banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

নিকাবে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

সম্প্রতি বিএনপি নেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘নিকাব মুসলমানদের ড্রেসই নয়…। ইহুদি নারীরা যখন বেশ্যাবৃত্তি করত অথবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম করত, তখন নিকাব পরত।’ এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষ বিস্মিত ও আহত হয়েছেন। কারণ বিষয়টি কেবল একটি পোশাকের আলোচনা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় পরিচয়, নারীর মর্যাদা এবং সমাজের সাধারণ সৌজন্যবোধ। একজন নারী কী পরবেন, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তকে ‘অনৈতিকতা’ বা ‘অপরাধ’-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটি সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

প্রথমেই একটি ন্যায্য কথা বলা দরকার—অপরাধের দায় অপরাধীর, পোশাকের নয়। কোনো নারী নিকাব পরলেই তিনি সন্দেহজনক, এমন ধারণা তৈরি করা মানে লক্ষ কোটি পর্দানশীন নারীকে অবমূল্যায়ন করা। পোশাককে কেন্দ্র করে নারীকে চরিত্রগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা নারীর সম্মানবোধকে দুর্বল করে, সমাজকে অশালীন করে।

নিকাব কি মুসলিম সমাজে অচেনা কিছু?

নিকাবকে ‘মুসলমানদের ড্রেস নয়’ বলে এভাবে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার আগে ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো দেখা জরুরি। সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত আছে— ‘ইহরামরত অবস্থায় নারীরা মুখে নিকাব এবং হাতে হাতমোজা পরিধান করবে না।’ (বুখারি : ১৮৩৮)। এই হাদিস খুব স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত দেয়। ইহরাম হলো বিশেষ ইবাদতের অবস্থা; সেখানে কিছু পোশাক বা আচরণে আলাদা বিধান থাকে। কিন্তু যেটি লক্ষণীয়—নিকাব ও হাতমোজা ইহরামের সময়ে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। আর একটি জিনিস সমাজে পরিচিত না হলে, সাধারণভাবে ব্যবহৃত না হলে, তার ব্যাপারে আলাদা নিষেধাজ্ঞা আসার কথাও নয়। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাসুল (সা.)-এর যুগে বহু নারী নিকাব পরতেন, হাতমোজাও ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, নিকাব মুসলিম সমাজে সম্পূর্ণ অচেনা বা বহিরাগত কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামের প্রথম যুগের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এটি পরিচিতভাবে যুক্ত ছিল।

এছাড়া উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর পর্দা ও সংযমের বিষয়েও হাদিসে নানা বর্ণনা আছে। ইসলামি জীবনবোধে পর্দা ছিল শালীনতার স্বাভাবিক সংস্কৃতি। তাই নিকাবকে অসম্মান করার মধ্যে ইতিহাস-বিচ্ছিন্নতা যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মীয় অনুভূতিতে অপ্রয়োজনীয় আঘাত।

নিকাব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মর্যাদা নষ্ট করা কাম্য নয়

নিকাব ফরজ কি না, ফিকহি আলোচনায় মতভেদ রয়েছে। কেউ একে বাধ্যতামূলক বলেন, কেউ উত্তম বলেন, কেউ সমাজভেদে ব্যাখ্যা করেন। তবে যা-ই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—পর্দানশীন নারীকে অপমান করার সুযোগ এতে তৈরি হয় না। ইসলামি জ্ঞানধারায় বহু প্রসিদ্ধ আলেম নিকাবকে অন্তত অধিক সংযমপূর্ণ ও নিরাপদ পথ হিসেবে দেখেছেন। কেউ নিকাব বেছে নিলে তা হতে পারে তার তাকওয়া, সততা, নিরাপত্তাচেতনা কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত। তাকে বিদ্রুপ করা নয়, বরং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা সুশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আবশ্যক।

