শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

Daily Archives: February 23, 2018

 

ইতিবাচক স্বীকৃতির গুরুত্ব

মল্লিকা দে


মানুষ হিসেবে আমাদের ভিতর এক ধরনের সংকীর্ণতা আছে। পারিবারিক- ভাবে চর্চার অভাব, হিংসা বা অন্য কোন কারণেই হোক, আমরা অন্যের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করি। বরং অন্যের দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা করতেই বেশী পছন্দ করি।

উদাহরণ: মা-বাবা, সন্তান কোন ভাল কাজ করলে তার প্রশংসা খুব কমই করেন কিন্তু খারাপ কাজ করলে তাকে শাস্তি ঠিকই দেন সঙ্গে সঙ্গে। এক্ষেত্রে অধিকাংশ মা-বাবার ধারনা, বেশী প্রশংসা করলে সন্তান বিগড়ে যেতে পারে।

আবার অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও তার অধঃস্তন কর্মচারীকে সহজে প্রশংসা করতে চান না। কারণ তাদের ধারনা এতে করে কর্মচারীর অহমবোধ বেড়ে যেতে পারে।

এমনকি যে মা, সারাদিন ঘরের কাজ করেন, খাবার তৈরী করেন, সন্তানদের মানুষ করার গুরু দায়িত্ব পালন করেন, তাকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দেয়া হয় না।

আবার প্রেমের শুরুতে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মাঝে স্বীকৃতির আদান প্রদান বা প্রশংসা করার প্রবনতা খুব বেশী থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে এগুলো আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে এবং একটা সময় গিয়ে একেবারেই থাকে না। আর এ থেকেই মান-অভিমান এবং ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়। পরিশেষে ব্রেক-আপ বা ডিভোর্স।

সাইকিয়াট্রিস্ট এরিক বার্ণ’ মানুষের ছয় ধরনের মানসিক ক্ষুধার কথা বলেছেন। এদের ভিতর ‘স্বীকৃতির ক্ষুধা’ অন্যতম। কারণ আমরা শুধুমাত্র ব্যক্তি হিসেবেই নয়, আমাদের প্রত্যেক কাজের জন্যও মনে মনে অন্যের ‘স্বীকৃতি’ আশা করি। কাজটি যত ছোটই হোক বা বড়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ‘স্বীকৃতি’ বলতে আসলে কি বোঝায়?
‘স্বীকৃতি’ বলতে বোঝায় কোন ব্যক্তির তার নিজের প্রতি এবং অন্য কোন ব্যক্তি তার প্রতি বা তার কোন কাজের প্রতি যে মূল্যায়ন করে তাকে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে ‘স্ট্রোক’ বলে। আর এই স্বীকৃতির আদান-প্রদান ঘটে যখন ব্যক্তি নিজেই নিজের সাথে কথা বলে অথবা অন্য ব্যক্তির সাথে কথা বলে।

‘স্বীকৃতি’ আবার কয়েক ধরনের হতে পারে,

বাচনিক-অবাচনিক,ইতিবাচক-নেতিবাচক,শর্তযুক্ত-শর্তহীন।

আমাদের সমাজে ‘নেতিবাচক স্বীকৃতির’ পরিমানই বেশি। উপরের উদাহরণগুলো থেকে এটাই বোঝা যায়। কিন্তু নেতিবাচক স্বীকৃতির তুলনায় ইতিবাচক স্বীকৃতির গুরুত্ব বেশি।

‘ইতিবাচক স্বীকৃতি’ পেলে আমাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়, কাজ করার আগ্রহ বেড়ে যায়, মনে সন্তুষ্টি আসে।

অপরদিকে ‘নেতিবাচক স্বীকৃতি’ আমাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা তৈরী করে, কাজ করার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, জীবন সম্পর্কে হতাশা সৃষ্টি হয়।

তবে মানুষ যেহেতু স্বীকৃতির কাঙ্গাল, তাই অনেক সময় স্বীকৃতিহীন জীবনের চেয়ে, নেতিবাচক স্বীকৃতিও ভাল। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, ‘কোন ব্যক্তির নেতিবাচক কাজের জন্যও কি ইতিবাচক স্বীকৃতি দেব?
তবে উত্তর হবে অবশ্যই ‘না’।

কিন্তু আমাদের ভিতর ইতিবাচক স্বীকৃতি দেয়ার প্রবনতা বাড়াতে হবে। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তিরই তার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন পাওয়ার অধিকার রাখেন। এমনকি যে রিক্সাওয়ালা আপনাকে নিজের রিক্সায় বহন করে বাড়ি পৌছিয়ে দেন, তাকেও আপনি একটা ধন্যবাদ দিতে পারেন। এতে করে খুব বেশি সময় নষ্ট হবে না কিন্তু সে তার কাজের স্বীকৃতি পাবে।

মাঝে মাঝে আপনি আপনার সন্তানকেও আলিঙ্গন করতে পারেন, তার ছোট ছোট কাজের প্রশংসা করতে পারেন।

আর আপনি যদি অফিসের বস বা শিক্ষক হন, তবে আপনি আপনার কর্মচারীর বা ছাত্র-ছাত্রীর ভাল দিকগুলোর প্রশংসা করতে পারেন। এতে করে তাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হবে এবং যে ছাত্র বা ছাত্রী একসময় ক্লাসে কথাই বলতো না, তারাও আগ্রহ নিয়ে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবে। শুধুমাত্র প্রশংসাই নয়, অনেক সময় আপনার ছোট্ট একটা হাসিও অন্যের কাছে স্বীকৃতি হতে পারে।

কাজেই মন খুলে অন্যকে ইতিবাচক স্বীকৃতি দিন। তাহলে আপনিও দিনশেষে ইতিবাচক স্বীকৃতির ঝুড়ি নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ঘুমোতে যেতে পারবেন। পরিবারের ভিতরেও ছোট-বড় সবাইকে যার যার কাজের স্বীকৃতি দিন। সে কাজ যত ছোটই হোক না কেন।

আর কেউ যদি আপনাকে কোন স্বীকৃতি না দেয়, তবে মনে মনে ক্ষোভ না জমিয়ে, নিজেই নিজের কাজের স্বীকৃতি দিন, নিজের প্রশংসা করুন। কারণ, অনেক সময় কেউ ঢ়াক না বাজালে, নিজের ঢ়াক নিজেই বাজাতে হয়।

উপস্থাপনায়
মল্লিকা দে
প্রভাষক
মনোবিজ্ঞান বিভাগ
আই,ইউ,বি,এ,টি বিশ্ববিদ্যালয়
উত্তরা, ঢাকা।