আমাদের খুব চেনা, ভীষণ আপন ‘হেঁশেল’ শব্দটার জন্ম কিন্তু হুট করে হয়নি। একটু পেছনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এটি আসলে এসেছে ‘হাঁড়িশাল’ শব্দ থেকে।
সহজ কথায় যে ঘরে হাঁড়ি রাখা হয়, সেটাই হাঁড়িশাল।
পুরোনো গ্রামীণ বাংলায় সমাজ ও জীবনযাত্রার সাথে মিলিয়ে এমন প্রচুর ‘শাল’ বা ‘শালা’ শব্দের ব্যবহার ছিল।
যেমন গরুর থাকার জায়গা গোয়াল বা গোশাল, কামারদের কাজ করার কারখানা কামারশাল, ঘোড়া রাখার ঘোড়াশাল কিংবা পড়াশোনার জন্য পাঠশালা।
সংস্কৃত সাহিত্যে রান্নাঘরের একটা বেশ মিষ্টি আর রসালো নাম পাওয়া যায় ‘রসবতী’। শুনতে ভারী চমৎকার হলেও এই নামটা বোধহয় অভিধানের পাতাতেই বন্দি হয়ে রয়ে গেছে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মুখের ভাষায় হাঁড়িশালই কালক্রমে আদুরে ‘হেঁশেল’ হয়ে উঠেছে।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অসামান্য রন্ধনশিল্পী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তাঁর কালজয়ী রান্নার বই ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’-এ সেকালের হেঁশেলের এক বিশাল সরঞ্জামের বিবরণ দিয়েছেন।
সেই তালিকাটি পড়লে আমাদের চোখ কপালে উঠবে! ধামা, চুপড়ি, কুড়ুল, দা, উনানের হাওয়া দেওয়ার পাখা থেকে শুরু করে ছাই খোঁচানোর লোহার শিক কী ছিল না সেখানে!
আজকের মডার্ন কিচেনের গ্যাস বার্নার, মিক্সার গ্রাইন্ডার, মাইক্রোওয়েভ আর ওটিজির চাকচিক্যে সেই কাঠের উনানের দিন আজ সত্যিই ফুরিয়েছে।
শিল-নোড়ার জায়গা দখল করেছে মিক্সি, আর যে ভাতের হাঁড়ির নামে রান্নাঘরের নাম হয়েছিল হাঁড়িশাল, সেই ঐতিহ্যবাহী তোলো বা তিজেল হাঁড়িকে একরকম ঘরছাড়া করে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে প্রেসার কুকার। তবে রান্নার সরঞ্জাম আর প্রযুক্তি যতই বদলাক না কেন, যুগ যুগ ধরে বাঙালির হেঁশেলের আসল উদ্দেশ্য কিন্তু একই রয়ে গেছে -আর তা হলো মন জুড়ানো রসনাবিলাস।
আমাদের প্রাচীন বাংলায় মাটিতে বসে কলাপাতায় কিংবা শালপাতায় পাত পেড়ে খাওয়ার মধ্যে একটা আলাদা স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল।
মধ্যযুগীয় ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ কাব্যের কবি বাঙালির এই ভোজনসুখের এক চমৎকার বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন যে, কলার পাতায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, ঘন দুধ, মৌরলা মাছের তরকারি আর নালতে শাক যখন পরম স্নেহে স্ত্রী পরিবেশন করেন, তখন সেই অন্ন খাওয়ার সৌভাগ্য কেবল কোনো পুণ্যবানের ভাগ্যেই জোটে। সময়ের সাথে সাথে কলাপাতার বদলে কাঁসা বা স্টিলের থালা-বাটি ববা হাল যুগের সিরামিকের প্লেটের চল হলেও, খাবার পরিবেশনের সেই আন্তরিকতা আর পদের বৈচিত্র্য বাঙালি আজও ধরে রেখেছে।
প্রথম পাতে গরম ভাতের সাথে ‘ভাতে’ বা সেদ্ধ খাওয়ার এক চিরকালীন নিয়ম ছিলো আমাদের। সবজিকে আলাদা করে জল দিয়ে সেদ্ধ না করে ভাতের ভেতরেই সেদ্ধ করে নেওয়ার এই পদ্ধতিটি সত্যিই দারুণ। এতে ভাতের নিজস্ব সুঘ্রাণের সাথে সবজির স্বাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আলু, কুমড়ো, করলা, ওল কিংবা স্রেফ একটা পাতলা কাপড়ে বেঁধে মসুর ডাল যখন সরিষার তেল, নুন আর কাঁচা মরিচে চটকে মাখা হয়, তখন তার স্বাদের কাছে সাহেবদের নুন ছিটানো সেদ্ধ সবজি (sauté vegetables) নিমেষেই হার মানে।
প্রথম পাতের এই ঘরোয়া আয়োজনের সাথে বেগুন পোড়াও দারুণ জমে। যেমনটা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে গোপাল ভাঁড় বলেছিলেন -পোড়ার মুখে সবই ভালো!
