অস্ত্রোপচারের পর ক্ষতস্থানে সংক্রমণ বা ইনফেকশন হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক সময় সময়মতো সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়ায় রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। এই জটিল সমস্যার এক অবিশ্বাস্য ও সহজ সমাধান আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আমেরিকার আয়োয়া অঙ্গরাজ্যের এক হাইস্কুল ছাত্রী দাসিয়া টেলর। খন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। নিজের স্কুলের রসায়ন ক্লাসের একটি সাধারণ প্রজেক্ট থেকে তিনি এমন এক ‘স্মার্ট সিউচার’ বা সেলাই সুতা তৈরি করেছেন, যা ক্ষতস্থানে সংক্রমণ শুরু হলেই রং বদলে সংকেত দেয়। এই যুগান্তকারী যাত্রার শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে। দাসিয়ার রসায়নের শিক্ষক ক্যারোলিন ওয়ালিং যখন ক্লাসে বার্ষিক বিজ্ঞান মেলার কথা জানান, তখন থেকেই ভিন্নধর্মী কিছু করার পরিকল্পনা করেন দাসিয়া। তিনি লক্ষ্য করেন, অস্ত্রোপচারের পর বিশেষ করে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সঠিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ক্ষতস্থানের সংক্রমণ সময়মতো ধরা পড়ে না। এই মানবিক চিন্তা থেকেই তিনি এমন কিছু তৈরির চেষ্টা শুরু করেন, যা কোনো দামি যন্ত্র ছাড়াই সাধারণ মানুষ খালি চোখে বুঝতে পারবে। দাসিয়ার এই চমৎকার আবিষ্কারের পেছনে কাজ করেছে বিজ্ঞানের খুব সহজ একটি সূত্র, যা মানবদেহের ‘pH’ বা অম্ল-ক্ষারের মাত্রার সাথে সম্পর্কিত। সাধারণত মানুষের সুস্থ ত্বকের স্বাভাবিক pH মাত্রা কিছুটা অ্যাসিডিক অর্থাৎ প্রায় ৫ হয়ে থাকে। কিন্তু ক্ষতস্থানে যখনই কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে, তখন সেখানকার পরিবেশ দ্রুত ক্ষারীয় রূপ নেয় এবং pH মাত্রা বেড়ে প্রায় ৯-এ পৌঁছায়। দাসিয়া বুঝতে পেরেছিলেন, যদি সেলাই সুতা এই pH পরিবর্তনের সাথে সাথে রং বদলাতে পারে, তবে খুব সহজেই ইনফেকশন শনাক্ত করা সম্ভব। এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রাকৃতিক pH ইন্ডিকেটরের খোঁজে নেমে পড়েন দাসিয়া। বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবশেষে তিনি বেছে নেন আমাদের পরিচিত বিটরুট। প্রায় তিন ডজন বিট থেকে রস বের করে তিনি তা তুলা ও পলিয়েস্টার মিশ্রণের তৈরি সাধারণ সেলাই সুতায় প্রয়োগ করেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম সংক্রমিত পরিবেশে সুতাটি রাখা মাত্রই ঘটে চমকপ্রদ ঘটনা,মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে সুতাটি তার উজ্জ্বল লাল রং বদলে গাঢ় বেগুনি হয়ে যায়। চিকিৎসা বাজারে আগে থেকেই কিছু উন্নত “স্মার্ট সিউচার” বা সুতা থাকলেও দাসিয়ার তৈরি সুতাটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য। প্রচলিত স্মার্ট সুতাগুলো তৈরিতে অত্যন্ত চড়া প্রযুক্তির সিলিকন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাছাড়া সেই সুতার রিডিং দেখার জন্য স্মার্টফোন বা ল্যাব মনিটরের প্রয়োজন পড়ে। অন্যদিকে দাসিয়ার তৈরি পদ্ধতিটি অত্যন্ত সস্তা, সহজে প্রস্তুতযোগ্য এবং এর রং পরিবর্তন এতটাই স্পষ্ট যে রোগী বা স্বাস্থ্যকর্মীরা কোনো যন্ত্র ছাড়াই খালি চোখে সংক্রমণ দেখতে পাবেন। এই অসামান্য উদ্ভাবনের জন্য দাসিয়া টেলর ২০২১ সালের আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ ‘রেজেনেরন সায়েন্স ট্যালেন্ট সার্চ’ প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ৪০ জন ফাইনালিস্টের মধ্যে জায়গা করে নেন। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর তিনি আয়োয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ্লোবাল হেলথ’ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন।
![]()














