ধ্রুপদী আধুনিকতার শেষ।
উত্তর আধুনিকতার সূর্য তখন মধ্য গগণে।
আমরা উপনিবেশিত চোখের বিস্ময়ে দেখছি সাম্রাজ্যবাদের লাস্যময়ী রূপ আর পাশ্চাত্য সভ্যতার বাহারী লাবণ্য।
নিয়ন বাতির আলোয় ম্লান হয়ে উঠেছে চাঁদের জ্যোৎস্না।চারদিকে তার শৌর্যের গরিমা।
নারীর জন্য শৃঙ্খলের নাগপাশ মুক্ত উন্মুক্ত পৃথিবী।যেন নারীর ইচ্ছার স্বাধীনতা আর অথরিটির একমাত্র রক্ষক তারা।আমাদের উপনিবেশিত চোখ যেন সেখানেই খুঁজে ফিরছে মুক্তির নিয়তি।
২৩মে,১৯৩৪ সাল।
নিউইয়র্ক শহর,বস্তুনগর আর অর্থের ঈশ্বরী।
পাশ্চাত্য সভ্যতার সবটুকু ধারণ করে সেখানে তখন গতির গরিমা আর নারীবাদের জয়জয়কার।
এখানেই এক সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মার্গারেট মার্কোস।
তবে ইতিহাসের পাতায় তিনি মরিয়ম জামিলা নামে আপন মহিমায় পদচিহ্ন এঁকেছিলেন।
সংবেদনশীল হৃদয় আর দৃষ্টির অতিরিক্ত মহাকাশ দেখতে পাওয়া মার্গারেট তরুণ বয়সেই দেখতে পান সুতনু সভ্যতার আসল রূপ।
দেখেন সভ্যতার পুঁজির অরণ্যে আর নারীবাদের অলিন্দে সতীত্ব আর আব্রু বিক্রি হচ্ছে লালসার দামে।
নারীকে মুক্তি দেবে বলে তার নারীত্ব কে আলাদা করে পণ্যের পসরা সাজাতে ব্যস্ত নারীবাদ।
নারীর মুক্তিদূতের পায়ের তলে জীবনের কাতরানি।
বস্তুবাদ আর ভোগবাদের নিয়ন্ত্রণহীন আকাঙ্খা জীবনবোধ ও হৃদয়কে উপেক্ষা করে সাম্রাজ্যবাদের শিবির গড়ছে।
খুব ছোটবেলায় তিনি জীবনের মূল্য নির্ধারণে সভ্যতার নির্লজ্জ মানসের সাথে পরিচিত হন।
শৈশবের কোমল হৃদয় আর দৃষ্টির প্রখরতায় তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি করা অনাচার দেখতে পান।প্রতিবাদে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম।
মাত্র বারো বছর বয়সে এক ফিলিস্তিনি শরণার্থীর জীবন নিয়ে লেখেন প্রথম উপন্যাস।
“আহমদ খলিল:দ্য স্টোরি অফ আ প্যালেস্টাইন রিফিউজি অ্যান্ড হিজ ফ্যামিলি”।
পেন্সিল স্কেস আর রঙিন অঙ্কনে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ফিলিস্তিনি শরণার্থী আহমদ খলিলের বর্ণহীন জীবন।
অবাধ স্বাধীনতা আর মুক্ত চিন্তার পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকেন তিনি।নিউইয়র্কের সেরা স্কুল আর নারীবাদ প্রতিষ্ঠিত সমাজেও তিনি খুঁজে ফিরছিলেন প্রকৃত জীবনানুভূতি আর জীবনের মূল্য।
নাস্তিক্যবাদী প্রাণহীন পরিবেশ, আধুনিক সভ্যতার নামে ক্ষমতার লালসায় বিরামহীন দ্বন্দ্ব আর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চাতুর্যের কোলাহলে তার কৈশোর আর যৌবনের সকল চপলতা চাঁপা পড়ে গিয়েছিল।
এই অবিশ্বাসের মাঝে বেড়ে উঠতে গিয়ে তিনি সত্যের সন্ধানে ধর্ম, দর্শন,ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে একাগ্র অধ্যায়ণ শুরু করেন।
আরব ও ইহুদিদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূত্র ধরে ইসলামকে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
নিউইয়র্কের পাবলিক লাইব্রেরি হয়ে ওঠে তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
ইতিহাসের কন্দরে কন্দরে দেখতে পান ইহুদিদের মুনাফেকী আর শঠতা।
যখন স্পেনে খৃস্টান ভিসিগথদের অত্যাচার আর নিষ্পেষণে ইহুদিদের প্রাণ ওষ্ঠাগত তখন
তারিক বিন যিয়াদ ইসলামের সুমহান শাসন নিয়ে স্পেনে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করেন।
তিনি ইহুদিদের করের বিনিময়ে নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেন।
মুসলিম শাসনের অধীনে ইহুদিরা দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতন থেকে নিস্তার লাভ করে।
কর্ডোভা এবং টোলেডোর মতো শহরগুলো ইহুদি সংস্কৃতি, জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কর্ডোভার খলিফা আব্দুর রহমান (তৃতীয়) এর উপদেষ্টা হাসদাই ইবনে শাপ্রুত-এর মতো ইহুদিরা উচ্চপদস্থ পদে অধিষ্ঠিত হয়।
