banner

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

শিশুকে বেশি কোলে রাখা উচিত নাকি উচিত নয়?

নবজাতক বা কয়েক মাসের শিশুকে অনেক সময়ই দেখা যায় শুধু মায়ের কোলেই থাকতে চাইছে, একটু দূরে রাখলেই কান্না শুরু করে। তখন অনেকেই বলেন – এভাবে কোলে নিলে তো শিশু অভ্যাস করে ফেলবে, আর কারও কাছে যেতে চাইবে না।

কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, জীবনের প্রথম কয়েক মাসে শিশুর এই আচরণ একেবারেই স্বাভাবিক। বরং এই সময় বাবা-মায়ের স্পর্শ, কণ্ঠ ও উপস্থিতিই শিশুর নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর প্রথম মাসগুলো: নিরাপত্তার অনুভূতি কেন গুরুত্বপূর্ণ

জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুত বিকশিত হয়। এই সময়েই সে ধীরে ধীরে চারপাশের পৃথিবীকে চিনতে শেখে এবং নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি গড়ে উঠতে শুরু করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬–৭ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুরা নিজের অস্তিত্ব ও মায়ের অস্তিত্বকে পুরোপুরি আলাদা করে বুঝতে পারে না। তাই মা বা যত্নশীল মানুষের কাছাকাছি থাকলেই তারা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Center on the Developing Child–এর মতে, অভিভাবকের দ্রুত সাড়া দেওয়া, যত্ন নেওয়া এবং স্নেহপূর্ণ আচরণ শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুর কান্নার জবাব দেওয়া কেন জরুরি

শিশুর জন্য কান্নাই মূলত যোগাযোগের ভাষা। ক্ষুধা, অস্বস্তি, ভয় বা একাকিত্ব—সবকিছুর প্রকাশ সে কান্নার মাধ্যমেই করে। তাই শিশুর কান্না শুনে তাকে কোলে নেওয়া, খাওয়ানো বা সান্ত্বনা দেওয়া তাকে শেখায় যে তার প্রয়োজনগুলোর গুরুত্ব আছে।

American Academy of Pediatrics বলছে, দ্রুত ও স্নেহপূর্ণ প্রতিক্রিয়া শিশুর মধ্যে “নিরাপদ সংযুক্তি” বা secure attachment গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই সম্পর্ক শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বেশি আদর করলে কি শিশু নষ্ট হয়ে যায়?

অনেকের ধারণা, বেশি কোলে নেওয়া বা কান্না শুনেই সাড়া দিলে শিশু নষ্ট হয়ে যায়। তবে গবেষণা ভিন্ন কথা বলছে। জীবনের প্রথম বছরগুলোতে শিশুকে অতিরিক্ত আদর করে “নষ্ট” করে ফেলার আশঙ্কা খুবই কম।

বরং নিয়মিত স্নেহ, স্পর্শ এবং যত্ন শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–ও বলছে, শিশুর সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য স্নেহপূর্ণ ও সাড়া-দেওয়ার পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি

শিশুকে কোলে নেওয়া বা তার কান্নার জবাব দেওয়া শুধু মুহূর্তের সান্ত্বনা নয়—এটি ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। ছোটবেলায় যে শিশু নিরাপদ ও ভালোবাসায় ঘেরা পরিবেশে বড় হয়, সে বড় হয়ে নতুন মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।

তাই শিশু বারবার কোলে আসতে চাইলে সেটিকে অভ্যাস বা খেয়াল নয়, বরং তার নিরাপত্তা খোঁজার স্বাভাবিক চেষ্টা হিসেবেই দেখা উচিত।

 

প্রবীণের সঙ্গে তরুণের বন্ধুত্ব কেন জরুরি?

সমাজে সাধারণত দেখা যায়—তরুণরা নিজেদের জগতে ব্যস্ত, আর প্রবীণরা ধীরে ধীরে একাকিত্বে ডুবে যান। অথচ গবেষণা ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বলছে, প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বন্ধুত্ব সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার এক সুন্দর সেতুবন্ধন।

১. অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনের মিলন

প্রবীণরা জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন। তাদের কাছে রয়েছে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার—ভুল-শুদ্ধ সিদ্ধান্ত, সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প। অন্যদিকে তরুণরা নতুন চিন্তা, উদ্যম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে আসে। এই দুই শক্তি একত্র হলে নতুন ধারণা ও বাস্তব জ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে।

২. একাকিত্ব কমায়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্বে ভোগেন। তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তাদের জীবনে নতুন প্রাণ এনে দেয়। গল্প, স্মৃতি ও সময় ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা আবার সামাজিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

৩. তরুণদের জন্য জীবনজ্ঞান

তরুণদের জীবনে সিদ্ধান্তের মুহূর্ত অনেক। শিক্ষা, পেশা, সম্পর্ক—সবকিছু নিয়ে দ্বিধা থাকে। প্রবীণ বন্ধুদের পরামর্শ অনেক সময় পথ দেখায়। তারা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তরুণদের ভুল থেকে বাঁচতে সাহায্য করতে পারেন।

৪. পারস্পরিক সহমর্মিতা তৈরি করে

প্রজন্মের পার্থক্যের কারণে অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। বন্ধুত্ব সেই দূরত্ব কমায়। তরুণরা প্রবীণদের অনুভূতি বুঝতে শেখে, আর প্রবীণরা নতুন প্রজন্মের ভাবনা ও জীবনধারা সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।

৫. সমাজে মূল্যবোধ গড়ে তোলে

প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ থাকলে সমাজে সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান বাড়ে। প্রবীণরা ইতিহাস ও মূল্যবোধের ধারক, আর তরুণরা ভবিষ্যতের নির্মাতা। তাদের বন্ধুত্ব সমাজকে আরও সুস্থ ও মানবিক করে তোলে।

প্রবীণ ও তরুণের বন্ধুত্ব আসলে সময়ের দুই প্রান্তকে একত্র করে। এতে যেমন প্রবীণরা নতুন উদ্যম পান, তেমনি তরুণরা পান জীবনের গভীর শিক্ষা। তাই প্রজন্মের এই বন্ধন শুধু ব্যক্তিগত নয়—একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্যও অপরিহার্য।

(রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে)