজের হাতে খাবার খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে পায়নি। নাকে লাগানো একটি নলের মাধ্যমে তাকে তরল খাবার দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসার দীর্ঘ ব্যয় পরিবারটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থসংকটের কারণে সিঙ্গাপুরে নির্ধারিত ফলোআপ চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। বিদেশ থেকে আনা বিশেষ ওষুধ ও পুষ্টিকর তরল খাবারের মজুতও শেষের পথে বলে জানিয়েছে পরিবার।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতায় মুসার মতো আরও বহু শিশু প্রাণ হারিয়েছে বা গুরুতর আহত হয়েছে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের ঘটনায় মোট ১২৮ জন শিশু ও কিশোর নিহত হয়েছে। তাদের অনেকের জীবনও মুসার মতো চিরতরে বদলে গেছে।

 

হাঁড়িশাল থেকে মডার্ন কিচেন: চেনা খাবারের অজানা ইতিহাস

আমাদের খুব চেনা, ভীষণ আপন ‘হেঁশেল’ শব্দটার জন্ম কিন্তু হুট করে হয়নি। একটু পেছনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এটি আসলে এসেছে ‘হাঁড়িশাল’ শব্দ থেকে।
সহজ কথায় যে ঘরে হাঁড়ি রাখা হয়, সেটাই হাঁড়িশাল।
পুরোনো গ্রামীণ বাংলায় সমাজ ও জীবনযাত্রার সাথে মিলিয়ে এমন প্রচুর ‘শাল’ বা ‘শালা’ শব্দের ব্যবহার ছিল।
যেমন গরুর থাকার জায়গা গোয়াল বা গোশাল, কামারদের কাজ করার কারখানা কামারশাল, ঘোড়া রাখার ঘোড়াশাল কিংবা পড়াশোনার জন্য পাঠশালা।
সংস্কৃত সাহিত্যে রান্নাঘরের একটা বেশ মিষ্টি আর রসালো নাম পাওয়া যায় ‘রসবতী’। শুনতে ভারী চমৎকার হলেও এই নামটা বোধহয় অভিধানের পাতাতেই বন্দি হয়ে রয়ে গেছে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মুখের ভাষায় হাঁড়িশালই কালক্রমে আদুরে ‘হেঁশেল’ হয়ে উঠেছে।

​জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অসামান্য রন্ধনশিল্পী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তাঁর কালজয়ী রান্নার বই ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’-এ সেকালের হেঁশেলের এক বিশাল সরঞ্জামের বিবরণ দিয়েছেন।
সেই তালিকাটি পড়লে আমাদের চোখ কপালে উঠবে! ধামা, চুপড়ি, কুড়ুল, দা, উনানের হাওয়া দেওয়ার পাখা থেকে শুরু করে ছাই খোঁচানোর লোহার শিক কী ছিল না সেখানে!
আজকের মডার্ন কিচেনের গ্যাস বার্নার, মিক্সার গ্রাইন্ডার, মাইক্রোওয়েভ আর ওটিজির চাকচিক্যে সেই কাঠের উনানের দিন আজ সত্যিই ফুরিয়েছে।
শিল-নোড়ার জায়গা দখল করেছে মিক্সি, আর যে ভাতের হাঁড়ির নামে রান্নাঘরের নাম হয়েছিল হাঁড়িশাল, সেই ঐতিহ্যবাহী তোলো বা তিজেল হাঁড়িকে একরকম ঘরছাড়া করে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে প্রেসার কুকার। তবে রান্নার সরঞ্জাম আর প্রযুক্তি যতই বদলাক না কেন, যুগ যুগ ধরে বাঙালির হেঁশেলের আসল উদ্দেশ্য কিন্তু একই রয়ে গেছে -আর তা হলো মন জুড়ানো রসনাবিলাস।

​আমাদের প্রাচীন বাংলায় মাটিতে বসে কলাপাতায় কিংবা শালপাতায় পাত পেড়ে খাওয়ার মধ্যে একটা আলাদা স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল।
মধ্যযুগীয় ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ কাব্যের কবি বাঙালির এই ভোজনসুখের এক চমৎকার বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন যে, কলার পাতায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, ঘন দুধ, মৌরলা মাছের তরকারি আর নালতে শাক যখন পরম স্নেহে স্ত্রী পরিবেশন করেন, তখন সেই অন্ন খাওয়ার সৌভাগ্য কেবল কোনো পুণ্যবানের ভাগ্যেই জোটে। সময়ের সাথে সাথে কলাপাতার বদলে কাঁসা বা স্টিলের থালা-বাটি ববা হাল যুগের সিরামিকের প্লেটের চল হলেও, খাবার পরিবেশনের সেই আন্তরিকতা আর পদের বৈচিত্র্য বাঙালি আজও ধরে রেখেছে।

​প্রথম পাতে গরম ভাতের সাথে ‘ভাতে’ বা সেদ্ধ খাওয়ার এক চিরকালীন নিয়ম ছিলো আমাদের। সবজিকে আলাদা করে জল দিয়ে সেদ্ধ না করে ভাতের ভেতরেই সেদ্ধ করে নেওয়ার এই পদ্ধতিটি সত্যিই দারুণ। এতে ভাতের নিজস্ব সুঘ্রাণের সাথে সবজির স্বাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আলু, কুমড়ো, করলা, ওল কিংবা স্রেফ একটা পাতলা কাপড়ে বেঁধে মসুর ডাল যখন সরিষার তেল, নুন আর কাঁচা মরিচে চটকে মাখা হয়, তখন তার স্বাদের কাছে সাহেবদের নুন ছিটানো সেদ্ধ সবজি (sauté vegetables) নিমেষেই হার মানে।
প্রথম পাতের এই ঘরোয়া আয়োজনের সাথে বেগুন পোড়াও দারুণ জমে। যেমনটা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে গোপাল ভাঁড় বলেছিলেন -পোড়ার মুখে সবই ভালো!
আর এই প্রথম পাতের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি হলো শুক্তো।
শুক্তো হলো ভাতের সাথে পরিবেশিত একটি ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর বাঙালি নিরামিষ পদ। এটি হালকা তিতকুটে স্বাদের জন্য পরিচিত। সজনে ডাঁটা, করলা, আলু, কাঁচকলা, বেগুন এবং বড়ির সমন্বয়ে তৈরি এই সুস্বাদু পদটি সাধারণত রান্নার শেষে সামান্য দুধ ও ঘি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

​বাঙালির দুপুরের ভোজে ভাতের সাথে যার ডাক পড়ে, সে হলো ডাল। মধ্যযুগীয় সাহিত্যে ডালকে বলা হতো ‘সূপ’। আর এই সূপ যিনি রাঁধতেন, তাঁকে বলা হতো ‘সূপকার’।
বাঙালিয়ানা খাবারের ইতিহাসে ডাল মূলত প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির অংশ। ইতিহাসবিদদের মতে, ডালের চাষ এবং খাওয়ার রীতি আর্য ভারতের দান হলেও, ১৫ শতক থেকে এটি বাঙালিদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
বাঙালির হেঁশেলে মুগ, মসুর, বিউলি কিংবা ছোলার ডালের কদর চিরকালের।
তবে ডাল খাওয়ার ক্ষেত্রেও দুই বাংলার মানুষের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক তফাত ছিল। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) মাছের এতই প্রাচুর্য ছিল যে ডাল চাষ হতো খুব সীমিত আকারে।
তাই এই বঙ্গে ডালকে বেশ আভিজাত্যের বা বড়লোকদের খাবার মনে করা হতো।
সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথায় এক বালকের গল্প আছে, যে মাছ দিয়ে ভাত খেলেও ডাল চেনে না, কারণ তার মতে ডাল কেবল বড়লোকরাই খায়!

আবার ঢাকা অঞ্চলে খাওয়া-দাওয়ার একদম শেষ পাতে কলাইয়ের ডাল বাটি ধরে চুমুক দিয়ে খাওয়ার এক অদ্ভুত সুন্দর রেওয়াজও ছিল।
​ডালের সাথে পাতে যখন চচ্চড়ি কিংবা ঘণ্টা আসে, তখন তৃপ্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। পাঁচফোড়ন আর সামান্য সরষে বাটা দিয়ে তৈরি মাখামাখা চচ্চড়ির স্বাদই আলাদা। বিশেষ করে লম্বা লম্বা করে কাটা আলু, কুমড়ো আর কাঁচা মরিচ মেখে অল্প আঁচে বাটিতে বসিয়ে করা ‘বাটি-চচ্চড়ি’র স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো।

অন্যদিকে ঘণ্ট হলো সবজির একটু থকথকে রূপ। এই ঘণ্টর জগতে ‘লাউ-চিংড়ি’ এক কিংবদন্তি সৃষ্টি।
ভারতীয় উপমহাদেশে লাউ চাষের ইতিহাস প্রায় কয়েক হাজার বছরের পুরনো। বাংলার আবহাওয়ায় লাউ খুব সহজলভ্য হওয়ায়, এটি বহু শতাব্দী ধরে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় স্থান পেয়ে আসছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে (বিশেষ করে পলিমাটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে) প্রচুর পরিমাণে ছোট চিংড়ি (কুচো চিংড়ি বা বাগদা/গলদা) পাওয়া যায়। সহজলভ্য এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণ থেকেই কালক্রমে ‘লাউ চিংড়ি’ রান্নার উৎপত্তি,যা আজ বাড়ির হেঁশেল ছাড়িয়ে বড় বড় রেস্তোরাঁতেও রাজত্ব করছে।

