banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

লুইস গিবসন: বিশ্বের সেরা ফরেনসিক আর্টিস্ট

ডিজিটাল নজরদারি যেখানে আজ তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, সেই যুগের অনেক আগেই অপরাধ অনুসন্ধানের নির্ভরতা ছিল মানুষের স্মৃতি আর একটি পেন্সিলের ওপর। ঠিক সেই বাস্তবতায় যিনি নিজের শিল্পশক্তিকে ন্যায়বিচারের অস্ত্রে রূপ দিয়েছিলেন, তিনি হলেন লুইস গিবসন। ফরেনসিক স্কেচকে একসময় “সফট সায়েন্স” বলে অবজ্ঞা করা হলেও তাঁর অভূতপূর্ব কাজ প্রমাণ করে দেয়—একটি নিখুঁত স্কেচও অপরাধী শনাক্তে প্রযুক্তির সমতুল্য, কখনো তার থেকেও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

লুইস গিবসন জন্মগ্রহণ করেন টেক্সাসের ডালাসে, ১৯৫০ সালে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল শিল্পের প্রতি গভীর টান এবং মানুষের মুখ পর্যবেক্ষণের এক আশ্চর্য ক্ষমতা। পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করতেন, অন্য শিশুদের মতো শুধু আঁকিবুঁকি করার বদলে লুইস মানুষের অভিব্যক্তি, মুখের রেখা ও সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলি অনায়াসে ধরতে পারতেন। তাঁর শিক্ষাজীবনেও আর্ট, সাইকোলজি ও মানব-পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ ছিল অত্যন্ত দৃঢ়।

জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে ফরেনসিক
আর্টের পথে নিয়ে আসে। তরুণ বয়সে তিনি নির্মম এক হামলার শিকার হন এবং দুর্ভাগ্যবশত সেই অপরাধী কখনো শাস্তি পায়নি। এই অমানবিক অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের প্রতিভাকে ব্যবহার করবেন অন্য ভিকটিমদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে। ভিকটিম বা সাক্ষীর স্মৃতি থেকে অপরাধীর মুখ পুনর্গঠন করার যে শিল্প, লুইস সেটিকে রূপ দেন পেশাদার দক্ষতায়।

পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন হিউস্টন পুলিশ ডিপার্টমেন্টে। সেখানে শুরু হয় তাঁর কিংবদন্তি ক্যারিয়ার। পুলিশের অনুরোধে তাঁকে বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হতো জটিল মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের স্মৃতি থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করে তিনি তৈরি করতেন অপরাধীর স্কেচ—যার নিখুঁততা দেখে অনেক প্রসিকিউটরই সেগুলোকে প্রায় আসল ছবির মতো বলে বর্ণনা করতেন। চোয়ালের সামান্য বাঁক, কপালের তীব্রতা, চোখের কোণের সংকোচন—এমন ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্যও তিনি অবিশ্বাস্যভাবে বাস্তবসম্মত করে তুলতেন।
তাঁর স্কেচের কারণে বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকা বহু মামলা নতুন করে গতিপথ পায়। নিখোঁজ শিশু, যৌন নিপীড়ন, খুন, ডাকাতি—সব ধরনের মামলাতেই তাঁর স্কেচ ছিল তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সহায়ক। ফরেনসিক স্কেচ, যাকে একসময় নগণ্য একটি অংশ হিসেবে দেখা হতো, লুইস গিবসনের সাফল্যের কারণে আজ বিশ্বজুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে মূল্যবান দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর কাজের বিশ্ব স্বীকৃতি আসে যখন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লুইস গিবসনকে ঘোষণা করে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফরেনসিক আর্টিস্ট। তাঁর স্কেচের সূত্র ধরে শনাক্ত অপরাধীর সংখ্যা ১,৩১৩ জনেরও বেশি—যা কোনো একক শিল্পীর সর্বোচ্চ অর্জন। যদিও পূর্ববর্তী কিছু সংবাদে ১,২৬৬ জন উল্লেখ ছিল, কিন্তু গিনেসের হালনাগাদ সংখ্যা তাঁর অবদানের পরিধিকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি লুইস গিবসনের ব্যক্তিগত জীবনও স্থির ও অনুপ্রেরণামূলক। তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জননী। পরিবারের সমর্থনই তাঁকে দীর্ঘ কর্মজীবনে অবিচল রেখেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেনসিক আর্ট পড়িয়েছেন এবং বিশ্বব্যাপী ওয়ার্কশপ ও বক্তৃতার মাধ্যমে নতুন শিল্পীদের প্রস্তুত করেছেন। তাঁর লেখা বই ও প্রশিক্ষণ উপকরণ আজও ফরেনসিক আর্টের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স।

