শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

ব্রেকিং নিউজ :

Monthly Archives: January 2018

 

চাইল্ড অ্যাবিউজ (চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ)

আফরোজা হাসান


চাইল্ড অ্যাবিউজ:

পৃথিবীর সব বাবা-মা’রাই সন্তানের ভালো চান। সন্তান যাতে ভালো হয় তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার।

শিশুদের বৈচিত্র্যতার চেয়েও বেশি দেখেছি বাবা-মাদের বৈচিত্র্যময় আদর-সোহাগ-ভালোবাসা এবং শাসন-শোষণ। জেনে বা না জেনে কিংবা বুঝে বা না বুঝে বাবা-মারা বাচ্চাদের উপর নানা ধরণের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন।

শারীরিক আঘাত চোখে দেখা যায় তাই পরবর্তীতে বাবা-মা তাতে মলম লাগাতে পারেন বা চেষ্টা করেন।

কিন্তু মানসিক আঘাত………!!!

এই আঘাতের কারণেই হয়তো শিশুদের মানসিকতার সঠিক বিকাশ বাধাঁপ্রাপ্ত হয়। কারণ বিভিন্ন ইন্দ্রীয়ের সাহায্যে শিশুরা বিভিন্ন বস্তুগত গুণাবলী ও ঘটনা সম্পর্কে ধারণা বা উপলব্ধি করতে শেখে।

আর এর উপর নির্ভর করেই শিশুদের মধ্যে জন্ম নেয় স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, বিচারবুদ্ধি ইত্যাদি।

আমার পরিচিত একটি বাচ্চা আছে।

১.বাচ্চাটা কোন কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারেনা,
২.স্থির হয়ে বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসতে পারে না,
৩.কোন কিছু করতে বললেও ঠিকমতো করতে পারেনা,
৪.একটুতেই রাগ করে-কান্না করে, ৫.বেখেয়ালি তাই খুব ভুল করে বা ভুলে যায়।

বাচ্চাটির বাবা-মাকে যদি পরামর্শ দেয়া হয় যে, ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান তারা দুজনই ভীষণ বিরক্ত হন বা রাগ করেন। মোটকথা তারা মানতেই রাজী না যে তাদের বাচ্চাটি এডিডি বা এটেনশন ডেফিসিট ডিজঅর্ডারের শিকার। কেউ বোঝাতে গেলে উল্টো তাদের সাথে মনোমালিন্য হয়। অথচ সন্তানের প্রতি তাদের ভালোবাসার কোন কমতি নেই। বাচ্চা যা চাইছে বলার সাথে সাথে তা সামনে এনে হাজির করেন। কিন্তু মানুষ বলবে যে তাদের বাচ্চাটা স্বাভাবিক না, সে ভয়তে বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিতে চায় না বা নিজেরাও মানতে চায়না।

প্রতিবেশী একজনকে দেখেছি বাচ্চা কিছু করতে না চাইলে, নানাভাবে ভয় দেখিয়ে সে কাজটি করতে বাধ্য করে। কেউ আছেন সারাক্ষণ টিভি চ্যানেল আর ফোনালাপ নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকেন যে, তখন বাচ্চা কথা বলতে চাইলে ধমক দিয়ে আরেক দিকে পাঠিয়ে দেন।

একজন মাকে দেখেছি বাংলাদেশ থেকে জালিবেত নিয়ে এসেছেন তার পাঁচ বছর বয়সি মেয়েকে শায়েস্তা করার জন্য। এক মা বুকফাটা কান্নার সাথে জানিয়েছিলেন, সাত বছর বয়সি ছেলেটাকে তাঁর স্বামী সামান্য কারণেই মাথায় তুলে সোফা বা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলেন, কখনো লাথি দেন আর বাকিটা নাহয় নাই বললাম।

যে কোন ধরণের আচার-ব্যবহার-কাজ যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বা ভালো থাকায় বাঁধা দেয়, তাকেই এককথায় চাইল্ড অ্যাবিউজ বলে।

চাইল্ড অ্যাবিউজকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে-

♠ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ বা যে কোন ধরণের নিয়ন্ত্রণহীন শারীরিক আঘাত।

♠সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ বা শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে যে কোন রকমের যৌন সংসর্গ।

♠বিহেবিয়ার অ্যাবিউজ বা শিশুর প্রতি অবহেলা-অমনোযোগিতা।

♠ইমোশনাল অ্যাবিউজ বা নানাভাবে শিশুকে বাধ্য করা।

এই প্রত্যেকটি কারণের দ্বারাই শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রত্যেকটি কারণ নিয়েই আলোচনা করবো।

চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ

চাইল্ড অ্যাবিউজ নিয়ে কথা বলছিলাম প্রতিবেশী কয়েকজন ভাবীর সাথে। সবাই চলে যাবার কিছুক্ষণ পর এক ভাবী ফিরে এলেন আবার। চেহারা দেখেই বুঝতে পারলাম কিছু বলতে চান। বেশ সময় নিলেন উনি নিজেকে গুছাতে তারপর বললেন, ভাবী আমি যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাসায় আমার দূর সম্পর্কের এক মামা থাকতেন। উনি আমাকে খুব আদর করতেন, জড়িয়ে ধরতেন……….!! এসব কি তাহলে অ্যাবিউজ ছিল? কিন্তু আমি তো তখন অনেক ছোট ছিলাম। মাত্র আট বছর বয়স ছিল আমার। বেশির ভাগ সময় আড়ালে করলেও, মাঝে মাঝে তো আব্বু-আম্মুর সামনেও আমাকে আদর করেছে মামা। উনারা তো কখনো কিছু বলেননি। বলেন না ভাবী আমি কি অ্যাবিউজের স্বীকার তাহলে? সংসার জীবনে খুব সুখী এই মেয়েটিকে সে যে অ্যাবিউজের স্বীকার ছিল, বুঝিয়ে বলতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু এখনো মেয়েটা সেসব ভেবে নীরবে কান্না করে।

ক্লাস টেনে পড়তাম তখনকার ঘটনা। আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীটা ছিল ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে আমুদে স্বভাবের। হঠাৎ করে একদিন ওকে ভীষণ চুপচাপ দেখে কি হয়েছে জানতে চাইলাম। অনেক করে জিজ্ঞেস করার পর বললো, দুই সপ্তাহ ধরে আমার আব্বুর এক বন্ধু আমাকে টিউশন দিচ্ছে। প্রথম থেকেই উনি যেন একটু কেমন। প্রথমে ড্রইংরুমে বসে পড়তাম কিন্তু উনি শুধু বেডরুমে বসে পড়লে পড়ায় মনোযোগ বেশি এমন নানা কথা আম্মুকে বললে, পড়ার সুবিধার কথা চিন্তা করে বেডরুমে পড়ার পারমিশন দিয়ে দিলেন আম্মু। তারপর থেকে উনি পড়ার ফাঁকে ফাঁকে নানা ধরণের নোংরা জোকস বলা শুরু করলেন। আর গতকাল আমাকে বললেন যে, তুমি এতো ঢেকেঢুকে বসো কেন? আরো একটু খোলামেলা হয়ে বসবে, এতে দেখতে সুবিধা হয়……..!! আমি এখনই কিছু না করলে লোকটা আরো সাহস পাবে। কিন্তু লজ্জার কারণে আব্বু-আম্মুকে বলতে পারছি না এসব কথা। পরে আমরা কয়েক বান্ধবী মিলে ওর আম্মুকে বলেছিলাম।

এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে আমাদের চারপাশে। বাবা-মার চোখের সামনে তাদের আদরের সন্তানটি অ্যাবিউজের স্বীকার হচ্ছে কিন্তু তারা বাঁধা দেয়া তো দূরে থাক টেরই পাচ্ছে না। বুক দিয়ে যাদের কাছ থেকে আগলে রাখার কথা সন্তানকে, অজ্ঞতার কারণে নিজেরাই ঠেলে দিচ্ছে তাদের কাছে। আর এই ধরণের ঘটনাগুলো বেশির ভাগই ঘটে ঘরের একান্ত কাছের আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা। যারা আদরের ছলে এমন সব বিকৃত কাজ করে, শিশুরা অস্বস্তিবোধ করলেও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যে এটা আদর নাকি অন্য কিছু। যার ফলে তারা কারো কাছে বিষয়টি জানায় না বা জানাতে যে হবে সেটাও বুঝতে পারে না।

ঘরের মানুষ ছাড়াও যারা শিশুদের কাছে আসার সুযোগ পায়, যেমন বাসার কাজের মানুষ, গৃহশিক্ষক, আশেপাশের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের কেউ, স্কুলের কেউ তাদের সবার ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

শিশু ছেলে হোক বা মেয়ে উভয়ই এই ধরণের অ্যাবিউজের স্বীকার হতে পারে।

আর এসব ঘটনা থেকে তাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে নানা ধরণের ছোট-বড় মানসিক সমস্যা, হীনমন্যতা, ব্যক্তিত্বহীনতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রভৃতি।

কেউ কেউ মারাত্মক কিংবা অপূরণীয় শারীরিক ক্ষতির স্বীকার হয় এর ফলে।

শিশুরা যাতে এই ধরণের জঘন্য হয়রানির স্বীকার হতে না পারে, সেজন্য সবার প্রথমে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে।

কে কি মনে করবে ইত্যাদি চিন্তা করে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা লজ্জায় না ভুগে ঘরে অবস্থানরত অন্যান্য সদস্যদের সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যে শিশুদের কতটুকু আদর করা যাবে।

আর শিশুদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে কোন ধরণের আদর গুলো পচা, শরীরের কোন কোন অংশে কাউকে ছুঁতে দেয়া যাবে না।

এবং বাবা-মাকে অবশ্যই সন্তানদের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা তাদের কোন কথা বাবা-মাকে বলতে দ্বিধা না করে। বাচ্চারা যদি কারো সাথে বাইরে যায় ফিরে আসার পর প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে বাইরে কি হয়েছে, কি দেখেছে, কি করেছে ইত্যাদি।

তার মানে এই নয় যে, আমরা প্রতিটা সম্পর্ককেই সন্দেহের চোখে দেখবো। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, বিভিন্ন কেস স্টাডি থেকে পাওয়া যায় এই ধরণের বিকৃত মানসিকতার মানুষগুলো চাচা-মামা-খালু-দুলাভাই-কাজিন-এমনকি দাদা-নানা….. পর্যন্ত হতে পারে।

সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য যদি নিজেকেও সতর্কতার চোখে দেখতে হয়, আমার মনেহয় সেটাই করা উচিত। কে কি মনে করলো সেই চিন্তায় যেন আমরা আমাদের সন্তানদেরকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে না দেই।

সাইকোলজি(পিএইচডি)

 

চাইল্ড অ্যাবিউজ (চাইল্ড ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ)

আফরোজা হাসান


চাইল্ড অ্যাবিউজ: পৃথিবীর সব বাবা-মা’রাই সন্তানের ভালো চান। সন্তান যাতে ভালো হয় তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার।

শিশুদের বৈচিত্র্যতার চেয়েও বেশি দেখেছি বাবা-মাদের বৈচিত্র্যময় আদর-সোহাগ-ভালোবাসা এবং শাসন-শোষণ। জেনে বা না জেনে কিংবা বুঝে বা না বুঝে বাবা-মারা বাচ্চাদের উপর নানা ধরণের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন।

শারীরিক আঘাত চোখে দেখা যায় তাই পরবর্তীতে বাবা-মা তাতে মলম লাগাতে পারেন বা চেষ্টা করেন।

কিন্তু মানসিক আঘাত………!!!