আবার উত্তরবঙ্গের বারেন্দ্র ঘরানার ‘চাপড়া ঘণ্ট’ তো আরও অনন্য। কুচি কুচি করে কাটা শশা আর ঝিঙের ওপর মটর ডাল বা খেসারির ডাল তাওয়ায় চ্যাপ্টা করে সেঁকে গুঁড়ো করে ছড়িয়ে এই পদটি তৈরি করা হয়।
ডালনা আর দোলমার ক্ষেত্রেও বাঙালির শিল্পবোধ প্রশংসনীয়। ছানার ডালনা বা ধোঁকার ডালনার পাশাপাশি পটোলের পেট চিরে মাছের কিমা কিংবা ছানার পুর ভরে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা দোলমা যেকোনো উৎসবের পাত আলো করে রাখতো।

​বাঙালির রন্ধনপ্রতিভার প্রশংসা করতে গিয়ে সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী একবার বলেছিলেন, বিশ্ব দরবারে বাংলা হেঁশেলের শ্রেষ্ঠ অবদান মূলত তিনটি— মাছ, ছানা এবং বাঙালি বিধবাদের হাতের নিরামিষ রান্না।
নিরামিষের এই বিপুল বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আমাদের আমিষের জগৎও সমানে সমৃদ্ধ। নদী, নালা, খাল আর বিলের এই দেশে চুনো মাছ থেকে শুরু করে রুই-কাতলা, পাবদা, ট্যাংরা কিংবা পারশের ঝোল-ঝাল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। সরষে বাটা দিয়ে মাছের ঝাল কিংবা কলাপাতায় মোড়ানো পাতুরি যেন ঠিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথার সাথে সুরের এক আত্মিক মেলবন্ধন।

​আর এই মাছের বাজারে যদি রাজা ইলিশের প্রবেশ ঘটে, তবে তো বাঙালির আর কিছু চাই-ই না। বেগুন আর কালোজিরে দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল কিংবা সরষে-কাঁচা মরিচের ভাপা ইলিশের ঘ্রাণে পুরো বাড়ি ম-ম করে ওঠে।
একইভাবে নারকেলের দুধ আর গরম মশলার যুগলবন্দিতে তৈরি চিংড়ির মালাইকারি আর বাঙালের চিরন্তন ফুটবলীয় যুদ্ধকেও ডাইনিং টেবিলে এক নিমেষে থামিয়ে দিতে পারে।
খাওয়া-দাওয়ার একদম শেষ পাতে যখন কাঁচা আম, তেঁতুল কিংবা চালতার টক-মিষ্টি অম্বল বা চাটনি পড়ে, তখন মনে হয় এই সুদীর্ঘ ভোজনবিলাস যেন এক পরম পূর্ণতা পেল।

​তবে বাঙালির এই সাধের হেঁশেল কিন্তু চিরকাল এই এক নিয়মে চলেনি।
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসন আমাদের পাত ও স্বাদে এক মস্ত বড় পরিবর্তন এনেছিল। ১৮৭৪ সালে সমাজসংস্কারক রাজনারায়ণ বসু তাঁর বিখ্যাত ‘সেকাল আর একাল’ প্রবন্ধে সমসাময়িক যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত বাবুদের এই অন্ধ পশ্চিমা প্রীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সেই প্রবন্ধেই কলকাতার বিখ্যাত ‘উইলসন হোটেল’-এর এক মজার গল্প সংকলিত হয়েছিল।
দুই বাঙালি বাবু হোটেলে গিয়ে পশ্চিমা কায়দায় গরুর মাংসের নানাবিধ পদের খোঁজ করছিলেন। কিন্তু ওয়েটার যখন একে একে বাছুরের মাংস (ভিল), বিফ স্টেক বা গরুর জিভ (অক্স টাং) -সব কিছুতেই ‘নেই’ বলে উত্তর দিচ্ছিল, তখন এক বাবুর অস্থিরতা দেখে তাঁর বন্ধু কৌতুকের ছলে ওয়েটারকে বলে ওঠেন, গরুর যখন কিছুই নেই, তখন বেচারাকে অন্তত কিছুটা গোবরই এনে দিন না!

​রাজনারায়ণ বাবু হয়তো স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে এই বাবুদের ব্যঙ্গ করেছিলেন, কিন্তু ইতিহাস এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করে। উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে এই সাহেবি খানা রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখ এড়িয়ে আড়ালে বসে খাওয়ার জন্য কলকাতার বুকে জন্ম নেয় এক নতুন ‘কেবিন সংস্কৃতি’। রাজশেখর বসুর (পরশুরাম) ‘রাতারাতি’ গল্পে যেমনটা দেখা যায়, ঘরের জাত বাঁচানোর ভয়ে তরুণরা গোপনে ‘অ্যাংলো-মোগলাই কাফে’ বা কেবিনে গিয়ে ডবল ডিমের মুঘলাই পরোটা কিংবা কাটলেট-চপে কামড় বসাচ্ছিল। প্রবীণদের রক্ষণশীলতা আর নবীনদের আধুনিকতার এই টানাপোড়েনই ছিল সে যুগের সমাজ পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।

​ইউরোপীয়দের দীর্ঘদিনের সংস্পর্শে এসে কেবল বাঙালির সামাজিক মনস্তত্ত্বই বদলায়নি, বরং বিদেশি পদগুলো আমাদের ছোঁয়া পেয়ে আমাদের নিজস্ব খাবার হয়ে উঠেছে। ফরাসি ‘ফ্রেঞ্চ অমলেট’ আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কুচি সহযোগে হয়ে গেল ‘মামলেট’। ইউরোপের চপ বা কাটলেট তাদের আদি রূপ ছেড়ে মাছ-মাংসের কিমার সাথে ব্রেডক্রাম্ব বা বিস্কুটের গুঁড়ো মেখে ডুবো তেলে ভাজা মচমচে বাঙালি বিকেলের নাস্তায় রূপান্তরিত হলো।
ব্রিটিশদের ঝাঁঝালো ‘ডেভিলড এগ’, যা অতিরিক্ত কড়া মশলার কারণে এমন নাম পেয়েছিল, তা বাঙালি বাবুর্চিদের হাতে আলুর পুরের চাদরে ঢাকা পড়ে নাম নিল ‘ডিমের ডেভিল’/’ডিম চপ’।
ময়দার খাস্তা আবরণের পেটিস কিংবা সকালের চিরচেনা পাউরুটিও এই পশ্চিমা বেকিং রন্ধনশৈলীরই এক স্থায়ী অবদান।

​এরই সমান্তরালে ঔপনিবেশিক অবকাঠামো এবং ভৌগোলিক পরিবর্তনের হাত ধরে কিছু ঐতিহাসিক পদের জন্ম হয়েছিল, যা আজ ভাবলে অবাক লাগে। যেমন গোয়া হয়ে বাংলায় আসা পর্তুগিজদের বিখ্যাত পদ ‘ভিন্দালু’। অনেকেই ভাবেন এর সাথে আমাদের চেনা সবজি আলুর সম্পর্ক আছে, কিন্তু আসলে তা নয়। পর্তুগিজ শব্দ ‘আলিও’ মানে রসুন আর ‘ভিন’ হলো ওয়াইন বা ভিনেগার। এই রসুন আর ভিনেগারে ম্যারিনেট করা মাংসের পদটি বাংলায় এসে সরিষার তেলের ছোঁয়ায় সম্পূর্ণ দেশি রূপ ধারণ করে।
আবার ব্রিটিশ আমলের নদীপথ ও রেলপথের কল্যাণে জন্ম নিল আরও কিছু পদ।
পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলে গোয়ালন্দ ঘাটের রাতের স্টিমারের খালাসিদের হাতের সেই জাদুকরী সরিষার তেল ও শিল-নোড়ায় বাটা মশলার তীব্র লালচে পাতলা ‘স্টিমার কারি’ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি ডাকবাংলোর খানসামাদের হাতের কাছে থাকা নিজস্ব পোষা দেশি মুরগি, ডিম ও আলু দিয়ে ঝটপট তৈরি করা ‘চিকেন ডাকবাংলো’ আমাদের রন্ধন ইতিহাসের এক একটি মাইলফলক হয়ে রইল।

একইভাবে দূরপাল্লার ট্রেনের সাহেবদের জন্য ঝাল কমিয়ে তৈরি হওয়া ‘রেলওয়ে মটন কারি’ও আজও সমান জনপ্রিয়।
​বাঙালির মাংস খাওয়ার ইতিহাসও একসময় কেবল পাঁঠা বা খাসির মাংসের পাতলা ঝোলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুরগি একদা রক্ষণশীল সমাজে নিষিদ্ধ থাকলেও, ডিরোজিওর ‘ইয়ং বেঙ্গল’ পন্থীরা প্রতিষ্ঠিত কুপ্রথায় জর্জরিত সমাজ ভাঙার গান গেয়ে যে ‘বিশুদ্ধ পক্ষী’ ভক্ষণের সূচনা করেছিলেন, আজ তা বাঙালির ঘরে ঘরে এক অতি সাধারণ রান্নায় পরিণত হয়েছে।

