বেশির ভাগ অভিভাবকই হয়তো এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়েন-আগে যে সন্তান মা বাবাকে চোখে হারাতো, হঠাৎ একসময় তার মাঝেই দেখা দেয় অস্বাভাবিক রাগ, জেদ কিংবা অবাধ্যতা। অনেক মা বলেন, “আমার ছেলে/মেয়ে হঠাৎ বদলে গেছে।” এমন পরিবর্তন নিছক মুডের ওঠানামা নয়, বরং এটি হতে পারে গভীর মানসিক সংকেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে কিশোর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ১৪% মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অথচ এই অঞ্চল, বিশেষ করে বাংলাদেশে, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা অনেক কম। ফলে খুব স্বাভাবিক পরিবর্তনও অনেক সময় বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। তিনা (ছদ্মনাম), বয়স বারো। আগে মা ছাড়া চলত না, মায়ের পেছনেই ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত। কিন্তু এখন তার চেহারাতেই বিরক্তি, কথা বললেই মুখ গোমড়া, রাগারাগি। মা জানালেন, কিছুদিন আগে তিনার ছোট ভাই জন্মেছে। এরপর থেকেই এমন আচরণ দেখা দিয়েছে। আদর, ভালোবাসা, খেলনা—সব দিয়েও যেন মন গলানো যাচ্ছে না। বরং দিন দিন সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন দেখে অনেক অভিভাবক চিন্তিত হয়ে পড়েন—“আমার সন্তান কেন এমন করছে?”
এখানে বিষয়টা বোঝা জরুরি। প্রথমেই যে ব্যাপারটি মাথায় রাখতে হবে, তা হলো—শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন কোনো একক ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে থাকে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক কারণ। ছোট ভাই জন্মের পর তিনার ভেতরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা মনোবিদ্যার ভাষায় ‘সিবলিং রাইভালরি’। অর্থাৎ, আগে সে যে গুরুত্ব পেত, এখন সেটি হঠাৎ হারিয়ে গেছে বলে তার মনে হচ্ছে। এতে করে তার মধ্যে অনিরাপত্তা, মনোযোগের ক্ষুধা এবং অভিমান তৈরি হয়েছে, যা বাইরে রাগ বা অবাধ্যতার রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।
একজন শিশুর জন্য মা–ই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। জন্মের পর থেকেই শিশুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ হয় মায়ের হাত ধরে। তাই মায়ের সঙ্গে তার যে আবেগগত বন্ধন তৈরি হয়, সেটি অন্য কারো সঙ্গে হয় না। আর সেই কারণেই, যখন শিশুটি কোনো মানসিক চাপে পড়ে, তখন প্রথমেই সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় মায়ের প্রতি। মা-ই হয়ে ওঠেন তার আবদার, অভিমান এমনকি রাগ প্রকাশের ‘নিরাপদ জায়গা’। অনেক সময় সন্তান মায়ের সঙ্গে যতটা অবাধ্য, অন্যদের সঙ্গে ততটা নয়—এটিও সেই মানসিক সংযুক্তির কারণেই হয়।
শিশু থেকে কিশোর বয়সে পা রাখার মধ্যবর্তী সময়টিও বেশ সংকটপূর্ণ। শারীরিক ও মানসিকভাবে তখন তারা নতুন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই বয়সে নিজেদের মতামত প্রকাশের চেষ্টা, স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠা এবং নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করার ইচ্ছা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রয়াসটি অনেক সময় রাগ, বিরক্তি বা মা–বাবার কথার বিরুদ্ধাচরণ হিসেবেই প্রকাশ পায়। অনেক সময় এটিকে ভুলভাবে বিশ্লেষণ করে বাবা–মা শাসনের পথ বেছে নেন, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
এর বাইরেও কিছু মানসিক জটিলতা, যেমন ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder), ODD (Oppositional Defiant Disorder), বা বুদ্ধিবিকাশজনিত অন্যান্য সমস্যা শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি যদি পারিবারিক পরিবেশ অশান্ত হয়, বাবা–মায়ের মধ্যে কলহ থাকে, অথবা সন্তানের প্রতি অতি শাসন বা অবহেলা করা হয়, তাহলেও তার মনের ওপর চাপ তৈরি হয়। এসব কারণেই আচরণে দেখা দেয় হঠাৎ রাগ, জেদ বা বিরক্তি।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক প্রথমেই যা করেন, তা হলো বকা দেওয়া, মারধর বা আরও কঠোর হওয়া। অথচ, এভাবে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং শিশু আরও দূরে সরে যায়।
বকাঝকা না করে বরং সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন, সময় দিন। বোঝার চেষ্টা করুন, তার ভেতরে কী চলছে। হয়তো সে কোনো কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে, যা প্রকাশ করার ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। তখন তার রাগটাই হয়ে উঠছে সেই ভাষা। এই ভাষাকে ভুল না বুঝে বরং সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করুন। ধৈর্য ধরে পাশে থাকুন।
সবচেয়ে বড় কথা, সন্তান বড় হওয়ার মানে শুধু তাকে ভালো খাবার, ভালো স্কুল আর ভালো জামাকাপড় দেওয়া নয়। তার মন, তার অনুভূতি, তার বিকাশ—সবই যত্নের দাবি রাখে। আর এই যত্নের বড় অংশ জুড়ে আছে আপনার সহানুভূতি, বোঝার চেষ্টা আর সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত।
সন্তান হঠাৎ অবাধ্য হলে বলবেন না—”বাচ্চারা তো এমনই হয়!” বরং ভাবুন—”সে এমন করছে কেন?” তাহলেই আপনি পারবেন তার মন বুঝতে, এবং তাকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে।













