banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Monthly Archives: January 2026

শিশুদের রক্তে বিপজ্জনক সিসা: প্রসাধনী, ব্যাটারি ও ধূলাবালিতে ঝুঁকি

বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের শরীরে সিসার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩.৫ কোটি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা রয়েছে। বিশেষত রাজধানী ঢাকায় দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯৮ শতাংশের রক্তে সিসার পরিমাণ নিরাপদ সীমার দ্বিগুণ শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন, শিশুদের জন্য রক্তে সামান্য সিসাও ক্ষতিকর। এটি মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করে, যার ফলে বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত জটিলতা এবং শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তীব্র মাত্রায় সিসার সংস্পর্শে খিঁচুনি, কোমা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু যা প্রাকৃতিকভাবে মাটি ও খনিজে থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এটি এখন খাবার, পানি, বাতাস, প্রসাধনী, খেলনা, রান্নার হাঁড়ি-পাত্র এবং ঘরের ধূলাবালিতেও পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিসার প্রধান উৎস হলো ব্যাটারি ও সিসা-ভিত্তিক শিল্প, রঙ, প্রসাধনী, রান্নার সরঞ্জাম এবং ঘরের অভ্যন্তরে ধূমপান। নিঃশ্বাস, খাদ্যগ্রহণ কিংবা ত্বকের মাধ্যমে এই বিষ শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণের শরীরেও পৌঁছে যায়। শিশুদের স্বভাবগত কৌতূহল এবং জিনিস মুখে নেওয়ার প্রবণতা তাদের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) রক্তে সিসার পরিমাণ প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে তা বিপজ্জনক মনে করে। কিন্তু আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৬৭ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। শিল্প এলাকায় বসবাসরত শিশুদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় গড়ে ৪৩ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে ইউনিসেফ জানিয়েছে, শিশুদের সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারি রিসাইক্লিং এবং শিল্পকারখানার সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিসা শরীরের প্রায় সব অঙ্গকেই প্রভাবিত করে। এটি মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি এবং হাড়ে জমা হয় এবং গর্ভবতী নারীর মাধ্যমে ভ্রূণেও ছড়িয়ে পড়ে। অল্প পরিমাণ সিসাও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যার ফলে তাদের আইকিউ কমে যেতে পারে, মনোযোগ নষ্ট হয় এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি এটি রক্তাল্পতা, কিডনি দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রজনন অঙ্গের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগও অপরিহার্য। পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ শরীরে সিসার ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে পারে। অন্যদিকে দূষিত এলাকায় বাস এড়ানো, শিল্প ও ব্যাটারি কার্যক্রমকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সহায়ক হতে পারে।

আইসিডিডিআর,বি’র পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, হলুদ মশলার সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও নিয়মতান্ত্রিক উদ্যোগ সফল হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে সিসা সম্পর্কিত সকল শিল্প কার্যক্রমকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে আনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানোই সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

 

কাঁচা পেঁয়াজ: ছোট হলেও কাজে বড়!

রান্নায় তো আমরা সবাই পেঁয়াজ দিই, কিন্তু কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার অভ্যাস আছে কি? শুধু স্বাদ নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক গুণ!

🥗 পেঁয়াজে কী থাকে?
ফাইবার, ভিটামিন সি, ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, সালফার, পটাশিয়ামসহ নানা খনিজ উপাদানে ভরপুর এই ছোট সবজিটা।

✨ উপকারিতা
১. ঠান্ডা-কাশি থেকে শরীর রক্ষা করে
২.হজমে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়
৩. রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক
৪.ত্বক ও চুলের জন্য উপকারী
৫. হার্ট ভালো রাখে
৬. ফ্রি র‍্যাডিকেল দূর করে ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়
৭. শরীর ডিটক্সিফাই করে
৮.হাড়ের স্বাস্থ্যেও সাহায্য করে

🍽️ খাওয়ার নিয়ম:
সালাদে, ভাতের সঙ্গে কাঁচা খাওয়া, কিংবা স্যান্ডউইচ/চাটনিতে ব্যবহার—অনেক উপায়ে খাওয়া যায়।

⚠️ সতর্কতা:
অতিরিক্ত খেলে কারও কারও গ্যাস হতে পারে। সংবেদনশীল পাকস্থলীর ক্ষেত্রে একটু সতর্ক থাকুন।

📌 দিনে কতটুকু?
মাত্র ২৫-৩০ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজই যথেষ্ট।

💬 আপনি কাঁচা পেঁয়াজ খেতে পছন্দ করেন?
নাকি গন্ধের ভয়ে দূরে থাকেন?
কমেন্টে জানান তো!

 

৩৯ বছর পর্যন্ত পড়তেই জানতেন না, এখন তিনি বেস্টসেলিং লেখক!

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে জন্ম নেওয়া এক নারী, যাঁর শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য আর পারিবারিক অশান্তির মধ্যে। ১৫ বছর বয়সে গর্ভবতী, ১৩-তেই মা-বাবার বিচ্ছেদ, ১৬-র আগেই হারিয়েছেন সন্তান। জীবনে একের পর এক ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়া নয়, বরং ঘুরে দাঁড়ানোই বেছে নিয়েছেন তিনি।

তাঁর নাম ক্যারেন উডস।
একটা সময় পর্যন্ত তিনি জানতেন না কীভাবে একটি ই-মেইল লিখতে হয়। কারণ, তিনি ছিলেন নিরক্ষর। হ্যাঁ, ৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তেও জানতেন না তিনি। তখন ক্লিনারের চাকরি করতেন, হঠাৎ অফিস থেকে পদোন্নতি দেওয়া হলো-কাজ মেইল আদান-প্রদান করার। ভয় পেয়ে গেলেন ক্যারেন। পড়তেই না জানলে কী করে চলবে?

কিন্তু এখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেল।
প্রতিষ্ঠানই তাঁকে ভর্তি করে দেয় অ্যাডাল্ট লিটারেসি কোর্সে। ৩৯ বছর বয়সে হাতে খড়ি হলো তাঁর! লিখতে-পড়তে শিখলেন। আর সেই ক্লাসেই প্রথম ভাবনা এলো-“আমি একটা বই লিখতে চাই।”
সেই চিন্তা থেকে মাত্র তিন মাসে হাতে লিখে ফেলেন প্রথম উপন্যাস “ব্রোকেন ইউথ”।

কপাল খুলে যায় যখন তাঁর পাণ্ডুলিপি চলে যায় এক স্থানীয় পত্রিকার হাতে, সেখান থেকে বড় এক প্রকাশনী এম্পায়ার পাবলিকেশনস-এ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ক্যারেন উডসকে। একের পর এক ২৭টি বই প্রকাশ হয়েছে তাঁর, যার বেশিরভাগই ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার। সুপারমার্কেট থেকে শুরু করে অ্যামাজনের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে বেস্টসেলার তালিকায় উঠে এসেছে তাঁর বই।

তবে এত কিছুর পরও তিনি নিজের পরিচয় ভুলে যাননি। এখনো ক্লিনারের কাজ করেন, পাশাপাশি কাজ করেন স্কুলের বিহেভিয়ার টিমে এবং কারাগারে বন্দীদের জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ বিষয়ে অনুপ্রেরণা দেন।

“আমি চাই, ৪০ পেরোনো নারীরা জানুক—এখনো শুরু করা যায়। সন্তান থাকলেও, সংসার থাকলেও, স্বপ্ন দেখা থেমে যায় না। আমি আজও বাড়ি পরিষ্কার করি, স্কুলে কাজ করি, নাটক লিখি, বই লিখি—সব একসঙ্গে,” বলেন ক্যারেন।