এই আঘাতের কারণেই হয়তো শিশুদের মানসিকতার সঠিক বিকাশ বাধাঁপ্রাপ্ত হয়। কারণ বিভিন্ন ইন্দ্রীয়ের সাহায্যে শিশুরা বিভিন্ন বস্তুগত গুণাবলী ও ঘটনা সম্পর্কে ধারণা বা উপলব্ধি করতে শেখে।

আর এর উপর নির্ভর করেই শিশুদের মধ্যে জন্ম নেয় স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, বিচারবুদ্ধি ইত্যাদি।

আমার পরিচিত একটি বাচ্চা আছে।

১.বাচ্চাটা কোন কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারেনা, ২.স্থির হয়ে বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসতে পারে না, ৩.কোন কিছু করতে বললেও ঠিকমতো করতে পারেনা,৪.একটুতেই রাগ করে-কান্না করে, ৫.বেখেয়ালি তাই খুব ভুল করে বা ভুলে যায়।

বাচ্চাটির বাবা-মাকে যদি পরামর্শ দেয়া হয় যে, ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান তারা দুজনই ভীষণ বিরক্ত হন বা রাগ করেন। মোটকথা তারা মানতেই রাজী না যে তাদের বাচ্চাটি এডিডি বা এটেনশন ডেফিসিট ডিজঅর্ডারের শিকার। কেউ বোঝাতে গেলে উল্টো তাদের সাথে মনোমালিন্য হয়। অথচ সন্তানের প্রতি তাদের ভালোবাসার কোন কমতি নেই। বাচ্চা যা চাইছে বলার সাথে সাথে তা সামনে এনে হাজির করেন। কিন্তু মানুষ বলবে যে তাদের বাচ্চাটা স্বাভাবিক না, সে ভয়তে বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিতে চায় না বা নিজেরাও মানতে চায়না।

প্রতিবেশী একজনকে দেখেছি বাচ্চা কিছু করতে না চাইলে, নানাভাবে ভয় দেখিয়ে সে কাজটি করতে বাধ্য করে। কেউ আছেন সারাক্ষণ টিভি চ্যানেল আর ফোনালাপ নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকেন যে, তখন বাচ্চা কথা বলতে চাইলে ধমক দিয়ে আরেক দিকে পাঠিয়ে দেন।

একজন মাকে দেখেছি বাংলাদেশ থেকে জালিবেত নিয়ে এসেছেন তার পাঁচ বছর বয়সি মেয়েকে শায়েস্তা করার জন্য। এক মা বুকফাটা কান্নার সাথে জানিয়েছিলেন, সাত বছর বয়সি ছেলেটাকে তাঁর স্বামী সামান্য কারণেই মাথায় তুলে সোফা বা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলেন, কখনো লাথি দেন আর বাকিটা নাহয় নাই বললাম।

যে কোন ধরণের আচার-ব্যবহার-কাজ যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বা ভালো থাকায় বাঁধা দেয়, তাকেই এককথায় চাইল্ড অ্যাবিউজ বলে।

চাইল্ড অ্যাবিউজকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে-

♠ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ বা যে কোন ধরণের নিয়ন্ত্রণহীন শারীরিক আঘাত।

♠সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ বা শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে যে কোন রকমের যৌন সংসর্গ।

♠বিহেবিয়ার অ্যাবিউজ বা শিশুর প্রতি অবহেলা-অমনোযোগিতা।

♠ইমোশনাল অ্যাবিউজ বা নানাভাবে শিশুকে বাধ্য করা।

এই প্রত্যেকটি কারণের দ্বারাই শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রত্যেকটি কারণ নিয়েই আলোচনা করবো।

চাইল্ড ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ

সন্তানদের ভালোর জন্যই প্রয়োজনে
বাবা-মাকে দৃঢ় হতে হয়। এটা অবশ্যই ভালো কারণ বাবা-মার দৃঢ়তা সন্তানদের মনে নিরাপত্তা বোধের জন্ম দেয়।

কিন্তু ছেলেমেয়েরা যখন কথা শোনে না বা অবাধ্যতা করে, তখন তাদেরকে সঠিক পথে আনতে বাবা-মারা যে কাজটি করেন, তাঁর নাম ‘শাসন’।

আর শাসন মানে সবাই মনে করেন যে, বকাঝকা করা নয়তো কোন শারীরিক শাস্তি দেয়া কিংবা পছন্দের জিনিস বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদি।

আর শাসনের পক্ষে নানা ধরণের যুক্তিও থাকে বাবা-মার কাছে। যেমন- মাঝে মাঝে শাসন না করলে বাচ্চারা মানুষ হয় না, সাহস বেশি বেড়ে যায়, ছোটবেলায় আমাদের বাবা-মা’রাও আমাদেরকে শাসন করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ শাসন আর গায়ে হাত তোলা কিন্তু এক জিনিস নয়। বাচ্চাদের ভুল বা অন্যায় গুলো অবশ্যই তাদেরকে ধরিয়ে দিতে হবে, তবে এরসাথে গায়ে হাত তোলার কোন সম্পর্ক নেই।

আমি দেখেছি আড়াই বছর বয়সি একটি মেয়েকে তার বাবাকে ঘর ভর্তি মানুষের সামনে চড় লাগিয়ে দিতে, মেহমানদের জন্য সাজিয়ে রাখা খাবার ধরার জন্য।

মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল, কারণ চড়টা কেন খেল বুঝতে পারছিলো না।

বাসায় টিচার আসলে পড়তে চায় না তাই চার বছর বয়সি মেয়েকে মা লাঠি পেটা শুরু করলো টিচারের সামনেই।

স্কুল থেকে ডেকে টিচাররা অভিযোগ করলো ক্লাসে বাচ্চা অমনোযোগী থাকে, বাসায় ফিরেই বাবার চড়-থাপ্পড়ের বৃষ্টি বাচ্চার উপর।

ছয় বছর বয়সি ছেলেটা তার তিন বছরের বোনের সাথে খেলনা শেয়ার করতে রাজী না হলেই শারীরিক আঘাতের স্বীকার হয়। ঘরের কোন জিনিসপত্র নষ্ট করলো তো আর রক্ষা নেই। এমন আরো অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে বাচ্চাদের সাথে।

অথচ এই ব্যাপার গুলোর সমাধানের সাথে শারীরিক আঘাতের কোন সম্পর্ক নেই বা শারীরিক আঘাত এর সমাধানও নয়।

পরীক্ষায় নাম্বার কম পেলে, ঘরের কোন জিনিস নষ্ট করলে, ছোট ভাই-বোনের সাথে বনিবনা না হলে, কথা শুনতে না চাইলে, অবাধ্যতা করলে বাচ্চাদের বুঝিয়ে না বলে,

গায়ে হাত তুললে আসলে তেমন কোন লাভ হয় না।

শরীরে ব্যথা পায় কিন্তু কেন ব্যথা পেলো বুঝতে পারে না, ফলে একই কাজ বার বার করে এবং আবারো শাস্তি পায়।

এর ফলে বাচ্চাদের মনে বাবা-মায়ের প্রতি চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ক্রমাগত তা বাড়তে থাকে।

একটা সময় বাচ্চারা বাবা-মার কথাই সহ্য করতে পারে না। ইচ্ছে করে তখন কথা শোনে না বা দুষ্টুমি করে। কারণ চিন্তা থাকে বড়জোর আমাকে ধরে মারবে এই তো!

তাই বাচ্চারা কোন অন্যায় করলে তাদের বোঝাতে হবে। কেন এই কাজটা করা ঠিক না, এর প্রভাব কি হতে পারে ইত্যাদি। আর শারীরিক আঘাতের চেয়ে এই বোঝানোটা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

শাসন আর অ্যাবিউজ কিন্তু এক জিনিস না। শাসন হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে শিশুর ভুল বা অন্যায় গুলো তাকে ধরিয়ে দিয়ে, তার থেকে বের হবার প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা করা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে শাসনের নামে বাচ্চারা অ্যাবিউজের স্বীকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যার ফলে বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তাদের সুষ্ঠু বিকাশ।

বাবা-মা যখন শাসন করতে গিয়ে বাচ্চাদের গায়ে হাত তুললেই যে সব ঠিক হয়ে যাবে এর কিন্তু কোন গ্যারান্টি নেই।
বরং বাচ্চারা আরো জেদি হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

যারা বাচ্চাদেরকে বোঝাতে পারেন না বা শেখাতে পারেন না তারাই আসলে শাসনের নামে গায়ে হাত তোলেন। কিন্তু এভাবে সন্তানদের মানুষ করা যায় না।

নিজেদের চরিত্রের অযোগ্যতা, নিয়ন্ত্রণহীনতাকে শাসনের নামে চালিয়ে দেন। যা কিনা প্রকৃত অর্থে চাইল্ড ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ।

আজ যে বাচ্চাটাকে আমি সামান্য কারণে গায়ে হাত তুলছি, শরীরের সাথে সাথে ছোট্ট মনটাকেও করছি আঘাতে আঘাতে জর্জরিত…!!

যখন ওর স্নেহ- মমতা-সহমর্মিতা-ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন পাচ্ছে শাসনের নামে চড়-থাপ্পড়-বকাঝকা…!!

একটা বয়সে গিয়ে যখন আমার স্নেহ-মমতা-সহমর্মিতা-ভালোবাসার প্রয়োজন পড়বে, তখন কি সন্তানের কাছ থেকে সেটাকে প্রাপ্য মনে করাটা অন্যায় হবে না?

আমার আজকের আচরণটাই যে আমার সন্তানের আগামীর পাথেয় হবে সেটা যেন আমরা কেউ ভুলে না যাই।

সাইকোলজি(পিএইচডি)

 

‘মা’ তোমাকে ভালবাসি

ডা. সাকলায়েন রাসেল


ক্লান্ত শরীরে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম..চোখ খুলে দেখি মা.. মাথায় হাত বুলাচ্ছেন! তাঁর দিকে তাকাতেই বললেন…
ঘেমে গেছিস…ফ্যান ছেড়ে দিব?
কিছু বলার আগে আবারো বললেন,
চুল অনেক বড় হয়ে গেছে,কাটাবি না?

চুল তো চাইলেই ছোট করতে পারি…পারিনা নিজেকে ছোট করতে ! তাহলে হয়ত মায়ের সেই ছোট্ট সাকলায়েনটি হয়ে থাকতাম.. চিরদিন!

সেদিন মাকে বললাম, আজ রোজা রাখব…

-শোয়ার আগে মা বলল, সত্যি সত্যি রাখবি?

_‘হু’

-ভোরে উঠে ভাত গরম করে খেতে পারবি?

_আরে না, কি যে বল, ভাত গরম করতে হবে কেন!… পেটে গেলে দু’মিনিটেই সব ঠান্ডা হয়… ! নিজের অক্ষমতা আড়াল করতে এভাবেই যুক্তির আশ্রয় নিলাম।

-কিছুক্ষণ পর মা এসে বলল, শোন, হটপটে খাবার আছে…খেয়ে নিস…!

_আচ্ছা

-কিছুক্ষণ পর, মা আবার এসে ঠোটে হাসির রেখা টেনে বলল, শোন, হটপট সাবধানে খুলিস !

এমন সাবধান বাণীতে অবাক হলেও কোন প্রশ্ন করলাম না…
ঘড়িতে তখন রাত ৩ টা…
খেতে গিয়ে অবাক হলাম…পুরো হটপট ৩ টা সোয়েটারে ঢাকা…!
‘আহ হারে’ ! …

ছেলের খাবার গরম রাখতে কি প্রাণ পণ চেষ্টা মায়ের…! ভাতটুকু গলধকরণের আগেই তাই বোবা কান্নাটাও গিলে ফেললাম…

শেষ প্রান্তে এসে বুঝলাম… ভাত শেষ কিন্তু পেটে ক্ষুধা তখনো রয়ে গেছে!…তবুও একমুঠো ভাত রেখেই খাবার শেষ করলাম…। ব্যাখ্যাঃ যদি সকালে উঠে মা দেখে সব ভাত শেষ… তবে ভাবতে পারে… আমার হয়ত আরো ভাত লাগত… আমি ক্ষুধা নিয়েই রোজা রেখেছি…
ফলাফল, মা সারাদিন মন খারাপ করবে… আফসোস করবে… আহ হারে! কেন ভাত একটু বেশি দিলাম না..! পেট অপূর্ণ থাকার পরও আমি তাই একটু ভাত ছেড়েই উঠলাম… তাতে মা অন্তত স্বান্তনা পাবে, ভাতের পরিমান ঠিক ছিল।

বন্ধুরা, Love you mom…আমি তেমনটা পারিনা…আমার কাছে LOVE মানে ভাত গরম রাখতে সোয়েটার দিয়ে হটপট ঢেকে রাখা…
LOVE মানে পেটে ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও কিছু ভাত ছেড়ে উঠা!

