banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

Monthly Archives: March 2026

 

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা, ঘাতক দম্পতি গ্রেপ্তার

রাজধানীর পল্লবীতে রামিসা আক্তার (৮) নামের দ্বিতীয় শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালে প্রতিবেশী এক যুবকের ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় জনতা ও পুলিশ। এই ঘটনায় অভিযুক্ত মূল আসামি সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে (২৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত রামিসা মিরপুরের ‘পপুলার মডেল হাই স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণীর রোল নম্বর এক (১)ধারী শিক্ষার্থী ছিল। প্লে-গ্রুপ ও কেজিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পর প্রথম শ্রেণীতে সে প্রথম স্থান অর্জন করে। পড়ালেখায় অত্যন্ত মেধাবী রামিসার অকাল ও নৃশংস মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে রামিসা নিখোঁজ হওয়ার পর তার মা পারভীন আক্তার খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেশী সোহেল রানার ফ্ল্যাটের বাইরে রামিসার জুতো জোড়া দেখতে পান। ভেতর থেকে রামিসার চিৎকার শুনতে পেয়ে পারভীন আক্তার দরজায় অনবরত ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ মেলেনি।
পরে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। রামিসার চাচা এ কে এম নজরুল ইসলাম জানান, ঘরের ভেতরে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উপস্থিত ছিলেন। পরে তল্লাশি চালিয়ে ঘরের খাটের নিচ থেকে রামিসার মাথা বিচ্ছিন্ন দেহ এবং বাথরুমের একটি বালতি থেকে তার মাথা উদ্ধার করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, দরজা না খুলে ভেতর থেকে সোহেলকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না।

হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়া প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে মিরপুর বিভাগীয় পুলিশ। পরবর্তীতে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বশির জানান, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন—উভয়কেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

রামিসার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার বিদ্যালয় পপুলার মডেল হাই স্কুলে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা ও শোক। রামিসার শ্রেণী শিক্ষক মাহবুবুল হাকিম বলেন:

“রামিসা প্রতিদিন ক্লাসের ১০ মিনিট আগেই স্কুলে চলে আসত। মঙ্গলবার ও আসেনি দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। পরে শুনলাম ওকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম রামিসাকে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
নিহত রামিসার বাসায় এখনো থরে থরে সাজানো রয়েছে তার কৃতিত্বের স্মারক ও একাডেমিক ট্রফিগুলো। কিন্তু যে মেধাবী শিশুটি এই ট্রফিগুলো অর্জন করেছিল, সে আজ আর বেঁচে নেই। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।

 

প্রশাসনে মুসলিম নারী: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আয়নায় – সালিমা মেহরা

​ফেসবুক ফতোয়ার ধুন্ধুমার পথ মাড়িয়ে আসুন চোখ রাখি ইতিহাস আর ঐতিহ্যে। আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যে এমনটা আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করলে আমাদের যেতে হয় ফারাণ মরুভূমিতে—আমাদের হৃদয়ে যাঁর নাম মক্কা।

​স্থিরতা, সহনশীলতা আর তাওয়াক্কুলের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত যমযম কূপের পাশে হযরত হাজেরা (আ.) শিশু পুত্রসহ একাকী বসে আছেন। পানির সন্ধান পেয়ে জুরহুম গোত্রের প্রতিনিধি দল এসে বলল, “সম্মানিতা বোন, আপনার অনুমতি হলে আমাদের গোত্র এখানে বসবাস করতে চায়।” হযরত হাজেরা (আ.) অনুমতি দিয়ে বললেন, “বসবাস করতে পারেন; তবে এই কূপের ওপর শুধু কর্তৃত্ব থাকবে আমার।”

​এটা কি শুধুমাত্র কূপের ওপর কর্তৃত্ব, নাকি এই কূপ ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদে পানি বণ্টন ও সীমা নির্ধারণের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃত্ব? তবে কি এ ভূমিকা ছিল একজন প্রশাসকের? একজন নারীর এই ভূমিকা তখনও স্বাভাবিক ছিল বলেই জুরহুম গোত্রের কোনো আপত্তি ছিল না।
কিন্তু এখন!!

