শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

 

ভলান্টিয়ারের চোখে ACBTC কনফারেন্স…

সুমাইয়া তাসনিম


এই শহরে কাকডাকা ভোর আসে কিনা তাও জানার সময় নেই, এমন ছিল ক’টা দিন। কেমন যেন চাপ অনুভব করি ভেতরে.. এর্লাম বাজার আগে ঘুম ভেঙ্গে যায়। যন্ত্রের মত উঠে গিয়ে সময় গুনে ফ্রেশ হয়ে রেডি হওয়া আর বেরিয়ে পড়ার জীবন। ভীষণ জ্যামে নাকাল হতে ভাল্লাগেনা আর। মিরপুরে এই জ্যামের মহামারী লেগে থাকবে অনন্তকাল..

দীর্ঘ জ্যাম পেরিয়ে ছোট্ট মিটিং শেষে ফুড বুথে। এই চারদিনে কতরকম মানুষ দেখলাম। সবাই সাইকোলজির সাথে কোনো না কোনো ভাবে জড়িত। কাউকে নামে চিনি, কাউকে চেহারায়। বিখ্যাত মানুষজন যারা আছেন তারাও কিছুক্ষণের জন্য এসে ঢুঁ মেরে যান। ২য় দিন এলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তারপর দিন মোহিত কামাল, শেষদিন মেহতাব খানম। কলেজের ম্যামরা এসে বেশ খুশি। নিজেদের ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা কাজ করছে, কিছু লাগলে এগিয়ে আসছে দেখেই তাঁরা আনন্দিত। হাসিনা ম্যামকে এগিয়ে গিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করতেই কাধ চাপড়ে গাল টিপে দিলেন।
ফুডবুথের কাজটা একরকম মজার আবার স্ট্রেসফুলও বটে। খাবার নিয়ে মানুষের কতরকম মন্তব্য, পছন্দ অপছন্দ.. সেই এক মজার ব্যাপার। কফি নিয়েও মানুষের মধ্যে দারুণ উত্তেজনা। কি জানি, আমার চা-কফির নেশা নেই বলেই হয়ত আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। চারদিনে হাজারখানেক কফি টোকেন হাত দিয়ে গেলেও এক চুমুকের বেশি কফি আমার মুখে রুচলো না।
ফুডবুথের কাজ মানেই মাথা অলওয়েজ ঠাণ্ডা। কারণ খাবার হাতে পেতে দেরী হলেই মানুষের মাথা গরম। :/
সবার খাওয়া শেষ হলে পরে আসে আমাদের পালা। সবার ছোট বলে ঠিকই খেয়াল করে “এই পিচ্চিটার ক্ষুধা লাগছে ওরে আগে দে তাড়াতাড়ি ” ইত্যাদি বলে সিনিয়ররা জোর করে আমাকেই আগে বসিয়ে দেয় খেতে।
কাজের সুবাদে আগে পরে কতজনের সাথেই জানাশোনা হলো। গত চার বছরে সাইকোলজির ফিল্ড রিলেটেড যত মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে প্রায় সবার সাথেই দেখা হলো, কথা হলো। পরিচয় হলো নতুন অনেকের সাথেই। কথায় কথায় ধর্মেন্দ্রদা জানালেন কক্সবাজারে কাজের অভিজ্ঞতা। জানালেন কাজের ভালো সুযোগ আর ঝুঁকির কথাও। রোহিঙ্গাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে APA টিম সেখানে যাচ্ছে আগামীকাল।
চবির বড় আপু জানালেন মন্ত্রনালয়ে কাজের অভিজ্ঞতা। বললাম, সব সময় কাউন্সেলিং করা যায়? বললেন, “যখন মুড ভালো থাকেনা তখন ত ক্লায়েন্ট ফিরিয়ে দিতেই হয়। তবে এটাও মাথায় থাকে, ক্লায়েন্টের দরকারটা জরুরী”।
কাজ করতে করতে বলছিলাম, কতজনকেই চিনি জানি অথচ নাম মনে রাখতে পারিনা বলে কথা বলা হয়না। সাকিব ভাই বললেন, “আমদের সেন্স অর্গান কয়টা?
-৫ টা।
-কোনো জিনিস মনে রাখার ক্ষেত্রে তুমি যত বেশি সংখ্যক সেন্স অর্গান ব্যবহার করবা তত বেশি বিষয়টা মনে থাকবে।

জিনিসটা বইতে পড়ে মাথায় না থাকলেও এখন মাথায় বেশ আছে।
রাহাত স্যারের কথা বলতে ভালো লাগে। চিনতে পেরেই যে কোমল হাসি হাসলেন দেখে ভালো লাগলো খুব।
শেষ দিনে এসে মোখলেস স্যার সিন্সিয়ারিটির ভূয়সী প্রশংসা করে ভাসিয়ে দিলেন আর জোবেদা ম্যাম দিলেন অনেক অনেক ধন্যবাদ। লজ্জায় এতটুকুন অবস্থা।
সেশন এ্যাটেন্ড করলাম কয়েকটাই। তবে কাজের ক্লান্তিতে খুব একটা মাথায় থাকেনি কিছু। তবে আরেকটু ঝালাই করে নিলে আশা করি অর্জন নিতান্তই কম নয়। শেষদিনে ডাঃ জাং হায়ে চই আর সাংইয়ং চইর ডে লং সেশন এ্যাটেন্ড করে স্কিমা থেরাপি অনেকটাই পরিষ্কার হওয়া গেলো। দেখলাম ট্রানজেকশনাল এ্যানালাইসিসের কিছু থিউরির সাথে অনেক সামঞ্জস্যতা। তবে এ্যাপ্রোচটা ভিন্ন। বাইদ্যাওয়ে, সাংইয়ং চই অসাধারণ বক্তা এবং অডিয়েন্সের সাথে কানেক্ট করার ক্ষমতা দারুণ। বলা বাহুল্য, তিনি অত্যন্ত সুদর্শন একজন কোরিয়ান প্রফেসর।
সাং হায়ে ক্বং এর সেল্ফ ইমেজারি কনসেপ্টটা বেশ ইউনিক মনে হলো। বাকেট লিস্টে থাকলো।