সহকারী অধ্যাপক, ভাসকুলার সার্জারী
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, বারডেম

 

ঝড়ের দিন -শেষ পর্ব

তানজীল আহমদ সিদ্দিকী


আলতানগর প্রাথমিক বিদ্যালয়। কদিন আগেও গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কলকাকলিতে স্কুলটার প্রত্যেকটা ঘর মুখর হয়ে উঠতো। অ আ ক খ ধ্বনি উড়ে উড়ে বেড়াতো স্কুলের প্রতিটি ঘরে। আর এখন স্কুলের প্রতিটি ইটে পাক খায় হানাদারদের দ্বারা নির্যাতিত মানুষগুলোর মরণ আর্তনাদ। জানালার কপাটে ঠুকে মরে ধর্ষিতাদের নিস্ফল কান্না। দেয়ালে লেপ্টে যায় হতভাগীদের অসহায় হাতের ছাপ।
দীপককে কখন ওরা স্কুলের একটা ঘরে বেঁধে রেখে গেছে টের পায়নি সে। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলো একটার অন্ধকার রুমে সিলিং থেকে ঝুলে থাকা দুটো দড়িতে হাত বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দীপক প্রথমে ভেবছিলো এ ঘরে সে একা, পরে অন্ধকারে চোখ একটু সয়ে আসতে বুঝতে পারলো তার পাশে আরেক জন একইভাবে বাঁধা। হঠাৎ মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো দীপকের। প্রচন্ড দূর্বল লাগছে। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হতে লাগলো দীপকের। তার ভুলের জন্য পুরো মিশনটাই বোধহয় ভেস্তে যেতে যাচ্ছে। এমন সময় পাশের মানুষটা খুব মৃদু গলায় বলে উঠলো, ‘পানি! পানি! কেউ আমাকে একটু পানি খেতে দাও! ‘ কণ্ঠস্বরটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। দীপক ভালো করে কান পাতলো। এ তো তপেশ মাস্টারের গলা!
‘ মাস্টার সাব, ও মাস্টার সাব! ‘
তপেশ মাস্টার প্রথমে বুঝতে পারলেন না কোথা থেকে আসছে কণ্ঠটা। এই পিশাচের দঙ্গলে কে-ই বা তাকে এত সম্মানের সহিত ডাকবে! তবে সাড়া দিলেন!
‘ কে বলছো? তুমি কি এ ঘরেই আছো? ‘
‘ আমি দীপক, মাস্টার সাব! আপনার পাশেই বাঁন্ধা আছি। আপনার এই অবস্থা ক্যান, স্যার? ‘
তপেশ মাস্টার অতি কষ্ট করে একটু হাসলেন। সেই হাসিতে লেগে আছে ব্যথাহত হৃদয়ের উথলে ওঠা আবেগের পরশ। তারপর অসহায় গলায় বললেন, ‘ মিলিটারিরা ধরে নিয়ে এসেছে, নজর আলির নির্দেশে। আমার স্ত্রী, বোন এদের আমি রক্ষা করতে পারিনি। জানিও না এমুহুর্তে কি অবস্থায় আছে ওরা। তোমাকে ধরেছে কেন? ‘ তার চোখ খানিক উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ‘ তুমি মুক্তিবাহিনীর লোক? ‘
দীপক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘ জে, মাস্টার সাব। ‘
হঠাৎ করে ভারী কাঠের দরজাটা খুলে গেলো। নজর আলি আর মেজর ওয়াসিমসহ কয়েকজন মিলিটারি ঘরে ঢুকলো। নজর আলির হাতে হারিকেন। সেই আলোয় পুরো ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো। দীপক খেয়াল করলো তপেশ মাস্টারের শরীরের সর্বত্র অত্যাচারের চিহ্ন। বিভিন্ন জায়গায় চামড়া ছিলে ফেলা হয়েছে। রক্ত ঝরছে সেসব ক্ষত থেকে। আসন্ন অত্যাচারের কথা চিন্তা করে দীপকের পুরো শরীর খানিক কেঁপে উঠলো। মেজর ওয়াসিম খান সোজা এগিয়ে আসলেন দীপকের সামনে। তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ তুম মুক্তি হ্যায়? ‘
পাশ থেকে তপেশ মাস্টার চিৎকার করে উঠলেন, ‘ কিচ্ছু বলো না, দীপক। একদম কিচ্ছু বলো না। পশুগুলো তোমা…’ কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি। নজর আলি সজোরে একটা চড় কষিয়ে দিলেন তিনি। তপেশ মাস্টারের চুলের মুঠি ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ‘ একদম চুপ, শালা মালাউন। তোর বউটারে তো সৈন্যরা ভোগ কইরা জঙ্গলে ফালায়ে রাইখা আসছে। আর তোর বোইনের মজা লুটসেন আমাগো মেজর। আর একটা কথা যদি কস, তাইলে তোর বউয়ের কাছে তোরে আর তোর বইনরে একলগে পাঠায় দিমু। ‘
নজর আলির কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তপেশ মাস্টার। তার স্ত্রী আর বেঁচে নেই! তার অনাগত সন্তানও আর বেঁচে নেই। ছোট বোনটার ইজ্জত লুটে নিয়েছে পশুগুলো। আর কি লাভ বেঁচে থেকে! হতভাগিনী বোনটাকে সাথে নিয়ে মরে গেলেই বোধহয় সব জ্বালা জুড়িয়ে যায়! ফিসফিস করে শুধু বললেন, ‘ মেরে ফেল আমাকে। ‘
মেজর আবার জিজ্ঞেস করলেন দীপককে, ‘ তুম মুক্তি হ্যায়? ‘
হ্যাঁ না যা-ই বলুক পরিণতি কি হতে পারে জানা আছে দীপকের। তাই ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো কোনভাবেই সহযোগিতা করবে না। পিশাচদের সাথে কোন আপোস করা যাবে না। মুখ ভর্তি থুতু ছুঁড়ে মারলো সে মেজরের দিকে। মেজর মুখ খারাপ গাল দিয়ে উঠে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে সজোরে চড় মারলেন দীপককে । এমন সময়ে হঠাৎ বাইরে থেকে প্রচন্ড গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে এলো। দুম করে গ্রেনেডও ফুটলো একটা। ঘরে উপস্থিত সকলে চমকে উঠলো। এক পাক সৈন্য ছুটতে ছুটতে এসে জানালো মুক্তিরা এট্যাক করেছে এবং সংখ্যায় মনে হচ্ছে বেশ ভারী ওরা! দীপকের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আসাদ ভাইরা এসে পড়েছেন! দীপক বিজয়ী ভঙ্গিমায় হেসে মেজরকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ এবার কোথায় পালাবি? ‘ মেজর সৈন্যদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর দীপকের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে নজর আলিকে সাথে নিয়ে নিজেও বেরিয়ে গেলেন। দীপকের চোখ তখন জ্বলছে। ক্রোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আজ পিশাচ বধ হবে। বহুদিন পর আলতানগরের আকাশে আবার স্বাধীন সূর্য উঠবে।
শিবু আর আসাদ যখন দীপকের বাড়িতে পৌঁছেছিলো তখন দীপকের মা-কে তারা বাড়ির উঠোনে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিলো। জ্ঞান ফেরানোর পর তিনি কাঁদতে কাঁদতে তাদের জানান যে মিলিটারিরা দীপককে ধরে নিয়ে গেছে। তারা তারপর সিদ্ধান্ত নেয় যে ওপারে ফিরে গিয়ে কমান্ডারকে জানানো যাবে। তারপর সম্ভব হলে একটা রেসকিউ অপারেশন চালাবে। পরবর্তীতে দীপকের মা-কে শান্ত করে খেয়াঘাটে পৌঁছে তারা দেখতে পায় তাদের পুরো গেরিলা দলটা খেয়াঘাটে অবস্থান নিয়ে আছে। কমান্ডার সাদেকও চলে এসেছেন। আসাদ আর শিবু অবাক হয়ে কমান্ডারের কাছে জানতে চেয়েছিলো – দলের একজন যোদ্ধার জন্য কমান্ডার এতবড় একটা ঝুঁকি নিলেন? কমান্ডার মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘ দেশটারে বাঁচাইতেই তো আমরা বেবাক্কে এক হইসি। ধইরা নাও দীপকই দেশ। কি? বাঁচাইবা না নিজের দেশরে? ‘ আসাদ অবাক তাকিয়ে ছিলো। কমান্ডারকে সবাইকে ডেকে পুরো মিশনটা বুঝিয়ে বললেন। চারদিক থেকে স্কুলটা ঘিরে ধরতে হবে। তারপর একসাথে সব দিক থেকে ফায়ারিং শুরু হবে।
প্ল্যান অনুযায়ী কমান্ডারের সাদেকের নেতৃত্বে গেরিলা দলের সবাই স্কুলের চারদিকে অবস্থান নিয়ে নেয়। আসাদ, শিবু সাথে আরো কয়েকজন অবস্থান নেয় স্কুলের সামনের দিকে। স্কুলের সামনে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকা কোন পাক সৈন্য কিচ্ছুটি টের পায়নি। তারপরই কমান্ডারের নির্দেশে শুরু হয়ে যায় গুলি বর্ষণ। স্টেনগান আর থ্রি নট থ্রি রাইফেলের একটানা গুলিবর্ষণে পুরো আলতানগর কেঁপে উঠলো। স্কুলের ভেতরে তখন মেজর দীপককে ইন্টারোগেট করছেন। পাক সৈন্যরা হামলার প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিতেই বেশ হিমশিম খেয়ে গেলো। তিন জন সৈন্য গোলাগুলি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লুটিয়ে পড়লো। বাকি সৈন্যরা ততক্ষণে সামলে নিয়েছে। কাভার নিয়ে ওরাও পালটা গুলি করতে লাগলো। পুরোদমে শুরু হয়ে গেলো এক মরণপণ লড়াই। গেরিলা দলটা জীবন বাজি রেখে লড়ছে আলতানগরকে হানাদারমুক্ত করবে বলে। আর পাক বাহিনী দাঁতে দাঁতে চেপে লড়ে যাচ্ছে এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলিটারি ঘাঁটির দখল রাখবে বলে। দুই পক্ষই সংখ্যায় ভারি। যদিও পাক বাহিনীর হাতে আছে একটা মেশিনগান। স্কুলের বাউন্ডারি ঘেঁষেই বসানো হয়েছে সেটি। অনবরত গুলি বর্ষিত হচ্ছে তা থেকে। ইতিমধ্যেই দুজন গেরিলা সেই মেশিনগানের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। কমান্ডার সাদিক সবাইকে খানিক পিছিয়ে যেতে বললেন। মেশিনগানটা কব্জা করতে না পারলে ক্যাম্পের দিকে আগানো সম্ভব না। বাঁশঝাঁড়ে অবস্থান নিয়ে থাকা কমান্ডারের পাশেই ছিলো শিবু। সে বলে উঠলো, ‘ আমি দখল নিমু মেশিনগানের। ‘ কমান্ডার অবাক হয়ে বললেন, ‘ কি কইরা? ‘
এই প্রথম শিবুকে হাসতে দেখলেন কমান্ডার। দু হাতে দুটো গ্রেনেড নিয়ে শিবু বললো, ‘ এইগুলান দিয়া। আপনেরা শুধু আমারে কাভার দেন। ‘ কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শিবু বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে এলো। আঁকাবাঁকা করে দৌড় দিলো স্কুলের দিকে, ঠিক যেখানে মেশিনগানটার অবস্থান। কমান্ডার চিৎকার করে সবাইকে নির্দেশ দিলেন শিবুকে কাভার দিতে। সবাই একযোগে গুলি শুরু করলো। স্টেনগানের কড়কড় আওয়াজে কান পাতা দায়। ওদিক থেকে চাইনিজ এসএসজি দিয়ে পাক বাহিনীও সমানে জবাব দিয়ে যাচ্ছে। আর সেই নরকের ভেতর দিয়ে শিবু এঁকেবেঁকে দৌড়ে যাচ্ছে। গুলির নহর ছুটে যাচ্ছে তার পাশ দিয়ে। তবু একটা গুলিও স্পর্শ করছে না তাকে। যেন অসম সাহসী মৃত্যুভয়হীন এই মানুষটাকে পরম শ্রদ্ধায় পথ করে দিচ্ছে গুলিগুলো। মেশিনগানের সামনে বসে গুলি রিলোড করতে পাক সৈন্যটা অবাক হয়ে দেখলো এক বাঙ্গাল দু হাতে দুটো গ্রেনেড নিয়ে ঠিক তার দিকেই ছুটে আসছে। মেশিনগানের গুলি রিলোডিং ফেলে সে তার রাইফেলটা হাতে তুলে নিলো এবং সাথে সাথেই গুলি করে দিলো। তবে তার আগেই ‘ ও মা, তোর লাইগা ‘ চিৎকার দিয়ে শিবু একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে দিয়েছে মেশিনগানের দিকে! বিকট আওয়াজ করে দুটো গ্রেনেড একসাথে ফুটলো। মেশিনগান গানার আর তার মেশিনগান টুকরো টুকরো হয়ে গেলো মুহুর্তে। অসম সাহসী শিবুর শরীরও টুকরো হয়ে মিশে গেলো তার বাংলা মায়ের শরীরের সাথে। সাথে সাথে কমান্ডার সাদেক চিৎকার করে সবাইকে আগে বাড়তে বললেন। ক্যাম্পের চারদিক থেকে যোদ্ধারা গুলি করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগলো। মেশিনগানটা উড়ে যেতে দেখেই পাক সৈন্যদের সাহস উবে যেতে শুরু করেছিলো, চারদিক থেকে গেরিলাদের এভাবে ছুটে আসতে দেখে অবশিষ্ট সাহসটুকুও আর রইলো না। নির্দিষ্ট কোন টার্গেট ভুলে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে লাগলো। ফলস্বরুপ বেশিরভাগ গুলিই যোদ্ধাদের আশপাশ দিয়ে চলে যেতে লাগলো। একটাসময় এসে পাক সৈন্যদের আর কেউই বেঁচে রইলো না ক্যাম্পটার দখল বজায় রাখার জন্যে। ভেতরে যারা ছিলো তারা সবাই মাথার উপরে হাত তুলে বেরিয়ে এলো। কমান্ডার সাদিক এগিয়ে আসলেন সামনে। সাত-আট সিপাহীকে সাথে নিয়ে মেজর ওয়াসিম খান সাদিকের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। তাদেরকে কড়া পাহারায় রেখে কমান্ডার কয়েকজনকে সাথে নিয়ে স্কুলের ভেতরে ঢুকলেন। একটা ঘরের দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢুকলেন। তপেশ মাস্টার আর দীপককে এ ঘরেই বেঁধে রাখা হয়েছে। কমান্ডার তাড়াতাড়ি দুজনের বাঁধন খুলে দিলেন। বাঁধন খুলে দিতেই তপেশ মাস্টার মূর্ছা গিয়ে কমান্ডারের শরীরের উপর ঢলে পড়লেন। কমান্ডার আস্তে করে তাকে মেঝেতে শুইয়ে দিলেন। তারপর তিনি দীপকের বাঁধন খুলে তাকে বাইরে নিয়ে এলেন। দীপককে দেখে আসাদসহ অনেকে ছুটে এলো। আসাদ উদ্বিগ্ন স্বরে দীপককে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ দীপক, ঠিক আসো তুমি? পশুগুলান মারে নাই তো? ‘ দীপক ক্লান্ত স্বরে বললো, ‘ আমি ভালা আছি, আসাদ ভাই। আপনেরা মাস্টার সাহেবরে দেখেন। ‘ কমান্ডারের মনে পড়লো তিনি মাস্টারকে ঘরে রেখে এসেছেন। সাথে সাথে তিনি একজনকে নির্দেশ দিয়ে দিলেন মাস্টার-কে যেন বাইরে নিয়ে আসা হয়। ততক্ষণে স্কুলের প্রত্যেকটি ঘরের দরজা খুলে বন্দিদের বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে। সবই যুবতী মেয়ে। তাদেরকে দিনের পর দিন এখানে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়েছে। গায়ে একটা সুতো পর্যন্ত ছিলো না কারো। উপস্থিত গেরিলা দলের প্রত্যেকে তাদের নিজেদের শার্ট-গেঞ্জি খুলে তাদেরকে ঢেকে দিয়েছে। মানসিক আর শারীরিক অত্যাচার হাঁটার শক্তি পর্যন্ত নিয়ে নিয়েছে তাদের। দুজন তাদেরকে নিয়ে গ্রামের দিকে আগালো। আলতানগত যে শত্রুমুক্ত হয়ে গেছে, গ্রামবাসীকে সেকথা তারা-ই জানিয়ে দেবে।
তপেশ মাস্টারকে ধরে ধরে যখন স্কুলঘরের বাইরে নিয়ে আসলো, তিনি তার বোনের খোঁজ জানতে চাইলেন। কমান্ডার সাদিক গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ মনডারে শক্ত করেন মাস্টার। ‘ কমান্ডারের কথা শুনে তপেশ মাস্টার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। এমন সময় ভেতর থেকে দুজন মুক্তিযোদ্ধা একটি মেয়ের লাশ ধরাধরি করে নিয়ে এলো। তারা সেই লাশটা পরম যত্নে শুইয়ে দিলো বারান্দার মেঝেতে। তপেশ মাস্টার এগিয়ে আসলেন। এ যে তার বোনেরই লাশ। তিনি আস্তে করে বসে পড়লেন তার বোনের পাশে। তারপর শান্ত গলায় কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলেন, ‘ কিভাবে? ‘ কমান্ডার ধরা গলায় বললেন, ‘ পরনের শাড়ি দিয়া। পশুগুলোর অমানুষিক অত্যাচার আর নিতা পারেনি বেচারি। ‘ কমান্ডারের কথা শোনার পর তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তপেশ মাস্টার শান্তভাবে তার বোনের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। কমান্ডার আর দাঁড়াতে পারলেন সেখানে। আস্তে করে সরে আসলেন। মাটিতে হাঁটু গেড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসা আত্মসমর্পণকারী পাক সৈন্যদের দিকে এগিয়ে এলেন। মেজর ওয়াসিম খানের সামনে এসে ডাক দিলেন তার এক সহযোদ্ধা-কে। শিক্ষিত লোক তিনি। শহরের কলেজে শিক্ষকতা করতেন, যুদ্ধের দামাম বাজতেই দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে অস্ত্র কাঁধে নেমে পড়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে। কমান্ডার তার হয়ে মেজরের সাথে কথা বলতে অনুরোধ করলেন তাকে।
তিনি কমান্ডারের কথা মতো মেজরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ ডু ইউ ফিল গিলটি ফর হোয়াট ইউ হ্যাভ ডান, মেজর? ‘
মেজর ঠান্ডা গলায় জবাব দিলেন, ‘ নো। বাট আই রিপেন্ট ওয়ান থিংগ। ‘
ভদ্রলোক তার মাথায় চেপে বসা রাগটা কোনরকমে ঠেলে সরিয়ে রেখে জানতে চাইলেন, ‘ হোয়াট? ‘
মেজর কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘ ইফ আই কুড ফাক মোর ওব ইওর গার্লস! ‘ আর সহ্য করতে পারলেন সেই শিক্ষক। অন্তরের সব ঘৃণা এক করে হাতের মুঠোয় এনে সজোরে এক ঘুষি মেরে বসলেন মেজরকে। মেজরের নাক দিয়ে রক্তের ফোয়ারা ছুটলো। কমান্ডার তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সরিয়ে নিয়ে গেলেন ভদ্রলোককে।
ভোর হবার খানিক আগে, কমান্ডার সাদিকের আদেশে মেজর ওয়াসিমকে স্কুলের পেছনে নিয়ে গিয়ে একটা বড় আমগাছের সাথে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাকি সৈন্যদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে রাখা হয় স্কুলের একটা ঘরে। পরে সুযোগমতো অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হবে। পরিবেশ একটু শান্ত হতেই সবার মনে পড়লো নজর আলির কথা! আশেপাশের দশ-বারোটা গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত রাজাকারটা কোন ফাঁকে যেন পালিয়ে গেছে। কমান্ডার সাদিকের নেতৃত্বে গেরিল দলের একাংশ নজর মেম্বারের বাড়িতে পৌঁছুলো। কমান্ডার ঘরের বাইরে থেকে জোরে ডাক দিলেন, ‘ নজর আলি! নজর আলি, তুমি বাইর হয়া আহো। আলতানগরে স্বাধীন মাটিতে আইজ তোমার বিচার হইবো। ‘ খানিকক্ষণ পর সদর দরজা খুলে গেলো। জোহরা বেগম বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে। ঘোমটার আড়াল থেকে আশ্চর্য শান্ত গলায় তিনি বললেন, ‘ তিনি বাড়িতে নাই। ‘ কমান্ডার একটু রেগেই বললেন, ‘ অবশ্যই সে বাড়িতে আছে। বাইর হইতে কন তারে। ‘
জোহরা বেগম বললেন, ‘ তিনি গোয়ালঘরে আছেন। যান। ‘
কমান্ডার কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে রইলেন এই মহিয়সী নারীর দিকে। তারপর তার সহযোদ্ধাদের আদেশ দিলেন নজর আলিকে ধরে আনার জন্যে। কিছুক্ষণ বাদেই তারা নজর আলি-কে টানতে টানতে নিয়ে এলো। নজর আলির দুচোখে মৃত্যুভয় স্পষ্ট। কমান্ডার ঘৃণাভরে কণ্ঠে বললেন, ‘ উপরে বিচার করবেন আল্লাহ, আর নিচে তোমার বিচার করবো এই আলতাগরের মানষে, যাগোর লগে বেঈমানি করসো তুমি। ‘ কমান্ডারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা নজর আলিকে তুলে দেয় ক্রোধের আগুনে জ্বলতে থাকা গ্রামবাসীদের হাতে। দা, বটি, কুড়াল কি দিয়ে তারা আঘাত করেনি নজর আলিকে! শেষপর্যন্ত যখন গ্রামবাসীদের ক্রোধের আগুন নিভলো, তখন নজর আলির শরীরটা একদলা মাংসপিন্ড ছাড়া আর কিছুই না। ততক্ষণে চারপাশ আলো হয়ে গেছে। গেরিলা দলটা স্কুলটাকে তাদের অস্থায়ী ঘাঁটি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মুসেগুল থেকে এসে যদি হানাদাররা আক্রমণ করে, তাই শক্ত অবস্থান নিতে হবে তাদের। অনেক রক্ত ঝরেছে আলতানগর মুক্ত করতে। সেই রক্তের প্রতিটি ফোঁটার সম্মান তাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।
আজ অনেকদিন পর আলতানগরের আকাশে মেঘের ভেলা সরে গিয়ে ঝকঝকে লাল সূর্য উঠেছে। সেই চোখ ধাঁধানো আলোয় একজন নিঃসঙ্গ মানুষ একা বসে আছে নদীর ধারে। মানুষটা তপেশ মাস্টার। নদীর ওপারে দৃষ্টি তার। কিংবা শুধু চোখটাই সেখানে ফেরানো, দৃষ্টি নেই তাতে। সূর্য পরম ভালোবাসায় তার পবিত্র আলো বুলিয়ে দিতে লাগলো মানুষটার সারা গায়ে। সব গেছে তার, শুধু প্রাণটা আছে। ঠিক যেন এই অভাগা দেশটার মতো। সব যাচ্ছে তার, শুধু ধুকপুক করা প্রাণটা আছে। একদিন এই প্রাণ থেকে আবার সব হবে। নকূল বাউলরা আবার এই আলতানগরের পথে হেঁটে বেড়াবে। শিবুরা আবার পরম ভালোবাসায় তার দেশমায়ের জন্য জীবন বাজি রাখবে। তপেশ মাস্টারের হতভাগিনী বোনটার মতো ষোড়শীরা আবার আলতানগরের পথে হাসতে হাসতে ছুটে বেড়াবে। ঝড়ের দিন শেষ হয়েছে। এখন প্রতিদিন সূর্য উঠবে, উঠবেই উঠবে।

