শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

ব্রেকিং নিউজ :

 

মোনালিসার নীল স্মৃতি

ডা. সাকলায়েন রাসেল


মোনালিসা সর্বদা জানালার পাশেই বসে।
আজও তার ব্যতিক্রম হল না। পার্থক্য হল অন্যদিন সিটে বসা মাত্রই নানা কথা বলে। আজ মুখে শব্দ নেই। নিঃশব্দ আমিও। উদ্দেশ্য তার নিরবতাকে সমর্থন করা।
শাপলা চত্ত্বর ঘুরে গাড়ী তখন কলেজ রোডে। এ রোডের এক পাশেই মোনালিসার বাড়ী। যে বাড়ীতে কেটেছে তার শৈশবের সবটুকু। দ্রুত গাড়ীটা সেখানেই চলে এলো। সে রাস্তার ধারেই।
রাস্তাটির পাশে আসতেই মোনালিসা সিটের বাম দিকে ঘুরে বসল…জানালার কাঁচ বরাবর। জানালার পাশে রাস্তাটা বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে…দ্রুতই পার হয়ে যাচ্ছে সে রাস্তা। একটু একটু করে পিছনে সরে গেল সব কিছু।
ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল সে…
বিরাটাকার এক শূন্য দৃষ্টি নিয়ে…
যতক্ষণ পারা যায়…
ফ্যালফ্যাল করে…
এই রাস্তা ধরেই সোজা পূর্বে চলে গেছে মোনালিসাদের বাড়ী..
আমার স্ত্রীর বাবার বাড়ী…
আমার সন্তানের নানার বাড়ী…
আমার শ্বশুর বাড়ী!
গাড়ী এগিয়ে চলল আপন গতিতে… মোনালিসা বাড়ীর দিকে হাতটা উচু করে একটু নাড়াল…
হাতের ভাষায় বিদায়ের ছাপ…
যেন হাত দিয়ে আলিঙ্গন করল এক শূন্যতাকে…
এক অসীম শূন্যতা…
মুখে কিছু বলল না…
যেন সব কষ্ট গলায় এসে পথ হারিয়ে ফেলেছে…
আমি ঘাড়ে হাত রাখলাম। স্পর্শের ছোঁয়ায় নিরব স্বান্তনা..ও দ্রুত চোখ মুছে নিল।
আমার স্পষ্ট মনে আছে…
বিয়ের পরপরই বিসিএস পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করেছিল সে…
বর্তমান ঠিকানায় যখন রংপুরের এই বাড়ীর ঠিকানা দিচ্ছিল…
আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম…
“তুমি থাকছো আমাদের বাসায় আর বর্তমান ঠিকানা দিচ্ছো রংপুরের!”
সে কোন উত্তর দিল না…পরে একদিন জানাল,
দেখ, বিয়ে হল সবে কয়েক মাস…
ঐ বাড়ীটা যে আমার না সেটা মন থেকে মেনে নিতেও তো কিছু সময় লাগবে, তাই না?
আমার অবুঝ মন সেদিনই প্রথম বুঝতে পারল…
একজন মেয়ের ফেলে আসা নিজ বাড়ী আকড়ে ধরে রাখার এ আকুতি…
আমার মাকেও দেখেছি, যতবারই নানার বাড়ী থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা হতাম ততবারই কাঁদত… জোরে জোরেই কাঁদত!…
আমি অবাক হতাম! কি আছে এই বাড়িতে! এতো বড় হয়েছে তবুও কান্না শুকায় না!
এখন আর কাঁদে না মা…
কি জানি, হয়ত কাঁদে…
আমি সেটা দেখতে পাইনা…
শুনতে পাইনা…
আচ্ছা, কষ্টের কি শেষ আছে? নাকি কষ্ট শুধু রূপান্তরিত হয়? শব্দ কান্না থেকে বোবা কান্নায়? নাকি অশ্রুতেই কস্টের উত্তাপ কমে যায়?
কি আছে এই মেয়েটার বাবার বাড়িতে?
মোনালিসা প্রায়ই বলত, তার বাবার বাড়ীতে খালারা,মামারাসহ সব আত্মীয় স্বজনের সরব উপস্থিতি ছিল প্রায় প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ। এমন কোন দিন সে পায়নি যেদিন তারা এ বাড়িতে শুধু নিজেরাই থেকেছে !!
কিন্তু যেদিন হটাৎ করেই তার মা এ বাড়ি থেকে বিদায় নিল…
চলে গেল না ফেরার দেশে…