​দিনের শেষে ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে, বাঙালি কখনোই কোনো বিদেশি সংস্কৃতি বা খাদ্যাভ্যাসকে অন্ধভাবে নকল করেনি। বরং নিজের হেঁশেলের নিজস্বতা, সরিষার তেলের ঝাঁঝ, কাঁচা মরিচ,রসুন ফোঁড়ন আর রন্ধনশালার চিরন্তন জাদুতে প্রতিটি বিদেশি পদকে এমনভাবে নিজের করে নিয়েছে, যেন বাইরের সেই পশ্চিম এসে শেষ পর্যন্ত বাঙালির ঘরের পাত বা হেঁশেলের কাছেই পরম মমতায় আত্মসমর্পণ করেছে।

গ্রন্থ সহায়িকা
​প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, আমিষ ও নিরামিষ আহার (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৯)

​রাজনারায়ণ বসু, সেকাল আর একাল (কলকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৮৭৪)

​সুকুমার সেন, কলিকাতার কাহিনী (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩)

​সৈয়দ মুজতবা আলি রচনাবলী (খণ্ড ১ ও ২) (কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ১৪১৭)

 

দেশে ছয় মাসে নারী নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনা শুধু অপরাধের নৃশংসতাই নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজধানীর মিরপুরে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা,
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক গৃহবধূ নিজ বাড়িতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। অভিযোগ ওঠে, ঘটনার পর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হুমকির কারণে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে এবং নিজ বাড়িতে ফিরতে না পেরে হাসপাতালেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
কুমিল্লার মুরাদনগরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের একটি ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করে, মামলা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় তদন্তের শুরুতেই নানা জটিলতা তৈরি হয়।
আবার ঢাকার নবাবগঞ্জে চুরির অভিযোগ তুলে দুই তরুণীকে আটকে রেখে মারধর এবং প্রকাশ্যে তাদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকারকর্মীরা একে নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।

এসব ঘটনার পাশাপাশি বিগত ছয়মাসে পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা, যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতন এবং শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বহু ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে
ঘটেছে।
বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, বিচারহীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং নারীবিদ্বেষী মানসিকতা এখনও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট। আইন, নীতিমালা এবং বিচারব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে অব্যাহত রয়েছে।
ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের কারণে হত্যা, যৌন হয়রানি এবং নারীর প্রতি নানামুখী নির্যাতন সমাজের নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন এবং ১১ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যার বিচারে ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ধর্ষণের পর হত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা ছিল ২২টি, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪.৯৮ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩০টি, অর্থাৎ প্রায় ৯.৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট এবং বিচার এড়াতে আরও সহিংস পন্থা বেছে নিচ্ছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৩ জন কিশোরী এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৬৮ জন শিশু রয়েছে। অর্থাৎ শিশু ও কিশোরীরাই যৌন সহিংসতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত পরিবারও অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ‘আসক’ এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৯১ জন নারী স্বামীর হাতে এবং ২১ জন নারী স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন, মানসিক চাপ ও সামাজিক নিপীড়নের কারণে ৬৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুকের দাবি, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়ার অভিযোগ কিংবা পারিবারিক বিরোধ সহ বিভিন্ন কারণকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নারীর পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে ৬ জন পুরুষ নিহত এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন।
বাস্তবিকই নারী নির্যাতন এখন শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং সামাজিক প্রতিরোধকেও সহিংসভাবে দমন করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নারী নির্যাতন অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকলেও মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অতীতে পরিচালিত ব্র্যাক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় চূড়ান্ত সাজা পাওয়ার হার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পান। ফলে অনেক অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায় এবং তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, মামলা গ্রহণে বিলম্ব, যথাসময়ে মেডিকেল পরীক্ষা না করা কিংবা তদন্তে গাফিলতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

নারী নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাও এখনও সীমিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই কম। ফলে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক চাপ এবং সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবারও নির্যাতনকারীর কাছেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
স্বল্পমেয়াদি সহায়তা বা আইনি পরামর্শ দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়।

নারী নির্যাতন কমাতে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; বরং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, কার্যকর তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে বিবেচনা করেই দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

তথ্যসূত্র:
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)
Human Rights Watch

 

গাজায় নারী-শিশু হত্যায় বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও প্রাণহানি থামেনি; বরং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, প্রতিদিনই নতুন করে নারী ও শিশুর মৃত্যু, আহত হওয়া এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮ হাজারের বেশি নারী ও কন্যাশিশু প্রাণ হারিয়েছেন। ইউএন উইমেনের মানবিক কার্যক্রমবিষয়ক প্রধান সোফিয়া ক্যালটর্প বলেন,
“গাযায় আগের সংঘাতগুলোর চেয়ে (সর্বশেষ যুদ্ধে) অনেক বেশি নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছে৷ তারাও ছিলেন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, তাদের জীবনেও স্বপ্ন ছিল৷”

সংস্থাটি আরও জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক মাস পরও সহিংসতা থামেনি। নারী ও শিশুদের হতাহতের ঘটনা অব্যাহত থাকলেও সব ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ১০ লাখ নারী ও কন্যাশিশু নিজ বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন।

শিশুদের পরিস্থিতিও সমান উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ছয় মাসেই অন্তত ২১৪ জন শিশু নিহত হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের ঘটনাগুলোও সেই চিত্রকেই স্পষ্ট করে। ১৭ জুলাই গাজার মধ্যাঞ্চলের নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের আল-বালাতা বাজারে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে আটজন একটি জানাজার শোভাযাত্রায় অংশ নিতে জড়ো হয়েছিলেন। হামলায় আরও অন্তত ২০ জন আহত হন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা একটি “সশস্ত্র গোষ্ঠীকে” লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল; তবে বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে। হামাস এ ঘটনাকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

একই দিনে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় একটি স্কুলের কাছে ড্রোন হামলায় ৫২ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন। এছাড়া আজ-জাওয়াইদা, আল-সাওয়ারহা, গাজা সিটি এবং খান ইউনিসেও পৃথক হামলায় আরও কয়েকজন নিহত ও আহত হন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধীন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েলবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। কমিশনের মতে, হাজারো শিশুর মৃত্যু, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি এবং হাসপাতাল, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের বিরুদ্ধে এসব হামলা ফিলিস্তিনি সমাজের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করার একটি সচেতন কৌশলের অংশ হতে পারে।

কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, কোয়াডকপ্টার ড্রোন, স্নাইপার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহার করে বহু শিশুকে হত্যা বা আহত করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল, বিশেষ করে নবজাতক ও শিশু হাসপাতালগুলোতে হামলার ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং খাদ্য সংকটকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যার ফলে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তদন্ত কমিশন আরও বলেছে, পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনি শিশুরা গ্রেপ্তার, নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং নিয়মিত সামরিক অভিযানের কারণে একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ জনেরও বেশি শিশু। জাতিসংঘ এই হতাহতের পরিসংখ্যানকে সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে, যদিও এ মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

প্রতিদিনের হামলা, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসাসেবার ভাঙন -সব মিলিয়ে গাজার নারী ও শিশুরা আজ বিশ্বের অন্যতম গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্ন করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলাই এখন সবচেয়ে জরুরি; অন্যথায় গাজার একটি পুরো প্রজন্ম দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের ভার বহন করতে বাধ্য হবে।

তথ্যসূত্র:
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (UN Women)
ইউনিসেফ (UNICEF)
রয়টার্স
বিবিসি

 

স্মৃতি অম্লান: জুলাই অভ্যুত্থানের ১০ নারী শহীদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই গণআন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। ছাত্রদের পাশাপাশি প্রায় সব শ্রেণীর নারীরাও ছিলেন আন্দোলনের সামনের সারিতে।
কেউ মিছিলে অংশ নিয়েছেন, কেউ আহতদের সেবা দিয়েছেন, কেউ প্রতিবাদকে সংগঠিত করেছেন, আবার কেউ ঘরের বারান্দা বা ছাদে দাঁড়িয়েই সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে প্রাণ হারানো নারী শহীদদের জীবনগল্প শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক।

শহীদদের মধ্যে ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী নাঈমা সুলতানা। রাজধানীর উত্তরায় বসবাসকারী এই স্কুলছাত্রী পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিবাদী পোস্টারও তৈরি করেন।
১৯ জুলাই বাসার বারান্দা থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ আক্রমণ চালালে,ওই পরিস্থিতি ফোনের ক্যামরায় ধারণ করার সময় পুলিশ তার দিকে গুলি ছুড়লে, মাথার একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মেঝেতে মগজ ছিটিয়ে পড়ে। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে শুধু একটাই শব্দ করতে পেরেছিল, ‘মা…আ…!’
পরিবারের স্বপ্ন ছিল তিনি বড় হয়ে চিকিৎসক হবেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ছিল মাত্র সাড়ে ছয় বছরের রিয়া গোপের মৃত্যু। নারায়ণগঞ্জে বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয় শিশুটি। কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সে মারা যায়। আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না; তবু সহিংসতার নির্মম শিকার হয় একটি নিষ্পাপ শিশু।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়া আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিন কর্মসূচিতে যোগ দিতেন এবং পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টের কর্মসূচিতেও অংশ নেন। সাভারে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আন্দোলনের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।