৩য় দিন যখন মালয়েশিয়ান প্রফেসর ফেরদৌস মুখতার ঘোষণা এবং একটা ডকুমেন্টারি দেখানোর মাধ্যমে নেক্সট CBT কনফারেন্সের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তখন হঠাৎই ভীষণ মন খারাপ হলো। এমনকি চোখেই পানি এসে গেল। কাজ করতে বিরক্তি লাগে। মনে হয় কখন শেষ হবে, কখন অবসর হবো, কিন্তু শেষ হয়ে যাবার পর মনে হচ্ছে যেন ঈদের অপেক্ষায় ছিলাম, সেই ঈদ চলে গেল। খালি খালি লাগছে ভেতরে। মনে হচ্ছে আরো কত অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান নেওয়ার ছিল, নেওয়া হলো না..
শেষ তো হলো, এবার গালা নাইট। ৩য়দিন সন্ধ্যা থেকে আয়োজন ছিল টিএসসিতে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে থেকে সবাই মিলে ঝাল ঝাল ফুচকা খেয়ে গিয়ে দেখি অসংখ্য ছবি টানানো হয়েছে। সবাই মহা উৎসাহে সেসব কিনে নিচ্ছে। কালচারাল নাইটে ভীষণ শব্দে গানবাজনা চলছে। সেসব সহ্য হলো না। মাঠে নেমে খালি পায়ে ফুলের পাশে হাঁটতেই বরং ভালো লাগছিলো। খাওয়া শেষে কিছু ছবি তোলাতুলি শেষে টিএসসির সামনে রুহির সাথে বসে রইলাম। রাত দশটায় শাড়ি পরে টিসসিতে বসে থাকা আর অদ্ভুত সব প্রলাপ বকার রাত আমার জীবনে আর আসবে কিনা জানিনা। জীবনটা এত ছোট…

শেষদিনে বিদায়ের পালা। রুইয়াহ জড়িয়ে ধরে বলল, ১০.২০ এর ট্রেনে চলে যাচ্ছি। আর দেখা হবে কিনা জানিনা।
আড্ডা দিতে দিতে হাঁটতে হাঁটতে শিমু হঠাৎ বলল, সুমাইয়ারে একটা হাগ দিই। তারপর জড়িয়ে ধরে বলল, ভুলটুল করলে মাফ করে দিস। আমি খুব অবাক হলাম।
তারপর হেসে ফেললাম। এই মেয়ে এমনই আউলা। পথে যেতে যেতে রুহিকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি মানুষটা কেমন নিজের মত করে বলতো! সে বেচারি যেন লজ্জা পেলো! বললো, তুই সব সময় সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলিস। তারপর বলল, একটু মুডিও আছিস। হাহাহা..
শাহবাগের ফুল দেখতে দেখতে বাস ধরতে যাচ্ছিলাম দু’জনে। এত এত ফুল এসেছে কাল পরশুর চাহিদা মেটাতে… দেখলাম টিউলিপ ফুলের মত সাদা রঙের ফুল। এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। অজস্র ফুলে ফুলে দোকান গুলো ভরে আছে।

ফিরতি পথে সিগনালে বসে জানালায় তাকাতেই দেখলাম একটা সাইকেল। হাল্কা গোলাপি রঙের সাইকেলের সামনের ঝুড়িতে রঙ মিলিয়ে কতগুলো গোলাপি প্লাস্টিকের ফুল। অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো দেখতে। লাগোয়া ঘড়ির দোকান পর্যন্ত দৃষ্টি প্রসারিত করতেই চোখে পড়লো ঘড়ি পছন্দ করতে থাকা গোলাপি টিশার্ট আর মাথায় গোলাপি ফুল লাগানো মেয়েটিকে। আমি সাইকেলের ছবি তুলছি দেখে আঢ়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি মনে মনে হাসলাম। কারো সাথে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে বৃষ্টির দিনে শহর ঘোরার চিন্তাটা বাদ দিয়ে নিজেই এমন একটা সাইকেল কিনে নিইনা কেন! আমার সাইকেলে ফুল থাকবে কিনা জানিনা, তবে একটা রঙিন উড়ন্ত বেলুন অবশ্যই বাধা থাকবে। একদিন এই শহর ছেড়ে হারিয়ে গেলে পলকা হাওয়ায় ভাসতে থাকা বেলুনটা আমায় সাহস দেবে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরও খবর