​ফারাণ পর্বত ছেড়ে মদিনায়। মুসলিম জাহানের সোনালী সময়; খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকাল। মদিনার বাজার—সমৃদ্ধ আর জমজমাট। সুচারুরূপে বাজার পরিচালনায় বাজার আদালত (قاضية الحسبة) তথা ‘অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি কোর্ট’ এবং (قاضية السوق) ‘মার্কেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর দায়িত্বে ছিলেন হযরত শাফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)।
তিনি ছিলেন একজন নারী সাহাবী এবং মক্কা ও মদিনার প্রসিদ্ধ চিকিৎসক। তিনি তাঁর পেশায় এতটাই সফল ছিলেন যে, ইতিহাস তাঁকে ‘শিফা’ (নিরাময়কারী) নামে স্মরণ রেখেছে।

ইতিহাসে আরেকটি নাম ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রহ.)। আলেপ্পোর প্রশাসনিক ফতোয়ার ওপর দুইজন পুরুষের পাশাপাশি দস্তখত থাকত এক নারীর—তিনিই সেই সম্মানিতা নারী।

​হাফসা বিনতে সিরিন (রহ) সময়ের সেরা ফকিহা। হিশাম বিন হাসসান যাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি হাসান বসরি ও ইবনে সিরিনকে দেখেছি, কিন্তু আমি এমন কাউকেই দেখিনি যাঁকে হাফসার চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে হয়েছে।”

উনারা তো ফকিহা ছিলেন; এখনো এই যোগ্যতা অর্জনে কে বাধা দেয়? সত্যিই কি এটা সমান অর্জন? তবে সেই ফকিহা কেমন? সেই অর্জন কতখানি?

​ক্রমবর্ধমান ইসলামী রাষ্ট্রের নিত্যনতুন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় সময়ের সেরা তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের হাতে গড়ে ওঠে ইসলামী আইনশাস্ত্র।
যেখানে টেক্সচুয়াল জ্ঞানের সাথে ‘Rational Knowledge’ বা ‘আকল-ভিত্তিক জ্ঞান’ ছিল অপরিহার্য। ইজতিহাদের সেই ক্ষমতা ছিল মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা। তাই সেই সময়ের ফকিহারা ছিলেন একেকটি পর্বতশৃঙ্গ, সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের অপরিহার্য অংশীদার।

​আমাদের দৃষ্টি আরও মুগ্ধতা মাখে এক হাশেমী নারীর বিস্ময়কর জ্ঞান, শক্ত মনোবল আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখে।
তিনি হযরত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ (রহ.)! ইতিহাস যাকে স্মরণ রেখেছে ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর জন্মদাত্রী এক সফল মা হিসেবে। পুত্র ইমাম শাফেয়ির জন্মের পরপরই স্বামী হারিয়ে তিনি ইয়েমেনে পিতৃগৃহে আশ্রয় নেন। পিতার অবস্থা ছিল হতদরিদ্র, তবে ফাতিমা থেমে যাননি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে ছেলেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা, কবিতা ও আর্চারি শেখানোর জন্য তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। ছেলেকে হাফেজ, মুহাদ্দিস ও ফকিহ হিসেবে গড়ে তুলতে অল্প বয়সে বিধবা হওয়া ফাতিমা ‘সিঙ্গেল মাদার’ হিসেবেই বাকি জীবন কাটিয়েছেন—যা তৎকালীন আরবের প্রেক্ষাপটে ছিল এক বিরল ঘটনা।

​একজন সফল মা হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সে সময়ের সেরা ফকিহা। একবার মক্কায় বিচারের কাজে সাক্ষী হওয়ার জন্য দুইজন নারীকে ডাকা হলো। দুজনের একজন ছিলেন হযরত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ। কাজি আলাদা আলাদা কক্ষে দুজনের সাক্ষ্য নিতে চাইলেন (শাফেয়ি মাযহাব মতে সাক্ষীদের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে আলাদা সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায়)।

বিচারের মজলিসে উপস্থিত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ শান্ত গলায় বললেন, “আপনার এটা করার কোনো অধিকার নেই কাজি সাহেব। কারণ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন—যদি নারী সাক্ষীদের একজন কোথাও ভুলে যায়, তবে অন্যজন তা স্মরণ করিয়ে দেবে।” (২:২৮২)।

