ঢাকার রামপুরার আট বছর বয়সী বাসিত খান মুসার জীবন ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতার পর থেকে আর আগের মতো নেই।
যে শিশুটি একসময় দৌড়ে খেলত, হাসত, কথা বলত, আজ সে খেলনা পিয়ানোয় সুর তোলে শুধু বাম হাতে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কিংবা খাবার খাওয়াও আর সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মুসা বাবার সঙ্গে আইসক্রিম কিনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। ঠিক সেই সময় রামপুরা এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা শুরু হয়। হঠাৎ ছুটে আসা একটি গুলি শিশুটির মাথায় আঘাত করে।
একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তার দাদি মায়া ইসলাম। হাসপাতালে নেওয়ার পরদিন তিনি মারা যান।
মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ছেলের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি তখন জানতেই পারেননি তার মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে মায়ের মৃত্যুর খবর পেলেও ছেলের সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুসার চিকিৎসা শুরু হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। পরে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশেও নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এ পর্যন্ত তার মাথায় ২১টি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খুলির অংশে কৃত্রিম খুলি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মস্তিষ্কে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল শরীরের অন্য অংশে সরিয়ে নিতে স্থায়ী শান্টও বসানো হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় সাত মাস নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকার পর ধীরে ধীরে সুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। বর্তমানে মুসা আশপাশের অনেক কিছুই বুঝতে পারে এবং অল্প কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। তবে এখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটা, কথা বলা কিংবা নিজের হাতে খাবার খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে পায়নি। নাকে লাগানো একটি নলের মাধ্যমে তাকে তরল খাবার দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে চিকিৎসার দীর্ঘ ব্যয় পরিবারটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থসংকটের কারণে সিঙ্গাপুরে নির্ধারিত ফলোআপ চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। বিদেশ থেকে আনা বিশেষ ওষুধ ও পুষ্টিকর তরল খাবারের মজুতও শেষের পথে বলে জানিয়েছে পরিবার।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতায় মুসার মতো আরও বহু শিশু প্রাণ হারিয়েছে বা গুরুতর আহত হয়েছে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের ঘটনায় মোট ১২৮ জন শিশু ও কিশোর নিহত হয়েছে। তাদের অনেকের জীবনও মুসার মতো চিরতরে বদলে গেছে।


