জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই গণআন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। ছাত্রদের পাশাপাশি প্রায় সব শ্রেণীর নারীরাও ছিলেন আন্দোলনের সামনের সারিতে।
কেউ মিছিলে অংশ নিয়েছেন, কেউ আহতদের সেবা দিয়েছেন, কেউ প্রতিবাদকে সংগঠিত করেছেন, আবার কেউ ঘরের বারান্দা বা ছাদে দাঁড়িয়েই সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে প্রাণ হারানো নারী শহীদদের জীবনগল্প শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক।
শহীদদের মধ্যে ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী নাঈমা সুলতানা। রাজধানীর উত্তরায় বসবাসকারী এই স্কুলছাত্রী পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিবাদী পোস্টারও তৈরি করেন।
১৯ জুলাই বাসার বারান্দা থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ আক্রমণ চালালে,ওই পরিস্থিতি ফোনের ক্যামরায় ধারণ করার সময় পুলিশ তার দিকে গুলি ছুড়লে, মাথার একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মেঝেতে মগজ ছিটিয়ে পড়ে। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে শুধু একটাই শব্দ করতে পেরেছিল, ‘মা…আ…!’
পরিবারের স্বপ্ন ছিল তিনি বড় হয়ে চিকিৎসক হবেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ছিল মাত্র সাড়ে ছয় বছরের রিয়া গোপের মৃত্যু। নারায়ণগঞ্জে বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয় শিশুটি। কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সে মারা যায়। আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না; তবু সহিংসতার নির্মম শিকার হয় একটি নিষ্পাপ শিশু।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়া আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিন কর্মসূচিতে যোগ দিতেন এবং পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টের কর্মসূচিতেও অংশ নেন। সাভারে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আন্দোলনের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।
নারায়ণগঞ্জের সুমাইয়া আক্তার ছিলেন এক নবজাতক সন্তানের মা। বাসার পাশের সড়কে সংঘর্ষের শব্দ শুনে বারান্দায় গেলে গুলি এসে তার মাথায় লাগে। হাসপাতালে নেওয়া হলেও তআর বাঁচানো যায়নি তাকে। তার মৃত্যুর পর অল্পবয়সী সন্তানটি এখন নানীর কাছে বড় হচ্ছে।
৫৭ বছর বয়সী শাহিনূর বেগম জীবিকার তাগিদে মাছের ব্যবসা করতেন এবং অসুস্থ স্বামীর সংসার চালাতেন।২২জুলাই সকালে হাঁটতে বেরিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুতে পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
মোসাম্মত লিজা জীবিকার জন্য ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পাশাপাশি একটি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষাও গ্রহণ করছিলেন।
সংঘর্ষের সময় ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও কয়েক দিন পর তার মৃত্যু হয়। পরিবারের আশা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে তিনি গ্রামে ফিরে নতুন জীবন শুরু করবেন।
নোয়াখালীর নাছিমা আক্তার বেড়াতে এসেছিলেন ঢাকায় ভাইয়ের বাসায়।
সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে ছাদে গিয়ে পরিস্থিতি দেখার সময় একই ঘটনায় তিনি ও তার ভাতিজা গুলিবিদ্ধ হন। ভাতিজা বেঁচে ফিরলেও নাছিমা আর ফিরতে পারেননি।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা কলেজছাত্রী রিতা আক্তার।
দরিদ্র পরিবারের একমাত্র বড় আশা ভরসা।
৫ আগস্টের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।
রিতা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে চলে যান মার্চ-টু-ঢাকা কর্মসূচিতে যোগ দিতে। দুপুরে মা ঘরে ফিরে দেখেন মেয়ে নেই। খুঁজতে বের হন। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়ের খোঁজ না পেয়ে মেডিকেল কলেজগুলোর মর্গে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। এক মেডিকেল থেকে আরেক মেডিকেল দৌঁড়াদৌঁড়ি করে রাত ১০টার পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের মর্গে মেয়ের মরদেহ পান। গায়ের জামাকাপড় দেখে মেয়েকে শনাক্ত করতে পারেন তিনি।
তার মৃত্যুতে একটি পরিবারের বহু বছরের স্বপ্নও থেমে যায়।
প্রায় ৬০ বছর বয়সী মায়া ইসলাম নাতিকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন।
একই গুলি নাতির মাথার তালু ভেদ করে দাদির তলপেটে আঘাত করে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মায়া ইসলাম।
আর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শিশুটির চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্যের ব্যাপারে এগিয়ে আসেন। তাদের সহযোগিতায় শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুর।
অনার্সপড়ুয়া মেহেরুন নেছা তানহা শুরুতে আন্দোলনে সক্রিয় না থাকলেও এক আত্মীয় নিহত হওয়ার পর প্রতিবাদে যুক্ত হন।
৫ আগস্ট বাসায় ফেরার পর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন।
নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই বহন করতেন এবং পরিবারের জন্য ছিল তার অনেক স্বপ্ন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো এই দশ নারী ভিন্ন ভিন্ন বয়স, পেশা ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করেন।
কেউ ছিলেন শিক্ষার্থী, কেউ গৃহিণী, কেউ কর্মজীবী নারী, কেউ আবার শিশু। কিন্তু তাদের সবার জীবনের শেষ অধ্যায় একই সুতোয় বাঁধা।
তাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, ত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের আত্মদান ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার জন্য অবিচল থাকার প্রেরণা হয়ে থাকবে।