‘ইহুদি নারী’ প্রসঙ্গ এনে নিকাবকে কলুষিত করা অশোভন সাধারণীকরণ

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো তিনি নিকাবকে ‘বেশ্যাবৃত্তি’ বা ‘নিষিদ্ধ কার্যক্রম’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি নিছক ভুল তথ্য নয়; এটি সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ এতে নিকাবধারী নারীর প্রতি একটি অপমানজনক মানসিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যেন নিকাব মানেই সন্দেহজনক, গুপ্ত অপরাধ; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঠাকুরের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ স্বকপোলকল্পিত। ইতিহাসের কোথাও ইহুদি নারীদের অন্যায় করে নিকাব করার কথা বর্ণিত হয়নি। বর্তমান সময়ে কোনো কোনো অসতী নারীর চিত্রকে তিনি অতীত ইতিহাসে প্রক্ষিপ্ত করেছেন।

সমাজে অপরাধ ঘটতে পারে, এটা সত্য। অপরাধ দমন হবে আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হবে, এটিই ন্যায়। কিন্তু একটি পোশাককে অপরাধের প্রতীক বানিয়ে দেওয়া মানে ধর্মীয় নারীদের গণহারে সন্দেহের আসামি বানিয়ে দেওয়া। এটি ন্যায্যতা নয়, এটি অপবাদ ও অন্যায়Ñঅসভ্য মানসিকতা।

যদি কেউ নিকাব পরে অপরাধ করে, সেটি ব্যক্তির অপরাধ। যেমন কেউ শাড়ি পরে অপরাধ করলে শাড়ি অপরাধের পোশাক হয়ে যায় না; কেউ স্যুট পরে দুর্নীতি করলে স্যুটকে দোষী করা যায় না। ঠিক তেমনি নিকাবকে কুৎসিত ইঙ্গিতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

নারীর পোশাক : অধিকার ও স্বাধীনতার অংশ

বাংলাদেশে বহু নারী নিকাব করেন, বহু নারী হিজাব করেন। কেউ শাড়ি-ওড়নায়ও পর্দা রক্ষা করেন। নারী কী পরবেন—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একান্তভাবে নারীরই। রাষ্ট্র নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে; সেই স্বাধীনতার স্বাভাবিক অংশ হলো পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা। কাজেই কারো নিকাব পরাকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অপরাধমূলক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। বিশেষত নতুন বাংলাদেশের নতুন পরিবেশে তা অকল্পনীয়।

এছাড়া একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, অনেক নারী নিকাব পরেন নিজেদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও আত্মমর্যাদার কারণে। তারা চান মানুষ তাদের শরীর নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব দেখুক। হিজাব-নিকাব তাদের কাছে কোনো লজ্জা নয়; বরং পর্দানশিন নারীর কাছে তা সম্মান ও সংযমের প্রতীক।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন মুসলিম নারী যদি পরিপূর্ণ পর্দা পালনে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি চেহারা ঢেকে রাখতে বাধ্য। এটি তার ধর্মীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। রাজনীতি থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু রাজনৈতিক কথাবার্তায় ধর্মীয় পোশাককে টেনে এনে নারীর সম্মানকে আঘাত করা চরম অসুস্থতার লক্ষণ। মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে যে কটূক্তি ও অসম্মানজনক ইঙ্গিত আছে, তা সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার দাবি। অন্তত এটুকু বোঝা জরুরি—নিকাব কোনো অপরাধের প্রতীক নয়, এটি বহু নারীর বিশ্বাস ও শালীনতার একটি পরিচিত প্রকাশ।

আমরা চাই, সমাজে বহুমত বহু চিন্তা থাকবে, কিন্তু সৌজন্য ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে; রাজনীতি থাকবে, কিন্তু অন্যায় আক্রমণ থাকবে না। নারীর পোশাক নিয়ে উপহাস নয়, বরং নারীর মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো সভ্যতার মানদণ্ড।

 

ফিরে দেখাঃ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৩০-৩১ সালের লবণ সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ লবণ আইনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো গণ-আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং সারা ভারতে বিদেশি পণ্য বর্জন, লবণ সংগ্রহ ও পুলিশি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই আন্দোলনের ইতিহাসে নারীদের অবদান আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া একটি পুরোনো ছবি অ্যালবাম সেই বিস্মৃত অধ্যায়ের নতুন আলোকপাত করেছে।