তিনি বই বিক্রি করে খুব ধনী হয়ে যাননি-তবুও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক জীবন এখন তাঁর। কারণ, তিনি জানেন, সম্মান কখনো বয়স দেখে আসে না বরং আসে সাহস আর ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে।

🔗 এমন আরও বাস্তব জীবনের গল্প পেতে চোখ রাখুন আমাদের পাতায়।
আপনি নিজেও হতে পারেন ক্যারেন উডসের মতো কারো অনুপ্রেরণা।

 

ঢাবি ছাত্রীদের ছবি নিয়ে জবি নেতার কটূক্তি

(পর্দা ও নারীর ধর্মীয় অধিকারে আঘাতের অভিযোগে মানববন্ধন)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্যের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার ঢাবি শাখার সদস্যদের সাক্ষাতের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণভাবে শেয়ার করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (১০ আগস্ট) বিকেলে জবি ভাষা শহীদ রফিক ভবনের সামনে নারী শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান।

প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা বলেন, ইসলামের ফরজ বিধান “পর্দা” শুধু একটি পোশাক নয়—এটি মুসলিম নারীর ধর্মীয় অধিকার, মর্যাদা ও আবেগের প্রতীক। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এ নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা কটূক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী হুমাইরা বলেন, “আমরা ৯৪% মুসলিমের দেশে বাস করি। এখানে পর্দা নিয়ে কটূক্তি কোনো সৎ ও সভ্য মানসিকতার মানুষের কাজ নয়। ৫ আগস্টের পরও কেন আমাদের এ ধরনের মন্তব্য শুনতে হবে?”

নাট্যকলা বিভাগের তিশা বলেন, “পর্দা আমাদের অধিকার। এর প্রতি অবজ্ঞা বা কটূক্তি করা মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ।”

ইংরেজি বিভাগের সুমাইয়া বলেন, “এটি শুধু মুসলিম নারী নয়, মূলত সব নারীর মর্যাদাকে অপমান করেছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই—ভবিষ্যতে যেন কেউ পর্দা পালনকারী নারীদের নিয়ে কটূক্তি করার সাহস না পায়, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।”

এর আগে গত শনিবার (৯ আগস্ট) জবি শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢাবি উপাচার্যের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার সদস্যদের সাক্ষাতের ছবি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন এবং একাধিক মন্তব্যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের ঝড় ওঠে।

 

ভাল থাকাটাও এক ধরনের বিজ্ঞান -জানুন উপেক্ষিত খনিজের কথা

ঘুম থেকে উঠেই শরীরে ক্লান্তির ছাপ। মন ভার, অথচ কোনো দৃশ্যমান কারণ নেই। মাথা যেন কুয়াশায় ঢাকা, মেজাজ খিটখিটে, আর দিনটা শুরুই হলো এক রকম খারাপ লাগা নিয়ে। আপনি ভাবছেন, ঘুম তো ঠিকঠাকই হলো! তবে এই অস্বস্তি, মনমরা ভাব, শরীরের অলসতা— সবকিছুর পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে একটিমাত্র খনিজের ঘাটতি। এই খনিজ শরীরের গভীরে নীরব এক সৈনিক— প্রতিদিন লড়াই করে চলেছে আমাদের মেজাজ, পেশি, এমনকি হৃদয়ের সুস্থতার জন্য। নাম তার: ম্যাগনেশিয়াম।

সোডিয়াম বা ক্যালশিয়ামের মতো খনিজ আমাদের চেনা নাম। কিন্তু ম্যাগনেশিয়ামের কথা খুব কমই শোনা যায়, অথচ শরীরচর্চা হোক বা হরমোনের ভারসাম্য, এমনকি মন ভাল রাখার ক্ষেত্রেও এই খনিজের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে নারীদের শরীরে হাড় ও পেশির গঠনে ম্যাগনেশিয়াম এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শুধু তাই নয়, মাসিকচক্র স্বাভাবিক রাখতে এবং হরমোনজনিত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণেও এর অবদান উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো, এমনকি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ম্যাগনেশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও এটি কার্যকর। শরীরচর্চার সময় পেশিতে টান ধরা বা রাতের ঘুমের সময়ে হঠাৎ পায়ের পেশিতে ব্যথা— এর পেছনেও রয়েছে এই খনিজের ঘাটতি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, শরীরে ভিটামিন ডি যতই থাকুক, যদি ম্যাগনেশিয়াম না থাকে, তবে তা কার্যকর হয় না বললেই চলে।

অতিরিক্ত মেদ ঝরানো যেমন কঠিন কাজ, তেমনি ম্যাগনেশিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে তা সহজ হতে পারে। এই খনিজ হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে, শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে এবং শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতাও বাড়ায়। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়, আবার প্রয়োজনীয় পুষ্টিও মেলে।

ভয়ের কিছু নেই। এই প্রয়োজনীয় খনিজ পাওয়া যায় অনেক পরিচিত খাবারে, যেগুলো আপনার দৈনন্দিন রসনার অংশ হতে পারে অনায়াসেই।

সবুজ শাকসবজি: বিশেষত পালংশাক— একটি শক্তিশালী ম্যাগনেশিয়াম উৎস। এক কাপ রান্না করা পালংয়ে মিলবে প্রায় ৭৮ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম।

বীজ ও বাদাম: কুমড়োর বীজ, চিয়া বীজ, কাজুবাদাম— এদের প্রত্যেকটিই ম্যাগনেশিয়ামে পরিপূর্ণ। আধা কাপ কুমড়োর বীজে প্রায় ১৫০ মিলিগ্রাম, চিয়া বীজে ১১১ মিলিগ্রাম, আর কাজুবাদামে মিলবে ৭৮ মিলিগ্রামের মতো।

দানাশস্য: ডালিয়া, কিনোয়া, ওটস— এগুলোর মধ্যেও রয়েছে এই খনিজ। ভাতের বদলে মাঝে মাঝে এই দানাশস্যগুলি খেলে পেট ভরবে, পুষ্টিও মিলবে, আর ওজনও নিয়ন্ত্রণে আসবে।

ফলমূল: কলা ও পেঁপে— এই সাধারণ ফলগুলিও ম্যাগনেশিয়ামে সমৃদ্ধ। একটি মাঝারি কলায় আছে প্রায় ৩২ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম। সকালে এক গ্লাস কলার স্মুদি কিংবা পেঁপের স্যালাড— হতে পারে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর একটি শুরু।

দুগ্ধজাত খাবার: দুধ ও দইয়ের মধ্যেও রয়েছে পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম। দইয়ের প্রোবায়োটিক উপাদান হজম শক্তি বাড়ায় এবং প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকলে শরীর-মন দুটোই ভাল থাকে।

শেষ কথা
ভাল থাকাটা শুধু মানসিক মনোভাব নয়, এটা শারীরিক সুসমঞ্জস্যের ফলও বটে। অল্পতে মেজাজ হারানো, ক্লান্ত লাগা, বা একটানা মন খারাপ থাকা— এসবের পেছনে কারণ খুঁজতে গেলে আপনি হয়তো মনস্তত্ত্ব ঘাঁটবেন। কিন্তু একবার খাবারের তালিকায় চোখ রাখলে বোঝা যাবে, হয়তো শরীরই তার প্রয়োজনীয় উপাদান ঠিকমতো পাচ্ছে না।

তাই প্রতিদিনের পাতে কিছু সামান্য পরিবর্তন এনে, এই নীরব পরিশ্রমী খনিজটিকে জায়গা দিন।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান :প্রত্যাশা,প্রাপ্তি এবং পুনর্গঠনের রূপরেখা

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ‘কোটা সংস্কার’ নিয়ে শুরু হওয়া একদল ছাত্র-জনতার আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় এক গণঅভ্যুত্থানে—যা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের অঙ্গীকারই নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক স্বপ্ন পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে। শোষণ, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে এই তরুণ প্রজন্মের উত্তাল আহ্বান গোটা জাতিকে এক অভূতপূর্ব আলোড়নে ফেলে দেয়।

শুরুতে এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে ছিল কোটা সংস্কারের দাবি, কিন্তু তা অচিরেই পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় অবিচার, রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র, পুলিশি জুলুম ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে গণজাগরণে।
কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন—বিপ্লব আমাদের কী দিয়েছে? আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? আর ভবিষ্যতের পথে আমাদের কী প্রত্যাশা?

