banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 353 বার পঠিত

 

চার বছরের গৃহবন্দিত্ব: জয়পুরহাটের লিজা আক্তার এবং সামাজিক দায়

২৬ জুলাই জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার মণ্ডলপাড়ায় ঘটে যাওয়া একটি নির্মম ঘটনা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, পরিবার কাঠামো এবং নারী অধিকার বিষয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ২০২১ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী ছাত্রী লিজা আক্তার গত চার বছর ধরে তার নিজ ঘরেই তালাবদ্ধ—স্রেফ এই কারণে যে তার বড় বোন প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। বাবা ও সৎমার চোখে এটি ছিলো ‘পরিবারের সম্মানহানি’ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার দায় যেন ছোট বোনকেই বহন করতে হলো।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লিজার বাবা এনামুল হক, যিনি এক সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি মেয়েকে চার বছর ধরে একটি স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কক্ষে বন্দি করে রাখেন। নিয়মিত চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে লিজাকে নিস্তেজ করে রাখা হতো। প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে তার চিৎকার শুনলেও কিছু করতে সাহস পাননি।
এভাবে বছর পার হতে হতে লিজা একসময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্ত এনামুল হক এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী ফুতি বেগমের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

লিজার ঘটনা নতুন নয়। আমাদের সমাজে ‘সম্মান রক্ষা’ বা ‘পারিবারিক মান-ইজ্জত’ রক্ষার নামে বহু নারীকেই শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এখানে নারী যেন পরিবারের সম্পত্তি-একজন নারী ‘ভুল’ করলে, তার দায় বর্তায় পুরো পরিবার বা অন্য নারীর ওপর। বড় বোনের প্রেম বা পলায়ন, ছোট বোনের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিয়ে তাকে বন্দি করে রাখার যথার্থতা কীভাবে একজন মানুষ কল্পনা করতে পারেন?
এটি শুধুই একটি পারিবারিক অন্যায় নয়; এটি সমাজে নারীর অবস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অধিকার, এবং স্বাধীন চিন্তার প্রতি আমাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিচ্ছবি।

এই ঘটনাটি ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’, ‘অবৈধ আটকে রাখা’, এবং ‘মানসিক নির্যাতন’-এর স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কাউকে বিনা অপরাধে বা আদালতের আদেশ ছাড়া এভাবে গৃহবন্দি রাখা ফৌজদারি অপরাধ। আইন অনুযায়ী এ ধরনের কাজের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, চার বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অফিস বা কোনো মানবাধিকার সংস্থা কেন এগিয়ে আসেনি? প্রতিবেশীরা কেন ভয় পেয়ে নীরব থেকেছে? নাকি আমরা সবাই সামাজিক সম্মান রক্ষার মুখোশ পরে আরেকজনের অসহায়ত্বের প্রতি চোখ বুঁজে থাকি?

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এখনও নারীর স্বাধীনতা, বিয়ে, এমনকি শিক্ষা নিয়েও পরিবার ও সমাজের কঠোর দমনমূলক মনোভাব বিদ্যমান। পুরুষের সিদ্ধান্তে নারীর জীবন নিয়ন্ত্রিত হওয়াই যেন ‘স্বাভাবিক’। এই ঘটনাটি সেই সংস্কৃতিরই এক চরম দৃষ্টান্ত, যেখানে একটি মেয়ে শুধুমাত্র মেয়ের বোন হওয়ার কারণে শিক্ষা, আলো-বাতাস, সমাজ সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আমাদের এখন প্রশ্ন তুলতে হবে—কোন সংস্কৃতি আমাদের এমন করে তোলে? যে সংস্কৃতিতে একজন পিতা তার মেয়েকে বন্দি রাখেন, সেই সংস্কৃতি কি আদৌ মানবিক?

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি-
১. নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: লিজার বাবা ও সৎমার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে সমাজে এমন অন্যায়ের বার্তা ছড়িয়ে পড়বে যে, পরিবার মানে একজন পুরুষ যা খুশি তা করতে পারে।

২.লিজার পুনর্বাসন ও মানসিক চিকিৎসা: তাকে শুধু মুক্ত করা নয়, প্রয়োজন তার সুস্থতা নিশ্চিত করা, শিক্ষা-জীবনে ফেরার পথ তৈরি করা, এবং মানসিক পুনর্বাসন দেওয়া।

৩.সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে পরিবারে নারী অধিকার, আইন এবং নৈতিকতা নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো দরকার।

৪.প্রতিবেশী ও সমাজের দায়িত্ব: মানুষ হিসেবে প্রতিবেশীর কষ্টে এগিয়ে যাওয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব। নির্যাতনের শব্দ শুনেও যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে ভবিষ্যতের অন্য ‘লিজা’রা আমাদের সমাজেই নিঃশেষ হবে।

আমরা সমাজে নারীদের জন্য এমন একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখি যেখানে একজনের ভুলের শাস্তি অন্যজনের কাঁধে এসে যেন না পড়ে।
এই নির্মম নিষ্ঠুরতার আইনি, সামাজিক, এবং নৈতিক সব স্তরে বিচার দাবি করছি।

#JusticeForLiza #BreakTheSilence #StopGenderViolence #BangladeshHumanRights

Facebook Comments Box