সেদিন থেকেই একে একে শেষ হতে লাগল এ বাড়ীর সব আয়োজন… যেন বিরাটাকার এক বটবৃক্ষ, প্রচন্ড এক ঝড়ে একে একে হারাতে বসেছে সব ডালপালা!…
হারাতে হারাতে আজ সে প্রায় শূন্য!
এখানে আজ আর জীবন নেই…নেই কোন আয়োজন…ছন্দ হারিয়ে থেমে গেছে তাই সব কবিতা!!
ছাদের দিকে তাকিয়ে মোনালিসা সেদিন বলল, দেখ ওই ছাদটার দিকে। এই বিছানায় যখনই শুইয়ে শুইয়ে পড়তাম.. দৃষ্টি পড়ত ঐ ছাদটার উপর..
কত বছর হল!!…
মা চলে গেল…একে একে সবাই চলে যাচ্ছি আপন ঠিকানায়…
আমি শিশু থেকে শিশুর মা হয়ে গেলাম… অথচ ছাদটায় কোন পরিবর্তন নাই… সেই আগের মতই আছে!
অথচ আজ থেকে এই বাড়ীটা কেবলই একটা স্মৃতি হতে বসেছে!! আমি চলে যাচ্ছি ঢাকায়, ভাইয়েরা হোস্টেলে, আর বাবা গ্রামের বাড়ীতে। আজ থেকে এটা কেবলই একটা পরিত্যক্ত স্মৃতি!
মোনালিসা ফ্যালফ্যালে ভেজা দৃষ্টিতে শূন্য পানে তাকিয়ে রইল…
হয়ত অসীম সেই শূন্যতার এক কোণে বসে মা দেখছেন সন্তানের এ স্মৃতিকাতরতা! আচ্ছা, মায়েরা কি সত্যি দেখেন। ওনাকে হারিয়ে প্রথম দিন মনে হয়েছিল জীবন থেকে একজন মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেললাম। আস্তে আস্তে মনে হল, জীবন থেকে আরেকটা জীবন ঝরে পড়েছে। আমরা সবাই তাই জীবনের ছন্দ হারিয়ে দিনকে দিন দিগ্বিদিক হয়ে যাচ্ছি। সামান্য শূন্যতা আজ তাই অসীমে রূপান্তরিত।
আমার ৯ বছরের বিবাহিত জীবনের নানা স্মৃতির প্রায় পুরোটাই এ বাড়ীটিকে ঘিরে… যদিও মাত্র দু’বছরেই ফিকে হয়ে গেছে স্বপ্নের ক্যানভাসের সব গুলো রং!..
আজ থেকেই হয়ত গল্প হয়ে গেল এ বাড়িটা!… যে গল্প শুধু নোনা জল ঝরাবে দুচোখ দিয়ে!
চাপা স্বভাবটা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না মোনালিসা…বিদায়ের আগ মুহুর্তে বলে বসল…
”খুব খারাপ লাগছে, কেন জানি মনে হচ্ছে এটাই শেষ, এ বাড়িতে আর ফিরে আসা হবে না কখনো”
বিদায় বেলা দৃষ্টি দিয়ে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিল সে পুরো বাড়ীটাতে!..কষ্টের তীব্রতার ঢেউ আছড়ে পড়ল আমার ললাটেও।
আমি শুধু মুখস্ত বুলিগুলো আওড়াতে লাগলাম…এটাই নিয়ম মোনালিসা, এভাবেই মানুষের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়… ভাঙ্গা স্বপ্নের টুকরা গুলো জোড়া লাগিয়ে সব কিছু আবার নতুন করে সাজাতে হয়… নতুন করে সাজানো তোমার এই স্বপ্নের আঙ্গিনায় হয়ত বীজ বুনবে আমাদের আরিবা… তারপর??
তারপর??
তারপর আবারো সেই ভাঙ্গা সুর…ভেঙ্গে যাবে সে মিলন মেলাও…
তখন হয়ত দৃশ্যপটে চলে আসবে নতুন কোন আরিবা!
রাত এখন চারটা…
বৃষ্টি ভেজা রাতে যমুনার বুকে চাঁদের মত বাঁকানো এই ব্রিজটাও কেমন জানি কেঁপে কেঁপে উঠছে। গাড়ি দ্রুতবেগেই ধেয়ে চলছে ঢাকার দিকে। অনেক হারিয়ে অনন্তের পথে ছুটে চলেছি আমরা দু’জন। আমি আর আমার মোনালিসা!
বিদায়..
বাড়ী নং —১৩৪
রোড নং —১/২
C/O মরহুমা নুরান্নাহার বেগম!!

সহকারী অধ্যাপক, ভাসকুলার সার্জারী
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, বারডেম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরও খবর