banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগসহ সারাদেশে নারীদের অবস্থান কর্মসূচি

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড় কে কেন্দ্র করে নারীদের নেতৃত্বে ও সক্রিয় অংশগ্রহণে টানা অবস্থান কর্মসূচি চলছে। কনকনে শীত, গভীর রাত কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ—কোনো কিছুই নারীদের এই প্রতিবাদ থামাতে পারেনি। নারী-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ রাজপথে অবস্থান নিয়ে একটাই দাবি তুলছেন—হাদি হত্যার দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় পানির ট্যাংকির সামনে গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুকে আন্দোলনকারীরা পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছেন।

হাদির মৃত্যুর পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে বিচার দাবিতে কর্মসূচি শুরু হয়। ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় শাহবাগ মোড়। এখানে নারীদের উপস্থিতি আন্দোলনকে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে, আবার কেউ একাই এসে অবস্থান কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। খোলা আকাশের নিচে কম্বল জড়িয়ে বসে নারীরা স্লোগান দিচ্ছেন—‘হাদি হত্যার বিচার চাই’, ‘ইনসাফ চাই’, ‘নারী-শিশুর নিরাপত্তা চাই’।

শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচির সময় একাধিক আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়। এক মা দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আন্দোলনস্থলে এসে বলেন, “আজ হাদির বিচার না হলে কাল আমাদের সন্তানরাও নিরাপদ থাকবে না।” শিশুকণ্ঠে উচ্চারিত ‘হাদি হত্যার বিচার চাই’ স্লোগান উপস্থিত অনেককে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

 নারীদের এই সরব উপস্থিতি আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক ন্যায়বিচারের দাবিতে রূপ দিয়েছে।

অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের জানান, কোনো আশ্বাসে নয় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কার্যক্রম শুরু হলেই কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

এছাড়াও খুনিদের গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবিতে সম্মিলিত নারী প্রয়াসের উদ্যোগে ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম, সহকারী সেক্রেটারি মাহসিনা মমতাজ মারিয়া, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সদস্য সাংবাদিক লাবিন রহমান, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিশাত শারমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন, জুলাই যোদ্ধা জান্নাতুন নাঈম প্রমি, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সদস্য রায়হানা নাসিম প্রমুখ। 

এবং ২২ ডিসেম্বর চিল্ড্রেন ভয়েস অব হিউম্যানিটির  উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

 পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের উদ্যোগে সমান্তরাল কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় নারীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে হাদি হত্যার বিচার দাবি জানিয়েছেন। রাজশাহীতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে নারীদের অংশগ্রহণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা শহরে নারী শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও কর্মজীবী নারীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ, মৌন মিছিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে নারীর নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। হাদি হত্যার বিচার এই রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার একটি পরীক্ষা বলেও তারা মন্তব্য করেন।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার সম্পন্ন এবং বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি জনসম্মুখে নিয়মিতভাবে জানানো।

নারীদের পক্ষ থেকে আরও দাবি জানানো হয়, ভবিষ্যতে যেন কোনো রাজনৈতিক সহিংসতায় কোনো প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আন্দোলনে নারীরা কোনো দলীয় ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকছেন না। বরং একজন নাগরিক, একজন মা, একজন শিক্ষার্থী ও একজন নারী হিসেবে ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নারীদের এই কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিভিন্ন স্থানের কর্মসূচির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করছে।

 শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগসহ সারাদেশে নারীদের অবস্থান কর্মসূচি এখন একটি শক্তিশালী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে—এমন ঘোষণা দিয়ে নারীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তারা আর নীরব থাকবেন না।