banner

বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Monthly Archives: January 2026

নিকাবে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

সম্প্রতি বিএনপি নেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘নিকাব মুসলমানদের ড্রেসই নয়…। ইহুদি নারীরা যখন বেশ্যাবৃত্তি করত অথবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম করত, তখন নিকাব পরত।’ এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষ বিস্মিত ও আহত হয়েছেন। কারণ বিষয়টি কেবল একটি পোশাকের আলোচনা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় পরিচয়, নারীর মর্যাদা এবং সমাজের সাধারণ সৌজন্যবোধ। একজন নারী কী পরবেন, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তকে ‘অনৈতিকতা’ বা ‘অপরাধ’-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটি সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

প্রথমেই একটি ন্যায্য কথা বলা দরকার—অপরাধের দায় অপরাধীর, পোশাকের নয়। কোনো নারী নিকাব পরলেই তিনি সন্দেহজনক, এমন ধারণা তৈরি করা মানে লক্ষ কোটি পর্দানশীন নারীকে অবমূল্যায়ন করা। পোশাককে কেন্দ্র করে নারীকে চরিত্রগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা নারীর সম্মানবোধকে দুর্বল করে, সমাজকে অশালীন করে।

নিকাব কি মুসলিম সমাজে অচেনা কিছু?

নিকাবকে ‘মুসলমানদের ড্রেস নয়’ বলে এভাবে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার আগে ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো দেখা জরুরি। সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত আছে— ‘ইহরামরত অবস্থায় নারীরা মুখে নিকাব এবং হাতে হাতমোজা পরিধান করবে না।’ (বুখারি : ১৮৩৮)। এই হাদিস খুব স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত দেয়। ইহরাম হলো বিশেষ ইবাদতের অবস্থা; সেখানে কিছু পোশাক বা আচরণে আলাদা বিধান থাকে। কিন্তু যেটি লক্ষণীয়—নিকাব ও হাতমোজা ইহরামের সময়ে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। আর একটি জিনিস সমাজে পরিচিত না হলে, সাধারণভাবে ব্যবহৃত না হলে, তার ব্যাপারে আলাদা নিষেধাজ্ঞা আসার কথাও নয়। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাসুল (সা.)-এর যুগে বহু নারী নিকাব পরতেন, হাতমোজাও ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, নিকাব মুসলিম সমাজে সম্পূর্ণ অচেনা বা বহিরাগত কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামের প্রথম যুগের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এটি পরিচিতভাবে যুক্ত ছিল।

এছাড়া উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর পর্দা ও সংযমের বিষয়েও হাদিসে নানা বর্ণনা আছে। ইসলামি জীবনবোধে পর্দা ছিল শালীনতার স্বাভাবিক সংস্কৃতি। তাই নিকাবকে অসম্মান করার মধ্যে ইতিহাস-বিচ্ছিন্নতা যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মীয় অনুভূতিতে অপ্রয়োজনীয় আঘাত।

নিকাব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মর্যাদা নষ্ট করা কাম্য নয়

নিকাব ফরজ কি না, ফিকহি আলোচনায় মতভেদ রয়েছে। কেউ একে বাধ্যতামূলক বলেন, কেউ উত্তম বলেন, কেউ সমাজভেদে ব্যাখ্যা করেন। তবে যা-ই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—পর্দানশীন নারীকে অপমান করার সুযোগ এতে তৈরি হয় না। ইসলামি জ্ঞানধারায় বহু প্রসিদ্ধ আলেম নিকাবকে অন্তত অধিক সংযমপূর্ণ ও নিরাপদ পথ হিসেবে দেখেছেন। কেউ নিকাব বেছে নিলে তা হতে পারে তার তাকওয়া, সততা, নিরাপত্তাচেতনা কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত। তাকে বিদ্রুপ করা নয়, বরং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা সুশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আবশ্যক।

