২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও প্রাণহানি থামেনি; বরং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, প্রতিদিনই নতুন করে নারী ও শিশুর মৃত্যু, আহত হওয়া এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮ হাজারের বেশি নারী ও কন্যাশিশু প্রাণ হারিয়েছেন। ইউএন উইমেনের মানবিক কার্যক্রমবিষয়ক প্রধান সোফিয়া ক্যালটর্প বলেন,
“গাযায় আগের সংঘাতগুলোর চেয়ে (সর্বশেষ যুদ্ধে) অনেক বেশি নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছে৷ তারাও ছিলেন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, তাদের জীবনেও স্বপ্ন ছিল৷”
সংস্থাটি আরও জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক মাস পরও সহিংসতা থামেনি। নারী ও শিশুদের হতাহতের ঘটনা অব্যাহত থাকলেও সব ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ১০ লাখ নারী ও কন্যাশিশু নিজ বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন।
শিশুদের পরিস্থিতিও সমান উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ছয় মাসেই অন্তত ২১৪ জন শিশু নিহত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের ঘটনাগুলোও সেই চিত্রকেই স্পষ্ট করে। ১৭ জুলাই গাজার মধ্যাঞ্চলের নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের আল-বালাতা বাজারে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে আটজন একটি জানাজার শোভাযাত্রায় অংশ নিতে জড়ো হয়েছিলেন। হামলায় আরও অন্তত ২০ জন আহত হন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা একটি “সশস্ত্র গোষ্ঠীকে” লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল; তবে বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে। হামাস এ ঘটনাকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
একই দিনে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় একটি স্কুলের কাছে ড্রোন হামলায় ৫২ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন। এছাড়া আজ-জাওয়াইদা, আল-সাওয়ারহা, গাজা সিটি এবং খান ইউনিসেও পৃথক হামলায় আরও কয়েকজন নিহত ও আহত হন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধীন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েলবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। কমিশনের মতে, হাজারো শিশুর মৃত্যু, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি এবং হাসপাতাল, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের বিরুদ্ধে এসব হামলা ফিলিস্তিনি সমাজের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করার একটি সচেতন কৌশলের অংশ হতে পারে।
কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, কোয়াডকপ্টার ড্রোন, স্নাইপার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহার করে বহু শিশুকে হত্যা বা আহত করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল, বিশেষ করে নবজাতক ও শিশু হাসপাতালগুলোতে হামলার ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং খাদ্য সংকটকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যার ফলে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তদন্ত কমিশন আরও বলেছে, পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনি শিশুরা গ্রেপ্তার, নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং নিয়মিত সামরিক অভিযানের কারণে একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ জনেরও বেশি শিশু। জাতিসংঘ এই হতাহতের পরিসংখ্যানকে সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে, যদিও এ মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
প্রতিদিনের হামলা, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসাসেবার ভাঙন -সব মিলিয়ে গাজার নারী ও শিশুরা আজ বিশ্বের অন্যতম গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্ন করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলাই এখন সবচেয়ে জরুরি; অন্যথায় গাজার একটি পুরো প্রজন্ম দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের ভার বহন করতে বাধ্য হবে।
তথ্যসূত্র:
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (UN Women)
ইউনিসেফ (UNICEF)
রয়টার্স
বিবিসি