নারায়ণগঞ্জের সুমাইয়া আক্তার ছিলেন এক নবজাতক সন্তানের মা। বাসার পাশের সড়কে সংঘর্ষের শব্দ শুনে বারান্দায় গেলে গুলি এসে তার মাথায় লাগে। হাসপাতালে নেওয়া হলেও তআর বাঁচানো যায়নি তাকে। তার মৃত্যুর পর অল্পবয়সী সন্তানটি এখন নানীর কাছে বড় হচ্ছে।

৫৭ বছর বয়সী শাহিনূর বেগম জীবিকার তাগিদে মাছের ব্যবসা করতেন এবং অসুস্থ স্বামীর সংসার চালাতেন।২২জুলাই সকালে হাঁটতে বেরিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুতে পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

মোসাম্মত লিজা জীবিকার জন্য ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পাশাপাশি একটি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষাও গ্রহণ করছিলেন।
সংঘর্ষের সময় ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও কয়েক দিন পর তার মৃত্যু হয়। পরিবারের আশা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে তিনি গ্রামে ফিরে নতুন জীবন শুরু করবেন।

নোয়াখালীর নাছিমা আক্তার বেড়াতে এসেছিলেন ঢাকায় ভাইয়ের বাসায়।
সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে ছাদে গিয়ে পরিস্থিতি দেখার সময় একই ঘটনায় তিনি ও তার ভাতিজা গুলিবিদ্ধ হন। ভাতিজা বেঁচে ফিরলেও নাছিমা আর ফিরতে পারেননি।

ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা কলেজছাত্রী রিতা আক্তার।
দরিদ্র পরিবারের একমাত্র বড় আশা ভরসা।
৫ আগস্টের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।
রিতা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে চলে যান মার্চ-টু-ঢাকা কর্মসূচিতে যোগ দিতে। দুপুরে মা ঘরে ফিরে দেখেন মেয়ে নেই। খুঁজতে বের হন। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়ের খোঁজ না পেয়ে মেডিকেল কলেজগুলোর মর্গে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। এক মেডিকেল থেকে আরেক মেডিকেল দৌঁড়াদৌঁড়ি করে রাত ১০টার পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের মর্গে মেয়ের মরদেহ পান। গায়ের জামাকাপড় দেখে মেয়েকে শনাক্ত করতে পারেন তিনি।
তার মৃত্যুতে একটি পরিবারের বহু বছরের স্বপ্নও থেমে যায়।

প্রায় ৬০ বছর বয়সী মায়া ইসলাম নাতিকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন।
একই গুলি নাতির মাথার তালু ভেদ করে দাদির তলপেটে আঘাত করে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মায়া ইসলাম।
আর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শিশুটির চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্যের ব্যাপারে এগিয়ে আসেন। তাদের সহযোগিতায় শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুর। 

অনার্সপড়ুয়া মেহেরুন নেছা তানহা শুরুতে আন্দোলনে সক্রিয় না থাকলেও এক আত্মীয় নিহত হওয়ার পর প্রতিবাদে যুক্ত হন।
৫ আগস্ট বাসায় ফেরার পর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন।
নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই বহন করতেন এবং পরিবারের জন্য ছিল তার অনেক স্বপ্ন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো এই দশ নারী ভিন্ন ভিন্ন বয়স, পেশা ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করেন।
কেউ ছিলেন শিক্ষার্থী, কেউ গৃহিণী, কেউ কর্মজীবী নারী, কেউ আবার শিশু। কিন্তু তাদের সবার জীবনের শেষ অধ্যায় একই সুতোয় বাঁধা।
তাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, ত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের আত্মদান ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার জন্য অবিচল থাকার প্রেরণা হয়ে থাকবে।

 

মৃত নারীর মর্যাদা রক্ষায় নারী ডোম চেয়ে রিট

বাংলাদেশের ময়নাতদন্ত-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালগুলোতে নারী মরদেহের পোস্টমর্টেমের জন্য একজন করে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হয়েছে।গত সোমবার (১৩ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট দায়ের করেন। রিটে স্বাস্থ্যসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে দেশের ময়নাতদন্ত পরিচালনাকারী হাসপাতালগুলোতে নারী ডোম নিয়োগের আবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে আবেদনটির কোনো কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন আবেদনকারী।

রিটে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন দেশ। ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মে নারীর মরদেহের মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও ময়নাতদন্ত একটি আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়া, তবুও মৃত নারীর দেহ পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে নারী কর্মী থাকলে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, পারিবারিক অনুভূতি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা অধিকতর সুরক্ষিত হবে।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কোনো নারী দুর্ঘটনা, হত্যা বা অন্য কোনো কারণে মারা গেলে তার পরিবার এমনিতেই গভীর শোক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকে। সেই অবস্থায় যদি পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন যে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত একজন পুরুষ ডোম করবেন, তাহলে তা তাদের জন্য আরও কষ্টদায়ক হয়ে উঠে।
এ কারণে নারী ডোম নিয়োগকে মানবিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

রিটে মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী মৃত্যুর পরও একজন মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই মর্গে মৃতদেহের নিরাপত্তা ও সম্ভ্রম নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আবেদনে অতীতে মর্গে নারীর মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগে দায়ের হওয়া কয়েকটি আলোচিত ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এক তরুণীর মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগে ডোম আবু সাঈদকে (২৯) গ্রেপ্তারের ঘটনা এবং ২০২০ সালের নভেম্বরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে একই ধরনের অভিযোগে ডোম মুন্না ভগত (২০) গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের মর্গকর্মী কেনেথ ডগলাসের বহুল আলোচিত অপরাধের ঘটনাও রিটে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য কেনেথ ডগলাস ১০০ জন মৃত নারীদেহের সাথে বিকৃত যৌন সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন।

রিটকারীর দাবি, দেশের যেসব হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন করে প্রশিক্ষিত নারী ডোম নিয়োগ দেওয়া হলে মৃত নারীদের মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা সহজ হবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বস্তি বাড়বে এবং ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

এখন রিটের ওপর হাইকোর্টের শুনানির তারিখ নির্ধারণের পর বিষয়টি আদালতে উত্থাপিত হবে। আদালতের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে নারী ডোম নিয়োগসংক্রান্ত পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

 

অনার কিলিং: নিয়ন্ত্রণের নির্মম সংস্কৃতি

সন্তান জন্ম নেওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রথম দায়িত্ব তাকে নিরাপদ রাখা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা যে পরিবার, কখনও কখনও সেই পরিবারই হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা।
সমাজের চোখে ‘সম্মান’ রক্ষার নামে যখন একজন বাবা নিজের সন্তানের দিকে অস্ত্র তোলেন, তখন শুধু একটি জীবনই শেষ হয় না; ভেঙে পড়ে মানবিকতার সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তিও।

সম্প্রতি দেশের দুটি ঘটনা সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সিলেটের বিয়ানীবাজারে ১৭ বছর বয়সী রায়কা আক্তার রিয়া হত্যাকাণ্ড এবং খুলনায় ১৬ বছর বয়সী আরফানা হোসেন নির্জনার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দুটি মামলার তদন্ত এখনও চলমান। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক চাপের কারনেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরই মাধ্যমে আবারও সামনে এনেছে বহুদিনের আলোচিত একটি শব্দ ‘অনার কিলিং’।

অনার কিলিং বা সম্মানের নামে হত্যা বলতে পরিবারের বা গোষ্ঠীর কথিত সম্মান রক্ষার অজুহাতে পরিবারের কোনো সদস্যকে- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী বা কিশোরীকে হত্যা করাকে বোঝায়।
পরিবারের অমতে প্রেম বা বিয়ে, আন্তঃধর্ম বা আন্তঃজাত বিয়ে, বিবাহপূর্ব বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত, কিংবা সম্পর্ক নিয়ে শুধুমাত্র সন্দেহের কারণেও অনেক সমাজে মানুষ এই অপরাধের শিকার হন। এমনকি ধর্ষণ বা অপহরণের মতো অপরাধের শিকার হওয়া নারীকেও অনেক পরিবার ‘অসম্মানের কারণ’ হিসেবে দেখে হত্যার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত নেয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch-এর মতে, অনার কিলিং হলো পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা পরিবারের সম্মান রক্ষার অজুহাতে নারী সদস্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যা বা সহিংসতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর মূল কারণ কোনো ধর্মীয় বিধান নয়; বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং বিকৃত সম্মানবোধ।

ইতিহাস বলছে, অনার কিলিংয়ের শিকড় বহু প্রাচীন। প্রাচীন রোমে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন-মৃত্যুর ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং ব্যভিচারের অভিযোগে নারীকে হত্যার অনুমোদনও প্রচলিত ছিল।
চীনের কিং রাজবংশ, অ্যাজটেক ও ইনকা সভ্যতা, এমনকি ইউরোপের কিছু অঞ্চলেও ব্যভিচার বা পারিবারিক অসম্মানের অভিযোগে নারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির পাওয়া যায়। ইতিহাসের এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, অনার কিলিং কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা অঞ্চলের নয়; বরং নারীর স্বাধীনতা দমন এবং পরিবারের কথিত সম্মান রক্ষার নামে গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহিংসতার রূপ।

