banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে:আইন ও ইসলাম

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা চায়ের আড্ডায় অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো-প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে।

 বিষয়টি নিছক একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় আইন এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের অধিকার খর্ব করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, আবার আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে অনেক নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু ইসলামি শরীয়ত, বাংলাদেশের আইন (১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ) এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে কিছু বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে যায়,তারমধ্যে-

*​দ্বিতীয় বিয়ের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও শর্তাবলি*

​ইসলামে পুরুষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি রয়েছে, তবে তা শর্তহীন বা অবাধ নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বহুবিবাহের অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু এর সাথে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘আদল’-এর কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:…আর যদি তোমরা ভয় কর যে স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার রক্ষা করতে পারবে না, তবে মাত্র একটি বিয়েই কর।”

​এখানে স্পষ্ট যে, একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও, যদি স্বামী মনে করেন যে তিনি স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ, ভরণপোষণ এবং সময় বন্টনে সমতা বজায় রাখতে পারবেন না, তবে তার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা নিষিদ্ধ বা হারাম।

আবার ফিকহ বা শরীয়ত অনুযায়ী- দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, অনুমতি না নিলে বিয়ে ‘বাতিল’ বা ‘অশুদ্ধ’ হবে না। তবে, ইসলামে পারিবারিক শান্তি এবং পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ভীষণভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

স্বামী যদি গোপনে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে তা জানাজানি হয়, তবে সংসারে যে অশান্তি ও বিশ্বাসের ফাটল তৈরি হয়, তা ইসলাম সমর্থন করে না।ইসলামে এতিমদের রক্ষণাবেক্ষণ, স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা বন্ধ্যত্বের মতো যৌক্তিক কারণে বহুবিবাহের পথ খোলা রাখা হয়েছে। 

কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে নিছক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য এই সুযোগের অপব্যবহার করা হচ্ছে, যা শরীয়তের মূল লক্ষ্যের পরিপন্থী।

*​বাংলাদেশের আইন: অনুমতি ছাড়া বিয়ে ও শাস্তি*

​বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে এটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে।

​১. সালিশি পরিষদের অনুমতি (ধারা ৬):

আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ বলবৎ থাকাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই ‘সালিশি পরিষদ’-এর কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। এই পরিষদে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়র এবং প্রথম স্ত্রীর প্রতিনিধি থাকবেন।২. অনুমতির যৌক্তিক কারণ:

শুধুমাত্র আবেদন করলেই অনুমতি মিলবে না। সালিশি পরিষদ কিছু নির্দিষ্ট কারণ বিবেচনা করে অনুমতি দিতে পারে, যেমন: বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব। শারীরিক অক্ষমতা বা দুরারোগ্য ব্যাধি দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের অযোগ্যতা বা মানসিকভাবে অসুস্থতা।

​৩. শাস্তি ও জরিমানা:যদি কোনো ব্যক্তি সালিশি পরিষদের (এবং পরোক্ষভাবে প্রথম স্ত্রীর) অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। এক্ষেত্রে শাস্তি হলো:

​এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা ​উভয় দণ্ড।

​৪. বিয়ের বৈধতা ও দেনমোহর:এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্যাঁচ বা সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে স্বামী শাস্তি পাবেন ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েটি ‘অবৈধ’ বা ‘বাতিল’ হবে না। অর্থাৎ, দ্বিতীয় স্ত্রী তার স্ত্রীর মর্যাদা এবং অধিকার পাবেন। তবে, অনুমতি না নেওয়ার কারণে স্বামী প্রথম স্ত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ দেনমোহর (মোজ্জল বা মুয়াজ্জল যা-ই হোক) পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।