অভ্যুত্থানের পটভূমি
২০২৪ সালের ৪ জুন হাইকোর্ট এক রায়ে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং চাকরিতে ৩০% কোটা পুনর্বহাল করে। রায় প্রকাশের পর শিক্ষিত তরুণ সমাজে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামে, তাদের একমাত্র দাবি ছিল—“চাকরি হোক মেধাভিত্তিক, বৈষম্য নয়।”

কিন্তু ১১ জুলাই কুমিল্লায় ছাত্রদের ওপর পুলিশি গুলি চলার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরদিন থেকে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের (গুলিবিদ্ধ হয়ে) মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং সেই মুহূর্ত থেকেই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হয় এক গণঅভ্যুত্থান ।

অভ্যুত্থানের উত্থান ও পতনের চিত্র
১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট—এই সময়কাল ইতিহাসে ‘জুলাই গণহত্যা’ নামে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঢাকার শাহবাগ, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, রংপুরের মেডিকেল মোড়, রাজশাহীর বিনোদপুর, খুলনার সোনাডাঙ্গা—সবখানে রক্তপাত ঘটে। পুলিশ, র‍্যাব ও ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনগুলো নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর চালায় গুলি, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গুম খুনের নির্যাতন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, এই সময়ে মোট ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, প্রায় ৩০,০০০ আহত এবং ১০,০০০-এর বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি গণহত্যার নতুন এক অধ্যায়।

দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলন দমন করা যায়নি,৩আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ১দফা দাবি ঘোষণা করে বিক্ষোভকারীরা ঢাকার শহীদ মিনারের কাছে জড়ো হন।
এরপরে জন অসন্তোষের মুখে পড়ে ৫ আগস্ট দুপুরবেলা তৎকালীন স্বৈরশাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।
তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় পরবর্তী সময়ের জন্য ৮আগস্ট একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে আসেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এভাবেই সমাপ্ত হয় একযুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এক কর্তৃত্ববাদী অধ্যায়।

প্রাপ্তি: কী পেলাম এই অভ্যুত্থানে?

১. সরকার পতন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর
দীর্ঘ ১৫ বছরের একক দমনমূলক শাসনের অবসান ঘটে। নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংবাদপত্রের মুক্তি, এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের।

২. “জুলাই ঘোষণাপত্র” ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-কে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে মূল চারটি স্তম্ভ ছিল: ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, বিকেন্দ্রীকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা।

৩. গণচেতনার পুনর্জাগরণ
এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রের মালিকানায় জনগণের নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারে অংশগ্রহণ বাড়ছে।

৪. আন্তর্জাতিক সমর্থন ও চাপ
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দিচ্ছে।

সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা
সব অর্জনের পরেও, আজ এক বছর পর দাঁড়িয়ে আমাদের কিছু অস্পষ্টতা এবং ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে:

গণহত্যার বিচার হয়নি: আজও পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত হয়নি। দায়ীদের চিহ্নিত কিংবা শাস্তির আওতায় আনা যায়নি।

আহত ও শহীদ পরিবারদের পুনর্বাসন অনিশ্চিত: পঙ্গু, গুম ও নির্যাতিতদের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন কাঠামো দাঁড়ায়নি।

সংবিধান সংশোধন এখনো অসম্পূর্ণ: “জুলাই ঘোষণাপত্র” প্রণীত হলেও তার অনেক ধারা এখনো কার্যকর নয়।

রাজনৈতিক বিভাজন: বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধ এখনো রয়ে গেছে।

আমাদের প্রত্যাশা ও ন্যায্য দাবি

এই বিপ্লবের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যায় না। তাই, আমরা এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে উত্থাপন করছি—

১. জুলাই শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

শহীদদের “জাতীয় শহীদ” হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে ৫ আগস্টকে “গণতন্ত্র পুনর্জাগরণ দিবস” ঘোষণা করতে হবে।

শহীদদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও স্থাপনা নামকরণ করে চিরস্থায়ী স্মৃতি নির্মাণ করতে হবে।

২. আহত ও নির্যাতিতদের পুনর্বাসন

পঙ্গু ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আন্দোলনকারীদের জন্য চিকিৎসা, চাকরি ও বাসস্থানসহ পূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

গ্রেফতারকৃত বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়া

গণহত্যার তদন্তে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কমিশন গঠন করতে হবে।

নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

৪. “জুলাই ঘোষণাপত্র”-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন

বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষায় মেধা ও মানবতা, সুশাসন, নারী অধিকারসহ ঘোষণাপত্রের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।

৫. রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

আন্দোলনকেন্দ্রিক সকল মামলার নিঃশর্ত প্রত্যাহার করতে হবে।

নাগরিকের মতপ্রকাশ, সংগঠিত হওয়ার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অধিকার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

পরিশিষ্ট
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে একটি যুগান্তকারী জাগরণ হিসেবে। এটি আমাদের স্বপ্নের, প্রতিবাদের, ত্যাগের এবং পুনর্নির্মাণের মুহূর্ত। আমাদের দায়িত্ব আজ, সেই নির্মাণযজ্ঞে অংশগ্রহণ করা।
এখন সময় এসেছে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার।
শহীদের রক্ত যেন আমাদের অবহেলায় রঙ হারিয়ে না ফেলে।

 

ঘরের ভিতরে নারীর মাথায় ওড়না রাখা কি ইসলামি দৃষ্টিতে জরুরি?

(ইসলামি বিধান ও প্রচলিত ধারণার প্রেক্ষিতে একটি বিশ্লেষণ)

ইসলামে নারীদের পর্দা পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে পর্দার শরয়ী বিধান সবসময় একই মাত্রায় প্রযোজ্য নয়; এটি প্রসঙ্গ ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন হয়ে থাকে। অনেকেই মনে করেন, একজন নারী নিজের ঘরে থাকলেও তার মাথায় সবসময় ওড়না থাকা জরুরি। এমন ধারণা কতটা সঠিক, তা পর্যালোচনা করা দরকার কুরআন-সুন্নাহর আলোকে।

ঘরের পরিবেশ ও মাহরাম পুরুষ
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা নারীদের পর্দা প্রসঙ্গে বলেন:
“হে নবী! মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আচ্ছাদন করে…”
(সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

এই আয়াতে গায়রে মাহরাম বা অনাত্মীয় পুরুষদের সামনে নারীদের শরীর ও সৌন্দর্য গোপনের কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ ইত্যাদি মাহরামদের সামনে এই পর্দা করার বাধ্যবাধকতা নেই।

