শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং, ,

 

শূন্যতা উদ্ভাসিত পূর্ণতায়… আফরোজা হাসান 

কেন জানি না কিছুই ভালো লাগছে না মুহিতের। সামনে পরীক্ষার তাই অনেক পড়া জমে আছে কিন্তু বই নিয়ে বসতে ইচ্ছে করছে না। সাধারণত টিভি দেখে না সে আর দেখলেও শুধু জিওগ্রাফী চ্যানেল দেখে। প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য ভীষণ রকম আকর্ষণ করে তাকে। কিন্তু অজানাকে জানার আগ্রহ আজ মনে কোন উচ্ছ্বাস তৈরি করতে পারলো না। কিছু যেন বাঁধা দিচ্ছে তাই ভেতর প্রবেশ করতে পারছে না বিশুদ্ধ বাতাস। কেমন যেন দম বন্ধ করা অনুভূতি হচ্ছে। কেমন যেন হাহাকার জাগানো শূন্যতার অনুভূতি হতে লাগলো মুহিতের। নিজেকে হঠাৎ আবিষ্কার করলো ধূ ধূ এক মরুভূমির মাঝে। চারিদিকে কেউ নেই, কিছু নেই। যতদূর চোখ যায় শুধু শূন্যতা আর শূন্যতা। অসহায়ত্বের উত্তাল সাগরের ঢেউ ভাসিয়ে দিয়ে গেলো মনের সৈকত। তীব্র স্রোতের ঝাপটা এসে লাগলো চোখে, ছলকে ছলকে বেড়িয়ে আসতে চাইলো পানির ধারা। 

এমন মুহুর্তগুলোতে প্রিয়জনদের সাথে কথা বললে অনেক প্রশান্ত হয় মন শুনেছিল সে। এমন কেউ যার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, যার কথা শুনতে ভালো লাগে। মনের অজানা ঝড়ের তাণ্ডবে নিভু নিভু আশার প্রদ্বীপ্তিকে যে দুহাতে আগলে ধরে আবার জ্বলে উঠতে সাহায্য করে। যার আশা জাগানিয়া শব্দরা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ ভেদ করে হাজির হয় সূর্য কিরণ রূপে। বাবার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করলো মুহিতের। কিন্তু সে জানে মনের এই অবস্থায় বাবার সাথে কথা বলতে গেলে আরো বেশি দুর্বল হয়ে যাবে। আর তার কণ্ঠ শুনেই বাবা বুঝে ফেলবেন কিছু একটা হয়েছে তার। কিভাবে যেন বাবা তার মনের সব কথা না বলতেই বুঝে ফেলেন। শুধু তাই না প্রয়োজন গুলোও কখনো মুখে বলতে হয় না বাবাকে। যখন যা দরকার বলার আগেই বাবা সবময় সেটা এনে দিয় তাকে। 

বন্ধুদের আড্ডায় সবাই যখন তাদের মাদের কথা বলে, মুহিত মুগ্ধ কণ্ঠে বাবার কথা বলে। অবশ্য মাকে নিয়ে বলার মতো তেমন কিছু নেইও মুহিতের। তার যখন তিন বছর বয়স মা চলে গিয়েছেন কভু না ফেরার দেশে। এরপর থেকে গত পনেরো বছর ধরে তার ভুবন বাবাময়। বাবা-মা-ভাই-বোন-বন্ধু সবকিছুর ভূমিকা বাবা একাই পালন করে যাচ্ছেন তার জীবনে। নিজের কোন কারণে বাবাকে টেনশন দিতে একদম ইচ্ছে করে না মুহিতের। তাই কথা বলার প্রচণ্ড ইচ্ছার পরও বাবাকে ফোন না দিয়ে পছন্দের দুই ক্লাসমেটকে ফোন করলো। কিন্তু একজনের ফোন বন্ধ আর আরেকজনেরটা এনগেজ টোন শুনিয়ে জানিয়ে দিলো সবাই নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত। তোমাকে দেবার মত সময় এখন কারোই নেই। 

