banner

বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 13 বার পঠিত

 

রেহানে জাবারি: অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক তরুণীর শেষ লড়াই

ইরানের তরুণী রেহানে জাবারির (জন্ম: ১৯৮৭) জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালের ৭ জুলাই, যখন মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি ধর্ষণের মুখে পড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এক প্রভাবশালী সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার আক্রমণাত্মক আচরণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে তিনি ছুরি ব্যবহার করেন। মুহূর্তেই এই আত্মরক্ষার চেষ্টা ‘পরিকল্পিত হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রতিরোধের সত্যটিকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে হত্যাকারী হিসেবে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

বিচারপ্রক্রিয়ায় রেহানের কথা শোনার কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। তদন্তে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ গুরুত্ব পায়নি; বরং তার নরম হাত, রঙ করা নখ, নারীত্বের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য—এসবই ব্যঙ্গ এবং সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে।
রেহানে যে কখনো একটি মশাও হত্যা করেননি—এই কথাও বিচারকের চোখে উপেক্ষিত থাকে। শেষ পর্যন্ত আদালত তাকে “ঠাণ্ডা মাথার খুনি” আখ্যা দিয়ে ২০০৯ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে।

রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মানবাধিকার সংগঠন, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতা—সবার দাবি ছিল রেহানের বিচার পুনর্বিবেচনা করা হোক। নানা দেশে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্তির দাবি ওঠে। এমনকি রেহানের মা শোলেহ আদালতের কাছে মেয়ের বদলে নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ার আবেদনের মতো হৃদয়বিদারক পদক্ষেপও নেন। কিন্তু রাষ্ট্রের কঠোর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই নরম হয়নি।

গ্রেফতারের পর রেহানেকে প্রথমে কুখ্যাত এভিন কারাগারের একাকী কক্ষে রাখা হয়। দীর্ঘ জেরা, নজরদারি ও নিপীড়নের মধ্যে কাটে তার দিন। পরে তাকে স্থানান্তর করা হয় শাহর-এ রায় কারাগারে, যেখানে পরিবেশ আরও কঠোর ছিল।
মাথা মুড়িয়ে তাকে একাকী কক্ষে রাখা হয়—যেন তার নারীত্ব ও আত্মমর্যাদাকে ভেঙে ফেলা যায়। আত্মরক্ষার সাহস দেখানোর অপরাধে তাকে সহ্য করতে হয় অপমান, অবমাননা এবং অমানবিক নির্যাতন।

ফাঁসির আগের রাতটি ছিল ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর। শাহর-এ রায় জেলের অন্ধকার সেলে সেই রাতটিই ছিল তার জীবনের শেষ রাত। সেদিনই তাকে জানানো হয় যে ২৫ অক্টোবর ভোরে ‘কিসাস’ রায় কার্যকর হবে। তিনি আক্ষেপ করেন—এই শেষ সত্যটি মা কেন নিজে জানাননি তাকে। সেই রাতেই তিনি লিখে যান তার বিখ্যাত শেষ চিঠি—যা পরে মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে প্রতিরোধের এক মূল্যবান দলিল হয়ে ওঠে।
চিঠিতে তিনি মায়ের শেখানো সত্য, সাহস ও মর্যাদার শিক্ষা স্মরণ করেন এবং জানান—তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না, কিন্তু বিচারহীনতার ক্ষত তাকে তীব্রভাবে ব্যথিত করে।

চিঠিতে রেহানে নিজের শেষ ইচ্ছাগুলোও প্রকাশ করেন। তিনি চান, মৃত্যুর পর তার চোখ, হৃদপিণ্ড, কিডনি, হাড়—যা কিছু দানযোগ্য, তা যেন অন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত হয়। তবে তিনি অনুরোধ করেন—যে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাবে, সে যেন কখনো রেহানের নাম না জানে। তিনি কোনো কবর, কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ফুলের আয়োজনও চান না। এমনকি মা-ও যেন তার কবরের পাশে শোক নিয়ে না যান-এই অনুরোধও করেন। তিনি মাকে বলেন, সমস্ত দুঃখ বাতাসে ছেড়ে দিয়ে নতুন করে জীবনকে গ্রহণ করতে।
চিঠির শেষ অংশে রেহানে দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে সৃষ্টিকর্তার আদালতে সত্যের বিচার হবেই। তিনি লিখেন—সেই চূড়ান্ত বিচারের দিনে তিনি ও তার মা দাঁড়াবেন অভিযোগকারীর আসনে, আর যারা তাকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে তারা দাঁড়াবে আসামির কাঠগড়ায়। মৃত্যুর আগে তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল—শেষ মুহূর্তে মায়ের বুকের কাছে থাকা। আর তার শেষ বাক্য—
“মা, তোমাকে আমি খুব, খুব ভালোবাসি।”
এই বাক্যেই মিশে আছে একসঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা ও নিখাদ স্নেহ।

২৫ অক্টোবর ২০১৪, ভোরের কিছু পর রেহানে জাবারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
আজও তার মৃত্যু মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক শোকাবহ অধ্যায়।আর তার লেখা সেই চিঠি আজও বেঁচে আছে সত্যের পক্ষের সওয়াল হিসেবে-অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে, নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হয়ে।

Facebook Comments Box