অতএব, যখন একজন নারী নিজের ঘরে অবস্থান করছেন এবং তার আশেপাশে শুধুমাত্র মাহরাম পুরুষ, নারী অথবা শিশু রয়েছে—তখন তার জন্য মাথা ঢেকে রাখা শরয়ীভাবে জরুরি নয়। এটি ইসলামী বিধানের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য, যে অতিরিক্ত কষ্টসাধ্যতা বা অযৌক্তিক কঠোরতা আরোপ করে না।

প্রচলিত ভুল ধারণা: “ফেরেশতা প্রবেশ করেন না”
বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের অনেক স্থানে একটি ধারণা প্রচলিত আছে—“নারীদের মাথায় ওড়না না থাকলে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” এ বক্তব্যটির কোনো সহিহ হাদিস ভিত্তি নেই। ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে একমত যে, এ ধরনের বর্ণনা বানানো হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।

হাদিসের বিশিষ্ট গ্রন্থ আল-মাকসূদ ফি মাজু’আতিল হাদিস ও আল-আস্রারুল মারফু’আ তে এমন অনেক ভুয়া হাদিসের তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যার নমুনা পাওয়া যায়। সুতরাং, এমন ভিত্তিহীন বক্তব্যকে ইসলামি বিধান হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয় এবং এতে ধর্মীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

অজুর সময় ওড়না পরা কি জরুরি?
অজুর সময় মাথায় ওড়না রাখা ফরজ, ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব—কোনোটিই নয়। বরং ইসলামে অজুর নির্দিষ্ট অঙ্গসমূহ ধৌত করাই শর্ত (সূরা মায়েদা: ৬)। নারীরা অজু করতে গিয়ে মাথায় ওড়না রাখলেন বা রাখলেন না—তা তাদের ইচ্ছা ও প্রয়োজনসাপেক্ষ। যদি তারা একান্ত ঘরে থাকেন এবং পরপুরুষের দৃষ্টিগোচর হওয়ার শঙ্কা না থাকে, তাহলে ওড়না ছাড়া অজু করতেও কোনো দোষ নেই।

ইমামগণের বক্তব্য
ইবনে কাসীর (রহ.) আয়াত ৩১-এর তাফসিরে বলেন,
“এই আয়াতে মাহরামদের তালিকা রয়েছে, যাদের সামনে নারীরা মুখ ও মাথা খোলা রাখতে পারে। এটি কোনো গোনাহ নয়।”

ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “মাহরামদের সামনে নারীর শরীরের এমন অংশ প্রকাশে কোনো গোনাহ নেই, যা সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে প্রকাশ পায়।”
(আল-মাজমু’, খণ্ড ৩)

পরিশিষ্ট
ইসলামে নারীর পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো—গায়রে মাহরাম এবং অনাত্মীয় পুরুষদের সামনে তার সৌন্দর্য গোপন রাখা। ঘরের ভেতরে যেখানে এমন পুরুষ নেই এবং শুধুমাত্র মাহরাম ও নারী রয়েছে, সেখানে মাথায় ওড়না রাখা জরুরি নয়। অজুর সময়ও এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে যারা নিজেদের ধর্মীয় সচেতনতা থেকে সবসময় মাথায় ওড়না রাখতে চান, তা তাদের ব্যক্তিগত ফজিলত ও তাকওয়ার পরিচায়ক হতে পারে। তবে এটিকে ফরজ বা ওয়াজিব হিসেবে দাবি করা ইসলামি শরিয়তের সীমালঙ্ঘন মূলক কাজ।

ছবিঃ istock

 

এক্স-রে চোখ”– রহস্যময়ী নাতাশা ডেমকিনা

১৯৮৭ সালে রাশিয়ার সারানস্ক শহরে জন্ম নেওয়া নাতাশা ডেমকিনা আজও বিশ্বের কাছে এক রহস্যময়ী নারী। সাধারণ একটি মেয়ের মতো বেড়ে ওঠা হলেও কৈশোরে হঠাৎই সে টের পায়, তার দৃষ্টিশক্তির মাঝে কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করছে। তার দাবি, সে মানুষের শরীরের ভেতর দেখতে পায়—একটি প্রাকৃতিক এক্স-রে ভিশনের মতো। এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার সূত্র ধরেই সে হয়ে ওঠে আলোচিত, আবার বিতর্কিতও।

নাতাশার বয়স তখন ১০ বা ১১। একদিন হঠাৎ সে দেখতে পায়, তার মায়ের পেটের ভেতরে কিছু একটা সমস্যা আছে। পরবর্তীতে চিকিৎসা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে—তার মায়ের পেটে সত্যিই একটি আলসার ছিল। এরপর থেকে নাতাশা একের পর এক রোগ নির্ণয় করতে থাকে, কখনো প্রতিবেশীর টিউমার, কখনোবা বৃদ্ধের হার্নিয়া। তার এই ‘অদ্ভুত’ চোখের কথা স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করে তার বাসায়।

১৭ বছর বয়সে নাতাশা গণমাধ্যমে আসে। রাশিয়ার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশগুলোর নজর পড়ে তার ওপর।
তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় লন্ডন এবং নিউইয়র্কে, যেখানে তার ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের চেষ্টা চালানো হয়।
লন্ডনে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নাতাশা সঠিকভাবে সমস্যা শনাক্ত করতে পারায় ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু নিউইয়র্কে অবস্থা ভিন্ন হয়ে যায়।
CSI (Committee for Skeptical Inquiry)-এর তত্ত্বাবধানে একটি ব্লাইন্ড টেস্টে তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। পরীক্ষায় একজন রোগীর শরীরে বসানো ধাতব পাত খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হন নাতাশা। ফলে, বিজ্ঞানীরা তার এক্স-রে ভিশনের দাবিকে “অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন” বলে ঘোষণা দেন।

তবে নাতাশা নিজে তার ব্যর্থতার জন্য বিভিন্ন যুক্তি দেন। তার ভাষায়—
“আমার চোখ কোনো যান্ত্রিক এক্স-রে মেশিন নয়। এটা একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার জন্য আমি সময়, মনোযোগ, রোগীর সরাসরি উপস্থিতি ও শান্ত পরিবেশ চাই। কিন্তু পরীক্ষার সময় আমার উপর চাপ ছিল, আমার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছিল, রোগীদের শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল-এসব কারণে আমি সঠিকভাবে কাজ করতে পারিনি।”

নাতাশার ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বরাবরই সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি হতে পারে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অনুমান ও কাকতালীয় ঘটনার সমন্বয়। তবে সাধারণ মানুষের একাংশ আজও তাকে অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করে।
বিশেষ করে রাশিয়াতে নাতাশা এক রহস্যময় ও জনপ্রিয় চরিত্র। অনেক রোগী এখনো তার কাছে যান সনাতন চিকিৎসার বাইরের বিকল্প উপায়ে রোগ শনাক্ত করতে।

২০০৪ সালে Discovery Channel ‘The Girl with X-ray Eyes’ শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে নাতাশার জীবনের উপর ভিত্তি করে। ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এ ডকুমেন্টারির কিছু অংশ এখনো দেখা যায়।

বর্তমানে নাতাশা একজন বিকল্প চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছেন। তার নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে “The Special Diagnostic Center” নামের একটি প্রজেক্ট। ইউরোপ ও জাপানেও তিনি বিভিন্ন সময় রোগ নির্ণয়ের কাজ করেছেন।