এইচ এস সি শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম

 

আমার শরীর, আমার অংশ, আমার স্বপ্ন!

ডা.সংগীতা হালদার রায়


ছোট খাট কিছু কম্পলিকেশন ছিল , ছিল মিস ক্যারিজের হিস্টরী, আর বাবুর মাথাও বেকে ছিল । তাই নরম্যাল ডেলিভারির আশা ছেড়ে দিয়ে সিজারিয়ান সেকশনের জন্যে চলে গেলাম CMH এ নির্ধারিত দিনের আগের দিনই।

মস্তিষ্কের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা হল খুব চাপের সময়ে সে অন্য কোন পুরাতন স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় বা অন্য কোন কিছু চিন্তাতে নিউরনগুলোকে কাজে লাগিয়ে ফেলে।

তাই ভর্তির সময়ে যখন আমার চিন্তিত বা আশংকিত হবার কথা ছিল পরদিন কি হবে বা সব কিছু ঠিক ভাবে হবে কিনা তখন আমি প্যালেস্টাইনি এক রোগীনির ভর্তি হবার পুরো প্রক্রিয়াতে মনোনিবেশ করে ফেললাম।

বেচারা ভীনদেশে বাবা হতে গিয়ে প্রচন্ড ভীত, ইন্টার্ন ডাক্তারদের কিছুতেই রোগীনিকে পরীক্ষা করতে দেবেন না , বলছেন ‘ আই ওয়ান্ত অনলি র‌্যাঙ্ক দক্তর’ । হিস্টরী নিয়ে রোগীকে রেডি করে সিনিয়রকে ডাকাই ইন্টার্নদের প্রথম দায়িত্ব, সে বেচারারা ভেবাচেকা খেয়ে একবার উনাকে বুঝাচ্ছিল, একবার রোগীকে বুঝাবার চেষতা করছিল, আরেকবার সিনিয়র নার্সকে জিজ্ঞেস করছিল সিনিয়র ডাক্তারকে ডাকা ঠিক হবে কিনা।

মহিলার প্রতিক্রিয়া দেখতে গিয়ে দেখি ছিপছিপে লম্বা ভদ্রমহিলা কিঞ্চিত দুশ্চিন্তা নিয়ে স্বামীর কান্ড দেখছেন কিন্তু কিছু বলতে চেয়েও পারছেন না। মহিলা এতোই ছিপছিপে ছিলেন যে নিজের বিশাল পেটের দিকে তাকিয়ে মনে হল, ” আরে আমার বাচ্চাটা কি পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে আর ইনারটা এটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাকি? ”

ভেবেই আনমনে ফিক করে হেসে দিয়েছিলাম, মহিলা তো আর জানতেন না যে আমি ঐ অবস্থায় এরকম বিচিত্র কথা ভেবে হাসছিলাম; কাজেই উনি সৌজন্য বিনিময়ের হাসি ফেরত দিলেন আমায়। আমি সংযত হয়ে বসলাম লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে।যাহোক নিজের ক্যাবিনে এলাম। ঘর , বাথ্রুম , বারান্দা দেখে মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়ে পরদিন কি পরে ওটিতে যাব , বাচ্চা কি পরবে, কোন কাঁথায় তাকে বরণ করা হবে সব কিছু একবার মা আরেকবার স্বামীকে বুঝিয়ে দিলাম ।