আরব ইসলামী সভ্যতার এই মহানুভবতা হিব্রু সংস্কৃতিকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিয়েছিল।
তাই ১৯৪৮ সালে যখন ইহুদিরা শরণার্থীবেশে ফিলিস্তিনে আসে।
তখন তিনি মনে করেন আরব-ইহুদীদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূত্র ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্যেই ইহুদীরা ফিলিস্তিনে ফিরে যাচ্ছে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের স্বর্ণযুগ তৈরীতে ইহুদি ও আরব মুসলিমদের পারস্পরিক সহযোগিতার আকাঙ্খার বিপরীতে দেখতে পান অকৃতজ্ঞতা আর ষড়যন্ত্রের ইতিহাস।আরবদের বদান্যতার প্রতিদানে ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা,দখলদারিত্ব আর সাম্রাজ্যেবাদী মনোভবে থমকে যান মরিয়ম জামিলাহ,স্বভাবতই নিজ ধর্মের প্রতি তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন।
মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকথলের বিখ্যাত আল কুরআনের অনুবাদ গ্রন্থ The meaning of glorious Koran এবং মুহাম্মাদ আসাদের The road to Mecca এবং Islam at the cross roads গ্রন্থ তাঁকে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে প্রত্যয়ী করে তোলে।
ইসলাম গ্রহণ উত্তর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার শংকা কোমলপ্রাণ মরিয়মকে বিচলিত করে তুলেছিল।
১৯৫৩ সালে তীব্র মানসিক চাপে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ দুই-তিন বছর হাসপাতালের বিছানায় থেকে আর ব্যাপক পড়াশুনার ফলে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিজস্ব সত্তায় এক নতুন বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেন।সৃষ্টিশীল লেখা আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অনবদ্য বৈশিষ্ট্য।
দীর্ঘ অধ্যয়ন ও মানসিক সংগ্রামের পর ১৯৬১ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রুক লাইনের ইসলামী মিশনের ওস্তাদ শায়েখ দাউদ আহমদ ফয়সালের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।আনুষ্ঠানিকভাবে মার্গারেট মার্কোস থেকে তিনি মরিয়ম জামিলা হন।
ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামী জীবনাচরণের দর্শনকে গভীরভাবে জানতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলেমদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন।
আলজিরিয়ার আলেমদের নেতা মরহুম শেখ ইব্রাহিমী, ওয়াশিংটন ডি সি’র তখনকার ইসলাম কেন্দ্রের পরিচালক ডঃ মাহমুদ এফ হোবাল্লা, আল আজহার-এর ডঃ মুহাম্মদ এল বাহাই, প্যারিসের ডঃ হামিদুল্লাহ, জেনেভা ইসলামী কেন্দ্রের পরিচালক ডঃ সৈয়দ রমজান এবং
এরই ধারাবাহিকতায় সমকালীন শ্রেষ্ঠ আলিম সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী (র)এর সাথে তার পত্রালাপ শুরু হয়।
দীর্ঘ দেড় বছরের পত্রালাপ শেষে ১৯৬২সালের এক বসন্তে মাওলানা মওদূদী(র)’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি পাকিস্তান আসেন।মাওলানা মওদূদী(র)’র পরিবারে একজন সদস্য হয়ে থাকতে শুরু করেন।এখানেই তিনি খুব কাছ থেকে ইসলামী পরিবেশ,মুসলমানদের সম্মিলিত জীবনাচরণ দেখতে পান।
একবছর পর জামায়াতে ইসলামী,পাকিস্তানের সার্বক্ষণিক নিষ্ঠাবান কর্মী মুহাম্মদ ইউসুফ খানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
বিবাহিত জীবনে চার সন্তানের জননী মরিয়ম জামিলা সফলতার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্যকর্মের প্রয়াস চালিয়েছেন।তাঁর সকল সাহিত্য সম্পাদনা ও প্রকাশের দায়িত্ব মমত্বের সাথে পালন করেন স্বামী মুহাম্মদ ইউসুফ খান।
কিশোর বেলা থেকে শিল্পচর্চায় আগ্রহী মরিয়ম জামিলা কেন বেছে নিয়েছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সংগ্রাম?