সবশেষে বলা যায়, লুইস গিবসন শুধু একজন শিল্পী নন—ন্যায়বিচারের সংগ্রামে তিনি এক আলোকবর্তিকা।ব্যক্তিগত বেদনা থেকে শুরু হওয়া যাত্রায় তিনি প্রমাণ করেছেন—শিল্প শুধু সৌন্দর্যের মাধ্যম নয়, এটি সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে।

 

নারীর ৫ ঘণ্টা কর্মদিবস: সুবিধা, চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীকে যদি শ্রমবাজারে পুরোপুরি কাজে যুক্ত করা যায়, তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বড় অর্জন হতে পারে।
তবে বাস্তবতা এমন নয় যে প্রতিটি নারী পূর্ণদিনের (৮–৯ ঘণ্টা) কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম। গর্ভাবস্থা, নবজাতক পরিচর্যা, পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব ইত্যাদি কারণে বহু উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন নারী চাকরি থেকে দূরে সরে যান।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ১৫ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের নারীর লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট ছিল প্রায় ৪৪.১৫ %, যেখানে মোট শ্রমবাজারে নারীর অংশ প্রায় ৩৬.৯৪ %।
তদুপরি, অধিকাংশ নারী এখনও অ-ফর্মাল সেক্টরে কাজ করছেন; একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্মরত নারীর ৯৬.৬ % অ-ফর্মাল কাজে নিয়োজিত।
এই তথ্যগুলো নির্দেশ করে যে, শুধু নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য নিরাপদ, স্থায়ী এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে, “৫ ঘণ্টার কর্মদিবস” অথবা সংক্ষিপ্তকালীন (part‑time) কাজ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই মডেল নারীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে: পরিবার ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য রক্ষা করা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ধরে রাখা, এবং যুব ও স্থানীয় কর্মশক্তিকে কাজে লাগানো। উদাহরণস্বরূপ, গর্ভবতী বা সদ্য-মাতা নারী ৫ ঘণ্টার কাজ করলে সন্তান পরিচর্যা ও ক্যারিয়ার দুটোই সহজভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।
পাশাপাশি, নতুন কর্মীদের জন্য part‑time অনবোর্ডিং মডেল তাদের দক্ষতা যাচাই ও পরবর্তীতে পূর্ণ‑সময় কাজে উত্তরণের সুযোগ তৈরি করে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই কর্মঘণ্টা সংক্ষিপ্তকরণ নারীর শ্রমবাজারে অবদান নিশ্চিত করতে সহায়ক। এটি শুধু কর্মজীবনই ধরে রাখে না, বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। পারিবারিক দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানের ভারসাম্য মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়।
তবে এটি কার্যকর করতে হলে পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য প্রোপোরশনাল বেতন, সামাজিক বীমা, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন ও ট্রান্সপারেন্ট প্রমোশন সিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এই মডেলের বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জও আছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গার্মেন্টস ও জরুরি সেবার মতো সেক্টরে শিফট সিস্টেম অপরিবর্তনীয় চাহিদা থাকতে পারে, যা শুধু ৫‑ঘণ্টার মডেল দ্বারা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এছাড়া পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা (যেমন বীমা, পেনশন), পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও প্রমোশনের নিয়মগুলোর পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। আইনগতভাবে ও নীতিগতভাবেও পরিবর্তন আনা দরকার — পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য স্বীকৃতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, চুক্তি ধরন এবং সুবিধার কাঠামোতে সংস্কার জরুরি।

এই সমস্যা মোকাবিলায় কিছু প্রাসঙ্গিক সুপারিশ:
১. পাইলট প্রোগ্রাম চালু করা: বিভিন্ন সেক্টরে ৫ ঘণ্টার/পার্ট‑টাইম কর্মদিবসের প্রভাব পরিমাপ।
২. শিফট ও রোটেশন ব্যবস্থা: জরুরি সেবা, স্বাস্থ্য ও গার্মেন্টসে গ্রেডেড শিফট, ওভারল্যাপিং শিডিউল ও জব-শেয়ারিং।
৩. অনবোর্ডিং ও রি-স্কিলিং: নতুন কর্মীদের জন্য part‑time অনবোর্ডিং এবং পারিবারিক বিরতির পর ফিরে আসা নারীদের জন্য অনলাইন/অফলাইন রি-স্কিলিং প্রোগ্রাম।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: প্রোপোরশনাল বেতন, পেনশন ও বীমা কাঠামো।
৫. পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও সচেতনতা: পারফরম্যান্স ভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রমোশন এবং HR-এ লিঙ্গ সচেতনতা বৃদ্ধি।

সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ৫ ঘণ্টার কর্মদিবস কেবল নারীর সুবিধার বিষয় নয়, এটি নারীর কর্মজীবন, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা সংরক্ষণ ও অর্থনীতিতে অবদান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি পরিবার ও কর্মের ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ দেয় এবং সমাজে লিঙ্গ-সমতার বাস্তবায়নে সহায়ক। নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই মডেলকে শুধুমাত্র বিকল্প না রেখে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের পথ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