বুঝতে পারছিলাম অস্থিরতা কাজ করছিল ওর মাঝে, ছেড়ে যেতে চাইছিল না আমায়, কারণ আমার মায়ের কোমরে ফ্যাকচার আছে, হঠাত করে হাসপাতালের চিকন বেড থেকে ভারি শরীর নিয়ে ওঠা নামা করা ইত্যাদি কাজে অসুবিধার আশংকা করছিল সে। কিন্তু CMH এর নিয়ম ওটাই, কিছু করার ছিল না। বলে গেল ঘুমাতে আর সাথে দিয়ে গেল গল্পের বই, খুবই পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের কাজ ছিল সেটা কিন্তু আমার স্নায়ুকে শুধু বই-ই শান্ত রাখতে পারে , অগত্যা!মা কিছুক্ষণ ঘুমাতে বলে ঘুমিয়ে গেল , আমি গল্পের বইতেও মনযোগ দিতে পারছিলাম না আর অস্থিরতায় ঘুমও আসছিলনা। পেটে হাত দিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম অনাগত সন্তানের কথা ভেবে, কথা বললাম বাবুটার সাথে খানিক্ষণ , অতঃপর ঘুমিয়ে গেলাম।

কিন্তু নতুন জায়গায় চিকন বেডে ছাড়া ছাড়া ঘুম হচ্ছিল, বার বার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছিল । বেড়ালের ডাকে, গাড়ির চাকার শব্দে, এমনকি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকেও । আবার ঘুমাবার চেষ্টা করছিলাম , নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম যে আমার ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিক রাখার জন্যে আমার ঘুমাতে হবে। আমার বাবুকে সুস্থ রাখতে আমাকে ঘুমাতে হবে।পরদিন ঘুম ভাংলো অনেক ভোরে সকালে উঠে দেখি মা স্নান সেরে নিজে নিয়ে আসা স্যাভলন দিয়ে ঘর , বারান্দা , এমনকি বাথরুমও মুছে ফেলেছে। আমি উঠতেই সাত তাড়াতাড়ি করে নিজের ফ্যাকচারড কোমর নিয়েই বেড থেকে নেমে এলো আমায় ব্যালান্স করে নামাতে । ধীরে ধীরে নেমে বাথরুমে গিয়ে মুখ ধোবার সময়ে নিজের চিন্তাক্লিস্ট চেহারাটা আয়নায় দেখে নিজেরই কেমন যেন লাগল । মনে হল আমার বাচ্চাটা প্রথমবার এমন ভাবে দেখবে আমায়!
বেড়িয়ে এসে সুন্দর করে নিজের চিল আচড়ে দুইটা বেনি করলাম। হালকা করে বিবি ক্রিম , পাউডার কাজল , হাতে পায়ের নখে নেইল পলিশ লাগালাম। তবুও দেখি সময় কাটেনা, স্বামীও আসেনা। মা তখন গীতা পড়ে যাচ্ছে মন দিয়ে। মাকে খেয়ে নিতে বলে আমার নিজের গীতাটা খুললাম । সাড়ে সাতটার দিকে আয়ারা চলে এলো আমাদের রুম মুছে দিতে আর আমাকে রেডি করে নিয়ে যেতে । আমার চুলের রাবার ব্যান্ড খুলে গজ ফিতা দিয়ে আবার বেঁধে দিল, কেন কে জানে ! আমার মনে হচ্ছিল যে ওদের করার কিছু নেই বলেই হয়তো অমন করেছিল। কারণ ঘর মোছা আর আমায় হালকা সাজুগুজু দেখে ওরা দুজন গা টেপাটেপি করে হেসেছিল।যখন নিয়ে যেতে চাইলো মা তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিল একটু, কারণ বাবা বা তার জামাই কেউই তখনো আসেনি। এদিকে ‘ম্যাডাম বলেছে’ বলে ওরা আমাদের আটকে ফেলেছে । ফ্যামিলি ওয়ার্ড থেকে ওটিতে যাবার জন্যে এম্বুলেন্সে আরো তিন বা চারজন হবু-মা শুকনো মুখে উঠে বসে আছেন , তাড়া দিচ্ছিল ওরা তাই। হেসে মাকে প্রনাম করে যখন গাড়িতে উঠলাম তখন শুকনো চোখেও ঝাপসা দেখছিলাম দুশ্চিন্তায়, সামনের কারো চেহারা দেখি নি আমি । গাড়ির পেছনের কাঁচে মাকে দেখছিলাম ব্যস্ত হয়ে মোবাইল চাপতে।

ওটির কাছে পৌঁছে দেখি মা আর স্বামী দুজনেই এসে গিয়েছে। ওয়েটিং রুমে কিছুক্ষণ বসানো হল আমায়। জানতে পারলাম বাবা নাকি অনেক আগেই পৌঁছে কোন ওটিতে অপারেশন হবে , কে করবেন তাদের সাথে কথা বলতে গিয়েছে।

নিজের প্রাক্তন কাজের জায়গাতে মেয়ের কোন অসুবিধা হবেনা এমনটাই আশা ছিল তার। ফোনে শাশুড়িমা- শশুরের কাছে আশীর্বাদ চেয়ে বিদায় নিলাম ওটিতে ঢুকে যাবার আগে । মা আর স্বামী দুজনেই চিন্তিত মুখে আর ছলছল চোখে বিদায় জানালো আমায়।

হেঁটে যেতে শুরুতেই আমার জুতো খুলে নিতে বললো কিন্তু অন্য কোন জুতো দেয়া হলনা। হাসপাতালের ময়লা জীবাণু কল্পনা করে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল , ডাস্ট এলার্জির জন্যে খালি পায়ে হাঁটতে আমার ভালোও লাগছিলনা আর ঐ ভারী শরীরে হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল । হাঁপাচ্ছিলাম, ঘেমে গিয়েছিলাম আর অনুরোধ করছিলাম একটা ট্রলিতে নিতে। কিন্তু আয়া ‘এইতো আরেকটু’ বলে বলে নিয়ে যাচ্ছিল তো যাচ্ছিলই। দোতলায় উঠে অন্য একটা ওটির বাইরের ট্রলি পাওয়া গেল অবশেষে একটা।ওটিতে নিয়ে ক্যানুলা করিয়ে যখন ক্যাথেটেরাইজড করানো হচ্ছিল , প্রথমবার বুঝতে পারলাম আমার রোগীনিদের কেন অত অস্বস্তি লাগতো । সব সময় রোগীদের কাউকে নরম স্বরে আর কাউকে গরম হয়ে বলতাম “শুনেন আমরা প্রতিদিন ২০/২৫ জনকে এভাবে ক্যাথেটার পরাই, কাজটা ভালোভাবে করার চেষ্টা করি তখন। রোগীর দিকে কেউ অন্য চোখে তাকায় না”।

একই কথা আমার বেলায়ও প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু মন মানছিলনা কিছুতেই ।ওটি বেডে শোয়ানোর পরে এনেস্থেটিস্ট আমাকে বলতে শুরু করলেন তিনি আমাকে ছোটবেলায় কবে কখন দেখেছেন, বাড়িয়ে দিলেন আমার অস্বস্তি । বাবাকে নিয়মের দোহাই দিয়ে চলে যেতে বললেন, আমি বাবার দিকে তাকিয়ে হেসে সাহস দিলাম যে আমার অসুবিধে হবেনা । এনেস্থেসিয়া হবার পরে যখন অপারেশন শুরু হল, মনে হচ্ছিল আমি সবই হাল্কা হাল্কা টের পাচ্ছিলাম , নিজের confusion দূর করতে একবার জিজ্ঞাসাও করে ফেললাম ‘ আঙ্গকেল আমি তো সবই বুঝতে পারছি মনে হচ্ছে, এমনই কি হয়?’ , উনি বললেন ‘তোমার মনের ভুল এটা’।

এক পর্যায়ে পাশে তাকিয়ে দেখি ওটি দরজার চৌকো কাঁচে বাবার মুখ দেখা যাচ্ছে। সেই মুখ হঠাত হেসে উঠতেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৯।৪৫ মিনিট বাজছে । মাথার কাছে এনেস্থেটিস্ট আংকেল হেসে বললেন তোমার মেয়ে হয়েছে, এখুনি মুছিয়ে নিয়ে আসবে।আমি বারবার তাকাচ্ছিলাম যেদিকে মোছাতে নিয়ে গেল সেদিকে , চিন্তা করছিলাম ওরা কি আমার পছন্দের জামাটা মেয়ের পরাবার জন্যে দিতে পেরেছে? কাঁথাটা দিতে পেরেছে তো? তোয়ালে দিয়েছে? আমি তো একটাই কাঁথা রেখে এসেছিলাম, যদি আরো লাগে ওরা সবাই পারবে তো দিতে?

ভাবতে ভাবতেই আমার সবুজ শাড়ির কাঁথায় মোড়ানো লাল টুকটুকে জামা পরা একটা ছোট্ট পুতুলকে পাশে নিয়ে এলো আয়া। শুনেছিলাম হাসপাতালে বাচ্চা বদলে যায় , খুব ভাল করে দেখে চিনে রাখার চেষ্টা করলাম মেয়েকে যেন বদলে না দেয়।

“আপনার ধর্মে আলহামদুলিল্লাহ’র মত যেইটা আছে সেইটা বলেন” বলে আয়া আমার গালে ছুঁইয়ে দিলো আমার সন্তানের গাল । আমার ডান গালে হালকা ঠান্ডা নরম স্পর্শে তখন অনেক বিস্ময় আর অনেক অনেক আনন্দ ! আমার শরীরের অংশ , আমার স্বপ্নের টুকরা আমার আমার চোখের সামনে ।

বিশ্বাস হচ্ছিল না যেন এই বাচ্চাটাই আমার শরীরে ছিল ! সত্যিই এ-ই ছিল তো (যদিও চিকন চোখ আর চাপা নাকে মেয়ের বাবার চেহারার আদলে সন্দেহ করবার মত আদৌ কিছু ছিলনা) । মায়া , ভালোবাসা, প্রতীক্ষা শেষের খুশী নেমে আসছিল চোখ বেয়ে !এরপরেও ঐ ওটিতেই আবারো কাঁদতে হয়েছিল, কাঁদতে কাঁদতে ঘামতে হয়েছিল এনেস্থেশিয়ার ঔষধের কার্যকারীতা শেষ হয়ে যাওয়ায় । কিন্তু সারাক্ষণ ঈশ্বরের কাছে বাঁচিয়ে রাখবার প্রার্থনা করছিলাম শুধু মেয়ের কাছেই ফিরে আসবার আকাংক্ষায়। প্রথম দেখায় কিংবা দেখারও আগে যাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম তাকে এরো একবার দেখবার আকাংক্ষায়।

ফরমাল লেকচারার
শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

 