বর্তমানে অনার কিলিং কোনো একক দেশের সমস্যা নয়।
দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
সেগুলোর মধ্যে জর্ডান, ইরান, ইয়েমেন, ইরাক এবং মিশর উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া সিরিয়া, লেবানন, কুয়েত, এবং সৌদি আরবেও এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা দেখা যায়।

ইরানে পরিবারের ‘সম্মান’ রক্ষার নামে বাবা বা ভাইয়ের হাতে নারী হত্যার ঘটনা ঘটে এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকরের কারণে অপরাধীরা তুলনামূলক কম শাস্তি পান। জর্ডান ও তুরস্কের কিছু অঞ্চলেও এই প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। আফগানিস্তানে নারীর স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অনার-সম্পর্কিত সহিংসতার ঝুঁকি আরও বেশি। এমনকি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও অভিবাসী কিছু পরিবারের মধ্যে অনার কিলিংয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা UN Women এবং UNODC-এর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৩ হাজার নারী ও কিশোরী ইচ্ছাকৃত হত্যার শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ নিজের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৩৭ জন নারী ও কিশোরী নিজের ঘরেই প্রাণ হারিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, নারীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান অনেক সময় নিজের ঘরই।

উপমহাদেশে অনার কিলিংয়ের সবচেয়ে বেশি আলোচিত উদাহরণ পাকিস্তান।
পাকিস্তানে ‘অনার কিলিং’-এর কথা প্রায়ই শোনা যায়৷ এই বর্বরতা সেখানে যেন সামাজিকভাবেই স্বীকৃত৷ পরিবারের ‘সম্মান রক্ষায়’ আত্মীয়-স্বজন, এমনকি বাবা-ভাইয়ের হাতে পরিবারের কোনো সদস্যকে হত্যা প্রায় নিয়মিত ঘটনা৷
দেশটির Human Rights Commission of Pakistan (HRCP)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অন্তত ৪০৫ জন নারী তথাকথিত সম্মান রক্ষার নামে নিহত হয়েছেন।
২০১৬ সালে কঠোর আইন প্রণয়ন করা সত্ত্বেও, বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গ্রামাঞ্চলে বিকল্প বিচার ব্যবস্থার কারণে অনার কিলিং সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের সিংহভাগই ছিলেন নারী, যাদেরকে পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে আত্মীয়-স্বজনরাই হত্যা করেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ঘটনাই পারিবারিকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়।

ভারতে হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তঃজাত বা আন্তঃধর্ম বিয়ে নিয়ে সংঘটিত অনার কিলিং বহুবার জাতীয় আলোচনায় এসেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ নিজেদের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন এবং সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করা সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন।

বাংলাদেশে অনার কিলিংয়ের আলাদা কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কারণ আইনেও ‘অনার কিলিং’ নামে স্বতন্ত্র কোনো অপরাধের শ্রেণিবিন্যাস নেই। ফলে প্রেম, বিয়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সাধারণ হত্যামামলা হিসেবেই তদন্ত হয়। এ কারণে প্রকৃত চিত্র জানা কঠিন। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রেম বা সম্পর্কের জেরে সন্তান হত্যার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই অনার কিলিংয়ের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান মনে করেন,”অল্প হোক,তারপরও অনার কিলিং আছে।আমরা হয়তো সেটাকে সেভাবে দেখি না৷পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরাই এর প্রধান শিকার৷ আর ধর্ম, সামাজিক অবস্থান এখানে কাজ করছে৷ আগে নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া হতো৷ হাইকোর্ট সেটা বন্ধ করেছে৷ আমি মনে করি, অনার কিলিং নিয়েও আমাদের ভাবার সময় এসেছে৷”

তবে মানবাধিকার কর্মী এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘‘পাকিস্তানে যেমন অনার কিলিংয়ে ক্ষমা পাওয়া যায়, কমিউিনিটি এটাকে গ্রহণ করে, বাংলাদেশে সেই অবস্থা নেই৷ এ ধরণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান আছে৷ কিন্তু যেটা হয়, তা হলো পারিবারিক বা অন্যকোনোভাবে ঘটনাকে গোপন করা হয়৷ আলামত নষ্ট করা হয়৷ ধামাচাপা দেয়া হয়৷”

অ্যাডভোকেট এলিনা খান আরো বলেন,‘‘আমি মনে করি, এক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে৷ পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে এ ধরণের ঘটনা প্রমাণে গুরুত্ব দিতে হবে৷ হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে৷ দরকার আইন ও বাস্তবায়ন৷”

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অনার কিলিংয়ের মূল কারণ প্রেম নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা। অনেক পরিবার এখনও মনে করে, সন্তানের জীবন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরই। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর। কোথায় যাবে, কাকে বিয়ে করবে, কীভাবে জীবন কাটাবে—এসব বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অনেকেরই থাকে না। সেই সীমা অতিক্রম করলেই শুরু হয় পারিবারিক চাপ, মানসিক নির্যাতন, হুমকি, এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কাও।

আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোও বলছে, অনার কিলিং সাধারণত হঠাৎ ঘটে না। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে চলে মানসিক নির্যাতন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ভয়ভীতি, নজরদারি এবং পারিবারিক সহিংসতা। অর্থাৎ হত্যা হলো দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের চূড়ান্ত পরিণতি।

তাহলে পরিবর্তনের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনার কিলিং প্রতিরোধে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বদলানো এবং পরিবার ও সমাজে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে একজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কখনোই পরিবারের ‘সম্মানহানি’ নয়।
একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। সন্তানকে সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে গড়ে তোলা,ধর্মীয় ও নৈতিক সুশিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি সন্তানকে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে মেনে নেওয়া।
মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতের অমিল কখনোই সহিংসতার কারণ হতে পারে না,সেজন্য পরিবারে সংলাপ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে যেসব তরুণ-তরুণী পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

রায়কা আক্তার রিয়া কিংবা আরফানা হোসেন নির্জনা সহ এরও আগে ঘটে যাওয়া অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার আদালত করবেন।
কিন্তু এই দুটি নাম যেন শুধু আরেকটি সংবাদ হয়ে না থাকে।
গণমাধ্যমকে এই ঘটনাগুলো সামাজিক সংকট হিসেবেও তুলে ধরতে হবে।

সম্মান কখনো হত্যা দিয়ে রক্ষা করা যায় না। সত্যিকারের সম্মান নিহিত থাকে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং মর্যাদাকে সম্মান করার মধ্যেই। সমাজ এই সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, সমাজে তত দ্রুত অনার কিলিংয়ের মতো অমানবিক অপরাধ দূরে সরে যেতে পারবে।

তথ্যসূত্র:
UN Women
UNODC
Human Rights Commission of Pakistan (HRCP)

 

রাসূলুল্লাহর (সা) যুগে নারী পুরুষের সহাবস্থান ও মর্যাদা

ড. ফাতিমা রুহানি

Teacher, House of Thinkers, Cyberjaya, Malaysia

রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ ছিল মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় আরব সমাজে নারীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অবহেলিত ও বঞ্চিত। কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করা হতো, নারীরা সম্পত্তির অধিকার পেত না, এবং সামাজিক সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এমন একটি সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা) নারী-পুরুষের মর্যাদা, অধিকার ও সহাবস্থানের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

ইসলাম নারী ও পুরুষকে মানবিক মর্যাদায় সমান ঘোষণা করে এবং উভয়ের জন্য ন্যায়, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনাচরণ, বক্তব্য ও নীতির মাধ্যমে নারীদের শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পারিবারিক সম্মানের বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে তাঁর যুগে নারী-পুরুষের সহাবস্থান ছিল শালীনতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি আদর্শ মডেল।

ঈমান ও মর্যাদার ভিত্তিতে সহাবস্থান

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে নারী ও পুরুষের সহাবস্থানের মূল ভিত্তি ছিল ঈমান (আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস) ও মানবিক মর্যাদা। ইসলাম ঘোষণা করে যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাকওয়া ও আমলের ভিত্তিতেই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়—লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে যে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)

নারী-পুরুষের মর্যাদা নির্নিত হয় কর্মের ভিত্তিতে

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা আন-নিসায় বর্ণনা করেন:

“তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহ কামনা করো না, যা দ্বারা তিনি তোমাদের কাউকে অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের অর্জিত কর্মফল, আর নারীদের জন্য রয়েছে তাদের অর্জিত কর্মফল। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর জ্ঞাতা।” (৪:৩২)

মহান আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় কর্ম ও আমলের ভিত্তিতে, লিঙ্গ বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নয়।

এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি—নারী হোক বা পুরুষ—নিজ নিজ আমল, চেষ্টা ও নেক কাজের ভিত্তিতে প্রতিদান লাভ করবে। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে মর্যাদার মানদণ্ড হলো তাকওয়া, পরিশ্রম ও সৎকর্ম।

