banner

শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 64 বার পঠিত

 

গাজার অকুতোভয় শিশু সাংবাদিক সুমাইয়া উইশাহ

​যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা। চারদিকে কেবল ধ্বংসস্তূপ আর বোমার শব্দ। এর মাঝেই ভারী ‘PRESS’ লেখা নীল ভেস্ট আর হেলমেট পরে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট মেয়ে। সে অন্য শিশুদের মতো কোনো খেলায় মেতে নেই; বরং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে যুদ্ধের এক ভয়ংকর বাস্তবতাকে।
​তার নাম সুমাইয়া উইশাহ। বয়স মাত্র ১১ বছর। গাজার ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাটই এখন তার কাজের জায়গা। শুরুতে তার বাবা, মুহাম্মদ উইশাহ এবং তার মা তাকে এই চরম বিপদে পা বাড়াতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ সাংবাদিকদের জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে তারা পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
কিন্তু সুমাইয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সত্য জানানোর জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় তাদের।

​গাজা যুদ্ধে তার ভূমিকা

যুদ্ধের ভয়াবহতায় যখন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরাও হিমশিম খাচ্ছেন, তখন সুমাইয়া হাতে তুলে নিয়েছে মাইক্রোফোন। সে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে, কিংবা খাবার ও ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরছে। আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তার এই সাহসী উপস্থিতির খবর প্রচারিত হয়েছে।

অনুপ্রেরণা

এত ছোট বয়সে সাংবাদিকতায় আসার পেছনে সুমাইয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলেন শিরিন আবু আকলেহ।
শিরিন আবু আকলেহ আল-জাজিরার একজন প্রখ্যাত ও সাহসী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ছিলেন, যিনি ২০২২ সালে জেনিনে সংবাদ সংগ্রহের সময় নিহত হন। শিরিনের সাহস আর সত্য প্রকাশের নির্ভীকতা সুমাইয়াকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
সে চায় শিরিনের মতোই গাজার প্রকৃত অবস্থা ও শিশুদের কষ্ট সারা বিশ্বকে জানাতে।

​প্রভাব ও বৈশ্বিক মনোযোগ

সুমাইয়ার এই অকুতোভয় সাংবাদিকতা খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ববাসীর মনে এক গভীর মানবিক ছাপ ফেলেছে।
তার ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
তার পাশাপাশি আরও দেখা যায় গাজার সবচেয়ে কনিষ্ঠ সাংবাদিক ৯ বছর বয়সী লামা আবু জামুস নামের আরেক শিশুও কাজ করছে।

​ঝুঁকি ও বাস্তবতা

কিন্তু এই অসামান্য উপাখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মর্মান্তিক কঠিন বাস্তবতা।
একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে একজন ১১ বছরের শিশুর সংবাদ সংগ্রহ করা কতটা বিপজ্জনক, তা সহজেই অনুমেয়।
তার এই কঠিন যাত্রায় গতকাল যুক্ত হয়েছে এক চরম আঘাত – জানা গেছে, একটি ড্রোন হামলায় সুমাইয়ার বাবা মুহাম্মদ উইশাহ নিহত হয়েছে।
চোখের সামনে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নিজের বাবাকে হারানোর এই তীব্র শোক সুমাইয়ার জন্য এক অকল্পনীয় মানসিক ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
শিশুরা যেখানে স্কুলে থাকার কথা, নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা, সেখানে তাদের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
একটি শিশুর কাঁধে যুদ্ধের খবর জানানোর এই দায়িত্ব আসলে আমাদের মানবিক ব্যর্থতারই প্রমাণ।

​সুমাইয়া উইশাহ কেবল একজন শিশু সাংবাদিক নয়, সে গাজার হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং সীমাহীন ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতীক। বাবার মৃত্যুর মতো চরম আঘাতের পরও তার এই টিকে থাকার লড়াই আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের নির্মমতা, সত্য তুলে ধরার অদম্য সাহস এবং সংবাদমাধ্যমের অসীম শক্তির কথা।

Facebook Comments Box