banner

বৃহস্পতিবার, ৩০ Jul ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 13 বার পঠিত

 

দেশে ছয় মাসে নারী নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনা শুধু অপরাধের নৃশংসতাই নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজধানীর মিরপুরে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা,
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক গৃহবধূ নিজ বাড়িতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। অভিযোগ ওঠে, ঘটনার পর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হুমকির কারণে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে এবং নিজ বাড়িতে ফিরতে না পেরে হাসপাতালেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
কুমিল্লার মুরাদনগরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের একটি ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করে, মামলা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় তদন্তের শুরুতেই নানা জটিলতা তৈরি হয়।
আবার ঢাকার নবাবগঞ্জে চুরির অভিযোগ তুলে দুই তরুণীকে আটকে রেখে মারধর এবং প্রকাশ্যে তাদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকারকর্মীরা একে নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।

এসব ঘটনার পাশাপাশি বিগত ছয়মাসে পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা, যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতন এবং শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বহু ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে
ঘটেছে।
বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, বিচারহীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং নারীবিদ্বেষী মানসিকতা এখনও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট। আইন, নীতিমালা এবং বিচারব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে অব্যাহত রয়েছে।
ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের কারণে হত্যা, যৌন হয়রানি এবং নারীর প্রতি নানামুখী নির্যাতন সমাজের নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন এবং ১১ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যার বিচারে ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ধর্ষণের পর হত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা ছিল ২২টি, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪.৯৮ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩০টি, অর্থাৎ প্রায় ৯.৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট এবং বিচার এড়াতে আরও সহিংস পন্থা বেছে নিচ্ছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৩ জন কিশোরী এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৬৮ জন শিশু রয়েছে। অর্থাৎ শিশু ও কিশোরীরাই যৌন সহিংসতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত পরিবারও অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ‘আসক’ এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৯১ জন নারী স্বামীর হাতে এবং ২১ জন নারী স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন, মানসিক চাপ ও সামাজিক নিপীড়নের কারণে ৬৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুকের দাবি, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়ার অভিযোগ কিংবা পারিবারিক বিরোধ সহ বিভিন্ন কারণকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নারীর পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে ৬ জন পুরুষ নিহত এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন।
বাস্তবিকই নারী নির্যাতন এখন শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং সামাজিক প্রতিরোধকেও সহিংসভাবে দমন করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নারী নির্যাতন অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকলেও মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অতীতে পরিচালিত ব্র্যাক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় চূড়ান্ত সাজা পাওয়ার হার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পান। ফলে অনেক অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায় এবং তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, মামলা গ্রহণে বিলম্ব, যথাসময়ে মেডিকেল পরীক্ষা না করা কিংবা তদন্তে গাফিলতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

নারী নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাও এখনও সীমিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই কম। ফলে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক চাপ এবং সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবারও নির্যাতনকারীর কাছেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
স্বল্পমেয়াদি সহায়তা বা আইনি পরামর্শ দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়।

নারী নির্যাতন কমাতে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; বরং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, কার্যকর তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে বিবেচনা করেই দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

তথ্যসূত্র:
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)
Human Rights Watch

Facebook Comments Box