নাতাশা ডেমকিনা একদিকে যেমন রহস্যে মোড়া এক চরিত্র, অন্যদিকে তেমনি বিজ্ঞানের কড়াকড়ি যাচাইয়ের মুখে পড়া একটি জীবন্ত কেস স্টাডি।
তার ক্ষমতা বাস্তব, না কি মনস্তাত্ত্বিক এক বিভ্রম—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে একথা অনস্বীকার্য, “এক্স-রে চোখের অধিকারী” এই নারী আজো মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে।

তথ্যসূত্র: গুগল সার্চ, Discovery Channel Documentary, CSI রিপোর্ট

 

৩৫০ বছর পর নারী অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল নিযুক্ত

গ্রহ-নক্ষত্রের রহস্যভেদ করতে হলে রাজদরবারে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী থাকা চাই– এই ভাবনা থেকেই ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় চার্লস শুরু করেছিলেন এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। জন্ম হয়েছিল ‘অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল’ নামের এক বিশেষ পদ, যা তিন শতাধিক বছর ধরে ছিলেন শুধু পুরুষদের দখলে। অবশেষে সেই লৌহপ্রাচীর ভেঙে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ রাজপরিবার পেয়েছে এক নারী জ্যোতির্বিদ মিশেল ডাউহার্টিকে।

গত ৩০ জুলাই, ব্রিটিশ রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন মিশেলের নিয়োগপত্রে। এতদিন এই মর্যাদাসম্পন্ন পদে ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার মার্টিন রিস। এখন থেকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন প্রফেসর মিশেল, যিনি শুধু একজন গবেষক নন—একজন পথপ্রদর্শক নারীও।

এই পদ এখন আর শুধুই প্রতীকী নয়, বরং বিজ্ঞান ও মহাকাশসংক্রান্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পরামর্শদানের দায়িত্ব বহন করে। বিশেষত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য সময় ও মহাকাশ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অটুট।

শুধু ‘প্রথম নারী’—এই পরিচয়ে তাঁকে আটকে রাখলে তা হবে বড় অবিচার। মিশেল ডাউহার্টি নিজ গুণেই পৌঁছেছেন উচ্চ শিখরে। ২০১৪ সালে তিনি পান ‘রয়্যাল সোসাইটি রিসার্চ প্রফেসরশিপ’—একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা পদ। এর আগে ২০০৭ সালে পেয়েছেন ‘ক্রি মেডেল’, গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র ও সৌর বাতাসের ওপর কাজের জন্য। ২০১৭ সালে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির স্বর্ণপদক ও ২০১৯ সালে আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের বিশেষ স্বীকৃতি তাঁর নামকে করেছে আরও উজ্জ্বল।

স্যাটার্ন ও বৃহস্পতি গ্রহ ঘিরে পাঠানো মহাকাশযানের ডেটা বিশ্লেষণে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। বর্তমানে তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে স্পেস ফিজিক্সের অধ্যাপক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। পাশাপাশি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির একটি গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য—বৃহস্পতির বরফঘেরা উপগ্রহ গ্যানিমিড, ইউরোপা ও ক্যালিস্টোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

গণমাধ্যমে মিশেল ডাউহার্টি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই পদে আমি নিযুক্ত হয়েছি আমার জেন্ডারের কারণে নয়, বরং আমার গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই।” তবে তাঁর এই অর্জন যে নারীদের বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা জোগাবে, সেই আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “যখন কেউ নিজের মতো কাউকে এমন জায়গায় দেখতে পায়, তখন তাদের মনে স্বপ্ন জাগে—তারাও পারবে।”

১৯৬২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার এক শহরে জন্ম মিশেলের। তাঁর মহাকাশের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় একদম শৈশবে, যখন তিনি দেখতেন তাঁর বাবা বাড়ির উঠানে ১০ ইঞ্চির একটি টেলিস্কোপ বানাচ্ছেন। মজার বিষয়, তাঁর স্কুলে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টি ছিলই না! তবু তাঁর এবিষয়ে আগ্রহ থামেনি।

তিনি পড়াশোনা করেছেন বর্তমান কোয়াজুলু-নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ফলিত গণিতে বিএসসি, পরে পদার্থবিজ্ঞান এবং শেষে পিএইচডি। কর্মজীবনের শুরু জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমিতে। পরে ১৯৯১ সালে তিনি যোগ দেন ইম্পেরিয়াল কলেজে। আর সেখানেই তাঁকে জুপিটার মিশনের জন্য চৌম্বকক্ষেত্রের একটি মডেল তৈরি করতে বলা হয়, যা তাঁর মহাকাশ পদার্থবিদ্যার যাত্রা সূচিত করে।

তিন শতকেরও বেশি সময়ের পুরুষতান্ত্রিক প্রথা ভেঙে মিশেল ডাউহার্টির এই নিযুক্তি শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র বৈজ্ঞানিক জগতের জন্য এক অনন্য মুহূর্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন-গ্রহ, নক্ষত্র, সময়, মহাকাশ—এসব বিশাল বিষয়ের বোঝাপড়ার জন্য লিঙ্গ নয়, দরকার অন্তর্দৃষ্টি, মেধা ও অক্লান্ত সাধনা।

 

শিল্পায়নের ধাক্কায় অস্তমিত কুটিরশিল্প, বিপন্ন অসংখ্য গ্রামীণ নারীর জীবিকা

শিল্পায়নের প্রবল স্রোতে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির যুগে একদিকে যেমন জীবন হয়েছে সহজ, অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা গ্রামীণ পেশা ও হস্তশিল্প। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লাগছে গ্রামীণ নারীদের ওপর, যাঁরা বহু বছর ধরে নিজ বাড়ির উঠোনে বসে তৈরি করতেন বাঁশ, বেত, মাটি, সুতা ও নকশিকাঁথার মতো নানা শিল্পপণ্য।

এই নারীরা সংসার সামলে বিকল্প আয়মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন কুটিরশিল্পে। বিশেষ করে যে সব পরিবারে পুরুষদের আয় সীমিত বা অনিয়মিত, সেখানে নারীদের এই ঘরোয়া কাজ ছিল সংসার টিকিয়ে রাখার মূল সহায়ক শক্তি। কিন্তু বাজার দখল করে নেওয়া প্লাস্টিক, মেলামাইন বা চাইনিজ মেশিনজাত পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কমদামের কারণে এখন এই পণ্যের আর তেমন চাহিদা নেই। ফলে একদিকে যেমন তাদের উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কুটিরশিল্পে নিয়োজিত নারীরা এখন আর আগের মতো কাজ পান না। অনেকে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যাঁরা এখনও টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের লাভের অঙ্ক এতটাই কম যে তা দিয়ে ন্যূনতম সংসার চালানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

শুধু আর্থিক সংকট নয়, এই শিল্প ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের সামাজিক মর্যাদাও কমে যাচ্ছে। আগে যাঁরা কর্মজীবী ছিলেন, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারতেন, এখন তাঁরা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন পুরুষের উপার্জনের ওপর। ফলে আত্মবিশ্বাস কমছে, বাড়ছে পারিবারিক নির্ভরতা ও বৈষম্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বিপণন কৌশল। শুধু সরকার নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামীণ নারীদের ঘরে বসে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি করা, নতুন নকশা ও উদ্ভাবনী ভাবনার সংযোগ ঘটানো, এবং পণ্যের ব্র্যান্ডিং করে বাজার তৈরি করা গেলে এই শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