মন খারাপের মাত্রাটা হঠাৎ করে আরো বেড়ে গেলো মুহিতের। আগেও দেখেছে যখন প্রয়োজন তখন আপন বা পছন্দের কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। এমনকি যারা নিজেদের বিরক্তিকর অবসরের কথা বলে তাদেরকেও খুঁজে পাওয়া যায় না এমন সময় গুলোতে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো মুহিতের ভেতর থেকে। কেন এমন শূন্যতা ভর করেছে মনে বোঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও শূন্যতার পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে পারলো না। মোবাইলের শব্দে চিন্তার জগত থেকে বেড়িয়ে এলো মুহিত। স্ক্রীনে বাবার হাসোজ্জ্বল চেহারা দেখে আনন্দাশ্রুতে ভরে এলো দুচোখ। ছেলে হিসেবে খুব বেশি ইমোশনাল হবার মোহর সবাই মিলে অনেক আগেই লাগিয়েছে তার উপর। মুহিত নিজেও অনুভব করে সত্যি তার বয়সী অন্যান্য অনেক ছেলের চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর সে, অনেক বেশি অভিমানী তার মন। 

সালাম বিনিময়ের পর বাবা বললেন, বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পর পেলাম তোমাকে। কথা বলছিলে কারো সাথে? 

মুহিত বলল, জ্বী না বাবা। বন্ধুদের ফোন করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পাইনি কাউকেই। 

মন খারাপ তোমার? কণ্ঠস্বর কেমন যেন বিষণ্ণ শোনাচ্ছে। 

বাবার কাছে কখনোই কিছু গোপন করে না মুহিত। অবশ্য চাইলেও পারে না গোপন করতে। তাই বলল, কেন জানি না ভালো লাগছিলো না বাবা। খুব একাকীত্ব বোধ হচ্ছিলো। তাই বন্ধুদের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু সবাই ব্যস্ত। 

কিছুক্ষণ নীরবতার পর মুহিতের বাবা হেসে বললেন, হ্যা প্রয়োজনের সময় বেশির ভাগই আমাদের বন্ধুরা ব্যস্ত থাকে। আবার অনেক সময় আমরা নিজেরাই কিছু বন্ধুকে দূরে রাখতে চাই সমস্যা থেকে। 

মুহিত বলল, আমি তোমাকে ফোন করিনি সেজন্য কি তুমি কষ্ট পেয়েছো বাবা? 

বাবা হেসে বললেন, না আমি কষ্ট পাইনি। আমি তোমাকে বুঝতে পারছি। কারণ আমার নিজের ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়। আমি আমার মন খারাপ বা সমস্যার কথা বলে কোন প্রিয় মানুষের মন খারাপ করতে চাই না। 

তাহলে তোমার মন খারাপ হলে তুমি কি করো বাবা? 

আমি এমন এক বন্ধুর কাছে যাই যে কখনোই ব্যস্ত থাকে না। যে কখনোই আমার কোন সমস্যা শুনে মুষড়ে পরে না। কারণ আমার সব সমস্যার সমাধান তার কাছে আছে। তাই তার কাছ থেকে কখনোই আমাকে নিরাশ বা আশাহত হতে হয় না। তুমি কি আমার সেই বন্ধুর সাথে পরিচিত হতে চাও? 

মুহিত বলল, অবশ্যই বাবা। কে তিনি? 

তিনি হচ্ছেন কালামুল্লাহ। আল্লাহর কালাম। যা লিপিবদ্ধ আছে পবিত্র কুরআনে। জানি খুব অবাক হচ্ছো তুমি আমার কথা শুনে। কিন্তু একথা নিয়ে দ্বিমত বা দ্বীধা পোষণের কোন সুযোগই নেই যে কুরআন আমাদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একজন ব্যক্তি তখনই আমাদের খুব ভালো বন্ধু হয় যখন তাকে আমরা শুভাকাঙ্খী বা কল্যাণকামী হিসেবে আমাদের পাশে পাই সর্বদা। আর কালামুল্লাহ’র চেয়ে শুভাকাঙ্খী বা কল্যাণকামী কে হতে পারে আমাদের জন্য? তুমি যদি খুঁজে দেখো তোমার মনের প্রতিটি অবস্থা ও পরিস্থিতির বর্ণণা ও সমাধান খুঁজে পাবে কুরআনে। করণীয়-বর্জনীয়, পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা খুঁজে পাবে। কুরআনের সুমধুর ধ্বনি তোমার অশান্ত হৃদয়ে প্রশান্তির বারিধারা বইয়ে দেবে। কাঁটা বিছানো পথ রুপান্তরিত হবে ফুল ছড়ানো পথে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কথা কি জানো? 

কি বাবা? 

