banner

বৃহস্পতিবার, ৩০ Jul ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: March 31, 2026

 

জুলাই ট্র্যাজেডির জীবন্ত সাক্ষী ছোট্ট মুসা

ঢাকার রামপুরার আট বছর বয়সী বাসিত খান মুসার জীবন ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতার পর থেকে আর আগের মতো নেই।
যে শিশুটি একসময় দৌড়ে খেলত, হাসত, কথা বলত, আজ সে খেলনা পিয়ানোয় সুর তোলে শুধু বাম হাতে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কিংবা খাবার খাওয়াও আর সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মুসা বাবার সঙ্গে আইসক্রিম কিনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। ঠিক সেই সময় রামপুরা এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা শুরু হয়। হঠাৎ ছুটে আসা একটি গুলি শিশুটির মাথায় আঘাত করে।
একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তার দাদি মায়া ইসলাম। হাসপাতালে নেওয়ার পরদিন তিনি মারা যান।

মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ছেলের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি তখন জানতেই পারেননি তার মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে মায়ের মৃত্যুর খবর পেলেও ছেলের সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুসার চিকিৎসা শুরু হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। পরে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশেও নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এ পর্যন্ত তার মাথায় ২১টি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খুলির অংশে কৃত্রিম খুলি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মস্তিষ্কে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল শরীরের অন্য অংশে সরিয়ে নিতে স্থায়ী শান্টও বসানো হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় সাত মাস নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকার পর ধীরে ধীরে সুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। বর্তমানে মুসা আশপাশের অনেক কিছুই বুঝতে পারে এবং অল্প কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। তবে এখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটা, কথা বলা কিংবা নিজের হাতে খাবার খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে পায়নি। নাকে লাগানো একটি নলের মাধ্যমে তাকে তরল খাবার দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসার দীর্ঘ ব্যয় পরিবারটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থসংকটের কারণে সিঙ্গাপুরে নির্ধারিত ফলোআপ চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। বিদেশ থেকে আনা বিশেষ ওষুধ ও পুষ্টিকর তরল খাবারের মজুতও শেষের পথে বলে জানিয়েছে পরিবার।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতায় মুসার মতো আরও বহু শিশু প্রাণ হারিয়েছে বা গুরুতর আহত হয়েছে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের ঘটনায় মোট ১২৮ জন শিশু ও কিশোর নিহত হয়েছে। তাদের অনেকের জীবনও মুসার মতো চিরতরে বদলে গেছে।

 

হাঁড়িশাল থেকে মডার্ন কিচেন: চেনা খাবারের অজানা ইতিহাস

আমাদের খুব চেনা, ভীষণ আপন ‘হেঁশেল’ শব্দটার জন্ম কিন্তু হুট করে হয়নি। একটু পেছনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এটি আসলে এসেছে ‘হাঁড়িশাল’ শব্দ থেকে।
সহজ কথায় যে ঘরে হাঁড়ি রাখা হয়, সেটাই হাঁড়িশাল।
পুরোনো গ্রামীণ বাংলায় সমাজ ও জীবনযাত্রার সাথে মিলিয়ে এমন প্রচুর ‘শাল’ বা ‘শালা’ শব্দের ব্যবহার ছিল।
যেমন গরুর থাকার জায়গা গোয়াল বা গোশাল, কামারদের কাজ করার কারখানা কামারশাল, ঘোড়া রাখার ঘোড়াশাল কিংবা পড়াশোনার জন্য পাঠশালা।
সংস্কৃত সাহিত্যে রান্নাঘরের একটা বেশ মিষ্টি আর রসালো নাম পাওয়া যায় ‘রসবতী’। শুনতে ভারী চমৎকার হলেও এই নামটা বোধহয় অভিধানের পাতাতেই বন্দি হয়ে রয়ে গেছে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মুখের ভাষায় হাঁড়িশালই কালক্রমে আদুরে ‘হেঁশেল’ হয়ে উঠেছে।

​জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অসামান্য রন্ধনশিল্পী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তাঁর কালজয়ী রান্নার বই ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’-এ সেকালের হেঁশেলের এক বিশাল সরঞ্জামের বিবরণ দিয়েছেন।
সেই তালিকাটি পড়লে আমাদের চোখ কপালে উঠবে! ধামা, চুপড়ি, কুড়ুল, দা, উনানের হাওয়া দেওয়ার পাখা থেকে শুরু করে ছাই খোঁচানোর লোহার শিক কী ছিল না সেখানে!
আজকের মডার্ন কিচেনের গ্যাস বার্নার, মিক্সার গ্রাইন্ডার, মাইক্রোওয়েভ আর ওটিজির চাকচিক্যে সেই কাঠের উনানের দিন আজ সত্যিই ফুরিয়েছে।
শিল-নোড়ার জায়গা দখল করেছে মিক্সি, আর যে ভাতের হাঁড়ির নামে রান্নাঘরের নাম হয়েছিল হাঁড়িশাল, সেই ঐতিহ্যবাহী তোলো বা তিজেল হাঁড়িকে একরকম ঘরছাড়া করে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে প্রেসার কুকার। তবে রান্নার সরঞ্জাম আর প্রযুক্তি যতই বদলাক না কেন, যুগ যুগ ধরে বাঙালির হেঁশেলের আসল উদ্দেশ্য কিন্তু একই রয়ে গেছে -আর তা হলো মন জুড়ানো রসনাবিলাস।

​আমাদের প্রাচীন বাংলায় মাটিতে বসে কলাপাতায় কিংবা শালপাতায় পাত পেড়ে খাওয়ার মধ্যে একটা আলাদা স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল।
মধ্যযুগীয় ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ কাব্যের কবি বাঙালির এই ভোজনসুখের এক চমৎকার বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন যে, কলার পাতায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, ঘন দুধ, মৌরলা মাছের তরকারি আর নালতে শাক যখন পরম স্নেহে স্ত্রী পরিবেশন করেন, তখন সেই অন্ন খাওয়ার সৌভাগ্য কেবল কোনো পুণ্যবানের ভাগ্যেই জোটে। সময়ের সাথে সাথে কলাপাতার বদলে কাঁসা বা স্টিলের থালা-বাটি ববা হাল যুগের সিরামিকের প্লেটের চল হলেও, খাবার পরিবেশনের সেই আন্তরিকতা আর পদের বৈচিত্র্য বাঙালি আজও ধরে রেখেছে।

​প্রথম পাতে গরম ভাতের সাথে ‘ভাতে’ বা সেদ্ধ খাওয়ার এক চিরকালীন নিয়ম ছিলো আমাদের। সবজিকে আলাদা করে জল দিয়ে সেদ্ধ না করে ভাতের ভেতরেই সেদ্ধ করে নেওয়ার এই পদ্ধতিটি সত্যিই দারুণ। এতে ভাতের নিজস্ব সুঘ্রাণের সাথে সবজির স্বাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আলু, কুমড়ো, করলা, ওল কিংবা স্রেফ একটা পাতলা কাপড়ে বেঁধে মসুর ডাল যখন সরিষার তেল, নুন আর কাঁচা মরিচে চটকে মাখা হয়, তখন তার স্বাদের কাছে সাহেবদের নুন ছিটানো সেদ্ধ সবজি (sauté vegetables) নিমেষেই হার মানে।
প্রথম পাতের এই ঘরোয়া আয়োজনের সাথে বেগুন পোড়াও দারুণ জমে। যেমনটা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে গোপাল ভাঁড় বলেছিলেন -পোড়ার মুখে সবই ভালো!
আর এই প্রথম পাতের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি হলো শুক্তো।
শুক্তো হলো ভাতের সাথে পরিবেশিত একটি ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর বাঙালি নিরামিষ পদ। এটি হালকা তিতকুটে স্বাদের জন্য পরিচিত। সজনে ডাঁটা, করলা, আলু, কাঁচকলা, বেগুন এবং বড়ির সমন্বয়ে তৈরি এই সুস্বাদু পদটি সাধারণত রান্নার শেষে সামান্য দুধ ও ঘি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

