বাংলাদেশ ভূমিকম্পঝুঁকির দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এলাকায় অবস্থান করছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণা জানিয়েছিল, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচে একটি সুপ্ত ‘মেগাথ্রাস্ট ফল্ট’ রয়েছে, যা এক সময় ৯ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই শঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ দেশের তিনটি দৈত্যাকৃতির টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে দীর্ঘদিন ধরে যে চাপ জমছিল, সেটি এখন আটকানো অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্লেট খুলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে বাংলাদেশ আরও উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গত ২১-২২নভেম্বর দেশের বিভিন্ন জেলায় চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা জানান, এটি আসন্ন চাপমুক্তির অংশ হতে পারে এবং আগামী এক সপ্তাহে আরও ২০ বার ছোট–বড় কম্পন অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় নয়, তবে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ভূগর্ভে চাপ জমে আছে। যদি কয়েক দিনের মধ্যে ৫.৭ মাত্রার চেয়েও বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটে, তাহলে স্বল্পসময়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাঁর মতে, বিভিন্ন এলাকায় উৎপত্তিস্থলের কথা বলা হলেও সমস্ত কম্পনের উৎস একই-নরসিংদী অঞ্চল।
জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভূমিকম্প গবেষক রুবাইয়াত কবির মনে করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভারতীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এর ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মারাত্মক ভূমিকম্পের মুখে পড়ছে।
এদিকে নরসিংদীর ঘোড়াশালে মাটিতে দেখা দেওয়া ফাটল পরিদর্শনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একটি দল নমুনা সংগ্রহ করেছে, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে কম্পনের ধরন ও গভীরতা নির্ণয় করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, গত কয়েক দিনের কম্পন হচ্ছে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্লেট এখন খুলে যাচ্ছে। বিশেষভাবে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি গত ৮০০ থেকে ১,০০০ বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করে আসছে; যা যেকোনো সময় তীব্র ভূমিকম্পের রূপ নিতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাবডাকশন জোনে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প সাধারণত ৭.৫ মাত্রার ওপরে হয়ে থাকে এবং সেগুলো ধ্বংসাত্মক হয়।
পৃথিবীর ‘রিং অব ফায়ার’-এ এমন ভূমিকম্প নিয়মিত দেখা যায়। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলও একই ধরনের সাবডাকশন জোনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় উদ্বেগ এখানে অত্যন্ত বেশি।
ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালে মিয়ানমার-টেকনাফ প্লেট সীমানায় ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে এসেছিল। ওই কম্পনে বঙ্গোপসাগরে সুনামি সৃষ্টি হয়ে পাঁচশর বেশি মানুষ মারা যায়। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই অঞ্চলে আবারো শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধ্বংস নিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, হিমালয়ের নিচে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে ভেঙে অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল স্তরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। এর ফলে ভূত্বকে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে উপমহাদেশজুড়ে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ২১ নভেম্বর সকালে নরসিংদী মাধবদী থেকে উৎপত্তি হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় যে ক্ষতি করেছে, তা রাজধানীর নাজুক অবস্থাই তুলে ধরে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে ভবনের দেয়াল ফাটল, স্ল্যাব ধস, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক, গ্যাস–বিদ্যুৎসংযোগে ত্রুটি দেখা দেয়। শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় কয়েক শত মানুষ। রাজউকের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বড় একটি অংশেই বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই যেখানে দৃশ্যমান ক্ষতি হচ্ছে, সেখানে ৭ বা ৮ মাত্রার কম্পন হলে কী ধরনের বিপর্যয় নামবে, তা কল্পনাতেও ভয়ংকর।
ঢাকার আরও একটি সমস্যা হলো এর নরম পলিমাটির গঠন। Basin Effect-এর কারণে কম মাত্রার ভূমিকম্পও ঢাকায় বড় কম্পনের মতো অনুভূত হয়। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্প সিলেট বা নরসিংদীর তুলনায় ঢাকায় বেশি ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। এ কারণেই ৩.৩ বা ৩.৭ মাত্রার আফটারশকও রাজধানীতে ৫ মাত্রার মতো অনুভূত হয়েছে।
যদিও ভূমিকম্পের পর হওয়া ছোট ছোট কম্পনগুলো স্বাভাবিক আফটারশক—যা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ধীরে ধীরে কমে আসার কথা—তবুও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট: স্বল্পমেয়াদে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব বেশি নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না; তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে পুনঃমূল্যায়ন, সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, এবং নাগরিকদের ঘরোয়া নিরাপত্তা–প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো শুধু বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাসই দিচ্ছেনা, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান কতটা বিপজ্জনক।
প্লেট টেকটনিকের এই ধীর পরিবর্তন কখন কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তাই এখনই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায়।