ঝড়ের দিন: পর্ব-৪

তানজীল আহমদ সিদ্দিকী


গাঁয়ে মিলিটারি ঢোকার পর থেকে সন্ধ্যা হলেই পুরো গ্রাম শ্মশানঘাটের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু কিছু বাড়ি থেকে মিটিমিটি কূপির আলো দেখা যায়, বাকি বাকিগুলোতে তাও চোখে পড়ে না। জীবিত মানুষগুলো বেঁচে থাকার তাগিদে মৃতের ছদ্মবেশ ধরে। সময়টাই এমন। আলোতেও ভয় কাটে না বরং চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। মিলিটারিরা যদি আলো দেখে বাড়িতে এসে কড়া নাড়ে? তাই পুরো বাড়ি অন্ধকার করে রেখে মানুষগুলো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁপে। প্রার্থনা করে আরেকটা সূর্যোদয়ের।
সন্ধ্যে হয়ে গেছে। চারদিকে লালচে অন্ধকার। আকাশের দিকে তাকালে একটা দুটো তারা চোখে পড়ছে। খেয়াঘাটে কেউ নেই। শুধু দুটো নৌকা দুলকি চালে ভাসছে। খুঁটির সাথে বাঁধা সেগুলো। ভোর হলে পরে মাঝিরা এসে ভাসাবে। শুধুমাত্র একটা নৌকা খুব ধীরে আলতানগরের দিকে এগিয়ে আসছে। দূর থেকে তাকালে শুধু দাঁড় বাইতে থাকা মাঝিকে দেখা যাবে। ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পাবে না যে নৌকার পাটাতনের নিচে আরো তিনটে মানুষ লুকিয়ে আছে। এরা হলো আসাদ, দীপক আর শেবু। একটা সশস্ত্র গেরিলা দলের রেকি টীম তারা। আজ রাতে আলতানগরে একটা গেরিলা এট্যাক হবে। রেকি দলের কাজ হলো শেষবারের মতো সবকিছু দেখে গিয়ে রিপোর্ট করা। নদীর ওপারেই বাকি যোদ্ধারা অপেক্ষা করে আছে। আসাদ আস্তে করে পাটাতন থেকে বেরিয়ে এলো। সুমন মাঝি অভ্যস্ত হাতে দাঁড় বাইছে। এই নদী তার নিজের হাতের তালুর মতো চেনা। রাতের অন্ধকারেও চোখ বন্ধ করে খেয়াঘাটে নৌকা ভেড়াতে পারে সে। আসাদ ছইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়লো। পাড় থেকে কেউ লক্ষ রাখলে মাঝি ছাড়া আর কাউকে দেখবে না। তারপর সেখান থেকেই কথা বলতে লাগলো সুমনের সাথে।
‘ সুমন ভাই, গ্রামের অবস্থা কিরাম? ‘
‘ ভালা নারে ভাই। পাকিস্তানি বেজন্মাগুলা মশামাছির মতো মানুষ মারে। বাড়ি থেকে মেয়েদের উঠায়া ক্যাম্পে নিয়া যায়। নজর কুত্তাটায় হেগোরে পথ দেখায়। নজর আর মিলিটারির ভয়ে গেরামের মানুষ ঘর থিইকানই বাইর হয় না। দিনে যাও বা বাইর হয়, রাইতে তো পুরা গেরাম শ্মশান হয়া যায়। এশার ওয়াক্তে মসজিদে এক কাতার মানুষও হয় না! ‘
বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আসাদ। ছমাস আগে যখন ঘর ছেড়েছিলো তখন মুসেগুলেও পরিস্থিতি এমনই ছিলো। বরঞ্চ আরো খারাপ ছিলো। শুক্রবার হাট বেলায় মুসেগুল বাজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলো পশুগুলো। তখন বাবার সাথে বাজারেই ছিলো আসাদ। হঠাৎ করে ‘ আগুন লাইগা গেসেরে ‘ চিৎকার শুনে আর সবার মতো সেও দৌঁড়েছিলো রুদ্ধশ্বাসে। পেছনে ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজ। দাউ দাউ করে জ্বলছে দোকানপাট। মানুষজন চেঁচাতে চেঁচাতে দৌঁড়ুচ্ছে। এদিন যেন নরক নেমে এসেছিলো সেখানে। দৌড়ুতে দৌড়ুতে কখন যে বাজার থেকে বহুদূরে চলে এসেছে খেয়াল করতে পারেনি আসাদ। আব্বা কোথায় গেলেন! সাথে সাথে দৌড়ে বাজারে ফিরেছিলো সে। জন্মদাতা পিতার অর্ধদগ্ধ লাশটা পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও থেমে গিয়েছিলো আসাদ। পিতার অর্ধদগ্ধ লাশটা কাঁধে তুলে নিয়ে চুপচাপ হাঁটা দিয়েছিলো সে। যত্রতত্র পড়ে থাকা দগ্ধ, অর্ধদগ্ধ, ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া লাশগুলো টলাতে পারেনি তাকে। শত মানুষের হাহাজারিতে ভারি বাতাসে খুব অল্প অল্প করে কিছু দীর্ঘশ্বাস পড়ছিলো তার। সেই দীর্ঘশ্বাসগুলোর সাথে বেরিয়ে যাচ্ছিলো সব আবেগ। শুধু রয়ে গেছিলো বুকভর্তি ঘৃণা। নিজ হাতে বাবাকে দাফন করে বাড়ি ফিরেছিলো আসাদ। শোকে কাতর মা আর ছোট ভাই-বোন দুটোকে নিজে পৌঁছে দিয়ে এসেছিলো মামাবাড়িতে। তারপর কদিনের ভেতরেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গিয়েছিলো ইন্ডিয়া। দু সপ্তাহ হলো সেখান থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন প্রশিক্ষিত গেরিলা হিসেবে আবার নিজ জন্মভূমিতে ফিরেছে আসাদ। তার পিতার মতো এমন হাজারো পিতার মৃত্যুর বদলা নিতে হবে তাকে। সন্তানহারা হাজারো মায়ের চোখের পানির বিনিময়ে স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্যটা ছিনিয়ে আনতেই হবে।
সুমন মাঝি অভিজ্ঞ হাতে নৌকা ভিড়ালো ঘাটে। আসাদ আস্তে করে ডাক দিলো বাকি দুজনকে। দীপক আর শিবু তাদের স্টেনগান হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো। মাঝিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে আসাদ তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে সামনের বাঁশঝাড়ে ঢুকে গেলো। ঘন বাঁশঝাড়ে বসে তারা আরেকটু রাত হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলো। আসাদ চুপচাপ পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। শিবু একটা বিড়ি ধরিয়ে অন্য হাতে ধরে রাখা স্টেনগানটার দিকে তাকিয়ে রইলো। নির্লিপ্ত মানুষ সে। কখনো মুখ দেখে তার মনের ভাব ধরতে পারা যায় না। আসাদ বুঝতে পারে না এই মানুষটাকে। নিজের সম্পর্কে কাউকে কিছু বলে না শিবু। শুধু নির্লিপ্ততার মূর্তিমান উদাহরণ হয়ে অস্ত্র কাঁধে হেঁটে বেড়ায় যতদূর শত্রুপক্ষের সীমানা কাঁটাতার দিয়ে আলাদা করে দেওয়া। দীপক কিছুক্ষণ থেকেই কেমন উশখুশ করছে। নৌকায় শিবুর সাথে বসে থাকার দরূণ কথা বলার সুযোগ পায়নি বেচারা। এখন কথা বলার একটা ছুঁতো খুঁজছে। দীপক দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠতম সদস্য। তার কৈশোরসুলভ চঞ্চলতায় পুরো মুক্তি ক্যাম্প মাতিয়ে রাখে সে। আসাদ ব্যাপারটা খেয়াল করে জানতে চাইলো, ‘ দীপক, কিছু বলবা? ‘
‘ আমরা রওনা হমু কখন? ‘
‘ আরেকটু অন্ধকার নামুক, তারপর। ‘
দীপক কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলো। মায়ের সাথে একবার দেখা করে আসতে মন টানছে তার। মুখ ফুটে সেকথা কি করে বলে! আরেকটু বাদেই তাদের মিশন। আসাদ বুঝতে পারলো। সব আবেগ সেদিন চলে যায়নি তার। দু, আপনজনের অনুপস্থিতির বেদনা সবই পোড়ায় তাকে। আসাদ কোমল স্বরে দীপককে বললো, ‘ মায়ের লাইগা মন টানে? ‘
দীপক মাথা নিচু করে আস্তে করে শুধু ঘাড়টা উপর-নিচ করলো। আসাদ তাকে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলো। তবে শর্ত দিয়ে দিলো যে খুব সাবধানে থাকতে হবে এবং এক ঘণ্টার ভেতরেই চলে আসতে হবে। খুশিতে দীপকের মুখটা চিকচিক করে উঠলো। তারপর স্টেনগানটা শালের ভেতরে রেখে বেরিয়ে এলো বাঁশঝাড় থেকে। সতর্ক পায়ে হাঁটা দিলো বাড়ির দিকে। হতভাগিনী মা তার পথ চেয়ে আছেন।
দীপক যাওয়ার ঘণ্টাদেড়েক হয়ে গেছে। এখনো আসার নামগন্ধ নেই। আসাদ অধৈর্য হয়ে পড়লো। ধরা পড়ে গেলো না তো ছেলেটা? সে শিবুকে জানালো তার আশংকার কথা। শিবু নির্লিপ্ত মুখে বললো, ‘ আমারো তাই মনে হইতেসে। ‘ সদা নির্লিপ্ত শিমুর কণ্ঠে শংকার আওয়াজ পেয়ে আসাদের ভয় লেগে উঠলো। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সে। দীপকের বাড়ি পর্যন্ত যাবে তারা, গিয়ে দেখবে দীপকের আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন। আসাদ প্রথমে সুমন মাঝিকে গিয়ে জানালো যে, যদি ঘণ্টাখাকের মধ্যে তারা কেউ না ফিরে তবে যেন সে ওপারে গিয়ে কমান্ডারকে খবরটা দেয়। তখন তিনি যা ভালো বুঝবেন তা করবেন। তারপর শিবুকে সাথে নিয়ে ঝোঁপঝাড় ঘেষে দীপকের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো আসাদ। ছেলেটার কিছু হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না সে।
দীপকের মা তার বুকের মানিককে কাছে পেয়ে আনন্দে একদম আত্মহারা হয়ে গেলেন। একবার হাসতে হাসতে ছেলের সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দেন, তো আরেকবার বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদেন। ছেলে বেঁচে আছে এটাই যেন তাঁর বিশ্বাস হচ্ছে না। দীপক অনেক কষ্টে তার মা-কে শান্ত করলো। বুঝিয়ে বললো যে আজ রাতে তাদের একটা মিশন আছে। তাই হাতে একদমই সময় নেই। বিচলিত মা শান্ত হলেন। ছেলের জন্য গরম গরম ভাত রাঁধতে বসে গেলেন। দীপক মায়ের পাশে বসে তার গেরিলা দলের গল্প করতে লাগলো। এমন সময় বাইরে কে যেন কড়া নাড়লো। সাথে সাথে দীপক স্টেনগান বের করে ফেললো। ফিসফিস করে তার মা কে বললো, ‘ আমি খাটের নিচে লুকাইতেসি। তুমি বাইর হয়া কও কেউ নাই ঘরে। ‘ পুত্রের বিপদের আশংকায় কাতর মা দরজা ঠেলে বাইরে বের হলেন। নজর আলি আর বেশ কজন মিলিটারি দাঁড়িয়ে আছে!
‘ ঘরে কে? ‘
দীপকের মা ঘোমটার আড়াল থেকে জবাব দিলেন, ‘ কেউ নাই। আমি একলা।’
নজর আলির কাছে খবর এসেছে গ্রামে মুক্তি ঢুকেছে। আর গ্রামের যেসব ছেলের নাম মুক্তি সন্দেহে লিস্টে তোলা আছে, সেখানে দীপকের নামও আছে। তাই নজর আলি দীপকের মায়ের কথা বিশ্বাস করলেন। তিনি ইশারা করতেই দুজন সৈন্য সামনে এগিয়ে এলো। তারপর বন্দুকের বাঁট দিয়ে এক বাড়ি মেরে মাটিতে শুইয়ে দিলো। মহিলা আর্তচিৎকার করে উঠলেন। নজর আলি তার বুকে একটা লাথি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ দীপক কুত্তার ছাওটা কই? ‘
মহিলা মুখ ভর্তি থুতু ছুড়ে মারলেন নজর আলির মুখে। ক্ষেপে গিয়ে নজর আলি আরেকটা লাথি মারলেন বৃদ্ধাকে। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলেন মহিলা। আর সহ্য করতে পারলো না দীপক। স্টেনগান হাতে দৌড়ে চলে আসলো বাইরে। ‘ বেজন্মার বাচ্চা ‘ বলে স্টেনগান দিয়ে বাড়ি মেরে দিলো নজর আলি। নজর আলি বাড়ি খেয়ে পড়ে যেতে যেতে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ গোলি মাত করো। জিন্দা পাকড়াও ইসে। ‘ পাক সৈন্যরা ঘিরে ফেললো দীপককে। নজর আলি মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় চিৎকার করে বললেন, ‘ একদম নড়বি না, দীপক। নইলে তোর মা রে মাইরা ফালামু। ‘ কথাটা শুনে দীপক তার হাতের স্টেনগান ফেলে দিলো। সাথে সাথে এক সৈন্য বন্দুকের বাঁট দিয়ে বাড়ি মেরে দিলো দীপকের মাথায়। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো দীপক। তারপর সেই অজ্ঞান দেহকেই মরা কুকুরের মতো টেঁনে হিঁচড়ে ক্যাম্পের দিকে নিয়ে চললো। সবার আগে নজর আলি। স্টেনগানের আঘাতে মাথার চামড়া কেটে রক্ত পড়ছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। গ্রামে মুক্তি ঢুকেছে! তিনি এতদিন শুধু শুনেছেন দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিরা গেরিলা হামলা চালাচ্ছে। আলতানগরেও যে মুক্তি ঢুকবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি তিনি। এই বেজন্মাটার থেকে সব কথা বের করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে জোর পদক্ষেপে হাঁটতে লাগলেন নজর আলি। দীপকের বাড়ির সামনে তার বৃদ্ধা মা তখন ফ্যালফ্যাল করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। উপরে বোধহয় ভগবান বলে কেউ নেই। নইলে তার সৃষ্ট মর্ত্যে পিশাচেরা হাসিমুখে হেঁটে বেড়ায় কি করে? বাঁশঝাড়ে শনশন করে বাতাসের ফিসফিসানি উঠে। এক অসহায় মায়ের বোবা কান্না ধীরে ধীরে ঘুরপাক খায় পিশাচের রাজত্বে।(চলবে)

এইচ এস সি শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম

 

প্রসব পরবর্তীকালীন বিষণ্ণতা

ডা.সংগীতা হালদার রায়


কিছুদিন আগে এক দাওয়াতে গিয়ে ‘বেবি ব্লুজ’ বা ‘প্রসব পরবর্তীকালীন বিষণ্নতা’ নিয়ে কথা উঠেছিলো।

টেবিলে বসা পুরুষদের একাংশের ধারণা এটা মর্ডাণ মেয়ে / মায়েদের হয় যেহেতু তারা ক্যারিয়ার / শপিং / স্টাইলিং ইত্যাদিকে জীবনে অত্যাধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকেনন যা আগের যুগের মায়েদের বেলায় হত না।

সেই রাত থেকেই মনে হচ্ছে একজন ডাক্তার ও মা হিসেবে আমার উচিত আমার বন্ধুদের কিছু জানানো যা আমি জানি;

