২০২৪ সালের অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়, তা কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনাই নয়—বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থবিরতা ও সামাজিক জটিলতার ভেতর থেকে উদ্ভূত এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
টানা গণ-আন্দোলন, অসন্তোষ ও রাষ্ট্রীয় চাপের এক সংমিশ্রণে ১৫ বছরের পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে, আর এর পরপরই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত নারী সমাজে যে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তা আশার আলো যেমন দেখায়, তেমনি অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশাও ঘনীভূত করে।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। আগের সরকারের সময় যে ভীতি, হয়রানি ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন নারী কর্মীদের সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল, তা কিছুটা হলেও সরে গেছে—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। মাঠের রাজনীতি, নাগরিক প্রতিরোধ, মত প্রকাশ—সব জায়গায় নারীর উপস্থিতি নতুন করে দেখা যাচ্ছে। দলীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগও বেড়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান উন্মুক্ততার ভেতরেও লুকিয়ে আছে গুরুতর বাস্তবতা।
নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নটি এই পরিবর্তনের সময় আরও জটিল রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ কমলেও তার অবসান হয়নি, আর যতদিন রাজনৈতিক উত্তেজনা বিদ্যমান থাকবে, ততদিন নারী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকবে—এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সুস্পষ্ট। রাজনৈতিক সমাবেশে মহিলা কর্মীদের উপর হামলার ঘটনা এখনও ঘটে; লাঞ্ছনা ও অপমানের চক্র থামেনি।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো সাইবার সহিংসতা। নারী সাংবাদিক, নারী রাজনীতিবিদ এবং অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার, ব্ল্যাকমেইলিং, ছবি বিকৃতি, হুমকি—এসব এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কণ্ঠরোধ করতে এই ভার্চুয়াল সহিংসতা কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতিকে নীরব করে দেওয়ার এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি করছে।
নারীর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ভোটার সংখ্যা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে নারীর ভোট সংখ্যা ৬ কোটি ২১ লাখেরও বেশি—একটি বিরাট গণশক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে এই শক্তির প্রতিফলন খুবই দুর্বল। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ১০ শতাংশেরও কম। এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক শক্তি এখনো প্রান্তিকীকরণ ও দলীয় পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে ওঠে দাঁড়াতে পারেনি।
নারীর ওপর সহিংসতার চিত্রও রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হাজার হাজার মামলা হয়েছে—এর বড় অংশই যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনসংক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা এই পরিসংখ্যানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। সামাজিক লজ্জা, বিচার না পাওয়ার ভয়, প্রভাবশালীদের চাপ—নারী এখনও এই তিন বৃত্তের মাঝখানে আটকে আছেন। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার পাওয়া এখনো অসাধ্য পর্বতের মতো।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবদান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নারীর কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক অগ্রগতি বাধার মুখে পড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, নতুন চাকরি সৃষ্টি না হওয়া, বাজারের অস্থিতিশীলতা—এসব কারণে নারী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যারা ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করতেন, তারা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছেন; অনেক কারখানা ও কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের নিয়োগ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব নারীর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
পরিস্থিতির এই বহুমাত্রিক পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয় যে, নারীকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে দূরে রেখে কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যকর হতে পারে না। রাষ্ট্র এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে সম্ভাবনার দরজা খোলা, অন্যদিকে সঙ্কটের ঘনঘটা। এই বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা, অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত।
সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করতে চায়, তবে নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীয় জায়গায় আনা ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো পথ নেই।


