banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 351 বার পঠিত

 

এক্স-রে চোখ”– রহস্যময়ী নাতাশা ডেমকিনা

১৯৮৭ সালে রাশিয়ার সারানস্ক শহরে জন্ম নেওয়া নাতাশা ডেমকিনা আজও বিশ্বের কাছে এক রহস্যময়ী নারী। সাধারণ একটি মেয়ের মতো বেড়ে ওঠা হলেও কৈশোরে হঠাৎই সে টের পায়, তার দৃষ্টিশক্তির মাঝে কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করছে। তার দাবি, সে মানুষের শরীরের ভেতর দেখতে পায়—একটি প্রাকৃতিক এক্স-রে ভিশনের মতো। এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার সূত্র ধরেই সে হয়ে ওঠে আলোচিত, আবার বিতর্কিতও।

নাতাশার বয়স তখন ১০ বা ১১। একদিন হঠাৎ সে দেখতে পায়, তার মায়ের পেটের ভেতরে কিছু একটা সমস্যা আছে। পরবর্তীতে চিকিৎসা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে—তার মায়ের পেটে সত্যিই একটি আলসার ছিল। এরপর থেকে নাতাশা একের পর এক রোগ নির্ণয় করতে থাকে, কখনো প্রতিবেশীর টিউমার, কখনোবা বৃদ্ধের হার্নিয়া। তার এই ‘অদ্ভুত’ চোখের কথা স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করে তার বাসায়।

১৭ বছর বয়সে নাতাশা গণমাধ্যমে আসে। রাশিয়ার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশগুলোর নজর পড়ে তার ওপর।
তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় লন্ডন এবং নিউইয়র্কে, যেখানে তার ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের চেষ্টা চালানো হয়।
লন্ডনে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নাতাশা সঠিকভাবে সমস্যা শনাক্ত করতে পারায় ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু নিউইয়র্কে অবস্থা ভিন্ন হয়ে যায়।
CSI (Committee for Skeptical Inquiry)-এর তত্ত্বাবধানে একটি ব্লাইন্ড টেস্টে তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। পরীক্ষায় একজন রোগীর শরীরে বসানো ধাতব পাত খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হন নাতাশা। ফলে, বিজ্ঞানীরা তার এক্স-রে ভিশনের দাবিকে “অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন” বলে ঘোষণা দেন।

তবে নাতাশা নিজে তার ব্যর্থতার জন্য বিভিন্ন যুক্তি দেন। তার ভাষায়—
“আমার চোখ কোনো যান্ত্রিক এক্স-রে মেশিন নয়। এটা একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার জন্য আমি সময়, মনোযোগ, রোগীর সরাসরি উপস্থিতি ও শান্ত পরিবেশ চাই। কিন্তু পরীক্ষার সময় আমার উপর চাপ ছিল, আমার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছিল, রোগীদের শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল-এসব কারণে আমি সঠিকভাবে কাজ করতে পারিনি।”

নাতাশার ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বরাবরই সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি হতে পারে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অনুমান ও কাকতালীয় ঘটনার সমন্বয়। তবে সাধারণ মানুষের একাংশ আজও তাকে অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করে।
বিশেষ করে রাশিয়াতে নাতাশা এক রহস্যময় ও জনপ্রিয় চরিত্র। অনেক রোগী এখনো তার কাছে যান সনাতন চিকিৎসার বাইরের বিকল্প উপায়ে রোগ শনাক্ত করতে।

২০০৪ সালে Discovery Channel ‘The Girl with X-ray Eyes’ শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে নাতাশার জীবনের উপর ভিত্তি করে। ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এ ডকুমেন্টারির কিছু অংশ এখনো দেখা যায়।

বর্তমানে নাতাশা একজন বিকল্প চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছেন। তার নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে “The Special Diagnostic Center” নামের একটি প্রজেক্ট। ইউরোপ ও জাপানেও তিনি বিভিন্ন সময় রোগ নির্ণয়ের কাজ করেছেন।

নাতাশা ডেমকিনা একদিকে যেমন রহস্যে মোড়া এক চরিত্র, অন্যদিকে তেমনি বিজ্ঞানের কড়াকড়ি যাচাইয়ের মুখে পড়া একটি জীবন্ত কেস স্টাডি।
তার ক্ষমতা বাস্তব, না কি মনস্তাত্ত্বিক এক বিভ্রম—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে একথা অনস্বীকার্য, “এক্স-রে চোখের অধিকারী” এই নারী আজো মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে।

তথ্যসূত্র: গুগল সার্চ, Discovery Channel Documentary, CSI রিপোর্ট

Facebook Comments Box