banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 236 বার পঠিত

 

প্রশাসনে মুসলিম নারী: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আয়নায় – সালিমা মেহরা

​ফেসবুক ফতোয়ার ধুন্ধুমার পথ মাড়িয়ে আসুন চোখ রাখি ইতিহাস আর ঐতিহ্যে। আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যে এমনটা আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করলে আমাদের যেতে হয় ফারাণ মরুভূমিতে—আমাদের হৃদয়ে যাঁর নাম মক্কা।

​স্থিরতা, সহনশীলতা আর তাওয়াক্কুলের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত যমযম কূপের পাশে হযরত হাজেরা (আ.) শিশু পুত্রসহ একাকী বসে আছেন। পানির সন্ধান পেয়ে জুরহুম গোত্রের প্রতিনিধি দল এসে বলল, “সম্মানিতা বোন, আপনার অনুমতি হলে আমাদের গোত্র এখানে বসবাস করতে চায়।” হযরত হাজেরা (আ.) অনুমতি দিয়ে বললেন, “বসবাস করতে পারেন; তবে এই কূপের ওপর শুধু কর্তৃত্ব থাকবে আমার।”

​এটা কি শুধুমাত্র কূপের ওপর কর্তৃত্ব, নাকি এই কূপ ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদে পানি বণ্টন ও সীমা নির্ধারণের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃত্ব? তবে কি এ ভূমিকা ছিল একজন প্রশাসকের? একজন নারীর এই ভূমিকা তখনও স্বাভাবিক ছিল বলেই জুরহুম গোত্রের কোনো আপত্তি ছিল না।
কিন্তু এখন!!

​ফারাণ পর্বত ছেড়ে মদিনায়। মুসলিম জাহানের সোনালী সময়; খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকাল। মদিনার বাজার—সমৃদ্ধ আর জমজমাট। সুচারুরূপে বাজার পরিচালনায় বাজার আদালত (قاضية الحسبة) তথা ‘অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি কোর্ট’ এবং (قاضية السوق) ‘মার্কেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর দায়িত্বে ছিলেন হযরত শাফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)।
তিনি ছিলেন একজন নারী সাহাবী এবং মক্কা ও মদিনার প্রসিদ্ধ চিকিৎসক। তিনি তাঁর পেশায় এতটাই সফল ছিলেন যে, ইতিহাস তাঁকে ‘শিফা’ (নিরাময়কারী) নামে স্মরণ রেখেছে।

ইতিহাসে আরেকটি নাম ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রহ.)। আলেপ্পোর প্রশাসনিক ফতোয়ার ওপর দুইজন পুরুষের পাশাপাশি দস্তখত থাকত এক নারীর—তিনিই সেই সম্মানিতা নারী।

​হাফসা বিনতে সিরিন (রহ) সময়ের সেরা ফকিহা। হিশাম বিন হাসসান যাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি হাসান বসরি ও ইবনে সিরিনকে দেখেছি, কিন্তু আমি এমন কাউকেই দেখিনি যাঁকে হাফসার চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে হয়েছে।”

উনারা তো ফকিহা ছিলেন; এখনো এই যোগ্যতা অর্জনে কে বাধা দেয়? সত্যিই কি এটা সমান অর্জন? তবে সেই ফকিহা কেমন? সেই অর্জন কতখানি?

​ক্রমবর্ধমান ইসলামী রাষ্ট্রের নিত্যনতুন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় সময়ের সেরা তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের হাতে গড়ে ওঠে ইসলামী আইনশাস্ত্র।
যেখানে টেক্সচুয়াল জ্ঞানের সাথে ‘Rational Knowledge’ বা ‘আকল-ভিত্তিক জ্ঞান’ ছিল অপরিহার্য। ইজতিহাদের সেই ক্ষমতা ছিল মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা। তাই সেই সময়ের ফকিহারা ছিলেন একেকটি পর্বতশৃঙ্গ, সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের অপরিহার্য অংশীদার।

​আমাদের দৃষ্টি আরও মুগ্ধতা মাখে এক হাশেমী নারীর বিস্ময়কর জ্ঞান, শক্ত মনোবল আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখে।
তিনি হযরত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ (রহ.)! ইতিহাস যাকে স্মরণ রেখেছে ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর জন্মদাত্রী এক সফল মা হিসেবে। পুত্র ইমাম শাফেয়ির জন্মের পরপরই স্বামী হারিয়ে তিনি ইয়েমেনে পিতৃগৃহে আশ্রয় নেন। পিতার অবস্থা ছিল হতদরিদ্র, তবে ফাতিমা থেমে যাননি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে ছেলেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা, কবিতা ও আর্চারি শেখানোর জন্য তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। ছেলেকে হাফেজ, মুহাদ্দিস ও ফকিহ হিসেবে গড়ে তুলতে অল্প বয়সে বিধবা হওয়া ফাতিমা ‘সিঙ্গেল মাদার’ হিসেবেই বাকি জীবন কাটিয়েছেন—যা তৎকালীন আরবের প্রেক্ষাপটে ছিল এক বিরল ঘটনা।