‘ইহুদি নারী’ প্রসঙ্গ এনে নিকাবকে কলুষিত করা অশোভন সাধারণীকরণ

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো তিনি নিকাবকে ‘বেশ্যাবৃত্তি’ বা ‘নিষিদ্ধ কার্যক্রম’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি নিছক ভুল তথ্য নয়; এটি সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ এতে নিকাবধারী নারীর প্রতি একটি অপমানজনক মানসিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যেন নিকাব মানেই সন্দেহজনক, গুপ্ত অপরাধ; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঠাকুরের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ স্বকপোলকল্পিত। ইতিহাসের কোথাও ইহুদি নারীদের অন্যায় করে নিকাব করার কথা বর্ণিত হয়নি। বর্তমান সময়ে কোনো কোনো অসতী নারীর চিত্রকে তিনি অতীত ইতিহাসে প্রক্ষিপ্ত করেছেন।

সমাজে অপরাধ ঘটতে পারে, এটা সত্য। অপরাধ দমন হবে আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হবে, এটিই ন্যায়। কিন্তু একটি পোশাককে অপরাধের প্রতীক বানিয়ে দেওয়া মানে ধর্মীয় নারীদের গণহারে সন্দেহের আসামি বানিয়ে দেওয়া। এটি ন্যায্যতা নয়, এটি অপবাদ ও অন্যায়Ñঅসভ্য মানসিকতা।

যদি কেউ নিকাব পরে অপরাধ করে, সেটি ব্যক্তির অপরাধ। যেমন কেউ শাড়ি পরে অপরাধ করলে শাড়ি অপরাধের পোশাক হয়ে যায় না; কেউ স্যুট পরে দুর্নীতি করলে স্যুটকে দোষী করা যায় না। ঠিক তেমনি নিকাবকে কুৎসিত ইঙ্গিতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

নারীর পোশাক : অধিকার ও স্বাধীনতার অংশ

বাংলাদেশে বহু নারী নিকাব করেন, বহু নারী হিজাব করেন। কেউ শাড়ি-ওড়নায়ও পর্দা রক্ষা করেন। নারী কী পরবেন—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একান্তভাবে নারীরই। রাষ্ট্র নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে; সেই স্বাধীনতার স্বাভাবিক অংশ হলো পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা। কাজেই কারো নিকাব পরাকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অপরাধমূলক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। বিশেষত নতুন বাংলাদেশের নতুন পরিবেশে তা অকল্পনীয়।

এছাড়া একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, অনেক নারী নিকাব পরেন নিজেদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও আত্মমর্যাদার কারণে। তারা চান মানুষ তাদের শরীর নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব দেখুক। হিজাব-নিকাব তাদের কাছে কোনো লজ্জা নয়; বরং পর্দানশিন নারীর কাছে তা সম্মান ও সংযমের প্রতীক।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন মুসলিম নারী যদি পরিপূর্ণ পর্দা পালনে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি চেহারা ঢেকে রাখতে বাধ্য। এটি তার ধর্মীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। রাজনীতি থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু রাজনৈতিক কথাবার্তায় ধর্মীয় পোশাককে টেনে এনে নারীর সম্মানকে আঘাত করা চরম অসুস্থতার লক্ষণ। মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে যে কটূক্তি ও অসম্মানজনক ইঙ্গিত আছে, তা সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার দাবি। অন্তত এটুকু বোঝা জরুরি—নিকাব কোনো অপরাধের প্রতীক নয়, এটি বহু নারীর বিশ্বাস ও শালীনতার একটি পরিচিত প্রকাশ।

আমরা চাই, সমাজে বহুমত বহু চিন্তা থাকবে, কিন্তু সৌজন্য ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে; রাজনীতি থাকবে, কিন্তু অন্যায় আক্রমণ থাকবে না। নারীর পোশাক নিয়ে উপহাস নয়, বরং নারীর মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো সভ্যতার মানদণ্ড।

 

ফিরে দেখাঃ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৩০-৩১ সালের লবণ সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ লবণ আইনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো গণ-আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং সারা ভারতে বিদেশি পণ্য বর্জন, লবণ সংগ্রহ ও পুলিশি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই আন্দোলনের ইতিহাসে নারীদের অবদান আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া একটি পুরোনো ছবি অ্যালবাম সেই বিস্মৃত অধ্যায়ের নতুন আলোকপাত করেছে।

