banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 257 বার পঠিত

 

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিধ্বস্ত সুদান, মৃত্যুর মিছিলে আফ্রিকা

সুদানে টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে সংঘাতে আজ দেশটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের কেন্দ্রে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, প্রায় এক কোটি বিশ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, এবং পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্ভিক্ষ ও ধ্বংসযজ্ঞ। পশ্চিম দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহর সম্প্রতি আরএসএফ বাহিনীর দখলে চলে গেছে, যেখানে তারা গণহত্যা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বের বিবেক আজ সুদানের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু যুদ্ধের আগুন যেন নিভছেই না।

এই গৃহযুদ্ধের সূচনা ২০১৯ সালে, প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতনের মধ্য দিয়ে। তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বশিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বৈরাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যখন জনরোষ তীব্র হয়, তখন সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু এতে দেশে স্থিতিশীলতা ফেরেনি। গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ চলতে থাকে, যার ফলে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু দুই বছর না যেতেই, ২০২১ সালের অক্টোবরে আবারও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এবার অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন দুই সেনানায়ক—জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো, যিনি “হেমেডটি” নামে পরিচিত।

এক সময় ঘনিষ্ঠ এই দুই সামরিক নেতা ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। মূল বিরোধ ছিল আরএসএফ বাহিনীর সৈন্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—এ নিয়েই। সেনাবাহিনী আশঙ্কা করেছিল, আরএসএফকে একীভূত করা হলে দাগালোর ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়। রাজধানী খার্তুমসহ বড় বড় শহরে বন্দুকের গুলি আর বোমার শব্দে কেঁপে ওঠে সুদান।

আরএসএফ বাহিনীর জন্ম ২০১৩ সালে, যার মূল শিকড় দারফুর অঞ্চলের কুখ্যাত জানজাওয়িদ মিলিশিয়ায়। ওমর আল-বশির শাসনামলে এই মিলিশিয়া বিদ্রোহীদের দমন করতে ভয়াবহভাবে নিপীড়ন চালায়—হত্যা, ধর্ষণ ও গণঅগ্নিসংযোগ তাদের নিত্যকার কৌশল ছিল। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে বশির এই মিলিশিয়াকে বৈধতা দেন এবং তাদের র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। দাগালো বা হেমেডটির নেতৃত্বে আরএসএফ খুব দ্রুত একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে আরএসএফ ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং সুদানের বিভিন্ন সোনার খনি দখলে নেয়। এই অর্থনৈতিক শক্তি দাগালোর হাতে ব্যাপক প্রভাব এনে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরএসএফ সেনাবাহিনীর সমান শক্তি অর্জন করে, এমনকি রাজধানী খার্তুমের একাংশও তারা দখল করে নেয়। বর্তমানে আরএসএফ সুদানের পশ্চিমাঞ্চল দারফুর, কোর্দোফানসহ বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি—এই অঞ্চলগুলো নিয়ে তারা একটি নতুন সরকার গঠন করবে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানের মতো আবারও দেশটি বিভক্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে উত্তর ও পূর্বাঞ্চল। সেনাপ্রধান জেনারেল আল-বুরহান এখন লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট সুদানকে নিজের প্রধান ঘাঁটি ঘোষণা করেছেন। এখান থেকেই জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ধারণা করা হয়, সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিচ্ছে মিসর, কারণ নীলনদ ও সীমান্তসংলগ্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দেশের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করেছে। তবে যুদ্ধের আগুন এখানেও ছড়িয়ে পড়েছে—২০২৫ সালের মার্চে আরএসএফ ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায় পোর্ট সুদানে, যেখানে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়।

দারফুর অঞ্চল আজ পরিণত হয়েছে মৃত্যুর উপত্যকায়। আরএসএফ ও তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘ, ইউনিসেফ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য—শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছে না। এমনকি এক বছর বয়সী শিশুদেরও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দারফুরের অনারব মাসালিট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আরএসএফ সেনারা বলেছে, “তোমাদের গর্ভে আরব সন্তান দেব।” এসব অপরাধে শুধু আরএসএফ নয়, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন এল-ফাশের অঞ্চলে থাকা আড়াই লাখের বেশি অনারব নাগরিক বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।

সুদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ। প্রায় উনিশ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশের সীমানা সাতটি আফ্রিকান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত, এবং লোহিত সাগরের তীরঘেঁষা অবস্থান এটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নীলনদও এই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। জনসংখ্যার অধিকাংশই মুসলিম, ভাষা আরবি ও ইংরেজি। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে নাগরিকদের গড় বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ৭৫০ ডলার। যুদ্ধের পর তা আরও কমে গেছে, রাষ্ট্রীয় আয় প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, লাখ লাখ মানুষ অনাহার ও রোগে ভুগছে।

সুদানের এই সংঘাত এখন শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি ধর্ম, জাতি, সম্পদ ও ক্ষমতার সংঘর্ষ।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল একে “মানবসভ্যতার অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি” হিসেবে দেখছে।
তবে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ—উভয় পক্ষই এখনো সমঝোতায় আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

এক সময় যে দেশ ইসলামি ঐতিহ্য, সোনার খনি আর নীলনদের জন্য গর্ব করত—
আজ সেই সুদান রক্ত, ধ্বংস আর ক্ষুধার রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

Facebook Comments Box