একটি জাতির ঐতিহ্য শুধু তার ভাষা বা পোশাকে নয়, বরং তার হস্তশিল্পেও প্রতিফলিত হয়। কুটিরশিল্প শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি সংস্কৃতি ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। তাই শিল্পায়নের এই গতির মধ্যে ঐতিহ্যকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব—বিশেষ করে সেই নারীদের জন্য, যাঁরা নিঃশব্দে যুগের পর যুগ ধরে গড়ে তুলেছেন আমাদের নিজস্ব শিল্পচর্চার ভিত।

 

চার বছরের গৃহবন্দিত্ব: জয়পুরহাটের লিজা আক্তার এবং সামাজিক দায়

২৬ জুলাই জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার মণ্ডলপাড়ায় ঘটে যাওয়া একটি নির্মম ঘটনা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, পরিবার কাঠামো এবং নারী অধিকার বিষয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ২০২১ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী ছাত্রী লিজা আক্তার গত চার বছর ধরে তার নিজ ঘরেই তালাবদ্ধ—স্রেফ এই কারণে যে তার বড় বোন প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। বাবা ও সৎমার চোখে এটি ছিলো ‘পরিবারের সম্মানহানি’ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার দায় যেন ছোট বোনকেই বহন করতে হলো।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লিজার বাবা এনামুল হক, যিনি এক সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি মেয়েকে চার বছর ধরে একটি স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কক্ষে বন্দি করে রাখেন। নিয়মিত চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে লিজাকে নিস্তেজ করে রাখা হতো। প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে তার চিৎকার শুনলেও কিছু করতে সাহস পাননি।
এভাবে বছর পার হতে হতে লিজা একসময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্ত এনামুল হক এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী ফুতি বেগমের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

লিজার ঘটনা নতুন নয়। আমাদের সমাজে ‘সম্মান রক্ষা’ বা ‘পারিবারিক মান-ইজ্জত’ রক্ষার নামে বহু নারীকেই শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এখানে নারী যেন পরিবারের সম্পত্তি-একজন নারী ‘ভুল’ করলে, তার দায় বর্তায় পুরো পরিবার বা অন্য নারীর ওপর। বড় বোনের প্রেম বা পলায়ন, ছোট বোনের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিয়ে তাকে বন্দি করে রাখার যথার্থতা কীভাবে একজন মানুষ কল্পনা করতে পারেন?
এটি শুধুই একটি পারিবারিক অন্যায় নয়; এটি সমাজে নারীর অবস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অধিকার, এবং স্বাধীন চিন্তার প্রতি আমাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিচ্ছবি।

এই ঘটনাটি ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’, ‘অবৈধ আটকে রাখা’, এবং ‘মানসিক নির্যাতন’-এর স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কাউকে বিনা অপরাধে বা আদালতের আদেশ ছাড়া এভাবে গৃহবন্দি রাখা ফৌজদারি অপরাধ। আইন অনুযায়ী এ ধরনের কাজের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, চার বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অফিস বা কোনো মানবাধিকার সংস্থা কেন এগিয়ে আসেনি? প্রতিবেশীরা কেন ভয় পেয়ে নীরব থেকেছে? নাকি আমরা সবাই সামাজিক সম্মান রক্ষার মুখোশ পরে আরেকজনের অসহায়ত্বের প্রতি চোখ বুঁজে থাকি?

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এখনও নারীর স্বাধীনতা, বিয়ে, এমনকি শিক্ষা নিয়েও পরিবার ও সমাজের কঠোর দমনমূলক মনোভাব বিদ্যমান। পুরুষের সিদ্ধান্তে নারীর জীবন নিয়ন্ত্রিত হওয়াই যেন ‘স্বাভাবিক’। এই ঘটনাটি সেই সংস্কৃতিরই এক চরম দৃষ্টান্ত, যেখানে একটি মেয়ে শুধুমাত্র মেয়ের বোন হওয়ার কারণে শিক্ষা, আলো-বাতাস, সমাজ সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আমাদের এখন প্রশ্ন তুলতে হবে—কোন সংস্কৃতি আমাদের এমন করে তোলে? যে সংস্কৃতিতে একজন পিতা তার মেয়েকে বন্দি রাখেন, সেই সংস্কৃতি কি আদৌ মানবিক?

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি-
১. নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: লিজার বাবা ও সৎমার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে সমাজে এমন অন্যায়ের বার্তা ছড়িয়ে পড়বে যে, পরিবার মানে একজন পুরুষ যা খুশি তা করতে পারে।

২.লিজার পুনর্বাসন ও মানসিক চিকিৎসা: তাকে শুধু মুক্ত করা নয়, প্রয়োজন তার সুস্থতা নিশ্চিত করা, শিক্ষা-জীবনে ফেরার পথ তৈরি করা, এবং মানসিক পুনর্বাসন দেওয়া।

৩.সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে পরিবারে নারী অধিকার, আইন এবং নৈতিকতা নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো দরকার।

৪.প্রতিবেশী ও সমাজের দায়িত্ব: মানুষ হিসেবে প্রতিবেশীর কষ্টে এগিয়ে যাওয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব। নির্যাতনের শব্দ শুনেও যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে ভবিষ্যতের অন্য ‘লিজা’রা আমাদের সমাজেই নিঃশেষ হবে।

আমরা সমাজে নারীদের জন্য এমন একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখি যেখানে একজনের ভুলের শাস্তি অন্যজনের কাঁধে এসে যেন না পড়ে।
এই নির্মম নিষ্ঠুরতার আইনি, সামাজিক, এবং নৈতিক সব স্তরে বিচার দাবি করছি।

#JusticeForLiza #BreakTheSilence #StopGenderViolence #BangladeshHumanRights

 

ঢাবিতে ছাত্রীসংস্থার জুলাই প্রদর্শনী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীদের বীরোচিত ভূমিকা স্মরণে আয়োজন করা হলো এক ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রদর্শনীটি সোমবার (৪ আগস্ট) বিকেল তিনটায় শুরু হয়, যেখানে ব্যানার, ফেস্টুন, তথ্যচিত্রসহ নানাভাবে তুলে ধরা হয় নারী শিক্ষার্থীদের অবদান।

প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে, যেখানে ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাইয়ে রাজপথ কাঁপানো সাহসিনী ছাত্রীদের নানা মুহূর্তের চিত্র স্থান পায়। বিশেষ করে আন্দোলনের সময়কার নারী নেতৃত্ব, ব্যানার বহনের দৃশ্য, পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে স্লোগানে স্লোগানে এগিয়ে চলা, মাইক হাতে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর—এইসব শক্তিশালী মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলা হয় তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনায়। প্রদর্শনীতে একটি প্রামাণ্যচিত্রও দেখানো হয়, যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও প্রত্যয়ের কাহিনি উঠে আসে সরাসরি বক্তব্য ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে।

ঢাবি শাখা ছাত্রীসংস্থার সভানেত্রী সাবিকুন নাহার তামান্না বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার ছিলো নারীরা। অনেকেই কেবল পুরুষ নেতৃত্বকে সামনে রাখেন, কিন্তু মাঠে-ময়দানে নারীরাও সমানভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই অবদানকে স্মরণ করতেই আমাদের এ আয়োজন।”

তিনি আরও জানান, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও আজকের আয়োজনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। “বৃষ্টির কারণে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলেও যারা এসেছেন তারা গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রদর্শনী উপভোগ করেছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণাদায়ী সাড়া পেয়েছি,”—বলেন তামান্না।

প্রদর্শনী ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। দর্শনার্থী শিক্ষার্থী মরিয়ম তাবাসসুম বলেন, “এটা খুব ইউনিক একটা উদ্যোগ। জুলাই নিয়ে অনেক সংগঠন কাজ করেছে, কিন্তু নারী শিক্ষার্থীদের অবদানকে কেন্দ্র করে এরকম পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী আমি প্রথম দেখলাম। এটা সত্যিই অনন্য।”

