সন্তান জন্ম নেওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রথম দায়িত্ব তাকে নিরাপদ রাখা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা যে পরিবার, কখনও কখনও সেই পরিবারই হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা।
সমাজের চোখে ‘সম্মান’ রক্ষার নামে যখন একজন বাবা নিজের সন্তানের দিকে অস্ত্র তোলেন, তখন শুধু একটি জীবনই শেষ হয় না; ভেঙে পড়ে মানবিকতার সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তিও।
সম্প্রতি দেশের দুটি ঘটনা সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সিলেটের বিয়ানীবাজারে ১৭ বছর বয়সী রায়কা আক্তার রিয়া হত্যাকাণ্ড এবং খুলনায় ১৬ বছর বয়সী আরফানা হোসেন নির্জনার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দুটি মামলার তদন্ত এখনও চলমান। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক চাপের কারনেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরই মাধ্যমে আবারও সামনে এনেছে বহুদিনের আলোচিত একটি শব্দ ‘অনার কিলিং’।
অনার কিলিং বা সম্মানের নামে হত্যা বলতে পরিবারের বা গোষ্ঠীর কথিত সম্মান রক্ষার অজুহাতে পরিবারের কোনো সদস্যকে- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী বা কিশোরীকে হত্যা করাকে বোঝায়।
পরিবারের অমতে প্রেম বা বিয়ে, আন্তঃধর্ম বা আন্তঃজাত বিয়ে, বিবাহপূর্ব বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত, কিংবা সম্পর্ক নিয়ে শুধুমাত্র সন্দেহের কারণেও অনেক সমাজে মানুষ এই অপরাধের শিকার হন। এমনকি ধর্ষণ বা অপহরণের মতো অপরাধের শিকার হওয়া নারীকেও অনেক পরিবার ‘অসম্মানের কারণ’ হিসেবে দেখে হত্যার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত নেয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch-এর মতে, অনার কিলিং হলো পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা পরিবারের সম্মান রক্ষার অজুহাতে নারী সদস্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যা বা সহিংসতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর মূল কারণ কোনো ধর্মীয় বিধান নয়; বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং বিকৃত সম্মানবোধ।
ইতিহাস বলছে, অনার কিলিংয়ের শিকড় বহু প্রাচীন। প্রাচীন রোমে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন-মৃত্যুর ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং ব্যভিচারের অভিযোগে নারীকে হত্যার অনুমোদনও প্রচলিত ছিল।
চীনের কিং রাজবংশ, অ্যাজটেক ও ইনকা সভ্যতা, এমনকি ইউরোপের কিছু অঞ্চলেও ব্যভিচার বা পারিবারিক অসম্মানের অভিযোগে নারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির পাওয়া যায়। ইতিহাসের এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, অনার কিলিং কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা অঞ্চলের নয়; বরং নারীর স্বাধীনতা দমন এবং পরিবারের কথিত সম্মান রক্ষার নামে গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহিংসতার রূপ।
বর্তমানে অনার কিলিং কোনো একক দেশের সমস্যা নয়।
দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
সেগুলোর মধ্যে জর্ডান, ইরান, ইয়েমেন, ইরাক এবং মিশর উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া সিরিয়া, লেবানন, কুয়েত, এবং সৌদি আরবেও এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা দেখা যায়।
ইরানে পরিবারের ‘সম্মান’ রক্ষার নামে বাবা বা ভাইয়ের হাতে নারী হত্যার ঘটনা ঘটে এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকরের কারণে অপরাধীরা তুলনামূলক কম শাস্তি পান। জর্ডান ও তুরস্কের কিছু অঞ্চলেও এই প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। আফগানিস্তানে নারীর স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অনার-সম্পর্কিত সহিংসতার ঝুঁকি আরও বেশি। এমনকি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও অভিবাসী কিছু পরিবারের মধ্যে অনার কিলিংয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা UN Women এবং UNODC-এর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৩ হাজার নারী ও কিশোরী ইচ্ছাকৃত হত্যার শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ নিজের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৩৭ জন নারী ও কিশোরী নিজের ঘরেই প্রাণ হারিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, নারীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান অনেক সময় নিজের ঘরই।
উপমহাদেশে অনার কিলিংয়ের সবচেয়ে বেশি আলোচিত উদাহরণ পাকিস্তান।
পাকিস্তানে ‘অনার কিলিং’-এর কথা প্রায়ই শোনা যায়৷ এই বর্বরতা সেখানে যেন সামাজিকভাবেই স্বীকৃত৷ পরিবারের ‘সম্মান রক্ষায়’ আত্মীয়-স্বজন, এমনকি বাবা-ভাইয়ের হাতে পরিবারের কোনো সদস্যকে হত্যা প্রায় নিয়মিত ঘটনা৷
দেশটির Human Rights Commission of Pakistan (HRCP)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অন্তত ৪০৫ জন নারী তথাকথিত সম্মান রক্ষার নামে নিহত হয়েছেন।