​অতঃপর কাজি এই যুক্তির পর একসাথে তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ইমাম সুবকি এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে বলেন, “সত্যিই এটি ছিল সুন্দর দলিল, শক্তিশালী উপস্থাপন আর অসাধারণ যুক্তিতর্ক।” ছেলের মাযহাবের বিপরীতে উম্মে শাফেয়ির এই অবস্থান ছিল অনবদ্য।

ইতিহাসের গলিপথ মাড়িয়ে মহাগ্রন্থ আল কুরআন-এ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে হযরত মারইয়াম (আ.)যে ছবি ভেসে উঠে তাতে আমরা একজন বুদ্ধিদীপ্ত বালিকার সাক্ষাৎ পাই। বালিকা থেকে কৈশোরে উপনীত হতেই যিনি ইলম চর্চা, আনুগত্য আর চারিত্রিক পবিত্রতায় মহান রবের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কৈশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা রাখা এই মহান রমণী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিজার জন্য মনোনীত হলেন।
ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে তিনি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সদ্য জন্মানো অসাধারণ শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজ গোত্রে ফিরে আসা এবং দোলনা থেকে ছোট্ট শিশুর মাধ্যমে মায়ের চারিত্রিক পবিত্রতার সত্যায়ন—ইতিহাসের এই বর্ণনা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।

​তবে আমরা যা শুনিনি বা খুবই কম শুনেছি, তা হলো:

​একজন নারী কি পবিত্র মসজিদের খাদেমা হতে পারে? সমাজের ও জনপদের লোকদের এই নেতিবাচক মনোভাবকে ভুল প্রমাণিত করে মহান রব দিয়েছেন এর সম্মানজনক অনুমোদন।

​একজন সফল ‘সিঙ্গেল মাদার’-এর সংগ্রামের গল্প। সদ্য জন্মানো শিশুপুত্র ছিল একজন নবী, স্বয়ং রাজা ছিল যাঁর দুশমন। পুরো একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সন্তানের নিরাপত্তায় একাকী মায়ের লড়াই।

​একজন মা, পিতাহীন শিশুপুত্রকে হকের জন্য নিরাপদ রাখতে সুদূর মিশর পানে ছুটে চলেছেন। পথে বিপদ আছে, জীবননাশের শঙ্কা আছে; আর সেই মায়ের একমাত্র হাতিয়ার—বিশ্বাস, তাওয়াক্কুল আর বিচক্ষণতা। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বারোটি বছর সন্তানকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। শিক্ষা দিয়েছেন জালেম রাজার বিরুদ্ধে আর মাজলুমের পক্ষে অটল হয়ে দাঁড়ানোর তেজোদীপ্ততা।

​আমরা থমকে দাঁড়াই ইতিহাসের এই বাঁকে এসে, যখন অভিভূত হয়ে দেখি, একজন নারী লড়ে যেতে পারেন গোটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে—সত্য ও ন্যায়ের জন্য। আর পবিত্র কুরআনে এই মহান নারীকে মনোনীত করেছে সকল নারীর জন্য আদর্শ হিসেবে:

​“হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছেন এবং পবিত্র করেছেন; আর বিশ্বজগতের নারীগণের ওপর আপনাকে মনোনীত করেছেন।” (৩:৪২)

​আমরা যদি বর্তমান ও আগামীর সন্ধানে চোখ রাখি ইতিহাসে তাহলে চার্লস সেইফার্টের ভাষায় বলতে হয়, “নিজের ইতিহাস আর সংস্কৃতির জ্ঞান যে জাতির নেই, তারা শিকড়হীন গাছের মতো। সামনে এগোতে হলে আগে পেছনে তাকাতে হয়।”

 

চট্টগ্রামে বিরল ভাইরাসে সিভাসু শিক্ষিকার মৃত্যু

চট্টগ্রামে বিরল মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা ও বমি নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। শুরুতে বিষয়টিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর বা ফ্লু মনে করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার একাধিক স্ট্রোক হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মারা যান।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ সাধারণত কিউলেক্স প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ড. জুথির ক্ষেত্রেও ভাইরাসজনিত জটিলতায় ব্রেন স্ট্রোক এবং হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭-০৮ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি জাপানের Hiroshima University থেকে পিএইচডি এবং Kyushu University থেকে পোস্টডক সম্পন্ন করেন। সম্প্রতি তিনি সিভাসুতে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

তার স্বামী অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার হাসেম অর্নব বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের পাঁচ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।

 