কোন মানুষের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব যেমন হুট করে একদিনেই হয়ে যায় না। বরং নিয়মিত যোগাযোগ রাখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়। কুরআনের ক্ষেত্রেও কিন্তু ঠিক এমনটিই। যত তুমি কুরআনের দিকে এগোবে ততই কুরআনকে তোমার সান্নিধ্যে পাবে। কারণ কুরআনের কাছাকাছি যাওয়া মানে আল্লাহর নিকটাবর্তী হওয়া। আর হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূল (সঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে,মহান আল্লাহ বলেছেন,”বান্দাহ যখন আমার দিকে আধ হাত পরিমান এগিয়ে আসে,আমি তার দিকে এক হাত পরিমান এগিয়ে যাই। আর যখন সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে,আমি তার দিকে দুই হাত এগিয়ে যাই। আর যখন সে আমার দিকে হেঁটে আসে,আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” সুবহানাআল্লাহ। যদি আল্লাহ কারো আশ্রয় হন তাহলে তার তো একাকীত্ব বোধ করার কোন সুযোগই থাকে না। কারণ আল্লাহ তো সর্বত্র বিরাজমান। 

অনেকটা সময় চুপ থেকে মুহিত বলল, আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না বাবা। 

বাবা বললেন, আমাদের দুর্ভাগ্য কি জানো মুহিত? দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকেই ভুলে গিয়েছি। মুমিনের জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হচ্ছে মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলা’মীনের ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও তাঁর সান্নিধ্য অর্জন করা। ভেবে দেখো পৃথিবীতে কারো ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব পাওয়ার জন্য কত কিছুই না আমরা করে যাই বিরামহীন ভাবে। অথচ এটা কখনোই আমাদের সম্পূর্নরুপে জানা থাকে না যে,যাকে আমরা ভালোবাসি বা যাকে বন্ধু রূপে পেতে চাইছি তাকে পাওয়ার জন্য কি কি করতে হবে? কোন দিক নির্দেশনা যেহেতু দেয়া থাকে না তাই বিভিন্ন ভাবে আমরা বুঝে নিতে চেষ্টা করি। বুঝে নেয়ার ও বোঝার পরের সফর পারি দিতে অনেক ধরণের কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয় এবং তা করার জন্য প্রস্তুত থাকি আমরা। কারণ সম্পর্ক থেকে কিছু পেতে হলে কিছু দেয়া প্রধান শর্ত। তাই আমরা খুশি মনেই তা করি কারণ লক্ষ্য থাকে প্রিয় মানুষকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে তার ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব অর্জন। জীবন চলার পথে সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার মুহুর্তগুলোতে পাশে পেতে চাই তাই অনেক কদর করি তাদের। অথচ যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যার রহমত ছাড়া একটি মুহুর্ত আমাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয় ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব পেতে আমরা কি ত্যাগ স্বীকার করি? অথচ আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন তো আমাদের শুধু এই দুনিয়াতেই ভালোবাসেন না বরং পরকালেও দিবেন চির শান্তির জান্নাত। আর তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমাদের কি করতে হবে তাও তিনি বলে দিয়েছেন কুরআনে। শুধু বলেই দেননি রাসুল (সঃ) মাধ্যমে বাস্তবে তাঁর প্রতিফলন করে দেখিয়েছেন। যাতে আমাদের কোন কিছু নিয়ে দ্বীধা-সংকোচে ভুগতে না হয়। ভেবে দেখো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের চেয়ে বড় শুভাকাঙ্খী ও কল্যাণকামী কি কেউ হতে পারবে আমাদের জন্য? 

মুহিত বলল, ইনশাআল্লাহ বাবা এই মুহুর্ত থেকে আমি কুরআনকে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলাম। তুমি ঠিক বলেছো বাবা সেই তো শ্রেষ্ঠ বন্ধু যে সর্বাবস্থায় কল্যাণকামী হিসেবে পাশে পাওয়া যায়, যাকে কোন কথা বলতে দ্বীধা-সংকোচ স্পর্শ করতে পারে না। যে সবসময় শুনিয়ে যায় আশার কথা, দিয়ে যায় নিরবধি প্রেরণা, যার সঙ্গ সর্বদা অন্তরকে করে প্রশান্ত। যে স্বপ্ন দেখায় সুন্দর এক জগতের। মনের সকল শূন্যতা যার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হয় পুর্ণতায়। আর একমাত্র কুরআনই এমনটা হতে পারে কারো জন্য। বাবা আজ থেকে তাই তোমার মতো আমারো সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হচ্ছেন কালামুল্লাহ। 

বাবা হেসে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে তুমি তোমার বন্ধুর সাথে সময় কাটাও এখন। অফিসের কাজ সেরে বাসায় ফিরে কথা হবে, ইনশাআল্লাহ। 

বাবাকে বিদায় জানিয়ে মুহিত কুরআন ও তাফসীর নিয়ে বসলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরও খবর