কোন সে উপলব্ধি যা ত্রিশের অধিক বই লেখার প্রেরণা?
কারণ মরিয়ম জামিলা দেখেছিলেন আধুনিক সভ্যতা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আর বিজ্ঞানের অগ্রগতির আড়ালে পর্যায় ক্রমে ঐশ্বরিক শক্তির অধিকার চায়।কিন্তু তার প্রান্তিকতা আর ভারসাম্যহীনতা মানব প্রকৃতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
আধুনিকতা মূলত সাম্রাজ্যবাদ,জাতীয়তাবাদ আর সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কমিউনিজম,সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ,প্রয়োগবাদ অথবা নারীবাদ এ সব কিছুর ছদ্নাবরণে হাজির হয়েছে।
এ সব মানব রচিত মতবাদ হল সাম্রাজ্যবাদের সেই প্রজেক্ট যার গর্ভে ডালপালা মেলে শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ।যার প্রভাব বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতিতে গালাগালি,ঘৃণাচর্চা প্রতিষ্ঠা করে সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু ইত্যাদি নানা বিভাজনে মানব সমাজকে বিভক্ত করছে।
‘ইসলাম ও আধুনিকতা’ নামক শিরোনামের লেখায় তিনি কর্ম ও জীবনের সমন্বয়ে ভারসাম্য পূর্ণ ইসলামকে পূর্ণ বলিষ্ঠতায় উচ্চারণ করেছেন পাশ্চাত্য সভ্যতার বিপরীতে।
তিনি দেখিয়েছেন আধুনিকতা প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ও তাঁর সকল আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক দূর্লঙ্ঘ বিদ্রোহ মাত্র।
আধুনিক মতাদর্শের বৈশিষ্ট্যই হল শুধুমাত্র মানবপূঁজা।যা একশ্রেণীকে ক্ষমতা আর ভোগের সুবিধা দিচ্ছে।অন্য একটি শ্রেণীকে শোষিত ও বঞ্চিত করছে। জবাবদিহিতার অনুভূতিমুক্ত আর পরকালীন জীবনের অস্বীকার চেতনা ব্যক্তিগত ও সমাজিক জীবনে নৈতিক বিপর্যয় নামিয়ে আনছে।
অপরদিকে ‘ইসলাম ও আধুনিক মুসলিম নারী’ বিষয়ক লেখায় তিনি নারীবাদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।
পাশ্চাত্য তৃতীয় বিশ্বের যেমন:দক্ষিণ এশিয়া,আফ্রিকার মত মুসলিম সমাজের সব রকম রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক সকল সমস্যা একসাথে মিশ্রিত একটি মাত্র সমস্যায় চিহ্নিত করা হচ্ছে,দেখানো হচ্ছে যে সব সমস্যার কারণ ‘নারী শিক্ষার অভাব’।
মুসলিম সমাজের নারীর প্রতি অন্যায়ের আলাদা আলাদা ঘটনা একটা ছাঁচে ফেলে মুসলিম সমাজে ‘নারীর সংকট’ চিত্র আঁকা হচ্ছে।
আর ‘সংকটাপন্ন নারীর’ গল্প মুসলিম সমাজের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো হচ্ছে।
দেখানো হচ্ছে মুসলিম শাসন ব্যবস্থায় নারী শিক্ষা ও নিরাপত্তা সংকট আর এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ পশ্চিম নির্মিত ন্যারেটিভ ‘নারীবাদ’।
এই চিত্র আমরা পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই,আফগানিস্তানের মুখতার মেই অথবা সুলতানাদের ঘিরে পশ্চিমা মিডিয়ার চটকদার গল্পে দেখেছি। এই সকল
গল্পে দেখানো হচ্ছে মুসলিম শাসন নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে আর পশ্চিমারা তার একমাত্র রক্ষাকর্তা।
অথচ বাস্তবতা হলো, পশ্চিমের কাছে তৃতীয় বিশ্বের নারী শিক্ষা কেবল নারীকে শ্রমিক আর ভোগের পণ্য বানাবার সিঁড়ি মাত্র।
আধুনিক ও অগ্রসর নারীর পরিচয়ের একমাত্র ছাঁচ তৈরি করা হয়েছে খোলামেলা পোশাক,দৈহিক সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, এক পুরুষে পরিবারে সংযুক্ত না থেকে বহু পুরুষের ভোগ্য পণ্যে আর শিল্পচর্চার নামে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার মানসিকতাকে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে এই বয়ানকে এতটাই শক্তিশালী করা হয়েছে যে,
