একটি কথা প্রচলিত আছে, “এগ্রিমেন্ট করে সংসার হয়না” কথাটা আসলে কতটুকু যৌক্তিক? শুনতে ঠিক লাগলেও বাস্তবতা হল, মুসলিম ম্যারেজ-এ এই কথাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। In Islam, marriage itself is an agreement, ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বিয়ে কোনো অতীন্দ্রিয় বা স্যাক্রামেন্টাল ইউনিয়ন নয় (যেমনটি হিন্দু ধর্মে মনে করা হয়), বরং এটি একটি দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract)। বিয়ের মূল দলিলই হলো একটি চুক্তিপত্র, আমরা যেটাকে কাবিননামা/নিকাহনামা বলে জানি। এখানে উভয় পক্ষ শর্তারোপ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় থেকেই নারীরা বিয়ের সময় যে কোন বৈধ শর্ত দেওয়ার অধিকার রাখতেন। আব্বাসীয় আমলে (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) অনেক ‘প্রাক-বিবাহ চুক্তি’/Prenup Agreement এর প্রমাণ পাওয়া গেছে যেখানে নারীরা শর্ত দিতেন যে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না বা স্ত্রীকে শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে পারবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি….
প্রশ্ন আসতে পারে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে এবং বিভিন্ন ইসলামী খেলাফতের আন্ডারে নারীরা বিয়ের ক্ষেত্রে কী কী আইনি ও সামাজিক অধিকার ভোগ করতেন? এটা নিয়ে আসলে বিস্তর স্টাডি আর আলোচনার প্রয়োজন আছে, আমি জাস্ট মেজর কিছু ক্রাইটেরিয়া সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
১. বিয়ের সম্মতির অধিকার
ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামতকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কোনো নারী যদি কোনো বিয়েতে অসম্মতি জানাতেন, তবে সেই বিয়ে বাতিল করার আইনি অধিকার তার ছিল।রাসূল (সা.) স্পষ্ট করেছিলেন যে, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারীর স্পষ্ট অনুমতি এবং কুমারী মেয়ের মৌন বা স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।খাসা বিনতে খিযাম (রা.)-এর বিয়ে তার বাবা তার অমতে দিয়েছিলেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) সেই বিয়ে বাতিল করে দিয়েছিলেন।
২. বিয়ের চুক্তিতে শর্তারোপের অধিকার
ইসলামী আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের সময় স্ত্রী নিজের সুরক্ষার জন্য যেকোনো বৈধ শর্তারোপ করতে পারতেন। এবং তা লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হত। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.) যখন তালাকপ্রাপ্তা হন এবং পরবর্তীতে তার বিয়ের আলোচনা চলছিল, তখন সেখানে শর্ত ও অধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা ছিল।
আতিকা বিনতে যায়েদ (রা.) সাহাবী উমর (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। বিয়ের আগে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে তাঁকে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া যাবে না। উমর (রা.) এই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন এবং সারা জীবন তা পালন করেছেন। (রেফারেন্স: আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা-২২৯; সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৯০০-এর ব্যাখ্যা)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রপৌত্রী সুকাইনা বিনতে হুসাইন তাঁর বিয়ের চুক্তিতে শর্ত দিয়েছিলেন যে, তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে বা দাসী গ্রহণ করতে পারবেন না এবং স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক সফরে গিয়ে তার স্বামী দাসী গ্রহণ করে বিয়ের শর্ত ভঙ্গ করায় সুকাইনা (রা.) কাজীর দরবারে(কোর্ট অব ল’) গিয়ে খোলা তালাক নিয়ে এসেছিলেন। (রেফারেন্স: কিতাব আল-আঘানি, আবু আল-ফারাজ আল-ইসফাহানি)।
৩. অর্থনৈতিক অধিকার ও আর্থিক স্বাধীনতা
- মোহরানা/দেনমোহর : বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছিল নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তৎকালীন আরবে দেনমোহর বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রচলন ছিল। ইসলাম এসে নিয়ম করে দেয় যে বিয়ের সময় নির্ধারিত ‘মোহর’ কনের ব্যক্তিগত সম্পদ। এটি কনের বাবা বা অন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য নয়। নারী চাইলে এই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারতেন বা নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারতেন।
- ভরণপোষণ : বিয়ের পর স্ত্রীর যাবতীয় খরচ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) বহন করা স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বা আয় থাকলেও তিনি স্বামীর খরচে জীবনযাপনের অধিকার রাখতেন।
- উত্তরাধিকার : বিয়ের পরও নারী তার পিতার সম্পত্তির অংশীদার থাকতেন। স্বামীর মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি থেকেও নির্দিষ্ট অংশ লাভের আইনি গ্যারান্টি ইসলাম দিয়েছিল
৪. তালাক ও ‘তালাক-ই-তাফওয়ীয’ (কর্তৃত্ব হস্তান্তর)
বিয়ের চুক্তি যদি অকার্যকর হয়ে পড়ত, তবে নারী ‘খোলা’ (Khula) তালাক্বের মাধ্যমে সেই বন্ধন থেকে সম্মানের সাথে বেরিয়ে আসতে পারতেন। এক্ষেত্রে নারীরা জাস্ট সংসারে আর আগ্রহী নন এই কারণেও তালাক্ব নিতে পারতেন।
জামিলা বিনতে উবাই (রা.) রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামীর চারিত্রিক বা ধর্মীয় কোনো ত্রুটি নেই, কিন্তু আমি তাঁকে সহ্য করতে পারছি না (আমি কুফরিতে লিপ্ত হওয়ার ভয় করছি)।” রাসূল (সা.) তাঁকে তাঁর মোহরানার বাগানটি ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছেদ করতে বলেন। এটিই ইসলামের প্রথম ‘খোলা’ তালাক। (রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫২৭৩)।
হাবিবাহ বিনতে সাহল (রা.) যখন তাঁর স্বামী সাবিত বিন কায়েসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি তাঁকে মেরেছেন, তখন রাসূল (সা.) তাঁদের বিচ্ছেদের (খোলা তালাক) ব্যবস্থা করে দেন। (রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২২৭)।
এছাড়াও বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রী নিজেই নিজেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফওয়ীজ) রাখতেন। (তালাক-ই-তাফওয়ীজ এর অধিকার সর্বপ্রথম পেয়েছিলেন উম্মুল মু’মিনীনগণ, কিন্তু তাঁরা আল্লাহর রাসূল সা. কেই বেছে নিয়েছিলেন। সূরা আহযাব ২৮-২৯ দ্রষ্টব্য)
প্রশ্ন হল, এই যে মুসলিমদের বিয়ে এবং পারিবারিক জীবনের ভিত্তিই ছিল এই এগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক চুক্তি, এইটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা “এগ্রিমেন্ট দিয়ে সংসার হয়না”-তে কীভাবে চলে আসলাম?! নট জাস্ট চলে এসেছি, যারা একটা অফিশিয়াল এগ্রিমেন্ট এর মাধ্যমে নিজের প্রাইভেসি এবং সেইফটির অধিকার সংরক্ষণ করতে চাচ্ছি তাদের ওপরেও বিষয়টাকে চাপিয়ে দিচ্ছি! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময় এবং ইসলামের সোনালী যুগে বিয়ে যে একটি ‘সিভিল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক ও আইনি চুক্তি ছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ইসলামে বিয়ের কাবিননামা মূলত একটি আইনি সুরক্ষা কবচ, যেখানে মোহরানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার পূর্ণ অধিকার নারীর ছিল। মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় এই চুক্তিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত হয়ে “কাগজ দিয়ে সংসার হয় না” বা “এগ্রিমেন্ট দিয়ে ভালোবাসা হয় না” জাতীয় আবেগী ও অবাস্তব মনোভাব প্রবেশের পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে –
১. ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মের প্রভাব এবং পারস্য আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে বিয়েকে একটি পারস্পরিক চুক্তির পরিবর্তে একটি ‘পবিত্র বন্ধন’ হিসেবে দেখা শুরু হয়, ফলে চুক্তির আইনি দিকগুলো অনেকের কাছে “ব্যবসায়িক লেনদেন” বা “অবিশ্বাস” হিসেবে গণ্য হতে থাকে। এই অতি-আবেগীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিয়ের বাস্তবসম্মত আইনি সুরক্ষাগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখানে নারীর ত্যাগকেই প্রধান গুণ হিসেবে ধরা হয়। মোগল আমলে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে হিন্দু আইন ও স্থানীয় প্রথাগত আইনের প্রভাবে বিয়ের “চুক্তি” (Contract) চরিত্রটি হারিয়ে “ধর্মীয় ত্যাগ” (Sacrament) এর রূপ নেয়, যেখানে মনে করা হতো স্ত্রী কোনো শর্ত দিলে তা তাঁর সতীত্বের বা পতিভক্তির পরিপন্থী, অথচ স্বামীর মনিব নয় পার্টনার হওয়ার কথা ছিল। এছাড়াও ব্রিটিশ আমলের ভিক্টোরিয়ান ঘরানার রক্ষণশীল চিন্তা আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ে, যেখানে মনে করা হতো বিয়ের চুক্তি মানেই হলো আবেগের মৃত্যু।
২. পারিবারিক কাঠামো যখন অধিকতর পুরুষতান্ত্রিক (নট পিতৃতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক) হয়ে ওঠে, তখন নারীর দরকষাকষির ক্ষমতা বা চুক্তিতে শর্ত দেওয়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা হয়। “সংসার মানেই ছাড় দেওয়া” এই তত্ত্বের আড়ালে মূলত নারীর আইনি অধিকার ও নিরাপত্তার জায়গাটি সংকুচিত করা হয়েছে। বিয়ের চুক্তিতে শক্ত শর্তারোপকে তখন “অবাধ্যতা” বা “সংসার শুরুর আগেই ভাঙনের সুর” হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়।
৩. ইসলামী শরীয়াহর জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে কমে যাওয়ার ফলে বিয়ের চুক্তিতে (নিকাহনামা) কনের ইচ্ছানুযায়ী শর্ত রাখার বিষয়টি অনেকের কাছে অজানা থেকে গেছে। ধর্মীয় অনেক বিধিবিধানের চেয়ে সামাজিক রীতিনীতি বা ‘প্রথা’ যখন শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন আইনের চেয়ে লোকলজ্জা বা বংশীয় ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে চুক্তির বিষয়টিকে অবজ্ঞা করা হয়।
৪. ভারতবর্ষের মতো অঞ্চলগুলোতে মুসলিম পারিবারিক আইনে উপনিবেশিক প্রভাবের ফলে বিয়ের আইনি দিকগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের জটিলতায় পড়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে রেজিস্ট্রি বা চুক্তি কেবল একটি সরকারি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, যা জীবনের প্রকৃত সুখ-শান্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে মানুষ মনে করতে শুরু করে।
৫. আস্থার অভাবকে পুঁজি করা। ”এগ্রিমেন্ট দিয়ে কি ভালোবাসা হয়?”—এই যুক্তিটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো পক্ষ (সাধারণত কনে পক্ষ) নিজের অধিকারের সুরক্ষা চায়, তখন অন্য পক্ষ এটিকে “আস্থার অভাব” বা “অবিশ্বাসের সম্পর্ক” বলে চালিয়ে দেয়। ফলে সামাজিকভাবে মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে কুণ্ঠাবোধ করে।
রাসূল সাঃ এর সময়ে নারী সাহাবীরা কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং নিজেদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করেই সংসার করতেন। তবে একটি সফল সংসারের জন্য আইনি শর্ত এবং পারস্পরিক এহসান—দুটিরই প্রয়োজন। তখনকার দিনে লিখিত এগ্রিমেন্ট থাকার পরেও আমাদের সম্মানিত সাহাবীয়্যাতের স্বামীদের অসম্মানিত বোধ হয়নি, স্ত্রীর প্রতি এহসান, আবেগ-অনুভূতির ব্যাত্যয় ঘটেনি, কারণ তারা কেউ ভাবতেন না যে এগ্রিমেন্ট দিয়ে সংসার হয়না, তারা এটাকে তাদের স্ত্রীদের অধিকার বলেই স্বীকার করতেন। কিন্তু এই প্র্যাক্টিস এখনকার সমাজে ইমপ্লিমেন্ট করতে গেলে দেখা যাবে উঠতে বসতে নারী সাহাবীদের মত হতে বলা পুরুষরাই বেজার হয়ে বসে আছেন! সমস্যা আসলে এগ্রিমেন্ট-এ না, সমস্যা তাদের মানসিকতায় যারা আইন ও অধিকারকে ‘অসম্মান’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। রাসূলের যুগে মেয়েরা এই করত না সেই করত না এটা ধপ করে বলে ফেলা যায়, কিন্তু বলার আগে একটু আন্দাজ করা কি উচিত না যে আসলে আসলে রাসূলের যূগ সম্পর্কে কতটুকু জানি!