বিয়ে ও প্রি-ম্যারিটাল এগ্রিমেন্ট : প্রচলিত ভুল ধারণার পুনর্বিবেচনা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

একটি কথা প্রচলিত আছে, “এগ্রিমেন্ট করে সংসার হয়না” কথাটা আসলে কতটুকু যৌক্তিক? শুনতে ঠিক লাগলেও বাস্তবতা হল, মুসলিম ম্যারেজ-এ এই কথাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। In Islam, marriage itself is an agreement, ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বিয়ে কোনো অতীন্দ্রিয় বা স্যাক্রামেন্টাল ইউনিয়ন নয় (যেমনটি হিন্দু ধর্মে মনে করা হয়), বরং এটি একটি দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract)। বিয়ের মূল দলিলই হলো একটি চুক্তিপত্র, আমরা যেটাকে কাবিননামা/নিকাহনামা বলে জানি। এখানে উভয় পক্ষ শর্তারোপ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় থেকেই নারীরা বিয়ের সময় যে কোন বৈধ শর্ত দেওয়ার অধিকার রাখতেন। আব্বাসীয় আমলে (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) অনেক ‘প্রাক-বিবাহ চুক্তি’/Prenup Agreement এর প্রমাণ পাওয়া গেছে যেখানে নারীরা শর্ত দিতেন যে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না বা স্ত্রীকে শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে পারবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি….

প্রশ্ন আসতে পারে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে এবং বিভিন্ন ইসলামী খেলাফতের আন্ডারে নারীরা বিয়ের ক্ষেত্রে কী কী আইনি ও সামাজিক অধিকার ভোগ করতেন? এটা নিয়ে আসলে বিস্তর স্টাডি আর আলোচনার প্রয়োজন আছে, আমি জাস্ট মেজর কিছু ক্রাইটেরিয়া সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

১. বিয়ের সম্মতির অধিকার
​ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামতকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কোনো নারী যদি কোনো বিয়েতে অসম্মতি জানাতেন, তবে সেই বিয়ে বাতিল করার আইনি অধিকার তার ছিল।রাসূল (সা.) স্পষ্ট করেছিলেন যে, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারীর স্পষ্ট অনুমতি এবং কুমারী মেয়ের মৌন বা স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।খাসা বিনতে খিযাম (রা.)-এর বিয়ে তার বাবা তার অমতে দিয়েছিলেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) সেই বিয়ে বাতিল করে দিয়েছিলেন।

​২. বিয়ের চুক্তিতে শর্তারোপের অধিকার
​ইসলামী আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের সময় স্ত্রী নিজের সুরক্ষার জন্য যেকোনো বৈধ শর্তারোপ করতে পারতেন। এবং তা লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হত। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.) যখন তালাকপ্রাপ্তা হন এবং পরবর্তীতে তার বিয়ের আলোচনা চলছিল, তখন সেখানে শর্ত ও অধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা ছিল।
​আতিকা বিনতে যায়েদ (রা.) সাহাবী উমর (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। বিয়ের আগে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে তাঁকে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া যাবে না। উমর (রা.) এই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন এবং সারা জীবন তা পালন করেছেন। (রেফারেন্স: আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা-২২৯; সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৯০০-এর ব্যাখ্যা)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রপৌত্রী সুকাইনা বিনতে হুসাইন তাঁর বিয়ের চুক্তিতে শর্ত দিয়েছিলেন যে, তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে বা দাসী গ্রহণ করতে পারবেন না এবং স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক সফরে গিয়ে তার স্বামী দাসী গ্রহণ করে বিয়ের শর্ত ভঙ্গ করায় সুকাইনা (রা.) কাজীর দরবারে(কোর্ট অব ল’) গিয়ে খোলা তালাক নিয়ে এসেছিলেন। (রেফারেন্স: কিতাব আল-আঘানি, আবু আল-ফারাজ আল-ইসফাহানি)।

