banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 347 বার পঠিত

 

দেয়ালের আঁকা ছবি থেকে আমেরিকার স্কলারশিপ জয়

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক পুরনো বাড়িতে জন্ম নেওয়া মুমতাহিনা করিম মীম ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অন্যরকম। বাইরের খেলাধুলার চেয়ে বেশি ভালো লাগত দেয়ালে ছবি আঁকতে। রাজকন্যা, প্রকৃতি কিংবা নিজের কল্পনার চরিত্র-প্রতিদিনই কিছু না কিছু আঁকতেন ঘরের দেয়ালে।
“আমার ঘরের দেয়াল ছিল আমার প্রথম ক্যানভাস,” বললেন মীম।

শৈশবে তাঁর হাতে রঙতুলির হাতেখড়ি হয় মায়ের মাধ্যমে। মীমের মা ছিলেন একজন হোম-বেইজড ফ্রিল্যান্সার। কাজ করতেন ল্যাপটপে। ছোট্ট মীম সেখানেই প্রথম প্রযুক্তির জগৎকে আবিষ্কার করেন।
একদিন মা যখন Microsoft Paint-এ কিছু দেখাচ্ছিলেন, মীম বলেই ফেললেন, “এইটাও তো আঁকার জায়গা!” সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রযুক্তিভিত্তিক ক্যানভাসের যাত্রা।

মাত্র ক্লাস থ্রিতে থাকা অবস্থায় ইউটিউব দেখে নিজেই শিখে ফেলেন HTML আর CSS।
প্রথমবার কোডে যখন “Hello World” লিখে স্ক্রিনে দেখেন-তাঁর ভাষায় “তখনই বুঝে গিয়েছিলাম,এই ট্যাপাট্যাপি করাটাও এক ধরনের শিল্প।”

নবম শ্রেণিতে গিয়ে মীম প্রতিষ্ঠা করেন নিজের স্কুলে একটি প্রোগ্রামিং ক্লাব। শুরুতেই ক্লাবের সদস্য হয় ৬৫ জন শিক্ষার্থী।
প্রথমদিকে অনেকে বলেছিল,
“‘মেয়ে হয়ে এসব করছো কেন?’—এই কথাটা বহুবার শুনেছি। কিন্তু আমি জানতাম, দক্ষতা আর আগ্রহের কাছে লিঙ্গ কখনোই বাধা হতে পারে না।”

করোনা মহামারির সময়, যখন সবাই ঘরবন্দি, তখন মীম ইউটিউব দেখে দেখে তৈরি করেন রোবটিক্স প্রজেক্ট। নিজের জমানো টাকায় কেনেন Arduino কিট ও নানা সেন্সর।
নিজের ঘরটিই হয়ে ওঠে ক্ষুদ্র ল্যাবরেটরি।
সেখানেই তৈরি করেন ফুড-সার্ভিং রোবট ‘কিবো’। বন্ধুরা বলত,
“‘এসব করে সময় আর টাকার অপচয় করছো।’ কিন্তু আমি এগুলো করতাম ভালোবেসে।”

এইচএসসি পাশের পর চারপাশে সবাই যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন মীম নিরবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য।
কারো কোনো গাইডলাইন ছিল না, ছিলো না কোনো বড় ভাইবোন বা সিনিয়র। ইউটিউব, ব্লগ, ওয়েবসাইট ঘেঁটে ঘেঁটে নিজেই শিখে ফেলেন -কীভাবে ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করতে হয়,কীভাবে স্টেটমেন্ট অফ পারপাস (SOP) লিখতে হয়,কীভাবে স্কলারশিপ পাওয়া যায়।

SAT এবং TOEFL-এর প্রস্তুতির জন্য রাত জেগে পড়াশোনা করতেন। নিজের খরচ চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক কোম্পানিতে পার্টটাইম অনলাইন চাকরি করতেন।
তবে রাত জাগা নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক কথা শুনতে হয়েছে।
“অনেকেই বলত, বিদেশে পড়া আমাদের পরিবারের জন্য না। কেউ কেউ হাসতও। কিন্তু আমি জানতাম-ভালো স্কলারশিপ ছাড়া আমেরিকা যাওয়া সম্ভব না।”

এই পুরো পথচলায় একমাত্র শক্তি হয়ে পাশে ছিলেন মিজানুর রহমান স্যার—যিনি শুধু স্কুলের শিক্ষকই ছিলেন না, বরং নিঃস্বার্থভাবে মীমকে SAT পরীক্ষার জন্য গাইড করেছিলেন।
“স্যার ছিলেন ছায়ার মতো। তাঁর মতো মানুষ না থাকলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না।”

অবশেষে দিনের পর দিন রাত জেগে কষ্ট করার ফল আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসে অ্যাডমিশন ও স্কলারশিপ অফার। কিন্তু তার মধ্য থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অফার আসে Hendrix College থেকে—Hays Memorial Scholarship, যা পুরোপুরি টিউশন, থাকা-খাওয়াসহ সব খরচ কভার করে।

আজ মীম প্রস্তুত তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের জন্য। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক ছোট্ট বাড়ি থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার আসনে।

Facebook Comments Box