​বাঙালির দুপুরের ভোজে ভাতের সাথে যার ডাক পড়ে, সে হলো ডাল। মধ্যযুগীয় সাহিত্যে ডালকে বলা হতো ‘সূপ’। আর এই সূপ যিনি রাঁধতেন, তাঁকে বলা হতো ‘সূপকার’।
বাঙালিয়ানা খাবারের ইতিহাসে ডাল মূলত প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির অংশ। ইতিহাসবিদদের মতে, ডালের চাষ এবং খাওয়ার রীতি আর্য ভারতের দান হলেও, ১৫ শতক থেকে এটি বাঙালিদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
বাঙালির হেঁশেলে মুগ, মসুর, বিউলি কিংবা ছোলার ডালের কদর চিরকালের।
তবে ডাল খাওয়ার ক্ষেত্রেও দুই বাংলার মানুষের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক তফাত ছিল। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) মাছের এতই প্রাচুর্য ছিল যে ডাল চাষ হতো খুব সীমিত আকারে।
তাই এই বঙ্গে ডালকে বেশ আভিজাত্যের বা বড়লোকদের খাবার মনে করা হতো।
সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথায় এক বালকের গল্প আছে, যে মাছ দিয়ে ভাত খেলেও ডাল চেনে না, কারণ তার মতে ডাল কেবল বড়লোকরাই খায়!

আবার ঢাকা অঞ্চলে খাওয়া-দাওয়ার একদম শেষ পাতে কলাইয়ের ডাল বাটি ধরে চুমুক দিয়ে খাওয়ার এক অদ্ভুত সুন্দর রেওয়াজও ছিল।
​ডালের সাথে পাতে যখন চচ্চড়ি কিংবা ঘণ্টা আসে, তখন তৃপ্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। পাঁচফোড়ন আর সামান্য সরষে বাটা দিয়ে তৈরি মাখামাখা চচ্চড়ির স্বাদই আলাদা। বিশেষ করে লম্বা লম্বা করে কাটা আলু, কুমড়ো আর কাঁচা মরিচ মেখে অল্প আঁচে বাটিতে বসিয়ে করা ‘বাটি-চচ্চড়ি’র স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো।

অন্যদিকে ঘণ্ট হলো সবজির একটু থকথকে রূপ। এই ঘণ্টর জগতে ‘লাউ-চিংড়ি’ এক কিংবদন্তি সৃষ্টি।
ভারতীয় উপমহাদেশে লাউ চাষের ইতিহাস প্রায় কয়েক হাজার বছরের পুরনো। বাংলার আবহাওয়ায় লাউ খুব সহজলভ্য হওয়ায়, এটি বহু শতাব্দী ধরে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় স্থান পেয়ে আসছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে (বিশেষ করে পলিমাটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে) প্রচুর পরিমাণে ছোট চিংড়ি (কুচো চিংড়ি বা বাগদা/গলদা) পাওয়া যায়। সহজলভ্য এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণ থেকেই কালক্রমে ‘লাউ চিংড়ি’ রান্নার উৎপত্তি,যা আজ বাড়ির হেঁশেল ছাড়িয়ে বড় বড় রেস্তোরাঁতেও রাজত্ব করছে।

আবার উত্তরবঙ্গের বারেন্দ্র ঘরানার ‘চাপড়া ঘণ্ট’ তো আরও অনন্য। কুচি কুচি করে কাটা শশা আর ঝিঙের ওপর মটর ডাল বা খেসারির ডাল তাওয়ায় চ্যাপ্টা করে সেঁকে গুঁড়ো করে ছড়িয়ে এই পদটি তৈরি করা হয়।
ডালনা আর দোলমার ক্ষেত্রেও বাঙালির শিল্পবোধ প্রশংসনীয়। ছানার ডালনা বা ধোঁকার ডালনার পাশাপাশি পটোলের পেট চিরে মাছের কিমা কিংবা ছানার পুর ভরে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা দোলমা যেকোনো উৎসবের পাত আলো করে রাখতো।