​​৩. অর্থনৈতিক অধিকার ও আর্থিক স্বাধীনতা

  • মোহরানা/দেনমোহর : ​বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছিল নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
    ​তৎকালীন আরবে দেনমোহর বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রচলন ছিল। ইসলাম এসে নিয়ম করে দেয় যে বিয়ের সময় নির্ধারিত ‘মোহর’ কনের ব্যক্তিগত সম্পদ। এটি কনের বাবা বা অন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য নয়। নারী চাইলে এই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারতেন বা নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারতেন।
  • ​ভরণপোষণ : বিয়ের পর স্ত্রীর যাবতীয় খরচ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) বহন করা স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বা আয় থাকলেও তিনি স্বামীর খরচে জীবনযাপনের অধিকার রাখতেন।
  • ​উত্তরাধিকার : বিয়ের পরও নারী তার পিতার সম্পত্তির অংশীদার থাকতেন। স্বামীর মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি থেকেও নির্দিষ্ট অংশ লাভের আইনি গ্যারান্টি ইসলাম দিয়েছিল

​৪. তালাক ও ‘তালাক-ই-তাফওয়ীয’ (কর্তৃত্ব হস্তান্তর)
বিয়ের চুক্তি যদি অকার্যকর হয়ে পড়ত, তবে নারী ‘খোলা’ (Khula) তালাক্বের মাধ্যমে সেই বন্ধন থেকে সম্মানের সাথে বেরিয়ে আসতে পারতেন। ​এক্ষেত্রে নারীরা জাস্ট সংসারে আর আগ্রহী নন এই কারণেও তালাক্ব নিতে পারতেন।
​জামিলা বিনতে উবাই (রা.) রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামীর চারিত্রিক বা ধর্মীয় কোনো ত্রুটি নেই, কিন্তু আমি তাঁকে সহ্য করতে পারছি না (আমি কুফরিতে লিপ্ত হওয়ার ভয় করছি)।” রাসূল (সা.) তাঁকে তাঁর মোহরানার বাগানটি ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছেদ করতে বলেন। এটিই ইসলামের প্রথম ‘খোলা’ তালাক। (রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫২৭৩)।
​হাবিবাহ বিনতে সাহল (রা.) যখন তাঁর স্বামী সাবিত বিন কায়েসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি তাঁকে মেরেছেন, তখন রাসূল (সা.) তাঁদের বিচ্ছেদের (খোলা তালাক) ব্যবস্থা করে দেন। (রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২২৭)।
এছাড়াও বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রী নিজেই নিজেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফওয়ীজ) রাখতেন। (তালাক-ই-তাফওয়ীজ এর অধিকার সর্বপ্রথম পেয়েছিলেন উম্মুল মু’মিনীনগণ, কিন্তু তাঁরা আল্লাহর রাসূল সা. কেই বেছে নিয়েছিলেন। সূরা আহযাব ২৮-২৯ দ্রষ্টব্য)

প্রশ্ন হল, এই যে মুসলিমদের বিয়ে এবং পারিবারিক জীবনের ভিত্তিই ছিল এই এগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক চুক্তি, এইটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা “এগ্রিমেন্ট দিয়ে সংসার হয়না”-তে কীভাবে চলে আসলাম?! নট জাস্ট চলে এসেছি, যারা একটা অফিশিয়াল এগ্রিমেন্ট এর মাধ্যমে নিজের প্রাইভেসি এবং সেইফটির অধিকার সংরক্ষণ করতে চাচ্ছি তাদের ওপরেও বিষয়টাকে চাপিয়ে দিচ্ছি! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময় এবং ইসলামের সোনালী যুগে বিয়ে যে একটি ‘সিভিল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক ও আইনি চুক্তি ছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ইসলামে বিয়ের কাবিননামা মূলত একটি আইনি সুরক্ষা কবচ, যেখানে মোহরানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার পূর্ণ অধিকার নারীর ছিল। মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় এই চুক্তিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত হয়ে “কাগজ দিয়ে সংসার হয় না” বা “এগ্রিমেন্ট দিয়ে ভালোবাসা হয় না” জাতীয় আবেগী ও অবাস্তব মনোভাব প্রবেশের পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে –

১. ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মের প্রভাব এবং পারস্য আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে বিয়েকে একটি পারস্পরিক চুক্তির পরিবর্তে একটি ‘পবিত্র বন্ধন’ হিসেবে দেখা শুরু হয়, ফলে চুক্তির আইনি দিকগুলো অনেকের কাছে “ব্যবসায়িক লেনদেন” বা “অবিশ্বাস” হিসেবে গণ্য হতে থাকে। এই অতি-আবেগীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিয়ের বাস্তবসম্মত আইনি সুরক্ষাগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখানে নারীর ত্যাগকেই প্রধান গুণ হিসেবে ধরা হয়। মোগল আমলে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে হিন্দু আইন ও স্থানীয় প্রথাগত আইনের প্রভাবে বিয়ের “চুক্তি” (Contract) চরিত্রটি হারিয়ে “ধর্মীয় ত্যাগ” (Sacrament) এর রূপ নেয়, যেখানে মনে করা হতো স্ত্রী কোনো শর্ত দিলে তা তাঁর সতীত্বের বা পতিভক্তির পরিপন্থী, অথচ স্বামীর মনিব নয় পার্টনার হওয়ার কথা ছিল। এছাড়াও ব্রিটিশ আমলের ভিক্টোরিয়ান ঘরানার রক্ষণশীল চিন্তা আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ে, যেখানে মনে করা হতো বিয়ের চুক্তি মানেই হলো আবেগের মৃত্যু।

​২. পারিবারিক কাঠামো যখন অধিকতর পুরুষতান্ত্রিক (নট পিতৃতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক) হয়ে ওঠে, তখন নারীর দরকষাকষির ক্ষমতা বা চুক্তিতে শর্ত দেওয়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা হয়। “সংসার মানেই ছাড় দেওয়া” এই তত্ত্বের আড়ালে মূলত নারীর আইনি অধিকার ও নিরাপত্তার জায়গাটি সংকুচিত করা হয়েছে। বিয়ের চুক্তিতে শক্ত শর্তারোপকে তখন “অবাধ্যতা” বা “সংসার শুরুর আগেই ভাঙনের সুর” হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়।

৩. ইসলামী শরীয়াহর জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে কমে যাওয়ার ফলে বিয়ের চুক্তিতে (নিকাহনামা) কনের ইচ্ছানুযায়ী শর্ত রাখার বিষয়টি অনেকের কাছে অজানা থেকে গেছে। ধর্মীয় অনেক বিধিবিধানের চেয়ে সামাজিক রীতিনীতি বা ‘প্রথা’ যখন শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন আইনের চেয়ে লোকলজ্জা বা বংশীয় ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে চুক্তির বিষয়টিকে অবজ্ঞা করা হয়।

৪. ভারতবর্ষের মতো অঞ্চলগুলোতে মুসলিম পারিবারিক আইনে উপনিবেশিক প্রভাবের ফলে বিয়ের আইনি দিকগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের জটিলতায় পড়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে রেজিস্ট্রি বা চুক্তি কেবল একটি সরকারি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, যা জীবনের প্রকৃত সুখ-শান্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে মানুষ মনে করতে শুরু করে।

৫. আস্থার অভাবকে পুঁজি করা। ​”এগ্রিমেন্ট দিয়ে কি ভালোবাসা হয়?”—এই যুক্তিটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো পক্ষ (সাধারণত কনে পক্ষ) নিজের অধিকারের সুরক্ষা চায়, তখন অন্য পক্ষ এটিকে “আস্থার অভাব” বা “অবিশ্বাসের সম্পর্ক” বলে চালিয়ে দেয়। ফলে সামাজিকভাবে মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে কুণ্ঠাবোধ করে।

রাসূল সাঃ এর সময়ে নারী সাহাবীরা কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং নিজেদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করেই সংসার করতেন। তবে একটি সফল সংসারের জন্য আইনি শর্ত এবং পারস্পরিক এহসান—দুটিরই প্রয়োজন। তখনকার দিনে লিখিত এগ্রিমেন্ট থাকার পরেও আমাদের সম্মানিত সাহাবীয়্যাতের স্বামীদের অসম্মানিত বোধ হয়নি, স্ত্রীর প্রতি এহসান, আবেগ-অনুভূতির ব্যাত্যয় ঘটেনি, কারণ তারা কেউ ভাবতেন না যে এগ্রিমেন্ট দিয়ে সংসার হয়না, তারা এটাকে তাদের স্ত্রীদের অধিকার বলেই স্বীকার করতেন। কিন্তু এই প্র‍্যাক্টিস এখনকার সমাজে ইমপ্লিমেন্ট করতে গেলে দেখা যাবে উঠতে বসতে নারী সাহাবীদের মত হতে বলা পুরুষরাই বেজার হয়ে বসে আছেন! সমস্যা আসলে এগ্রিমেন্ট-এ না, সমস্যা তাদের মানসিকতায় যারা আইন ও অধিকারকে ‘অসম্মান’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। রাসূলের যুগে মেয়েরা এই করত না সেই করত না এটা ধপ করে বলে ফেলা যায়, কিন্তু বলার আগে একটু আন্দাজ করা কি উচিত না যে আসলে আসলে রাসূলের যূগ সম্পর্কে কতটুকু জানি!