​একজন সফল মা হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সে সময়ের সেরা ফকিহা। একবার মক্কায় বিচারের কাজে সাক্ষী হওয়ার জন্য দুইজন নারীকে ডাকা হলো। দুজনের একজন ছিলেন হযরত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ। কাজি আলাদা আলাদা কক্ষে দুজনের সাক্ষ্য নিতে চাইলেন (শাফেয়ি মাযহাব মতে সাক্ষীদের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে আলাদা সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায়)।

বিচারের মজলিসে উপস্থিত ফাতিমা বিনতে ওবায়দুল্লাহ শান্ত গলায় বললেন, “আপনার এটা করার কোনো অধিকার নেই কাজি সাহেব। কারণ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন—যদি নারী সাক্ষীদের একজন কোথাও ভুলে যায়, তবে অন্যজন তা স্মরণ করিয়ে দেবে।” (২:২৮২)।

​অতঃপর কাজি এই যুক্তির পর একসাথে তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ইমাম সুবকি এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে বলেন, “সত্যিই এটি ছিল সুন্দর দলিল, শক্তিশালী উপস্থাপন আর অসাধারণ যুক্তিতর্ক।” ছেলের মাযহাবের বিপরীতে উম্মে শাফেয়ির এই অবস্থান ছিল অনবদ্য।

ইতিহাসের গলিপথ মাড়িয়ে মহাগ্রন্থ আল কুরআন-এ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে হযরত মারইয়াম (আ.)যে ছবি ভেসে উঠে তাতে আমরা একজন বুদ্ধিদীপ্ত বালিকার সাক্ষাৎ পাই। বালিকা থেকে কৈশোরে উপনীত হতেই যিনি ইলম চর্চা, আনুগত্য আর চারিত্রিক পবিত্রতায় মহান রবের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কৈশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা রাখা এই মহান রমণী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিজার জন্য মনোনীত হলেন।
ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে তিনি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সদ্য জন্মানো অসাধারণ শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজ গোত্রে ফিরে আসা এবং দোলনা থেকে ছোট্ট শিশুর মাধ্যমে মায়ের চারিত্রিক পবিত্রতার সত্যায়ন—ইতিহাসের এই বর্ণনা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।

​তবে আমরা যা শুনিনি বা খুবই কম শুনেছি, তা হলো:

​একজন নারী কি পবিত্র মসজিদের খাদেমা হতে পারে? সমাজের ও জনপদের লোকদের এই নেতিবাচক মনোভাবকে ভুল প্রমাণিত করে মহান রব দিয়েছেন এর সম্মানজনক অনুমোদন।

​একজন সফল ‘সিঙ্গেল মাদার’-এর সংগ্রামের গল্প। সদ্য জন্মানো শিশুপুত্র ছিল একজন নবী, স্বয়ং রাজা ছিল যাঁর দুশমন। পুরো একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সন্তানের নিরাপত্তায় একাকী মায়ের লড়াই।

​একজন মা, পিতাহীন শিশুপুত্রকে হকের জন্য নিরাপদ রাখতে সুদূর মিশর পানে ছুটে চলেছেন। পথে বিপদ আছে, জীবননাশের শঙ্কা আছে; আর সেই মায়ের একমাত্র হাতিয়ার—বিশ্বাস, তাওয়াক্কুল আর বিচক্ষণতা। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বারোটি বছর সন্তানকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। শিক্ষা দিয়েছেন জালেম রাজার বিরুদ্ধে আর মাজলুমের পক্ষে অটল হয়ে দাঁড়ানোর তেজোদীপ্ততা।

​আমরা থমকে দাঁড়াই ইতিহাসের এই বাঁকে এসে, যখন অভিভূত হয়ে দেখি, একজন নারী লড়ে যেতে পারেন গোটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে—সত্য ও ন্যায়ের জন্য। আর পবিত্র কুরআনে এই মহান নারীকে মনোনীত করেছে সকল নারীর জন্য আদর্শ হিসেবে:

​“হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছেন এবং পবিত্র করেছেন; আর বিশ্বজগতের নারীগণের ওপর আপনাকে মনোনীত করেছেন।” (৩:৪২)

​আমরা যদি বর্তমান ও আগামীর সন্ধানে চোখ রাখি ইতিহাসে তাহলে চার্লস সেইফার্টের ভাষায় বলতে হয়, “নিজের ইতিহাস আর সংস্কৃতির জ্ঞান যে জাতির নেই, তারা শিকড়হীন গাছের মতো। সামনে এগোতে হলে আগে পেছনে তাকাতে হয়।”

Facebook Comments Box