​বাঙালির রন্ধনপ্রতিভার প্রশংসা করতে গিয়ে সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী একবার বলেছিলেন, বিশ্ব দরবারে বাংলা হেঁশেলের শ্রেষ্ঠ অবদান মূলত তিনটি— মাছ, ছানা এবং বাঙালি বিধবাদের হাতের নিরামিষ রান্না।
নিরামিষের এই বিপুল বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আমাদের আমিষের জগৎও সমানে সমৃদ্ধ। নদী, নালা, খাল আর বিলের এই দেশে চুনো মাছ থেকে শুরু করে রুই-কাতলা, পাবদা, ট্যাংরা কিংবা পারশের ঝোল-ঝাল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। সরষে বাটা দিয়ে মাছের ঝাল কিংবা কলাপাতায় মোড়ানো পাতুরি যেন ঠিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথার সাথে সুরের এক আত্মিক মেলবন্ধন।

​আর এই মাছের বাজারে যদি রাজা ইলিশের প্রবেশ ঘটে, তবে তো বাঙালির আর কিছু চাই-ই না। বেগুন আর কালোজিরে দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল কিংবা সরষে-কাঁচা মরিচের ভাপা ইলিশের ঘ্রাণে পুরো বাড়ি ম-ম করে ওঠে।
একইভাবে নারকেলের দুধ আর গরম মশলার যুগলবন্দিতে তৈরি চিংড়ির মালাইকারি আর বাঙালের চিরন্তন ফুটবলীয় যুদ্ধকেও ডাইনিং টেবিলে এক নিমেষে থামিয়ে দিতে পারে।
খাওয়া-দাওয়ার একদম শেষ পাতে যখন কাঁচা আম, তেঁতুল কিংবা চালতার টক-মিষ্টি অম্বল বা চাটনি পড়ে, তখন মনে হয় এই সুদীর্ঘ ভোজনবিলাস যেন এক পরম পূর্ণতা পেল।

​তবে বাঙালির এই সাধের হেঁশেল কিন্তু চিরকাল এই এক নিয়মে চলেনি।
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসন আমাদের পাত ও স্বাদে এক মস্ত বড় পরিবর্তন এনেছিল। ১৮৭৪ সালে সমাজসংস্কারক রাজনারায়ণ বসু তাঁর বিখ্যাত ‘সেকাল আর একাল’ প্রবন্ধে সমসাময়িক যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত বাবুদের এই অন্ধ পশ্চিমা প্রীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সেই প্রবন্ধেই কলকাতার বিখ্যাত ‘উইলসন হোটেল’-এর এক মজার গল্প সংকলিত হয়েছিল।
দুই বাঙালি বাবু হোটেলে গিয়ে পশ্চিমা কায়দায় গরুর মাংসের নানাবিধ পদের খোঁজ করছিলেন। কিন্তু ওয়েটার যখন একে একে বাছুরের মাংস (ভিল), বিফ স্টেক বা গরুর জিভ (অক্স টাং) -সব কিছুতেই ‘নেই’ বলে উত্তর দিচ্ছিল, তখন এক বাবুর অস্থিরতা দেখে তাঁর বন্ধু কৌতুকের ছলে ওয়েটারকে বলে ওঠেন, গরুর যখন কিছুই নেই, তখন বেচারাকে অন্তত কিছুটা গোবরই এনে দিন না!

​রাজনারায়ণ বাবু হয়তো স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে এই বাবুদের ব্যঙ্গ করেছিলেন, কিন্তু ইতিহাস এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করে। উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে এই সাহেবি খানা রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখ এড়িয়ে আড়ালে বসে খাওয়ার জন্য কলকাতার বুকে জন্ম নেয় এক নতুন ‘কেবিন সংস্কৃতি’। রাজশেখর বসুর (পরশুরাম) ‘রাতারাতি’ গল্পে যেমনটা দেখা যায়, ঘরের জাত বাঁচানোর ভয়ে তরুণরা গোপনে ‘অ্যাংলো-মোগলাই কাফে’ বা কেবিনে গিয়ে ডবল ডিমের মুঘলাই পরোটা কিংবা কাটলেট-চপে কামড় বসাচ্ছিল। প্রবীণদের রক্ষণশীলতা আর নবীনদের আধুনিকতার এই টানাপোড়েনই ছিল সে যুগের সমাজ পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।