আরেক শিক্ষার্থী উর্মি জানান, “ঢাবিতে ছাত্রীসংস্থার তৎপরতা সম্পর্কে আগে তেমন জানতাম না। কিন্তু আজকের এই আয়োজন তাদের দর্শন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। প্রদর্শনী দেখে ভালো লেগেছে, নারীর কণ্ঠকে এভাবে প্রাধান্য দেওয়া খুব দরকার ছিল।”

প্রদর্শনীটি প্রমাণ করেছে, ইতিহাসের পাতায় যাদের নাম অনুল্লিখিত থেকে গেছে, তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে আনতে আজকের ছাত্রীরা নিজেদের দায়িত্ব সজাগভাবে নিচ্ছে। নারী নেতৃত্ব, অংশগ্রহণ ও সাহসিকতার ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করতেই ছাত্রীসংস্থার এ প্রয়াস নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ছাত্রীসংস্থা যে স্মৃতিচারণ করেছে, তা কেবল অতীতকে নয়, ভবিষ্যতের নেতৃত্বকেও নিঃসন্দেহে প্রেরণা জোগাবে।

 

নরম তুলতুলে রুটি বানাতে কার্যকরী কৌশল

রোজকার খাবারের তালিকায় রুটি থাকেই। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, যত যত্ন করেই বানানো হোক না কেন, বাসার রুটি হয়ে যায় শক্ত, শুকনো আর মুখে জমাট বাঁধা! তখন মনটাই খারাপ হয়ে যায়। অথচ, একটু কৌশলী হলেই ঘরেই বানানো যায় একেবারে রেস্টুরেন্টের মতো নরম আর তুলতুলে রুটি। কীভাবে? চলুন জেনে নিই—

১.ঠান্ডা পানির বদলে হালকা গরম পানি কিংবা কুসুম দুধ দিয়ে ময়দা মাখলে তা আরও নরম হয়। এই উষ্ণতার ছোঁয়াই রুটিকে করে তোলে গলে যাওয়ার মতো নরম।

২.ডো মেখে কমপক্ষে ১৫–২০ মিনিট ঢেকে রাখলে তা ‘বসে’ যায় এবং গঠনে আসে নমনীয়তা। এ বিশ্রামই রুটির নরমত্বের গোপন চাবিকাঠি।

৩.ডোতে ১–২ চা চামচ তেল বা ঘি মিশিয়ে নিন। এতে ডো শুকায় না, এবং রুটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত থাকে নরম ও রসাল।

৪.ডো যেন খুব বেশি শক্তও না হয়, আবার অতিরিক্ত নরমও না হয়। মাঝারি ঘনত্বের ডো-ই রুটির কাঙ্ক্ষিত স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করে।

৫.কমপক্ষে ৫–৭ মিনিট ধরে ময়দাকে ভালোভাবে মাখুন। এতে গঠন হয় মসৃণ ও নমনীয়, এবং রুটি পায় প্রাকৃতিক কোমলতা।

৬.অনেকেই রুটি বেলার সময় অতিরিক্ত শুকনো ময়দা ব্যবহার করেন, যা পরে রুটিকে শুকিয়ে ফেলে। তাই যতটা কম সম্ভব, ততটাই ব্যবহার করুন।

৭.তাওয়ায় রুটি দেওয়ার ১০–১২ সেকেন্ড পর প্রথমবার উল্টান, এরপর ২০–২৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার উল্টে দিন। তাপে সময়মতো এ উল্টানোই রুটিকে দেয় ফুলে ওঠার আনন্দ।

৮.কম আঁচে রুটি হয় শক্ত ও চাপা। মাঝারি থেকে উচ্চ আঁচে দ্রুত সেঁকলে রুটি হয় তুলতুলে ও মোলায়েম।

৯.রুটিগুলো একবারে বেলে রাখলে তা শুকিয়ে যায়। বরং একটি বেলে সঙ্গে সঙ্গে তা সেঁকে ফেলুন—এতেই রুটির সতেজতা বজায় থাকে।

 

কন্যাসন্তান জান্নাত লাভের সোপান

আজকের সমাজে কন্যাসন্তান নিয়ে কমন যেই চিত্র দেখা যায়। একদিকে উচ্চশিক্ষিত পরিবারেও মেয়ে সন্তান হওয়ায় নিরাশা—অন্যদিকে ইসলাম যাকে বলে ‘আল্লাহর রহমত’। আমাদের আশেপাশে এখনো অনেক পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে মুখ কালো হয়ে যায়, আত্মীয়স্বজন নীরব হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে ‘পরের সম্পত্তি’ বলে মেয়ে সন্তানকে অবহেলা করে। অথচ ইসলাম এমন আচরণ কঠোরভাবে নিন্দা করে এবং কন্যাসন্তানকে বেহেশতের চাবিকাঠি হিসেবে দেখায়।

জাহেলি মানসিকতা এখনো আমাদের মাঝে বেঁচে আছে
ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে কন্যাসন্তানকে এতটাই ঘৃণার চোখে দেখা হতো যে, অনেকে লোকলজ্জায় নিজের মেয়েকে জীবন্ত কবর দিতো। সেই বর্বরতা আমরা আজ আর করি না ঠিকই, কিন্তু মানসিকতার জায়গায় আমরা কি খুব বেশি বদলেছি?

“আর যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে রাগে-ক্ষোভে ভরে যায়।”
— [সুরা নাহল: ৫৮]
এ আয়াতে বর্ণিত মানসিকতা কি আজও কিছু পরিবারে আমরা দেখি না?

আল্লাহর দেওয়া প্রথম পরিচয়—’কন্যা’
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন:

“তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন…”
— [সুরা আশ-শুরা: ৪৯-৫০]

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ প্রথমেই কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয়—কন্যা সন্তান কোনোভাবেই ছোট নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য দান।

কন্যাসন্তান—জান্নাত লাভের সিঁড়ি
আজ যারা ভাবে “মেয়ে সন্তান মানে দায়”, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে:

“যার কন্যাসন্তান হয় এবং সে তাদের লালন-পালন করে, কষ্ট না দেয়, মেয়েদের কারণে অসন্তুষ্ট হয় না—আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।”
— [মুসনাদে আহমদ]

আর তিনটি কন্যাসন্তানের প্রতিপালনের কথা তো আছেই, এমনকি দুইটি মেয়ে লালন-পালন করলেও জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন তিনি।
(সহিহ মুসলিম ও শুআবুল ইমান)

আজকের বাস্তবতা: কন্যা মানে কষ্ট না, বরং করুণা
আমাদের সমাজে এখনো অনেক বাবা-মা কন্যাকে ‘পরের ঘরের মানুষ’ ভাবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, বিপদের সময় সবচেয়ে বেশি পাশে থাকে মেয়েই। ছেলে হয়তো নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু মেয়ে ফোন করে, খোঁজ নেয়, টাকা পাঠায়, বাবা-মায়ের জন্য ডাক্তারের সিরিয়াল নেয়,এরকম আরো অনেককিছু যা হয়তো ছেলে সন্তানরা করেনা বা করতে পারেনা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

“যে কন্যাসন্তানের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন।”
— [আবু দাউদ]

পিতা-মাতার সৌভাগ্যের চিহ্ন কন্যাসন্তান
সাহাবি ওয়াসিলা বিন আসকা (রা.) বলেন:

“কন্যাসন্তান মা-বাবার সৌভাগ্যের প্রতীক।”
কারণ আল্লাহ নিজেই বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা প্রথমে কন্যা দেন—এটি সৌভাগ্যের ইঙ্গিত।

কন্যাসন্তান মানে রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্য

“যে ধৈর্যের সঙ্গে কন্যাসন্তান লালন-পালন করে, কিয়ামতের দিন সে আমার খুব কাছে থাকবে।”
— [সহিহ মুসলিম]
নবীজির কাছাকাছি জান্নাতে থাকার চেয়ে বড় আশীর্বাদ একজন মুমিনের জন্য আর কী হতে পারে?

