banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 126 বার পঠিত

 

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব: সতর্কতার সময় এখনই

বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম-এ আক্রান্তের সংখ্যা। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসজনিত রোগ ইতোমধ্যেই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি “নীরব সংকট” হিসেবে দেখছেন।

সংক্রমণ পরিস্থিতি: দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনের বাস্তবতা

হাম এমন একটি ভাইরাস, যার সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি আশপাশের প্রায় ৯০ শতাংশ অনটিকাপ্রাপ্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমানে দেশের অন্তত ১০টির বেশি জেলায় এই রোগ প্রকট আকার ধারণ করেছে, এবং প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা প্রাদুর্ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর, স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব এবং পুষ্টিহীনতা একত্রে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

কেন বাড়ছে হাম?
এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট কারণ কাজ করছে:

১. টিকাদানের ঘাটতি
সবচেয়ে বড় কারণ হলো নিয়মিত টিকা না নেওয়া। Expanded Programme on Immunization-এর আওতায় থাকলেও অনেক শিশু সম্পূর্ণ ডোজ পায় না, ফলে তারা ঝুঁকিতে থেকে যায়।
২. অপুষ্টি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
অপুষ্ট শিশুর শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে পারে না। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি হামের জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।
৩. বুকের দুধ কম খাওয়ানো
শিশুর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের দুধের ওপর। এই জায়গায় ঘাটতি থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
৪. কৃমিনাশক ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব
নিয়মিত কৃমিনাশক না খাওয়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

যেভাবে ছড়ায় হাম: বিপজ্জনক সংক্রমণ চক্র

হামের ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণাগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেগুলো প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
সংক্রমণের প্রধান মাধ্যমগুলো হলো-
আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা।
কাশি-হাঁচির মাধ্যমে বায়ুবাহিত ফোঁটা।
দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করে চোখ, নাক বা মুখে হাত দেওয়া।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই একজন ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে।

লক্ষণ ও জটিলতা
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০–১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রথমদিকে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো মনে হলেও দ্রুত তা জটিল রূপ নেয়।

প্রাথমিক লক্ষণ-
উচ্চ জ্বর (১০৪°F পর্যন্ত)
সর্দি, কাশি
চোখ লাল হওয়া
মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)

পরবর্তী পর্যায়-
কানের পেছন থেকে শুরু হওয়া লালচে ফুসকুড়ি
পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়া র‍্যাশ
তীব্র দুর্বলতা ও জ্বরের পুনরাবৃত্তি
জটিল অবস্থায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

মৃত্যুঝুঁকি: সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ছিল:
টিকাবঞ্চিত
অপুষ্টিতে ভোগা
বয়সে ছোট (৫ বছরের নিচে)

এটা সরাসরি প্রমাণ করে—হাম নিজে যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি মারাত্মক হয়ে ওঠে যখন শরীর দুর্বল থাকে।

প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর পথ
এখন পর্যন্ত হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
যা করতেই হবে-
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা
শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া
পুষ্টিকর খাবার ও বুকের দুধ নিশ্চিত করা
আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখা

একটা ব্যাপার পরিষ্কার—এই প্রাদুর্ভাব “হঠাৎ” হয়নি। এটা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁক, অভিভাবকদের অবহেলা এবং সচেতনতার ঘাটতির সরাসরি ফল। যদি এখনই কঠোরভাবে টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানো না হয়, তাহলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এটা নিশ্চিত।
এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—অবহেলা করবেন, নাকি প্রতিরোধ করবেন।

Facebook Comments Box