দুই দশক আগে লন্ডনের নিলামে ওঠা ধূসর রঙের ছোট অ্যালবামটি দীর্ঘসময় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল দিল্লির আলকাজি ফাউন্ডেশনে। অ্যালবামের মলাটে ছিল ‘ওল্ড কংগ্রেস পার্টি—কে এল নার্সি’ লেখা, কিন্তু নামটি কার সে পরিচয় জানা ছিল না। ছবিগুলোর নিচে টাইপরাইটারে লেখা ক্যাপশনগুলোতেও ছিল প্রচুর ভুল। গবেষকেরা অনেক দিন এ অ্যালবামকে তেমন গুরুত্ব দেননি। অবশেষে ২০১৯ সালে ফাউন্ডেশনের কিউরেটর ও যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক অ্যালবামের ছবিগুলো বিশ্লেষণ শুরু করলে তাঁরা বিস্মিত হন—এই বহু পুরোনো অ্যালবামেই লুকিয়ে ছিল লবণ সত্যাগ্রহে নারীদের নেতৃত্বের অমূল্য প্রমাণ।

অ্যালবামের ছবিগুলোতে ধরা আছে ১৯৩০ সালের বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) উত্তাল রাস্তাঘাট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মুহূর্ত, আহত স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধার এবং সর্বোপরি নারী নেতৃত্বের দৃশ্য। গবেষক সুমাথি রামাস্বামীর ভাষায়—“ছবিগুলো দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীরা কতটা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের ময়দানে ছিলেন।”

 লীলাবতী মুনশি নামে গুজরাটের সাহসী কংগ্রেস নেত্রীকে দেখা যায় পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ দিচ্ছেন সরকারি লবণ কেন্দ্র দখলে। আরেক ছবিতে তিনি ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে দৃঢ় ভঙ্গিতে বয়কট কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। চারপাশে পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও তাঁর আত্মবিশ্বাসে ছিল নারীর নতুন শক্তি ও রাজনীতিতে নতুন পরিচয়।

অ্যালবামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘দেশ সেবিকা’ বাহিনীর ছবি—যা ছিল সম্পূর্ণ নারীদের নিয়ে গঠিত। তাঁরা পুলিশের লাঠিচার্জ ঠেকিয়ে পতাকা রক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, যা তখনকার সামাজিক মানসিকতার জন্য ছিল অভাবনীয়। একই সঙ্গে চৌপাট্টি সৈকতে হাজারো নারী সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন-লবণ সত্যাগ্রহকে জন-আন্দোলনে রূপ দিতে এই নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

 আরও উল্লেখযোগ্য হলো—অনেক নারী তাঁদের কন্যাদের হাত ধরে আন্দোলনে নিয়ে এসেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

ছবিগুলোর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক মিছিলে নারীরা সামনের সারিতে, আর রাস্তার দুই পাশে পুরুষেরা দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন। এই উল্টোচিত্র সমসাময়িক সমাজে নারীর অবস্থান বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। গবেষকেরা বলেন, শুধু নেতাদের ডাকে নয়—বোম্বের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সাধারণ নারী, আন্দোলনকে বড় রূপ দিয়েছিলেন। তাঁদের মিছিল, পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো, গ্রেপ্তার হওয়া ও বয়কটের প্রচারণা—সবই ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এ অ্যালবামে শুধু আন্দোলনের ছবি নয়, তখনকার বোম্বের নগরজীবনেরও চিত্র ফুটে উঠেছে। শহরের রাস্তাঘাট, বাজার, সমুদ্রতট—সব মিলিয়ে এটি প্রায় এক শতাব্দী আগের ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যবান দলিল হয়ে উঠেছে।

 বর্তমানে ছবিগুলো প্রকাশিত হয়েছে “ফটোগ্রাফিং সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স” নামে একটি বইয়ে, যা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে লবণ সত্যাগ্রহের বিস্মৃত নারীনেত্রীদের।

সর্বোপরি, এই অ্যালবাম প্রমাণ করে—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু পুরুষদের নেতৃত্বে চলে এমন ধারণা ভুল। লবণ সত্যাগ্রহে নারীরা ছিলেন সমানভাবে নেতৃত্বের আসনে, কখনো কখনো পুরুষদেরও পেছনে ফেলে। তাঁদের দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও ত্যাগ আজও ইতিহাসের পাতায় অনিবার্য হয়ে আছে, আর এই ছবিগুলো সেই সংগ্রামী নারীদের প্রতি প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিচ্ছে।






































