banner

মঙ্গলবার, ২১ Jul ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 2152 বার পঠিত

 

পৃথিবী বিখ্যাত ৫ জন নার্স

বর্তমান বিশ্বে নার্সিং বিষয়ে পড়াশুনা করাটা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে  উঠছে এবং নার্সিং পেশার চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জনের জন্য কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। নার্সিং পেশাটি যে সত্যিই মূল্যবান তা উনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে স্বীকৃত ছিলো না যতক্ষণ না কিছু অসাধারণ ব্যক্তি বিশেষ করে  মহিলারা আহত ও অসুস্থ মানুষের সেবা করার জন্য এই পথটি বেছে নেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরেই নার্সের অবস্থান। পৃথিবী বিখ্যাত এমন কিছু নার্স বা  সেবিকাদের কথাই আজ আমরা জেনে নেই আসুন যারা নার্সিং পেশার ক্ষেত্রটিকেই পরিবর্তন করে দিয়েছেন।

 

১। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল
১৮২০ সালের ১২ই মে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ছোটবেলা থেকেই নার্সিং এর প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিলো। কিন্তু তাঁর পিতামাতা তাকে এই বিষয়ে শিক্ষা দিতে অসম্মতি জানান। কারণ তখন এটি তেমন কোন মূল্যবান পেশা ছিলোনা। অবশেষে তাঁর পিতামাতা তাঁর ইচ্ছা পূরণের জন্য অনুমতি দেন। ১৮৫১ সালে তিনি নার্সিং এর উপর তিন মাসের প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণের জন্য জার্মানিতে যান। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন “জেন্টল ওমেন” হিসেবে। কিছুদিন পর ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়। নাইটিংগেল তখন নার্সদের একটি দলকে প্রশিক্ষণ দেন যারা তুরস্কের সামরিক হাসপাতালে যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবা শুশ্রূষা করেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তিনি লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে “নাইটিংগেল ট্রেইনিং স্কুল ফর নার্সিং” প্রতিষ্ঠা করেন যা বিশ্বে মহিলাদের প্রথম নার্সিং স্কুল। এইখান থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ইংল্যান্ডের সব হাসপাতালে নার্সদের পাঠানো হত।  ১৮৬০ সালে নাইটিংগেল নার্সিং প্রশিক্ষণের তত্ত্ব বা মতবাদ প্রকাশ করেন যা ব্যপক  প্রভাব বিস্তার করে। সেই বইটিতে তিনি স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগ, সামরিক স্বাস্থ্য এমনকি হাসপাতালের পরিকল্পনার বিষয়েও আলোচনা করেন যা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় এখনও অনুসরণ করা হয়।
২। কারলা বারটন
ইতিহাসের পরিচিত ব্যক্তিত্ব কারলা বারটন। তিনি ১০ বছর বয়সেই সেবার কাজ শুরু করেছিলেন তাঁর বড় ভাইয়ের শুশ্রূষা করার মাধ্যমে। ১৫ বছর বয়সে সুশিক্ষিতা কারলা পাশের স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৮৫৩ সালে তিনি আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে প্যাটেন্ট অফিসে অনুলিপিকর হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬১ সালে যখন আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি সেবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন। যুদ্ধের সময়ে তিনি একজন পুরুষের মতই সম্মুখে থেকে কাজ করেছেন। ১৮৭৭ সালে তিনি আমেরিকাতে রেডক্রসের প্রথম শাখার প্রস্তাব করেন। ১৮৮১ সালে আমেরিকান রেডক্রসের সভাপতি মনোনিত হন। রেডক্রসের কর্মী হিসেবে তিনি প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট অনেক দুর্যোগে আহত মানুষের সেবা করেছেন ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত।