আর এই প্রথম পাতের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি হলো শুক্তো।
শুক্তো হলো ভাতের সাথে পরিবেশিত একটি ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর বাঙালি নিরামিষ পদ। এটি হালকা তিতকুটে স্বাদের জন্য পরিচিত। সজনে ডাঁটা, করলা, আলু, কাঁচকলা, বেগুন এবং বড়ির সমন্বয়ে তৈরি এই সুস্বাদু পদটি সাধারণত রান্নার শেষে সামান্য দুধ ও ঘি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।
বাঙালির দুপুরের ভোজে ভাতের সাথে যার ডাক পড়ে, সে হলো ডাল। মধ্যযুগীয় সাহিত্যে ডালকে বলা হতো ‘সূপ’। আর এই সূপ যিনি রাঁধতেন, তাঁকে বলা হতো ‘সূপকার’।
বাঙালিয়ানা খাবারের ইতিহাসে ডাল মূলত প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির অংশ। ইতিহাসবিদদের মতে, ডালের চাষ এবং খাওয়ার রীতি আর্য ভারতের দান হলেও, ১৫ শতক থেকে এটি বাঙালিদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
বাঙালির হেঁশেলে মুগ, মসুর, বিউলি কিংবা ছোলার ডালের কদর চিরকালের।
তবে ডাল খাওয়ার ক্ষেত্রেও দুই বাংলার মানুষের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক তফাত ছিল। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) মাছের এতই প্রাচুর্য ছিল যে ডাল চাষ হতো খুব সীমিত আকারে।
তাই এই বঙ্গে ডালকে বেশ আভিজাত্যের বা বড়লোকদের খাবার মনে করা হতো।
সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথায় এক বালকের গল্প আছে, যে মাছ দিয়ে ভাত খেলেও ডাল চেনে না, কারণ তার মতে ডাল কেবল বড়লোকরাই খায়!
আবার ঢাকা অঞ্চলে খাওয়া-দাওয়ার একদম শেষ পাতে কলাইয়ের ডাল বাটি ধরে চুমুক দিয়ে খাওয়ার এক অদ্ভুত সুন্দর রেওয়াজও ছিল।
ডালের সাথে পাতে যখন চচ্চড়ি কিংবা ঘণ্টা আসে, তখন তৃপ্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। পাঁচফোড়ন আর সামান্য সরষে বাটা দিয়ে তৈরি মাখামাখা চচ্চড়ির স্বাদই আলাদা। বিশেষ করে লম্বা লম্বা করে কাটা আলু, কুমড়ো আর কাঁচা মরিচ মেখে অল্প আঁচে বাটিতে বসিয়ে করা ‘বাটি-চচ্চড়ি’র স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো।
অন্যদিকে ঘণ্ট হলো সবজির একটু থকথকে রূপ। এই ঘণ্টর জগতে ‘লাউ-চিংড়ি’ এক কিংবদন্তি সৃষ্টি।
ভারতীয় উপমহাদেশে লাউ চাষের ইতিহাস প্রায় কয়েক হাজার বছরের পুরনো। বাংলার আবহাওয়ায় লাউ খুব সহজলভ্য হওয়ায়, এটি বহু শতাব্দী ধরে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় স্থান পেয়ে আসছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে (বিশেষ করে পলিমাটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে) প্রচুর পরিমাণে ছোট চিংড়ি (কুচো চিংড়ি বা বাগদা/গলদা) পাওয়া যায়। সহজলভ্য এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণ থেকেই কালক্রমে ‘লাউ চিংড়ি’ রান্নার উৎপত্তি,যা আজ বাড়ির হেঁশেল ছাড়িয়ে বড় বড় রেস্তোরাঁতেও রাজত্ব করছে।
আবার উত্তরবঙ্গের বারেন্দ্র ঘরানার ‘চাপড়া ঘণ্ট’ তো আরও অনন্য। কুচি কুচি করে কাটা শশা আর ঝিঙের ওপর মটর ডাল বা খেসারির ডাল তাওয়ায় চ্যাপ্টা করে সেঁকে গুঁড়ো করে ছড়িয়ে এই পদটি তৈরি করা হয়।
ডালনা আর দোলমার ক্ষেত্রেও বাঙালির শিল্পবোধ প্রশংসনীয়। ছানার ডালনা বা ধোঁকার ডালনার পাশাপাশি পটোলের পেট চিরে মাছের কিমা কিংবা ছানার পুর ভরে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা দোলমা যেকোনো উৎসবের পাত আলো করে রাখতো।