*​সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট: বাস্তবতা কী?*

​আইন ও ধর্মের বাইরে গিয়ে যদি আমরা বাংলাদেশের বর্তমান সমাজের দিকে তাকাই, তবে চিত্রটি বেশ জটিল। ​১. আইনের ফাঁকফোকর ও প্রয়োগহীনতা: গ্রামাঞ্চলে এবং অনেক ক্ষেত্রে শহরেও, সালিশি পরিষদের তোয়াক্কা না করেই অনেকে দ্বিতীয় বিয়ে করছেন। ভুয়া তালাকনামা তৈরি করা বা প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া হয়েছে মর্মে মিথ্যা হলফনামা দেওয়ার প্রবণতাও প্রচুর। নারীরা অধিকাংশ সময় অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা এবং ‘লজ্জা’র ভয়ে মামলা করতে চান না।

​২. অর্থনৈতিক সংকট: মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে স্বামী যখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রথম সংসারের সন্তানরা অবহেলায় বেড়ে ওঠে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং অনেক সময় বিপথগামী হয়।৩. ‘সুন্নাহ’র অপব্যাখ্যা:

সমাজে একটি শ্রেণি রয়েছে যারা দ্বিতীয় বিয়েকে শুধুমাত্র ‘সুন্নাহ’ বা ধর্মীয় অধিকার হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু সেই সুন্নাহ পালনের জন্য যে আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক পরিপক্কতা প্রয়োজন, তা তাদের থাকে না। এটি ধর্মের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।

*​মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কেমন* ​অনুমতিহীন দ্বিতীয় বিয়ে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।

 দীর্ঘদিনের সংসার জীবনের পর স্বামীর গোপন বিয়ে একজন নারীর আত্মবিশ্বাস চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এটি তার মধ্যে গভীর বিষণ্নতা (Depression) তৈরি করে।

সতিন বা দ্বিতীয় স্ত্রী আসার পর সংসারে ঝগড়া-বিবাদ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় প্রথম স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।বেশিরভাগ সময়ই​ বাবার দ্বিতীয় বিয়ে সন্তানদের মনে বাবার প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ তৈরি করে। পারিবারিক ভাঙন তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

*​আইন বনাম ধর্ম* অনেকে প্রশ্ন করেন, “ইসলামে যদি অনুমতি না লাগে, তবে রাষ্ট্র কেন বাধা দিচ্ছে?”

​এখানে মূল বিষয়টি হলো ‘মাসলাহা’ বা জনকল্যাণ। ইসলামি রাষ্ট্রে বা মুসলিম সমাজে যখন কোনো ধর্মীয় অনুমতির ব্যাপক অপব্যবহার হয় এবং তা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্র সেই অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ (Restrict) করতে পারে।

​১৯৬১ সালের আইনটি তৈরি করা হয়েছিল নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, যাতে কোনো পুরুষ খেয়ালখুশি মতো বিয়ে করে নারীদের রাস্তায় বসিয়ে দিতে না পারে। তাই, রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করাও একজন নাগরিক হিসেবে মুসলমানের দায়িত্ব, যতক্ষণ না তা সরাসরি কুফরির দিকে নিয়ে যায়। যেহেতু এই আইনটি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি, তাই এটি পরোক্ষভাবে ইসলামি চেতনারই পরিপূরক।চলমান ইস্যু ‘​প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে’ -বিষয়টি কেবল আইনি বা ধর্মীয় তর্কের নয়, এটি মানবিকতারও প্রশ্ন। ইসলামে যেমন বহুবিবাহের অনুমতি আছে, তেমনি ন্যায়বিচারের কঠোর হুঁশিয়ারিও আছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আইন পুরুষকে জেল-জরিমানার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের বোঝা উচিত, বিয়ে মানে কেবল যৌন সম্পর্ক বা বংশবৃদ্ধি নয়; এটি একটি গুরুদায়িত্ব। গোপন বিয়ে বা জোরপূর্বক অনুমতি নিয়ে বিয়ে কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আইনের কঠোর প্রয়োগেরপাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক ব্যাখ্যাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।

পরিবারের শান্তি বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।