 

অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষক নুসরাতের সাত বছরের লড়াই

বর্তমানে নুসরাত বেতন অ্যাকাউন্ট সচল করা ও জব্দ করা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। 

দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করার কারণে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কারাবরণ, চাকরিচ্যুতি ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শিকার হন, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়া। প্রায় সাত বছর পর অবশেষে তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান এবং পুনরায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ ফিরে পান।

২০১৮ সালের জুলাই–আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় নুসরাত ফেসবুকে অন্যের একটি লেখা শেয়ার করেন। ওই শেয়ারের জেরে ২০১৮ সালের ৪ আগস্ট গভীর রাতে তাঁকে আটক করে কলাপাড়া থানায় নেওয়া হয়। পরদিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

গ্রেপ্তারের সময় নুসরাত সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁকে প্রায় ১২ ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয় এবং পরে ১৪ দিন কারাগারে থাকতে হয়। একই সময় তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যা তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে গভীর সংকট তৈরি করে।

কারাগারে থাকাকালীন নুসরাতকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়েছে বলে তিনি জানান। বড় পেট নিয়ে মেঝেতে পাতলা কম্বলের ওপর ঘুমানো, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং মানসিক চাপে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। জামিন শুনানির সময়ও রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক অপবাদ ও ভয় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী করে রাখে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন, যা মানসিকভাবে তাঁকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক অপবাদ ও ভয় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী করে রাখে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন, যা মানসিকভাবে তাঁকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৪ সালের ২২ মে হাইকোর্ট মামলাটি বাতিল করেন। আদালত বলেন, মামলার চার্জশিট দাখিলের সময় সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর ছিল না, ফলে এটি আইনের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয়।

এরপর গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আদেশে নুসরাতের সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়। বরখাস্তকালীন সময় চাকরিকাল হিসেবে গণ্য হবে এবং বকেয়া বেতন–ভাতাও তিনি পাবেন বলে জানানো হয়। ২৯ ডিসেম্বর তিনি পুনরায় কর্মস্থলে যোগ দেন।

নুসরাতের গর্ভে থাকা সন্তানটির বয়স এখন সাত বছরের বেশি। সেই সন্তান আজ মায়ের কাছে জানতে চায়, তাকে পেটে নিয়ে কেন মাকে জেলে যেতে হয়েছিল। এই প্রশ্ন নুসরাতকে এখনো মানসিকভাবে নাড়া দেয়।

মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, নুসরাতের সঙ্গে যা ঘটেছে তা গুরুতর অন্যায়। এ ঘটনার পূর্ণ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের জবাবদিহির পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বর্তমানে নুসরাত বেতন অ্যাকাউন্ট সচল করা ও জব্দ করা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। 

দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে:আইন ও ইসলাম

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা চায়ের আড্ডায় অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো-প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে।

 বিষয়টি নিছক একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় আইন এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের অধিকার খর্ব করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, আবার আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে অনেক নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু ইসলামি শরীয়ত, বাংলাদেশের আইন (১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ) এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে কিছু বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে যায়,তারমধ্যে-

*​দ্বিতীয় বিয়ের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও শর্তাবলি*

​ইসলামে পুরুষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি রয়েছে, তবে তা শর্তহীন বা অবাধ নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বহুবিবাহের অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু এর সাথে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘আদল’-এর কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:…আর যদি তোমরা ভয় কর যে স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার রক্ষা করতে পারবে না, তবে মাত্র একটি বিয়েই কর।”

​এখানে স্পষ্ট যে, একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও, যদি স্বামী মনে করেন যে তিনি স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ, ভরণপোষণ এবং সময় বন্টনে সমতা বজায় রাখতে পারবেন না, তবে তার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা নিষিদ্ধ বা হারাম।

আবার ফিকহ বা শরীয়ত অনুযায়ী- দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, অনুমতি না নিলে বিয়ে ‘বাতিল’ বা ‘অশুদ্ধ’ হবে না। তবে, ইসলামে পারিবারিক শান্তি এবং পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ভীষণভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