 

কেরালায় মুসলিম লীগের প্রথম নারী বিধায়ক, রাজনীতিতে বদলের ইঙ্গিত

২০২৬ সালের কেরালার বিধানসভা নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন তরুণ মুসলিম আইনজীবী ফাতিমা তাহিলিয়া।
বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পেরামব্রা আসনে জয়ী হয়ে তিনি ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) প্রথম নারী বিধায়ক হিসেবে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই জয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং দলীয় ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনে তাহিলিয়া সিপিআই(এম)-এর জ্যেষ্ঠ নেতা ও এলডিএফ কনভেনর টি.পি. রামকৃষ্ণনকে পরাজিত করেন।
তিনি মোট ৮১ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে প্রায় ৫ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২১ সালের নির্বাচনে একই আসনে রামকৃষ্ণন ২২ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ফলে এবারের ফলাফল বাম জোটের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল মালাবার অঞ্চলে ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি মুসলিম তরুণীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নতুন আশা জাগিয়েছে। আইইউএমএল অতীতে খুব কম নারী প্রার্থী দিয়েছে, এবং ২০২৬ সালের আগে মনোনয়ন পাওয়া দুই নারী প্রার্থীই নির্বাচনে পরাজিত হন। সেই প্রেক্ষাপটে তাহিলিয়ার জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

ছাত্ররাজনীতি থেকেই তাহিলিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। তিনি মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এমএসএফ) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং এর নারী শাখা ‘হারিতা’র প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১২ সাল থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত এই তরুণী পরবর্তীতে কোঝিকোড সিটি করপোরেশনের কুট্টিচিরা ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এবং বর্তমানে মুসলিম ইয়ুথ লীগের রাজ্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষাজীবনে তাহিলিয়া কোঝিকোড সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতক এবং ত্রিশূরের সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কোঝিকোড জেলা আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতেও সক্রিয়।

নির্বাচনী প্রচারণায় তাহিলিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন। প্রবীণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদের জীবিকা ও কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরার মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জন করেন।

তবে এই পথ মোটেই সহজ ছিল না। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই তাহিলিয়া সাইবার হামলা ও অনলাইন হয়রানির শিকার হন।
বিশেষ করে হিজাব পরিহিত মুসলিম নারী হিসেবে তার সক্ষমতা নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। তবুও তিনি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যান।

তাহিলিয়ার এই জয় কেরালার রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
বামদের শক্ত ঘাঁটিতে এই ফলাফল ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং নারী নেতৃত্বের পথকে আরও উন্মুক্ত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

মে দিবসে উপেক্ষিত নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার

আজ পহেলা মে, ​বিশ্বজুড়ে মে মাসের প্রথম দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সংগ্রাম আর সংহতির প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে এবং আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার সুফল আজও পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারেননি নারী শ্রমিকরা।
একদিকে যখন উৎসবের আমেজে মে দিবস পালিত হয়, অন্যদিকে দেশের বিশাল শ্রমশক্তির একটা অংশ -নারী শ্রমশক্তি দিন পার করেন চরম মজুরি বৈষম্য আর অদৃশ্য শ্রমের নিগড়ে বন্দি থেকে।
বিশেষ করে দেশের কৃষি, শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও নারীদের ন্যায্য অধিকার যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

​সৃষ্টির আদি পেশা কৃষির সঙ্গেই নারীর সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের কৃষিখাতে যে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি এই নারীরা।
পরিসংখ্যান বলছে, সার্বিক কৃষির ২১টি কাজের মধ্যে অন্তত ১৭টি কাজই নারীরা করে থাকেন।
বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা তৈরি, ধান মাড়াই, সেদ্ধ করা বা রোদে শুকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তাদের হাতেই সম্পন্ন হয়।
অথচ, এই খাতে ভূমিকা রাখা নারী শ্রমিকদের শ্রম অনেকটাই অদৃশ্য।
নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অভাব, স্বল্প মজুরি আর নানা বঞ্চনায় তারা আজো কোণঠাসা।
কৃষি শ্রমশক্তির সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ কোটির বেশি নারী শ্রমিকের মধ্যে অন্তত ৫৮ শতাংশই মজুরি বৈষম্যের নির্মম শিকার।