৩। মারগারেট সেঙ্গার  
১৮৭৯ সালে জন্ম গ্রহণ কারা মারগারেট সেঙ্গার খুবই সাহসী নারী ছিলেন। ১৮ তম গর্ভধারণের ফলে তাঁর মায়ের মৃত্যু তাকে নার্সের পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তিনি গর্ভবতী মহিলাদের সেবার ক্ষেত্রে হয়ে উঠেন বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯০০সালে নিউইয়র্কের হোয়াইট প্লেইন হাসপাতালে নাসিং এর উপর পড়াশুনার জন্য ভর্তি হন। তিনি মহিলাদের স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলার জন্য “হোয়াট এভরি গার্ল শুড নো” শিরোনামে আর্টিকেল লিখেন দ্যা নিউ ইয়র্ক কল পত্রিকায়। ১৯১৬ সালে তিনি আমেরিকাতে প্রথম বার্থ কন্ট্রোল ক্লিনিক খুলেন। কিছুদিন পরেই সেঙ্গার এবং তাঁর স্টাফদের গ্রেফতার করা হয় যার ফলে বার্থ কন্ট্রোলের বিষয়টি জনসম্মুখে চলে আসে এবং তিনি একদল সমর্থক পেয়ে যান। অবশেষে সেঙ্গার ও আমেরিকান বার্থ কন্ট্রোল লীগ “ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ব্যুরো” নামে প্রথম বার্থ কন্ট্রোল ক্লিনিক স্থাপন করেন ১৯২১ সালে। তিনি তাঁর লেখা অব্যাহত রাখেন এবং “মাই ফাইট ফর বার্থ কন্ট্রোল এন্ড মারগারেট সেঙ্গার” নামের আত্মজীবনী লিখেন।
৪। মেরী ব্রেকেনরিজ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার এক্সপেডিশনারি ফোরসে কাজ করতেন। তিনি মারগারেটের চেয়ে ভিন্ন ভাবে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি ইউরোপিয়ান ধাত্রীদের সাথে দেখা করেন এবং উপলব্ধি করেন যে তাঁদের পদ্ধতি মার্কিন মূলকের প্রত্যন্ত অংশে বসবাসকারী মহিলাদের প্রয়োজন পূরণে সক্ষম। তিনি ঘোড়ার পিঠে চড়ে উত্তর আমেরিকার অ্যাল্পাইন অঞ্চলের গর্ভবতী মহিলাদের জন্মপূর্ব ও জন্মকালীন সেবা প্রদান করতেন। এর জন্য তিনি রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী পারিশ্রমিক নিতেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেক নার্স এই কাজ শুরু করেন। কেন্টাকির নার্সিং পরিষেবা কেন্দ্র এখনও এই কাজ করছে।
৫। মেরী এলিজা মাহনি
মেরী এলিজা মাহনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা যিনি কখনোই না বলতেন না। তিনি প্রথম রেজিস্টার্ড আফ্রিকান আমেরিকান নার্স। তিনি নিউ ইংল্যান্ড হসপিটাল ফর ওমেন এন্ড চিলড্রেন এ ১৫ বছর কাজ করেন এর নার্সিং স্কুলে ভর্তি হওয়ার পূর্বে। তিনি ১৯০৫ সালে গ্র্যাজুয়েট হন এবং একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত প্রাইভেট কেয়ার নার্স হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। কৃষ্ণাঙ্গ নার্সদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা দেয়ার জন্য তিনি সব সময় চেষ্টা করে গেছেন। তিনি বর্তমানের আমেরিকান নার্স এ্যাসোসিয়েশনে জয়েন করেন। তিনি বোস্টনের প্রথম মহিলা যিনি ভোটের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন ১৯২০ সালে।
নার্স বা সেবিকারা শুধুমাত্র হাসপাতালের রোগীদের সেবাই করেন না তারা বিশ্ব ব্যাপী অনগ্রসর মানুষের সহায়তায়ও কাজ করেন। সমাজের উন্নতির জন্য বর্তমানে এইচআইভি সংকট মোকাবিলায় অথবা জনবহুল বিশ্বে ক্রমবর্ধমান নগরায়নের কুফল  অথবা দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাওয়ার পানির মাধ্যমে রোগের বিস্তারের ক্ষেত্রে কাজ করছেন অনেক সেবিকারা। ভবিষ্যতে যারা এই মহীয়সী নারীদের মতোই ইতিহাসে নাম রেখে যাবেন।
লিখেছেন- সাবেরা খাতুন
Facebook Comments Box