হিজাব পরিহিতা, শালীন নম্র কোন নারী প্রগতিশীল ও আধুনিক হতে পারছে না,তারা যতই শিক্ষিত,জ্ঞানী,বুদ্ধিমান ও কর্মদক্ষ হোক না কেন।
পশ্চিমা নারীবাদ ছদ্নাবরণে সাম্রাজ্যেবাদ আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রজেক্ট মাত্র।
পশ্চিমের এই চেহারা উন্মোচনের পাশাপাশি মুসলিম দুনিয়ায় পশ্চিমা নারীবাদের ধারণা প্রবেশ করাতে মিশরের লেখক ও বুদ্ধিজীবী কাসিম আমিনের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
যিনি তার বই ‘তাহরির আল মারা’ যা ‘দ্যা নিউ ওম্যান’ নামে মুসলিম বিশ্বে নতুনত্বের ঝড় তুলেছিল তাকে একহাত নিয়েছেন ।
তিনি দেখিয়েছেন কাসিম আমিনরা ইসলামের প্রকৃতাবস্থা তুলে ধরার চেয়ে একে পশ্চিমাকরণের আগ্রহ বেশি।
মুসলিম মেয়েদের হিজাব খুলে স্কার্ট পরানোতেই তাদের মনোযোগ।
‘ইসলামিক ফেমিনিজম’ বলে যা তারা বাজারে আনতে চায়,তা মূলত মুসলিম নারীর প্রকৃত মূল্যবোধ যা ইসলামের নীতি ও আদর্শের প্রভাবে তৈরি হয় তার পরিপন্থী।
তবে তিনি পশ্চিমের নারীশিক্ষা ধারণার বিপরীতে মুসলিম সমাজের দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার সমালোচনা করেছেন।
মুসলিম সমাজের আলিম বা ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলোর পশ্চিমা নারীশিক্ষা ফর্মূলার মোকাবিলা করতে গিয়ে নারীশিক্ষা বিরোধী মানসিকতা লালন করছে আর অন্য অংশ যেমন:কাসিম আমিন,ফাতেমা মারনিসি ,আসমা বারলাসদের মত সেকুলার অংশ ইসলাম কে পশ্চিমা ছাঁচে ফেলে উপস্থাপনারও বিরুদ্ধে ।
বরং নারী সংকট মোকাবিলায় ইসলামের ইতিহাসের পূর্ণমূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা ও ইসলামী কাঠামোর আওতায় ব্যাখ্যার প্রতিনিধিত্বশীল রচনা ও উপস্থাপনায় গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায়ও ইসলামের নির্দেশনা মেনে নারী প্রশ্নের মোকাবেলা সম্ভব।
ইসলামই নারীর সত্যিকারের এজেন্সি,অথরিটি ও রাইটের একমাত্র রক্ষক।
অধিকতর বিনম্র এবং সুষ্ঠু জীবন ধারার স্থিতিশীলতা, বিকাশ ও পবিত্রতা রক্ষায় শুধুমাত্র ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
অপরদিকে পাশ্চাত্য
সম অধিকারবাদীদের প্রস্তাবিত অদ্বৈত-যৌনতার (Uni-sexual) সমাজ হচ্ছে এমন একটি সমাজ যেখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই এবং সে সমাজটি এমন একটি সমাজ যেখানে বিবাহ, সংসার ও পরিবার, লজ্জা, সতীত্ব ও মাতৃত্ব ঘৃণিত বিষয় এবং এগুলো ‘প্রগতি’ ও ‘স্বাধীনতার’ পরিচায়ক নয় বরং চরম অধঃপতনের কারণ বলেই বিবেচিত। এর ফলাফল হলো নির্ভেজাল অরাজকতা, সীমাহীন বিশৃঙ্খলা ও সম্পূর্ণ সামাজিক অব্যবস্থা আর নৈতিক অবক্ষয়।
তবে তিনি পশ্চিমে জন্ম নেওয়া নারীবাদ কেন মুসলিম সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।ইসলাম যখন শক্তিশালী আর বিজয়ী বেশে বিরাজমান ছিল তখন সেখানে অন্য কোন মতবাদের প্রয়োজন ছিল না।
কিন্তু ইসলাম যখন রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্বল হতে শুরু করল পুরুষরা ইসলামের বড় অংশকে ছেড়ে দিয়ে নারীদের ক্ষেত্রে ইসলামকে চাপিয়ে দিতে চাইল তখনই নারীবাদ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করতে পারল।