​গাইবান্ধার সায়মা আক্তার যেন এই লাখো বঞ্চিত নারীরই প্রতিচ্ছবি। মাঠে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভুট্টা তোলা, পাট বা পুঁই শাক তোলার মতো কাজ করলেও দিনশেষে তার হাতে ওঠে মাত্র ৫০০ টাকা এবং একবেলা খাবার। অথচ একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা পাচ্ছেন তিন বেলা খাবারসহ বেশি মজুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যও এই বৈষম্যের সত্যতা প্রমাণ করে। কৃষিখাতে দৈনিক একবেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে সর্বোচ্চ ৫৭৭ টাকা পান, সেখানে নারীদের জোটে মাত্র ৪১৬ টাকা। খাবার ছাড়া পুরুষের ৬২১ টাকার বিপরীতে নারী পান ৪৬১ টাকা।
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ফসলের ন্যায্য হিস্যা বা সমান মজুরি না পাওয়াটা যেন তাদের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

​কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ হলো কৃষক হিসেবে নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না থাকা। কৃষিবিদ ড. কাশফিয়া আহমেদের মতে, দেশে কত শতাংশ নারী কৃষক আছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য হালনাগাদ নেই। ২ কোটি ২৫ লাখ কৃষকের মধ্যে নারীদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তাদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ বা বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল মনে করেন, নারীবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির অভাব এই বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। প্রযুক্তিগুলোকে নারীবান্ধব করে গড়ে তোলার পাশাপাশি নারী কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

​শুধু কৃষিখাতেই নয়, ইটভাটা, চাতাল, নির্মাণশ্রম, পাথর ভাঙা কিংবা পোশাক শিল্পের মতো ভারী ও প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব জায়গাতেই নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু অভাবের তাড়নায় কাজ করতে আসা এই নারীদের মজুরির বেলায় ঠকানো হচ্ছে অবলীলায়। পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা রোজগার করেন, সেখানে নারীদের দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির যুগে সামান্য এই টাকায় সংসার চালানো তাদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
অধিকার বা মজুরি বৃদ্ধির কথা বললে অনেক সময় কাজ হারানোর হুমকিতেও পড়তে হয় তাদের।

​মজুরি বৈষম্যের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য আরেকটি বড় আতঙ্কের নাম যৌন হয়রানি।
‘সজাগ কোয়ালিশন’-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কারখানার প্রায় ২২ শতাংশ নারী শ্রমিক নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। কারখানায় প্রবেশের সময় অস্বস্তিকর দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, কিংবা মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা অনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চাপের মতো বিষয়গুলো নিত্যদিনের ঘটনা। অথচ এসব অভিযোগ বেশিরভাগ সময়ই আমলে নেওয়া হয় না। এর বাইরে বিদেশে, বিশেষ করে সৌদি আরবে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের খবর প্রতিনিয়তই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। গত তিন দশকে নারী শ্রমিকদের ৪০ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব, যেখানে তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ আজও দৃশ্যমান নয়।

​বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় আয়ে নারীদের অবদান প্রায় ৩০ ভাগ,বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪বছর বয়সী বিশ্বের মোট নারীর ৪৫ ভাগই অর্থনৈতিক ভাবে স্বক্রিয়।
অন্যদিকে দেশে রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পোশাকশিল্পের ৮০ ভাগই নারী শ্রমিকদের দখলে।
তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। 
তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ক্রমশ কমছে,এ থেকে বুঝা যায় শ্রমমর্যাদায় নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান কতটা পিছিয়ে।

৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি নিয়ে মে দিবস এলেও নারীদের অদৃশ্য ও গৃহস্থালি শ্রমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, নেই কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের সুযোগ। সমতার ভিত্তিতে মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মে দিবসের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব। তা না হলে উৎসবের এই দিনটি নারী শ্রমিকদের কাছে কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি পাতা হয়েই রয়ে যাবে।