banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 114 বার পঠিত

 

মে দিবসে উপেক্ষিত নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার

আজ পহেলা মে, ​বিশ্বজুড়ে মে মাসের প্রথম দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সংগ্রাম আর সংহতির প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে এবং আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার সুফল আজও পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারেননি নারী শ্রমিকরা।
একদিকে যখন উৎসবের আমেজে মে দিবস পালিত হয়, অন্যদিকে দেশের বিশাল শ্রমশক্তির একটা অংশ -নারী শ্রমশক্তি দিন পার করেন চরম মজুরি বৈষম্য আর অদৃশ্য শ্রমের নিগড়ে বন্দি থেকে।
বিশেষ করে দেশের কৃষি, শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও নারীদের ন্যায্য অধিকার যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

​সৃষ্টির আদি পেশা কৃষির সঙ্গেই নারীর সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের কৃষিখাতে যে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি এই নারীরা।
পরিসংখ্যান বলছে, সার্বিক কৃষির ২১টি কাজের মধ্যে অন্তত ১৭টি কাজই নারীরা করে থাকেন।
বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা তৈরি, ধান মাড়াই, সেদ্ধ করা বা রোদে শুকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তাদের হাতেই সম্পন্ন হয়।
অথচ, এই খাতে ভূমিকা রাখা নারী শ্রমিকদের শ্রম অনেকটাই অদৃশ্য।
নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অভাব, স্বল্প মজুরি আর নানা বঞ্চনায় তারা আজো কোণঠাসা।
কৃষি শ্রমশক্তির সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ কোটির বেশি নারী শ্রমিকের মধ্যে অন্তত ৫৮ শতাংশই মজুরি বৈষম্যের নির্মম শিকার।

​গাইবান্ধার সায়মা আক্তার যেন এই লাখো বঞ্চিত নারীরই প্রতিচ্ছবি। মাঠে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভুট্টা তোলা, পাট বা পুঁই শাক তোলার মতো কাজ করলেও দিনশেষে তার হাতে ওঠে মাত্র ৫০০ টাকা এবং একবেলা খাবার। অথচ একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা পাচ্ছেন তিন বেলা খাবারসহ বেশি মজুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যও এই বৈষম্যের সত্যতা প্রমাণ করে। কৃষিখাতে দৈনিক একবেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে সর্বোচ্চ ৫৭৭ টাকা পান, সেখানে নারীদের জোটে মাত্র ৪১৬ টাকা। খাবার ছাড়া পুরুষের ৬২১ টাকার বিপরীতে নারী পান ৪৬১ টাকা।
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ফসলের ন্যায্য হিস্যা বা সমান মজুরি না পাওয়াটা যেন তাদের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

​কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ হলো কৃষক হিসেবে নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না থাকা। কৃষিবিদ ড. কাশফিয়া আহমেদের মতে, দেশে কত শতাংশ নারী কৃষক আছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য হালনাগাদ নেই। ২ কোটি ২৫ লাখ কৃষকের মধ্যে নারীদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তাদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ বা বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল মনে করেন, নারীবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির অভাব এই বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। প্রযুক্তিগুলোকে নারীবান্ধব করে গড়ে তোলার পাশাপাশি নারী কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

​শুধু কৃষিখাতেই নয়, ইটভাটা, চাতাল, নির্মাণশ্রম, পাথর ভাঙা কিংবা পোশাক শিল্পের মতো ভারী ও প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব জায়গাতেই নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু অভাবের তাড়নায় কাজ করতে আসা এই নারীদের মজুরির বেলায় ঠকানো হচ্ছে অবলীলায়। পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা রোজগার করেন, সেখানে নারীদের দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির যুগে সামান্য এই টাকায় সংসার চালানো তাদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
অধিকার বা মজুরি বৃদ্ধির কথা বললে অনেক সময় কাজ হারানোর হুমকিতেও পড়তে হয় তাদের।

​মজুরি বৈষম্যের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য আরেকটি বড় আতঙ্কের নাম যৌন হয়রানি।
‘সজাগ কোয়ালিশন’-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কারখানার প্রায় ২২ শতাংশ নারী শ্রমিক নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। কারখানায় প্রবেশের সময় অস্বস্তিকর দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, কিংবা মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা অনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চাপের মতো বিষয়গুলো নিত্যদিনের ঘটনা। অথচ এসব অভিযোগ বেশিরভাগ সময়ই আমলে নেওয়া হয় না। এর বাইরে বিদেশে, বিশেষ করে সৌদি আরবে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের খবর প্রতিনিয়তই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। গত তিন দশকে নারী শ্রমিকদের ৪০ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব, যেখানে তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ আজও দৃশ্যমান নয়।

​বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় আয়ে নারীদের অবদান প্রায় ৩০ ভাগ,বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪বছর বয়সী বিশ্বের মোট নারীর ৪৫ ভাগই অর্থনৈতিক ভাবে স্বক্রিয়।
অন্যদিকে দেশে রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পোশাকশিল্পের ৮০ ভাগই নারী শ্রমিকদের দখলে।
তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। 
তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ক্রমশ কমছে,এ থেকে বুঝা যায় শ্রমমর্যাদায় নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান কতটা পিছিয়ে।

৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি নিয়ে মে দিবস এলেও নারীদের অদৃশ্য ও গৃহস্থালি শ্রমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, নেই কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের সুযোগ। সমতার ভিত্তিতে মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মে দিবসের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব। তা না হলে উৎসবের এই দিনটি নারী শ্রমিকদের কাছে কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি পাতা হয়েই রয়ে যাবে।

Facebook Comments Box