​ইউরোপীয়দের দীর্ঘদিনের সংস্পর্শে এসে কেবল বাঙালির সামাজিক মনস্তত্ত্বই বদলায়নি, বরং বিদেশি পদগুলো আমাদের ছোঁয়া পেয়ে আমাদের নিজস্ব খাবার হয়ে উঠেছে। ফরাসি ‘ফ্রেঞ্চ অমলেট’ আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কুচি সহযোগে হয়ে গেল ‘মামলেট’। ইউরোপের চপ বা কাটলেট তাদের আদি রূপ ছেড়ে মাছ-মাংসের কিমার সাথে ব্রেডক্রাম্ব বা বিস্কুটের গুঁড়ো মেখে ডুবো তেলে ভাজা মচমচে বাঙালি বিকেলের নাস্তায় রূপান্তরিত হলো।
ব্রিটিশদের ঝাঁঝালো ‘ডেভিলড এগ’, যা অতিরিক্ত কড়া মশলার কারণে এমন নাম পেয়েছিল, তা বাঙালি বাবুর্চিদের হাতে আলুর পুরের চাদরে ঢাকা পড়ে নাম নিল ‘ডিমের ডেভিল’/’ডিম চপ’।
ময়দার খাস্তা আবরণের পেটিস কিংবা সকালের চিরচেনা পাউরুটিও এই পশ্চিমা বেকিং রন্ধনশৈলীরই এক স্থায়ী অবদান।

​এরই সমান্তরালে ঔপনিবেশিক অবকাঠামো এবং ভৌগোলিক পরিবর্তনের হাত ধরে কিছু ঐতিহাসিক পদের জন্ম হয়েছিল, যা আজ ভাবলে অবাক লাগে। যেমন গোয়া হয়ে বাংলায় আসা পর্তুগিজদের বিখ্যাত পদ ‘ভিন্দালু’। অনেকেই ভাবেন এর সাথে আমাদের চেনা সবজি আলুর সম্পর্ক আছে, কিন্তু আসলে তা নয়। পর্তুগিজ শব্দ ‘আলিও’ মানে রসুন আর ‘ভিন’ হলো ওয়াইন বা ভিনেগার। এই রসুন আর ভিনেগারে ম্যারিনেট করা মাংসের পদটি বাংলায় এসে সরিষার তেলের ছোঁয়ায় সম্পূর্ণ দেশি রূপ ধারণ করে।
আবার ব্রিটিশ আমলের নদীপথ ও রেলপথের কল্যাণে জন্ম নিল আরও কিছু পদ।
পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলে গোয়ালন্দ ঘাটের রাতের স্টিমারের খালাসিদের হাতের সেই জাদুকরী সরিষার তেল ও শিল-নোড়ায় বাটা মশলার তীব্র লালচে পাতলা ‘স্টিমার কারি’ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি ডাকবাংলোর খানসামাদের হাতের কাছে থাকা নিজস্ব পোষা দেশি মুরগি, ডিম ও আলু দিয়ে ঝটপট তৈরি করা ‘চিকেন ডাকবাংলো’ আমাদের রন্ধন ইতিহাসের এক একটি মাইলফলক হয়ে রইল।

একইভাবে দূরপাল্লার ট্রেনের সাহেবদের জন্য ঝাল কমিয়ে তৈরি হওয়া ‘রেলওয়ে মটন কারি’ও আজও সমান জনপ্রিয়।
​বাঙালির মাংস খাওয়ার ইতিহাসও একসময় কেবল পাঁঠা বা খাসির মাংসের পাতলা ঝোলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুরগি একদা রক্ষণশীল সমাজে নিষিদ্ধ থাকলেও, ডিরোজিওর ‘ইয়ং বেঙ্গল’ পন্থীরা প্রতিষ্ঠিত কুপ্রথায় জর্জরিত সমাজ ভাঙার গান গেয়ে যে ‘বিশুদ্ধ পক্ষী’ ভক্ষণের সূচনা করেছিলেন, আজ তা বাঙালির ঘরে ঘরে এক অতি সাধারণ রান্নায় পরিণত হয়েছে।