বেবি ব্লুজ : বই অনুযায়ী ৭০% – ৮০% মায়েদেরই হয়। আমার ধারণা আরো বেশি সংখ্যায় হয়ে থাকে কিন্তু ডাক্তারের কাছে ‘কেস’ খুব কম আসে বলেই বই এ ডকুমেন্টারি কম আছে।

হওয়ার কারণ : প্রেগন্যান্সির সময় প্রয়োজনয়ীয় হরমোন ১০০ – ১০০০ গুন (100- 10000 fold decrease) কমে যাওয়া এবং MAO – A হরমোনের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া যা ব্রেইন সেলে বিষণ্নতা উৎপন্নকারী হরমোন বাড়িয়ে দেয় ।

সময় : প্রসবের পর থেকে শুরু হয় এবং ২-৩ সপ্তাহ স্থায়ী হয় সাধারণত । দিনে কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘন্টা হতে পারে এর স্থায়ীত্বকাল ।

স্টেজ: মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায় ।

(লক্ষণ সমূহ হিসেব করলে ডাক্তারী হিসেব মতে মোট ৬ টা স্টেজ , কিন্তু যারা ডাক্তার নন আবার সচেতন থাকতে চান তারা তিনটা জানলেই চলবে )

ক) বেবি ব্লুজ
মন খারাপ হয় কারণ ছাড়া, শুধু শুধুই কান্না পায় ( weeping ), খুব বেশি গুরুতর কারণ ছাড়াই বিরক্তি লাগে , মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে , বাচ্চা ও বাচ্চার যত্ন নিয়ে অতিরিক্ত টেনশন হয় (বাচ্চার বাবার কোলে বাচ্চা দিতেও টেনশন হয় )

প্রতিকার
শুধু মিষ্টি ব্যবহার , সহানুভূতিসম্পন্ন কথা ও ব্যবহার (তুমি ঠিক পারবে , সবারই এরকম অসুবিধা হয় আর এটাই স্বাভাবিক) বাচ্চা সামলাতে সহানুভূতিশীল সাহায্যই যথেষ্ট’
‘আমরা তো অমুক করেছি’ বা ‘আমরা যেন আর বাচ্চা সামলাই নাই ‘ টাইপ কথা বলা মানুষজনকে ১০০ x ২ = ২০০ হাত দূরে রাখা খুব দরকার।

খ) পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন 
বাচ্চা হবার তিন মাস পরেও যখন লক্ষণসমূহ থেকেই যায় বরং আগের সমস্ত লক্ষণ আরো প্রকট হয় , নিজের ছোট্ট বাচ্চাকে সহ্য করতে না পারা , নিজের উপরে নিজের অসন্তোষ , নিজের ক্যারিয়ার + নিজের রূপ সবকিছু নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা, নিজের জীবনের প্রতি মায়া চলে যাওয়া।

প্রতিকার
কোন এমন মানুষের সাথে মনের কথা বলা যার উপরে মা পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন , বাচ্চা সামলানোর জন্যে সাহায্যকারী যাতে মা অন্য কিছু করেও নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে পারেন, একটু কোথাও ঘুড়ে আসা তা পাশের পার্কেও হতে পারে

গ) পোস্টপারটাম সাইকোসিস 
মা মনে করতে থাকেন শুধু তিনি মরে গেলেই মানুষ বুঝবে যে তিনি তার শিশুকে কত্ত ভালোবাসতেন , আত্মহত্যার প্রচেষ্টা এবং শিশুকে মেরে ফেলার ঘটনাও লিপিবদ্ধ আছে ।

পরিশেষে বলবো , এরকম আগেও হত ( ঘরে ছোট ভাইবোন আসার পরে মায়ের পিট্টি খাওয়া বা অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে মায়ের খিটখিটে হয়ে যাওয়া বা মা- বাবার / মা- দাদীর ঝগড়া বেড়ে যাওয়ার স্মৃতি মনে করে দেখুন ) আর এর সাথে ‘MODERNISM’ কোন সম্পর্ক নেই ।

‘উত্তম ব্যবহারেই উন্নত বংশের পরিচয়’ আর ‘সৃষ্টিকর্তাও একজন প্রসবিনীর প্রসব-পূর্ব সমস্ত পাপ মাফ করে দেন’ এগুলো তো অনেক প্রচলিত জানা কথা ।
কাজেই একটু ধৈর্য ধরে সহানুভূতিশীল ব্যবহার করুন। কারণ প্রতিটি মা-ই তার সন্তানকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন । তাকে মন ও শরীরে সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মা হয়ে ওঠার সময়টুকু দিন প্লিজ।

ফরমাল লেকচারার
শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

 

রাজধানী শহর ঢাকায় দূষণ বেড়েছে ৮০ ভাগ

বাতাসকে পরিশুদ্ধ করতে পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর একটি প্রচেষ্টা স্পষ্টতই সাফল্য পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। গত দশ বছর ধরে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা’র একটি স্যাটেলাইটের পর্যালোচনায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অরা মিশন নামের এই স্যাটেলাইটটি ২০০৪ সালে উৎক্ষেপণ করা হয় বিশ্বজুড়ে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইডের নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ করতে।

পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে এই দূষণের মাত্রা কমেছে। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশ-সহ এশিয়ার কিছু দেশে দূষণের হার বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় এই দূষণের হার গত দশ বছরে বেড়েছে শতকরা আশি ভাগ পর্যন্ত। আর চীনে এই বৃদ্ধির হার শতকরা ২৫ ভাগ।
অপরপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে গত দশ বছরে নাইট্রোজেন দূষণের হার কমে গেছে শতকরা ২০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত।

সার্বিক বিচারে গত দশ বছরে বিশ্বে গড়ে এই গ্যাসের দূষণ অবশ্য কমেছে শতকরা ১৪ ভাগ হারে। নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড গ্যাস মূলত জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর ফলে নিঃসারিত হয়।

সংক্ষেপে ‘এনওটু’ নামে পরিচিত এই গ্যাসটির মূল উৎস গাড়ির নির্গমন পাইপ ও কয়লা পোড়ানো হয় এমন শিল্প কারখানা।

হলদে-বাদামী এই গ্যাস মানুষের শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মক প্রদাহের কারণ। এটি বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগে ওজোন গ্যাস বাড়াতেও ভূমিকা রাখে।

অরা মিশন থেকে প্রাপ্ত গত দশ বছরের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এর ফলাফল আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের এক বৈঠকে উপস্থাপন করেন বিজ্ঞানীরা।
সুত্র: ইন্টারনেট

 