স্বামী যদি গোপনে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে তা জানাজানি হয়, তবে সংসারে যে অশান্তি ও বিশ্বাসের ফাটল তৈরি হয়, তা ইসলাম সমর্থন করে না।ইসলামে এতিমদের রক্ষণাবেক্ষণ, স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা বন্ধ্যত্বের মতো যৌক্তিক কারণে বহুবিবাহের পথ খোলা রাখা হয়েছে। 

কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে নিছক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য এই সুযোগের অপব্যবহার করা হচ্ছে, যা শরীয়তের মূল লক্ষ্যের পরিপন্থী।

*​বাংলাদেশের আইন: অনুমতি ছাড়া বিয়ে ও শাস্তি*

​বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে এটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে।

​১. সালিশি পরিষদের অনুমতি (ধারা ৬):

আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ বলবৎ থাকাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই ‘সালিশি পরিষদ’-এর কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। এই পরিষদে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়র এবং প্রথম স্ত্রীর প্রতিনিধি থাকবেন।২. অনুমতির যৌক্তিক কারণ:

শুধুমাত্র আবেদন করলেই অনুমতি মিলবে না। সালিশি পরিষদ কিছু নির্দিষ্ট কারণ বিবেচনা করে অনুমতি দিতে পারে, যেমন: বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব। শারীরিক অক্ষমতা বা দুরারোগ্য ব্যাধি দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের অযোগ্যতা বা মানসিকভাবে অসুস্থতা।

​৩. শাস্তি ও জরিমানা:যদি কোনো ব্যক্তি সালিশি পরিষদের (এবং পরোক্ষভাবে প্রথম স্ত্রীর) অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। এক্ষেত্রে শাস্তি হলো:

​এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা ​উভয় দণ্ড।

​৪. বিয়ের বৈধতা ও দেনমোহর:এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্যাঁচ বা সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে স্বামী শাস্তি পাবেন ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েটি ‘অবৈধ’ বা ‘বাতিল’ হবে না। অর্থাৎ, দ্বিতীয় স্ত্রী তার স্ত্রীর মর্যাদা এবং অধিকার পাবেন। তবে, অনুমতি না নেওয়ার কারণে স্বামী প্রথম স্ত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ দেনমোহর (মোজ্জল বা মুয়াজ্জল যা-ই হোক) পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।

*​সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট: বাস্তবতা কী?*

​আইন ও ধর্মের বাইরে গিয়ে যদি আমরা বাংলাদেশের বর্তমান সমাজের দিকে তাকাই, তবে চিত্রটি বেশ জটিল। ​১. আইনের ফাঁকফোকর ও প্রয়োগহীনতা: গ্রামাঞ্চলে এবং অনেক ক্ষেত্রে শহরেও, সালিশি পরিষদের তোয়াক্কা না করেই অনেকে দ্বিতীয় বিয়ে করছেন। ভুয়া তালাকনামা তৈরি করা বা প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া হয়েছে মর্মে মিথ্যা হলফনামা দেওয়ার প্রবণতাও প্রচুর। নারীরা অধিকাংশ সময় অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা এবং ‘লজ্জা’র ভয়ে মামলা করতে চান না।

​২. অর্থনৈতিক সংকট: মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে স্বামী যখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রথম সংসারের সন্তানরা অবহেলায় বেড়ে ওঠে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং অনেক সময় বিপথগামী হয়।৩. ‘সুন্নাহ’র অপব্যাখ্যা:

সমাজে একটি শ্রেণি রয়েছে যারা দ্বিতীয় বিয়েকে শুধুমাত্র ‘সুন্নাহ’ বা ধর্মীয় অধিকার হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু সেই সুন্নাহ পালনের জন্য যে আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক পরিপক্কতা প্রয়োজন, তা তাদের থাকে না। এটি ধর্মের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।

*​মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কেমন* ​অনুমতিহীন দ্বিতীয় বিয়ে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।