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, আখিরাত গড়ুন
একজন মুসলমানের জন্য সন্তানের লিঙ্গ নয়, তার আমল ও প্রতিপালনই গুরুত্বপূর্ণ। কন্যাসন্তান কোনো ‘দায়’ নয়—এটা আখিরাতে আপনার জান্নাত লাভের অন্যতম সুযোগ। আল্লাহ তাআলার দেওয়া প্রতিটি সন্তানই পরীক্ষা ও নেয়ামত। তাই আসুন, কন্যাসন্তানকে সম্মান দিই, ভালোবাসি এবং সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিই।

 

বিমানবাহিনীর প্রথম নারী সদস্য এসথার ম্যাকগোউইন ব্লেক

৮ জুলাই ১৯৪৮, ঠিক মধ্যরাত। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ফোর্ট ম্যাকফারসন সামরিক ঘাঁটিতে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত রচিত হয়। ওই রাতেই এসথার ম্যাকগোউইন ব্লেক যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে প্রথম নারী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়ে তৈরি করেন এক অনন্য নজির। তার এই পদক্ষেপ কেবল একজন নারীর পেশাগত অগ্রযাত্রা নয়, বরং তা ছিল লাখো নারীর জন্য সামরিক পরিসরে প্রবেশের দ্বার উন্মোচনের প্রতীক।

এসথার ব্লেকের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত এক বেদনার গল্প, এবং গভীর দেশপ্রেম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৪ সালে, তিনি “Women’s Army Corps”–এ যোগ দেন। কারণটা ছিল তার নিখোঁজ বড় ছেলে। তিনি একজন বৈমানিক, যিনি যুদ্ধকালীন বেলজিয়ামে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিখোঁজ হন। এসথারের বিশ্বাস ছিল, সেনাবাহিনীর কোনো অফিস সহায়ক কাজের দায়িত্ব নিয়ে তিনি হয়তো তার ছেলের খোঁজ পেতে পারবেন।

এরপর থেকেই যুক্ত হন সামরিক অফিসের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে, বিশেষ করে বিমান শাখায় বেসামরিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী পৃথক কোনো বাহিনী ছিল না; তা সেনাবাহিনীরই একটি শাখা। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২৬ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘United States Air Force’—আলাদা এক সামরিক বাহিনী হিসেবে গঠিত হয়। এর পরপরই শুরু হয় এই বাহিনীতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার আইনি ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া।

এক বছর পর, ১৯৪৮ সালের ৮ জুলাই কার্যকর হয় “Women’s Armed Services Integration Act”, যার মাধ্যমে নারীরা স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার অধিকার পান। আর এই আইন কার্যকর হওয়ার ঠিক এক মিনিট পর, এসথার ম্যাকগোউইন ব্লেক হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর প্রথম নারী সদস্য—একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদচারণা।

যদিও এসথার ব্লেক কখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি, তার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে, যা কোনো বাহিনীর কার্যকারিতা ও কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, যুদ্ধে না গিয়েও একজন নারী সামরিক বাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারেন। তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞাই তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

এসথার ব্লেক পরবর্তীতে সামরিক জীবন থেকে অবসর নেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে নারীদের স্থায়ী ও স্বীকৃত অংশগ্রহণের যাত্রা। আজ যখন আমরা দেখি নারীরা শুধু অফিসে নয়, যুদ্ধবিমান চালানো থেকে শুরু করে সামরিক কমান্ডেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন মনে পড়ে সেই নারীকে, যিনি প্রথম সাহস করে সেই দরজাটি খুলেছিলেন।

তাঁর পদক্ষেপ ছিল ভবিষ্যতের নারীদের জন্য আশার আলো, আর প্রমাণ করে দেয়—আকাশ কোনো সীমা নয়, বরং নতুন এক যাত্রার শুরু।

তথ্যসূত্র:
U.S. Air Force Historical Studies Office

“Women in the Military: An Unfinished Revolution” by Maj. Gen. Jeanne Holm

U.S. Department of Defense Archives

Women’s Armed Services Integration Act, 1948

 

টঙ্গীর ড্রেনে পড়ে এক মায়ের মৃত্যু—দায় কার?

টঙ্গীর একটি খোলা ড্রেনে পড়ে মারা গেলেন এক কর্মজীবী মা। পানিতে দীর্ঘসময় ডুবে থাকায় তাঁর মরদেহ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল—নাক ছিল না, শরীর ফুলে চেনার উপযোগী না, আতর ও স্প্রে দিয়ে দুর্গন্ধ চাপা দিয়ে শেষবারের মতো তাকে দাফন করা হয় মাত্র অল্প সময় আগে।
দুই জমজ শিশুকে লাশের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি, তারা ভয় পাবে বলে। অথচ তারা শুধু একটাই প্রশ্ন —“মা কই?”
তাদের কান্না থামছে না, চোখে ঘুম নেই। মা ছাড়া এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতে তাদের ঠাঁই কোথায়, কে জানে?
ডিভোর্সড মা, একা হাতে সন্তানদের মানুষ করছিলেন। একটি কোম্পানিতে চাকরি করে কঠিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে। আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে একদিকে ঘরের এক কোণে বসে দুই শিশু কাঁদছে, অন্যদিকে পরিবারের কিছু সদস্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাঁর সামান্য স্বর্ণালঙ্কার আর সম্পদের হিসাব নিয়ে।
আর সিটি কর্পোরেশন?
যাদের গাফিলতিতে এক মায়ের মৃত্যু হলো—তারা এখনও কোনো সহানুভূতি দেখায়নি, পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। লাশ বুঝিয়ে দিয়ে যেন তাদের দায়িত্ব শেষ।
এই নিষ্ঠুর নিরবতা এবং দায়িত্বহীনতা শুধু এক পরিবার নয়, পুরো সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আমরা জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি—
এই দুই অনাথ শিশুর পুনর্বাসন ও শিক্ষা-ব্যবস্থার সরকার এবং সিটি কর্পোরেশনকে অবিলম্বে দায়িত্ব নিতে হবে।

মৃত্যুর জন্য দায়ী সিটি কর্পোরেশনের অবহেলার তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

ঢাকাসহ দেশের সব খোলা ড্রেন ও ম্যানহোল দ্রুত সংস্কার করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যা হবে মানবিক দায়বদ্ধতার ন্যূনতম বহিঃপ্রকাশ।

অনাথ শিশু সন্তানদের আইনি সহায়তা ও মানসিক সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে, এবং এ ক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি।

এটা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—এটা আমাদের অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। মৃত্যু হয়েছে একজন মায়ের, অনাথ হয়েছে দুটি শিশু—এই দায় সবার। রাষ্ট্র কিংবা কর্পোরেশন দায় এড়িয়ে গেলে, মানবতা মুখ থুবড়ে পড়ে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই শিশুদের পাশে দাঁড়াই। সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, আর নিরাপদ শহর গড়ার দাবি জানাই।