banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 239 বার পঠিত

 

শিল্পায়নের ধাক্কায় অস্তমিত কুটিরশিল্প, বিপন্ন অসংখ্য গ্রামীণ নারীর জীবিকা

শিল্পায়নের প্রবল স্রোতে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির যুগে একদিকে যেমন জীবন হয়েছে সহজ, অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা গ্রামীণ পেশা ও হস্তশিল্প। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লাগছে গ্রামীণ নারীদের ওপর, যাঁরা বহু বছর ধরে নিজ বাড়ির উঠোনে বসে তৈরি করতেন বাঁশ, বেত, মাটি, সুতা ও নকশিকাঁথার মতো নানা শিল্পপণ্য।

এই নারীরা সংসার সামলে বিকল্প আয়মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন কুটিরশিল্পে। বিশেষ করে যে সব পরিবারে পুরুষদের আয় সীমিত বা অনিয়মিত, সেখানে নারীদের এই ঘরোয়া কাজ ছিল সংসার টিকিয়ে রাখার মূল সহায়ক শক্তি। কিন্তু বাজার দখল করে নেওয়া প্লাস্টিক, মেলামাইন বা চাইনিজ মেশিনজাত পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কমদামের কারণে এখন এই পণ্যের আর তেমন চাহিদা নেই। ফলে একদিকে যেমন তাদের উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কুটিরশিল্পে নিয়োজিত নারীরা এখন আর আগের মতো কাজ পান না। অনেকে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যাঁরা এখনও টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের লাভের অঙ্ক এতটাই কম যে তা দিয়ে ন্যূনতম সংসার চালানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

শুধু আর্থিক সংকট নয়, এই শিল্প ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের সামাজিক মর্যাদাও কমে যাচ্ছে। আগে যাঁরা কর্মজীবী ছিলেন, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারতেন, এখন তাঁরা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন পুরুষের উপার্জনের ওপর। ফলে আত্মবিশ্বাস কমছে, বাড়ছে পারিবারিক নির্ভরতা ও বৈষম্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বিপণন কৌশল। শুধু সরকার নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামীণ নারীদের ঘরে বসে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি করা, নতুন নকশা ও উদ্ভাবনী ভাবনার সংযোগ ঘটানো, এবং পণ্যের ব্র্যান্ডিং করে বাজার তৈরি করা গেলে এই শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

একটি জাতির ঐতিহ্য শুধু তার ভাষা বা পোশাকে নয়, বরং তার হস্তশিল্পেও প্রতিফলিত হয়। কুটিরশিল্প শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি সংস্কৃতি ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। তাই শিল্পায়নের এই গতির মধ্যে ঐতিহ্যকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব—বিশেষ করে সেই নারীদের জন্য, যাঁরা নিঃশব্দে যুগের পর যুগ ধরে গড়ে তুলেছেন আমাদের নিজস্ব শিল্পচর্চার ভিত।

Facebook Comments Box