বাঙালির রন্ধনপ্রতিভার প্রশংসা করতে গিয়ে সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী একবার বলেছিলেন, বিশ্ব দরবারে বাংলা হেঁশেলের শ্রেষ্ঠ অবদান মূলত তিনটি— মাছ, ছানা এবং বাঙালি বিধবাদের হাতের নিরামিষ রান্না।
নিরামিষের এই বিপুল বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আমাদের আমিষের জগৎও সমানে সমৃদ্ধ। নদী, নালা, খাল আর বিলের এই দেশে চুনো মাছ থেকে শুরু করে রুই-কাতলা, পাবদা, ট্যাংরা কিংবা পারশের ঝোল-ঝাল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। সরষে বাটা দিয়ে মাছের ঝাল কিংবা কলাপাতায় মোড়ানো পাতুরি যেন ঠিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথার সাথে সুরের এক আত্মিক মেলবন্ধন।
আর এই মাছের বাজারে যদি রাজা ইলিশের প্রবেশ ঘটে, তবে তো বাঙালির আর কিছু চাই-ই না। বেগুন আর কালোজিরে দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল কিংবা সরষে-কাঁচা মরিচের ভাপা ইলিশের ঘ্রাণে পুরো বাড়ি ম-ম করে ওঠে।
একইভাবে নারকেলের দুধ আর গরম মশলার যুগলবন্দিতে তৈরি চিংড়ির মালাইকারি আর বাঙালের চিরন্তন ফুটবলীয় যুদ্ধকেও ডাইনিং টেবিলে এক নিমেষে থামিয়ে দিতে পারে।
খাওয়া-দাওয়ার একদম শেষ পাতে যখন কাঁচা আম, তেঁতুল কিংবা চালতার টক-মিষ্টি অম্বল বা চাটনি পড়ে, তখন মনে হয় এই সুদীর্ঘ ভোজনবিলাস যেন এক পরম পূর্ণতা পেল।
তবে বাঙালির এই সাধের হেঁশেল কিন্তু চিরকাল এই এক নিয়মে চলেনি।
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসন আমাদের পাত ও স্বাদে এক মস্ত বড় পরিবর্তন এনেছিল। ১৮৭৪ সালে সমাজসংস্কারক রাজনারায়ণ বসু তাঁর বিখ্যাত ‘সেকাল আর একাল’ প্রবন্ধে সমসাময়িক যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত বাবুদের এই অন্ধ পশ্চিমা প্রীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সেই প্রবন্ধেই কলকাতার বিখ্যাত ‘উইলসন হোটেল’-এর এক মজার গল্প সংকলিত হয়েছিল।
দুই বাঙালি বাবু হোটেলে গিয়ে পশ্চিমা কায়দায় গরুর মাংসের নানাবিধ পদের খোঁজ করছিলেন। কিন্তু ওয়েটার যখন একে একে বাছুরের মাংস (ভিল), বিফ স্টেক বা গরুর জিভ (অক্স টাং) -সব কিছুতেই ‘নেই’ বলে উত্তর দিচ্ছিল, তখন এক বাবুর অস্থিরতা দেখে তাঁর বন্ধু কৌতুকের ছলে ওয়েটারকে বলে ওঠেন, গরুর যখন কিছুই নেই, তখন বেচারাকে অন্তত কিছুটা গোবরই এনে দিন না!
রাজনারায়ণ বাবু হয়তো স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে এই বাবুদের ব্যঙ্গ করেছিলেন, কিন্তু ইতিহাস এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করে। উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে এই সাহেবি খানা রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখ এড়িয়ে আড়ালে বসে খাওয়ার জন্য কলকাতার বুকে জন্ম নেয় এক নতুন ‘কেবিন সংস্কৃতি’। রাজশেখর বসুর (পরশুরাম) ‘রাতারাতি’ গল্পে যেমনটা দেখা যায়, ঘরের জাত বাঁচানোর ভয়ে তরুণরা গোপনে ‘অ্যাংলো-মোগলাই কাফে’ বা কেবিনে গিয়ে ডবল ডিমের মুঘলাই পরোটা কিংবা কাটলেট-চপে কামড় বসাচ্ছিল। প্রবীণদের রক্ষণশীলতা আর নবীনদের আধুনিকতার এই টানাপোড়েনই ছিল সে যুগের সমাজ পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।