আল্লাহর কাছে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদাপূর্ণ

সুরা আন-নাহল (১৬:৯৭):

“যে কেউ সৎকর্ম করবে — পুরুষ হোক কিংবা নারী — আর সে যদি মুমিন হয়, তবে আমি তাকে পরম সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদের কর্মের উত্তম প্রতিদান অবশ্যই দেব।”

আল্লাহর কাছে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদা পায় যদি তারা ঈমান ও সৎকর্মশীল হয়।

আল্লাহর দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাকওয়ার উপর নির্ভর

সুরা আল-হুজুরাতে মহান রাব্বুল আলামীন বলেন (৪৯:১৩):

 “হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদেরকে করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্র, যাতে তোমরা একে অপরকে চেনো। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে সর্বাধিক মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।”

মহান আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই আল্লাহর কাছে সমান মর্যাদাপূর্ণ, যদি তারা ঈমান ও সৎকর্মে অটল থাকে। এখানে লিঙ্গভিত্তিক কোনো পার্থক্য করা হয়নি; বরং শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুইটি বিষয়—ঈমান এবং সৎকর্ম।

নারীর অধিকার ও মর্যাদা সংরক্ষণের নির্দেশ

নারীর প্রতি অত্যাচার ও অবিচারে পূর্ণ এক পৃথিবীতে মহান রাব্বুল আলামিনের সুস্পষ্ট ঘোষণা –

 “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে তোমরা নারীদের জোরপূর্বক উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করো। তাদের উপর কঠোরতা করো না, যাতে তোমরা যা তাদেরকে দিয়েছ তা ফেরত নিয়ে নাও। তবে তারা যদি স্পষ্ট অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয়, তখন ভিন্ন কথা। আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে জীবন যাপন করো। যদি তাদেরকে অপছন্দও করো, তবে হতে পারে তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করলে আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” সুরা আন-নিসা (৪:১৯)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নারীর মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা নির্ধারণ করেছেন—

প্রথমত, নারী কোনো সম্পত্তি নয়—তাকে জোরপূর্বক গ্রহণ করা বা উত্তরাধিকার হিসেবে ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এতে নারীর স্বাধীন সত্তা ও ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অন্যায়ভাবে নির্যাতন বা চাপ প্রয়োগ নিষিদ্ধ। স্বামী বা অভিভাবক যেন কঠোর আচরণ করে নারীর কাছ থেকে প্রদত্ত মোহর বা সম্পদ ফেরত নেওয়ার চেষ্টা না করে—এ নির্দেশ নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

তৃতীয়ত, সদ্ব্যবহারের নির্দেশ। “তোমরা তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে জীবন যাপন করো”—এই অংশটি বৈবাহিক জীবনের মূলনীতি নির্ধারণ করে। ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও সম্মান—এসবের ভিত্তিতেই দাম্পত্য জীবন গড়ে উঠবে।

চতুর্থত, ধৈর্য ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষ কখনও কখনও আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে অপছন্দ করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন—যার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে অপছন্দনীয় কিছু রয়েছে, তার মধ্যেই হয়তো আল্লাহ বহু কল্যাণ রেখেছেন। এটি পারিবারিক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়।

ইবাদত ও মসজিদে অংশগ্রহণ

রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর প্রতিষ্ঠিত সমাজে ইবাদত ছিল নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মসজিদকেন্দ্রিক জীবন—নামাজ, শিক্ষা, উপদেশ ও সামাজিক দিকনির্দেশনা—এসব কার্যক্রমে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। মসজিদে নববী-তে পুরুষদের সঙ্গে একই জামাতে নামাজ আদায় করতেন, তবে শালীনতা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে আলাদা কাতারে—পুরুষরা সামনে, নারীরা পেছনে। এটি বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং ইবাদতের পরিবেশে মনোযোগ, সংযম ও শালীনতা রক্ষার একটি সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“তোমরা নারীদের আল্লাহর ঘরে আসা থেকে বিরত করো না।” — সহিহ মুসলিম

এই হাদিস নারীদের মসজিদে যাওয়ার মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ ধর্মীয় চর্চা ও ইবাদতে অংশগ্রহণ তাদের প্রাপ্য অধিকার; সমাজ বা পরিবার ইচ্ছামতো তা বন্ধ করতে পারে না।

আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে:

“পুরুষদের প্রথম কাতার হচ্ছে সর্বোত্তম, আর নারীদের প্রথম কাতার হচ্ছে সবচেয়ে কম উত্তম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৪০)

এর ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন—পুরুষদের জন্য সামনে থাকা উত্তম, কারণ তা ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বেশি মনোযোগ ও ফজিলত অর্জনের সুযোগ দেয়। আর নারীদের ক্ষেত্রে পেছনের কাতার অধিক শালীন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করত, তাই সেটিই উত্তম বিবেচিত হয়েছে। এখানে মর্যাদার হ্রাস-বৃদ্ধি নয়; বরং পরিবেশগত শালীনতার বিবেচনাই মূল।

উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

রাসূল ﷺ সালাম ফেরানোর পর নারীরা সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যেতেন, আর পুরুষরা কিছুক্ষণ বসে থাকতেন—যাতে বাইরে ভিড় বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি না হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৭০)

এটি প্রমাণ করে যে, সহাবস্থান ছিল সুসংগঠিত ও সম্মানজনক। পারস্পরিক সম্মান ও শালীনতা বজায় রেখে সবার ইবাদত নিশ্চিত করা হতো।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক সমাজে নারীরা কেবল গৃহকেন্দ্রিক ছিলেন না; বরং ইবাদত, জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। তবে সেই অংশগ্রহণ ছিল শালীনতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানের কাঠামোর মধ্যে। এভাবেই রাসূলুল্লাহ ﷺ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন—যেখানে সবাই আল্লাহর ইবাদতে সমানভাবে অংশ নিতে পারত, আবার সামাজিক শৃঙ্খলাও অটুট থাকত।

শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা

রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর যুগে জ্ঞান অর্জন ছিল নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে শিক্ষা দিয়েছেন যে, ইলম বা জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। ফলে নারীরাও সরাসরি তাঁর নিকট এসে প্রশ্ন করতেন, দ্বীনি জ্ঞান শিখতেন এবং প্রাপ্ত জ্ঞান অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

আবু সাঈদ খুদরি (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদল নারী রাসূল ﷺ–এর কাছে এসে বললেন: “পুরুষরা আপনাকে বেশি সময় নিয়ে নেয়; আমাদের জন্য আলাদা একটি দিন নির্ধারণ করুন।” তখন তিনি তাদের জন্য বিশেষভাবে একটি দিন নির্ধারণ করেন এবং উপদেশ ও শিক্ষা প্রদান করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৩৪)

এ ঘটনা প্রমাণ করে যে নারীরা জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী ছিলেন এবং রাসূল ﷺ তাঁদের এই আগ্রহকে সম্মান দিয়ে শিক্ষার সুব্যবস্থা করেছিলেন। এটি নারীর শিক্ষার অধিকারের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

হযরত আয়িশা (রাঃ) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী আলেমা। তিনি বিপুলসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং বহু জটিল মাসআলার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আবু মুসা আশআরি (রাঃ) বলেন: “রাসূল ﷺ–এর সাহাবীদের যদি কোনো বিষয়ে সন্দেহ হতো, আমরা আয়িশার কাছে জিজ্ঞেস করতাম; তাঁর নিকট আমরা জ্ঞান পেতাম।” (জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৮৩)

এটি প্রমাণ করে যে নারী কেবল শিক্ষার্থীই নন, বরং শিক্ষক ও ফিকহবিশারদ হিসেবেও সমাজে স্বীকৃত ছিলেন। পুরুষ সাহাবীরাও তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করতেন—যা নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদার উজ্জ্বল উদাহরণ।

এছাড়া উম্মে সালামা (রাঃ) কুরআনের আয়াত নাযিল প্রসঙ্গে সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন: “হে আল্লাহর রাসূল ﷺ, পুরুষদের নাম তো কুরআনে এসেছে, কিন্তু নারীদের নাম কোথায়?” তাঁর এই প্রশ্নের পর সূরা আহযাব–এর ৩৫ নম্বর আয়াত নাযিল হয়, যেখানে মুমিন নারী-পুরুষ উভয়কে সমানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—ইবাদত, ধৈর্য, দান, রোজা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে। (তাফসির ইবনে কাসির)

এই ঘটনা দেখায় যে নারীরা দ্বীনি বিষয়ে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করতেন না, এবং তাঁদের প্রশ্ন সমাজ ও শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যার কারণ হয়েছে।

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সমাজে নারীরা জ্ঞানচর্চায় সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তারা প্রশ্ন করতেন, শিখতেন, শিক্ষা দিতেন এবং দ্বীনের প্রচারে অংশ নিতেন। ফলে ইসলামি সমাজে শিক্ষা ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত—যেখানে নারী-পুরুষ উভয়েই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে সমাজ গঠনে অবদান রেখেছেন।

বাই‘আত ও অঙ্গীকারে অংশগ্রহণ

ইসলামের ইতিহাসে বাই‘আত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার—যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ–এর প্রতি আনুগত্য, নৈতিকতা ও দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিত। এ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বীকৃত, মর্যাদাপূর্ণ ও সুস্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ।