 দীর্ঘদিনের সংসার জীবনের পর স্বামীর গোপন বিয়ে একজন নারীর আত্মবিশ্বাস চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এটি তার মধ্যে গভীর বিষণ্নতা (Depression) তৈরি করে।

সতিন বা দ্বিতীয় স্ত্রী আসার পর সংসারে ঝগড়া-বিবাদ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় প্রথম স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।বেশিরভাগ সময়ই​ বাবার দ্বিতীয় বিয়ে সন্তানদের মনে বাবার প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ তৈরি করে। পারিবারিক ভাঙন তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

*​আইন বনাম ধর্ম* অনেকে প্রশ্ন করেন, “ইসলামে যদি অনুমতি না লাগে, তবে রাষ্ট্র কেন বাধা দিচ্ছে?”

​এখানে মূল বিষয়টি হলো ‘মাসলাহা’ বা জনকল্যাণ। ইসলামি রাষ্ট্রে বা মুসলিম সমাজে যখন কোনো ধর্মীয় অনুমতির ব্যাপক অপব্যবহার হয় এবং তা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্র সেই অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ (Restrict) করতে পারে।

​১৯৬১ সালের আইনটি তৈরি করা হয়েছিল নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, যাতে কোনো পুরুষ খেয়ালখুশি মতো বিয়ে করে নারীদের রাস্তায় বসিয়ে দিতে না পারে। তাই, রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করাও একজন নাগরিক হিসেবে মুসলমানের দায়িত্ব, যতক্ষণ না তা সরাসরি কুফরির দিকে নিয়ে যায়। যেহেতু এই আইনটি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি, তাই এটি পরোক্ষভাবে ইসলামি চেতনারই পরিপূরক।চলমান ইস্যু ‘​প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে’ -বিষয়টি কেবল আইনি বা ধর্মীয় তর্কের নয়, এটি মানবিকতারও প্রশ্ন। ইসলামে যেমন বহুবিবাহের অনুমতি আছে, তেমনি ন্যায়বিচারের কঠোর হুঁশিয়ারিও আছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আইন পুরুষকে জেল-জরিমানার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের বোঝা উচিত, বিয়ে মানে কেবল যৌন সম্পর্ক বা বংশবৃদ্ধি নয়; এটি একটি গুরুদায়িত্ব। গোপন বিয়ে বা জোরপূর্বক অনুমতি নিয়ে বিয়ে কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আইনের কঠোর প্রয়োগেরপাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক ব্যাখ্যাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।

পরিবারের শান্তি বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।

ব্যাংকে নারীবান্ধব ওয়াশরুম বাধ্যতামূলক করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ও গ্রাহকসেবাকে আরও নারীবান্ধব করতে সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে স্বাস্থ্যসম্মত নারীবান্ধব ওয়াশরুম নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দেশনা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়সহ দেশের সব শাখা ও উপশাখায় কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত সপ্তাহে জারি করা এ নির্দেশনায় জানিয়েছে, ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ব্যাংকিং সেবা নিতে আসা নারীদের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম থাকা আবশ্যক। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারীবান্ধব ওয়াশরুমের অভাবে অনেক নারী কর্মকর্তা ও নারী গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, যা কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, তফসিলভুক্ত সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয় এবং সব শাখা–উপশাখায় নারীবান্ধব ওয়াশরুম নির্মাণ নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি বিদ্যমান ওয়াশরুমের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পর্যাপ্ত স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১–এর ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে নারীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সম্মানজনক কর্ম ও সেবা পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

গ্রেফতার হলেন মাদুরোর স্ত্রী,মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন*

গ্রেফতার হলেন মাদুরোর স্ত্রী,মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর স্ত্রী, ৬৯ বছর বয়সী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করে, আহত অবস্থায় আদালতে হাজির করার ঘটনা- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর আইনগত ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 ঘটনাটি শুধু একটি গ্রেপ্তার অভিযান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের সীমারেখা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে । অভিযানের সময় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন।

পরে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে হাজিরির সময় তাঁর মুখ ও চোখে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। 

