banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 98 বার পঠিত

 

ফিরে দেখাঃ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৩০-৩১ সালের লবণ সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ লবণ আইনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো গণ-আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং সারা ভারতে বিদেশি পণ্য বর্জন, লবণ সংগ্রহ ও পুলিশি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই আন্দোলনের ইতিহাসে নারীদের অবদান আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া একটি পুরোনো ছবি অ্যালবাম সেই বিস্মৃত অধ্যায়ের নতুন আলোকপাত করেছে।

দুই দশক আগে লন্ডনের নিলামে ওঠা ধূসর রঙের ছোট অ্যালবামটি দীর্ঘসময় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল দিল্লির আলকাজি ফাউন্ডেশনে। অ্যালবামের মলাটে ছিল ‘ওল্ড কংগ্রেস পার্টি—কে এল নার্সি’ লেখা, কিন্তু নামটি কার সে পরিচয় জানা ছিল না। ছবিগুলোর নিচে টাইপরাইটারে লেখা ক্যাপশনগুলোতেও ছিল প্রচুর ভুল। গবেষকেরা অনেক দিন এ অ্যালবামকে তেমন গুরুত্ব দেননি। অবশেষে ২০১৯ সালে ফাউন্ডেশনের কিউরেটর ও যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক অ্যালবামের ছবিগুলো বিশ্লেষণ শুরু করলে তাঁরা বিস্মিত হন—এই বহু পুরোনো অ্যালবামেই লুকিয়ে ছিল লবণ সত্যাগ্রহে নারীদের নেতৃত্বের অমূল্য প্রমাণ।

অ্যালবামের ছবিগুলোতে ধরা আছে ১৯৩০ সালের বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) উত্তাল রাস্তাঘাট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মুহূর্ত, আহত স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধার এবং সর্বোপরি নারী নেতৃত্বের দৃশ্য। গবেষক সুমাথি রামাস্বামীর ভাষায়—“ছবিগুলো দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীরা কতটা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের ময়দানে ছিলেন।”

 লীলাবতী মুনশি নামে গুজরাটের সাহসী কংগ্রেস নেত্রীকে দেখা যায় পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ দিচ্ছেন সরকারি লবণ কেন্দ্র দখলে। আরেক ছবিতে তিনি ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে দৃঢ় ভঙ্গিতে বয়কট কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। চারপাশে পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও তাঁর আত্মবিশ্বাসে ছিল নারীর নতুন শক্তি ও রাজনীতিতে নতুন পরিচয়।

অ্যালবামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘দেশ সেবিকা’ বাহিনীর ছবি—যা ছিল সম্পূর্ণ নারীদের নিয়ে গঠিত। তাঁরা পুলিশের লাঠিচার্জ ঠেকিয়ে পতাকা রক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, যা তখনকার সামাজিক মানসিকতার জন্য ছিল অভাবনীয়। একই সঙ্গে চৌপাট্টি সৈকতে হাজারো নারী সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন-লবণ সত্যাগ্রহকে জন-আন্দোলনে রূপ দিতে এই নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

 আরও উল্লেখযোগ্য হলো—অনেক নারী তাঁদের কন্যাদের হাত ধরে আন্দোলনে নিয়ে এসেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

ছবিগুলোর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক মিছিলে নারীরা সামনের সারিতে, আর রাস্তার দুই পাশে পুরুষেরা দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন। এই উল্টোচিত্র সমসাময়িক সমাজে নারীর অবস্থান বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। গবেষকেরা বলেন, শুধু নেতাদের ডাকে নয়—বোম্বের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সাধারণ নারী, আন্দোলনকে বড় রূপ দিয়েছিলেন। তাঁদের মিছিল, পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো, গ্রেপ্তার হওয়া ও বয়কটের প্রচারণা—সবই ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এ অ্যালবামে শুধু আন্দোলনের ছবি নয়, তখনকার বোম্বের নগরজীবনেরও চিত্র ফুটে উঠেছে। শহরের রাস্তাঘাট, বাজার, সমুদ্রতট—সব মিলিয়ে এটি প্রায় এক শতাব্দী আগের ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যবান দলিল হয়ে উঠেছে।

 বর্তমানে ছবিগুলো প্রকাশিত হয়েছে “ফটোগ্রাফিং সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স” নামে একটি বইয়ে, যা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে লবণ সত্যাগ্রহের বিস্মৃত নারীনেত্রীদের।

সর্বোপরি, এই অ্যালবাম প্রমাণ করে—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু পুরুষদের নেতৃত্বে চলে এমন ধারণা ভুল। লবণ সত্যাগ্রহে নারীরা ছিলেন সমানভাবে নেতৃত্বের আসনে, কখনো কখনো পুরুষদেরও পেছনে ফেলে। তাঁদের দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও ত্যাগ আজও ইতিহাসের পাতায় অনিবার্য হয়ে আছে, আর এই ছবিগুলো সেই সংগ্রামী নারীদের প্রতি প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিচ্ছে।






































Facebook Comments Box