​দিনের শেষে ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে, বাঙালি কখনোই কোনো বিদেশি সংস্কৃতি বা খাদ্যাভ্যাসকে অন্ধভাবে নকল করেনি। বরং নিজের হেঁশেলের নিজস্বতা, সরিষার তেলের ঝাঁঝ, কাঁচা মরিচ,রসুন ফোঁড়ন আর রন্ধনশালার চিরন্তন জাদুতে প্রতিটি বিদেশি পদকে এমনভাবে নিজের করে নিয়েছে, যেন বাইরের সেই পশ্চিম এসে শেষ পর্যন্ত বাঙালির ঘরের পাত বা হেঁশেলের কাছেই পরম মমতায় আত্মসমর্পণ করেছে।

গ্রন্থ সহায়িকা
​প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, আমিষ ও নিরামিষ আহার (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৯)

​রাজনারায়ণ বসু, সেকাল আর একাল (কলকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৮৭৪)

​সুকুমার সেন, কলিকাতার কাহিনী (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩)

​সৈয়দ মুজতবা আলি রচনাবলী (খণ্ড ১ ও ২) (কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ১৪১৭)

 

দেশে ছয় মাসে নারী নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনা শুধু অপরাধের নৃশংসতাই নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজধানীর মিরপুরে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা,
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক গৃহবধূ নিজ বাড়িতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। অভিযোগ ওঠে, ঘটনার পর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হুমকির কারণে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে এবং নিজ বাড়িতে ফিরতে না পেরে হাসপাতালেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
কুমিল্লার মুরাদনগরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের একটি ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করে, মামলা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় তদন্তের শুরুতেই নানা জটিলতা তৈরি হয়।
আবার ঢাকার নবাবগঞ্জে চুরির অভিযোগ তুলে দুই তরুণীকে আটকে রেখে মারধর এবং প্রকাশ্যে তাদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকারকর্মীরা একে নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।

এসব ঘটনার পাশাপাশি বিগত ছয়মাসে পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা, যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতন এবং শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বহু ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে
ঘটেছে।
বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, বিচারহীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং নারীবিদ্বেষী মানসিকতা এখনও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট। আইন, নীতিমালা এবং বিচারব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে অব্যাহত রয়েছে।
ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের কারণে হত্যা, যৌন হয়রানি এবং নারীর প্রতি নানামুখী নির্যাতন সমাজের নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন এবং ১১ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যার বিচারে ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ধর্ষণের পর হত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা ছিল ২২টি, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪.৯৮ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩০টি, অর্থাৎ প্রায় ৯.৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট এবং বিচার এড়াতে আরও সহিংস পন্থা বেছে নিচ্ছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৩ জন কিশোরী এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৬৮ জন শিশু রয়েছে। অর্থাৎ শিশু ও কিশোরীরাই যৌন সহিংসতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত পরিবারও অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ‘আসক’ এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৯১ জন নারী স্বামীর হাতে এবং ২১ জন নারী স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন, মানসিক চাপ ও সামাজিক নিপীড়নের কারণে ৬৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুকের দাবি, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়ার অভিযোগ কিংবা পারিবারিক বিরোধ সহ বিভিন্ন কারণকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নারীর পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে ৬ জন পুরুষ নিহত এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন।
বাস্তবিকই নারী নির্যাতন এখন শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং সামাজিক প্রতিরোধকেও সহিংসভাবে দমন করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নারী নির্যাতন অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকলেও মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অতীতে পরিচালিত ব্র্যাক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় চূড়ান্ত সাজা পাওয়ার হার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পান। ফলে অনেক অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায় এবং তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, মামলা গ্রহণে বিলম্ব, যথাসময়ে মেডিকেল পরীক্ষা না করা কিংবা তদন্তে গাফিলতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

নারী নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাও এখনও সীমিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই কম। ফলে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক চাপ এবং সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবারও নির্যাতনকারীর কাছেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
স্বল্পমেয়াদি সহায়তা বা আইনি পরামর্শ দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়।

নারী নির্যাতন কমাতে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; বরং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, কার্যকর তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে বিবেচনা করেই দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

তথ্যসূত্র:
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)
Human Rights Watch