বুর্জোয়া মানসিকতা আর পুঁজিবাদী লাইফস্টাইল ধারণের বাসনা, পুরুষতান্ত্রিকতাকে ইসলাম দিয়ে হালাল করা ইত্যাদি মূলত এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে ইসলাম ও নারীবাদকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে ।
নারীকে ইসলাম যে মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে নারীবাদ আপনাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
এছাড়া পশ্চিমা সমাজের বস্তুবাদ ব্যাক্তিস্বাধীতার অপব্যাখ্যা ,সাংস্কৃতিক অবক্ষয়,মুসলিম উম্মাহর জন্য জাতীয়তাবাদের ক্ষতির দিক চিহ্নিত করে পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন।
অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে তিনি মনে করতেন একমাত্র নৈতিক বিপ্লবই সম্পদের ন্যায্য বন্টন নিশ্চিত করতে পারে।
এছাড়া মুসলিম বিশ্বের চারিত্রিক অধঃপতনের জন্য মুসলিম ছদ্নাবরণে বিধর্মী আচারণের প্রতি ঝোঁককে দায়ী করেছেন। সাংস্কৃতিক দাসত্ব বরণের মানসিকতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্বের পথ তৈরির অন্যতম কারণ আখ্যায়িত করেছেন।
বিরোধীতা করেছেন প্রগতিবাদের।
যে প্রগতিবাদ মোস্তাফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে সাদরে বরণ করেছিল তা তুরস্কের জন্য শুধুমাত্র হতাশা উপহার দিয়েছে।
প্রগতিবাদ অপশ্চিমী জাতিসমূহকে হতাশ করার জন্যে একটি মনস্তাত্বিক হাতিয়ার মাত্র ।এতে শুধুমাত্র পশ্চিমা সাংস্কৃতিরই ভবিষ্যৎ রয়েছে।
ইসলামকে ‘যৌক্তিক’ ‘আধুনিক’ ‘বৈজ্ঞানিক’ ‘গতিশীল’ উদার’ ও ‘প্রগতিশীল’ করার নাম করে প্রগতিবাদের আড়ালে নতুন নতুন ব্যাখ্যা করে অমুসলিমদের তুষ্ট করার চেষ্টা ক্ষতিকর বলেছেন। বস্তুবাদী আদর্শের ছত্রছায়ায় ইসলামকে বর্তমান যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টা আত্মঘাতী।যার উদাহরণ-তুরস্ক,মিশর।
তবে পশ্চিমা সভ্যতা কেন বিজয়ী?
সংক্ষিপ্ত সময়ে সর্বোচ্চ ক্ষমতা, সম্পদ, আরাম-আয়েশ ও আনন্দ লাভের অদম্য সংকল্পই তাকে এ সাফল্য দিয়েছে।তবে এই লক্ষ্য অর্জনে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের কোন ভিত্তি নেই।
মানবিকতা,আধ্যাত্মিকতা,হৃদয়ের সুকুমার বৃত্তিকে উপেক্ষা করা হয়েছে । অপর কথায় পশ্চিমা জগত কি চায় তা জানতো এবং তা অর্জনের জন্যে কোন প্রচেষ্টাই তারা বাকী রাখেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভবিষ্যৎ জয়ের আত্মবিশ্বাস।
আমরা মুসলমানরা যদি ইসলামী আদর্শের শ্রেষ্ঠত্বে আত্মবিশ্বাসী হই তা বাস্তবায়নের জন্যে এক মন এক ধ্যানে আত্মনিয়োগ করি,তবে ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত।এজন্য ইসলামকে নয় বরং মুসলমানদের ঈমান আর নৈতিকতায় পূর্ণ হতে নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে ।
মরিয়ম জামিলার অসাধারণ প্রজ্ঞা, বলিষ্ঠ চেতনা, জ্ঞানের দূত্যি,ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের অবিচলতা,অসাধারণ কর্মদক্ষতা বিংশ শতাব্দীর অনন্য চরিত্র।
গত শতকে তার মত বিদূষী মুসলিম নারী বুদ্ধিজীবী ও কলম সৈনিক বিরল।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি লাহোরে বসবাস করছিলেন এবং ৩১ অক্টোবর ২০১২ সালে ইন্তেকাল করেন । পশ্চিমা সংস্কৃতি ত্যাগ করে ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের তিনি এক অনন্য উদাহরণ যা কিয়ামত পর্যন্ত পশ্চিমের তৈরি দর্শন-প্রকল্পকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শক্তিশালী প্রেরণা যোগাবে।


