banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 137 বার পঠিত

শিশুদের রক্তে বিপজ্জনক সিসা: প্রসাধনী, ব্যাটারি ও ধূলাবালিতে ঝুঁকি

বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের শরীরে সিসার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩.৫ কোটি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা রয়েছে। বিশেষত রাজধানী ঢাকায় দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯৮ শতাংশের রক্তে সিসার পরিমাণ নিরাপদ সীমার দ্বিগুণ শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন, শিশুদের জন্য রক্তে সামান্য সিসাও ক্ষতিকর। এটি মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করে, যার ফলে বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত জটিলতা এবং শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তীব্র মাত্রায় সিসার সংস্পর্শে খিঁচুনি, কোমা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু যা প্রাকৃতিকভাবে মাটি ও খনিজে থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এটি এখন খাবার, পানি, বাতাস, প্রসাধনী, খেলনা, রান্নার হাঁড়ি-পাত্র এবং ঘরের ধূলাবালিতেও পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিসার প্রধান উৎস হলো ব্যাটারি ও সিসা-ভিত্তিক শিল্প, রঙ, প্রসাধনী, রান্নার সরঞ্জাম এবং ঘরের অভ্যন্তরে ধূমপান। নিঃশ্বাস, খাদ্যগ্রহণ কিংবা ত্বকের মাধ্যমে এই বিষ শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণের শরীরেও পৌঁছে যায়। শিশুদের স্বভাবগত কৌতূহল এবং জিনিস মুখে নেওয়ার প্রবণতা তাদের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) রক্তে সিসার পরিমাণ প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে তা বিপজ্জনক মনে করে। কিন্তু আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৬৭ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। শিল্প এলাকায় বসবাসরত শিশুদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় গড়ে ৪৩ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে ইউনিসেফ জানিয়েছে, শিশুদের সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারি রিসাইক্লিং এবং শিল্পকারখানার সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিসা শরীরের প্রায় সব অঙ্গকেই প্রভাবিত করে। এটি মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি এবং হাড়ে জমা হয় এবং গর্ভবতী নারীর মাধ্যমে ভ্রূণেও ছড়িয়ে পড়ে। অল্প পরিমাণ সিসাও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যার ফলে তাদের আইকিউ কমে যেতে পারে, মনোযোগ নষ্ট হয় এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি এটি রক্তাল্পতা, কিডনি দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রজনন অঙ্গের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগও অপরিহার্য। পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ শরীরে সিসার ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে পারে। অন্যদিকে দূষিত এলাকায় বাস এড়ানো, শিল্প ও ব্যাটারি কার্যক্রমকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সহায়ক হতে পারে।

আইসিডিডিআর,বি’র পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, হলুদ মশলার সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও নিয়মতান্ত্রিক উদ্যোগ সফল হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে সিসা সম্পর্কিত সকল শিল্প কার্যক্রমকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে আনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানোই সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

Facebook Comments Box