২০১৬ সালে কঠোর আইন প্রণয়ন করা সত্ত্বেও, বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গ্রামাঞ্চলে বিকল্প বিচার ব্যবস্থার কারণে অনার কিলিং সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের সিংহভাগই ছিলেন নারী, যাদেরকে পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে আত্মীয়-স্বজনরাই হত্যা করেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ঘটনাই পারিবারিকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়।
ভারতে হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তঃজাত বা আন্তঃধর্ম বিয়ে নিয়ে সংঘটিত অনার কিলিং বহুবার জাতীয় আলোচনায় এসেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ নিজেদের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন এবং সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করা সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন।
বাংলাদেশে অনার কিলিংয়ের আলাদা কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কারণ আইনেও ‘অনার কিলিং’ নামে স্বতন্ত্র কোনো অপরাধের শ্রেণিবিন্যাস নেই। ফলে প্রেম, বিয়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সাধারণ হত্যামামলা হিসেবেই তদন্ত হয়। এ কারণে প্রকৃত চিত্র জানা কঠিন। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রেম বা সম্পর্কের জেরে সন্তান হত্যার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই অনার কিলিংয়ের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান মনে করেন,”অল্প হোক,তারপরও অনার কিলিং আছে।আমরা হয়তো সেটাকে সেভাবে দেখি না৷পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরাই এর প্রধান শিকার৷ আর ধর্ম, সামাজিক অবস্থান এখানে কাজ করছে৷ আগে নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া হতো৷ হাইকোর্ট সেটা বন্ধ করেছে৷ আমি মনে করি, অনার কিলিং নিয়েও আমাদের ভাবার সময় এসেছে৷”
তবে মানবাধিকার কর্মী এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘‘পাকিস্তানে যেমন অনার কিলিংয়ে ক্ষমা পাওয়া যায়, কমিউিনিটি এটাকে গ্রহণ করে, বাংলাদেশে সেই অবস্থা নেই৷ এ ধরণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান আছে৷ কিন্তু যেটা হয়, তা হলো পারিবারিক বা অন্যকোনোভাবে ঘটনাকে গোপন করা হয়৷ আলামত নষ্ট করা হয়৷ ধামাচাপা দেয়া হয়৷”
অ্যাডভোকেট এলিনা খান আরো বলেন,‘‘আমি মনে করি, এক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে৷ পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে এ ধরণের ঘটনা প্রমাণে গুরুত্ব দিতে হবে৷ হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে৷ দরকার আইন ও বাস্তবায়ন৷”
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অনার কিলিংয়ের মূল কারণ প্রেম নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা। অনেক পরিবার এখনও মনে করে, সন্তানের জীবন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরই। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর। কোথায় যাবে, কাকে বিয়ে করবে, কীভাবে জীবন কাটাবে—এসব বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অনেকেরই থাকে না। সেই সীমা অতিক্রম করলেই শুরু হয় পারিবারিক চাপ, মানসিক নির্যাতন, হুমকি, এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কাও।
আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোও বলছে, অনার কিলিং সাধারণত হঠাৎ ঘটে না। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে চলে মানসিক নির্যাতন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ভয়ভীতি, নজরদারি এবং পারিবারিক সহিংসতা। অর্থাৎ হত্যা হলো দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের চূড়ান্ত পরিণতি।
তাহলে পরিবর্তনের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনার কিলিং প্রতিরোধে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বদলানো এবং পরিবার ও সমাজে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে একজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কখনোই পরিবারের ‘সম্মানহানি’ নয়।
একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। সন্তানকে সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে গড়ে তোলা,ধর্মীয় ও নৈতিক সুশিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি সন্তানকে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে মেনে নেওয়া।
মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতের অমিল কখনোই সহিংসতার কারণ হতে পারে না,সেজন্য পরিবারে সংলাপ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে যেসব তরুণ-তরুণী পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
রায়কা আক্তার রিয়া কিংবা আরফানা হোসেন নির্জনা সহ এরও আগে ঘটে যাওয়া অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার আদালত করবেন।
কিন্তু এই দুটি নাম যেন শুধু আরেকটি সংবাদ হয়ে না থাকে।
গণমাধ্যমকে এই ঘটনাগুলো সামাজিক সংকট হিসেবেও তুলে ধরতে হবে।
সম্মান কখনো হত্যা দিয়ে রক্ষা করা যায় না। সত্যিকারের সম্মান নিহিত থাকে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং মর্যাদাকে সম্মান করার মধ্যেই। সমাজ এই সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, সমাজে তত দ্রুত অনার কিলিংয়ের মতো অমানবিক অপরাধ দূরে সরে যেতে পারবে।
তথ্যসূত্র:
UN Women
UNODC
Human Rights Commission of Pakistan (HRCP)