মহান আল্লাহ সূরা আল-মুমতাহিনা–এর ১২ নম্বর আয়াতে নবী ﷺ–কে নির্দেশ দেন, যখন মুমিন নারীরা তাঁর কাছে বাই‘আত করতে আসবে, তখন নির্দিষ্ট শর্তে তাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করতে এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে।

এই আয়াতে যে শর্তগুলো উল্লেখ করা হয়েছে—শিরক পরিহার, চুরি না করা, ব্যভিচার না করা, সন্তান হত্যা না করা, অপবাদ না দেওয়া এবং সৎকর্মে অবাধ্য না হওয়া—এসবই একটি নৈতিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি। অর্থাৎ নারীদের বাই‘আত ছিল কেবল ধর্মীয় আনুগত্য নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামো রক্ষার অঙ্গীকার।

হযরত আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, যখন এই আয়াত নাযিল হয়, তখন ঈমানদার নারীরা এসে উল্লিখিত শর্তে বাই‘আত করতেন এবং রাসূল ﷺ তাঁদের অঙ্গীকার গ্রহণ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৮৯১)

এটি প্রমাণ করে যে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দ্বীনি ও সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসতেন।

আরেক বর্ণনায় উম্মে আতিয়া (রাঃ) বলেন, বাই‘আতের সময় তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, শোকের অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে বিলাপ করবেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৩৫)

এতে বোঝা যায়, বাই‘আত ছিল দৈনন্দিন আচরণ ও সামাজিক সংস্কৃতির সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া।

আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, রাসূল ﷺ কোনো নারীর হাত স্পর্শ করে বাই‘আত নিতেন না; বরং কথার মাধ্যমেই গ্রহণ করতেন। তিনি বলতেন, “আমি তোমাদের বাই‘আত গ্রহণ করলাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫১২৭) এটি তাঁর শালীনতা ও নৈতিক সীমারেখা রক্ষার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যেখানে নারীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবেও নারীদের অংশগ্রহণ সুস্পষ্ট। মক্কা বিজয়–এর সময় বহু নারী এসে ইসলামের শর্ত মেনে বাই‘আত করেন। এছাড়া দ্বিতীয় আকাবার বাইআত–এ নুসাইবা বিনতে কা‘আব (রাঃ)-এর মতো সাহসী নারী অংশ নিয়েছিলেন। তিনি পরবর্তীতে উহুদের যুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে নবী ﷺ–কে রক্ষা করেছিলেন—যা প্রমাণ করে যে বাই‘আত ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের অঙ্গীকার।

অর্থাৎ, ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের অঙ্গীকারে নারীদের সক্রিয় ও সম্মানজনক অংশগ্রহণ ছিল স্বীকৃত। বাই‘আতের মাধ্যমে তারা ঈমান, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের শপথ নিতেন। এতে স্পষ্ট হয় যে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর যুগে নারীরা সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাণে অবিচ্ছেদ্য অংশীদার ছিলেন।

নারীদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দানে নারীরা

রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যুগে নারীরা শুধু ইসলাম গ্রহণ করেই থেমে যাননি, বরং সক্রিয়ভাবে অন্যদের ইসলামের পথে আহ্বান করেছেন।

খাদিজা (রাঃ) ছিলেন ইসলামের প্রথম দাওয়াত দানকারী নারী। রাসুল ﷺ প্রথম ওহি পাওয়ার পর ভয়ে-উদ্বিগ্ন হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। খাদিজা (রাঃ) তাঁকে শান্ত করেন এবং আল্লাহর রাস্তা গ্রহণে উৎসাহ দেন। তিনিই প্রথম ঈমান গ্রহণ করেন এবং নবীজিকে সমর্থন ও দাওয়াহ কাজে সহায়তা করেন। – সহিহ বুখারি, হাদিস ৩

উম্মে শারিক (রাঃ) মক্কার মহিলাদের মাঝে গোপনে ইসলাম প্রচার করতেন। কুরাইশরা বিষয়টি জানতে পেরে তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল, তবুও তিনি দাওয়াহ চালিয়ে যান। – আল-ইসাবাহ ফি তামীয আস-সাহাবাহ, ইবনে হাজর

ফাতিমা (রাঃ) এর নিজ পরিবারের মধ্যে দাওয়াহ কাজের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইসলামে পাওয়া যায়। উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর বোন ফাতিমা (রাঃ) ও তাঁর স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমর (রাঃ) তাঁদের কাছে কুরআন (সূরা ত্ব-হা) শুনে আবেগাপ্লুত হন এবং পরে মুসলিম হয়ে যান। নারীর দাওয়াহ প্রভাবে ইসলামের শক্তিশালী রক্ষক উমর (রাঃ) মুসলিম হন। – সীরাহ ইবনে হিশাম

উম্মে আম্মারা (নুসাইবা বিনতে কা‘আব, রাঃ) মক্কার নারীদের মাঝে দাওয়াহ কাজে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। আকাবার বাই‘আতেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। কেবল আনুগত্য নয়, বরং অন্য নারীদেরও ইসলামে আহ্বান করেছেন। – ইবনে ইসহাক, আস-সীরাহ

হিজরতে ভূমিকা

হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়—শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, বরং ঈমান রক্ষার জন্য ত্যাগ, ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরীক্ষা। এই কঠিন সময়ে নারীরাও পুরুষদের মতোই সাহস, প্রজ্ঞা ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

প্রথমত, উম্মে সালামা (রাঃ)-এর ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তিনি স্বামীসহ মদিনায় হিজরত করতে চাইলে তাঁর পরিবার তাঁকে আলাদা করে দেয় এবং সন্তানকেও ছিনিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ধৈর্য ধারণের পর অবশেষে তিনি একাকী মদিনার পথে রওনা হন। পথে একজন অমুসলিম ব্যক্তিও তাঁর সততা ও সাহস দেখে সহায়তা করেন।

এই ঘটনা প্রমাণ করে—নারীরা ঈমানের জন্য পারিবারিক কষ্ট, সামাজিক বাধা ও দীর্ঘ ভ্রমণের ঝুঁকি পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ), যিনি “যাতুন-নিতাকাইন” (দুই নিতাকের অধিকারিণী) নামে খ্যাত। হিজরত-এর সময় যখন রাসূল ﷺ ও আবু বকর (রাঃ) সওর গুহা-তে আশ্রয় নেন, তখন আসমা (রাঃ) গোপনে খাবার ও পানি পৌঁছে দিতেন। খাবারের পুটলি বাঁধার জন্য কোমরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছিলেন—এ কারণেই তাঁর এই উপাধি। তিনি শুধু রসদই পৌঁছে দেননি; শত্রুদের প্রশ্নের মুখেও দৃঢ় ছিলেন। এমনকি আবু জাহল তাঁকে চড় মারলেও তিনি রাসূল ﷺ–এর অবস্থান প্রকাশ করেননি। এটি তাঁর ঈমানী দৃঢ়তার অনন্য উদাহরণ।

তৃতীয়ত, রুকাইয়া বিনতে মুহাম্মদ (রাঃ) ও তাঁর স্বামী উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) প্রথমে আবিসিনিয়ায় (হাবশা) হিজরত করেন। ইসলামের প্রথম দিকের এই হিজরতেও নারীরা অংশ নিয়েছিলেন, যা দেখায় যে দ্বীনের জন্য দেশত্যাগে তারাও সমানভাবে প্রস্তুত ছিলেন।

এছাড়া মদিনায় আগত মুহাজির নারীরা নতুন পরিবেশে পরিবার গঠন, সন্তান প্রতিপালন ও সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা শুধু অনুসারী ছিলেন না; বরং একটি নতুন ইসলামী সমাজের ভিত্তি স্থাপনে সক্রিয় অংশীদার ছিলেন।

হিজরতের ইতিহাস কেবল পুরুষ সাহাবীদের বীরত্বগাথা নয়; বরং নারীদের ত্যাগ, ধৈর্য ও অবিচল ঈমানের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তারা কষ্ট সহ্য করেছেন, গোপন সহযোগিতা করেছেন, পরিবার হারিয়েছেন, তবুও দ্বীনের পথে অটল থেকেছেন। এভাবেই হিজরত প্রমাণ করে—ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারী-পুরুষ উভয়েই সমান সাহস ও দায়িত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

যুদ্ধ ও জনসেবায় অবদান

বদর, উহুদ, খন্দকের মতো যুদ্ধে নারীরা পুরুষদের সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ পানীয় ও চিকিৎসা দিতেন, আবার কেউ অস্ত্র হাতে লড়েছেন

উহুদের যুদ্ধে নুসাইবা বিনতে কা‘আব (রাঃ) তলোয়ার ও ধনুক নিয়ে পুরুষ সাহাবিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। রাসুল ﷺ এর চারপাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে রক্ষা করেন। যুদ্ধে তিনি একাধিক আঘাত পান। – সীরাহ ইবনে হিশাম

খন্দকের যুদ্ধে সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ), রাসুল ﷺ এর ফুফু এক ইহুদি গুপ্তচর মুসলিম নারীদের তাঁবুর কাছে এলে তিনি নিজ হাতে তাকে হত্যা করেন এবং সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। – আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির

