banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা

দেশের শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই নারীরা আজ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও জীবনের প্রয়োজনে নিয়মিতভাবে গণপরিবহন ব্যবহার করছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই চলাচল অনেক সময় তাদের জন্য হয়ে ওঠে ভয়, অপমান ও অস্বস্তির কারণ।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন, আর তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একটি সামাজিক সংকটের প্রতিফলন—যেখানে নিরাপদ চলাচলের মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।

নারীদের গণপরিবহনে হয়রানির ঘটনা ঘটলে প্রথম করণীয় হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এমন পরিস্থিতিতে ভয় বা লজ্জায় চুপ না থেকে বরং সরব প্রতিবাদ জানানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আশপাশের মানুষকে অবহিত করা, জোরে চিৎকার করে জানানো কী ঘটছে, এবং প্রয়োজনে চালক, কন্ডাক্টর বা নিকটস্থ যাত্রীদের সহায়তা নেয়া। সম্ভব হলে মোবাইল ফোনে ঘটনার ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করে রাখা। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকলে তার নাম ও ফোন নম্বর নোট করা, কারণ এই তথ্যগুলো পরবর্তীতে আইনি প্রমাণ হিসেবে অমূল্য ভূমিকা রাখে।

আইনের দৃষ্টিতে গণপরিবহনে শারীরিক বা মৌখিক হয়রানি কোনো সাধারণ অসভ্যতা নয়, এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৩৫৪ অনুযায়ী, কোনো নারীকে আক্রমণ করা, জোর করে স্পর্শ করা, বা তার শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে, ধারা ৫০৯ অনুসারে কোনো নারীকে অপমান বা শ্লীলতাহানি করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা আচরণ করাও আইনের আওতায় দণ্ডনীয়। তদুপরি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০—এর অধীনেও এসব অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করা উচিত। যদি ঘটনাটি গুরুতর হয়—যেমন শারীরিক আক্রমণ বা যৌন সহিংসতা—তবে এফআইআর দায়ের করতে হবে। এখন অনলাইনেও জিডি করার সুযোগ রয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে সহায়তা করে। পুলিশের পাশাপাশি কোনো আইনজীবী বা নারী সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর হয়। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিডিও, ছবি, অডিও বা মেডিকেল রিপোর্ট সবসময় সংরক্ষণ করে রাখা উচিত, কারণ এসব প্রমাণ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মৌখিক কটূক্তি বা হেনস্তার মতো ঘটনাও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেউ যদি গণপরিবহনে অশালীন কথা বলে বা কটূক্তি করে, সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানান। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা লজ্জা বা ভয়ের কারণে চুপ থাকেন, কিন্তু নীরবতা অপরাধীকে সাহসী করে তোলে। সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, যাতে প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনাস্থলে প্রতিক্রিয়া জানান ও অপরাধীকে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করেন।

হয়রানির শিকার ব্যক্তির জন্য একটি মানসিক আঘাত। তাই এমন ঘটনার পর পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীর সহযোগিতা নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে স্থানীয় নারী সহায়তা কেন্দ্র, ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯, কিংবা কোনো এনজিওর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু আইনগত পরামর্শই নয়, মানসিক সহায়তাও প্রদান করে।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন।
দেখা যায় এহেন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীকে বারংবার দোষারোপ বা হেয় করা হচ্ছে।
এসমস্ত ভিক্টিম ব্লেইমিং সংস্কৃতি থেকে সরে এসে ভুক্তভোগীর প্রতি
সহায়তাও সহানুভূতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ানোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক।
গণপরিবহনে হয়রানি কেবল নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। তাই পরিবর্তনের দায়িত্ব—নাগরিক হিসেবে, যাত্রী হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই।

জীবিকার তাগিদে, শিক্ষার প্রয়োজনে কিংবা পারিবারিক দায়িত্বে প্রতিদিন লাখো নারী ঘর থেকে বের হন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা হলেও, সচেতন প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়।তাই আর নীরবতা নয়, প্রতিবাদই পারে অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে দিতে।

 

গোলটেবিল বৈঠক: নতুন বাংলাদেশে শাসক নয়, সেবক চাই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে গত ১৮ অক্টোবর শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী গোলটেবিল বৈঠক—প্রতিপাদ্য ছিল “নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বে শাসক নয়, সেবক চাই।” নারী নেতৃত্বভিত্তিক সংগঠন ‘সম্মিলিত নারী প্রয়াস’ আয়োজিত এই আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।

বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দলীয় আনুগত্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সেবামুখী নেতৃত্বই পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরিন আমিন মোনামি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে সমাজকে শ্রেণী ও মানসিকতায় বিভক্ত করা হয়েছে—গ্রাম-শহর, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানভেদেও। এই বিভাজনই শোষণের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, নারীর প্রতিনিধিত্ব কেবল মুখের বুলি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে পরিচয়ের রাজনীতি নয়, কাজের নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।

বুয়েটের এমএমই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকিয়া আনা ফখরুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ বা ইসলামফোবিয়া গভীর আকার ধারণ করেছিল। নতুন সরকারের পক্ষে তা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তবে উদ্যোগ নিতে হবে সচেতনতার সঙ্গে। তিনি বলেন, নেতৃত্বে থাকতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনায় দক্ষতা—যে নেতা কেবল ক্ষমতায় নয়, পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবেন।

ঢাবির জিনপ্রকৌশল ও জিনপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রকৃত শাসক সে-ই, যিনি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়, বরং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দুর্নীতিমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বই পারে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, অতীতে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন ছিল তুলনামূলক সহজ, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি, ভোট কেনাবেচা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, জনগণের সচেতনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থাই নেতৃত্ব নির্বাচনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।

তার মতে, ভবিষ্যতের শাসককে হতে হবে দ্বৈতধর্মী—একদিকে জনগণের সেবক, অন্যদিকে অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।

বৈঠকের সারসংক্ষেপে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন ‘শাসক মানসিকতা’ নয়, ‘সেবক মানসিকতা’ প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতি দায়বোধ—এই তিন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে হবে নতুন নেতৃত্ব।