ফল্ট লাইনের প্লেট খুলে যাচ্ছে: উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ভূমিকম্পঝুঁকির দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এলাকায় অবস্থান করছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণা জানিয়েছিল, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচে একটি সুপ্ত ‘মেগাথ্রাস্ট ফল্ট’ রয়েছে, যা এক সময় ৯ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই শঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ দেশের তিনটি দৈত্যাকৃতির টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে দীর্ঘদিন ধরে যে চাপ জমছিল, সেটি এখন আটকানো অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্লেট খুলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে বাংলাদেশ আরও উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

গত ২১-২২নভেম্বর দেশের বিভিন্ন জেলায় চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা জানান, এটি আসন্ন চাপমুক্তির অংশ হতে পারে এবং আগামী এক সপ্তাহে আরও ২০ বার ছোট–বড় কম্পন অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় নয়, তবে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ভূগর্ভে চাপ জমে আছে। যদি কয়েক দিনের মধ্যে ৫.৭ মাত্রার চেয়েও বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটে, তাহলে স্বল্পসময়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাঁর মতে, বিভিন্ন এলাকায় উৎপত্তিস্থলের কথা বলা হলেও সমস্ত কম্পনের উৎস একই-নরসিংদী অঞ্চল।

জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভূমিকম্প গবেষক রুবাইয়াত কবির মনে করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভারতীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এর ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মারাত্মক ভূমিকম্পের মুখে পড়ছে।
এদিকে নরসিংদীর ঘোড়াশালে মাটিতে দেখা দেওয়া ফাটল পরিদর্শনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একটি দল নমুনা সংগ্রহ করেছে, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে কম্পনের ধরন ও গভীরতা নির্ণয় করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, গত কয়েক দিনের কম্পন হচ্ছে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্লেট এখন খুলে যাচ্ছে। বিশেষভাবে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি গত ৮০০ থেকে ১,০০০ বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করে আসছে; যা যেকোনো সময় তীব্র ভূমিকম্পের রূপ নিতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাবডাকশন জোনে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প সাধারণত ৭.৫ মাত্রার ওপরে হয়ে থাকে এবং সেগুলো ধ্বংসাত্মক হয়।
পৃথিবীর ‘রিং অব ফায়ার’-এ এমন ভূমিকম্প নিয়মিত দেখা যায়। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলও একই ধরনের সাবডাকশন জোনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় উদ্বেগ এখানে অত্যন্ত বেশি।

ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালে মিয়ানমার-টেকনাফ প্লেট সীমানায় ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে এসেছিল। ওই কম্পনে বঙ্গোপসাগরে সুনামি সৃষ্টি হয়ে পাঁচশর বেশি মানুষ মারা যায়। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই অঞ্চলে আবারো শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধ্বংস নিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, হিমালয়ের নিচে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে ভেঙে অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল স্তরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। এর ফলে ভূত্বকে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে উপমহাদেশজুড়ে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ২১ নভেম্বর সকালে নরসিংদী মাধবদী থেকে উৎপত্তি হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় যে ক্ষতি করেছে, তা রাজধানীর নাজুক অবস্থাই তুলে ধরে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে ভবনের দেয়াল ফাটল, স্ল্যাব ধস, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক, গ্যাস–বিদ্যুৎসংযোগে ত্রুটি দেখা দেয়। শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় কয়েক শত মানুষ। রাজউকের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বড় একটি অংশেই বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই যেখানে দৃশ্যমান ক্ষতি হচ্ছে, সেখানে ৭ বা ৮ মাত্রার কম্পন হলে কী ধরনের বিপর্যয় নামবে, তা কল্পনাতেও ভয়ংকর।

ঢাকার আরও একটি সমস্যা হলো এর নরম পলিমাটির গঠন। Basin Effect-এর কারণে কম মাত্রার ভূমিকম্পও ঢাকায় বড় কম্পনের মতো অনুভূত হয়। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্প সিলেট বা নরসিংদীর তুলনায় ঢাকায় বেশি ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। এ কারণেই ৩.৩ বা ৩.৭ মাত্রার আফটারশকও রাজধানীতে ৫ মাত্রার মতো অনুভূত হয়েছে।

যদিও ভূমিকম্পের পর হওয়া ছোট ছোট কম্পনগুলো স্বাভাবিক আফটারশক—যা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ধীরে ধীরে কমে আসার কথা—তবুও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট: স্বল্পমেয়াদে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব বেশি নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না; তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে পুনঃমূল্যায়ন, সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, এবং নাগরিকদের ঘরোয়া নিরাপত্তা–প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো শুধু বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাসই দিচ্ছেনা, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান কতটা বিপজ্জনক।
প্লেট টেকটনিকের এই ধীর পরিবর্তন কখন কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তাই এখনই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায়।