ঝড়ের দিন: পর্ব – ৩

তানজীল আহমদ সিদ্দিকী


যে রাতে মেজর ওয়াসিম খানের নির্দেশে নকূল বাউলকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তার পর চার চারটে মাস পেরিয়ে গেছে। আলতানগরের পরিবেশ আর আগের মতো নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখন আর ক্ষেতের আইল জুড়ে ঘুড়ি হাতে উড়ে বেড়ায় না। জমির উদ্দিনের বাড়ির উঠোনে এখন আর মার্বেল খেলার আসর জমে না। রাতের বেলা ছোট বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে গেলে মায়েদের আর বর্গির গল্প করতে হয় না, উড়ে এসে জুড়ে বসা হায়েনার দলকে এখন তারা ভালোভাবেই চেনে। আজকাল মাগরিবের আজান পড়ে গেলে সে-ই যে সবাই ঘরে ঢোকে, বিশেষ কোন প্রয়োজন না পড়লে ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ বের হয় না। মড়ক লাগা গ্রামে যেমন চারদিক সুনসান থাকে, আলতানগরের অবস্থাও এখন তেমনি। মড়ক এখানেও লেগেছে, আতংকের মড়ক।
নজর আলির পরামর্শ মতো গ্রামের স্কুলেই মিলিটারিরা ক্যাম্প বসিয়েছে। আশপাশের দশ-বারোটা গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্যাম্প এটাই। মুসেগুল থেকে জীপভর্তি সৈন্য এনে এখানে মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের অত্যাচারে গ্রামবাসীর জীবন বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে মশামাছির মতো মেরে ফেলা হয়। মানুষ মারতে তাদের কোন অজুহাতের প্রয়োজন পড়ে না তাদের। দুদিন আগে দুজন মিলিটারি ক্ষেতের আইল দিয়ে হাঁটছিলো। সেখানে তাদের একটা মোটাসোটা ছাগী চোখে পড়ে। ক্ষেতে গাঁড়া খুঁটিতে বাঁধা ছিলো ওটা। মিলিটারি দুজন দড়ি খুলে সেই ছাগল নিয়ে হাঁটা দেয় ক্যাম্পের দিকে। এমন সময় ছাগলের মালিক দৌঁড়ে এসেছিলো। মিলিটারি দুজনের পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো ছাগীটা না নিয়ে যেতে, গরীব মানুষ ও। অসহায় মানুষটাকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে মারতে মারতে ক্যাম্পে নিয়ে গেছিলো ওরা। পরদিন সকালে, গ্রামবাসীরা রাস্তার একধারে খুঁজে পায় হতভাগ্য লোকটার মৃতদেহ। নকূল বাউলের মতোই ফেঁড়ে ফেলা হয়েছে দেহটা। টুঁ শব্দটি করতে পারেনি কেউ। হাতে দা-কাস্তে নিয়েও নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিলো তারা। রাইফেল কাঁধে পিশাচের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর হিম্মত তাদের নেই। দুমাস আগে এই মানুষগুলোই তপেশ মাস্টারের বাড়িতে বসে শেখ সাহেবের কণ্ঠে যখন শুনেছিলো – ” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ” তখন চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলো। কোদাল আর কাস্তে হাতে মিলিটারির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা ভেবেছিলো। সব স্বপ্নের আগুন নিভে গেছে। পরিবার পরিজন নিয়ে একেকটা দিন বেঁচে থাকাটাই যখন সংগ্রাম, স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন কুহকিনীর মিথ্যে আশ্বাস।
আজকাল নজর আলির কাজের অন্ত নেই। পিস কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তার কাঁধে এখন প্রচুর দায়িত্ব। মেজর সাহেবের খেদমতের দায়িত্ব তিনি নিজ হাতে কাঁধে তুলে নিয়েছেন। মেজর সাহেবের প্রতিবেলার খানাদানা থেকে শুরু করে অবসর সময়ে বিনোদনের ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছু তিনি নিজে দেখভাল করেন। মেজর সাহেব বহুদিন ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। জোয়ান মানুষ, শরীরে যে মাঝেমধ্যে বেচাইন করে সে তিনি ভালোভাবেই বোঝেন। তাই অবসর সময়ে একটু আধটু বিনোদনের জন্য মাঝেমধ্যেই ক্যাম্পে মেয়ে পাঠান তিনি। গ্রামে কোন কোন ঘরে সুন্দরী যুবতী আছে সব তার জানা। সেসব ঘর থেকেই যুবতী মেয়েদের জোর করে তুলে আনেন তিনি। সৈন্যরাই টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে, তিনি শুধু প্রয়োজনীয় নির্দেশটুকু দেন। এই তো সেদিনই জামাল নাপিতের বড় মেয়েটাকে তুলে আনতে গেছিলেন। চোখ ধাঁধানো রূপ মেয়ের। মেয়েটাকে কায়দামতো পেলে তিনিই ভোগ করতেন, মেজরের জন্য নিয়ে যেতেন না। সৈন্যরা যখন টেনে হিঁচড়ে বের করছিলো মেয়েটাকে, জামাল নাপিতের বৌটা দা হাতে ছুটে এসেছিলো তার দিকে। আরেকটু হলেই ঘাড় থেকে তার মাথাটা নেমে যেতো যদিনা এক সিপাহী মহিলাকে গুলি না করতো। নজর আলি মেয়েটাকে সেদিন তার মায়ের লাশের উপর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে এনে ক্যাম্পের একটি ঘরে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। পরে শুনেছিলেন শুধু মেজর না, ক্যাম্পের প্রায় সব সৈন্যই সেদিন রাতটা সেই ঘরে কাটিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত মেয়েটার পরিণতি কি হয়েছে সেটা জানা নেই তার, জানার ইচ্ছেও নেই। এমন কত গণিমতের মাল আসবে আর যাবে!
শেষ বিকেল। সূর্য বিদায় নেবার আগে তার শেষ রশ্মিটুকু অকাতরে বিলাচ্ছে। বাড়ির উঠোনে সেই রশ্মিগুলো কানামাছি খেলছে। তপেশ মাস্টার জানালা দিয়ে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছেন। বয়স তার চল্লিশের উপর। শান্ত সৌম্য চেহারা। জুলফির গোড়ায় খানিক পাকা চুল ছাড়া বয়সের চিহ্নমাত্র পাওয়া যায় না। তবে এ কদিনে স্বাস্থ্যের বেশ অবনতি ঘটেছে তার। আর হবে নাই বা কেন! মাত্র কয়েক মাসে সবই কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে। মূর্খ পশুগুলো তার স্কুলটা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে তারা ক্যাম্প বসিয়েছে। যে ঘরগুলোতে বসে বাচ্চারা অ আ শিখতো, সেই ঘরগুলোতে এখন মানুষ জবাই হয়। মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়। সব দেখে শুনেও কিছু করতে না পারার অক্ষমতার গ্লানিতে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছেন তিনি। কদিন ধরে কানাঘোষা শুনছেন দেশের অনেক জায়গায় নাকি পাক হানাদারদের সাথে খন্ড খন্ড যুদ্ধ হচ্ছে। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষরাই এই যুদ্ধে শামিল হয়েছে। আশেপাশের গ্রামের অনেকেই নাকি ইন্ডিয়ায় পালিয়ে গেছে। সেখান থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার দেশে ঢুকবে। তারও ইচ্ছে হয় সেই সংগ্রামীদের সাথে যোগ দিতে কিন্তু সন্তান সম্ভাবা স্ত্রী আর ছোট বোনটাকে এই নরকে ফেলে রেখে যাবেনই বা কি করে? তিনি কিংবা তাঁর স্ত্রী কারোরই তিনকূলে কেউ নেই যে কোন আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠবেন। শেষপর্যন্ত মনে হচ্ছে ইন্ডিয়াতেই পালিয়ে বাঁচতে হবে। এমন সময় একটা ডাকে তপেশ মাস্টারের ভাবনায় ছেদ পড়লো।
‘ মাস্টার! ও মাস্টার! একটু বাইরে আহো।
তপেশ মাস্টার চিনতে পারলেন গলাটা। নজর মেম্বার এসেছে। লোকটা সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত, যখন যেখানে যায় মৃত্যুর দুর্গন্ধ ছড়ায়। তিনি তাড়াতাড়ি তার বোন আর স্ত্রী-কে ডেকে বললেন, ‘ তোমরা কিছুক্ষণ বাড়ির পেছনে খড়ের গাদায় লুকিয়ে থাকো। আমি না বলা পর্যন্ত বের হবা না। ‘ বিনাবাক্য ব্যয়ে তারা তার নির্দেশ মেনে বাড়ির পেছনে চলে গেলো। তপেশ মাস্টার উঠোনে গিয়ে দেখলেন নজর আলি, সবুজ আর পাঁচ-ছজন মিলিটারি দাঁড়িয়ে আছে।
‘ কি ব্যাপার মেম্বার? এসময়ে এখানে? ‘
‘ মেজর সাব তোমারে তলব করসেন,মাস্টার। পুরা পরিবার সহ। ‘
‘ আমি ওদের আগেই অন্য জায়গায় রেখে এসেছি। আর তোমার মেজরকে গিয়ে বলে দিও, আমি তার হুকুমের চাকর নই যে তিনি তলব করলেই সাথে সাথে দৌঁড় দেবো। দরকার পড়লে তিনি নিজে এসে যেন আমার সাথে দেখা করে যান। ‘
‘ তোমার তেজ খুব বাড়সে, মাস্টার। ছুটাইতেসি তেজ ‘, বলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিপাহীকে হাত দিয়ে ইশারা দিলেন। সাথে সাথে সেই সিপাহী তপেশ মাস্টারের তলপেটে সজোরে লাথি মারলো। তপেশ মাস্টার মাটিতে ছিটকে পড়লেন। বাকি সিপাহীরা এবার এগিয়ে আসলো। বন্দুকের বাঁট দিয়ে উপর্যুপরি মারতে লাগলো মাস্টারকে। মাথায় একটা শক্ত বাড়ি খেয়েই তপেশ মাস্টার অজ্ঞান হয়ে গেলেন। নজর আলি তখন দুজন সৈন্যকে নির্দেশ দিলেন তপেশ মাস্টারকে যেন মরা কুকুরের মতো হিঁচড়ে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। আর বাকি চর সৈন্যকে নির্দেশ দিলেন পুরো বাড়ি খুঁজে দেখতে। মেয়েমানুষ দুটো যাবে কোথায়! একটু বাদেই নারীকণ্ঠের চিৎকার শোনা গেলো। সৈন্যরা নির্দয় হাতে টেনে হিঁচড়ে তপেশ মাস্টারের ষোড়শী বোন আর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী-কে নিয়ে এলো। তপেশ মাস্টারের বোনকে দেখে নজর আলির ভেতরে আবার কামনার আগুন জ্বলে উঠলো। মেয়েটাকে ঘরে আটকে রেখে এখানেই…! না, নজর আলি নিয়ন্ত্রণ করলেন নিজেকে। ঘটনাটা জানতে পারলে মেজর রেগে যাবেন। নজর আলি তপেশ মাস্টারের বৌকে এখানেই শেষ করে দিতে বলে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যাওয়া মেয়েটার হাত ধরে টানতে টানতে ক্যাম্পের দিকে হাঁটা দিলেন। সাথে রইলো আরেক সৈন্য। বাকি তিন সৈন্য চিৎকার করে কাঁদতে থাকা অসহায় প্রসূতি মহিলাটাকে টানতে টানতে জঙ্গলের দিকে নিয়ে গেলো।
তপেশ মাস্টারের স্ত্রী সৈন্যগুলোর পায়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘ আপনারা আমার ভাইয়ের মতো। ছাইড়া দেন আমারে। ভাই হয়া বোনের ইজ্জত নিয়েন না। ‘
সৈন্যরা অট্টহাসি দিয়ে উঠলো। বাঙ্গালি নারী তো বরাবরই তাদের কাছে ভোগের সামগ্রী, ” বেহেন ” হতে যাবে কোন দুঃখে! মানুষের মতো দেখতে সেই হায়েনাগুলো তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লো অসহায়ভাবে পড়ে থাকা সেই মহিলার উপর।
একটা নারীকে শারীরিকভাবে যত রকমভাবে অসম্মান করা যায়, সব করলো তারা। উপর্যুপরি কয়েকবার গণধর্ষণ শেষে হতভাগিনী মহিলা যখন তার মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, তখন পশুগুলো তার পেট বরাবর বেয়োনেট চার্জ শুরু করলো। অবাক প্রকৃতি নিশ্চুপ শুনে গেলো এক মৃত্যুপথযাত্রী গর্ভবতী মায়ের অসহায় আর্তনাদ। পৃথিবীর প্রতি একরাশ ঘৃণা আর অভিমান নিয়ে তপেশ মাস্টারের হতভাগিনী স্ত্রী অবশেষে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। নরপশুগুলো প্যান্ট পরা শেষ করে বেল্ট পড়তে পড়তে হাঁটা দিলো ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তপেশ মাস্টারের মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রী-র মৃত্যু চিৎকার সহ্য করতে না পেরে যে কাকটা উড়ে চলে গিয়েছিলো, সে-ই কাকটা আবার এসে বসলো বিশাল বড় আমগাছটার মগডালে। তারপর স্থির চেয়ে রইলো হাঁটতে হাঁটতে দূরে সরে যাওয়া মিলিটারিদের গমনপথের দিকে। মানুষ অনেক দেখেছে সেটি। তবে অমানুষ বোধহয় এই প্রথম দেখলো! (চলবে)

এইচ এস সি শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম

 

গল্পে গল্পে বাচ্চাদের শেখানো

আফরোজা হাসান


বাগানে বসে কাজ করছিলো সিহাব। হঠাৎ কান্নার শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখল ভাতিজা আয়াত কান্না করতে করতে আসছে। অতি প্রিয় চাচ্চুকে দেখে আয়াতের কান্নার শব্দ আরো বেড়ে গেলো।কাজ বন্ধ করে ভাতিজাকে ধরে সিহাব বলল, কে ছেড়ে দিলো চোখের নল, ঝরছে অঝোর ধারায় জল।মোর আঁখিও ছলছল, এখনি বুঝি নামবে ঢল। চাচ্চুর ইন্সট্যান্ট কবিতা শুনে আয়াতের চোখে আনন্দের ঝিলিক দিয়ে উঠলেও সে কান্না জারি রাখলো।

-আরে আরে কি হয়েছে আমার সোনা বাবাটার? কেন কান্না করছেন আপনি বাবা? ব্যথা পেয়েছেন নাকি কেউ মেরেছে?

-(ফোঁপাতে ফোঁপাতে) নুবাঈদ আমার খেলনা নিয়ে গিয়েছে। সকালে তামান্না আমার চকলেট নিয়ে গিয়েছিলো। সবাই আমার কাছে থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে যায় সবসময়।

-(হাসি চেপে) সবাই তোমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে যায়?

-(পুতুলের মত মাথা দুলিয়ে) হ্যা সবকিছু নিয়ে যায়।

-তুমি নিতে দাও কেন? কাউকে কিছু বলো না কেন?

-দাদুভাই আমাকে বলেছে কাউকে কষ্ট দিতে নেই। তা না হলে আল্লাহ রাগ করবেন আমার উপর।

-দাদুভাই তোমাকে কাউকে কষ্ট দিতে মানা করেছেন কিন্তু আত্মরক্ষা করতে তো নিশ্চয়ই মানা করেননি।

-দাদুভাই বলেছেন কারো সাথে রাগ না করতে। কাউকে কষ্ট না দিতে।

-(হেসে) আচ্ছা ঠিকআছে। এখন তুমি কান্না বন্ধ করো। চলো তোমাকে চাচ্চু একটা গল্প শোনাই। শুনবে গল্প?

-(চোখ মুছে হাসি মুখে) হ্যা শুনবো।

-(ভাতিজাকে কোলে বসিয়ে আদর করে দিয়ে) এক গ্রামের রাস্তার ধারে এক সাপ বাস করতো। ভীষণ ছিল তার আকৃতি। সে যখন ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করতো তখন রক্ত হীম হয়ে আসতো।

-সাপটার নাম কি চাচ্চু?

-সাপটার নাম মিস্টার ফোঁস ফোঁস। কারণ রাস্তা দিয়ে মানুষ যেতে দেখলেই সে ফোঁস ফোঁস করে তার দিকে তেড়ে আসতো আর কামড় দিতো। বিনা দোষে পথচারীরা প্রাণ হারাতো। মিস্টার ফোঁস ফোঁসের এই অত্যাচারের কারণে সেই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো। একদিন এক সাধু সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন।

-দুষ্টু মিস্টার ফোঁস ফোঁস সাধুকেও কামড়ে দিলো তাই না চাচ্চু?

-শোনই না তারপর কি হল। মিস্টার ফোঁস ফোঁস তো অনেকদিন পর মানুষের দেখা পেয়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে ছুটে এলো। কামড়ে দেবার দেবার আগেই সাধু তার মন্ত্রের জোরে তাকে বশ করে ফেললো। সে তখন মাথা নত করে চুপ করে থাকলো। সাধুটি কাছে বসে বললেন, অকারণে মানুষকে কষ্ট দিয়ো না, কারো ক্ষতি করো না, হিংসা পরিত্যাগ করো পুরোপুরি এবং পারলে মানুষের উপকার করবে। উপদেশ দিয়ে তো সাধু চলে গেলেন।

-মিস্টার ফোঁস ফোঁস কি তখন ভালো হয়ে গেলো চাচ্চু?

-বলছি কি হলো। এরপর তো অনেকদিন পার হয়ে গেলো। হঠাৎ একদিন সাধুটি ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন মিস্টার ফোঁস ফোঁস রাস্তার এক কোণে পড়ে আছে। তার শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। সাধু তখন এগিয়ে গিয়ে বললেন, তোমার এই অবস্থা কি করে হল? সে জবাব দিলো, আপনার উপদেশ মানতে গিয়ে। সাধু অবাক হয়ে বললেন, সেটা কি করে? বলল, আপনি বলেছিলেন হিংসা ত্যাগ করো, কাউকে কষ্ট দিয়ো না। যখন থেকে আমি তা করছি সবাই আমার উপর অত্যাচার করছে। এখানকার ছেলেরা আমাকে মেরে এক কোনায় ফেলে রেখেছে। আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি। তখন সাধু বললেন, আরে বোকা আমি তোমাকে হিংসা পরিত্যাগ করতে বলেছি, কাউকে অকারণে কষ্ট দিতে মানা করেছি কিন্তু আত্মরক্ষা করতে তো নিষেধ করিনি। তুমি অবশ্যই কারো ক্ষতি করবে না এবং সেই সাথে কেউ যাতে তোমার ক্ষতি করতে না পারে তাই ফোঁস ফোঁস করে তাদের ভয় দেখানোতে কোন দোষ নেই। এখন বলো কি বুঝলে গল্প থেকে?

-আত্মরক্ষা করবো কিন্তু কাউকে কষ্ট দেবো না। আমি কারো ক্ষতি করবো না এবং কেউ যাতে আমার ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনে প্রতিবাদ করবো।

-(হেসে) মাশাআল্লাহ! এই তো তুমি বুঝে গিয়েছো। এখন তাহলে কি করতে হবে?

-নুবাইদকে প্রতিবাদ করতে হবে। জাযাকাল্লাহ চাচ্চু আমাকে বুঝিয়ে বলার জন্য। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।

চাচ্চুর কোল থেকে নেমে প্রতিবাদ করতে ছুটল আয়াত। আর সিহাব হেসে কাজে মন দিলো।

@সাইকোলজি (পিএইচডি)