তাঁর আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, বয়স ও শারীরিক অবস্থার তুলনায় তাঁর ওপর অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বিচারক তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের আইনি যুক্তি হলো, সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সংগঠিত অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে আগে থেকেই ফেডারেল ইন্ডিক্টমেন্ট রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব অপরাধ সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তারা এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল জুরিসডিকশনের আওতায় মামলা পরিচালনার অধিকার রাখে। অভিযানের সময় আহত হওয়ার ঘটনাকে তারা “পরিস্থিতিগত দুর্ঘটনা” হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

অন্যদিকে, ফ্লোরেসের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞরা এই গ্রেপ্তারের বৈধতা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের মতে, ভেনেজুয়েলার সরকারের সম্মতি কিংবা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া সে দেশের ভেতরে অভিযান পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে স্পষ্ট সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের শামিল।

এটি কোনো নিয়মিত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অপহরণের বৈশিষ্ট্য বহন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতরভাবে বিতর্কিত।

আহত হওয়ার বিষয়টি মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তির শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।

একজন প্রবীণ নারীর মুখ ও চোখে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন থাকা গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রশ্ন তোলে। এ অবস্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যকার সংঘাতকে আবারও স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো একভাবে বিষয়টিকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপন করলেও আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে তা একইভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

পাশাপাশি, নারী ও মানবাধিকার ইস্যুতে বৈশ্বিক নীরবতা তথাকথিত “নির্বাচিত মানবাধিকার” বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

সব মিলিয়ে, সিলিয়া ফ্লোরেসের গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার ঘটনা এখন একটি প্রতীকী মামলায় রূপ নিয়েছে। এটি কেবল আদালতের রায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতা, আইন ও মানবাধিকারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচিত হতে থাকবে।

জকসুতে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দেওয়া সেই শান্তা জয়ী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব ও শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী শান্তা আক্তার। ভোটের দিন ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে হেনস্তা করা হলেও শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সমর্থনে তিনি বিজয়ী হন।

ভোটগ্রহণের দিন শান্তা আক্তার মাইক হাতে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিলে ছাত্রদল সমর্থিত নেত্রী খাদিজাতুল কুবরা তার হাত থেকে মাইক কেড়ে নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেদিনই ক্যাম্পাসে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই ঘটনাটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন।

সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শান্তা আক্তার রেকর্ড সংখ্যক ৩ হাজার ৫৫৪ ভোট পেয়ে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে জয়লাভ করেন।
বুধবার (৮ জানুয়ারি) মধ্যরাতে জকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন।
এ সময় তিনি আবারও ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিলে পুরো হলরুম মুখরিত হয়ে ওঠে।

জয়ী ঘোষণার পর শান্তা আক্তার আবেগাপ্লুত হয়ে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন,
“এই জয় শুধু আমার ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি শহীদ ওসমান হাদি ভাইয়ের বিশ্বাস, স্বপ্ন ও শেষ ইচ্ছার প্রতিফলন। নির্বাচনের আগে হাদি ভাই আমাকে ফোন করে বলেছিলেন—‘শান্তা, জিতে আইতে হবে।’ সেই কথাই আমার লড়াইয়ের প্রধান প্রেরণা ছিল। এখন আমি কেবল তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে চাই—ভাই, আমি জিতে এসেছি।”

তিনি আরও জানান, নির্বাচনের ঠিক আগে ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি ভোট চাইতে পারেননি। তবুও শিক্ষার্থীরা তার আদর্শ ও বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে ভোট দিয়েছেন।

জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শান্তা আক্তার শহীদ হাদির স্মরণে মুড়ি ও বাতাসা বিতরণ করেন।

শান্তা আক্তার জয়ের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন,
“এই জয় আমাকে আরও দায়িত্বশীল করেছে। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করতে চাই। বিভাজন নয়, ঐক্যই হবে আমাদের পথ।”

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, কারিগরি জটিলতা ও দীর্ঘ বিরতি সত্ত্বেও সব পক্ষের উপস্থিতিতে ওএমআর মেশিন ও হাতে গণনার সমন্বয়ে স্বচ্ছভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে।

‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিয়ে যে শান্তা আক্তার একদিন হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই স্লোগানই হয়ে উঠল তার বিজয়ের প্রতীক আর জকসু রাজনীতিতে এক আলোচিত অধ্যায়।