ইউরোপীয়দের দীর্ঘদিনের সংস্পর্শে এসে কেবল বাঙালির সামাজিক মনস্তত্ত্বই বদলায়নি, বরং বিদেশি পদগুলো আমাদের ছোঁয়া পেয়ে আমাদের নিজস্ব খাবার হয়ে উঠেছে। ফরাসি ‘ফ্রেঞ্চ অমলেট’ আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কুচি সহযোগে হয়ে গেল ‘মামলেট’। ইউরোপের চপ বা কাটলেট তাদের আদি রূপ ছেড়ে মাছ-মাংসের কিমার সাথে ব্রেডক্রাম্ব বা বিস্কুটের গুঁড়ো মেখে ডুবো তেলে ভাজা মচমচে বাঙালি বিকেলের নাস্তায় রূপান্তরিত হলো।
ব্রিটিশদের ঝাঁঝালো ‘ডেভিলড এগ’, যা অতিরিক্ত কড়া মশলার কারণে এমন নাম পেয়েছিল, তা বাঙালি বাবুর্চিদের হাতে আলুর পুরের চাদরে ঢাকা পড়ে নাম নিল ‘ডিমের ডেভিল’/’ডিম চপ’।
ময়দার খাস্তা আবরণের পেটিস কিংবা সকালের চিরচেনা পাউরুটিও এই পশ্চিমা বেকিং রন্ধনশৈলীরই এক স্থায়ী অবদান।
এরই সমান্তরালে ঔপনিবেশিক অবকাঠামো এবং ভৌগোলিক পরিবর্তনের হাত ধরে কিছু ঐতিহাসিক পদের জন্ম হয়েছিল, যা আজ ভাবলে অবাক লাগে। যেমন গোয়া হয়ে বাংলায় আসা পর্তুগিজদের বিখ্যাত পদ ‘ভিন্দালু’। অনেকেই ভাবেন এর সাথে আমাদের চেনা সবজি আলুর সম্পর্ক আছে, কিন্তু আসলে তা নয়। পর্তুগিজ শব্দ ‘আলিও’ মানে রসুন আর ‘ভিন’ হলো ওয়াইন বা ভিনেগার। এই রসুন আর ভিনেগারে ম্যারিনেট করা মাংসের পদটি বাংলায় এসে সরিষার তেলের ছোঁয়ায় সম্পূর্ণ দেশি রূপ ধারণ করে।
আবার ব্রিটিশ আমলের নদীপথ ও রেলপথের কল্যাণে জন্ম নিল আরও কিছু পদ।
পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলে গোয়ালন্দ ঘাটের রাতের স্টিমারের খালাসিদের হাতের সেই জাদুকরী সরিষার তেল ও শিল-নোড়ায় বাটা মশলার তীব্র লালচে পাতলা ‘স্টিমার কারি’ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি ডাকবাংলোর খানসামাদের হাতের কাছে থাকা নিজস্ব পোষা দেশি মুরগি, ডিম ও আলু দিয়ে ঝটপট তৈরি করা ‘চিকেন ডাকবাংলো’ আমাদের রন্ধন ইতিহাসের এক একটি মাইলফলক হয়ে রইল।
একইভাবে দূরপাল্লার ট্রেনের সাহেবদের জন্য ঝাল কমিয়ে তৈরি হওয়া ‘রেলওয়ে মটন কারি’ও আজও সমান জনপ্রিয়।
বাঙালির মাংস খাওয়ার ইতিহাসও একসময় কেবল পাঁঠা বা খাসির মাংসের পাতলা ঝোলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুরগি একদা রক্ষণশীল সমাজে নিষিদ্ধ থাকলেও, ডিরোজিওর ‘ইয়ং বেঙ্গল’ পন্থীরা প্রতিষ্ঠিত কুপ্রথায় জর্জরিত সমাজ ভাঙার গান গেয়ে যে ‘বিশুদ্ধ পক্ষী’ ভক্ষণের সূচনা করেছিলেন, আজ তা বাঙালির ঘরে ঘরে এক অতি সাধারণ রান্নায় পরিণত হয়েছে।
দিনের শেষে ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে, বাঙালি কখনোই কোনো বিদেশি সংস্কৃতি বা খাদ্যাভ্যাসকে অন্ধভাবে নকল করেনি। বরং নিজের হেঁশেলের নিজস্বতা, সরিষার তেলের ঝাঁঝ, কাঁচা মরিচ,রসুন ফোঁড়ন আর রন্ধনশালার চিরন্তন জাদুতে প্রতিটি বিদেশি পদকে এমনভাবে নিজের করে নিয়েছে, যেন বাইরের সেই পশ্চিম এসে শেষ পর্যন্ত বাঙালির ঘরের পাত বা হেঁশেলের কাছেই পরম মমতায় আত্মসমর্পণ করেছে।
গ্রন্থ সহায়িকা
প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, আমিষ ও নিরামিষ আহার (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৯)
রাজনারায়ণ বসু, সেকাল আর একাল (কলকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৮৭৪)
সুকুমার সেন, কলিকাতার কাহিনী (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩)
সৈয়দ মুজতবা আলি রচনাবলী (খণ্ড ১ ও ২) (কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ১৪১৭)