দুই দশক আগে লন্ডনের নিলামে ওঠা ধূসর রঙের ছোট অ্যালবামটি দীর্ঘসময় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল দিল্লির আলকাজি ফাউন্ডেশনে। অ্যালবামের মলাটে ছিল ‘ওল্ড কংগ্রেস পার্টি—কে এল নার্সি’ লেখা, কিন্তু নামটি কার সে পরিচয় জানা ছিল না। ছবিগুলোর নিচে টাইপরাইটারে লেখা ক্যাপশনগুলোতেও ছিল প্রচুর ভুল। গবেষকেরা অনেক দিন এ অ্যালবামকে তেমন গুরুত্ব দেননি। অবশেষে ২০১৯ সালে ফাউন্ডেশনের কিউরেটর ও যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক অ্যালবামের ছবিগুলো বিশ্লেষণ শুরু করলে তাঁরা বিস্মিত হন—এই বহু পুরোনো অ্যালবামেই লুকিয়ে ছিল লবণ সত্যাগ্রহে নারীদের নেতৃত্বের অমূল্য প্রমাণ।

অ্যালবামের ছবিগুলোতে ধরা আছে ১৯৩০ সালের বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) উত্তাল রাস্তাঘাট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মুহূর্ত, আহত স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধার এবং সর্বোপরি নারী নেতৃত্বের দৃশ্য। গবেষক সুমাথি রামাস্বামীর ভাষায়—“ছবিগুলো দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীরা কতটা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের ময়দানে ছিলেন।”

 লীলাবতী মুনশি নামে গুজরাটের সাহসী কংগ্রেস নেত্রীকে দেখা যায় পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ দিচ্ছেন সরকারি লবণ কেন্দ্র দখলে। আরেক ছবিতে তিনি ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে দৃঢ় ভঙ্গিতে বয়কট কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। চারপাশে পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও তাঁর আত্মবিশ্বাসে ছিল নারীর নতুন শক্তি ও রাজনীতিতে নতুন পরিচয়।

অ্যালবামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘দেশ সেবিকা’ বাহিনীর ছবি—যা ছিল সম্পূর্ণ নারীদের নিয়ে গঠিত। তাঁরা পুলিশের লাঠিচার্জ ঠেকিয়ে পতাকা রক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, যা তখনকার সামাজিক মানসিকতার জন্য ছিল অভাবনীয়। একই সঙ্গে চৌপাট্টি সৈকতে হাজারো নারী সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন-লবণ সত্যাগ্রহকে জন-আন্দোলনে রূপ দিতে এই নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

 আরও উল্লেখযোগ্য হলো—অনেক নারী তাঁদের কন্যাদের হাত ধরে আন্দোলনে নিয়ে এসেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

ছবিগুলোর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক মিছিলে নারীরা সামনের সারিতে, আর রাস্তার দুই পাশে পুরুষেরা দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন। এই উল্টোচিত্র সমসাময়িক সমাজে নারীর অবস্থান বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। গবেষকেরা বলেন, শুধু নেতাদের ডাকে নয়—বোম্বের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সাধারণ নারী, আন্দোলনকে বড় রূপ দিয়েছিলেন। তাঁদের মিছিল, পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো, গ্রেপ্তার হওয়া ও বয়কটের প্রচারণা—সবই ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এ অ্যালবামে শুধু আন্দোলনের ছবি নয়, তখনকার বোম্বের নগরজীবনেরও চিত্র ফুটে উঠেছে। শহরের রাস্তাঘাট, বাজার, সমুদ্রতট—সব মিলিয়ে এটি প্রায় এক শতাব্দী আগের ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যবান দলিল হয়ে উঠেছে।

 বর্তমানে ছবিগুলো প্রকাশিত হয়েছে “ফটোগ্রাফিং সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স” নামে একটি বইয়ে, যা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে লবণ সত্যাগ্রহের বিস্মৃত নারীনেত্রীদের।

সর্বোপরি, এই অ্যালবাম প্রমাণ করে—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু পুরুষদের নেতৃত্বে চলে এমন ধারণা ভুল। লবণ সত্যাগ্রহে নারীরা ছিলেন সমানভাবে নেতৃত্বের আসনে, কখনো কখনো পুরুষদেরও পেছনে ফেলে। তাঁদের দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও ত্যাগ আজও ইতিহাসের পাতায় অনিবার্য হয়ে আছে, আর এই ছবিগুলো সেই সংগ্রামী নারীদের প্রতি প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিচ্ছে।