banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 182 বার পঠিত

 

ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট: শীর্ষ ৫০ নারী নেত্রীর তালিকায় শিফা

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এক গর্বের সংবাদ—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিতা বিনতে আজাদ শিফা স্থান করে নিয়েছেন রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর অধীন প্রতিষ্ঠান ‘অবনিন্সক টেক একাডেমি’ কর্তৃক নির্বাচিত বিশ্বের শীর্ষ ৫০ নারী নেত্রীর তালিকায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত আবেদনকারীর মধ্য থেকে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তার পূর্ববর্তী কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণাকর্ম এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শিফার জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সমাজসেবার প্রতি গভীর ভালোবাসা, যা তিনি শিখেছেন বাবা-মায়ের কাছ থেকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, মানুষের উপকারে আসাটাই জীবনের প্রকৃত অর্থ। সমাজকর্ম বিভাগে ভর্তি হয়ে তিনি বুঝতে পারেন—সমাজকর্মের শিক্ষার্থীরা যদি ডায়নামিক হতে পারে, তাদের সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিজেকে যুক্ত করেন নানা স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। তার এই অদম্য প্রচেষ্টা তাকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স প্রকল্পে লিড প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে শিফা উপলব্ধি করেন—বাংলাদেশের অনেক তরুণ মেধাবী হলেও সঠিকভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে না পারার কারণে পিছিয়ে পড়ে। ঢাকা শহরে পড়াশোনার সময় তিনি দেখেছেন, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী তাদের যোগ্যতার যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। এই সমস্যার সমাধান নিয়েই জন্ম নেয় তার উদ্যোগ ‘ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট’। তরুণদের যোগাযোগ দক্ষতা ও সফট স্কিল উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
শিফার স্বপ্ন, ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে অন্তত এক লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা। তার বিশ্বাস, একজন মানুষ যদি নিজের সফট স্কিল গুণাবলিগুলো উন্নত করতে পারে, তবে সে নিজের জীবনের পথ নিজেই তৈরি করে নিতে সক্ষম হবে।

শিফার সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের অবদান অপরিসীম। বাবা ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ এবং মা সোহরাত বেগম ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। সততা, নিষ্ঠা, নীতিনিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের যে শিক্ষা তিনি তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন, সেটিই তাকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে শক্তি জুগিয়েছে। বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসাই তার এগিয়ে চলার সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি।

রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা শিফার জীবনে এনেছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি দেখেছেন—পৃথিবীতে অনেক ভালো মানুষ রয়েছেন, যারা একে অপরের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে সম্মান করেন। শিফা বলেন, “দেশের বাইরে আমি মানেই বাংলাদেশ। আমাকে দেখে অনেকেই বাংলাদেশকে চিনেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।” তার এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ।
যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের জন্য শিফার বার্তা অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক।
তার মতে, নারীদের জন্য আজকের যুগে সুযোগের দ্বার অনেক উন্মুক্ত। ঘরে বসেই ইংরেজি শেখা, নতুন ভাষা বা কোডিং শেখার মতো দক্ষতা অর্জন এখন অনেক সহজ। তিনি বলেন, “আপনাকে আপনার লক্ষ্য জানতে হবে। যদি আপনার লক্ষ্য বড় হয়, তবে ছোট ছোট বাধা খুব সহজেই পেরিয়ে যাওয়া যায়।”

শিফার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং পারিবারিক মূল্যবোধের সমন্বয় থাকলে যেকোনো স্বপ্নই পূরণ করা সম্ভব। ‘ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট’-এর মাধ্যমে তিনি যে পরিবর্তনের বীজ বপন করেছেন, তা একদিন আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ তরুণ প্রজন্মে রূপ নেবে—যারা নিজের জীবন বদলে দিতে পারবে, আর সেইসঙ্গে বদলে দেবে পুরো সমাজকেও।

Facebook Comments Box