উম্মে সুলাইম (রাঃ) যুদ্ধে সাহাবিদের জন্য পানি বহন করতেন, আহতদের সেবা করতেন। কখনো কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রও ব্যবহার করেছেন।

উম্মে আতিয়া (রাঃ) বলেন: “আমি রাসুল ﷺ এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমরা খাদ্য তৈরি করতাম, আহতদের সেবা করতাম, এবং শহীদদের দাফন করতাম।” – সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮১২

এতে বোঝা যায়, সম্মিলিতভাবে সমাজ রক্ষা ও ঐক্য সুদৃঢ় করার কাজে উভয় পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

৮. পরামর্শ ও শূরা

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর পরামর্শ

হিজরতের ৬ষ্ঠ বছরে হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হয়। অনেক সাহাবী তখন চুক্তির শর্ত শুনে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের কুরবানির পশু জবাই ও ইহরাম খোলার নির্দেশ দেন। কিন্তু সাহাবীরা দুঃখ ও হতাশার কারণে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যায়। এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে বিষয়টি আলোচনা করেন। তিনি পরামর্শ দেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি নিজে আগে কুরবানির পশু জবাই করে মাথা মুন্ডন করুন। সাহাবীরা আপনাকে দেখে নিজেরাই আপনার অনুসরণ করবে।” রাসূলুল্লাহ ﷺ এই পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন, এবং সাহাবীরা সাথে সাথে তা অনুসরণ করে। এটি প্রমাণ করে যে, কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি নারীর মতামত গ্রহণ করেছেন এবং তা কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

শূরায় নারীদের অংশগ্রহণ

কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— “তাঁদের কাজকর্ম পরামর্শের ভিত্তিতে হয়” (সূরা আশ-শূরা ৪২:৩৮)।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ব্যাখ্যা করেছেন জীবনে। নারীরাও তাঁর শূরা-পরিষদে প্রশ্ন করতে পারতেন, পরামর্শ দিতে পারতেন। যেমন, উম্মে সালামা (রা.), আয়েশা (রা.), ফাতিমা (রা.) প্রমুখ সময়োপযোগী মতামত দিয়েছেন।

মদিনার সামাজিক জীবনে নারীর পরামর্শ

রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে নারীদের জন্য বিশেষ দিন নির্ধারণ করেছিলেন, যেখানে তারা নিজেদের প্রশ্ন, সমস্যা ও পরামর্শ পেশ করতেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) এতে বোঝা যায়, সামাজিক ও পারিবারিক সিদ্ধান্তেও তাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।

উপসংহার:

রাসূলুল্লাহ ﷺ নারী-পুরুষকে সমাজের দুই বিপরীত মেরু হিসেবে আলাদা করে দেখেননি; বরং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শালীনতা, ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে উভয়কে একত্রে একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, নারী ও পুরুষ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—বরং পরিপূরক। একজনের শক্তি ও দায়িত্ব অন্যজনকে সহায়তা করে; এভাবেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনাচরণে নারীদের শিক্ষা গ্রহণ, মতামত প্রদান, সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শালীনতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সীমারেখা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সহাবস্থান হয় সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সদাচরণের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ককে দৃঢ় করেছেন এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ফলস্বরূপ তাঁর যুগে এমন একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়েই ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশীদার—ইবাদতে, জ্ঞানচর্চায়, ত্যাগে, সমাজসেবায় এবং রাষ্ট্রগঠনে। এই আদর্শ মডেল আজও মানবজাতির জন্য প্রাসঙ্গিক ও অনুসরণযোগ্য।

সুতরাং বলা যায়, ঈমান, সৎকর্ম ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সেই সমাজই ছিল প্রকৃত সাম্য, মর্যাদা ও ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

১৭ বছর বয়সেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলোড়ন, সংক্রমণ শনাক্তকারী সেলাই সুতা আবিষ্কার দাসিয়া টেলরের

অস্ত্রোপচারের পর ক্ষতস্থানে সংক্রমণ বা ইনফেকশন হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক সময় সময়মতো সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়ায় রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। এই জটিল সমস্যার এক অবিশ্বাস্য ও সহজ সমাধান আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আমেরিকার আয়োয়া অঙ্গরাজ্যের এক হাইস্কুল ছাত্রী দাসিয়া টেলর। খন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। নিজের স্কুলের রসায়ন ক্লাসের একটি সাধারণ প্রজেক্ট থেকে তিনি এমন এক ‘স্মার্ট সিউচার’ বা সেলাই সুতা তৈরি করেছেন, যা ক্ষতস্থানে সংক্রমণ শুরু হলেই রং বদলে সংকেত দেয়। ​এই যুগান্তকারী যাত্রার শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে। দাসিয়ার রসায়নের শিক্ষক ক্যারোলিন ওয়ালিং যখন ক্লাসে বার্ষিক বিজ্ঞান মেলার কথা জানান, তখন থেকেই ভিন্নধর্মী কিছু করার পরিকল্পনা করেন দাসিয়া। তিনি লক্ষ্য করেন, অস্ত্রোপচারের পর বিশেষ করে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সঠিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ক্ষতস্থানের সংক্রমণ সময়মতো ধরা পড়ে না। এই মানবিক চিন্তা থেকেই তিনি এমন কিছু তৈরির চেষ্টা শুরু করেন, যা কোনো দামি যন্ত্র ছাড়াই সাধারণ মানুষ খালি চোখে বুঝতে পারবে। ​দাসিয়ার এই চমৎকার আবিষ্কারের পেছনে কাজ করেছে বিজ্ঞানের খুব সহজ একটি সূত্র, যা মানবদেহের ‘pH’ বা অম্ল-ক্ষারের মাত্রার সাথে সম্পর্কিত। সাধারণত মানুষের সুস্থ ত্বকের স্বাভাবিক pH মাত্রা কিছুটা অ্যাসিডিক অর্থাৎ প্রায় ৫ হয়ে থাকে। কিন্তু ক্ষতস্থানে যখনই কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে, তখন সেখানকার পরিবেশ দ্রুত ক্ষারীয় রূপ নেয় এবং pH মাত্রা বেড়ে প্রায় ৯-এ পৌঁছায়। দাসিয়া বুঝতে পেরেছিলেন, যদি সেলাই সুতা এই pH পরিবর্তনের সাথে সাথে রং বদলাতে পারে, তবে খুব সহজেই ইনফেকশন শনাক্ত করা সম্ভব। ​এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রাকৃতিক pH ইন্ডিকেটরের খোঁজে নেমে পড়েন দাসিয়া। বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবশেষে তিনি বেছে নেন আমাদের পরিচিত বিটরুট। প্রায় তিন ডজন বিট থেকে রস বের করে তিনি তা তুলা ও পলিয়েস্টার মিশ্রণের তৈরি সাধারণ সেলাই সুতায় প্রয়োগ করেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম সংক্রমিত পরিবেশে সুতাটি রাখা মাত্রই ঘটে চমকপ্রদ ঘটনা,মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে সুতাটি তার উজ্জ্বল লাল রং বদলে গাঢ় বেগুনি হয়ে যায়। ​চিকিৎসা বাজারে আগে থেকেই কিছু উন্নত “স্মার্ট সিউচার” বা সুতা থাকলেও দাসিয়ার তৈরি সুতাটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য। প্রচলিত স্মার্ট সুতাগুলো তৈরিতে অত্যন্ত চড়া প্রযুক্তির সিলিকন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাছাড়া সেই সুতার রিডিং দেখার জন্য স্মার্টফোন বা ল্যাব মনিটরের প্রয়োজন পড়ে। অন্যদিকে দাসিয়ার তৈরি পদ্ধতিটি অত্যন্ত সস্তা, সহজে প্রস্তুতযোগ্য এবং এর রং পরিবর্তন এতটাই স্পষ্ট যে রোগী বা স্বাস্থ্যকর্মীরা কোনো যন্ত্র ছাড়াই খালি চোখে সংক্রমণ দেখতে পাবেন। ​এই অসামান্য উদ্ভাবনের জন্য দাসিয়া টেলর ২০২১ সালের আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ ‘রেজেনেরন সায়েন্স ট্যালেন্ট সার্চ’ প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ৪০ জন ফাইনালিস্টের মধ্যে জায়গা করে নেন। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর তিনি আয়োয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ্লোবাল হেলথ’ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন।

Loading

 

অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর প্রথম নারী সেনাপ্রধান সুসান কয়েল, ১২৫ বছরের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়

অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর ১২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী চিফ অব আর্মি (সেনাপ্রধান) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুসান কয়েল আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটির সামরিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।

দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্সের চিফ অব জয়েন্ট ক্যাপাবিলিটিজ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নতুন দায়িত্বে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইমন স্টুয়ার্ট-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এ নিয়োগকে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেছেন, সুসান কয়েলের নেতৃত্ব বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারী সেনাসদস্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

৫৫ বছর বয়সী সুসান কয়েল ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রায় চার দশকের সামরিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও নেতৃত্বের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। তাঁর এই নিয়োগের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্সের কোনো সার্ভিস শাখার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো একজন নারী দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্সে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ২১ শতাংশ। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের পদে নারীদের উপস্থিতি ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী।

Loading